আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৩৮+৩৯+৪০
ফারজানা মনি
দুপুরের কড়া রোদের পাশাপাশি মানুষের শরীরের ছায়াটাও যেন বিদায় নিয়েছে। একটা ঘর্মাত্মক দুপুর পার হয়ে ধরনীতে দেখা দিয়েছে এক স্নিগ্ধ বিকেল। দুপুরের ঘটনার পর মীম আর বাহিরে বের হয়নি। যদি চোখে চোখ পড়ে যায় আরিফের সেই ভয়ে।
মিম জানে আরিফ তাকে কিছুই বলবেনা এমনকি বাড়ির কাউকেও এই ব্যাপারে অবগত করবে না। তাও এক অনাকাঙ্ক্ষিত ভয় যেন তাকে ঝাকিয়ে ধরেছে।
মিমের কি এক অদ্ভুত বিশ্বাস আরিফের প্রতি। মিম জানে আরিফের দ্বারা তার কোন ক্ষতি কোন কালেই সম্ভব নয়। দুপুরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি মিমকে এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সেটা কি একমাত্র আরিফের প্রতি ভয়? না.. সেটা কেবলই অপরাধবোধ।
আরিফের প্রতি মিমের আকর্ষিক কর্মকাণ্ড.. আরিফের পাশাপাশি মিমকেও এক অদ্ভুত দহনে পোড়াচ্ছে। আরিফ কি তা জানে? হয়তো না আবার হয়তো হ্যাঁ। সদ্য যৌবনে পা দেওয়া কিশোরী মিম নিজের মনটা অনেক আগেই আরিফের নামে লিখে দিয়েছে.. কিন্তু কি লজ্জা! এই কথা তার মন স্বীকার করলেও তার মস্তিষ্ক মানতে চায় না।
কি করেই বা মানবে? দীর্ঘ ২৭ বছর আগে এই একই প্রেম ঘোরের কারণে এই বাড়ির একমাত্র আদরের মেয়ের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছিল খান বাড়ির। আবির আর মেঘ আপু এই বাড়ির ই ছেলে মেয়ে। তাদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণরূপে আলাদা। কিন্তু মিম.. আরিফকে ভালোবাসলে যদি ফুপ্পির সাথে আবারো সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। তাহলে তো ফুপ্পি ভিতর থেকে এবার শেষ হয়ে যাবে। সেই কলঙ্ক মিম নিজের কাঁধে কখনোই নিতে পারবে না।
মেয়ে মানুষ অল্প বয়সেই যেন নিজের ম্যাচিউরিটির পরিচয় দেয়। এই কিশোরী যেন তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। হয়তো আরিফ তা ভাবছে না, তাই এক গভীর সম্পর্কে নিজেকে আটকাতে চাচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে আরিফ ও একই চিন্তায় বিভোর কিন্তু তার মন তা মানতে চায় না।
এত কিছু হিজিবিজি ভাবনার মাঝে বাহিরের ড্রয়িং রুমের শোরগোল শুনে মিমের ধ্যান মগ্ন হলো। সবার কথা একত্রে ড্রয়িং রুমে শোনা যাচ্ছে। মীম ছুটে গেল ড্রয়িং রুমে। দেখলো তানভীর এসেছে। তাকে নিয়েই আদি খুশিতে হইচই করছে। আবির ভাইয়া, মেঘ আপু, বউমনি, আদি, ফুপ্পি, জান্নাত আপু, আইরিন সহ সকলেই সেখানে উপস্থিত। কিন্তু তাও যেন মিমের চোখ অন্য কাউকে খুঁজছে।
মিমের চোখ দুটো ব্যাকুল। অস্থির নয়নে ড্রয়িং রুমের চারদিকে তাকিয়ে আরিফ কে খুজলো।
কিরে মিম এত দূরে কেন দাঁড়িয়ে আছিস? এদিকে আয়.. বলেই হাক ছেড়ে ডেকে উঠলো তানভির। মীম হকচকিয়ে বলল: আসছি ভাইয়া। বলেই সকলের সামনে গেল মিম।
হঠাৎই মেঘ বলে উঠলো.. মিম… তোর চোখ মুখ এমন ফুল আছে কেন… তোর কি শরীর ঠিক আছে?
