Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯১
ইসরাত জাহান দ্যুতি

‘ওমা!’ কপট লজ্জা মুখ করে দ্রুত ফিরে দাঁড়াল দীধিতি।
ঘোরাচ্ছন্ন ইয়াসিফের কানে পৌঁছলই না দীধিতির আওয়াজ। কেবল মারিহাম ভাবীর উপস্থিতি টের পেতেই আরও মরিয়া হলো নিজেকে মুক্ত করার। রাগে‚ ক্ষোভে এবার কামড়টা দিয়েই বসল সে ইয়াসিফের ঠোঁটে। প্রচণ্ড ব্যথায় তখন ‘উহ্’ করে উঠে ইয়াসিফ রেগেমেগে ধাক্কা মারল মারিহামকে৷
এর মাঝে টেরেসে প্রবেশ করল মাভিশা৷ হাতে তার নাশতার ট্রে৷ দীধিতি টেরেসের মুখেই ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। মাভিশাকে এগোতে বারণ করবে তখনই ইয়াসিফ মারিহামকে ধাক্কা মারতে দেখে চেঁচিয়ে উঠল মাভিশা‚ ‘আরে কী করছ‚ ইয়াসিফ?’ বলতে বলতে ছুটে এলো। ‘এটা কেমন আচরণ তোমার? তুমি গায়ে হাত তুলছ মারিহামের?’ বেশ রাগ মাভিশার কণ্ঠে৷
দীধিতি জলদি এসে মাভিশাকে টেনে ধরল‚ আহা! কুল‚ মাভিশা।’ কানে কানে জানাল‚ ‘দে ওয়ার আমার্সড ইন ইচ আদার। আমরা ওদের বিরক্ত করে ফেলেছি।’

‘এমন কিচ্ছু না‚ ভাবী।’ দীধিতির কানে কানে কথা শুনতে পেয়েই মেজাজের সঙ্গে বলে উঠল মারিহাম‚ ‘তোমার ক্যারেক্টারলেস ব্রাদার ইন ল আমাকে জোরজবরি করছিল। হি ওয়াজ অ্যাসলটিং মি।’
‘হোয়াট?’ বিভ্রান্ত মাভিশা মৃদুবেগে চেঁচিয়ে উঠল আবার।
নিজের চরিত্রের গুনগান সহ্য হলো না ইয়াসিফের। পূর্বেকার রাগটা মাথায় চেপে বসল আবার। তেড়ে গেল মারিহামের দিকে‚ ‘আমি ক্যারেক্টারলেস?’
হতবাক দীধিতি ইয়াসিফকে ঠেকাতে দৌড়ে এসে দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ল‚ ‘ভাইয়া! কী করছেন আপনি?’
‘আমার লাইফটাকে হেল করে দেওয়া তোমার ক্রিমিনাল সিস্টার ইন ল’র ক্যারেক্টারও জানো!’ রক্তচক্ষু মারিহামের দিকে ছুঁড়ে রাগের মাথায় বলে ফেলল ইয়াসিফ‚ ‘ও জাদের বোন। সেটা আপন বোন নাকি সৎ তা আমি ভাবিনি৷ কেবল ও জাদের বোন বলেই যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এই ক্রিমিনাল আমাকে সিডিউস করে যেত। আমি শালা অ্যাসহোল ওর ট্র্যাপে পা দিয়ে ওর কাছে ধরা দিই৷ তারপর থেকে ও আমার সমস্ত ইমোশন কন্ট্রোল করতে শুরু করে৷ জানি না আমিও কোন মোহঘোরে হারালাম। যা কোনোদিন কোনো মেয়ের কাছে গিয়ে হয়নি। আমার এই উইকনেসেরই সুযোগ নিয়ে আমার সঙ্গে ধোঁকাবাজি করল ও। আর এখন আমি ক্যারেক্টারলেস হয়ে গেছি!’

