আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
মাথাটা দু’বার ঝাঁকি দিয়ে দীধিতি লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিলো। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল নাওফিলকে, ‘আমার আবেগ-অনুভূতি আপনার থেকে বেশি না আপনারই বেশি? একটু আগে কী বলছিলেন আপনি?’
-‘একটু কাব্যিক স্টাইলে চুমু খাওয়ার কথা বলেছিলাম আর কী। তাতেই তো তোমার গায়ে কাঁটা দাঁড়িয়ে গেছে। আর এরকমটা তো আবেগ-অনুভূতি বেশি যাদের তাদের হয়।’
-‘তাই না কি? এমনভাবে কাছে এসে স্লো ভয়েজে চুমু খাওয়ার কথা বলবেন আর আমি তাতে শকড হবো না? জীবনে কোনোদিন আমার এত কাছে কোনো ছেলে আসেনি আর এমন কথা তো উপন্যাসে পড়া ছাড়া নিজের ক্ষেত্রে শুনিইনি। আর সেটাও যদি হয় আপনার মতো ডেঞ্জারাস হ্যান্ডসাম ম্যান, তো আমার অনুভূতি না থাকলেও তো জেগে উঠবেই। দেখে মনেই হয় না এমন রোম্যান্টিকতাও জানেন আপনি।’
নাওফিল মিটিমিটি হাসল কিছুক্ষণ, ‘দেখে মনে হয় না, না? এটা আসলেও আমার সাথে যায় না। কারণ, আমি তো সত্যিই এমন না। তোমাকে নাকি ভয় ডর দেখিয়ে তোমার প্রেমে পড়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছি। তাই গতকাল ওরা আমাকে টিপস্ দিলো একটু রোম্যান্টিক হিরোদের মতো করে তোমার সাথে কথাবার্তা বলার। তাতে নাকি তুমি ইমপ্রেস হয়ে যাবে। বায় ওয়ে অফ হয়েও গেলে। হয়ে গিয়েছিলে না বলো? অস্বীকার করবে না কিন্তু।’
অপ্রতিভ গলায় বলে উঠল দীধিতি, ‘আরে হবো না? বললামই তো, এমনটা ফার্স্ট টাইম হয়েছে আমার সঙ্গে। তাই বলে পুরোপুরি হইনি, একটু হয়েছিলাম।’
হতাশাগ্রস্তের মতো মাথা এপাশ ওপাশ দোলাতে দোলাতে নাওফিল সোফাতে গিয়ে বসল, ‘এ কারণেই প্রেমের বিয়েগুলো টিকতে চায় না। তুমি কি ধরতে পেরেছিলে শুরুতে, এটা আমার নাটকীয় রূপ? পারোনি, অবশ্য তোমার খুব ভালো লেগেছিল আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু দীধি, এটা আমি নই। আমি এমন রোমাঞ্চকর কথাবার্তা অহরহ বলতে জানি না৷ ইন ফ্যাক্ট জানিই না। এগুলো আমার প্র্যাক্টিসের একটা নমুনা। প্রেমের সময় তাহলে ছেলে মেয়েরা একে অপরের সাথে এমন নাটকীয় কিংবা আবেগজড়িত রোমাঞ্চকর প্রেম আলাপ করে। আর বিয়ের পর যখন দু’জন দু’জনকে আসল ব্যক্তিত্বে আবিষ্কার করে তখন একে অপরকে ব্লেম দেয় “তুমি বদলে গেছ, তুমি আর আগের মতো আমাকে ভালোবাসো না।” আরও অনেকরকম ব্লেম। যেটা দু’জনের বেলাতেই অযৌক্তিক। আসল কথা তো এটাই, প্রেমের সময় কেউ কারও সঠিক রূপটাকে চেনেনি। দু’জনই দু’জনকে তখন শুধু ইমপ্রেস করতে ব্যস্ত৷ আর বিয়ের পর ইমপ্রেস করার প্রয়োজন নেই। তখনই শুরু হয়ে যায় দু’জনকে নিয়ে নানা অভিযোগ, ধীরে ধীরে সম্পর্কের সমাপ্তি। কিন্তু তুমি ভাবো দীধি, যদি ওই দু’জন এক অপরের আসল ব্যক্তিত্বকে শুরু থেকে জানাত, চেনাত তাহলে কি বিয়ের পর তাদের দু’জনের মাঝে কোনো অভিযোগ করার সুযোগ থাকত?
