আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি
মানসিক ধকল আর সারাদিনের কান্নাকাটির পর স্বামীর নৈকট্য। তারপর আর চাইলেও চোখ খুলে রাখা সম্ভব হয়নি দীধিতির৷ শ্রান্ত দেহমনে নিজের ঘরে ফেরার চেষ্টাও করতে মন চায়নি। ঘনিষ্ঠতার অন্তিমকালে আর এক দণ্ডও নাওফিলের শরীরে মিশে থাকল না মেয়েটা। হুমকিস্বরে ওকে ‘আর ছোঁবে না আমায়’ বলেই চলে যায় বিছানার একপ্রান্তে। নাওফিলের চেহারায় তখনো দুষ্টু হাসি খেলছিল। জবাবে নীরব হেসে বাথরুমে চলে যায় সে। বেরিয়ে আসার পর দেখে কিং সাইজ বিছানাটির একদম কোনা ঘেঁষে শুয়ে আছে নাজুক হৃদয়ের অভিমানীনি। বোধ হয় ঘুমিয়েও পড়েছে এতক্ষণে৷ ভেজা চুল ভালোভাবে মুছতে মুছতে সেদিকটাতে এসে দাঁড়াল সে। ভাবল, ডেকে তুলে গোসলে পাঠাবে৷ এতে শরীর-মন দুটোই ঝরঝরে লাগত, ঘুমটাও ভালো হত। পরবর্তীতে ঘড়িতে চোখ পড়তেই মত বদলাল৷ আর দু, আড়াই ঘণ্টা পরই ফজরের আজান দেবে৷ তখনই না হয় ডাকা যাবে।
বিছানায় এসে বউয়ের গায়ে পাতলা একটি চাদর টেনে দিয়ে তার পাশ ঘেঁষেই শুলো নাওফিল। কিন্তু ঘুমানোর নিয়ত ওর ফজরের নামাজটা আদায় করার পর। খুব সাবধানে দীধিতির মাথায় হাত রাখল। দেখল, কোনো হুঁশ নেই। সত্যিই বিভোর ঘুমে তলিয়ে গেছে। এবার তাই নিশ্চিন্তে চুলের ফাঁকে আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিলো। খুব যত্নে আর আদরে চুলের মাঝে আঙুল চালাতে চালাতে ঘুমন্ত দীধিতির উদ্দেশ্যে বিড়বিড়িয়ে উঠল সে, ‘মনে পড়ে, স্মরণ? আমাদের বিয়ের পরেরদিনের কথা? তুমি নিজেকে ধর্ষিতা সাজিয়ে ধোঁকা দিতে চেয়েছিলে। তাই তোমাকে বলেছিলাম, প্রতিটি মানুষকেই তার প্রত্যেকটি কাজের ফল ভোগ করতে হবে৷ তোমাকেও করতে হবে৷ আজ সেই ফল তুমি পেলে, দেখেছ? কিন্তু সেদিন কথা দিয়েছিলাম, তোমার কষ্ট অর্ধেক ভাগ করে নেব আমি। স্যরি সোনা, সেই কথা আর রাখতে পারলাম না৷’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে গেল নাওফিল। উদাস চোখে উদ্দেশ্যহীন চেয়ে থেকে মনে মনে বলল, ‘সেদিন যদি জানতাম, চার বছর পর আজকের পরিস্থিতি আমাদের এমন হবে। তাহলে তোমাকে নিয়ে সেদিনই চিরকালের জন্য চলে যেতাম তোমার মায়ের কাছে। আমি তোমাকে মনির ব্যাপারে সবটাই জানাতাম অনেক আগেই। কিন্তু চেয়েছিলাম, স্যামুয়েলই তোমার বাবা সেটার প্রমাণও হাতে নিয়ে তারপর বিশেষ কোনোদিনে তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে। সেই সিদ্ধান্তটা আসলে ভুল ছিল আমার। আর তারপর তো তোমার নিজের অটল জেদ, আর জানতে চাও না তুমি বাবা-মায়ের পরিচয়৷ প্রমাণ পেয়েও তা না দেখেই নষ্ট করে ফেললে।’ পরিশেষে আবারও একবার হতাশাপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