‘সিডিউস’ শব্দটা খুব কানে বাজল মারিহামের৷ না‚ ইয়াসিফকে তো সে কখনোই প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেনি। বরং ইয়াসিফের ব্যাপারে সবকিছু জানার পর মনকে শক্তভাবে ধরে রাখত যেন ইয়াসিফ কখনো অন্য মেয়েদের মতো ওর মনকে কব্জা করতে না পারে। কিন্তু শেষমেশ পারল আর কই? এ কথা সত্য যে‚ ইয়াসিফ ঠিকই দূরত্বটা বজায় রাখতে পারত। কিন্তু পারেনি সে-ই। যেসব মেয়েরা ইয়াসিফের প্রতি আগ্রহী ছিল তাদের মতো সেও নিজের অজান্তেই ঝুঁকে পড়েছিল এই সুপুরুষের প্রতি। বহুবার নিজেকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও যখন পারেনি তখন নিজের মনের ওপর জোরপূর্বক শাসন বারণ চালিয়ে মনটাকে অত্যাচার করা বন্ধ করে দিলো। নিজেকে ছেড়ে দিলো ভাগ্যের ওপর৷ সামনে কী হবে তা নিয়ে আর চিন্তা করল না৷ তিনটা মাস ইয়াসিফের সঙ্গে হোটেলের ওই সুইটে কখনো ভীষণ বিশ্বস্ত বন্ধু‚ কখনোবা নবদম্পতিদের মতো কাটানো সময়গুলো ওর জীবন নিয়ে পরিকল্পনা বদলে দিয়েছিল‚ ওর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিয়েছিল৷ কখনো অন্যসব মেয়েদের মতো প্রেমিক বা স্বামী নিয়ে সুখস্বপ্ন না গড়া মানুষটা সে স্বপ্ন দেখতেও শুরু করেছিল ইয়াসিফকে নিয়ে। কিন্তু ওই যে ভাগ্যের ওপর সবটা ছেড়ে দিয়েছিল সে! তাই তো ভাগ্য ওকে অনেক বড়ো চমক দিলো। আলিয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সু্বিচার না পাওয়ায় সত্যিই ক্রিমিনালের মতো অন্যায় অবিচার করে ফেলল ইয়াসিফের সঙ্গে৷ সে খুব দুর্বল ব্যক্তিত্বের মেয়ে বলেও প্রমাণ পেলো তারপর। এই চার বছরে ইয়াসিফ‚ নাওফিল‚ কারও মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়িয়ে অন্যায়টা স্বীকার করার সৎসাহসের অভাবে ভুগেছে বলেই এতগুলো দিন লুকিয়ে রেখেছিল নিজেকে।

চুপ করে থাকল তাই মারিহাম। ইয়াসিফের করা রাগ‚ অপমান‚ প্রতিশোধ‚ সব জায়েজ। এখানে ওর কোনো স্বীকারোক্তি আর খাটবে না হয়ত।
মাভিশা আশা করেছিল মারিহাম এ কথাগুলোর জবাব দেবে৷ ইয়াসিফকে নিয়ে মারিহাম কী অনুভব করে তা সে জানে। কিন্তু হতাশ হলো ওকে চুপ থাকতে দেখে৷ যে কারণে সে-ই বলে উঠল‚ ‘ইয়াসিফ‚ সেদিনের সিচুয়েশনই মারিহামকে বাধ্য করেছিল তোমার সঙ্গে ধোঁকাবাজি করার৷ কারণটা তুমিও জানো৷ কিন্তু তার জন্য ও রিগ্রেট ফিল করেছে এতগুলো দিন৷ তোমাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস ওর হয়নি বলেই এতদিন লুকিয়ে থেকেছে।’
‘টেরোরিস্ট জাইমার সঙ্গে সামিল হতে ভয় লাগেনি যার। তার আমার সামনে এসে দাঁড়াতে ভয় লেগেছিল? হোয়াট আ সিলি জোক‚ গার্ল!’ তিরস্কারপূর্ণ হাসল ইয়াসিফ।
‘এরও তো কারণ আছে‚ ইয়াসিফ।’ বলল মাভিশা মৃদুস্বরে।
মেজাজে আর লাগাম দিতে পারল না ইয়াসিফ। সামনের চেয়ারটাতে লাথি কষে চেঁচিয়ে উঠল‚ ‘যত বড়ো কারণই থাকুক আমি ওকে কোনোদিন মাফ করব না৷ চার চারটা বছর কেটেছে ঠিকই৷ কিন্তু আমার জীবনটা থমকে আছে হোটেলের ওই সুইটেই৷ ও আটকে দিয়ে গেছে আমার সব সুখ‚ আনন্দ। আমি বের হতে পারিনি সেখান থেকে‚ মাভিশা। কিন্তু ও ঠিকই মৌজ‚ মস্তি‚ ফূর্তিবাজিতে মজে থেকেছে। ও কী করে তাহলে রিগ্রেটফুল হলো‚ ভাই?’