মিম কিছুটা থতমত খেয়ে বলল: ইয়ে.. মানে.. হ্যা আপু। আমি ঠিক আছি। পাশ থেকে বন্যা বলে উঠলো: আমার ছোট ননদিনীর মুখটা এত বিষন্ন কেন দেখাচ্ছে? মিম মুখটাকে একটু কাচুমাচু করে বলল: আসলে বউ মনি ঘুমিয়ে ছিলাম তো.. হয়তো তাই একটু অন্যরকম লাগছে।
তোমরা কি শুরু করলে বলতো, এই মিম আমার পাশে এসে বস । বলে উঠলো তানভির।
পড়ন্ত বিকেলের রক্তিম তাপহীন সূর্যকে বিদায় জানিয়ে, অন্তরীক্ষকে রংবেরঙের আবিরে সাজিয়ে ধরণীতে নেমে এলো সন্ধ্যা। মাহমুদা খানদের বাড়িটা সবসময়ই জমজমাট থাকে । আইরিন ,জান্নাত, আসিফ, আরিফ সবাই যেন বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখে।
এর মাঝে জুটেছে আজ খান বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ ছোট সদস্যরা। তারাও হৈচৈয়ে কোনো দিক থেকে কম নয়। সকলে একত্রে ড্রয়িং রুমে বসে জমিয়েছে সন্ধ্যার আসর।
মাহমুদা খান তার হেল্পিং হ্যান্ড এর উদ্দেশ্যে বলে উঠলো: সকলের জন্য চা নাস্তা তৈরি করতে।
চায়ের সাথে সাথে সন্ধ্যার আড্ডাটা বেশ ভালোই জমবে মনে হয়। আবির কখন থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রল করে যাচ্ছে। হঠাৎই মেঘ সকলের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো: চলো আমরা সবাই কোন খেলা খেলি।
মেঘের হঠাৎ প্রস্তাব শুনে সকলে সায় দিলেও আবির আর মিম সায় দিল না.. মেঘের এই সময় খেলার কথা শুনে আবির কখন থেকে ভ্রু কুঁচকে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই তার চেহারা টা যেন বড্ড গুরু গম্বীর হয়ে উঠলো। কিন্তু মেঘ তো তা লক্ষই করেনি।
মেঘ তো মিমের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত। কিরে মিম.. তুই খেলবি না কেন? তোর আজ আবার কি হলো বলতো.. বলেই প্রশ্নের তীর ছুঁড়ে দিল মিমের দিকে। মিম একটু ইতস্তত কন্ঠে বলে উঠলো: না আপু তেমন কিছুই না।
মেঘ চোখ ছোট ছোট করে মিমের মুখপানে তাকিয়ে আছে। বলল: তোর মতি গতি আমি ঠিক বুঝতে পারতেছি না। এই ভালো তো এই খারাপ। অসুখ টা কোথায় তোর মনে নাকি শরীরে?
মেঘের দুষ্টুমি বুঝতে পেরে মিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এবার মেঘ একটু কটুক্তির সুরে বলে উঠলো: বুঝেছি.. তোর জন্য একটা ডাক্তার জামাই লাগবে। মিমকে বলা মেঘের এরকম কথা শুনে সবাই হুহু করে হেসে দিল
stop it. এখানে কোন খেলা হবে না। তুমি মিমকে কেন জোর করছো ?যেখানে তুমি নিজেই খেলতে পারবে না। বলেই মেঘের মুখপানে কটমট করে তাকালো আবির।
মেঘ মনে হয় একটু ভয় পেল। হ্যাঁ ভয়.. এই জিনিসটা এক সময় সে রোজ পেতো। মাঝখানের দু এক বছরে আবিরের রাগ যেন সে ভুলেই গেছে।
মেঘ একটু কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে বলল: আপনি কেন এমন করছেন? সবাই মিলে একসাথে খেললে মজা হবে অনেক। বন্যা ,তানভীর, জান্নাত সকলেই যেন নীরব দর্শক।
আবিরের নজর মেঘের কাঁদো কাঁদো মুখের দিকে পড়ায় তার চেহারার গাম্ভীর্য যেন তাৎক্ষণিক সে পাল্টে আন্তরিক অবস্থায় ফিরে এলো। মেঘের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল তুমি কেন এই মুহূর্তে খেলাধুলা এগুলোতে এত আসক্ত হচ্ছ ।তুমি কি জানো না এই সময় তুমি নিজেকে নিয়ে এত লাফালাফি করলে আমাদের বেবি কষ্ট পাবে। আবিরের এবারকার শান্ত কথা শুনে মেঘ চোখ মেলে আবিরের চোখের দিকে তাকালো। আহা.. কি শান্ত সেই দৃষ্টি। একটু আগের রাগী চেহারাটা যেন তার ই নয়।
আসলে একটু আগে যখন আবির ফোন স্ক্রল ছিল তখনই খবর পেল। আজ অফিসে একটা ছোটখাটো ঝামেলা হয়েছে। সেটা নিয়েই মূলত আবিরের মেজাজ গরম। হয়তো অন্য কারোর উপরের রাগটা ভুলে ভুল জায়গায় দেখিয়ে ফেলেছে। আবির মেঘকে শান্ত করতে চাইলো।
শান্ত হওয়ার বিনিময়ে মেঘ আবিরের বাহু জড়িয়ে আবারও বলে উঠল: আপনি কেন এত রাগ করছেন?
