Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৬

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৬

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৬
DRM Shohag

আকাশের কথায় সন্ধ্যা আর আসমানী নওয়ানের উপর বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলল না। ততক্ষণে আকাশ ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছে।
সন্ধ্যা আর আকাশের মা অবাক হয়, সৃজনকে নিয়ে আকাশের এরকম রিয়েকশন দেখে। আপাতত এসব ভাবনা বাদ দিল সন্ধ্যা। ভাবল, আকাশ কেন বলল, সৃজন এই বাড়ি নেই। সৃজন কি সত্যিই এই বাড়ি নেই? সে অনেকক্ষণ থেকে সৃজনকে দেখেনি। ভেবেছিল আসমানী নওয়ানের কাছে আছে। তাকায় আসমানী নওয়ানের পানে। দ্রুত এগিয়ে এসে আসমানী নওয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“আম্মা আমার সৃজন কোথায়? ও তোমার কাছে ছিল না?”
আসমানী নওয়ান ঢোক গিলল। সৃজনকে তার বাড়ির এক কাজের মেয়ে দোকানে নিয়ে গিয়েছে। ছেলেটা জেলি খাওয়ার জন্য ভীষণ জেদ করছিল। আসমানী নওয়ান না পেরে তার বাড়ির এক কাজের মেয়েকে দিয়ে বাইরে পাঠিয়েছে। কিন্তু আকাশের ওমন রিয়েকশন দেখে তার এখন মনে হচ্ছে সৃজনকে অন্যকারো সাথে বাইরে পাঠানো একদম উচিৎ হয়নি।
আসমানী নওয়ানকে চুপ দেখে সন্ধ্যার চোখেমুখে ভীতি জড়ো হয়। ভদ্রমহিলাকে ঝাঁকিয়ে ভীত গলায় বলে,
“আম্মা প্লিজ বলো, আমার সৃজন কোথায়?”
আসমানী নওয়ান ঢোক গিলে বলে,
“ওকে চুমকির সঙ্গে বাইরে পাঠিয়েছি, জেলি কিনতে। এখনো ফেরেনি।”

অন্যসময় হলে হয়ত সন্ধ্যা চিন্তা করত না। কিন্তু এখন সে মোটেও চিন্তামুক্ত হতে পারছে না৷ উল্টে আকাশের রিয়েকশন দেখার পর থেকে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। তার মনে হচ্ছে, আকাশ তার সৃজনকে তার থেকে কেড়ে নিতেই ছুটল। সন্ধ্যা সময় নষ্ট করল না। ড্রয়ার থেকে একটি ওড়না বের করে মাথায় পেঁচিয়ে, কাঁধে সাইড ব্যগ চেপে হতদন্ত হয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। পরনে যে শাড়ি ছিল সেই শাড়িই রইল।
সন্ধ্যার পিছু পিছু আসমানী নওয়ানও বেরিয়ে আসে। তখনই দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে কাজের মেয়ে চুমকি। চুমকিকে দেখে সন্ধ্যা এগিয়ে এসে বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“আমার সৃজন কোথায় চুমকি? তুমি নাকি ওকে নিয়ে গেছিলে, কোথায় ও, বলো?”
চুমকি হাঁপানো কণ্ঠে বলে,

“আপা আমারে মাফ কইরা দেন। এক লোক সৃজনরে আমার থেইকা জোর কইরা নিয়া গেছে।”
সন্ধ্যার চোখেমুখে ভীতি। আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে ধমক দিয়ে বলে,
“জোর করে নিয়ে গেছে মানে? তুই আমার নাতিকে আরেকজনকে দিলি কেন?”
চুমকি ভয়ে প্রায় কেঁদে দেয়। বলে,
“খালাম্মা বিস্বাস করেন, আমি দিতে চাই নাই। লোকটা আমার থেইকা জোর কইরা নিয়া গেল! আমারে ক্ষমা কইরা দেন।”

সন্ধ্যার চোখের কোণ ভিজে উঠল। সে জিজ্ঞেস করতে চাইল, লোকটি আকাশ ছিল কি-না! কিন্তু চুমকি আকাশকে সেভাবে চেনেনা, তাই সঠিক বলতে পারবে না। এজন্য সন্ধ্যা আর কিছু বলল না। তাছাড়া আকাশ যেভাবে গেল, মনে হলো সে সৃজনকে নিতেই বেরিয়ে গেল। অর্থাৎ, সন্ধ্যার ধারণা সকালে আকাশের বলা কথা অনুযায়ী আকাশ সৃজনকে দত্তক দিতে নিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার গলা ফাটিয়ে ইচ্ছে করল। কিন্তু সে বুকে পাথর চেপে অসহায়ত্বে ঘেরা এক মন নিয়ে ছুটল ছেলের খোঁজে। চোখের কোণ ঘেষে দু’ফোঁটা জল গড়ালো। শরীর চলছে না, কিন্তু তার দমলে কি করে হবে? ছেলের বাবার থেকে যে ছেলেকে বাঁচাতে হবে। পৃথিবীতে সেই হয়ত প্রথম ব্যক্তি, যার স্বামী নিজের ছেলেকে অন্যের কাছে দত্তক দিতে এতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্যারেজে আসে। তার স্কুটি স্টার্ট দিতে গেলে দেখল, স্কুটিতে চার্জ নেই। সন্ধ্যার অসহায়ত্ব বাড়লো। কাজের সময় কিছুই পাওয়া যায় না৷ সন্ধ্যা বসে থাকলো না। সে গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে একপ্রকার দৌড়ে বাড়ির মেইন গেইটের দিকে যায়। পিছন পিছন আসমানী নওয়ান ডাকলো। সন্ধ্যা তাকালো না। এলোমেলো পায়ে দৌড়ে গেইটের বাইরে এসে দাঁড়ায়। রাস্তার দু’দিকে ঝাপসা চোখজোড়া ঘোরালে চোখে পড়ে বা দিকে রাস্তার দিকে আকাশের গাড়ি। দূর থেকে দেখেই সন্ধ্যা চিনে ফেলল। সে ধরেই নিল, আকাশের গাড়িতেই তার সৃজন আছে। সন্ধ্যা চিৎকর করে ডাকে,

