আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮৬+৮৭+৮৮+৮৯
ফারজানা মনি
👦 ফাহিম ও আবদুল আহাদ
🎶 “Gallan Goodiyan… sab karenge Gallan Goodiyan…”
পুরো বাড়ির ছোট বড় সবাই উঠল নেচে।
—
👑 তারপর হঠাৎ স্টেজে উঠে আসলো আবির ও মেঘ।
গান:
🎶 “Sajan sajan… tujhe dulhan sajaungi…”
আবির সাদা পাগড়ি পরে মেঘের পাশে এসে দাঁড়ালো। একে একে ঢুকে পড়ল বন্যা ও তানভীর। এরপর হঠাৎ মিমকেও টেনে আনা হলো— একসাথে চারজনের পারফর্মেন্স, চোখ ধাঁধিয়ে দিল সবাইকে।
👯♀️ তারপর মীমের বান্ধবী আকলিমা, আদ্রিশা, আফরিন, আলপি, আসরিফা, আয়ুশী, অনামিকা, অন্তরা, আরু, ইফটিকা, ইলমা, ইশিতা, ইসরাত, ইভা, লামিয়া, হালিমা, রাইসা, আনিসা, তানহা, জান্নাতুল,নীলাঞ্জনা, তানজিলা, মিতু । — সবাই গ্ৰুপ পারফর্ম করল:
🎶 “Mehendi hai rachne wali… haathon mein gehri laali…”
প্রতিটা লাইনে কেউ না কেউ ঠোঁট নেড়ে, নাচ করে… ছেলেরা পাল্টা দিচ্ছে সেই লাইনের জবাব নাচে।
এই গ্রুপের পারফর্ম শেষ হতে না হতেই সঙ্গে সঙ্গে উঠলো আরেক গ্রুপ । সেখানে রয়েছে: তাহমিনা, তবলাসসুম, তনজিম, তমা, তাসনোভা, তানজিম, তানিয়া, তাবাসসুম, তিসা, তৌফা, দিবজানি,মোহনা।
তাদের গ্রুপ ডান্স করল : নিলা বালি গানে।
মেয়েরা এই গানে ডান্স করছে মিমকে মাঝখানে দাঁড় করিয়ে।
ওদের এই পারফরম্যান্স শেষ হওয়ার সাথে সাথেই
হঠাৎ লাইট অফ।
ফোকাস লাইটে মঞ্চে এলো আরিফ।
🎶 “Mehendi laga ke rakhna… doli saja ke rakhna…”
আরিফ মিমের দিকে হাত বাড়ালো।
মিম হাসিমুখে এগিয়ে গেল।
দুজন একসাথে মঞ্চে… চারদিকে স্লো ক্ল্যাপ।
💃 শেষে সব্বাই একসাথে—
🎶 “Desi girl”
🎶 “Lungi dance”
🎶 “Tukur tukur dekhte ho kya…”
🎶 “Bole chudiyan bole kangana…”
সবাই একে একে স্টেজে— একসাথে নাচ, আনন্দ, হৈচৈ!