আমরা তো ট্রুথ এন্ড ডেয়ারও খেলতে পারি। আবির একটু চুপ করে থেকে বলল: ঠিক আছে খেলো বাট আমাকে ডাকবে না এসবে। তানভীর আবিরের হাত জড়িয়ে বলল ভাইয়া তুমি না থাকলে খেলায় কোন মজা আসবে না। বলেই জোর করে মেঘের পাশে বসিয়ে দিল আবিরকে।
আবির মেঘের পাশে বসেই লক্ষ্য করল মেঘের মন খারাপ হয়ে গেছে। সকলের অগোচরে আবির মেঘের এক হাত শক্ত করে ধরে আছে এখনো।।
আবির আস্তে আস্তে মেঘকে বুঝালো। জানালো যে অফিসের কাজে ডিস্টার্ব থাকার কারণে মেজাজটা হঠাৎই চরে গিয়েছিল। এবার মেঘের মুখটা একটু শিথিল হয়ে আসলো।
পাশ থেকে জান্নাত বলে উঠলো: এইযে ভাইয়া আর ভাবি.. আপনাদের প্রেম করা শেষ হলে খেলায় মনোযোগ দিন..
আবির আর মেঘ একটু হাসলো। মনোযোগ দিল খেলায়। কিন্তু মিমের মন যেন আজ তার কাছেই নেই। যদিও থাকে তার মন আজকাল তার কথা না শুনে যেন অন্য পুরুষের কথা শুনছে। এই যে এখন মস্তিষ্ক বলছে তাকে আর খুঁজবো না। কিন্তু মন বারবার বলে উঠছে কোথায় সে … ড্রয়িং রুমে এত মানুষের ভিড়ে কেন সে নেই।
ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ মিমের কানে সকলের চিৎকার ভেসে আসলো; চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল বোতলটা ঘুরে আবিরের দিকে ফিরে আছে। জান্নাত বলে উঠলো: প্রশ্ন আমি করব? ভাইয়া ট্রুথ নাকি ডেয়ার?
আবির: ট্রুথ…
জান্নাতের প্রশ্নে আবির ট্রুথ বেছে নেওয়ায় সবাই অ….অ…. বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। থাম এবার তোরা। কি বলতে হবে সেটা বল.. শান্ত মুখে বলে উঠলো আবির।
জান্নাত বলে উঠলো: আমি বলব.. আমি বলব..
আইরিন বলল: উফফসস.. ভাইয়া.. ট্রুথ কেন নিলা ডেয়ার নিতে পারলে না।
আবির কপাল কুঁচকে আইরিনের দিকে তাকিয়ে বলল : কেনো??
আইরিন মিন মিনিয়ে বলল: তাহলে তো তোমাকে দিয়ে অন্য একটা টাক্স কমপ্লিট করাতাম।
আইরিনের কথাটা ঢাকা পড়ে গেল তানভীরের স্বরে: হয়েছে.. হয়েছে.. ভাইয়ার পছন্দ হয়েছে তাই ট্রুথ নিয়েছে, তাতে এত প্রশ্ন কিসের?
আবির জান্নাতের দিকে তাকিয়ে বলল: জান্নাত.. কি প্রশ্ন করতে চাও করো..