‘ভাইয়া‚ প্লিজ শান্ত হন।’ মিনতি স্বরে বলল দীধিতি‚ ‘আপনাকে এমন কন্ট্রোললেস মানতে পারছি না আমি। আপনি জানেন এখনের সিচুয়েশন কী। আমরা কিছু অজানা বিষয়ে জানতে চলেছি। যা হয় আমাদের খুশি করবে কিংবা কষ্ট দেবে৷ আপনি এখানে আমাদের সবার বড়ো। সামনে কী হয় না হয় সবটা আপনাকেই সামলাতে হবে৷ প্লিজ আপনি মাথা গরম হয়ে উলটোপালটা কোনো ডিসিশন নিয়েন না।’
হাতের শক্ত মুঠি খুলে ইয়াসিফ বড়ো এক শ্বাস ফেলল। কঠিন চাউনি তুলে মারিহামের নত মুখপানে তাকিয়ে রইল নীরবে কয়েকপল। বলল দীধিতিকে‚ ‘ওকে বলো‚ আমি যা যা জিজ্ঞেস করব তার পাই টু পাই আন্সার যেন করে।’ চেয়ারটা টেনে তারপর বসে পড়ল ইয়াসিফ।
মারিহামকে কিছু বলতে হলো না। ইয়াসিফের মুখোমুখিই বসল সে। মাভিশা আর দীধিতি নাশতার ট্রে সরিয়ে বসল তারাও।
‘জাইমাকে আমি নই‚ আমাকে জাইমা খুঁজে নিয়েছিল৷’ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জবান খুলল আচমকা মারিহাম নিজেই‚ ‘বাংলাদেশ যাওয়ার আগেই আলিয়া মেহজাবিনের ঠিকানা খুঁজে বের করেছিল সে। আমি তার সঙ্গে সামিল হয়েছিলাম শুধু আলিয়া মেহজাবিনকে খোঁজার জন্য। আমি কোনো টেরোরিস্ট নই।’

‘আমি তা বিশ্বাস করি‚ মারিহাম।’ দীধিতি ওর হাতটা ধরে বলল‚ ‘তুমি ছিলে বলেই সেদিন মলে আমি আর কিরণ বিপদে পড়িনি।’
কিন্তু ইয়াসিফের তীক্ষ্ণ কটূক্তি থামল না‚ ‘সেই তার মধ্যেই যে ঠান্ডা মাথার ক্রিমিনালের বসবাস তাও বিশ্বাস করি।’
এমন মন্তব্যের পরও মারিহাম নির্বিকার। বিষণ্ণ দৃষ্টিজোড়া তুলে তাকালও না। ইয়াসিফ বলে উঠল এবার‚ ‘আর এই আলিয়া মেহজাবিন আলিয়া মেহজাবিন মামলা কী? মম বলে যার জন্য রাতদিন জিকির করত। যার জন্য এত বড়ো দুঃসাহস দেখাল আমাকে নিজের হত্যাকারী বানিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করে৷ তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নাম ধরে ডাকার কারণ কী?’
‘সেটাই তো জানছে নাওফিল ভাই।’ জবাব দিলো হঠাৎ মাভিশা। ‘যে কষ্ট একা বইছিল এতদিন মারিহাম। সেটার মুখোমুখিই তোমরা আজ হচ্ছ‚ ইয়াসিফ।’
‘সেটা কী?’ কপাল কুঁচকাল ইয়াসিফ‚ ‘হেঁয়ালি না করে কাইন্ডলি ক্লিয়ার করে বলো‚ মাভিশা।’
মাভিশা মারিহামের দিকে তাকাল‚ ‘ক্লিয়ার তুই কর‚ মারিহাম।’
ম্লান কণ্ঠে উত্তর দিলো মারিহাম‚ ‘আমি বলার থেকে ডায়ারি পড়ে নেবে ওরা।’
‘আমি এক্ষুনি জানতে চাই।’ নিমেষেই ইয়াসিফের আদেশ গলা চড়ে উঠল।
টি-টেবিল থেকে নীরবে পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে চুমুক বসাল মারিহাম। প্রলম্বিত এক শ্বাস ছেড়ে সে ইয়াসিফের দিকে ফিরে বসল। তার চোখে চোখ রেখে গম্ভীরস্বরে বলল‚ আমি হয়ত আলিয়া মেহজাবিন আর আমার আব্বুর নাজায়েজ মেয়ে তোমার তো এটাই সন্দেহ ছিল‚ তাই না?’
‘ছিল।’ থমথমে মুখে উত্তর দিলো ইয়াসিফ‚ ‘কিন্তু আলিয়া মেহজাবিন যে ইনফারটাইল ছিল সেটা পরে জেনেছিলাম।’

