আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি
রং চটা দেওয়ালের চাকচিক্যহীন দোতলা বাড়িটার নিচতলা ভাড়া দিয়ে ডাক্তার ঝুমুর ইয়াসমিন মেয়েদের নিয়ে থাকেন উপরতলায়৷ যশোর যখন এসেছিলেন তিনি স্বামীর সঙ্গে, তখন এ বাড়িতে তারাও ভাড়াই থাকতেন৷ এ বাড়ির মালিক হঠাৎ কী কারণে যেন পুরো বাড়িটাই বিক্রি করে দিয়ে যান তাদের কাছে৷ সেই থেকেই তারা চিরস্থায়ী এই যশোর জেলায়।
বাসার নিচতলায় ভাড়া থাকে একটি মাস্টার পরিবার৷ স্বামী-স্ত্রী দুজনেই হাই স্কুলের শিক্ষক। তাদের ছোটো ছোটো দুই ছেলে মেয়ে আছে ছ’বছর আর ন’বছরের। আর সঙ্গে থাকে একজন কাজের মেয়ে। কাজের মেয়েটির নাম শিউলি৷ এ পরিবারটির সঙ্গে বেশ সুসম্পর্কই ঝুমুরদের৷ যেদিন রাতে তার ফিরতে প্রচুর দেরি হয়ে যায় সে রাতে শিউলি এসে থাকে কিরণের সঙ্গে৷ আজকের দিনটাও তেমনই৷ রাত এখন বারোটার কাটাতে। কিরণ কল করেছিল ঘণ্টাখানিক আগে মা’কে৷ তখন বলেছিলেন ক্লিনিক থেকে বের হবেন তিনি দশ মিনিট পরই। ফিরতে বড়োজোর বিশ মিনিট লাগার কথা যদি রিকশাতে ফিরেন। সেখানে প্রায় একটা ঘণ্টা অতিক্রম হওয়ায় আর মা কল না তোলায় দুশ্চিন্তায় ঘুম উবে গেছে ওর। অপারেশন থাকলে প্রায়ই এমন দেরি করে ফিরতে হয় ঝুমুরকে। সে রাতটা কিরণ আর স্মরণ দুজন যেখানেই থাকুক, ফোনকলে এক সঙ্গে চিন্তা করতে বসে যায়।
কিন্তু আজ আর কিরণ কল দিয়ে জানায়নি কিছু আপুকে। ইদানিং আপুর সাথে কথা বলে শান্তি পায় না সে। কেমন যেন একটা বৈরাগী বৈরাগী সুর মনে হয় আপুর কথায়৷ কী হয়েছে কে জানে? প্রেমে পড়লে মেয়েরা প্রেমিক থেকে আঘাত পেলে এমনটা করে জানে কিরণ৷ নিজের বন্ধুদের দেখেছে তো, তাই এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা তার বেশ ভালোই। মায়ের সাথে আপুর এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সাহস হয়নি। পড়াশোনা করতে গিয়ে বোন প্রেমে দেবদাসী বনে গেছে জানতে পারলে মা ওর বোনকে তো কিছু করতে বা বলতে পারবে না। উপরন্তু সব রাগ উসুল করবেন ওর পিঠেই লাঠি ভেঙে।
সোফা ছেড়ে উঠে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে পানির গ্লাসটা হাতে নিতেই দরজায় টোকা পড়ল, সাথে কলিংবেলও বাজল৷ পানি পান করা হলো না কিরণের৷ দৌঁড়ে এসে দরজার পীপহোল দিয়ে আগে দেখে নিলো ওপাশে তার মা’ই কি না। কাঙ্ক্ষিত মানুষটির মুখ দেখার বদলে বড্ড অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখে বুকের রক্ত ছলকে উঠল ওর। সুহাইল শেখ! সেই দুপুরের সাদা পাঞ্জাবিটাই পরনে লোকটির। তিনি এত রাতে কী জন্য এসেছেন? ভাবনার মাঝেই টোকা পড়ল দরজাতে আবার। সেই সঙ্গে ওপাশের মানুষটি ডাকল, ‘বাচ্চা! দরজাটা খোলো।’ ঝুমুর ডাকলেন। তাহলে তিনি আর সুহাইল এক সঙ্গেই এসেছেন! জলদি দরজাটা খুলে সামনের চিত্রটি দেখে আর্তনাদ করে উঠল কিরণ, ‘আম্মু! কী হয়েছে তোমার?’