প্রেমের সময় একরকম আর বিয়ের পর আরেকরকম। আমরা নিজেদের পরিবর্তন হওয়াটা যতটা সহজে মেনে নিতে পারি, কাছের মানুষের পরিবর্তন ততটাই কঠিন মেনে নেওয়া আমাদের জন্য। এটা আমাদের সহজাত দোষ। আমার বন্ধুদের কথামতো আমি চাইলেই তোমাকে এইভাবে ইমপ্রেস করে আমার প্রতি তোমার প্রেমের অনুভূতি জাগাতে পারি। কিন্তু আমি তো তোমার সাথে সারাজীবন শুধু প্রেমই করব না। আমার ফোকাস তো আমাদের বিয়ের পরের জীবনটা। যেখানে এমন কোনো সুযোগ না থাকে যার ফলে আমাদের সম্পর্ক কঠিন হয়ে যেতে পারে। আমি আমার সমস্ত খারাপ দিকটা নিজে থেকে তোমার কাছে তুলে ধরব। আর আমার ভালো দিকটা তোমাকে খুঁজে নিতে হবে। এরপরই তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে আমাকে নিয়ে। আমি সে সুযোগ তোমাকে দিয়েছি। অলমোস্ট আমার সব থেকে ভয়ঙ্কর খারাপ দিকটা তোমাকে শুরুতেই দেখিয়ে দিয়েছি।
অন্যান্য বাজে দিকগুলোও দেখতে পাবে। আমি চাই না, আমার আসল আমিকে খোলসে ঢুকিয়ে রেখে বাইরের মিথ্যা আবরণে তোমাকে ফাঁসাতে। তুমি হয়তো বুঝে গেছ, আমার জীবনে কোনো বিশেষ একটি গোপন উদ্দেশ্য আছে। শেষবারের মতো তোমাকে বলছি দীধি, তোমাকে ভালোবাসার থেকেও একজন শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহযোগী হিসেবে বেশি প্রয়োজন আমার। তাই যতটা সম্ভব চেষ্টা কোরো, আমার খারাপ ভালো উভয় মিলিয়ে আমাকে বিচার করার। শুধু খারাপটা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ো না। আমি প্রয়োজনে তোমার আর তোমার পরিবারের একটা সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের অঙ্গীকার দেবো লিখিতভাবে, আমার জন্য তোমার কোনো ক্ষতি হবে না তার নিশ্চয়তাও আমি তোমাকে দেবো। যেভাবে চাও সেভাবেই দেবো। আমার নামের অর্ধেক প্রপার্টি তোমার নামে করে দিয়ে প্রয়োজনে আমার অঙ্গীকার রাখব।’
মনোযোগী শ্রোতার মতোই দীধিতি নাওফিলের প্রতিটা বাক্য শ্রবণ করল। কথাগুলো বলার সময় নাওফিলের একটু আগের দুষ্টু দুষ্টু হাস্যোজ্জ্বল অভিব্যক্তিটা হারিয়ে গেল কোথাও। খুব অসহায়ত্ব ফুটে উঠল ওর চেহারায়৷ কিন্তু নাওফিলের মতো ছেলেরও অসহায়ত্ব থাকতে পারে এ যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না দীধিতির। কী নেই ওর জীবনে? তবুও কোনো এক শূন্যতা অনুভব করছে দীধিতি ওর চোখে।
দৃষ্টি ঝুঁকিয়ে আছে নাওফিল, দীধিতি না চাইতেও তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করল, ‘কী এমন উদ্দেশ্য আপনার জীবনে?’