সোনালী রোদে মোড়ানো ঝকঝকে আজকের দিনটা। মৃদুমন্দ বাতাসও ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক৷ তবে রিসোর্টের একদম পেছন দিকটাতে পাগলা হাওয়ার দাপাদাপি। এদিকটা যেমন নির্জন, তেমনই মনোরম। একটা সুন্দর বিলও আছে। বিলের তিনপাশ জুড়ে নারকেল গাছের সমারোহ। কিন্তু অগ্রভাগে শান বাধানো। সঙ্গে বড়ো বড়ো ছটা সোপান।
রিসোর্টটির নাম স্বপ্ননীড়৷ অল্প কয়েক মাস হলো এটি তৈরি হয়েছে গাজীপুরে। গ্রাম্য পরিবেশকে অক্ষুণ্ণ রেখে রিসোর্টের মালিক গড়েছে এটাকে। বিলাসপূর্ণ লাউঞ্জ, কটেজের পাশাপাশি ছোটো ছোটো শৌখিন ধাচের কুঁড়েঘরও আছে এখানে৷ আর ভিআইপিদের জন্য কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থাও দিয়ে থাকে স্বয়ং রিসোর্ট মালিকই। তাই শেখ বাড়ির বড়ো ছেলের বিয়ের রিসেপশন প্রোগ্রাম এখানেই আয়োজিত হচ্ছে। এ শখটা ছিল অবশ্য নাওফিলের। ওর শখকে প্রাধান্য দিয়েই তাওসিফ বাবা-মাকে রাজি করিয়েছে। আমন্ত্রিত সকল বিত্তবান অতিথির আনাগোনা চারপাশে। কিরণ আর তাওসিফ ব্যস্ত এই অতিথির অভ্যর্থনা গ্রহণে৷ মাহতাব শেখ কিছু সময় আগেও ছিলেন এখানে৷ কিন্তু বাড়িতে মুমূর্ষু জান্নাতি বেগম পরিচারিকাদের দায়িত্বে আছেন একা৷ স্ত্রীর টানে তাই তিনি মাত্রই বেরিয়ে পড়লেন বাড়ির উদ্দেশ্যে৷ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অতিথিদের সঙ্গে আপাতত সাক্ষাৎ শেষ। রাত ন’টার মাঝে আবার ফিরবেন তিনি৷ তখন অতিথিদের মাঝে ঘোষণা করা হবে আরও একটি সুসংবাদ৷ সে সম্পর্কে অবশ্য এখন পর্যন্ত কেউ-ই অবগত নয়। এমনকি জাকির শেখ এবং জাহিদ শেখও নয়। সবাইকে চমকে দেওয়ার ইচ্ছা আরকি মাহতাব শেখের।
এখন বিকেল চারটা। ইয়াসিফ মাভিশাকে নিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে অনেকক্ষণই হলো। কিন্তু নাওফিল আর দীধিতির দেখা এখনো কেউ পায়নি৷ কিন্তু তাওসিফের কাছে বার্তা এসেছে, নাওফিল গাজীপুরে ঢুকেছে এক ঘণ্টা আগে। আপাতত সে নিজের বাংলোতে গিয়েছে বউকে নিয়ে৷ সে ঠিক সন্ধ্যার সময় আসবে বলে জানিয়েছে৷
এত জাঁকজমকপূর্ণ করা হয়েছে অনুষ্ঠানটা, যে কিরণের মুগ্ধতায় শেষ হচ্ছে না। বিয়ে ঘটা করে হলে যে আয়োজন করা হত, সেরকম আয়োজনই করা হয়েছে৷ তাই তাওসিফের ইচ্ছা ছিল, কিরণকেও বউবেশে দেখার৷ কিন্তু রিসিপশন প্রোগ্রামে তা কেমন যেন দেখায়। এজন্য কিরণ মোটেও তাওসিফের চাওয়াকে পাত্তা দেয়নি৷ কারণ, মাহতাব শেখের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে সে ভেতরে ভেতরে ইতোমধ্যে আধমরা হয়েছিল। লোকটি চার বছর আগে যে গর্জন করেছিলেন ওদের অন্যায় কাজটি জানার