Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি

দরজাটা আটকে দিলো দীধিতি। কিন্তু লক করেনি। আটকানোর আওয়াজ হলো৷ সে আওয়াজ পেয়ে নাওফিল চোখ মেলে অদূরে দেখতে পেলো দীধিতিকে। তখনই আকস্মিক চেঁচিয়ে উঠল, ‘তোমাকে আসতে বলেছে কে?’
আচমকা নাওফিলের এমন প্রতিক্রিয়া আশাতীত ছিল দীধিতির কাছে। থমকে গেল ও, সামনে পা বাড়ানোর ইচ্ছাটুকুও মরে গেল। লজ্জা, অপমানের চোখদু’টো চিকচিক করে উঠল ওর… বুকের ভেতর কষ্টের কামড়ে প্রচণ্ড ব্যথার উদ্রেক হলো। ভারী কণ্ঠে জানিয়ে দিলো, ‘তুষার ভাই অনুরোধ করে বলেছিল ঐশীকে, আমি যেন আসি আপনার কাছে।’

হ্যাঁ, পরিষ্কার করেই জানিয়ে দিলো সে অনুরোধে ঢেঁকি গিলতেই এসেছে পর পুরুষের বাড়ি বয়ে সেই নিষিদ্ধ পুরুষকে এক নজর দেখতে। যা সমাজের দৃষ্টিতেও অশোভনীয় আর নিজের বিবেকের কাছেও। এই ভুল আজকের পর আর সজ্ঞানে করবে না সে৷
নাওফিলের ফিরতি জবাবের অপেক্ষা না করে দরজাটা টেনে খুলতে গেলেই নাওফিল আহত পায়ের ওপর থেকে চাদরটা ছুঁড়ে ফেলে ব্যথাকে অগ্রাহ্য করে তড়িঘড়ি করে উঠে দৌঁড়ে এলো দীধিতির কাছে৷ দরজাটাও ততক্ষণে খুলে দীধিতি ঘরের বাইরে পা ফেলেছে। নাওফিলও তখন ওর কব্জি চেপে ধরে আবার টেনে ভেতরে এনেছে। বাইরে বসার ঘরে কারও চোখে পড়ার সুযোগ দেয়নি সে।
দরজাটা লক করে দিলো নাওফিল ওর হাতটা মুঠোবন্দি করে রেখেই।
-‘কী সমস্যা?’
তেজী গলায় শুধিয়ে দীধিতি হাতটা উগ্রতার সঙ্গে ছাড়িয়ে নিলো।
ব্যান্ডেজ পা’টাই তড়তড়িয়ে ব্যথা বেড়ে উঠল নাওফিলের। দীধিতির প্রশ্নের বিপরীতে ও নিশ্চুপ থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরে এলো আবার বিছানাতে। আর জিদ্দি দীধিতি একই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে তখনও। ওর দিকে একবার চেয়ে নাওফিল বিছানার হেডবোর্ডে গা’টা এলিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে একটা অশ্রাব্য গালি উচ্চারণ করল তুষারের উদ্দেশ্যে। ঠোঁট কামড়ে ব্যথটুকু সয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে দীধিতিকে বলল, ‘এসে বোসো আমার পাশে। তারপর বলছি কী সমস্যা।’