স্বাভাবিকভাবে জবাব দিলো নাওফিল, ‘জানতে পারবে, যদি সুযোগ পাই তোমাকে আমার জীবনে আনার।’
‘তুমি বরং স্বপ্নে এসো গহীন নীদের
রাতে,
বাস্তবেতে তোমায় আমায় মানায় না
এক সাথে।
তুমি বরং উপমা হও আমার গানের
মাঝে,
তোমায় ভেবে কথার মালা গাঁথব
সকাল সাঁঝে।’
-‘কী আশ্চর্য! ফোন মানুষের পার্সোনাল স্পেস। আপনি সেটাই বিনা অনুমতিতে নিয়ে ঘাটাঘাটি করছেন?’
কবিতাটা ঠিক আবৃত্তি করছিল না নাওফিল। আবৃত্তি করতে জানেই না সে। নাওফিলের অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে এসে আড্ডা দিচ্ছিল দীধিতি ওর বান্ধবীদের সঙ্গে। হঠাৎ তার মাঝে একটু প্রয়োজনে নিচে যায় সে। আর তখনি রুমান, নাওফিল সবুজ আর রাতুল ছাদে এসে পৌঁছে। সবার সাথে কথার ফাঁকে দীধিতির ফোনটা টি-টেবিলের ওপর দেখতে পেয়ে নাওফিল কৌতূহলবশতই হাতে নিয়েছিল। ভেবেছিল লক থাকবে ফোন অবশ্যই। কিন্তু সে ভাবনা ভুল হলো তার। আর এই সুযোগে ফোনের মেসেজবক্স থেকে শুরু করে যাবতীয় কথা বলার মতো জায়গাগুলো দেখতে থাকে। শেষে পৌঁছে যায় নোটপ্যাডে। যেখানে শুরুতেই এই কবিতাটা পেয়ে যায় সে। প্রথম লাইনটা ভালো লেগে যায় বলে পরের লাইনদু’টো জোরে আওয়াজেই পড়তে আরম্ভ করেছিল। এর মাঝেই দীধিতি এসে হাজির। কার্নিশ ঘেঁষে একা একাই দাঁড়িয়ে ছিল নাওফিল। বাকিরা খানিকটা দূরেই।
সেদিন ঐশীদের সঙ্গে দুপুরের আড্ডা শেষ করে ফিরে যাওয়ার পর বারোদিন যাবৎ দীধিতির সঙ্গে যোগাযোগ আর দেখা কোনোটাই ছিল না নাওফিলের। পুরোপুরি যোগাযোগ ছিল না বললে ভুল হবে। দীধিতি ফোনকলে বা অনলাইনে আলাপ জমাতে চেয়েছে নাওফিলের সাথে অনেকবার। কিন্তু নাওফিলের থেকে কোনো আগ্রহ বা সাড়া পায়নি সে। এ অবশ্যই রেগে যাবার মতো। আরে তাকে চিনবার জন্য, জানবার জন্য হলেও তো দু’জনের সঙ্গে দু’জনের কথা বলা জরুরি। সেখানে নাওফিল তাকে এড়িয়ে যায়। অথচ সেই বলে তাকে যেন যাচাই করে সঠিক সিদ্ধান্তটা নেয়। কিন্তু যাচাই করার সুযোগ দিচ্ছে কই ছেলে? এমন এড়িয়ে যাবার মানে কী? রাগ তো চূড়ান্ত পর্যায়ের ছিলই দীধিতির। সেই সাথে নাওফিলের জন্য আকর্ষণ, তাকে জানবার জন্য কৌতূহল, তার প্রতি জেগে ওঠা অবাধ্য উড়নচণ্ডী যতসব আবেগজড়িত প্রেমটাও রীতিমতো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল তাকে। আর তাই রাগ, প্রেম সবটা নিয়েই ঐশীকে জানিয়ে তার বাসায় চলে আসে বিকালে, নাওফিলকে পাওয়া যায় কি না সেই আশায়।