মায়ের কাছে আসতে গেলেই সুহাইল হাতের ইশারায় থামিয়ে বললেন, ‘শান্ত হও, আগে মা’কে নিয়ে ভেতরে আসি, বাবু।’
খুব ইতস্তত ভাব নিয়ে ঝুমুর সুহাইলের বুকের পাশে মিশে আছেন। শরীরের সম্পূর্ণ ভরটা তার সামলে আছেন সুহাইলই। বড়োই বিনয়ের সাথে ঝুমুরকে সোফায় বসিয়ে কিরণকে আদেশ করলেন, ‘ঠান্ডা দু গ্লাস পানি নিয়ে আসো, কিরণ।’
বলতে দেরি যতটুকু, কিরণ ছুটে গিয়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে নরমাল পানির সঙ্গে মিশিয়ে আবার আগের গতিতে ফিরে এলো। এক গ্লাস সুহাইল নিলেন, আরেক গ্লাস তিনি ঝুমুরের হাতে তুলে দিলেন। জিজ্ঞেস করল কিরণ পুনরায়, ‘আম্মুকে অমন দেখাচ্ছে কেন, স্যার?’
গ্লাসটা সামনের কাচ বসানো টি টেবিলটার ওপর রেখে সুহাইল অসন্তুষ্ট অভিব্যক্তিতে তাকালেন ঝুমুরের দিকে, ‘আমার কোলে চড়ার শখ হয়েছিল তোমার আম্মুর। তাই লো প্রেশার বানিয়েছেন৷ ও.টি. শেষ করে সিঁড়ি থেকে নামবার সময় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। আমি তখনই উঠছিলাম। দ্রুত সামলে নিয়েও শেষ রক্ষা হলো না৷ কীভাবে যেন ডান পা’টা মচকে গিয়েছে। চিন্তা কোরো না৷ দু’দিন ওষুধ খেলে আর রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তোমাকে খুব স্ট্রিক্ট হতে হবে কিরণ। আম্মুর খাওয়া-দাওয়ার দিকে কঠোর নজর রাখতে হবে, খুব বেশি যেন টেনশন না করে সে খেয়ালও রাখতে হবে। আর সময় পেলে স্মরণকে কিছুদিনের জন্য এসে ঘুরে যেতে বোলো। এখন যাও, দ্রুত আম্মুর জন্য বড়ো এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে আসো।’
-‘এক্ষুনি যাচ্ছি।’
ঝুমুর মেয়েকে বারণ করারও জো পেলেন না। এক দৌঁড়ে সে রান্নাঘরে চলে গেছে। সে সুযোগেই সুহাইল ঝুমুরের গা ঘেঁষে এসে বসলেন। আগুনের আঁচ লাগল যেন গায়ে৷ তেমন প্রতিক্রিয়া করেই ছিটকে দূরে গিয়ে বসলেন ঝুমুর, তেতে উঠলেন নিমিষেই, ‘নির্লজ্জের মতো কাছে এসে বসছেন কেন? আপনি কিন্তু দিনদিন খুব বাড়াবাড়ি করছেন, সুহাইল৷ স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের মতো হয়ে যাচ্ছেন। সব সময় আমাকে স্টক করছেন কেন? আর আজ ক্লিনিকে কী করলেন আপনি? কোন সাহসে কোলে তুলে নিলেন আমাকে? এখন আবার আমার মেয়ের সামনে এসেও অভদ্রদের মতো কথা বলছেন! একজন মেয়র হিসেবে এমন পার্সোনালিটি মানায় না কিন্তু আপনাকে।’
অবাধ্য, বেপরোয়া আর দুষ্টু সুহাইল এবারও ঝুমুরের কাছে এসে বসলেন, ঝুমুরের কথাগুলোকে অগ্রাহ্য করে বললেন, ‘আপনি কী নিয়ে এত টেনশনে আছেন, স্মরণের আম্মু? আমাকে বলুন।’
-‘চুপ করুন! কেন বলব আপনাকে? কে আপনি? আর নিষেধ করেছি না আমাকে স্মরণের আম্মু না ডাকতে? ভাবি বলবেন নয়ত শুধু ডক্টর।’
কানের কাছের চুলগুলোর মাঝে দু একটা চুল পাক ধরেছে সুহাইলের৷ সেখানে হঠাৎ হঠাৎ চুলকায়। এখনও সেখানে চুলকাতে আরম্ভ করলেন, ‘আমার বড়ো সাত ভাইয়ের চারজনই মারা গেছেন। ভাবিও মারা গেছেন তিনজন। বেঁচে আছেন যে চার ভাবি, তাদের কারোরই সতীন না আপনি৷ তাহলে ভাবি ডাকব কোন আক্কেলে? আপনার হাজবেন্ড যে সময় বেঁচে ছিলেন, তখনও তাকে আমি কখনও ভাই ডাকিনি। আমরা কোনোদিন মুখোমুখিই হইনি৷ সেদিক থেকেও তো আপনাকে ভাবি ডাকা যায় না৷ এবার রইল ডক্টর। আমি এখন পর্যন্ত ভার্জিন৷ আমার ওসব কোনো সমস্যা আছে কি না তা জানা নেই। আপনাকে বিয়ে করার পর তা বোঝা যাবে।
তবে আমার ধারণা আলহামদুলিল্লাহ আমি পুরোপুরি সুস্থ৷ তাই আপনার কাছে ট্রিটমেন্ট নেবার প্রয়োজন পড়ছে না আপাতত৷ আপনার পেশেন্টই যদি না হই ঢং করে ডক্টর ডাকতে যাব কেন?’
