আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
বড়ো ভাইদের কাছে ছোটো বোন পাখির আদুরে ছানার মতোই। নাওফিল দেখেছে তা ফিহার বেলাতে৷ ইয়াসিফ আর তাওসিফ ফিহার জন্মের পর থেকে এখন অবধি বোনকে সেই ছোট্ট পাখির ছানার মতোই আগলে আগলে রাখতে চায়৷ এইতো বছর চার আগে দীধিতির সঙ্গে কত বড়ো অন্যায় করল ফিহা! যে অন্যায়ের সাজা ভোগ করার কথা ছিল তার জেলে বসে। কিন্তু কঠোর ইয়াসিফও বোনটাকে জেলে পুরতে না পারার ব্যর্থতা‚ ভাই হিসেবে দুর্বলতা আর অক্ষমতা নিয়ে নাওফিলের কাছে হাতজোড় করে মাফ চেয়েছিল। তাওসিফও একইভাবে অপরাধী চেহারায় নাওফিলের সামনে দাঁড়িয়ে বোনের হয়ে সকল সাজার মওকুফ প্রার্থনা করেছিল৷ তারপরও জানত‚ নাওফিল মাফ করতে পারবে না। তাই শেষমেশ বোনকে নাওফিলের শাস্তি থেকে বাঁচাতে দাদার পরামর্শে পাঠিয়ে দেয় বিদেশ বিভূঁইয়ে।
আজ মারিহামের মুখোমুখি নাওফিল৷ মাথা নুইয়ে বসে আছে মারিহাম ওরই সামনে। তাকে ও নীরবে নির্নিমেষ দেখে চলেছে শুধু। বছর চার আগে আলিয়ার সন্ধান করতে এসে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে অন্যায় করেছিল সেও। তারপর পালিয়েও এলো। বোনের কর্মে কষ্ট হয়েছিল‚ রাগ আর অভিমানও হয়েছিল নাওফিলের৷ কিন্তু এখন সামনে পেয়ে সেসব কষ্ট‚ অভিমান‚ সব উধাও। কেমন যে লাগছে ওর! সেই অনুভূতির কোনো বর্ণনা নেই।
মারিহাম পারছে না ভাইয়ের চোখে চোখ রাখতে। এত কাছ থেকে ভাইকে দেখার পর নিজের অপরাধবোধ ভীষণভাবে পীড়া দিচ্ছে। যা গত চার বছরে এতটা উপলব্ধিটা হয়নি। সেভাবে টানটাও অনুভবই করেনি ভাইয়ের প্রতি। কিন্তু এখন সেই ভাইকে এত কাছে পেয়ে‚ ভাইয়ের বেদনার্ত চোখে চেয়ে খুব অনুভব করছে সে ভালোবাসতে না পারলেও ভাইটা ঠিকই তার প্রতি স্নেহ‚ মমতায় আচ্ছন্ন। অথচ ইয়াসিফের সাথে ভাইয়ের মজবুত বন্ধন দেখে নির্বোধের মতো বিচার করে ভাইকেও স্বার্থপর ভেবে চলে এসেছিল। তার সে ভুলটাও ভাঙল এমনভাবে যে‚ কোনোভাবেই ভাইয়ের মুখোমুখি দাঁড়াবার ক্ষমতা তার হচ্ছিল না। কিছুটা ইয়াসিফের বেলাতেও৷
‘এভাবে আর কতক্ষণ তোমরা চুপচাপ বসে থাকবে?’