চার বান্ধবী মিলেই বিকালটা আড্ডা দিয়ে কাটিয়েছে ওরা। রুমান ডিউটির ফাঁকে সন্ধ্যায় বাসায় আসে। দীধিতির আকস্মিক আগমনে কিঞ্চিৎ অবাক হওয়ার কথা থাকলেও সে কিন্তু অবাক হয়নি। তার বিশ্বাসটা ছিলই তো এমন, নাওফিল পাগল হবে না দীধিতির জন্য। দীধিতিই বাজেভাবে হারিয়ে যাবে নাওফিলের মধ্যে। নাওফিলকে খবরটা জানাতে খুব বেশি দেরি করেনি সে। বাইরে সবুজ আর রাতুলের সঙ্গে ছিল নাওফিল। দীধিতির আগমনের খবরটা জেনে ওদেরকে নিয়ে দ্রুতই চলে আসে ফ্ল্যাটে। সবুজ আর রাতুল আবার তন্বীকে দেখে শিহাবকে চলে আসতে বলে। তামান্না ঐশীর বাসায় আসার কথা জানিয়েছে আগেই তুষারকে। কিন্তু তুষার ব্যস্ত থাকায় বলেছে, সন্ধ্যার পর অবধি থাকলে হয়তোবা দেখা হতে পারে তাদের। কারণ, নাওফিল অসুস্থ হবার পর আপাতত তুষার নাওফিলের সঙ্গেই থাকে ওর ফ্ল্যাটে।
দীধিতির প্রশ্নটাই যুক্তি থাকলেও খুব বাজে লেগেছে নাওফিলের। উপযুক্ত কী উত্তরই বা দেওয়া যায় এর বিপরীতে? তাই প্রশ্নটা এড়িয়ে যায়, উলটে জিজ্ঞেস করে, ‘কবিতাটা কার লেখা? তোমার?’
-‘কবির নাম তো লেখায় আছে নিচে। রূপক চৌধুরী।’
-‘নিচে অবধি যেতে দিলে কই? কবিতাটা সুন্দর। কিন্তু তুমি তো বোধ হয় এমন কাউকে চাও না, যাকে এ জীবনে পাওয়া কখনোই হবে না।’
-‘আপনি কী করে জানলেন? অবশ্যই থাকতে পারে।’
ছুরির ফলার মতো কথাটা ধারাল আর তীক্ষ্ণ না হলেও নাওফিলকে নিরুদ্বেগও থাকতে দিলো না, ‘এমন কে আছে? কাকে স্বপ্নে পেয়েই সন্তুষ্ট তুমি?’
দীধিতি খেয়াল করল নাওফিলের চাপানো, ধারালো চোয়ালদু’টো শক্ত হয়ে উঠেছে। কণ্ঠেও চোরা অস্থিরতা। তা দেখে স্বীকার্য ভালো লাগা ভেসে উঠল ওর চোখের হাসিতে।
-‘একজন ভীনদেশী। কল্পনাতেই যার অস্তিত্ব আজীবন।’
এমন কথায় নাওফিলের অভিব্যক্তি কেমন হতে পারে তা দেখবার জন্য উৎসুক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল দীধিতি ওর দিকে।
নাওফিল ভ্রু কুঁচকাল। কার্ণিশের সঙ্গে হেলে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ ওভাবেই চেয়ে থাকল দীধিতির দিকে। ফোনটা ওর হাতে তুলে দিয়ে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে জিজ্ঞেস করল হঠাৎ মোলায়েম স্বরে, ‘কেমন আছ, দীধি?’