“সৃজন? আব্বা??”
ততক্ষণে আকাশের গাড়ির দূরত্ব তার থেকে আরও অনেকটা বাড়িয়েছে। সন্ধ্যা কয়েক পা দৌড়ালো। দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। তার সৃজনকে ছাড়া সে কি করে বাঁচবে? কয়েক পা দৌড়ে সন্ধ্যা থেমে যায়। দ্বিতীয়বারের মতো চিৎকার করে ডাকে,
“আব্বা? যেও না আমায় একা করে দিয়ে। আমার সৃজন আব্বা??”
আকাশের গাড়ি দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায়। সন্ধ্যার শরীর নিস্তেজ লাগে। নিভুনিভু চোখে তাকায়। নিজেকে সামলে নিতে চায়। সে এভাবে দুর্বল হয়ে গেলে তার বাচ্চার কি হবে? তার সৃজন যে তার থেকে হারিয়ে যাবে। সন্ধ্যা দু’হাতে ঝাপসা চোখজোড়া মুছে নেয়। ঠিক করে সে আকাশের গাড়ির পিছনে যাবে। ওভার গাড়ি করে যাবে ভাবলো৷ গাড়ি খোঁজার জন্য এপাশ-ওপাশ করতেই সন্ধ্যার একদম পাশ ঘেঁষে একটি কার গাড়ি এসে থামে। সন্ধ্যা দ্রুত মাথা নামিয়ে বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“এটা কি ওভার গাড়ি?”
ড্রাইভিং সিটে বসা ছেলেটি গম্ভীর গলায় বলে, “হুম। উঠে আসুন।”
সন্ধ্যা সময় নষ্ট না করে গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে পড়ে। তাড়াহুড়ায় পিছনের সিটে বসার কথা বেমালুম ভুলে বসল। ডানদিকে ফিরে বলে, “দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিন।”
ততক্ষণে লোকটি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে। গাড়ির স্পিড হাই। দু’মিনিটের মাথায় সন্ধ্যার চোখে পড়ে আকাশের গাড়ি। সন্ধ্যা ডান হাতের আঙুল দ্বারা ইশারা করে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“ওই গাড়িটা ফলো করুন। ওই যে সামনের ওই গাড়িটা।”
সন্ধ্যার পাশে বসা ছেলেটির ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। মুখে একটি রুমাল বাঁধা। মাথায় ক্যাপ। সাদা চোখের মণি দু’টো আকাশের গাড়িতে নিবদ্ধ। সে হঠাৎ-ই গাড়ির স্পিড আগের চেয়েও বাড়ায়। কারণ আকাশও গাড়ির স্পিড বাড়িয়েছে। ছেলেটি গাড়ির স্টিয়ারিং দ্রুতহাতে এদিক-ওদিক ঘোরায়। উদ্দেশ্য আকাশের গাড়ি যেন হারিয়ে না ফেলে। আকাশের গাড়ির স্পিড অধিক, আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি চলছে, ক’সেকেন্ডের ব্যবধানে হঠাৎ-ই সে আকাশের গাড়ি হারিয়ে ফেলে। আকাশের গাড়ি চালানোর দক্ষতার সাথে সে পারলো না। ছেলেটি চরম বিরক্তি নিয়ে গাড়ির ব্রেক কষে। ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে গাড়ির স্টিয়ারিং-এ একটি শক্ত পাঞ্চ মেরে শব্দ করে বলে ওঠে, “ড্যাম ইট।”

হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষায়, পাশে বসা সন্ধ্যা গাড়ির সিল্টবেল্ট না লাগানোয় সামনে ধাক্কা খতে নিলে ড্রাইভিং সিটে বসা ছেলেটি দ্রুত এগিয়ে এসে বা হাতে সন্ধ্যার হাত টেনে ধরে সন্ধ্যাকে প্রটেক্ট করে। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ পেয়ে সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ঝাড়া মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। দ্রুত লোকটির দিকে তাকিয়ে রেগে কিছু বলতে নিয়ে থেমে যায় লোকটিকে একদম তার মুখের সামনে দেখে। সন্ধ্যার চোখের আকার বড় হয়ে যায়। ভীতি ঢোক গিলল সে। লোকটির চোখের মণি দু’টো বিড়ালদের মতো একদম সাদা। যে চোখ দু’টোর দৃষ্টি তার চোখে নিবদ্ধ, সন্ধ্যা বুঝল। সে শক্ত করে কিছু বলতে নেয় তার আগেই অধীর ঠাণ্ডা গলায় উচ্চারণ করে,
“কেমন আছিস প্রাণ?”

সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। সারা শরীরজুড়ে অদ্ভুদ এক অনুভূতি হয়। এই চোখের মণি, সাথে ডাকটি সন্ধ্যার ভীষণ পরিচিত ঠেকল। মেয়েটার চোখের সামনে আবছা কিছু ভেসে ওঠে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আওড়ায়, “প.প.প্রা.ণ….
সন্ধ্যার এক্সপ্রেশনে অধীর চোখে হাসে। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে শক্ত গলায় বলে ওঠে, “কে আপনি?”
কথাটা অধীরের বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। এই নাম ডাকার পরও সন্ধ্যা তাকে চিনতে পারলো না? মুহূর্তেই চোখেমুখে রা’গ হানা দেয়। বা হাতে সন্ধ্যার গাল চেপে অসম্ভব রেগে বলে,
“তুই আমাকে ভুলে গিয়েছিস? আমাকে এভাবে ভুলে যাওয়ার স্পর্ধা কোথায় পেয়েছিস তুই?”
সন্ধ্যা অধীরকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। রাগান্বিত স্বরে বলে, “আরে আজব তো, আপনি আমাকে এভাবে টাচ করছেন কেন? আমি আপনাকে চিনিনা। এখানে ভুলে যাওয়ার কথা কোথা থেকে আসছে?”
ইতোমধ্যে অধীরের চোখ দু’টো লাল হয়ে গিয়েছে। লালিত দৃষ্টিজোড়া সন্ধ্যার পানে নিবদ্ধ রেখে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “আমাকে চিনিস না তুই?”