দীধিতির প্রশ্নে মাথা তুলল মারিহাম৷ চোখাচোখি হলো তখন নাওফিলের সাথে। রক্তিম হয়ে আছে নাওফিলের চোখজোড়া। নোনাজল ভীড় করেছিল সেখানে‚ তার ছাপ স্পষ্ট। মারিহামেরও কান্না পেয়ে গেল। ঠোঁট চেপে দৃষ্টি নত করে কেঁদেই ফেলল। দীধিতি উঠে এসে বসল মারিহামের পাশে। তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল‚ ‘ভাইয়ার অভিমান ভাঙাও। ওর কাছে যাও।’
চোখের পানি মুছে মারিহাম দাঁড়িয়ে পড়ল৷ নাওফিলের ব্যথাহত চাউনি মেঝেতে তখন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু আঙুলে কান্না জড়ো হওয়া চোখদুটো ডলে নিতে নিতে দীধিতিকে বলল‚ ‘তোমার রেস্টের ব্যবস্থা দরকার।’
‘আমি ঠিক আছি একদম’‚ বলে মারিহামকে আবার ইশারা করল নাওফিলের কাছে গিয়ে বসার জন্য।
মন্থর পায়ে হেঁটে এসে মারিহাম বসল নিচে‚ নাওফিলের পায়ের কাছে৷ একবার তাকিয়ে নাওফিল চোখ ফিরিয়ে নিলো। প্রচণ্ড ইচ্ছা করল বোনকে মেঝে থেকে টেনে উঠিয়ে বুকে আগলে নিতে। হয়তো নিতোও—যদি ছোট্ট হতো বোনটা। কিংবা দূরত্বটুকু যদি না থাকত।
জড়তা নিয়ে মারিহাম নাওফিলের ডান হাতটা ধরল। ‘ভাইয়া’‚ কান্নারুদ্ধ গলায় ডেকে উঠল ওকে। মুহূর্তেই নাওফিলের চোখদুটো ছলছল করে উঠল পুনর্বার। তা দেখে মারিহামও আর ধরে রাখল না আবেগ অশ্রুকে। ভাইয়ের জড়িয়ে রাখা হাতটার সঙ্গে কপাল ঠেকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল।
এমনিতেই আবেগটা দীধিতির বেশি৷ ভাই-বোনের মিলন দেখে বেচারির গাল ভিজে একাকার। কিন্তু নাওফিলের কান্না দেখে একটু বেশিই কষ্ট লাগছে ওর। তাই তাকিয়ে থাকতে পারল না মানুষটার দিকে৷ আর উপলব্ধিও করল‚ এই লোকের কান্না চেহারাটা মারাত্মক যন্ত্রণা অনুভূতি দেয়। হয়ত সেটা কেবল ওর জন্যই। কিংবা যে কেউও হয়ে উঠতে পারে আবেগী৷ আসলে যে কোনো পুরুষের কান্নায় বোধ হয় ভীষণ কষ্টদায়ক।
নাওফিল মারিহামকে উঠিয়ে পাশে বসালো। বোনের চোখের পানি মুছে দিয়ে মাথাটা টেনে নিলো কাঁধের ওপর। আহ্লাদ আর স্নেহের সুরে বলে উঠল‚ ‘কী করে পারলে বলো তো? কষ্ট হলো না ভাইয়াকে রেখে চলে আসতে? ভাইয়ার সামনে এসে দাঁড়ানোর ইচ্ছেও হলো না একবারও?’
‘খুব ভুল করেছি‚ খুব খারাপ করেছি৷ মাফ করো আমাকে। আমি তখন যা ডিসিশন নিয়েছি সবটাই রাগের বশে।’ কাঁদতে কাঁদতে সরল স্বীকারোক্তি দিলো মারিহাম।
‘তবুও যে আমাকে আমার বোনকে ফিরিয়ে দিয়েছ তুমি। তার জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ তোমার কাছে।’
কতটা অপেক্ষায় ছিল নাওফিল তার জন্য‚ তা বুঝতে পেরেই অনুতাপ বাড়ল মারিহামের। মৃদুস্বরে বলল‚ ‘আমি তোমার মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। তাই মাভিশার হে়ল্প নিয়েছি। প্লিজ ফরগিভ মি‚ ভাইয়া।’
‘আমি রেগে নেই। কষ্টও নেই আর৷ তুমি আমাকে তোমার কাছে পৌঁছনোর সুযোগ দিয়েছ তো। আমি সব ভুলে গিয়েছি।’ বলতে বলতে বোনের মাথায় স্নেহের হাত রাখল৷
কলিংবেল বেজে উঠল এরপরই৷ দীধিতি ইশারায় ওদেরকে বলল‚ ‘আমি যাচ্ছি।’
‘রাতের খাবার কেনার কী দরকার ছিল, ইয়াসিফ? আমরা রান্না করে নিতে পারতাম তো।’ দরজার মুখে দাঁড়িয়ে পড়ে মাভিশা বলল।
‘প্রয়োজন নেই।’ ম্লান মুখে উত্তর দিলো ইয়াসিফ, ‘আমরা সবাই ক্লান্ত। খেয়েদেয়েই ঘুমাতে হবে সবাইকে।’
ওদের প্রায় বিশ মিনিট লেগেছে খাবার কিনে মারিহামের বাসায় ফিরতে। কলিংবেল চেপে ইয়াসিফ অপেক্ষা করতে থাকল দরজার ওপাশে একজনকেই দেখার জন্য৷ মারিহামের এতক্ষণে চলে আসার কথা নিশ্চয়ই। উদ্বেগ প্রকাশ না করলেও ভেতরে ভেতরে অধৈর্য হয়ে উঠছে সে মারিহামকে স্বচক্ষে দেখার আশায়।
দরজাটা খুলল দীধিতি। ওর চোখ-মুখের অবস্থা আগের মতোই। তা দেখে ইয়াসিফ অনুতপ্ত সুরে বলল‚ ‘স্যরি‚ দেরি হয়ে গেল অনেক। খিদে পেয়েছে খুব?’