আবিরের কথায় এবার যেন সবাই একটু স্বাভাবিক হয়ে আসলো। জান্নাত বলল: আচ্ছা ভাইয়া… আপনি যখন আমাদের মেঘবতিকে প্রপোজ করেছেন তখন তো আমরা মেয়েরা ছিলাম না। তো.. এখন মেঘবতীকে নিয়ে কিছু অপ্রকাশিত কথা আজকে প্রকাশ করে দিন।
আমি একটু হাসলো। তারপর তাকালো মেঘের মুখের পানে। মেঘ একটু লাজুক হেসে মাথা নুইয়ে বসে আছে।
আবির কিছুক্ষণ থেমে তারপর বলা শুরু করল:
মেঘ.. তোমাদের সকলের কাছে এই নামটা ছোট একটা শব্দ হলেও আমার কাছে এটার বিশালতা অনেক। এই মেঘ নামক মূল্যবান মানুষটিকে আমি বহু যত্নে গত ১৬টি বছর, হৃদয়ের মাঝে একটু একটু করে যত্নে পুষেছি। আমার সারা জীবনের সকল পূর্ণতার মাঝে শ্রেষ্ঠ পূর্ণতা আমার কাদম্বিনী.. আমার সকল অপূর্ণতার মাঝেও শ্রেষ্ঠ পূর্ণতা আমার স্পেরু..
মেঘ একটু কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। আবির মেঘের দিকে পাশ ঘুরে মেঘের দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল: মেঘ. আমার দিকে তাকাও..
ততক্ষণে মেঘের চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। আবির মেঘের চোখটা মুছে দিয়ে মাথা দিয়ে ইশারা করে বুঝালো “না”
তারপর আবির মেঘের চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো: আগেই তো বলেছি তোমার চোখে তাকিয়ে মিথ্যে বলার সাদ্য আমার নেই.. মেঘ সুস্থীর নয়নে তাকিয়ে আছে। ভালোবাসি … ভীষণ ভালবাসি আহিয়ার আম্মু.. আমৃত্যু ভালোবাসে যাবো…
হঠাৎ ই মেঘ ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আবির ও মেঘকে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে নিল।
সবাই একটা নিরব দৃষ্টি থেকে বেরিয়ে জোরে জোরে হাততালি দেওয়া শুরু করলো। আসিফ তো ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে মূহূর্তেই সিটি বাজানো শুরু করলো। এসব দেখে মেঘ কিছুটা লজ্জায় পড়ে গেল।
আবির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য তানভির কে বলল: হা করে তাকিয়ে না থেকে বোতলটাকে ঘুরা বেয়াদব..
আবিরের কথায় যেন তানভীরের টনক নরলো। এবার বোতল ঘুরাতে ই বোতল গিয়ে পরলো মিমের দিকে..
তানভীর একটু হেসে আইরিন এর উদ্দেশ্যে বলে উঠলো:
ছোট বোনকে আমরা আর কি প্রশ্ন করব ? আইরিন তুই ই প্রশ্ন কর।
আইরিন খুশিতে গদোমদো হয়ে মিমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, মিম কি নিবে? ট্রুথ নাকি ডেয়ার…
মিম অন্যমনস্ক হয়ে উওর জানালো ডেয়ার..
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৩৫+৩৬+৩৭
এবার আইরিন বলল: ওকে ফাইন,, একটা গান শোনাও..
সকলেই মিমের দিকে তাকিয়ে আছে.. হঠাৎই মিম গানের সুর তুলল..
বোঝাতে পারিনা তোমায় আমি, কতোটা ভালোবাসি।।♥️
বোঝাতে পারিনা তোমায় আমি, কতটা ভালোবাসি।।♥️
তুমি আমার অবুজ আদলে, গল্পে সাজানো বায়না…♥️♥️
আমি জানি, তুমিও জানো.. ♥️
এ মায়া আর কেউ বোঝেনা..♥️♥️
আমার কাছে তুমি অন্যরকম..♥️
ভালোবাসি বেশি, প্রকাশ করি কম ♥️♥️
আমার কাছে তুমি অন্যরকম..♥️
ভালোবাসি বেশি, প্রকাশ করি কম.. ♥️♥️
এত সুন্দর একটি গান শোনে যেন করতালির প্রতিযোগিতা চলছে। সবাই মিমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