জবাবটা শুনে মারিহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলল আরেকবার। হঠাৎ বিষণ্ণ হাসি ফুটিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল সে‚ ‘ভাইয়াকে হারিয়ে আমার ড্রাগ অ্যাডিকটেড আম্মু যখন উন্মাদ প্রায় এবং তার মাঝে ঠিকঠাক ড্রাগসও নিতে পারছিল না৷ যার ফলে এত বেশি ভায়োলেন্ট হয়ে গিয়েছিল যে আব্বুকে অসংখ্যবার খুন করার সর্বোচ্চ চেষ্টাও করেছিল সে৷ তারপর আব্বু তার কাছের বন্ধুগুলোর পরামর্শে দ্বিতীয়বার বাচ্চা নেওয়ার ডিসিশন নেয়। আবারও ছেলের খুব আশা করেছিল আব্বু। যাতে এক ছেলেকে হারানোর কষ্ট‚ রাগ দ্বিতীয় ছেলের মাধ্যমে ভুলতে পারে আম্মু। প্রেগন্যান্সির সময়টাতে আব্বু যতটা পারত আম্মুর খেয়াল রাখা‚ তাকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু যে বিপদ ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছিল তা থেকেও তো মুক্তি পাওয়ার দরকার। সেই কাজেই আব্বু ছোটাছুটি করতে ব্যস্ত যখন নানান জায়গাতে‚ নানান মানুষের শরণাপন্ন হতে। আম্মুর মেনটাল কন্ডিশন তখন দিনকেদিন আরও খারাপের দিকে যেতে থাকে৷ হঠাৎ করে ড্রাগস নেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শারীরিক‚ মানসিক‚ উভয় সমস্যাতেই আম্মু যে বিকৃত মস্তিষ্কের হয়ে যাচ্ছিল। তা আব্বু টের পেয়েছিল বহু দেরিতে৷ ততদিনে আমার আগমনের সময় হয়ে গেছে৷ আমাকে জন্ম দেওয়ার পর যখন আব্বু দেখল মেয়ে হয়েছে তার৷ খুশি হওয়ার বদলে তার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ পড়েছিল। কেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছিল সে‚ তার কারণ আলিয়া জানতে পেরেছিল আম্মু যখন আমাকে কোলে নেয়…’
‘এক সেকেন্ড।’ দীধিতির কথায় মারিহাম থেমে পড়লে দীধিতি জিজ্ঞেস করল‚ ‘আলিয়া মেহজাবিন কি শুরু থেকেই আব্বু আম্মুর সঙ্গে থাকতেন?’
‘না‚ সে এসেছিল আম্মুর ডেলিভারির সময়ে। তাকে কখনো আব্বু বা আম্মু তাদের সঙ্গে থাকাটা অ্যালাও করেনি।’