পর, সেদিনটির ছবি এখনও ওর স্মৃতির ঘরে স্বচ্ছ পরিষ্কার। ওর জন্য সোহাইল শেখকেও কম অপমান করেননি সেদিন জাহিদ শেখ। আর ওর বোন মানুষটিকেও সেদিন জান্নাতি বেগমের কাছে অশ্রাব্য গালি-গালাজ শুনতে হয়েছিল৷ যদি না সেদিন ইয়াসিফ আর নাওফিল শক্ত গলায় ওদের হয়ে প্রতিবাদ জানাত, তবে ওকে আরও জঘন্যভাবে অপমান হতে হত। ভাগ্যিস এই দুভাই সেদিন সমস্ত দোষের ভাগ তাওসিফের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিলেন! নয়ত ওই বয়সে অমন লজ্জাজনক কাজের জন্য আজীবন বিষণ্নতায় ভুগতে হত।
নাওফিল দপ্তরের গাড়ি বদলে নিজস্ব গাড়িটা নিয়েছে আজ। কিন্তু ড্রাইভিং করছে দীধিতি। গাড়ির আগে এবং পিছে আরও দুটি গাড়ি আছে নাওফিলের নিরাপত্তার জন্য৷ জাকির শেখের কঠোর আদেশ কি-না! তার কারণেই এই নিরাপত্তার বেষ্টনী থেকে বের হতে পারেনি নাওফিল৷ অথচ সে চাইছিল, বউকে নিয়ে আজ একটু একাকী সময় কাটাবে। কিন্তু বাপটা তা বুঝলে তো! যার জন্য শেষমেশ সরাসরিই বাবাকে মনের উদ্দেশ্যটা বলতে বাধ্যই হয় সে। ফোনের ওপাশে থাকা জাকির সাহেব তখন অস্বস্তিতে কয়েক পল চুপ করে থাকেন। তারপর স্বভাবজাত গুরুগম্ভীর গলায় বলেন, ‘ওকে। সুযোগ দেওয়া হলো। তবে সেটা বাংলো থেকে রিসোর্ট আসার সময়টুকু অবধিই৷ অর্থাৎ গাড়িতেই সময় কাটাও।’ তা শোনার পর নাওফিলও তখন কয়েক পলের জন্য মুক হয়ে যায়৷ একটা মানুষ ভালোবাসার মানুষের ধোঁকা খেয়ে এত বাড়াবাড়ি পর্যায়ের নীরস হয়ে যেতে পারে, তা নিজের চাচা কাম বাবাকে দেখেই জানল সে৷ কথাটা যদি জাকির সাহেবের বদলে তাওসিফ বা ইয়াসিফ বলত শুধু৷ তবে তাদের মুহূর্তেই সবচেয়ে নিম্নমানের গুটিকয়েক গালি শুনিয়ে দিতে কার্পণ্য করত না।
-‘গাড়ি এখন কোনদিকে নেবো? বামে না ডানে?’ স্বপ্ননীড়ের পথ চেনা নেই দীধিতির৷ নাওফিলকে জিজ্ঞেস করে দৃষ্টি সম্মুখে রেখেই অপেক্ষায় রইল জবাবের।
সিটে মাথা এলিয়ে এত সময় নাওফিল তার দিকেই চেয়ে ছিল। চোখে-মুখে করুণ এক বিষণ্নতা ওর। কারণ, দিনের আলো ফুটতেই দুজনের মাঝে সেই পূর্বেকার দূরত্বই৷ ফজরের পর দীধিতিকে আর ধরে রাখতে পারেনি সে নিজের কাছে৷ জোরজবরি করলে রাখা সম্ভব হত। কিন্তু সব সময় অমন জবরদস্তি করতে সায় দেয় না ওর মন।
-‘কী হলো? বলছ না কেন? না-কি তুমিও চেনো না?’
-‘বামে মোড় নাও।’ বলে দু সেকেন্ড পর দীধিতিকে জিজ্ঞেস করল নাওফিল, ‘গাড়িতে সানগ্লাস পরে থাকার কী দরকার? তোমার ফোলাচোখ তো গাড়ির মধ্যে কেউ দেখতে পাচ্ছে না।’
-‘ওহহো, খেয়াল ছিল না। থ্যাঙ্ক ইউ।’ চশমাটা খুলে স্টোরেজে রাখল দীধিতি। আর তখনই সুচের কী যেন আঙুলে ফুটল। মৃদু চিৎকারে ‘উহ্’ করে উঠতেই নাওফিল জানতে চাইলো, ‘কী হয়েছে?’