অবশেষে স্টেজের একপাশে বসে পড়ল মিম।
বাঁ পাশে বন্যা, ডানে মেঘ।
আরিফ মিমের হাতে মেহেদি লাগালো— হালকা কাঁপা হাত, চোখে জল।
আইরিন ফিসফিস করে বলল:
“এই ভালোবাসার নাম— আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে।”
ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়ায় শান্তির এক ধ্বনি…
শেষের উৎসব… যা শুরু হবে একটি নতুন জীবনের গল্পে।
লোকে ঠিকই বলে “যত হাসি তত কান্না”।
আজ মিমের ক্ষেত্রে তা একটু অন্যভাবে ফলে গেল।
যেমন: “যত কান্না তত হাসি”।
এই যে এখন মিমের এক হাতে মেহেদি পরিয়ে নিজের নাম লিখে দিল আরিফ।
মেয়েটার গালগুলো আজ লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে বারবার।
গত দুইদিন আগেই তো সে কত কেঁদেছে। কত কষ্ট পেয়েছে।
আর এখন মনে হচ্ছে সেই কষ্টের চেয়ে হাজার গুন বেশি সুখ ঝরনার মত ঝরছে তার হাসিতে।
কিছুক্ষণের মধ্যে জান্নাত এলো।
আরিফের উদ্দেশ্যে বলল:
এই যে দেবরজি .. এবার তো যেতে হবে। আর দুইদিন পর তো বউকে পার্মানেন্টলি পেয়েই যাবেন। এখন চলুন বাড়ি ফিরা যাক।
জান্নাতের কথায় যেন চারদিকে হাসির ফোয়ারা বইছে। মিমের সব বান্ধবীরা হেসে দিল। মিম লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
আরিফ মুচকি হাসলো। তারপর একবার তাকালো মিমের লাজুক মুখের দিকে। তারপর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল:
উফ, সুন্দর একটা বউ পেয়েছি বলে, চারিদিকের সবাই আমাকে হিংসা করে। কোথায় যে যাই…
বলেই আরিফ অন্যদিকে তাকিয়ে হাঁটা শুরু করলো।
জান্নাত তো অবাক।
রিয়া বলল:
বিয়ের খুশিতে এই ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
মুহূর্তেই পরিবেশটা হাসি ঠাট্টায় আরো মেতে উঠল।
🌼 হইচইয়ের মাঝেই নতুন অতিথিরা এসে হাজির।
দরজার কাছে উম্মে হাবিবা, কাহাফ, জেরিন, দেবজানি আর প্রীথি দাঁড়িয়ে ছিল।
উম্মে হাবিবা মিমের গালে আলতো করে চাপড়ে বলল—
—“আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে, রাজকুমারী হয়ে বসে আছিস!”
কাহাফ বলল—
—“মেহেদির রঙ দেখি দারুণ গাঢ় হবে।”
জেরিন হাসল—
—“আরিফ ভাইয়ের নামও বুঝি লিখে ফেলেছিস?”
দেবজানি বলল—
—“কত্তদিন ধরে ভাবছিলাম এই দিনটায় তোর পাশে থাকব। অবশেষে এলাম!”
প্রীথি হাত নেড়ে বলল—
—“আজকের সব ছবি কিন্তু আমার মোবাইলে থাকবে!”
আরও একটু পর প্রার্থনা, পূরবী, ফারহানা, ফারুল, বর্ষা আর বর্ণালি এসে জুটল।
প্রার্থনা বলল—
—“তোর গায়ে হলুদে আমরা সবার আগে লাফালাফি করব!”
পূরবী হেসে বলল—
—“তোর হাসি দেখে মন ভালো হয়ে যাচ্ছে।”
ফারহানা দুষ্টুমি করে বলল—
—“আরিফ ভাই কত ভাগ্যবান রে!”
ফারুল বলল—
—“কাল থেকে তোরা একসাথে, এবার কবে আমাদের বিয়ে হবে!”
বর্ষা আর বর্ণালি হাত তালি দিয়ে হেসে ফেলল।
এক কোণে মাইশা আর মায়া মিমের গয়না ঠিক করছিল।
মাহোদিবা, মিরা, মিরাজ আর মেহজাবিন আস্তে আস্তে পাশে বসল।
মাহোদিবা বলল—
—“কেমন লাগছে? টেনশন?”
মিম মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল—
—“সত্যি বলতে খুব নার্ভাস লাগছে…”
মিরা বলল—
—“চিন্তা করিস না, আমরা আছি।”
মিরাজ হাসতে হাসতে বলল—
—“এখন কাঁদিস না, বিয়ের দিন একসাথে কাঁদব!”
মেহজাবিন বলল—
—“দেখিস, সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।”
মনজিলা, মুন আর মুনতাহা এসে মিমকে জড়িয়ে ধরল।
মুন বলল—
—“আজ তোকে আলাদা করে সুন্দর লাগছে।”
মুনতাহা বলল—
—“যদি পালিয়ে যেতে চাস, আমাদের জানাস।”
মুক্তা, মাসুকা, নয়ন, নাবা, নাবিলা, নামিরা, নাদিরা, নিরমা সবার শেষে এসে বলল—
—“আজ তুই সবার নায়িকা!”