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। ঝাপসা ঝাপসা কিছু স্মৃতি মনে পড়ছে। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? মরা মানুষ কিভাবে বেঁচে উঠবে? অসম্ভব। তাহলে এই লোকটা পরিচিত মানুষের মতো করে কিভাবে কথা বলছে? চোখদু’টোও একই। সবচেয়ে বড় কথা, এতোগুলো বছর পর তাকেই বা কিভাবে চিনে ফেলবে? সবমিলিয়ে সন্ধ্যার মাথা এলোমেলো লাগে। সন্ধ্যা ঢোক গিলে বলে, “মুখ তো দেখতে পাচ্ছি না। চিনব কিভাবে?”
সন্ধ্যার কথা শুনে রুমালের আড়ালে অধীর ঠোঁট বাঁকায়। সোজা হয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলে,

“তোর স্বামী মেবি তোর বাচ্চাকে দত্তক দিতে গিয়েছে, তাইনা? এইজন্য তোর এতো তাড়া!”
কথাটা বলে অধীর তীব্র আফসোসের ভঙ্গি করল। সন্ধ্যা অবাকের উপর অবাক হয়। এই কথা এই লোকটা কিভাবে জানলো? অধীর আবারো বলে, “শুনেছি, মাফিয়াদের মাথা গরম হয়। বাচ্চাদেরকেও ছেড়ে কথা বলে না তারা। তোর স্বামী যদি রেগে তোর বাচ্চাকেই মেরে দেয়?
এই কথাটা বলে অধীর আগের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি আফসোসের সুর টানলো। সন্ধ্যা লোকটিকে দেখে আর কত অবাক হবে? আকাশ আর তার ছেলের ব্যাপারে এই লোকটা সবকিছু কিভাবে জানে? কথাটা ভাবতে গিয়েও সেভাবে ভাবতে পারলো না। কারণ সৃজনকে নিয়ে বলা অধীরের কথাটা সন্ধ্যার মস্তিষ্কে বাজতে লাগলো। তার সৃজনকে নিয়ে আকাশ কোথায় গিয়েছে? আকাশ তাকে আর সৃজনকে ভুলে গিয়ে, সত্যিই কি সৃজনকে কিছু করে বসবে? সন্ধ্যার চোখেমুখে অজস্র ভীতি। কাঁপছে তার শরীর।
অধীর স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে রাস্তার মোড় ঘোরায়। বাঁকা হেসে বলে,

“তোর স্বামী তোকে ভুলে গিয়ে আবারো তোকে কেন বিয়ে করতে চায়, শুনবি?
এটুকু বলে থামে অধীর। ঠোঁটের কোণে হাসি দীর্ঘ হয়। আবারো বলে,
মাফিয়াদের একটা সিক্রেট বলি তোকে, ওরা শ’ত্রুদের বিয়ে করে চরম লেভেলের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। হাজারহোক, সৌম্য তোর স্বামীর বাবার খু’নি। মাফিয়া কিং এভি তার বাবার খু’নিকে কি এমনি এমনি ছেড়ে দিবে? তোর চৌদ্দগুষ্টিকে জা’হা’ন্না’ম দেখিয়ে ছাড়বে।
লাস্ট কথাটা ভীষণ শক্ত শোনালো। সাথে চোখমুখও শক্ত হয়ে গিয়েছে। নিজেকে সামলালো অধীর। খুব স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির ব্রেক কষে বাদিকে ফিরে বিস্মিত সন্ধ্যার দিকে তাকায়। শীতল দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে রেখে বলে,
তবে তোকে ছাড় দিতে পারে। হাজার হোক,, তুই শ্যামলা গড়নের মেয়ে। মায়াবতী বলে কথা! ছেলেরা তো সর্বপ্রথম মায়াবতী মেয়েতেই আটকায়। ঠিক বললাম তো প্রাণ?”
সন্ধ্যার বোধয় আর অবাক হওয়ার বাকি নেই। সে হয়ত তখন ছোট ছিল, কিন্তু তার স্মৃতি এতোটাও নড়বড়ে ছিল না যে, তার কিছু মনে নেই। বরং তার সব খুব ভালোভাবে মনে আছে। ছোট্ট সন্ধ্যার কানের কাছে এসে একদিন অধীর বলেছিল,

‘তোকে এক দেখায় যেকোনো ছেলে পছন্দ করবে, কেন জানিস প্রাণ? কারণ তোর গায়ের রঙ শ্যামলা। আর শ্যামলা মেয়েরা মায়াবতী হয়। যে ছেলেরা কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসতে চায়, তারা সবার আগে তোর মতো মায়াবতী মেয়েতেই আটকায়। বুঝলি?’
সেদিন সন্ধ্যা বোকা বোকা চোখে চেয়ে শুনেছিল অধীরের কথা। এতোগুলো বছর পর আজও সেইম কথাগুলো শুনে সন্ধ্যার অবাকের মাত্রা ছাড়িয়েছে। এই প্রাণ নামে একমাত্র অধীরই তাকে ডাকতো। সে ভীষণ বিরক্ত হতো, কিন্তু অধীর তার বিরক্তি পাত্তা দিত না। এতো বছর পর সেই নাম আবারো পাশে বসা লোকটার মুখ থেকে শুনে সন্ধ্যা কি রিয়েকশন দিবে বুঝতে পারছে না। তার মানে কি এটাই অধীর? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? সন্ধ্যা ভাবতে পারে না। তার দৃষ্টি অধীরের সাদা চোখের মণিতে। কাঁপা কণ্ঠে অস্ফুটস্বরে আওড়ায়, “অধীর ভাইয়া?”
অধীরের কানে এসেছে সন্ধ্যার উচ্চারণ করা নিজের নামটি। হাসল সে। সামনে তাকিয়ে ডান হাত গাড়ির স্টিয়ারিং-এ রেখে বা হাত সামান্য বাদিকে এনে একটানে সন্ধ্যার সিটবেল্ট লাগিয়ে দেয়। দৃষ্টি সামনে। সন্ধ্যা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অধীর গাড়ি স্টার্ট দেয়। হাইস্পিডে গাড়ি চলছে। হঠাৎ কি হলো সন্ধ্যা বুঝতে পারলো না। এতো স্পিডে গাড়ি চলতে দেখে সন্ধ্যা হতভম্ব হয়ে যায়। বিচলিত কণ্ঠে বলে,