‘আচ্ছা। তারপর বলো।’
‘আম্মুও এক্সপেক্ট করেছিল নাওফিল ভাইয়ার মতোই আরেকটা ছেলেকে পাবে সে৷ কিন্তু মেয়ে হওয়ার কারণে আম্মু বিরক্ত হলো‚ রাগ হলো আমার ওপর৷ আর কোলে নিতে চাইলো না আমাকে৷ তা দেখে আব্বু আমাকে কোলে নিয়ে আমাকে মা মা বলে ডাকতে থাকল আর আদর করে বলতে থাকল‚ ‘তোমার জন্য আমরা নতুন করে বাঁচব‚ মা।’ সেসব আম্মু বিরক্তি চোখেই দেখতে থাকল। আলিয়া ছবি তুলেছিল ওই মুহূর্তেরই। আমাদের বেশিরভাগ ছবি তুলত ওই মহিলাই। আব্বু কিন্তু আমার নামটা রাখল আমার মৃত বোনের নামেই। যে মৃত বোনের মৃত্যুর দায়ভার এক সময় আব্বুকেই দিয়েছিল আম্মু। আমার মাঝে তাকেই খুঁজে নিলো আব্বু।’

❝একই চোখ‚ একই মুখ। এমনকি চুলটাও আমি মানের মতোই শর্ট লেয়ারস দিয়েছি। তাহলে ভিন্নতা কোথায় আমার আর ওর মাঝে? জায়িন‚ স্যামুয়েল‚ কেউ-ই আমাকে কেন চাইলো না? কী স্পেশালিটি আছে মানের মধ্যে? বরং আমার চেয়েও ওর লাইফ রিস্কি‚ ওর অপরাধের ঝুলি বড়ো‚ ওর শত্রু অগণিত। তবুও জায়িনের কাছে ও-ই ইম্পর্ট্যান্ট। আচ্ছা‚ মানলাম জায়িনের কৈশোরের প্রেম ও৷ কিন্তু স্যামুয়েলের থেকেও যে রিজেকশন পেলাম আমি৷ কারণ কি তবে এটাই যে‚ আমার জরায়ু নেই? আমি বংশধর আনতে পারব না বলেই তবে ওরা কেউ আমাকে মিসেস হিসেবে যোগ্য মনে করে না।❞
আরও কিছু লেখা ছিল পৃষ্ঠাতে৷ যা কেবল নিজের অক্ষমতা‚ ব্যর্থতা নিয়েই খেদ প্রকাশ করে গেছে আলিয়া। তাই সেখানে আর সময় অপচয় করল না নাওফিল৷ পরবর্তী লেখা পেলো তিন পৃষ্ঠা পর—
❝জায়িন‚ তুমি কি নির্ভর নও এই আলিয়ার ওপর? তুমি কি স্বীকার করতে বাধ্য নও মারিহামের মা আমি এবং আমিই? কেবল আমি আলিয়া মারিহামের মা হওয়ার যোগ্য নই বলো? তুমি কি দেখো না মানের অযোগ্যতা? বুকের দুধটুকু ছাড়া মারিহাম আর কী পায় ওর থেকে? জায়িন‚ তুমি সবই দেখো‚ সবই জানো। তবুও কেন নির্বিকার তুমি? আমি অপেক্ষায় আছি তোমার থেকে মারিহামের মায়ের স্বীকৃতি লাভের।❞
পরবর্তী পৃষ্ঠা—