এবার খুব অভিমান জড়িয়ে ধরল দীধিতিকে। কিন্তু তাদের দু’জনের সম্পর্কে এখন অবধি এমন কোনো শক্ত ভিত জন্মায়নি যার কারণে নাওফিলের প্রতি তার অভিমান করার অধিকার আছে। তবুও হচ্ছে খুব। এই যুবকটি একদমই আপন নয় ওর, হবে কি না ভবিষ্যতে তাও অজানা। এরপরও… অভিমান এরপরও আপন কেউ অনুভব করেই। অথচ অদ্ভুত হলো, এমনটা সে অনুভব করতে চায়নি।
সেদিনের মতোই আজও নাওফিল দ্বিধাহীন, বেহায়া নজরে চেয়ে দেখছে দীধিতিকে। একেকটা সময়ে দীধিতির একেকরকম চেহারার অভিব্যক্তি আবিষ্কার করার ঝোঁক জন্মেছে ওর মধ্যে। কখনো ভীত চেহারা, কখনো আত্মসম্মানে আঘাত লেগে হঠাৎ কঠোর হয়ে যাওয়া, আর সেদিনে আবিষ্কার করা লজ্জরুণ হওয়া মুখটা। এই মুহূর্তে দীধিতির অভিমানে আহ্লাদিত শক্ত মুখটাও আবিষ্কার করে ফেলল সে। বারবার কথা বলতে চেয়েও যখন দীধিতিকে সে এড়িয়ে গেছে, তখন কি সে টের পায়নি মেয়েটার আত্মসম্মানে লাগবে এতে? আর তারপর সে সাংঘাতিক রেগেও যাবে! ঠিকই টের পেয়েছে। কিন্তু সেও যে পরীক্ষা করে নিচ্ছে দীধিতির ধৈর্য।
-‘অবশ্যই ভালো রেখেছেন আল্লাহ পাক। তো আপনার শরীরের কী অবস্থা?’
-‘তুমি দেখতে পাচ্ছ না?’ চকিতে প্রশ্ন ছুঁড়ল নাওফিল।
দীধিতি এসেই লক্ষ করেছে, এক সপ্তাহের জ্বরে পড়ে অনেকটা শুকিয়ে গেছে নাওফিল। সৌন্দর্যের উজ্জ্বলতা কমেনি ঠিকই। কিন্তু তবুও মলিন লাগছে মুখটা। একটু নরম হলো মনটা ওর। ভাইরাস জ্বর থেকে সেড়ে ওঠার পরও শরীরের দুর্বলতা কাটতেও সময় লাগে, মুখে রুচি ফিরে আসতেও বোধ হয় সময় লাগে। যার জন্য স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে এ ক’দিনেই।
-‘খাওয়া-দাওয়া কি ঠিকমতো করছেন?’
-‘হ্যাঁ, ঐশী আর রুমান আসার পর খাওয়ার সমস্যা হচ্ছে না অবশ্য। তবে নিজের রান্নাবান্নার জন্য একজন লোক নিয়োগ দেবো খুব দ্রুতই। এভাবে ওদের ওপর আমার দায়িত্ব চাপিয়ে রাখতে ভালো লাগছে না।’
-‘বাসায় কাউকে জানাননি?’
-‘আমি না জানালেও জেনে যান তারা। দু’দিন গিয়ে ছিলাম বাসায়। বাসায় গিয়েও থাকি না, আবার রুনা মেয়েটাকেও তাড়িয়ে দিয়েছি। তাই দাদী বিয়ে করিয়ে বউ ঘরে এনে দেওয়ার জন্য মেয়ে দেখতে শুরু করেছেন।’
-‘কী?’ চমকে উঠল দীধিতি।
নাওফিল হাসি হাসি মুখটাই স্বাভাবিকতা এনে বলল, ‘আর বোলো না। রাগ করে কথা বলছে না আমার সাথে। মেয়ে দেখতে যেতে চেয়েছিল সেদিন। যাইনি বলে মেরেছেও পর্যন্ত আমাকে।’
-‘আপনি না সেদিন বললেন আপনার মামা-মামি আমার কথা জানিয়েছেন আপনার বাবা-মা’কে?’
-‘হ্যাঁ, জানিয়েছে তো।’
-‘তাহলে আপনার পছন্দ রেখে আবার অন্য মেয়ে দেখতে যেতে চান কেন?’ চাপা রাগটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে দীধিতির।
-‘আমাকেও তো বলেছে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যখন জানল তুমি আমাকে বিয়ে করা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছ, তিন মাস সময় চেয়েছ, তারপরই দাদী রেগে যান খুব। আমাকে নিয়ে তাদের খুব অহংকার আছে কিনা! তাই এমন কথাটা মানতে পারেননি ওনারা।’
-‘আচ্ছা! তো আমি কেন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম সেটা তো আর ওনারা জানেন না নিশ্চয়ই?’