“গাড়ি থামান। আমি নেমে যাবো।”
সন্ধ্যার কথা অধীর কানে নিল না। সে গাড়ির স্পিড আরও বাড়ায়। বলে,
“দশ মিনিটে তোর বাচ্চার কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। যাস্ট ওয়েট প্রাণ, এতো প্যারা নিস না।”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। তার মনে হচ্ছে তার পাশে সেই ছোটবেলার অধীর বসা। যে কথায় কথায় তাকে প্রাণ ডাকতো, আর তার সৌম্য ভাইয়ার মতো তুই শব্দ। কিন্তু অধীর কি করে বেঁচে থাকতে পারে? তার আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা, যেদিন ভরদুপুরে সৌম্য তার কাছে দৌড়ে এসে ভাঙা গলায় বলেছিল, ‘বোনু জানিস, অধীর ভাইয়া না মরে গেছে রে!’
কথাটা ভাবতেই সন্ধ্যার শরীর শিউরে উঠল। সে কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছে না। কিন্তু এখন এসব ভাবনার ইতি টানলো। সৃজনের জন্য তার সবচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছে। আগে সৃজনকে বুকে নিবে, এরপর বাকি চিন্তা মাথায় নিবে।

প্রায় আধঘণ্টার মাথায় আকাশ এক জায়গায় গাড়ির ব্রেক কষে। দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। আশেপাশে দিশেহারা হয়ে সৃজনকে খোঁজে। হাতের ফোনটিতে আরেকবার চেক করে নিল, জায়গাটি ঠিক আছে কি-না! তাকে যে লোকেশন পাঠিয়েছে, এটাই সেই জায়গা। আকাশ সামনের দিকে দু’মিনিট দৌড়ালো।
সন্ধ্যার আমেজে ঢাকা ধরণীর বুকে ছোট্ট সৃজন একা একা হাঁটছে আর কাঁদছে। থেকে থেকে মা মা করে ডাকছে। নিস্তব্ধ এই জায়গায় ছোট্ট বাচ্চাটির কান্নামাখা আওয়াজ চারিদিকে তীব্রভাবে প্রতিধ্বনি হয়। সৃজনের পায়ে জুতো নেই। পরনে একটি প্যান্ট আর গেঞ্জি। ছেলেটি দিশেহারা হয়ে মাকে খুঁজছে আর অনবরত ডাকছে। কিন্তু মাকে এতো ডেকেও না পেয়ে সৃজনের কান্নার বেগ বাড়ে। আশেপাশে কাউকে না দেখে আরও ভয় পায়। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“মা তুমি কুতায়? আমাল কাচে এচো। এচো মা। আমি বয় পাচ্চি। তুমি এচো মা। আমাকি কুলে নাউ, মা???”
এভাবে আরও কতশত বিলাপ করে আর কাঁদে ছোট্ট সৃজন। কিন্তু শোনার মতো কেউ নেই।

আকাশ এলোমেলোভাবে হাঁটছে, কখনো বা দৌড়াচ্ছে। অস্থির দৃষ্টি চারিদিকে ঘুরছে। হঠাৎ-ই একটি বাচ্চার আওয়াজ কানে ভেসে আসে। মনে হচ্ছে কোনো বাচ্চা কাঁদছে। আকাশ অস্থির হয়। পায়ের গতি বাড়ায়। কয়েক পা এগোতেই দৃষ্টি আটকায় সামনে এলোমেলো পায়ে হাঁটতে থাকা সৃজনের পানে। আকাশের পা থেমে যায়। সৃজনকে দিশেহারা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাঁদতে দেখে ঢোক গিলল। শব্দ করে ডাকে, “সৃজন?”
কান্নারত সৃজন নিজের নাম শুনতে পেয়ে সামনে তাকায়। ছোট্ট ছোট্ট দু’হাতে ভেজা মুখ মুছে ভালোভাবে তাকায়। পরিচিত আকাশকে দেখে বাচ্চা ছেলেটির মনে সাহস জাগে। এতক্ষণের জমায়িত ভীতি অনেকটা দূর হয়ে যায়। কিছুক্ষণ আগে আকাশ তাকে কোলে বসিয়ে খেলা দেখাচ্ছিল, এসব ভেবে আকাশকে আর ভয় পায় না। মুখে হাসি ফুটে ওঠে। আকাশের দিকে দৌড়ে আসতে আসতে বলে,

“বাতাচ বাবু, মা আচে না। আমাকি কুলে নেয় না। একন তুমি আমাকি কুলে নাউ, বুচ্চ বাতাচ বাবু?”
আকাশ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে আসা সৃজনের পানে। দু’বার ঢোক গিলে শুকনো গলা ভেজায়। দৃষ্টির সামান্য নড়চড় হলে দেখতে পায় সৃজনের পিছন পিছন একজন লোক একটি বড়সড় ছু’রি নিয়ে তেড়ে আসছে সৃজনকে অ্যাটাক করতে। আকাশ লোকটির দিকে ভস্ম করা দৃষ্টিতে তাকায়। ডান পা উঁচু করে, ডান হাতে পায়ের জুতোর ভিতর থেকে একটা মিডিয়াম সাইজের ছু’রি বের করে। শক্ত দৃষ্টি লোকটির পানে, যে সৃজনকে আঘাত করতে সৃজনের দিকে এগিয়ে আসছে। আর সৃজন আকাশের দিকে। আকাশ পা থেকে বের করা ছু’রিটি ডান হাতের মুঠোয় শক্তহাতে চেপে ধরে হঠাৎ-ই এক দৌড় দেয় সৃজনের দিকে। দু’সেকেন্ডের মাথায় আকাশ সৃজনের পিছে ধেয়ে আসা লোকটির বুক বরাবর জোরেসোরে একটা লাথি বসায়। আকস্মিক শক্ত লাথিতে লোকটি নিজেকে সামলে নিতে পারে না। একবারে উল্টে চিৎপটাং হয়ে যায়। আকাশ সাথে সাথে সৃজনের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে বা হাতে সৃজনকে কোলে তুলে নেয়। সৃজনের মাথা তার কাঁধে চেপে ধরে। এরপর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ডান হাতের ধারালো ছু’রিটি মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির গলার মাঝ বরাবর একদম গেঁথে দেয়। লোকটি ভয়ানক স্বরে আর্তনাদ করে ওঠে। হঠাৎ এমন বিদঘুটে আওয়াজে আকাশের কোলে থাকা সৃজন ভ’য়ে কেঁপে ওঠে। এতোক্ষণের জমানো ভ’য় সাথে এখনকার ভ’য় দু’টো মিলিয়ে সে শ’ক্ত করে আকাশকে আঁকড়ে ধরে। ফুঁপিয়ে উঠে আদোআদো স্বরে বলে,