মিম সবার কথা শুনে লজ্জায় গাল লাল করে ফেলল।
মেঘের দূর সম্পর্কের মামাতো বোন উর্মি এসে বলল:
মেঘ আপু.. পার্লারের মুন্নি আপু এসেছে মেহেদি দেওয়ার জন্য।
মেঘ বলল:
আপুকে এখানে নিয়ে আয়। মিমসহ আমরা সবাই এখানেই মেহেদি লাগাবো।
ঠিক আছে কথাটা বলেই লেহেঙ্গার দুই পাশ ধরে দৌড়ে ছুটে পালালো উর্মি।
ধীরে ধীরে রাত আরো গভীর হতে থাকলো।
ভোর চারটার দিকে একে একে সবাই ঘুমাতে গেল।
মোটামুটি সবাই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত।
“হলুদ রাঙা সকাল”
সকালের সূর্য আজ খান বাড়িতে একটু বেশি আলো নিয়ে এসেছে।
সকালের আবহাওয়ায় যেন উৎসবের সুবাস।
স্পেরো ড্রিম হাউসে আজ হলুদ সন্ধ্যার দিন।
কিন্তু শুরুটা হলো একগাদা দুষ্টুমিতে!
🏃♀️ তৃধা ঘুরে ঘুরে বাসার সব হলুদ জিনিস খুঁজে বের করছে। এটা সেটা দেখিয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলছে।
“এই যে! এটা তো হলুদ টিস্যু! মিম ফুপি নিশ্চয় এটা পরবে!”
বলতে বলতেই সে টিস্যু মাথায় জড়িয়ে ফেলল।
এদিকে আহিয়া ও আহিয়ান দুজন মিলে কিচেনের দিকে ছোটে।
তারা নাকি আজ হলুদ রঙের লাচ্ছি বানাবে!
“আমি মেহেদী নাইটে ডান্স করেছিলাম, আমার লাচ্ছি খেতে হবে আগে!” — বলে চেঁচিয়ে উঠল আহিয়া।
সবাই হাসতে হাসতে পাগল।
নাস্তার টেবিলে একদম জমজমাট পরিবেশ।
আদি হেসে বলল:
“এই তানভীর ভাইয়া তো স্টেজে কেমন হঠাৎ চক্কর দিতে লাগলো… লাগছিল বেদের দলের উস্তাদ!”
মেঘ খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল,
“আর আবির ভাই? উনি তো শেষ লাইনে এমন ঢং করে হাত তুলে নাচলো, যেন পুরো বাংলাদেশ দেখছে!”
বন্যা বলল,
“আরিফ ভাই শেষমেশ মিমকে যেভাবে নিয়ে গেল… ওটাই ছিল আসল সেরা মুহূর্ত!”
মিম হেসে বলল,
“চুপ করো তো! সবাই দেখি আজ আমাকে নিয়ে পড়ে আছে।”
নাস্তার টেবিল যেন এক টুকরো স্মৃতির থালা।
নাস্তার পর আবির চুপচাপ উঠে গেল নিজের রুমে।
সবার ব্যস্ততা, হাসি-মজা—কিন্তু সে যেন একটু চুপচাপ।
আবির বিছানায় গিয়ে চুপ করে ল্যাপটপটা নিয়ে বসলো।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা— মেঘ হাতে কফির কাপ নিয়ে ঢুকল।
“আপনি কিছু বলছেন না কেন?”
আবির একটু চমকে তাকাল মেঘের দিকে।
“তোমার কথা শুনে ভাবছিলাম… এখন আমি কিছু বললেই নাকি ঢং মনে হবে।”
মেঘ হেসে কাপটা এগিয়ে দেয়।
আবির মেঘকে টেনে পাশে বসায়।
ধীরে ধীরে তার হাত ধরে।
“তুমি জানো মেঘ… তোমার মুখটা যখন হাসে, আমি পৃথিবীর সব যুদ্ধ জিতে যাই।”
মেঘ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে।
আবির মৃদু কণ্ঠে বলে—
“আজকের হলুদ সন্ধ্যায় তুমি সবচেয়ে কম করে সাজবে… যেন পুরো পৃথিবীর কেউ তোমার দিকে নজর না দেয়।”
মেঘ কাঁপা গলায় বলে—
“আপনি আছেন বলেই আমি জীবনটাকে সুন্দরভাবে উপভোগ করছি।”
দুজন কিছুক্ষণ চুপচাপ।
নিরবতা যেন ভালোবাসার ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।
🌼 বন্যা, মিম ও মেঘ একটা রুমে বসে হলুদ সন্ধ্যার প্ল্যানিং করছে। জান্নাত আর আইরিনও যোগ দিয়েছে ভিডিও কলে।
বন্যা বলল,
“আমার মনে হচ্ছে মিমকে গায়ে হলুদের সময় ছেলেরা মঞ্চে তুলে দেবে, কিন্তু আমাদের তরফ থেকেও একটা ডান্স পারফরম্যান্স থাকা উচিত!”