‘তা পেয়েছে৷ কিন্তু আপাতত ভুলে গেছি খিদের কথা।’ মুচকি হাসতে হাসতে ওদেরকে ভেতরে আসার জায়গা করে দিলো দীধিতি।
‘ফিরেছে মারিহাম?’ মাভিশা জিজ্ঞেস করল।
‘ফিরেছে।’ বলে ইয়াসিফের দিকে তাকাল দীধিতি।
বুকের বাঁ পাশে মৃদু ধাক্কা অনুভব করল ইয়াসিফ মুহূর্তেই। মাভিশা খাবারের ব্যাগগুলো নিয়ে বসার ঘরের দিকে রওনা হতেই দীধিতি জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফকে‚ ‘মাভিশা আর মারিহামের প্ল্যান ছিল সবটা?’
‘অবশ্যই।’ পায়ের জুতো খুলতে খুলতে বলল ইয়াসিফ‚ ‘নয়ত চার বছর পরই কেন মাভিশা মারিহামের চিন্তায় অস্থির হয়ে ছুটে আসবে? চিন্তা যদি এতই থাকত তবে আরও আগেই আসত। নিশ্চয়ই তোমার ক্রিমিনাল ননদের সাহস ছিল না আমাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবার। তাই এই কাহিনি বানিয়ে মাভিশাকে পাঠিয়েছে সে।’
‘কী নিখুঁত অভিনয় ছিল মাভিশার’‚ বিস্ময় কণ্ঠে বলল দীধিতি। কিন্তু আপনি আর নাওফিল ওদের এই পরিকল্পনা বুঝলেন কী করে?’
‘আমার পুলিশ মন তো এমনিতেই সন্দেহপূর্ণ। মাভিশার আগমন আর ওর কথাবার্তা জাদকে যখন অবগত করলাম৷ জাদ এক চান্সেই ওর ক্রিমিনাল বোনের পরিকল্পনা ধরে ফেলে৷ তারপর আমিও নিশ্চিত হলাম। কিন্তু কিছু বুঝতে দিলাম না মাভিশাকে জাদের কথা মতোই।’
হতাশ গলায় বলে উঠল দীধিতি‚ ‘মানুষের অভিনয় বোঝাটা আমার জন্য বোধ হয় খুবই মুশকিল‚ ভাই। আর আপনাদের কাছে ভাত-মাছের মতো।’
‘মাত্র তো একটা প্রফেশনে ঢুকলে। আস্তেধীরে তুমিও মানুষকে চিনতে শিখে যাবে। আমাদের কাছে ভাত-মাছের মতো হয়েছে বহু মানুষকে দেখার আর তাদের চেনার অভিজ্ঞতা থেকে৷ আমি আমার পেশার কারণে হলেও জাদের পুরো জীবনের গল্পটাই ও যা কিছুর মুখোমুখি হয়েছে‚ যেখানে যেখানে চলাফেরা করেছে বা করছে আর যাদের সাথে ওঠাবসা হয়েছে বা হচ্ছে। তা থেকেই ওর বিচারশক্তি‚ বিচক্ষণতা বা বুদ্ধিবৃত্তি বেশি হওয়া স্বাভাবিক নয়? বরং আমি স্বীকার করতে বাধ্য আমার থেকেও বেশি৷ কারণ‚ জেনেটিক্যালি জায়িন মাহতাব আর আয়মান মেহরিনের কত বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে তোমার বর। তা তো তুমি এখনো দেখার আর জানার সুযোগই পাওনি। আমি প্রার্থনা করি‚ তা যেন কোনোদিন দেখার আর জানার পরিস্থিতি না আসে।’
‘সিরিয়াসলি! আরও জানার বাকি আছে আপনার ভাইকে?’