দেরি না করে হনহনিয়ে দীধিতি এসে বসল নাওফিলের থেকে একটু দূরে৷ বিছানার পাশের সাদা সেন্টার টেবিলে স্যুপের বাটিটা ঢাকা পড়ে আছে৷ খুলেও দেখেনি নাওফিল৷ সেদিকে চেয়ে দীধিতি থমথমে সুরে বলল, ‘স্যুপটা আমি এসেই তৈরি করে পাঠিয়েছিলাম সবুজ ভাইয়ের হাতে।’
ঘাড় বেঁকিয়ে সাদা স্যুপের বাটিটার দিকে একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে নাওফিল দীধিতির চোখে চোখ রাখল। অকপটে বলল, ‘রাইট নাও আ’ম ভেরি আপসেট অ্যান্ড অলসো নট ইনজয়িং এনিওয়ান’স কম্পানি। তাই রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি। কারণ, এই রাতের বেলা তোমার আমার কাছে আসা আশা করিনি।’
ভীষণ সস্তা মনে হলো নিজেকে দীধিতির এবার। নাওফিলই যেখানে রাতবিরেতে ওর বাসায় চলে আসাটাকে অপ্রত্যাশিত ভেবে নিয়েছে, সেখানে ওর নিজের ব্যক্তিত্বের দরটা কতটা নিম্ন তা এখন ওর নিজের কাছেই পরিষ্কার। ভদ্র আর রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েরা কখনওই এমন করে পর পুরুষের বাড়ি বয়ে আসে না! স্বাধীনতা পেয়ে ও আজ-কাল তার অপব্যবহার করছে খুব বেশি। ঐশী তখন যেভাবে নাওফিলের দূরাবস্থার কথা বর্ণনা করেছিল ওর কাছে, তা শুনে ওর ওই মুহূর্তে কেবল এটাই ঠিক মনে হয়েছে যে অবশ্যই আসা উচিত ওর নাওফিলের কাছে। কিন্তু সেটা যে কত বড়ো ভুল, সেই ভুলটা করে ফেলার পর তা উপলব্ধি হচ্ছে।
মাথা নুইয়ে বসে থাকা দীধিতির দিকে জহুরি চোখে চেয়ে দেখছে নাওফিল। ওর কথার পর চোখ তুলেও তাকাচ্ছে না৷ নাজুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘কিছু বলছ না কেন?’

-‘ঐশীর থেকে আপনার অ্যাক্সিডেন্টের এক্সপ্লেনেশন শুনে অস্থির হয়ে পড়েছিলাম৷ তাই অত কিছু মাথায় আসেনি।’
-‘অস্থির?’
কথাটা নাওফিল পুনঃউচ্চারণ করতেই দীধিতি ঝটপট উত্তর বদলাল, ‘চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম।’
নাওফিল মিহি হাসল। তা দেখল না দীধিতি। সে আর দৃষ্টিই তুলছে না৷ শুধু যত দ্রুত সম্ভব বের হতে চাইছে সে এখান থেকে।
-‘কালকে রাতের মেসেজের পর তোমাকে প্রত্যাশা করব না, এটাই তো স্বাভাবিক তাই না?’
কালকের কথাগুলো তো ভুলেই গিয়েছিল দীধিতি৷ ভাগ্যিস প্রসঙ্গটা তুলল নাওফিল। ঝট করে মাথাটা তুলে দীধিতি সরাসরি প্রশ্ন নিক্ষেপ করল ওর দিকে চেয়ে, ‘মানে কী এমন সিদ্ধান্তের?’
নাওফিল আর এবার চোখ রাখতে পারল না দীধিতির দৃষ্টিতে। সেন্টারটেবিল থেকে স্যুপের বাটিটা তুলে নিয়ে খেতে আরম্ভ করল৷ অবশ্যই দীধিতির তৈরি বলেই মুখে নিলো। খাওয়ার পাত্রেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে জবাব দিলো, ‘মানে তো পরিষ্কার করেই বলে দিয়েছিলাম।’