রাগ, লজ্জায় ঝুমুরের রক্তিম মুখখানা শক্ত হয়ে এলো। রান্নাঘরের দিকে একবার সতর্ক চোখে চেয়ে দূরছাই করলেন সুহাইল, ‘এসব নোংরা কথাবার্তা বলার জন্য বসে আছেন এখনও? রাত বারোটার সময় আমার বাসায় আপনার উপস্থিতি কেউ জানতে পারলে কতটা অসম্মানিত হতে হবে আমাকে, জানেন? এমনিতেই মেয়েদু’টোকে নিয়ে কম শুনতে হচ্ছে না। এর মধ্যে আপনি এসে আরও সুযোগ করে দিচ্ছেন পাড়া প্রতিবেশীদের।’
-‘তাহলে এটাই আপনার দুশ্চিন্তার কারণ, তাই তো? এবার তাহলে পাড়ার মহর্ষিগুলোর ব্যবস্থাও নিতে হবে।’ মুখভঙ্গি বদলে একটু রুঢ় হলো সুহাইলের।
-‘কীসের ব্যবস্থা? আপনাকে কিন্তু আমি আবারও বলছি আমার বা আমার মেয়েদের ব্যাপারে আপনি আর নাক গলাবেন না।’
গরম চোখে তাকালেন সুহাইল, ধমকে বললেন ঝুমুরকে, ‘দ্বিতীয়বার এই কথা আমাকে বললে আপনাকে বিয়ে না করেই কিন্তু স্মরণ, কিরণকে আইনিভাবে কাগজে কমলে লিখে নেব। আপনার চোখের সামনে ওদেরকে বাপ ডাকতে বলব।’
-‘আর ওরা বোধ হয় খুব উল্লাস করে মুখ ভরে আব্বু ডাকবে আপনাকে? প্রত্যাশা অনেক বেশি হয়ে গেল, না?’
-‘কেন? বেশি হবে কেন? বাইশ বছর বয়সের যে যুবক সুহাইল ছাব্বিশ বছরের সুন্দরী ঝুমুরকে ভালোবেসেছিল তার পরিচয় না জেনেই। আজও সেই সুহাইল বেয়াল্লিশের বুড়ো হয়েও ছেচল্লিশের ঝুমুরকেই ভালোবাসে। সেদিনও সে স্বপ্ন দেখেছে তাকে নিয়ে, আজও দেখে। বিশ বছর বয়সে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হলে বউ আপনি আমারই হতেন। স্মরণ, কিরণও আমারই সন্তান হত। কিংবা ওদের বদলে অন্য কেউ৷ তাই ওদেরকে আমি মনে করি না পরের সন্তান ওরা৷ আপনার হাজবেন্ড বেঁচে ছিলেন যতকাল, ততকাল কিন্তু আপনাদের ছায়াও মাড়াইনি আমি। তিনি মারা যাবার পর নিজ দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি আমি। যতদিন বেঁচে আছি ততদিনই ওদের ভালো-মন্দের, ওদের মায়ের ভালো-মন্দের খেয়াল রেখে যাব ইন শা আল্লাহ। আপনার গলার জোর আমি মেনে নিচ্ছি আর একটা বছর। স্মরণের চাকরি হলেই তো কিরণকে ঢাকা পাঠিয়ে দেবেন। তখন আপনি কোন অজুহাত দেখিয়ে আমাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন দেখে নেব।’
ট্রে হাতে নিয়ে কিরণ রান্নাঘরের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। সুহাইল আর ঝুমুরের কথার মাঝে এসে তাদের অস্বস্তিতে ফেলতে চায়নি। কথা শেষ হতেই সে খাবারের ট্রে টেবিলে রেখে সুহাইলকে বলল, ‘একটু হলেও খেয়ে যেতে হবে, স্যার। না খেয়ে যেতে দেব না।’