একটু হাসল ইয়াসিফ‚ ‘এক জীবনে একটা মানুষকে সম্পূর্ণ চিনতে পারা আসলে সম্ভব নয়৷ কারণ‚ মানুষগুলো বারবার বদলায়৷ আর যদি সে মানুষ নিজে থেকে না চায় কেউ তাকে সঠিকভাবে বা পুরোপুরি না জানুক‚ তাহলে তো আরও অসম্ভব।’
কথাগুলো সত্য৷ কিন্তু দীধিতির ভালো লাগল না। নাওফিল যে এখনো ওর কাছে অচেনা‚ অজানা। তা ভাবতেই কঠিন হয়ে উঠল ওর চেহারাটা৷
‘চলো‚ ভেতরে যাই।’
দীধিতি এগোলো ইয়াসিফের পিছু পিছু। বসার ঘরে ওরা পা ফেলতেই মারিহাম সজল চোখদুটো তুলল—দৃষ্টি মিলন ঘটল নিমেষেই ইয়াসিফের সঙ্গে৷ শূন্য সেকেন্ডের মাঝে সে দৃষ্টি ফিরিয়েও নিলো মারিহাম। কিন্তু ইয়াসিফ নিশ্চল‚ দৃঢ় চাউনিতে দেখতে থাকল মারিহামকে৷ পাশে দাঁড়িয়ে দীধিতি তার সেই চাউনি দেখে হাসল৷ মাভিশাও ডাইনিং থেকে ফিরে এসে দেখল মারিহামের প্রতি ইয়াসিফের কঠিন দৃষ্টিজোড়া। মনে মনে সে আল্লাহর কাছে তখনই প্রার্থনা করল মারিহামের জন্য‚ ‘ওর দেহটাকে রক্ষা কোরো‚ গড।’
রাত ১:২০
মাস্টার বেডরুমটা মারিহাম ভাই-়ভাবির জন্য ছেড়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় রুমটা ইয়াসিফের আর তৃতীয় রুমটা মাভিশার দখলে৷ আপাতত মারিহাম বসার ঘরের বড়ো সোফাতে আশ্রয় নিয়েছে। মাভিশা যে ঝগড়া আরম্ভ করেছে বরের সঙ্গে! তাতে মনে হয় না বাকি রাতেও সে ঝগড়া শেষ হবে। রাফি ছেলেটা বেশ ফ্যামিলি পার্সোন। সেখানে মাভিশা প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা মনোভাবের৷ ঘরে বেশিক্ষণ মন টেকা দায় তার৷ কথা ছিল নাওফিলদের ইস্তাম্বুলের ঠিকানা জানিয়েই সে চলে যাবে লন্ডন। কিন্তু সেই কথা রাখছে না সে। তাই নিয়েই ঝামেলা শুরু করেছে রাফি৷ মারিহাম রাফির হয়েই কথা বলেছিল। তাতেই মাভিশা রেগেমেগে ওকে ঘর থেকে বের করে এখন দরজা আটকে তুমুল ঝগড়া করে যাচ্ছে রাফির সঙ্গে।
খোলা চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে মারিহাম উঠে এলো রান্নাঘরে। খিদে পেয়েছে খুব। সান্ধ্যভোজনের সময় ইয়াসিফের মুখোমুখি বসতে হয়েছিল ওকে। কিন্তু খেতে বসে সারাটাক্ষণ কেউ যদি মুখের দিকে অনড় তাকিয়ে থাকে। তবে কি শান্তিমতো খাওয়া যায়? খেতে পারেনি সেও। ইয়াসিফকে নিয়ে ভাবনাও হচ্ছে বেশ। তিনটা মাসের শুরুতে ইয়াসিফের সঙ্গে অন্তরঙ্গতার মুহূর্তে ইয়াসিফ খুব বর্বর আর অসভ্য ছিল। যখন ওকে চাইতো তখন না বললেও সেই ‘না’ মান্য করার প্রয়োজনবোধ করত না সে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মাঝে