❝আমি এতটা আনন্দ পাইনি জীবনে। সত্যিই পাইনি। জায়িন আজ দেখেছ তো‚ মারিহামের জীবনটাও নিরাপদ নয় মানের কাছে? জানকে ছাড়া মান তোমার কোনো সন্তানকেই কাছে টানবে না। আজ মারিহামকে ছুঁড়ে ফেলেছে কেবল৷ কাল ওর প্রাণটাও নিয়ে নিতে থামবে না। কারণ‚ মান কেবল দেখতেই মানুষ। কিন্তু ওর ভেতরটা যে হিংস্র পশু৷ আর এখন তো ও পুরোদস্তুর ভয়ঙ্কর মানসিক রোগী৷ ওর হৃদয়ে কেবল তোমার জন্য আর জানের জন্য যে ভালোবাসা আছে সেটাও অসুস্থ ভালোবাসা৷❞
❝আমি আর পারছি না চোখের সামনে এসব সহ্য করতে৷ জায়িন কেন মারিহামের নিরাপদ জীবন নিয়ে ভাবছে না? ওর মতো পুরুষ কী করে এক নিষ্ঠুর‚ হৃদয়হীন খুনী‚ মানসিক রোগীর জন্য ডেডিকেটেড হতে পারে? ডক্টর এত করে বলল মানকে অ্যাসাইলামে না পাঠালে যে-কোনোদিন যে-কেউ ওর হাতে খুন হতে পারে৷ তারপরও জায়িন কীভাবে নিশ্চিন্তে ওকে বুকে নিয়ে ঘুমায়? মারিহামকে কেন দূরে রাখে না?❞
আয়মানের মানসিক‚ শারীরিক দূরাবস্থার কথা আরও কিছু জায়গায় লিখেছে আলিয়া। মারিহামের জন্মের পর স্বাভাবিক হওয়ার পরিবর্তে আরও কতটা অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল‚ তা আলিয়া লিখে রেখেছে পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে। সেসব লেখার মাঝে একটা পৃষ্ঠাতে গিয়ে নাওফিল থমকে পড়ল।
খুব শোচনীয় অবস্থা তখন আয়মানের৷ সে ভুলে যেতে শুরু করেছিল অনেক কিছু৷ এমনকি হঠাৎ হঠাৎ জায়িন‚ মারিহাম তাদেরও চিনতে পারত না৷ কিন্তু নাওফিলের কথা কেন যেন ঠিকই স্মরণে থাকত তার৷ ‘জান! জান‚ এসো ফ্রুটস খাবে! আম্মু এই যে বসে আছি।’ ‘তুমি আজ আব্বুর বুকে শোবে না কিন্তু‚ জান। আমি তাহলে আর কোলে তুলব না তোমাকে।’ ‘জান? তুমি কি তোমার আব্বুকে বেশি চাও না-কি আমাকে? চলো তুমি আমি এক সঙ্গে কোথাও পালিয়ে যাই৷ থাকব না তোমার আব্বুর কাছে। তুমি জানো না‚ তোমার আব্বু ভীষণ রুড। ই ইজ আ ব্যাড বয়‚ জান।’ ‘জান‚ হয়্যার আর ইউ? আমি রেগে যাচ্ছি কিন্তু।’

এলোমেলো বেশে‚ রুগ্ণ শরীরে ঘরবন্দি হয়ে সারাটাক্ষণ এভাবেই সে প্রলাপ বকত‚ চিৎকার করে ডাকতে থাকত নাওফিলকে৷ জায়িন তখন সামনে এলে রেগেমেগে তাকে কামড়াত‚ খামচাত‚ মারধর করে আহতও করত। পরক্ষণেই যখন চিনতে পারত তাকে৷ তখন নিজেই নিজেকে গালাগাল করে জায়িনের ক্ষততে চিকিৎসা দিতো৷ কিংবা অপরাধবোধ‚ অনুশোচনায় নিজেকে আঘাত করতে চাইত। বাইরে ছোটাছুটি করে এসে ঘরে ফিরে বিশ্রামের বদলে আয়মানকে সামলাতে সামলাতে জায়িন মাঝেমধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ত‚ অসহ্য হয়ে উঠত। কিন্তু তবুও আয়মানকে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাটুকু করতে পারত না৷ বরং আলিয়ার কাছে বসে অসহায় সুরে নিজেকে দোষারোপ করত‚ ‘আমার জন্যই ও আজ মৃত্যুর মুখে‚ মাধু৷ আমার সঙ্গে ওকে না জড়ালে নিশ্চয়ই ওর পরিণতি এতটা শোচনীয় হত না! আমি কী করে ফেললাম ওর জীবনটাকে? ধ্বংস করে ছাড়লাম। এভাবে তো ওকে চাইনি পাশে। আমার জীবনটাও এমন হোক তাও আমি চাইনি কখনো৷ নিজেকে আজ-কাল অভিশপ্ত লাগে‚ জানো? মনে পড়ে ভাইয়া‚ আব্বা‚ আম্মার কথাও৷ আমার জন্য কত অপমানিত‚ কত লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে তাদের পৃথিবীর কাছে৷ আমার এই জীবনটার জন্যই আমার জানকেও হারালাম আমি। আমার জানও কত তিক্ততার শিকার হবে এই সমাজে‚ এই দুনিয়ার কাছে৷ আমার জন্যই আমার সন্তান দুটোর জীবন অভিশপ্ত হয়ে উঠবে। আমিই এক অভিশাপ‚ মাধু। সবার জন্যই আমি অভিশাপ। এই পৃথিবীর জন্যও। আমার বিনাশ হওয়া উচিত।’