“আমি কুব বয় পাই। ইই জাগা ইকটুও বালো না। বাতাচ বাবু, তুমি আমাকে মা কাচে নিয়ে চলু।”
আকাশের জ্ব’ল’ন্ত দৃষ্টি সোনালি চোখের মণি দু’টোয় যেন আ’গু’ন জ্বলছে, যে ভয়ানক দৃষ্টি মাটিতে পড়ে থাকা গলা কাটা মুরগির ন্যায় লোকটির পানে ছিল। সৃজনের ফোঁপানোর স্বরে কথাগুলো শুনে আকাশের ধ্যান ভাঙে। গুমগুম পায়ের শব্দে আকাশ মাথা তুলে সামনে তাকালে দেখতে পায়, একদল লোক তাদের দিকে ছুটে আসছে। আকাশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকগুলোকে দেখে। মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির গলায় গাঁথা ছু’রিটি একটানে তুলে সামনে একজন লোকের গলা বরাবর ছু’রি ছুড়ে মা’রে। আকাশের ছুড়ে দেয়া নিশানা অনুযায়ী ছু’রিটি লোকটির একদম গলা বরাবর গেঁথে গিয়েছে। লোকটির পা থেমে যায়, ঢলে পড়ে মাটিতে। বাকি লোকগুলো তাদের সঙ্গীর এহেন পরিণতিতে ভ’য় পেলেও থামলো না। আর না তো এগিয়ে গিয়ে লোকটিকে ধরলো। তাদের একমাত্র লক্ষ্য বোধয় সৃজন। হবে নাই বা কেন! সৃজনকে হাতে না পেলে তাদের বস তাদের জীবন কি আস্ত রাখবে? ভয়াবহ অবস্থা হবে। থেমে থাকলে তো চলবে না।

এদিকে আকাশ কোর্টের পিছন থেকে পিস্তল বের করে লোকগুলোর দিকে তাক করতে নেয়, তার আগেই লোকগুলো আকাশ আর সৃজনের দিকে গু’লি ছোড়ে। আকাশ বা হাতে সৃজনকে বুকে চেপে নিচু হয়ে এপাশ থেকে ওপাশে একবার গড়িয়ে আবারো হাঁটু মুড়ে বসে। জলন্ত দৃষ্টি লোকগুলোর দিকে। ডান হাতের পিস্তল থেকে অনবরত গু’লি ছোড়ে লোকগুলোর দিকে। কিন্তু আকাশ সৃজনকে নিয়ে বেশি সুবিধা করতে পারলো না। সে সৃজনকে নিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। উল্টোপথে দৌড় লাগায়। যেন সে পালিয়ে যাচ্ছে। কাজটিতে আকাশ প্রচন্ড বিরক্ত হয়। এই চুনোপুঁটি লোকদের থেকে সে পালাচ্ছে, ব্যাপারটি আকাশ নিতে পারলো না। ফলস্বরূপ আকাশের কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে। তবে আপাতত সৃজনকে নিয়ে এদের হাত থেকে বাঁচতে পালানো বা ওদের চোখে ধূলো দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই৷
এদিকে এতো এতো বিকট ভ’য়া’ন’ক আওয়াজে সৃজন ভ’য়ে প্রায় কাঁপছে। দু’হাতে আকাশের গলা শ’ক্ত করে জড়িয়ে রেখে ভীত কণ্ঠে বলে,

“বাতাচ বাবু আমাকে ছুলে পেলবা না। আমি বয় পাই।”
আকাশ বা হাতে সৃজনকে শক্ত করে ধরে রেখে ফাঁকা রাস্তায় দৌড়াচ্ছে। পিছন থেকে অনবরত গু’লি ধেয়ে আছে। আকাশের ডান হাতে পি’স্ত’ল। সেই হাতটি কম্পনরত সৃজনের পিঠে শ’ক্ত করে রেখে হাঁপানো কণ্ঠে ছোট করে বলে, “ফেলব না।”
আকাশের কথায় ছোট্ট সৃজন সাহস পায়। ঠিক যেমন মা তাকে বুড়ো আঙুল দেখালে সাহস পায়। সৃজন আকাশের গলা আরও শ’ক্ত করে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“মা এত্তো (অনেক) বালো। বাতাচ বাবু ইত্তু (একটু) বালো।”

সৃজনের কথায় আকাশের মাঝে তেমন কোনো প্রভাব ফেললো বলে মনে হলো না। আকাশ একটি ফাঁকা জায়গায় এসে থেমে যায়। কোনদিকে যাবে সেটাই ভাবছে। আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কোনদিকে যাওয়া উচিৎ। সন্ধ্যার আমেজ চলে যাওয়ায় চারপাশে অন্ধকার হয়ে আছে। লোকগুলোর পায়ের আওয়াজ গাঢ়ভাবে শুনতে পায় আকাশ। খেয়াল করে, সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে ফাঁকা। অর্থাৎ নিচে আরেকটি রাস্তা যেখান দিয়ে অনবরত গাড়ি চলাচল করছে। মিটিমিটি আলোয় আকাশের দৃষ্টি আটকায় একটি বালির ট্রাকের উপর, ট্রাকটি ব্রিজের নিচ থেকে বেরিয়ে আকাশদের পাশ বরাবর নিচ দিয়ে যাচ্ছে। আকাশ সময় নষ্ট না করে ডান হাত বাড়িয়ে ব্যস্ত হাতে কোর্টের বোতামগুলো খুলে ফেলে। এরপর কোর্টের মাঝে সৃজনকে পেঁচিয়ে নিয়ে সাথে সাথে শূণ্যে ঝাপ দেয়, সৃজন ভ’য়ে পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। তীব্র বাতাসে চোখ মেলতে পারে না। ভীত কণ্ঠে আওড়ায়, “বাতাচ বাবু শুদু আমাকে বাতাচ খাওয়ায়।”