কোমলতা এলো‚ প্রেমিক বা স্বামীর মতো তাকে রোমান্টিকও হতে দেখল মারিহাম। মাঝেমধ্যে এক সঙ্গে রান্না করা‚ সময় পেলেই ওকে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া‚ হঠাৎ হঠাৎ রাতে কোনোদিন শাড়ি‚ কোনোদিন খোলামেলা রাতের পোশাক এনে দিয়ে তা ওকে পরতে আবদার করা। এমনকি একটা পর্যায়ে কাছে আসার জন্য অনুমতিও চাইতে আরম্ভ করে ইয়াসিফ৷ মারিহাম তখন বেশ বুঝতে পারে ওর জন্য ইয়াসিফের মাঝে প্রেমিক সত্ত্বা জন্ম নিয়েছে৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মারিহাম নিজের হত্যার চিত্র বানিয়ে নাওফিলের চোখে ইয়াসিফকে নিজের খুনী প্রমাণ করে পালিয়ে চলে আসে৷
ওই সময়গুলোতে কত হঠকারী কাজ যে করেছে সে! সেসব না করলে চারটা বছর আগেই ভাইকে কাছে পেত। যন্ত্রণা বুকে পুষে একা একা এখানে কাটাতে হতো না। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মারিহাম। ওভেন থেকে পিৎজাটা বের করে নিয়ে ফ্রিজের সামনে এলো। কোল্ড ড্রিংকসের ক্যানটা হাতে নিতেই অনুভব করল দ্বিতীয় কারও উপস্থিত ঘটেছে। ঝট করে ঘাড় ঘুরাল। শক্ত‚ গম্ভীর মুখ করে ইয়াসিফ ক্যাবিনেটের অপরপাশে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাওজারের পকেটে হাত পুরে। গা খালি তার। আপাদমস্তক তাকে একবার দেখে নিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মারিহাম‚ ‘কিছু চাই?’
‘চাদর।’ রুক্ষস্বরে জানিয়েই ইয়াসিফ চলে গেল।
মনে পড়ল মারিহামের ইয়াসিফের ঘরে গায়ে দেওয়া কোনো চাদর নেই৷ এও মনে পড়ল ওর‚ ঘুমানোর সময় পায়ের ওপর চাদর রাখা ইয়াসিফের অভ্যাস। মাস তিনেকে ইয়াসিফের অনেক কিছুই কাছ থেকে জেনেছিল সে।
খাবারটা রেখেই মাভিশার ঘরের সামনে গিয়ে মাভিশাকে ডাকাডাকি আরম্ভ করল মারিহাম। প্রচণ্ড বিরক্তির সঙ্গে দরজাটা খুলল মাভিশা৷ কানে তার ইয়ারপিস তখনো। কথা শেষ হয়নি রাফির সঙ্গে৷ চুপচাপ ঘরে ঢুকে চাদরটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো মারিহাম৷ ইয়াসিফের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেই কেমন যেন অস্বস্তি জেঁকে ধরল ওকে। আসার পর থেকে ভালো-মন্দ কোনো কথাবার্তা বিনিময় করেনি সে ইয়াসিফের সঙ্গে। যে কারণে আরও বেশি রেগে আছে মনে হয় ইয়াসিফ৷ যাক‚ এই সুযোগে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া যাবে।