‘তুমি শুধু নিজেকেই দায়ী করছ‚ জায়িন। তুমি অভিশপ্ত হলে মানও তবে অভিশপ্ত। জান‚ মারিহাম‚ ওদের যদি সত্যিই পৃথিবীর কাছে লাঞ্ছিত হতে হয় তবে তার দায়ভার মানেরও।’ জবাবটা দিয়েছিল আলিয়া এ কথাগুলো বলেই।
কখনো কখনো আয়মানের বাথরুমের চাপ এলে পোশাক নোংরা করে ফেলত সে। কারণ‚ বাথরুমে যাওয়ার জ্ঞানটুকুও হারাত সে মাঝেমধ্যে। জায়িনই তখন পরিস্কার করত তাকে৷ দূরে দাঁড়িয়ে সেসব আলিয়া দেখত আর আয়মানের প্রতি হিংসায় ছটফট করত। আবার পৈশাচিক আনন্দও পেত এই ভেবে যে‚ কতদিনই বা এসব করার ধৈর্য থাকবে জায়িনের? কতদিনই বা আয়মানের প্রতি প্রেম থাকবে? একদিন ঠিকই বিতৃষ্ণা জন্মাবে। সেদিন আয়মানের ঠাঁই হবে অ্যাসাইলাম। আর তার স্থান হবে জায়িনের পাশে৷ এবং তখন মারিহামের মা একমাত্র হবে সে-ই।
মারিহামের জন্মের আগেই খুব দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল ভয়াবহ মাদকাসক্ত আয়মানের। হঠাৎ করে মাদক থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়াটা ছিল প্রথম ভুল জায়িনের৷ যা প্রয়োজন ছিল তা হলো চিকিৎসার মাঝে রেখেই একটু একটু করে মাদকদ্রব্য থেকে আয়মানকে সরিয়ে আনা৷ কিন্তু চিকিৎসার বদলে তা আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর সেই সাথে নাওফিলকে হারিয়ে আয়মান ধীরে ধীরে হয়ে পড়ছিল প্রচণ্ড অসুস্থ। এবং তার মাঝেই আবার মারিহামকে ধারণা করা। জায়িন চাইলেও পারেনি তার দিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখতে৷ এর ফল ভুগতে শুরু করল সে মারিহামের জন্মের পর। আলিয়ার প্রতি নির্ভরশীল হতে বাধ্য হলো সে এ পর্যায়ে৷ কারণ‚ লোকালয় থেকে বহু নির্জনে আশ্রয় নিয়েছিল ওরা। মারিহামের দেখভালের জন্য তখন আলিয়া ছাড়া গতিও ছিল না৷

ইস্তাম্বুল ঢুকলেও জায়িন ছদ্মবেশ ছাড়া চলাচল করতে পারেনি৷ সেখানে আয়মানকে কোথায়‚ কীভাবে চিকিৎসা করাবে তা নিয়ে যখন সে দিশাহারা। সেই মুহূর্তেই আলিয়া প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শেষবারের মতো তাকে স্ত্রীর স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কারণ‚ সেই মুহূর্তে তার প্রস্তাব নাকচ করার কোনো কারণ ছিল না জায়িনের৷ বরং প্রত্যাখ্যান করাটাই বোকামি তার জন্য৷ আয়মানের যে অবস্থা হচ্ছিল দিনদিন তাতে যে-কোনোদিন নিজেকে নিজেই মেরে ফেলতে পারে সে। তাই তো তাকে নজরে নজরে রাখতে হতো জায়িনকে৷ কিন্তু আলিয়াকে বিস্মিত করে‚ আহত করে জায়িন আবারও প্রত্যাখ্যান করেছিল তাকে এই বলে‚ ‘তুমি যদি পৃথিবীর শেষ নারীও হও‚ মাধু। স্টিল মাই আন্সার ইজ ফর ইউ ‘নো’।