জান্নাত বলল,
“তাহলে একটা স্লো পারফরম্যান্স শিখিয়ে দাও মিমকে।”
মিম হেসে বলে,
“তোমরা একেকজন একটা নাটক! আমি তো টেনশনে আছি, আর তোমরা আমাকে নিয়ে গেম প্ল্যান করছো!”
আইরিন বলে,
“এটা বিয়ে? এটাই তো মজার সময়! পরে তো কাজই কাজ!”
সবাই একসাথে হেসে ওঠে।
বেলা যখন ১১ টা।
মালিহা খান, হালিমা খান, আকলিমা খান ও আরও কয়েকজন মায়েরা মিমকে ঘিরে বসেছেন।
আকলিমা বললেন,
“মিম, তোকে কোলে করে ঘুম পাড়িয়েছি একদিন… আজ তুই আমার চোখের সামনে শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছিস। বিশ্বাস হয় না রে মা।”
মিম চোখে জল চিক চিক করছে।
মালিহা খান হেসে বললেন,
“তবে মনে রাখবি, তুই যত বড়ই হোস না কেন… আমাদের জন্য তুই এখনও ছোট্ট সেই মিম।”
মিম চুপ করে, মাথা নিচু করে বসে রইল।
তার চোখে জল ঝরছে।
সেকেন্ড, মিনিট ,ঘন্টা। ধীরে ধীরে চলে আসলো সেই ক্ষণ।
স্পেরো ড্রিম হাউস আজ যেন রূপকথা!
বিকেল থেকে পুরো বাড়ি যেন রঙে রঙিন।
বড় বড় গাছের গায়ে লাল-হলুদ-কমলা কাপড়ের ঘুঙুর লাগানো ফিতার ঝুল।
ছাদ-বারান্দা-বাগানের প্রতিটা কোণে ফড়িংয়ের মত ছোট ছোট বাতি, হলুদের মালা আর ফুলে ভরা প্যান্ডেল।
প্রবেশ পথে বড় ফানুস আর টিউলিপ ফুলের তোড়া যেন বলে দিচ্ছে—
“এ বাড়িতে আজ ভালোবাসার হলুদ সন্ধ্যা।”
💛 বর-কনের পরিবারের ঝমকালো উপস্থিতি চারদিকের পরিবেশটা আরো মাতিয়ে তুলেছে।
মেয়েপক্ষ — মিমের পরিবারের
সব মেয়েরা একরঙা— হালকা কাঁচা হলুদের শাড়িতে নিজেদের রাঙিয়ে তুলেছে।
বড়রা হালকা হলুদ সুতির শাড়িতে, আর তরুণীরা সিল্ক বা জর্জেটের পাতলা শাড়িতে।
চুল খোলা, হাতে বেলি আর গাঁদার ফুলের বালা, কপালে ছোট্ট টিপ।
আর মিমের প্রবেশ
সবাইকে ছাপিয়ে যেন হলুদের রানী।
কাঁচা-হলুদ রংয়ের লেহেঙ্গা, কপালে ফুলের টিকলি, হাতে ফুলের বালা, খোঁপায় ফুলের মালা। মুখে তৃপ্ত, শান্ত, অনন্ত ভালোবাসার ছোঁয়া।
তার পাশে বন্যা, মেঘ, আইরিন, জান্নাত— সবার সাজ এক ই, কাঁচা হলুদের শাড়ি, খোলা চুলে ফুলের সাজ।
অন্যদিকে বরপক্ষ — আরিফের পরিবার ও কোন দিক থেকে কম নয়।
সব ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবি
শুধু স্পেশাল কয়েকজন যেমন; আবির, তানভীর, আসিফ, রাকিব, শাকিব, রাসেল, মোবারক— প্রত্যেকের গায়ে হলুদের পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা।
আরিফের উপস্থিতি আলাদা।
তাকে ঘিরে যেন একটা নরম আলো— সাদা আর হলুদের মিশেল।
খান পরিবারের তিন কর্তা:
আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান
তিনজন একসাথে বাড়ির সবচেয়ে বড় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে।
সাদা পাঞ্জাবি, পায়জামা— ছিমছাম ভদ্রবেশ।
সাথে আছে হলুদ পাঞ্জাবি পরুয়া আবির ,তানভীর ও আসিফ।
তাদের সৌজন্য, অভ্যর্থনায় অতিথিদের মনে পড়ে যাচ্ছে আগের দিনের অভিজাত বাড়ির আদব-কায়দা।
— “স্বাগতম, আমাদের কন্যার হলুদ সন্ধ্যায়…”