নাওফিল উত্তরে মাথা দুলিয়ে না জানাল শুধু। দীধিতি রাগের মাথায় বলেই ফেলল, ‘হাই সোসাইটির মানুষদের অহংকার তো বেশি থাকবেই। এ জন্যই তো শুরু থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি আপনার থেকে৷ আমাকে পাওয়া আপনার একটা জিদ, বুঝলেন? না করেছি তো, এটা আবার আপনার অহং এ নাড়া দিয়েছে। তাই এভাবে পিছে পড়ে আছেন আমার। আসলে কোনো ভালো টালোবাসা, প্রয়োজনবোধ বলে কিছু নেই।’
-‘আর কী ভাবো বলো তো?’ বিরক্ত গলা নাওফিলের।
-‘আর কী ভাবব? যখন পালিয়ে বেড়িয়েছি তখন চিরুনি তল্লাশী করে খুঁজে বের করেছেন, প্রেমে নাস্তানাবুদ অবস্থা আপনার, বিয়েটা আমাকে না করলে নাকি হবেই না। অথচ কখনো কল করে কথা বলেন? না আমি কল করলে রিসিভ করেন? অনলাইনে দেখতে পেলে মেসেজ করলে মেসেজ আনসিন হয়ে পড়ে থাকে, আবার সিন করলেও রিপ্লাই করেন যেন আমি অপরিচিত কেউ। দেখা করার ইচ্ছা নেই, কথা বলার ইচ্ছা নেই, তো আপনার চেহারাটা দেখে শুধু আপনাকে জাজ করব? পুরোদস্তুর এড়িয়ে চলেন। কী বোঝায় এসবে? আমার প্রতি আপনার এখন আর কোনো ইন্ট্রেস্ট নেই। কারণ যতক্ষণ অধি আমি ইন্ট্রেস্ট দেখাইনি, ততক্ষণ অবধি আমাকে ফল করানোর চেষ্টা করে গেছেন আপনার প্রতি।’
-‘তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ এখন আমার প্রতি তোমার ইন্ট্রেস্ট আছে?’
নাওফিলের কোমল স্বরের কথাটিতে দীধিতি একটু বিব্রত হলেও তবুও অবিচল থাকল, জবাব দিলো, ‘ইন্ট্রেস্ট জাগাতে হয়েছে। না জাগলে কেন আপনাকে জাজ করতে চাইব? অস্বীকার করার মতো নয় এখন আর বিষয়টা৷ জোরপূর্বক আপনি আমার লাইফে বর্তমান দখলদারি করে বসে আছেন। তো ইন্ট্রেস্ট দেখাব না আপনাকে নিয়ে?’
-‘আজ তুমি এসেছই আমার জন্য? পজিটিভলি বলো।’
-‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনার ভালো দিকগুলো তো উদ্ধার করতে হবে আমায়।’
ঠোঁটটা হালকা চেপে ধরে হাসল একটু নাওফিল, ইশারাতে নিজের পাশে এসে দাঁড়ানোর কথা বলল দীধিতিকে। ওকে হাসতে দেখে দীধিতির রাগ হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু খারাপ লাগছে খুব। এই মুহূর্তে নাওফিলের সামনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কারভাবে নিজের অনুভূতিকে আবিষ্কার করে ফেলেছে ও। কম হোক, বেশি হোক, ভালোবেসে ফেলেছে সে নাওফিলকে। এমন একটা রহস্যে ঘেরা, দুর্জ্ঞেয়, অস্বাভাবিক চরিত্রের মানুষকে ভালোবেসে ফেলল সে কী করে? তা ভেবেই নিজের প্রতি নিজের ধিক্ জানাতে ইচ্ছে করছে, অসহায় লাগছে খু্ব নিজেকে। নিজেকে এতবার রুখতে গিয়েও পারল না সে অনুভূতিকে সংযত রাখতে? এ কি হবারই ছিল?