-‘স্বেচ্ছাচারী মানসিকতার আপনি। নিজেই ফোর্স করবেন ভালোবাসতে। আবার নিজেই তাড়িয়ে দেবেন। যাকে ফোর্স করছেন তার ফিলিংস বোঝার ইচ্ছে নেই আপনার।’
বেশ লাগছে স্যুপটা নাওফিলের। আরাম করে খেতে খেতে আবারও হাসল আগের মতো। অনেকটা সিনেমার অভিনেতাদের মতো শিখিয়ে দেওয়া প্রশংসনীয় কায়দার মুচকি হাসি। অর্থাৎ ওর এসব হাসি সবই মেকি।
-‘তোমার সঙ্গে আসলেই খুব অন্যায় করেছি। আর করতে চাই না বলেই তোমাকে আমার থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছি।’
ধৈর্যের সীমা লঙ্ঘন হলো বোধ হয় দীধিতির, ‘প্লিজ বন্ধ করুন তো আপনার হেয়ালিপনা! রহস্য করে কথা বললে আপনার সামনের মানুষটার মাঝে জাস্ট রাগ আর বিরক্তি আসে। আগ্রহ আসবে এমনটা কেন ভাবেন? আমার শুরু থেকেই আপনার মাঝের রহস্য ভাবটা অসহ্য লাগে। কখন যে ঘৃণা করতে করতেই ভালো লেগে গেল আপনাকে! এটা আমার জন্য সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। আমি চাইনি আপনাকে ভালোবাসতে। বিশ্বাস করুন, এখনও চাই না।’
শেষ বাক্যে ঝিমিয়ে গেল দীধিতির কণ্ঠ। যেন সে পরাস্ত সৈন্য। নাওফিল ওর অবস্থাটা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারল বলেই মায়া হলো ওর। বাটিটা আগের জায়গায় রেখে তখন কোমল গলায় অনুরোধ করল, ‘কালকের পুরো দিনটা আমাকে দেবে? এখন তোমার বাসায় ফেরা উচিত, রাত হয়ে যাচ্ছে বেশি৷ আমি খোলাখুলি সব বলতে চাই তোমাকে৷ তার জন্য অনেকটা সময় লাগবে আমার। কালকে সকালবেলায় প্লিজ এসো।’
ওর দিকে অনেকক্ষণ নির্ণিমেষ চেয়ে থাকল দীধিতি। নাওফিলের চোখের ভাষা পড়তে চাইছে যেন। কিন্তু এই মানুষটির চোখদু’টোর ভাষাও খুব দুর্বোধ্য। উঠে পড়ল ও।
-‘ঠিক আছে। আসছি, খেয়াল রাখবেন নিজের।’
শক্ত মুখ করে চেয়ে থাকল নাওফিল ওর যাওয়ার পথে।

”শেখ বাড়ির সদস্যদের কঠোর নিয়ম-কানুনের মাঝে বড়ো করা হয়েছে। বাড়ির কর্তা মাহতাব শেখ তার ছোটো সন্তানের ধ্বংসাত্মক জীবনের পরিণাম দেখার পর থেকে নিজেকে পরিবর্তন করে নেন। বিশাল অর্থবান হলেও সাদামাটা জীবনযাপন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে রাজনীতিতে যুক্ত হতে বাধ্য করে৷ আদরের ছোটো সন্তান দেশদ্রোহী। একজন সন্ত্রাস নারীকে বিবাহ করে অস্ট্রেলিয়া সংসার পাতে সে। বিবাহের আট মাসের মাথায় এও জানতে পারেন তিনি, তার ছোটো ছেলে বাবা হয়েছে। কিন্তু সেই সন্তান ছিল অপরিণত শিশু৷ দীর্ঘ এক মাস তাকে ওখানের ডাক্তাররা পর্যবেক্ষণে রেখে তারপর সুস্থ করে তোলে। বড়ো ছেলে জাকির সেই বাচ্চার ছবি দেখিয়েছিল তাকে। সে সময়ে অস্ট্রেলিয়াতে সব থেকে সুন্দর শিশুদের একটা তালিকা তৈরি করত। কিন্তু শিশুরাতো ফেরেশতা সমতুল্য। সেই শিশুদের মাঝে আবার সৌন্দর্যের কম-বেশি নির্ণয় করা যায় কীভাবে?তা ঠিক জানা নেই। তবে জাকিরের কাছেই শুনেছিলেন তিনি, সেই সন্তান তালিকার শীর্ষে ছিল। জাকিরকে জানান, অন্তত ওই সন্তানকে দেখানোর জন্য হলেও যেন ছোটো ছেলে তার বউকে নিয়ে আসে দেশে। এ খবর ছোটো ছেলের কাছে পৌঁছতেই সে রাতের আঁধারে প্রাইভেট জেটের মাধ্যমে দেশে ফেরে সাত দিনের ব্যবধানে। নাতি হয়েছিল মাহতাব শেখের৷ তিনি কোলে নিয়ে সেই নাতিকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে শুধু একবারই বলেছিলেন ছোটো ছেলেকে, ‘ওকে আমার কাছে রেখে যা, বাপ! তোকে আর ফিরে চাই না আমি। কারণ, তুই ফিরবি না জানি। কিন্তু এই কোহিনূরকে তোর হারাম উপার্জনে বড়ো করিস না। ওকে আমায় দিয়ে দে।’