বা হাতে আধশোয়া সৃজনের দিকে আড়চোখে চেয়ে আকাশ বিড়বিড় করে, “ইডিয়ট।”
তখনই আকাশ ধপ করে এসে পড়ে ট্রাকে রাখা বালির স্তূপের উপর। আকাশ যেটুকু পেরেছে তার দিক ফেরানোর চেষ্টা করেছে। ফলস্বরূপ আকাশের পিঠ ঠেকেছে বালির উপর।
অর্থাৎ সে পুরো চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়েছে। আর সৃজন তার কোর্টের মাঝে বুকে ঘাপটি মেরে আছে। সে এবার ভ’য় পেয়ে কেঁদে দিয়ে বলে,
“বাতাচ বাবু আমি পলি গিলাম, পলি গিলাম। আমাকে ধলো ধলো। তাত্তালি ধলো।”
আকাশ সৃজনকে ধরে রেখেই দ্রুত শোয়া থেকে উঠে হাঁটুমুড়ে বসে। বা হাতে ধরে রাখা সৃজনকে আরেকটু উপরদিকে উঠিয়ে মৃদুস্বরে বলে,

“ধরেছি।”
সৃজনের কান্নার বেগ কমেছে, তবে থামেনি। সে কান্নামাখা গলায় ডাকতে থাকে, “মা, মা, মা কুতায় তুমি?”
আকাশ ট্রাকের উপর ডান হাতে হাতিয়ে হাতিয়ে পি’স্ত’ল খুঁজল। অন্ধকার হওয়ায় না পেয়ে বিরক্ত হলো৷ হাত থেকে কোথায় ছিটকে গিয়েছে কে জানে! আকাশ এখানে সময় নষ্ট করল না। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে ডান পায়ে ট্রাকের মাথায় জোরেসোরে একটা লাথি বসায়। যার ফলে ট্রাকের পিছনে যে অংশটি থাকে সেটি আলগা হয়ে একেবারে খুলে যায়। সাথে সাথে চলন্ত ট্রাকের ব্রেক কষে ড্রাইভার। এতো জোরে কিসের শব্দ হলো, সেটা দেখতে ভদ্রলোক ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে ট্রাকের পিছনে এসে দাঁড়ায়। পকেট থেকে ফোন বের করে, ফোনের ফ্লাস জ্বালিয়ে উপরের দিকে তাক করে, দেখার চেষ্টা করে ট্রাকে বালির স্তূপের উপর আসলে কি আছে যার ফলে ট্রাকের পিছন পার্ট খুলে গেল।

আকাশের মুখের দিকে লাইট এসে পড়ায় সে চরম বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে নেয়। কোর্টের ভিতর থাকা ছোট্ট সৃজন মাথা উঁচু করে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে, কে তাদের দিকে আলো ধরছে এজন্য। দু’হাত এখনো আকাশের গলায়।
ড্রাইভারটি আকাশকে এক দেখাতেই চিনতে পারে। আকাশের দাপটের ব্যাপারে জানেনা না, আকাশকে চেনেনা এমন মানুষ খুব কমই আছে। ড্রাইভারটি আকাশকে দেখতে পেয়ে সাথে সাথে তার তাক করা ফোন সরিয়ে নেয়। আবছা আলোয় লোকটি ভীত চোখে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। আকাশের মাথা মুখ বালি দিয়ে মাখামাখি দেখেছে। সে ভ’য় পাচ্ছে আকাশ তার ট্রাকে বালি দিয়ে মাখামাখি হওয়ায় তাকে আবার কিছু করে না বসে!
লোকটি লাইট সরিয়ে নেয়ায় আবারও অন্ধকার হয়ে যায় জায়গাটি। সৃজন কিছু দেখতে না পেয়ে কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে, “এতো অন্দকাল কেনু? আমি বয় পাই তো।”

সৃজনের কথা আকাশ শুনলেও ভালো, মন্দ কোনো রিয়েক্ট করল না। অল্পস্বল্প আলোয় সে দেখে দেখে এগিয়ে এসে সৃজনকে নিয়ে ধীরে ধীরে ট্রাক থেকে নেমে দাঁড়ায়। ট্রাকের ড্রাইভার রীতিমতো ভয়ে কাঁপছে। তার মনে হচ্ছে, আকাশ তাকে এক্ষুনি কিছু একটা করবে। হয়তো তাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু তার ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আকাশ তাকে পাস করে ট্রাকের উল্টোপথে হাঁটতে লাগলো। এটা দেখে লোকটি স্বস্তি পায়।
আকাশ পকেট থেকে ফোন বের করে ফোনের ফ্লাশলাইট জ্বালাতে গিয়েও জ্বালালো না৷ আবারো পকেটে রেখে দিল। আড়চোখে সৃজনের দিকে একবার তকালো। এরপর সোজা হয়ে চুপচাপ হাঁটতে লাগলো।
অনেকক্ষণ থেকে চারপাশটা অন্ধকার দেখে সৃজন কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে,

“কালি অন্দকাল অয়, আল বালো লাগে না।”
আকাশ গম্ভীর গলায় বলে,
“অন্ধকার ভয় পাও কেন?”
সৃজন উত্তরে বলে,
“অন্দকালে বুত থাকে বুত।”
“এটা তোমাকে কে বলেছে?”
সৃজন একটু সময় নিয়ে কিছু একটা ভেবে বলে, “অলুণ বলিচে।”
আকাশের চোখেমুখে বিরক্তি এসে জড়ো হয়। বিড়বিড় করে,
“বে’য়া’দ’ব অরুণ।”