দরজাটা খোলায়। কিন্তু ঘর একদম অন্ধকার করে রেখেছে ইয়াসিফ। ভেতরে ঢুকে গলা খাঁকরি দিলো একবার৷ কোনো সাড়াশব্দ এলো না৷ তাই কথা বলল‚ ‘চাদর এনেছি।’
এরপরই বিছানা থেকে ইয়াসিফের নামার আভাস পেলো মারিহাম। হাঁটার শব্দও টের পেলো। ওর দিকেই আসছে। চাদরটা বাড়িয়ে ধরল সে। কিন্তু অকস্মাৎ ওর হাতটা শক্ত করে ধরেই এক টানে নিজের কাছে আনল ইয়াসিফ। তারপর দরজাটাও বন্ধ করে দিলো৷ বোধ হয় এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলই মারিহাম। তাই ছটফট না করে ইয়াসিফের বুকের সাথে মিশে থেকেই মৃদুস্বরে বলল‚ ‘কিছু বলার সুযোগ চাই‚ ইয়াসিফ।’
নিজের নামটা পুরোপুরি উচ্চারণ করতে দিলো না ইয়াসিফ৷ তার আগেই মারিহামকে ধাক্কা দিয়ে ফেলল বিছানায়। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ওর কাছে এসে ওর ওপর চড়াও হলো সে। গলা চেপে ধরল নিষ্ঠুরভাবে।
বাথরুমের দরজা আটকানোর শব্দে ঘুমটা হঠাৎ ছেড়ে গেল নাওফিলের৷ দীধিতিকে এগিয়ে আসতে দেখল বিছানায়৷ বালিশের পাশে রাখা ফোনে সময় দেখে বড়ো এক হাই তুলে চিৎ হয়ে শুলো সে। শুতে শুতে জিজ্ঞেস করল দীধিতি‚ ‘ঘুম হচ্ছে না না-কি?’
‘নতুন বিছানাতে প্রথম রাতে ঘুম হয় না। তুমি জেগেছ কখন? জাগলে আমাকে ডাকোনি কেন?’
‘ডাকব কেন?’ ভ্রু কুঁচকে তাকাল দীধিতি।
ওর দিকে এগিয়ে এলো নাওফিল। পেট জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধের মাঝে মুখ গুঁজে বলল‚ ‘তখন পারমিশন দিলে না। বললে রাতে ঘুম ভাঙলে চান্স পাবো।’
‘তুমি কি এ কারণেই হালকাভাবে ঘুম দিচ্ছিলে? যাতে আমি জাগলেই টের পাও!’
দীধিতির কানের লতি দু ঠোঁটে কিছুক্ষণ চেপে ধরে আবার ওর গ্রীবাতে মুখ ডুবাল নাওফিল। তারপর জবাব দিলো‚ ‘আই অ্যাম আ টেরিবল ইনসোমনিয়াক।’
‘একদম মিথ্যা বলবেন না‚ নাওফিল।’ আচমকা রেগে গেল দীধিতি।
‘মিথ্যা মনে হলো কেন?’ মুখ তুলে বলল নাওফিল‚ ‘সপ্তাহে যে কোনো দুদিন কড়া ডোজের ঘুমের মেডিসিন নিতাম।’
আর কোনো জবাব দিলো না দীধিতি। নাওফিলও কোনো কথা না বাড়িয়ে ওর ওর গা থেকে চাদরটা সরাতেই দীধিতি রূঢ়ভাষী হলো আচমকা‚ ‘দূরে গিয়ে শোও। আমার ইচ্ছে করছে না।’
‘আবার মুড সুয়িং!’ হতাশার সঙ্গে মাথাটা বালিশের মধ্যে গুঁজল নাওফিল৷ বিড়বিড় করল‚ ‘ইয়া আল্লাহ‚ আমার দিকে তুমি কবে সুনজর দেবে? আমার বউকে আমার চার বছরের ইয়ের কষ্টটা বোঝার তওফিক দাও‚ মাবূদ।’
‘গালাগাল করছ আমাকে?’ ক্ষিপ্ত চোখে চেয়ে দীধিতি বলল‚ ‘কী গালাগাল করছ? আমাকে সরাসরি বলার সাহস নেই?’