কিন্তু বাধ সেধেছিল তখনই ছোটো পুত্রবধূ। রীতিমতো পাগলামি শুরু করে সে ওই মুহূর্তেই। একটা পর্যায়ে এত বেশিই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে সে, যে বাধ্য হয়ে তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিতে হয়। তখন মাহতাব শেখ আরও একটা ধাক্কা খান এ কথা জেনে, তার পুত্রবধূ একজন মানসিক রোগী। দেখতে সুস্থ লাগলেও সে সাইকোপ্যাথ কিলার৷ সে অন্যের কষ্ট অনুভব করে না, নিজের কষ্টও না। কিন্তু তবু সে অসীম ভালোবাসে নিজের সন্তানকে। সেদিন তাকে সামলানো গেলেও পরদিনই ঘটে সেই দুর্বিষহ ঘটনা। যে ঘটনার কারণে জাকির শেখে তার সন্তানতুল্য ছোটো ভাই জায়িন মাহতাবকে হত্যা পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। পুলিশে কল করে ধরিয়ে দিতেও চেয়েছিল ভাইকে আর ভাইয়ের স্ত্রী আয়মান মেহরিনকে। এরপর কী করে যেন সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জায়িন মাহতাব তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলে যায় দেশ ছেড়ে। তারপর থেকে মাহতাব শেখ আর তার স্ত্রী আর্তনাদ করে কাঁদতেন কলিজার সন্তান জায়িনের জন্য আর একদিনের দেখা নাতির জন্য। জাকির বাবা-মায়ের সেই কান্না সহ্য করতে না পেরে কথা দিয়েছিল তাদের, যেমন করেই হোক সে ফিরিয়ে আনবে তাদের নাতিকে। কিন্তু ভাইকে নয়।”

এই লম্বা ভয়েজ রেকর্ডটা দীধিতি পায় সকালে ঘুম থেকে উঠতেই। নাওফিল পাঠিয়েছে মাঝ রাত্রে। কিন্তু পরিষ্কার করে ও কিছুই বুঝতে পারেনি। শুধু মনে হচ্ছে, এই ছোট্ট গল্পটাই নাওফিলের ভূমিকা সব থেকে বেশি। আগ্রহ বা কৌতুহল দমিয়ে রাখা দায় হয়ে যায় ওর জন্য ভয়েজটা শুনেই।
আজকে তামান্না দুপুরের রান্না একবারে সেড়ে ফেলেছে। ডাল, আলু ভর্তা চিংড়ি মাছ ভুনা আর বেগুন ভাজা। দীধিতিকে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে ডাকতেই ও হাতের ফোনটাতে সময় দেখে, বেলা সাড়ে ন’টা। বিছানা ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে গোসল সেড়ে নেয়৷ বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি শেষে দু’বান্ধবীকে জানায়, ‘নাওফিল আজ খোলাখুলি কথা বলতে চাই আমার সঙ্গে৷ সারা দিনটা ওকে সময় দিতে বলেছে৷ আমি এখুনি বেরিয়ে যাচ্ছি, বুঝলি? তোরা ভার্সিটি শেষ করে চলে আসিস ওখানে৷’