আরও দু’পা এগোতেই হঠাৎ গু’লির আওয়াজে আকাশের কান সজাগ হয়। আরও কয়েক পা এগোলে রাস্তার আলোয় সবকিছু দৃশ্যমান হয়। চোখে পড়ে ডানদিকে থেকে সেই লোকগুলো তার দিকে দৌড়ে আসছে। সুযেগ বুঝে কয়েকটা গু’লি ইতোমধ্যে ছুড়েছে। আকাশ সৃজনকে নিয়ে বা দিকের রাস্তায় দৌড়ায়। চোখমুখ শক্ত হয়ে গিয়েছে। বা হাতে সৃজনকে শক্ত করে ধরে রেখে, ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। রাগে শরীর কাঁপছে৷ এদের সবকটাকে সে যে ঠিক কি করবে, সে নিজেও জানেনা।
এদিকে এতোক্ষণে সৃজনের যেটুকু ভ’য় দূর হয়েছিল, তা আবারো জেগে ওঠে। ছোট্ট বাচ্চাটি বুঝতে পারে না, আকাশ একটু পর পর এভাবে দৌড়াচ্ছেই বা কেন, আবার কোথা থেকে যেন বিকট আওয়াজ ভেসে আসছে৷ এজন্য সে বেশি ভ’য় পাচ্ছে।
ফাঁকা রাস্তায় মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি চলাচল করছে। আকাশ কয়েকটি গাড়ি পাস করে হঠাৎ থেমে যায় সামনে নিয়াজকে দেখে। নিয়াজ তার গাড়ি থেকে বেরোতে নিচ্ছিল, সামনে আকাশ আর সৃজনকে দেখে সে অবাক হয়। বেশি অবাক হয় বা দিকে থেকে বেশ কয়েকজন লোককে এদিকে আসতে দেখে। মনে হচ্ছে আকাশকে আক্রমণ করতে চাইছে। আর আকাশ পালাতে চাইছে। সে বাকহারা হয়ে আকাশকে দেখে। আকাশ কিছু একটা ভেবে নিয়াজের উদ্দেশ্যে বলে,

“হেই নিয়াজ, ক্যাচ হিম।”
কথাটা বলে সাথে সাথে সৃজনকে নিয়াজের দিকে ছুড়ে দেয়। সৃজন ভ’য়ে কেঁদে দিয়ে বলে,
“বাতাচ বাবু কুব কালাপ। কালি আমাকি ছুলে ফেলে। পুচা বাতাচ বাবু কুতাকাল।”
নিয়াজ ততক্ষণে সৃজনকে তার সাথে সাপ্টে ধরেছে। তার নিজেরই বুক ধুকধুক করছে। দৃষ্টি আকাশের দিকে। মনে প্রশ্ন জাগে, এই আকাশটার মাঝে কি একটুও দয়ামায়া নেই?
নিয়াজ কান্নারত সৃজনকে শান্ত করার টাইম টুকু পেল না, লোকগুলোর মাঝ থেকে একজন সৃজনের দিকে গু’লি ছুড়েছে। নিয়াজ যে জায়গাটি থেকে সরে যাব, সেই সুযোগটিও পাচ্ছেনা। কান্নারত সৃজনকে শক্ত করে ধরে রেখেছে বুকে। হঠাৎ-ই আকাশ গু’লির সামনে বা হাত পেতে দেয়। ফলস্বরূপ গু’লিটি আকাশের হাতের তালু বরাবর বিঁধে যায়। আকাশের মুখাবয়বে এর কোনো প্রভাব পড়ল না। তার শ’ক্ত দৃষ্টি সেই লোকটির দিকে, যে সৃজনের দিকে গু’লি ছুড়েছিল।
ওদিকে লোকগুলো এতোক্ষণ ভ’য় না পেলেও আকাশের হাতে গু’লি বিঁধে যাওয়ায় তাদের পা অটোমেটিক থেমে গিয়েছে, ভ’য়ে কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছে। কারণ তাদের উদ্দেশ্য সৃজন। আকাশ নয়। উল্টে আকাশকে তারা ভীষণ ভ’য় পাচ্ছে।

এদিকে আকাশকে প্রতিহত করতে দেখে নিয়াজ যেমন স্বস্তি পায়, তেমনি অবাক হয়। আকাশ সৃজনকে প্রটেক্ট করছে? ব্যাপারটি তার মোটেও হজম হচ্ছে না। জেলখানার ওখানে সন্ধ্যা, সৃজনের সাথে আকাশের করা কান্ডের কথা সে জানে। তাহলে? ভাবনার মাঝেই আকাশের শক্ত কণ্ঠে নিয়াজের ধ্যান ভাঙে,
“নিয়াজ, সৃজনকে নিয়ে এখান থেকে যাও। ফাস্ট।”
কথাটা বলতে বলতে বাদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে নিয়াজকে এখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আকাশ হুংকার ছেড়ে বলে, “এখান থেকে যাবি না-কি ম’র’বি আমার হাতে?”
নিয়াজ ঢোক গিলল। কিছু বলল না। আকাশের কান্ডে অবাক হয়েই রইল। এরপর সে দ্রুত সৃজনকে নিয়ে তার গাড়িতে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। কোলে বসা সৃজন দু’হাতে নিয়াজের গলা জড়িয়ে ধরে ফোঁপায় আর বলে,
“বাতাচ বাবু পুচা, বুচ্চো খিয়াজ মামা?”