জবাব দিলো না দীধিতি৷ আঙুলের মাথা থেকে একটুখানি রক্ত বেরিয়ে এসেছে দেখে স্টোরেজের ভেতর ভালো করে নজর বুলাল সে। গোটা চারেক হিজাব পিন আবিষ্কার করে সেগুলো হাতের মাঝে এনে রক্তিম চোখে নাওফিলের দিকে তাকাল একবার। নাওফিলও তার হাতের মাঝে একবার লক্ষ করে দীধিতির চাউনিতে আরেকবার লক্ষ করল৷ ওই আগুন লাল চোখের ভাষা পড়তে অসুবিধা হলো না ওর। মুহূর্তেই ঠোঁটে ফিচেল হাসি ঝুলিয়ে বলে উঠল, ‘গত সাড়ে চার বছর আগে আমার ঘরের হাফ বিদেশিনী তার হিজাব পিন খুলে আমার গাড়ির স্টোরেজ, ঘরের ড্রেসিং টেবিল, ক্যাবিনেট, এমনকি বিছানাতেও ছড়িয়ে রাখতে বাদ দিতো না। আপনার আঙুলের মতোই কত শতবার যে আমার গায়ের এখানে ওখানে ক্ষত করেছে এই মহান অস্ত্র, তার আর হিসাব নেই। যতই সেসব গুছিয়ে রাখার জন্য বক্স এনে দিতাম তাকে, তবুও তার সেসব রাখার জায়গা হতই এই স্টোরেজ, বিছানা, ড্রেসিংটেবিল। মনে আছে তা, মিসেস?’
রাগের বদলে এবার চোখে দেখাল দীধিতির অপ্রতিভ অভিব্যক্তি। পিনগুলো আরেকবার দেখে নিলো। যেন মনে করতে চেষ্টা করল, এগুলো সেই চার বছর আগের তার ব্যবহৃত পিনই কি-না৷ পিনের গায়ে মনে হচ্ছে হালকা মরচে পড়েছে। তা খেয়াল হতে মনের সন্দেহ দূর হলো পুরোপুরি। সেগুলো পুনরায় আগের জায়গাতে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল, ‘এ কয় বছরে কি স্টোরেজ ক্লিন করা হতো না?’
-‘অবশ্যই হত। তাই বলে ওগুলোর স্থান পরিবর্তন হত না।’
বুকের বাঁ দিকটায় কি একটু স্পন্দিত হলো দীধিতির? হ্যাঁ, দমিয়ে রাখা বিশেষ অনুভূতিরা একটু লম্ফঝম্প করে উঠেছিল নাওফিলের শেষ জবাবে। কিন্তু সেই সাথে পাহাড়সম অভিমানও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তার। ‘সেগুলোর মালিককেই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলো! সেখানে তার ব্যবহৃত জিনিসের প্রতি এত যত্ন ঠিক কী প্রমাণ করল, বুঝলাম না।’ তাচ্ছিল্যভরা সুরে কথাগুলো বলেই ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিলো সে। মনে মনে আশা করে রইল, এর উত্তরে নাওফিল এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ দর্শাবে। যে কারণগুলো জেনে তার অভিমান হালকা হতে পারে। বস্তুত দীধিতিও এমনটিই চায়৷ কিন্তু নাওফিল এরূপ কথার জবাব কখনই দিতে পারে না তাকে৷ অর্থাৎ শক্ত কোনো জবাব নেই ওর কাছে৷ তার মানে তবে এটাই দাঁড়ায়, সে ইচ্ছাকৃতই তাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল এতগুলো দিন। চোখ-মুখ শক্ত হয়ে উঠল দীধিতির তক্ষুনি। জবাব শোনার আশা রাখল না আর৷ পুরো পথ একদম কাটাল সে নিশ্চুপ থেকে৷ নাওফিলও বিশেষ একটা চেষ্টা করল না তার সঙ্গে ভাব জমানোর। গুমোট এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে রইল গাড়ির মধ্যে।
রাত আটটা। পার্টি জমে উঠেছে বেশ। এ পার্টিতে ইয়াসিফ আর তাওসিফ দাদার চিরাচরিত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মদের আয়োজনও রেখেছে৷ যেহেতু দাদার সঙ্গে ওদের সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই৷ তাই তার আদেশ, নিষেধের পরোয়া করাও ছেড়ে দিয়েছে ওরা। ইতোমধ্যে ওরা দু ভাই দাদার বিশাল সম্পদের তিন ভাগের আড়াইভাগ থেকেই বঞ্চিত। এরপর নতুন করে আর কিছু থেকে বঞ্চিত করার নেই ওদের।