তন্বী কিছু বলতে চাইলে ওর মুখের অভিব্যক্তি দেখে দীধিতি শুধু বলল, ‘সব কথা শুনে তারপর বিস্তারিত বলব৷ এখন কিছু বলিস না৷ নাওফিলের জন্য একটু খাবারগুলো টিফিনবক্সে দে তো। ঐশীর রান্না নাকি তেমনটা স্বাদের হয় না। তাই হয়তো নাওফিল খেতে চায় না৷ ঐশীই বলল কাল৷ আজ তামান্নার হাতের রান্না খাওয়াই গিয়ে।’
তন্বী বা তামান্না কেউ-ই কথা বাড়াল না। টিফিনবক্সে তন্বী খাবার গুছিয়ে দিতেই দীধিতি বেরিয়ে পড়ে৷ অনুপমাদের বাসার গলি পাড় হতেই দেখা হয়ে যায় ওর তাওসিফের সঙ্গে। আজ তো শনিবার। তাও এই সকালবেলা সেজেগুজে তাওসিফ গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। নাওফিলকে দেখতে যাচ্ছে না তো আবার? তাহলে তো ওর আজ কথা বলা হবে না নাওফিলের সঙ্গে৷ কিন্তু আজ যে করেই হোক কথা বলতে হবে ওকে৷ যদি তাওসিফ সেখানেই যায়, তবে নাওফিলের সঙ্গে প্রয়োজনে রুফটপে গিয়ে বসবে বাসা লক করে। নিশ্চিত হওয়া জরুরি এর পূর্বে, তাওসিফ সত্যিই যাচ্ছে কি না নাওফিলের বাসায়! তাই একরকম যেচে পড়েই ডাকল ও তাওসিফকে, ‘হ্যালো, তাওসিফ শেখ?’
গাড়িটা গলি থেকে বের করে মূল সড়কে উঠেছে তাওসিফ। দীধিতি রিকশাতে বসা তখন। ওর ডাক শুনে বাঁয়ে তাকায়৷ ভাবেনি এই মেয়েটা কখনও সেধে কথা বলবে ওর সঙ্গে৷ যে ভাবটা সেদিন নিলো ওর সঙ্গে ছাদ থেকে! তারপর এই ডাক তো একেবারেই ভাবনাতীত। নিজের চমকানো অভিব্যক্তিটা সামলে খুব গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর নিলো, ‘হ্যাঁ বলুন।’

-‘নাওফিলের শরীরের কী অবস্থা এখন? ও কি ঢাকায় ফিরেছে?’
-‘হ্যাঁ ফিরেছে। কিন্তু জ্বর ছাড়েনি। কাল রাতে কল করে জানলাম। আজ দেখতে যাওয়ার কথা ছিল আমার৷ কিন্তু ও নাকি সন্ধ্যার আগে বাসায় থাকবে না৷ রাতে যাব ওর কাছে।’
নিশ্চিন্ত হলো দীধিতি। এবং এটাও বুঝল, নাওফিল ওর জন্যই দিনে আসতে বারণ করেছে তাওসিফকে। আর নিজের অ্যাক্সিডেন্টের কথাও লুকিয়ে গেছে৷ তাওসিফের সঙ্গে কথার সমাপ্তি টানল ওখানেই। বিদায় জানিয়ে চলে এলো। কিন্তু তাওসিফ নড়তে পারল না গাড়ি নিয়ে৷ আজ বোরকা পরে বের হয়নি দীধিতি৷ মনে হলো একটু বেশিই পরিপাটি হয়ে বেরিয়েছে সে। প্রথম দু’দিন দেখে ভেবেছিল, একটু পর্দা মান্য করে হয়তো মেয়েটা। তাই ভালো লেগেছিল। আজ ভাবনা বদলাল ঠিকই, সঙ্গে দীধিতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও নাওফিলের জন্য অপছন্দ হলো। শেখ পরিবারের বধূ আর বাড়ির মেয়েদের পর্দা করার হুকুম রয়েছে। লোক দেখানো পর্দার হুকুম নয়। একজন সত্যিই আল্লাহ ভীরু পর্দানশীল নারী ছাড়া শেখ পরিবারের বউ হতে পারবে না সে। তাই নিজের মনটাও তাওসিফের খোঁজে এমন নারীকেই। সঙ্গে নিজের ভাইদের জন্যও।