নাওফিল চাইছিল না ওর হাতটা ধরতে৷ কিন্তু ওকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাতটা না ধরে থাকতেও পারল না। এগিয়ে নিয়ে এল দীধিতিকে নিজের পাশে, ও-ও বাধা দিলো না। প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে নাওফিল ওর দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে বলতে শুরু করল, ‘আমি বলেছিলাম আমার অপছন্দ বা খারাপ দিকগুলো আমিই তোমাকে জানাব। যা নিয়ে তুমি এতক্ষণ অভিযোগ করলে এটাও আমার সব থেকে বাজে দিক। সচারচার বলতে গেলে আমি এমনই। বাড়ির মানুষের অভিযোগ, আপন মানুষের প্রতি আমার মায়া, টান, ভালোবাসা কম। মাসের পর মাস আমি যোগাযোগ করি না তারা না করলে। কিন্তু তাদের কাছে থাকলে আবার সেই অভিযোগ করার সুযোগ পায় না। দূরে থাকলে আমার আসলে হয় না এভাবে যোগাযোগ রক্ষা করাটা। পারি না বললে মিথ্যা হবে। আমি চাইলেই পারি সবার মতো প্রতিদিন একবার দু’বার করে বাড়ির মানুষের খবর নিতে। কিন্তু সত্যটা হলো আমার ইচ্ছে হয় না। এটা আমার একটা বাজে স্বভাব। এতে এটা প্রমাণিত হয় না, আমি তাদের ভালোবাসি না। খুব ভালোবাসি তাদের সবাইকে। তুমি চাও, প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে তোমার সাথে ফোনে কথা বলি, নিজেদের মাঝে বোঝাপড়াটা হবে এতে, সহজ হবো একে অপরের সাথে, এগুলো আমি বুঝি। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনটা কানে ধরে কথা বলার মতো ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্যশক্তি কোনোটাই নেই আমার। তার মানে এই না আমি তোমার সাথে সহজ হতে চাই না, নিজেদের মাঝে বোঝাপড়া করতে চাই না, দু’জনের অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই না। তুমি যেটা চাও আমিও সেটাই চাই।আমি তোমার মন রক্ষার্থে কথা বলতে পারতাম। কিন্তু তাতেও বুঝতে পারতে আমি অনাগ্রহের সাথে ফোনে কথা বলছি।’
-‘তাহলে আপনিই বলুন, কীভাবে এই ব্যাপারগুলো আমার আর আপনার মধ্যে হবে?’
-‘এই যে এভাবে, সামনাসামনি। তুমি আর আমি রুমডেট তো আর করছি না যে জড়তা থাকবে। সবাই আছে আমাদের সাথে।’
-‘কিন্তু আপনি তো ডাকেননি আমাকে। আমি নিজে এসেছি বেহায়া হয়ে।’
-‘আমিই যদি বারবার নানারকম এক্সকিউজ নিয়ে তোমার আসার ব্যবস্থা করি, তাহলে আমার প্রতি তোমার যে আগ্রহ জন্মাচ্ছে সেটা বুঝতে কী করে? বেহায়া তো আমিও হয়েছি, তোমার থেকেও বেশি। তুমি কি সমপরিমাণ না হলেও তুচ্ছ পরিমাণ হবে না?’