আবিরের কথা শুনে একজন অতিথি জবাব দিল: হুম “বাড়ি তো আজ আনন্দের ঘরে পরিণত হয়েছে।”
শুনে আবির মৃদু হাসলো।
গেস্টরা সোজা প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে মিউজিক, খাবারের গন্ধ আর ফুলের সুবাসে পুরো পরিবেশ জমে আছে।
🌟 হঠাৎ করেই একটা সাদা গাড়ি এসে থামল বাড়ির গেটের সামনে। আবির মুচকি হেসে এগিয়ে গেল। সেই গাড়ি থেকে নামলো:
(চট্টগ্রামের এমপি নিহালের ছেলে ও পুত্রবধু): রিদ খান ও মায়া।
সাথে ছেলে মারিদ আর মেয়ে সুখ।
রিদ ফরমাল সাদা পাঞ্জাবি-পাজামায়, মায়া হলুদ রঙা জামদানি শাড়ি আর হলুদের গয়নায় অপরূপা।
সাথে মারিদ পড়েছে বাবার সাথে মিলিয়ে সাদা পাঞ্জাবি আর সুখ পাতলা হলুদ ফ্রক, হাতে ফুল।
আবির রিদ খানের দিকে হাত বাড়ি দিয়ে বলল: ওয়েলকাম মাই ড্রিম হাউস। রিদ খান মুচকি হাসলো।
তানবির ওদের উদ্দেশ্যে বলল: আপনার প্লিজ আমার সাথে ভেতরে চলুন।
🔹 তারপরে আরেকটা গাড়ি থেকে নামতে দেখা গেল ওয়াসিফ পূর্ব ও পূর্ণতা।
ওয়াসিফ সাবেক রাজনীতিবিদ, বর্তমান বিজনেস আইকন। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি।
পূর্ণতা ঘিয়ারঙা কাতান, হাতে সোনালী ফুলের বালা। সৌম্য অথচ স্পষ্ট উপস্থিতি।
ওদের ভিতরে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই এত অতিথি মাঝে লক্ষ করা গেল গেটের বাহিরে একটা ব্লক মার্সিডিস এসে থেমেছে। আসিফ সঙ্গে সঙ্গেই আবিরকে খবর দিল। আবির এগিয়ে যেতেই দেখল: ইতিমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে🔹 জায়ান কৃতিক চৌধুরী ও মিসেস অরোরা জায়ান, আর তাদের সাথে আছে মেয়ে কিয়ারা জায়ান চৌধুরী
কৃতিক ব্ল্যাক শার্ট ও ব্লাক পেন্টে নিজেকে ফরমাল ড্রেসে সাজিয়ে নিয়েছে, অরোরা জায়ান বিদেশি স্টাইলের শাড়ি আর কিয়ারা আধুনিক স্কার্ট।
আবির যখন কৃতিক কে স্বাগতম করায় ব্যস্ত তখনই এসে থামল দেশ বিখ্যাত উকিল মেহজাবিন আরমিন অন্তুর গাড়িটি ।
গাঢ় হলুদ শাড়ি, পল্টু ফুলের মালা হাতে। ঘোমটা সামান্য তুলে দাঁড়িয়ে আছেন মেহজাবিন।
তার পরপরই উপস্থিত হলেন ফারাজ এলাহী ও চিত্রাঙ্গনা।
ফারাজ ক্রিম পাঞ্জাবি, চিত্রাঙ্গনা উজ্জ্বল হলুদ শাড়ি, অনিন্দ্য সুন্দর।
আবির একে একে সকলকে নিয়ে তাদের জন্য বরাদ্দ স্থানে বসিয়ে দিল।
হঠাৎ স্টেজ অন্ধকার। ফোকাস লাইট একদম মাঝখানে। ব্ল্যাক জ্যাকেট পড়ুয়া একজনকে হাতে গিটার সহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।
🎤 VK (Vampire Kenneth) | স্পেশাল এন্ট্রি,
তার চোখ-মুখের ক্যারিশমায় শিস পড়ে উঠছে… বিশেষ করে কিশোরী মেয়েরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
🎵 ভি.কের কণ্ঠ— “ভ্রমর কইয়ো গিয়া” শুরু।
পুরো গানটা:
> “ভ্রমর কইয়ো গিয়া
শ্রীকৃষ্ণ বিহনে মোর অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে ভ্রমর
কইও গিয়া”
মাঝে মাঝে সবার করতালি, সবার মুখে তৃপ্তির হাসি।
কে যেন বলল—
— “ওমাইগড! ভাইরাল ভ্যাম্পায়ার লাইভ গান করছে!!”