দীধিতি পৌঁছে প্রথমে ঐশীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর বাসায় তালা দেখে নাওফিলের ফ্ল্যাটে একা যেতে দ্বিধা কাজ করছে। মনটা কেন যেন সায় দিচ্ছে না। কল করল ঐশীকে। ঐশী রিসিভ করল না। এমনকি রুমানও না। ভাবনা-চিন্তা করতে করতে বেলা সাড়ে বারোটা বেজে গেল। এসে পৌঁছেছিল সে বারোটাতে। উপায়ন্তর না পেয়ে সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে নাওফিলের ফ্ল্যাটে কলিংবেল চাপল বেশ ক’বার। প্রায় পাঁচ মিনিট পর দরজা খোলা হলো। বিধ্বস্ত বেশে নাওফিল দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। পরনে সাদা পলো শার্ট আর কালো ট্রাওজার। বেডৌল ঢেউ খেলানো চুলগুলো বড়ো হওয়ায় আর ক্লিন শেভ মুখটায় হঠাৎ খুবই হালকা দাড়িতে চেহারাটা পালটেছে ওর। গতকাল রাতে খেয়াল করেনি দীধিতি। কিন্তু নিদ্রাবিহীন টকটকে লাল চোখজোড়া খুব ভয়ঙ্কর লাগছে। সেই দিনের মতো, যেদিন নাওফিল নিজের কুৎসিত রূপ দেখিয়েছিল মৃত মানুষকে ব্যবচ্ছেদ করে। সেই দৃশ্যটা মনে পড়তেই দীধিতি আঁতকে উঠে একবার চোখ বন্ধ করে ফেলে আবার তাকাল সামনে। তখন দেখল সামনে নাওফিল নেই। ও কুঞ্চিত কপাল করে ঘরে ঢুকল। নাওফিল শোবার ঘরে ফিরে এসে বিছানায় কম্বল জড়িয়ে আবার শুয়ে পড়েছে। বেচারার সাংঘাতিক জ্বরে ধরেছে৷ এর কারণ, গতকাল রাতে সে ওষুধগুলো নেয়নি। দীধিতি খাবারটা নিয়ে ওর ঘরে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘সকালে কিছু খেয়েছিলেন?’

-‘খেয়েছিলাম, নিজের রক্ত।’ শীতল কণ্ঠে জবাব দিলো নাওফিল।
আবার শুরু করেছে লোকটা হেঁয়ালিপূর্ণ কথাবার্তা! দীধিতি মেজাজ খারাপ নিয়ে ঘরে থেকে বেরিয়ে এলো৷ ডাইনিংয়ে গিয়ে খাবারগুলো প্লেটে বেড়ে ফিরে এলো আবার৷ ওর পাশে বসে বলল, ‘উঠুন, খাবার এনেছি আমি। ওষুধ কি খেয়েছিলেন?’
নাওফিল কোনো জবাব দিলো না, উঠেও বসল না। দীধিতি ইতস্তত করে এগিয়ে এলো ওর আরেকটু কাছে। ওকে নাম ধরে ডাকতেই ও চোখদু’টো খুলে বিনাবাক্যে হঠাৎ দীধিতির হাতটা টেনে নিজের কপালে রাখল৷ ভীষণ চমকাল দীধিতি৷ প্রচণ্ড গরম নাওফিলের শরীর। কিছু বলতে গেলেই নাওফিল দ্বিতীয়বার তাকে চমকে নিজের বুকের মাঝখানে হাতটা চেপে ধরল, স্তিমিত গলায়, চোখদু’টো ফের বুজে বলতে থাকল, ‘দিজ লাইফ ইজ নট লাইক আ নরমাল হিউম্যান বিয়িং। আমার জন্ম, আমার বেড়ে ওঠা, সবটাই অপ্রত্যাশিত আর ঝামেলাপূর্ণ। তুমি জানো না দীধি, কেউ জানে না আমার একটা বোন আছে জাস্ট লাইক মি। নো নো নো, মে বি দেয়ার ওয়াজ।’
বিষণ্ন সুরের শেষ কথাটির পর মিইয়ে পড়া গলায় বাক্যের শেষ টানল, ‘পৃথিবীতে হয়তো সে নেই, আব্বু আম্মুও হয়তো নেই। কী জানি!’

-‘আপনার আব্বু আম্মু!’ কম্পিত, দ্বিধান্বিত কণ্ঠ দীধিতির।
এরপর একই রকম গলায় নাওফিলের স্বীকারোক্তি, ‘ও ইয়াহ্, মাই বায়োলজিক্যাল প্যারেন্টস।’
তাকে থামিয়ে দিতে চাইল দীধিতি, স্নেহ কণ্ঠে বলল, ‘আমার মনে হয় আপনার আজকেও রেস্টের প্রয়োজন। এলোমেলো কথা বলছেন৷ আমি বুঝতে পারছি না কথার অর্থ। উঠে খেয়ে নিন, ওষুধ বোধ হয় নেননি।’
তবু নাওফিল থামল না। বিড়বিড় করে বলে চলল, ‘আমি মানসিকভাবে অসুস্থ নই আবার সুস্থও নই৷ অ্যান্ড আ’ম নট ডেনজারাস। ইয়্যু আর সেইফ উইথ মি। এরপর আর বলা হবে না হয়তো। তোমাকে আমার সঙ্গে আর জড়াতে চাই না বলেই বলতে হবে আমায়। এলোমেলো লাগবে কথাগুলো৷ কষ্ট করে বুঝে নিয়ো প্লিজ। আমি গুছিয়ে বলার অবস্থাতে নেই। আজই হয়তো তোমার সাথে আমার শেষ দেখা৷ আমার পরিচয় জানার পর তুমি আসবে না আমার কাছে, আর না খুঁজে পাবে আমাকে।