মাথাটা ঝুঁকিয়ে রইল দীধিতি, চেহারাতে তার অধৈর্য ভাব। নাওফিল চেয়ে আছে তখনো ওর দিকে। দীধিতির ভাবনা বুঝতে পারছে ও। তবু দীধিতি কিছু বলুক ভেবে চুপ রইল। অল্প মুহূর্ত নিশ্চুপই রইল দু’জন।
-‘নাওফিল, আপনার কি মনে হয় না আপনি গম্ভীরতা, দাম্ভিকতা বজায় রেখে চলেন সব সময়? আমি এমন মানুষকে আজীবন এড়িয়ে চলে এসেছি। আমি যেমন আমি তেমন মানুষকেই নিজের কাছাকাছি আসতে দিই।’
-‘আমি গম্ভীর কেন মনে হলো? দীধি, আমি কিন্তু টকেটিভ পার্সোন। কিন্তু তা শুধু আমার বন্ধু আর আপন লোকের কাছে। আমিও খু্ব হাসতে জানি, আনন্দ করতে জানি, আপনজনের কাছে থাকলে তাদেরকে সময় দিতে জানি। হ্যাঁ, আমি আমার গণ্ডিটা আবদ্ধ রেখেছি শুধুই নিজের মানুষের মাঝে। এর বাইরে আমার সঙ্গে কাউকে আমি মিশতে দিই না, মিশতে চাই না। যার অর্থ এই না আমি অমিশুক। বাইরের মানুষের কাছে আমার গম্ভীরতাটা দেখাই নিজেকে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের দেখানোর জন্য। গম্ভীর থাকা, অন্যদের সাথে না মেশাটাকে যদি আমার দাম্ভিকতা প্রকাশ করে তাহলে সেটা হবে আমাকে না বোঝার অক্ষমতা। খারাপ হোক, ভালো হোক, সে বিষয়ে আমি সোজাসাপ্টা কথা বলে দিতে পছন্দ করি। সেটা কাটকাট কথা হলে মানুষকে আঘাত করলেও আমি তা নিয়ে ভাবি না। এই গম্ভীরতা দেখানো, অন্যদের সাথে না মেশা, কাটকাট কথা বলা, এগুলো আমার ব্যক্তিত্ব৷ এটাকে দাম্ভিকতা বলে না, দীধি। ব্যক্তিত্বের ধরন সবার একরকম নয়। আমার এই ব্যক্তিত্বের ধরনকে বাইরের মানুষ দাম্ভিকতা বললেও আমার যায় আসে না। কারণ, আমি নিজেই চাই না যে কেউ আমাকে বুঝে ফেলুক, আমাকে বই পড়ার মতো করে পড়ে ফেলুক। আমি খোলামেলা শুধু আমার আপনদের কাছে।’
কথাগুলো শুনলেও দীধিতি তার অর্থটা সঠিকভাবে বুঝে নিতে পারল না। ব্যথাহত চোখে চেয়ে, ক্ষোভ ঝরা কণ্ঠে নাওফিলকে শুধাল, ‘এ জন্যই আমাকেও এড়িয়ে চলেছেন, তাই না? ইচ্ছা করে নিজেকে জটিল করে রাখছেন আমার কাছে।’
এতগুলো কথার পর এমন একটা কথা শোনার আশা করেনি নাওফিল। হতাশ ভঙ্গিতে চোখদু’টো বুজে আকাশের দিকে মুখটা তুলল। তারপর হঠাৎ দীধিতির দিকে চেয়ে হেসে উঠে বলল, ‘আব্বু একটা কথা বলে আম্মাকে বারো হাত কাপড় নিয়ে। কথাটা মেয়েদেরকে কটাক্ষ করেই বলা। আমি সেটা বলতে চাইছি না। আমি কী বোঝালাম আর তুমি কী বুঝলে! আমাকে নিয়ে এত কিছু ব্যাখ্যা করলাম কেন বলো? কারণ, তুমি আমার নিজের মানুষ হবে ভবিষ্যতে। অন্যরা আমাকে যতটা চেনে জানে, তার থেকেও বেশি চিনতে হবে, জানতে হবে তোমাকে। তার জন্যই তো বলা।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮ (২)
চুপ করে রইল দীধিতি এবার। হঠাৎ করেই অত্যধিক মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল বলেই কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করেনি। কিন্তু এখনো নাওফিলকে ভালোবেসে ফেলার অপরাধে সে অসহায় বোধ করছে। কষ্টটা হচ্ছে এ জন্যই খুব বেশি। বারবার মনে হচ্ছে তার, নাওফিল ভালোবাসতে পারেনি তাকে। সে-ই বোকার মতো বেসে ফেলেছে। এ ক’দিনে নাওফিলের সাথে কথা বলার জন্য, ওকে দেখার জন্য অস্থিরতা লুকিয়ে কি ছিল না তার মাঝে? ছিল তো, ভালোবেসে ফেলেছে বলেই ছটফট করেছে সে। কিন্তু নাওফিলের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই এমনটা হয়নি। এতেই তো প্রমাণ হয়, ভালোবাসাটা তার হয়ে গেলেও নাওফিলেরই হয়নি কেবল। পালিয়ে বেড়ানোর থেকে বড়ো যন্ত্রণা যে একা একা ভালোবেসে যাওয়ার!