মুচকি হেসে কিরণকে হাতের ইশারায় মুখটা নিচু করতে বললেন সুহাইল৷ কিরণ হেসে মুখ নুয়াতেই তিনি আদরে ওর গাল টেনে বললেন, ‘আমি এমনিতেই খেয়ে যাব, মা। খাওয়ার বাহানায় হলেও বসে থাকব তোমার মায়ের খাওয়া শেষ না হওয়া অবধি। তাকে বলো, সে যেন দুধ খাওয়া শেষে ডিমের তরকারি দিয়ে এক মুঠো হলেও ভাত খায় যেন।’
মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে পড়লের ঝুমুর, অত্যন্ত রাশভারী গলায় কিরণকে বললেন, ‘আমাকে ঘরে নিয়ে চল, বাবু৷ আমি ফ্রেশ হব। আমাকে রেখে তারপর তোর স্যারের পাশে এসে বসিস।’
কিরণ আড়চোখে সুহাইলের দিকে তাকালে সুহাইল চোখের ইশারায় নিয়ে ঘরে যেতে বললেন ঝুমুরকে।
বেশ ক’মাস আগে অন্তর প্রদেশে একটা কুঁড়েঘর তৈরি হয়েছিল। সে ঘরের একজন বসতিও ছিল। নাওফিল! যাকে স্বেচ্ছায় দীধিতি আশ্রয় দিতে চায়নি। ওর সমস্ত নিষেধাজ্ঞা, অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্যকে পরোয়া না করে জোরপূর্বক ঘর বানিয়ে ঠাঁই করে নিলো। কিচ্ছু করতে পারল না দীধিতি৷ ওর মন জমিনটা বেদখল হয়ে গেল কবে আর কীভাবে যেন। আজ কিন্তু কুঁড়েঘরের সে মানুষটি নেই। শূন্যতা অনুভব করছে সেখানে দীধিতি৷ এ শূন্যতা আজ খুব ভোগাচ্ছে ওকে। ইনসোমনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে সে, নিজের যত্ন নিতে ইচ্ছা হয় না, কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলতে মন চায় না। যন্ত্রণা বেড়েছে আরও নিচের ফ্ল্যাটের মানুষটির জন্য। তাকে হঠাৎ দেখলে বুকের বাঁ পাশে কামড়ে ওঠে… চোখের তারায় ভেসে ওঠে চট করেই নাওফিলের মুখটা।
-‘আপনি আমার কাছে পড়তে কমফোর্টেবল না, দিধীতি। আমি নাওফিলের ভাই, শুধু এ কারণেই?’
চমকে বাঁয়ে তাকাল দীধিতি। তার পাশেই কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ানো তাওসিফ। কখন এসেছে লোকটা? আর এসেই না ডেকে এভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে কেন?
-‘এলার্ট না করে এমন পাশে দাঁড়ানো কি ভালো দেখাল?’
তাওসিফ সামনে থেকে নজর ফিরিয়ে ওর দিকে তাকাল ভ্রু কুঁচকে, ‘রাত সাড়ে বারোটায় নিজেই ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। সিঁড়িতে থাকতে আপনাকে দেখে প্রথমে আমিও একটু চমকেছিলাম। সেভাবে আপনাকেও না হয় একটু চমকে দিলাম৷ এত রিয়্যাক্ট করার কী আছে? আমার সাথে আপনার সমস্যাটা কী?’
-‘আপনার চেহারা।’ অবিলম্বেই জানিয়ে দিলো দীধিতি, রুক্ষ স্বরে।
প্রথমেই কথাটার অর্থ উদ্ধার করতে পারল না তাওসিফ৷ সেকেন্ড কয় গড়ালে বুঝতেই সে কী প্রতিক্রিয়া জানাবে সন্দিগ্ধ৷
-‘মানে আপনি আমার মধ্যে নাওফিলকে ইমাজিন করে ফেলছেন, রাইট? চেহারা কাছাকাছি হওয়ায়?’