মদের আয়োজন থাকায় প্রতাপশালী আর বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গের আনন্দ একটু দ্বিগুণ হয়েছে৷ বেশ নামী-দামী ব্রান্ডের মদের ব্যবস্থা করেছে ইয়াসিফ। কিরণ এর মাঝে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার ফ্রেশ হয়ে পার্টিতে অংশ নিয়েছে৷ এখন ওর পাশে ঝুমুরসহ ওর মামার পরিবারের লোকেদের ভীড়। তাই তাওসিফ নিজের বন্ধু, কলিগ, পার্টনারদের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত। ইয়াসিফও মাভিশাকে নিয়ে নিজের বন্ধুবান্ধবদের সাথে আমোদে ব্যস্ত। সৌরভের পরিবারও নিমন্ত্রিত। তাই সৌরভকে দেখা গেল বেশ চটকদার ভাবের সঙ্গে৷ তবে সেও একা নয়। এসেছে পর থেকেই এক সুন্দরীর সঙ্গে দেখা যাচ্ছে তাকে।
নাওফিলের আগমন ঘটল মাত্রই। পুরোদস্তুর কালো স্যুট, প্যান্টে মোড়া সে। নেত্রী নতুন করে মন্ত্রী পরিষদ গঠনের পর এই যু্বক প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে প্রায় সকলের মাঝে নানারকম আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিযোগী বড়ো বড়ো ক্ষমতাবান, পুরোনো নেতাদের হটিয়ে ক্ষমতা আদায়, নিজের কার্যদক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা, শিষ্টাচার আর নিজের কমনীয় সৌন্দর্য, সব কিছু দিয়েই সে যেন সবার দৃষ্টিতেও আর আলোচনাতেও নিজেকে কেন্দ্রবিন্দু করে রাখে সর্বদা। মাহতাব শেখ অবসর নিলেও নাতির এই চমৎকার ভাবমূর্তি আর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা শুনতে পান প্রায় প্রতিদিনই। বহু বছর আগে যে মানুষেরা তার ছোটো সন্তান জায়িনের জন্য সুযোগে অপমান, অপদস্থ করতে কার্পণ্য করেনি। সেই ক্ষত আজ মিলিয়ে দিয়েছে তার সেই সন্তানেরই ঔরসজাত। এ যে কত বড়ো গর্বের, কত আনন্দের, তা তিনি বলেও কাউকে বোঝাতে পারবেন না। আর সেই নাতির পাশে কি-না থাকবে ভীনদেশী, ভিন্নধর্মী এক সন্ত্রাসের নাজায়েজ মেয়ে? অবশ্যই না৷ তার এই হীরার টুকরো নাতির পাশে তিনি একদম যোগ্যতাসম্পন্ন মেয়েকে জুড়ে দেবেন। তাতে হয়ত তার নাতি তাকে আজীবনই খারাপ ভেবে যাবে। কষ্টও পাবে৷ কিন্তু একদিন ঠিকই বুঝবে, তার দাদা জ্ঞানত কোনোদিনই তার জন্য মন্দ কিছু বিচার করেননি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাতিজি তানিয়া৷ লন্ডন থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশে এসে বাবার ব্যবসার হাল ধরেছে৷ তার বাবা মাহতাব শেখের সমান না হলেও প্রায় তার মতোই একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। এজন্যই মাহতাব সাহেব পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া প্রস্তাবকে হেলায় ফেলেননি। তানিয়া মেয়েটি বাহ্যিক সৌন্দর্যেও দীধিতির চেয়ে কম হবে না। পশ্চিমা দেশে পড়াশোনা করলেও তানিয়ার চাল-চলনে তা অত বেশি বোঝা যায় না৷ পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, সবেতেই শালীনতা দেখেছেন তিনি। তাই তাকে অপছন্দ করার মতো যুক্তি দেখানোর সুযোগই পাবে না নাওফিল। সব কিছু মিলিয়েই আজ মাহতাব সাহেব দারুণ খুশি৷ তিনি আশা করছেন, তানিয়ার সঙ্গে নাওফিলের ভবিষ্যত সম্পর্কের ঘোষণা দিলে তাওসিফের মতো অন্তত সে আজ তাকে নারাজ করবে না। তার অনুগত নাতি কি-না নাওফিল!