সুদূর অস্ট্রেলিয়ার সন্ত্রাসবাদ জগতে আমার পরিচয়কে বলা হয় “কিলার হ্যোয়েল কাবস”। কারণ, আমার শরীরে দুজন মিস্টিক কিলার রকসের রক্ত বইছে। আমি বুঝতে শেখার পর থেকে জেনে এসেছি ওঁদের বর্বর মানসিকতার গল্প। কোনোদিন দেখিনি ওঁদের। কিন্তু আমি অনুভব কেন করি জানি না, আমার প্রতি ওঁদের তীব্র ভালোবাসাকে অসম্ভব অনুভব করি। আমিও প্রচণ্ড ভালোবাসি ওঁদের, খুব ভালোবাসি। আর এ যুক্তিতেই ধরে নেয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই আমিও ওঁদেরই মতো বর্বর হবো৷ কারণ, রক্ত নাকি কথা বলে। আমি দেখতেও হয়েছি নাকি আমার আব্বুর মতো আর আমার স্বভাব, বৈশিষ্ট্যও ওঁদেরই মতো। আমার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে গাজীপুরে। দাদাভাই আর দাদীবুর সঙ্গে একাকী, চাচাতো ভাই-বোনদের থেকে আলাদা৷ যাতে আমার হিংস্র মানসিকতার শিকার তারা না হয়, তারা যেন আমাকে অনুসরণ না করে। কিন্তু তবুও আমার চাচাতো ভাই-বোনেরা আমাকে খুব কাছে টানত। সবাই জানি শেখ পরিবারের জান আমি। কিন্তু ওই পরিবারের কয়েকজন সদস্যের চোখের বালি আমি৷ যাদের অবহেলা আর তিক্ত কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমি নোংরা বাবা-মায়ের সন্তান৷ আমিও তাদের মতোই হবো একদিন। আমি যে পিতৃ পরিচয়ে বড়ো হয়েছি, তিনি আমার বড়ো চাচা। তার প্রতি আমার প্রবল বিতৃষ্ণা আর ঘেন্না। তিনি কেবল মাহতাব শেখ, অর্থাৎ আমার দাদার জন্য আমাকে সন্তান পরিচয় দিয়েছেন৷ তাছাড়াও তার স্ত্রী আমাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন। এটাও একটা কারণ। কেননা তার নিজের কোনো সন্তান নেই। আমার বাবা-মা’কে ধ্বংস করেছেন আমার বড়ো চাচা। আরও কিছু বিশ্বাসঘাতক আছে এর সঙ্গে জড়িত। আমার আব্বু কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করতে পারেনি। আমিও পারি না৷ খুন করার সাধ জাগে আমার। কিন্তু সেই ক্ষমতা আমার নেই৷ কিন্তু তাই বলে তাদের ছেড়ে দেবো না৷ বিশ্বাসঘাতকর শাস্তি তাদের দেবোই। এমনকি নিজের চাচাকেও ছাড় দেবো না। দুর্ভাগ্য যে আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি৷ নয়তো তুমিও… ‘

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১২

-‘আমিও? আমিও কী নাওফিল?’ উত্তেজিত গলা দীধিতির।
সাসপেন্স ক্লিয়ার হওয়া আরও দেরি। কিন্তু আজ ফটোতে একটা ইঙ্গিত দিয়েছি। বলুন তো কী বুঝিয়েছি? পরবর্তী পর্ব আসতে এ কারণেই দেরি হবে, আমার পাণ্ডুলিপি রেডি না৷ আগামী এক মাসের মাঝে রেডি করতে হবে বলেই ধারাবাহিক নিয়মিত দিতে পারব না। আশা করছি পাঠকরা বুঝবেন আমার সমস্যাটা।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here