তড়াক করে নাওফিল উঠে বসল। দীধিতির গায়ের ওপর থেকে চাদরটা একটানে সরিয়ে ওকে চমকে দিয়ে ওর পা দুটো জড়িয়ে ধরল সে বুকের মধ্যে। ব্যাকুলি গলায় বলল‚ ‘আজকে সারারাত আমি এই পা জড়িয়ে ধরেই বসে থাকব৷ যতক্ষণ না আমি পুরোপুরি মাফ পাবো আমার বউয়ের থেকে।’
নীলচে মৃদু আলোয় নাওফিলের নির্বিকার মুখপানে তাকিয়ে দীধিতি বুঝতে চেষ্টা করল‚ যা বলছে নাওফিল তা সত্যিই করবে না-কি। কেন যেন জেদ টের পেলো ও নাওফিলের মাঝে৷ হয়তো সত্যিই তাই করবে। তবুও নরম হলো না দীধিতি৷ বরঞ্চ বিরক্তি প্রকাশ করল‚ ‘আমি ঘুমাব‚ নাওফিল৷ জার্নি করে আমি প্রচণ্ড টায়ার্ড।’
‘আচ্ছা।’ তবুও একইভাবেই বসে থাকল সে দীধিতির পা জড়িয়ে রেখে।
‘আচ্ছা মানে? পা ছাড়ছ না কেন?’
‘বলেছি তো। আজকে এভাবেই বসে থাকব আমি।’
‘কী ফাজলামি‚ হ্যাঁ? আমি ঘুমাব কীভাবে তাহলে?’
কোনো কথা বলল না নাওফিল। দীধিতি ঠিকই ধরেছে‚ সত্যিই জেদ ধরে বসে থাকবে নাওফিল। তাই বলল‚ ‘আমি বসব। পা ছাড়ো।’
পা দুটো ছেড়ে দিলো নাওফিল অবিলম্বেই৷ দীধিতি উঠতেই ওকে টেনে এনে নিজের কোলের মাঝে বসাল সে। ওর কাঁধের ওপর চিবুক ঠেকিয়ে ধীর স্বরে অনুরোধ করল‚ ‘প্লিজ‚ স্মরণ। আমার আগের বউটা হও না! আমি হাঁপিয়ে যাচ্ছি৷ কাছে পেয়েও দূরত্বের যন্ত্রণা মুক্তি দিচ্ছে না।’
‘কিন্তু যাকে আমি এখনো পুরোপুরি জানি না। তার সঙ্গে কীভাবে দূরত্ব ঘুচাই?’ থমথমে গলায় বলল দীধিতি।
‘পুরোপুরি জানো না মানে কী? তুমি আমাকে না জানলে আর কে জানবে?’
‘সত্যিই জানি আমি তোমাকে সম্পূর্ণ?’ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল দীধিতি নাওফিলের দিকে। চোখে চোখ রাখল তার। নাওফিল দীধিতির অনিমেষ চোখদুটোই চেয়ে আবিষ্কার করল অভিমান৷ ওর প্রশ্নটাও তাই এবার গুরুত্ব বহন করল৷
‘কেন জিজ্ঞেস করছ এ কথা? কেন মনে হলো আমাকে তুমি জানো না সম্পূর্ণ?’ ললিত সুর নাওফিলের কণ্ঠে। জিজ্ঞেস করেই ছোট্ট চুমু খেলো দীধিতির পুরু ঠোঁটদুটোই। তারপর বলল‚ ‘আমি নিজেকে তোমার কাছে যতখানি মেলে ধরেছি তা কখনো আব্বুর কাছেও প্রকাশ করিনি।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৮
‘কিন্তু ভাইদের কাছে করেছ।’ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল দীধিতি চকিতেই।
‘এমনটা কেন মনে হচ্ছে তোমার?’ গম্ভীর হলো এবার নাওফিলের কণ্ঠ আর মুখভঙ্গিও।
‘বলল তো ইয়াসিফ ভাই। তোমার ভেতরে এখনো কত কিছু আছে‚ যা আমার অজানা। তবে কোনোদিন যেন তা আমার জানার মতো পরিস্থিতি না আসে৷ তার জন্য ইয়াসিফ ভাই প্রার্থনাও করল।’
কপালে ভাঁজ পড়ল নাওফিলের৷ চোয়ালও কঠিন হয়ে উঠল সহসা। ইয়াসিফের উদ্দেশ্যে মনে মনে চরম নোংরা এক গালি দিয়ে বসল সে।