উত্তর দিলো না দীধিতি। মুখটা ফিরিয়ে রাখল উলটো দিকে। তাওসিফও কী বলবে আর খুঁজে পেল না। তবে উপলব্ধি করল নাওফিলের প্রতি দীধিতির দুর্বলতাটুকু৷ একটুখানি মায়া হল তাতে ওর৷ নাওফিল ওর ছোটো ভাই। যত অন্যায়ই করুক, তবুও ও পারে না নাওফিলকে ঘৃণা করতে। সেদিনের দুর্ঘটনার পরই নাওফিলকে ঢাকা,গাজীপুর ত্যাগ করতে হয়েছে। কেমন আছে এখন ওর ভাইটা কে জানে! ফোনেও কথা হয় না আজ-কাল ওদের৷ কথা বলতে চায় না নাওফিল৷ বয়সটা বাড়লেও এই ছেলেটার বোধ বুদ্ধি নেই বলেই মনে করে তাওসিফ। নয়ত দীধিতির মতো মেয়েকে নিয়ে খামখেয়ালি, অন্যায় আচরণ করতে পারত?
-‘আপনি ওকে খুব বেশিই ভালোবেসে ফেলেছেন, দীধিতি? প্রশ্নটায় কিছু মনে করবেন না প্লিজ। কৌতূহল জাগল এই আরকী!’
-‘দুর্বলতা আর ভালোবাসা কি এক? বলতে পারবেন? আমি এ ব্যাপারটা নিয়ে খুব কনফিউজড। ভালোবাসলে কি পারতাম ওকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে? ঘৃণা করতে পারতাম সেই মুহূর্তে এবং এখনও?’
দ্বিধা নিয়ে তাকাল তাওসিফ ওর চোখে, ‘ঘৃণা হয় ওর জন্য?’
-‘সাংঘাতিক৷ আমার জীবনে আমি এতখানি ঘৃণা কাউকে করিনি।’
-‘বড়ো কাকু বলেন, যাকে ভালোবাসা যায় খুব তার প্রতি অভিমান হতে পারে, রাগ হতে পারে, তার জন্য কষ্ট হতে পারে৷ কিন্তু ঘৃণাটা সহজে হয় না। আমি এসব অনুভূতির ব্যাপারে আনাড়ি৷ তবুও বলতে পারি ভালোবাসার মানুষ পাপ বা অন্যায় করলেও সেই পাপকে ঘৃণা করা যায়। কিন্তু ওই মানুষটিকে না। আপনি তাহলে নাওফিলকে কোনোদিনও ভালোবাসেননি। হয়ত নাওফিলের সৌন্দর্যে, ওর কোনো আচরণে, কথাবার্তা আর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এক সময় মুগ্ধতা থেকে দুর্বলতাও অনুভব করেছিলেন। কিন্তু ভালোবাসার পূর্বেই অঘটন ঘটে গেল।’
মনোযোগী শ্রোতার মতো দীধিতি প্রত্যেকটা কথা শুনল তাওসিফের। কথাগুলোর একটাও মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে না ওর৷ শূন্যতা ঠিকই অনুভব করছে নাওফিলের জন্য। কিন্তু সেই সাথে আফসোসটা বেশি অনুভব হচ্ছে নাওফিলকে বিশ্বাস করে বিশ্রীরকম বোকামিটা করার জন্য। ওকে নিয়ে দিবারাত্রি ভাবনাটা এই তিনমাসে একরকম বিষ পান করার মতো অনুভূতি দিচ্ছে। আর এই অনুভূতিটাই ওর স্বাভাবিক জীবনধারায় বাজেভাবে প্রভাব ফেলছে৷ তবে তাওসিফের কথায় ওর মনের ভারটা হালকা হলো যেন৷ নাওফিলকে নিয়ে নিজের নির্বোধ মনের অনুভূতিকে সে বিশ্লেষণ করতে পারছিল না। সেই বিভ্রান্তি দূর করে দিলো তাওসিফ। সত্যিই তো! ভালোবাসা কি এতই সোজা? নিমিষেই যদি ভালোবাসার জন্ম নিত সকলের হৃদয়ে, তবে এই জাহানে সকল মানুষের বুকে ভালোবাসা ছাড়া ক্রোধ আর বিদ্বেষের জন্ম নিত না।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৫
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর — শিরোনামটা কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার একটি লাইন বিশেষ। শিরোনামটাকে সাধারণ ভাববেন না। উপন্যাসে যে সকল মোড় আসবে তা পড়ার জন্য মনকে প্রস্তুত করে রাখুন। আর ভুল-ভ্রান্তি বুঝে নেবেন প্লিজ৷ এডিট করার সময় পাই না।