নিয়াজ কি বলবে বুঝল না। সে গাড়ি চালাতে চালাতেই সৃজনের মাথায় একটা চুমু খায়। চোখেমুখে হাজারটা প্রশ্নের ভিড়। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছেনা। সবচেয়ে বেশি অবাক করার বিষয় আকাশের কর্মকান্ড। দেখে মনে হলো, আকাশ সৃজনকে যেকোনোভাবে প্রটেক্ট করতে চায়। কিন্তু আকাশ সৃজনকে প্রটেক্ট করার জন্য তাকে কেন বেছে নিল, যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেই আকাশ তাকে বলে বসল, সে নাকি সৌম্য’র নামে মামলা করেছে। এতো এতো জগাখিচুরি ভাবতে গিয়ে নিয়াজের মাথা ধরে যায়। আকাশ প্রতি পদে পদে অদ্ভুদ আচরণ করছে। এর কারণ কি?
এতো এতো চিন্তা নিয়াজের মাথায় ভর্তি হয়ে গিয়েছে।

নিয়াজের গাড়ি চলে যেতে দেখে আকাশ ঘাড় ফিরিয়ে লোকগুলোর দিকে তাকায়। লোকগুলো থরথর করে কাঁপছে। আকাশ বোধয় ব্যাপারটি খেয়াল করেছে। ঠোঁট বাঁকালো সে। সামনে এগোতে এগোতে উপহাসের স্বরে বলে,
“এতো ভ’য়? তাহলে আমার….
থেমে যায় আকাশ। নিজের প্রতিই বিরক্ত হয় কথার মাঝে দাঁড়ি টানায়। অতঃপর শক্ত গলায় বলে,
কে পাঠিয়েছে?
লোকগুলো ঢোক গিলল। আকাশ আগের চেয়েও রাগান্বিত স্বরে বলে,
যে তোদের পাঠিয়েছে, সে আমার হাত থেকে তোদের বাঁচাতে পারবে?
এতক্ষণে তাদের হাত থেকে পি’স্ত’ল গুলো মাটিতে পড়ে গিয়েছে। আকাশকে তাদের দিকে এগোতে দেখে লোকগুলো ভ’য় পেয়ে উল্টোদিকে দৌড় দেয়। আকাশ দাঁড়িয়ে যায়। বাঁকা হাসে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সামনের দিকে এগোতে নেয়। হঠাৎ কোথা থেকে সন্ধ্যা একপ্রকার দৌড়ে এসে আকাশের সামনে দাঁড়ায়। আকাশের পা থেমে যায়। দৃষ্টি সন্ধ্যার ভীতি মুখপানে গিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা আকাশের একদম সামনে এসে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“আমার বাচ্চা কোথায়?”

সন্ধ্যার কণ্ঠে রাগের সাথে কম্পনও মিশে আছে। সৃজনের চিন্তায় তার নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। এখানে এসে আকাশের কাছে সৃজনকে না দেখে যার পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে৷
আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকায় সন্ধ্যার পানে। স্বাভাবিক গলায় উত্তর করে,
“মে’রে দিয়েছি।”
কথাটা কানে আসতেই সন্ধ্যার বুক কেঁপে ওঠে। চোখজোড়া ছলছল করে ওঠে। লোকটা এতো স্বাভাবিক গলায় কিভাবে এমন কথা বলতে পারে? সন্ধ্যা শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কণ্ঠে বলে, “মানে?”
আকাশ ডান হাতে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে রাখে। বা হাত নাড়াতে চাইলেও সুবিধা করতে পারলো না সে হাতে গু’লি লাগায়। তাই বা হাত আর নাড়ালো না। ডান হাতেই পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেটে আ’গু’ন ধরায়। দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে।

একে তো আকাশের বলা কথায় সন্ধ্যার শরীরে কম্পন ধরেছে, সাথে রাগ তো আছেই। এর উপর আকাশের করা কান্ডে সন্ধ্যার রাগ তড়তড় করে বেড়ে গেল। চেঁচিয়ে বলে,
“আপনার সাহস কি করে হয়, আমার ছেলেকে মা’র’তে আসার?”
আকাশ সিগারেট ধরালেও সিগারেটে টান দিল না, আর না তো ধোঁয়া ছাড়লো। উল্টে জ্ব’ল’ন্ত সিগারেটটির মাথায় ডান হাতের বুড়ো আঙুল চেপে রাখে। হয়ত রা’গ দমনের উপায়। তবে উপরে স্বাভাবিক। দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে রেখে কৌতুক স্বরে বলে,

“অ’বৈধ সন্তানের হায়াত বেশিদিন থাকেনা।”
কথাটা শুনে সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশের কথাটি সে ঠিক হজম করতে পারলো না। এটা সে কি শুনলো? তাও আবার আকাশের মুখে? যে নিজেই তার সন্তানের বাবা। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে কড়া কণ্ঠে বলে,
“মুখ সামলে কথা বলবেন। আমার বাচ্চা অ’বৈধ নয়, আমার সম্পূর্ণ হালাল এক স্বামী ছিল, যে এখন….
একটু থেমে সন্ধ্যা কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করে, সে এখন মৃ’ত।”
কথাটা আকাশের বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। ডান হাতের মুঠোয় সিগারেটটি চেপে চোয়াল শক্ত করে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “প্রমাণ?”
সন্ধ্যাও রে’গে উত্তর করে,
“আপনাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”
আকাশের দৃষ্টি একবার সন্ধ্যা তো একবার সন্ধ্যার পিছন থেকে কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়ানো একজন লোকের উপর ঘুরছিল। লোকটি মাত্র জায়গাটি প্রস্থান করতেই আকাশ ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে ডান হাতে সন্ধ্যার গাল চেপে হিসহিসিয়ে বলে,

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৫ (২)

“বে’য়া’দ’ব মেয়ে, তোর সাহস কি করে হয়, পরপুরুষের সাথে এতোদূর আসার? তোর কোন কালের স্বামী মৃ’ত এর হিসাব আমি আগে নিব। বে’য়া’দ’বের সাথে সাথে মিথ্যাচারেও এক্সপার্ট হয়ে গিয়েছিস, তাই না?”
সন্ধ্যা দু’হাতে আকাশকে ঠেলে সরাতে চাইলেও পারলো না। বিরক্ত হলো বেশ। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আমার স্বামী জীবিত না মৃ’ত এটা তো আপনার জানার কথা নয়। যেমনটা জানার কথা নয়, আমি সত্য বলছি না-কি মিথ্যা!”
সাথে সাথে আকাশ সন্ধ্যার গাল চেপে ধরা হাত ছেড়ে দেয়। গলা ঝেড়ে খুব স্বাভাবিকভাবে বলে,
“ভালো হয়েছে, তোমার স্বামী মৃ’ত। এবার তোমাকে বিয়ে করতে সুবিধা হবে আমার জন্য।”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১৭