মাটি ছুঁয়ে গেছে দীধিতির পরনের ঝলমলিয়ে ওঠা কালো রঙা বিশাল ঘেরের গাউন৷ লম্বা হাতার বাইরে বেরিয়ে থাকা তার ফরসা, চিকন হাতের আঙুলে ঝকঝক করছে হীরা আর পান্না খচিত আংটি৷ আরেক হাতে প্লাটিনামের ব্রেসলেট। তবে নীল চোখদুটো ছাড়া তার মুখদর্শনের উপায় রাখেনি নাওফিল। আজও তাকে হিজাব এবং মাস্ক পরিয়ে তবেই ছেড়েছে সে৷ আর অলংকারগুলো দীধিতির নিজেরই। যা বিচ্ছেদের পূর্বে স্বামীর থেকে পাওয়া উপহার ছিল তার।
মন্ত্রী পরিষদের যে সকল সম্মাননীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত। তাদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে খোশগল্পে মগ্ন ছিলেন মাহতাব শেখ। তাদের মাঝে মধ্যমণি হয়ে ছিল আপাতত তানিয়া। পরনে তার জাঁকজমকপূর্ণ লেহেঙ্গা আর কোটি টাকার গহনা। দীধিতির পাশে তাকে দাঁড় করালে মানুষ প্রথম অবস্থাতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, কে কার তুলনাতে বেশি রূপবতী। কিন্তু এই সুযোগ তো কেউ পাবেই না। অন্য পুরুষ নাওফিলের বউকে মেপে ঝুকে দেখবে, বিচার করবে। বেঁচে থাকতে এ কোনোদিন হতে দেবে না নাওফিল।
নাওফিলের থেকে মাত্র এক হাত পেছনে দীধিতি। নাওফিল তাকে পাশাপাশি হাঁটার কথা বললেও সে তা কানে তোলেনি। দুজন আগে পিছে থাকলেও রিসোর্ট সাজানো ঝিলিমিলি আলোয় বহু কৌতূহলী আর মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিয়েছে ওরা৷ পেশায় দীধিতি নাওফিলের গানম্যান হলেও এই পার্টিতে সে প্রথম পরিচয় দেবে নিজেকে কিরণের বড়োবোন হিসেবে। তাই নিজেকে সেভাবেই পরিপাটি করেছে সে। সাজসজ্জায় এক চুল খামতি রাখেনি৷ কিন্তু বেচারি সেই সজ্জা কাউকে দেখানোর সুযোগ আর পাবে কি?
পেছন থেকে ওকে কিছুটা উচ্চস্বরেই বলে উঠল সে নাওফিলকে, ‘আমি একটু কিরণ আর আম্মুর সঙ্গে দেখা করে আসছি।’ গান চলছে নরম সুরে। তাই জোরেই বলতে হলো। নাওফিল স্পষ্ট শুনতে পেলেও হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না তাকে। তাই আবারও দীধিতি পুনরাবৃত্তি করলে তখন তাকে সোজাসাপটা নিষেধ গলায় জানিয়ে দিলো নাওফিল, ‘এখন নয়৷ আধা ঘণ্টা পর।’ বলে সে আগের গতিতেই মাহতাব সাহেবের দলটির দিকে এগোতে থাকল। চলতে চলতেই হঠাৎ রগড় গলায় জিজ্ঞেস করে বসল, ‘ভয় পাচ্ছ, স্মরণ? মাহতাব শেখকে দেখে?’
-‘তার ছেলের বিরুদ্ধে এভিডেন্স নিয়ে চার বছর আগে পুলিশের কাছে হাজির হয়েছিলাম। সেদিনই ভয় পাইনি। আর আজ তো আত্মরক্ষা করতে জানি, আত্মবিশ্বাস মজবুত।’ থমথমে চেহারায় দীধিতি কাঠ কাঠ সুরে জবাবটা রাখল।
-‘ফ্যান্টাসটিক!’ মুচকি হাসল নাওফিল।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৫
তবে এও অস্বীকারের উপায় নেই যে, দীধিতির ভয় না হলেও কিছুটা দুশ্চিন্তা হচ্ছে বইকি। মাহতাব সাহেব যে নাতির জীবন থেকে তাকে দূর করার জন্য কত কিছু করলেন, তারপরও আজ সে তার নাতির সঙ্গেই। এ কি সহজে মানতে পারবেন তিনি? যদি রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে স্থান, কাল, পাত্র ভুলে তাকে যা-তা শুনিয়ে দেন? এটাই হলো চিন্তার বিষয়। শারীরিক আঘাত সহনশীলতা হলেও মান-সম্মানে আঘাত সহ্য করা তার পক্ষে বেজায় মুশকিল।