অপমান আর সহ্য হলো না আলিয়ার। কখনো নাওফিল বা মারিহামের জন্য খারাপ কিছু ভাবেনি সে৷ নাওফিলকে জাকির শেখের কাছে তুলে দিয়েছিল নাওফিলের সুস্থ‚ স্বাভাবিক জীবনের জন্য৷ ফলাফল যে আয়মানের জন্য খারাপ হবে তা সে জানত। কিন্তু তবুও বোনের জীবনের পরোয়া না করে বোনের সন্তানের পরোয়াই করে এসেছে সে শুরু থেকে৷ এর একমাত্র কারণ এটাই‚ সে কোনোদিন মা হতে পারবে না। মা বলে কোনো বাচ্চা তাকে ডাকবে না৷ তবে আয়মান কেন এই সুখটুকু পাবে? মারিহামকে জন্ম দিয়ে আয়মান আবারও সেই মা ডাক শুনবে‚ তাই বা সহ্য করবে সে কী করে? বোনকে সাহায্য করার অছিলাতে যখন ঠাঁই পেলো জায়িনের ঘরে‚ তখন কেবল লক্ষ্য ছিল তার মারিহামকে আয়মানের থেকে দূরে আনা৷ কিন্তু চোখের সামনে প্রতিদিন আয়মানের জন্য জায়িনের যত্ন‚ ভালোবাসা‚ অভিমান‚ কষ্ট দেখতে দেখতে তার মাঝে পুনরায় জায়িনকে ফিরে পাওয়ার লোভ জন্মে গেল৷ লক্ষ্য পরিবর্তন হলো তখন মারিহাম‚ জায়িন‚ দুজনকেই তার চাই।
বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসার কারণে লেখাগুলো পড়তে অসুবিধা হচ্ছে নাওফিলের৷ আর মাত্র শেষ ক’টা পৃষ্ঠা। অথচ চোখের পানির জন্য পড়তেই পারছে না সে।

চোখ বন্ধ মারিহামের৷ বন্ধ চোখের কোন গড়িয়ে অশ্রুজল পড়ছে ওর৷ তবুও সে বলে চলেছে‚ ‘আলিয়া মেহজাবিন ছিল বোনের জন্য সব সময়ই হিংসাপরায়ণ। বোনের জন্য যতটুকু ভালোবাসা বা টান প্রকাশ করত‚ তার পেছনে হয় থাকত কোনো উদ্দেশ্য৷ অথবা বাধ্যবাধকতা। এই হিংসার মাত্রা তার বেড়েছিল যখন দেখতে পায় আম্মুও আব্বুর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে৷ আর আব্বু তো সব সময়ই আম্মুর ভালো-মন্দ নিয়ে চিন্তিত ছিল‚ কেয়ারফুল ছিল৷ দুজন দুজনের প্রতি ভালোবাসাটা তারা নিজেরা উপলব্ধি করত কি-না তা নিয়ে তারা দুজনই ছিল বিভ্রান্ত।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯০

কিন্তু আলিয়া ঠিকই তাদের এই ভালোবাসা বুঝতে পারত। আম্মুর জীবনে একটা সময় যতখানি শূন্যতা ছিল৷ তা পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল স্বামী‚ সন্তান‚ সংসার পেয়ে৷ অথচ অন্যদিকে আলিয়া থাকল ঠিকই অপরিপূর্ণ। চাইলেও সে পাচ্ছিল না একটা মনের মতো জীবনসঙ্গী‚ একটা সংসার৷ যাকেই চাইলো সেই তাকে রিজেক্ট করল। আর মা হতে না পারার যে আফসোস তা তো ছিলই৷ বরং আম্মুকে দেখে সেই আফসোস দিন দিন বাড়ছিলই তার। শেষবারের মতো যেদিন আবার আব্বুর থেকে রিজেকশন পেলো সেদিনের অপমানই তাকে করে তুলল আম্মুর থেকেও ভয়ঙ্কর হিংস্র।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here