গানের শেষে ভি.কে হাসিমুখে স্টেজ থেকে বলল—
— “আজ মিম আর আরিফের জন্য রইল আমার স্পেশাল ভালোবাসা, সুখে থাকুক একজোড়া লাভ বার্ড”
আইরিন পুরো অনুষ্ঠান চালাচ্ছে প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিতে।
— “আজকের হলুদ সন্ধ্যা, সবার জন্য… স্পেশাল গেম, স্পেশাল মজা, স্পেশাল নাচ।”
হঠাৎ… দর্শকের ভেতর থেকে একটা ছেলে উঠে এল।
সাদা পাঞ্জাবি, দুষ্টু হাসি মুখে। বলল:
— “আজ আমি তোমার পার্টনার হবো।
আইরিন হঠাৎ চমকে গিয়ে বলল: আমি কি চেয়েছি কোন পার্টনার?
ছেলেটি দারুন হেসে জবাব দিল: না চাইলেই কী… আমার ইচ্ছে।”
আইরিন চোখ রাঙিয়ে বলল—
— “আপনি তানভীর ভাইয়ের কাজিন রাদিফ না? আপনি প্লিজ জায়গায় গিয়ে বসেন”
ছেলেটি আবারো হেসে হেসে জবাব দিল
— “আপনি দাঁড়ালে আমি কীভাবে বসি বলুন তো…?”
সবাই হেসে উঠল।
আইরিন ফিসফিস করে বলল— “প্লিজ আমাকে শান্তিতে আমার কাজ করতে দিন”
রাদিফ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল—
— “এত শান্তি থাকলে অনুষ্ঠান তো মাটি হয়ে যাবে মিস…!”
আইরিন রাগে কটমট করে জবাব দিল: আইরিন.. আইরিন আমার নাম।
আইরিন লক্ষ্য করল। নিচ থেকে সবাই স্টেজে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তাই নিজের রাগটাকে গিলে মুখে কৃত্তিম হাসি টেনে আবারও পুরো অনুষ্ঠান হোস্ট করা শুরু করল।
স্পেরো ড্রিম হাউস যেন অদ্ভুত এক ভালোবাসার পট।
একদিকে অতিথিরা, অন্যদিকে নাচ-গান, আর মাঝখানে বর-কনের হাসিমুখ…
এই হলো আজকের হলুদ সন্ধ্যা।
স্টেজে প্রথম উঠলো মিমের বান্ধবীদের টিম।
গান—
“Navrai Majhi” (নববধূর জন্য মজা করে নাচের গান)
হাসিমুখে, হলুদের সাজে সবাই একে একে উঠে এসে দুলতে দুলতে নাচ শুরু করলো—
“Navrai majhi, laadachi ladachi ga…”
গানের মাঝখানে এসে বান্ধবীরা মিমকে মাঝখানে দাঁড় করালো, চারপাশ ঘিরে দুষ্টু নাচ, হাসি, ঠাট্টা।
দ্বিতীয় নাচ— ছেলেপক্ষের পক্ষ থেকে।
সাউন্ড বক্সে বেজে উঠলো:
“Tunak Tunak Tun”
আরিফের সকল বন্ধু মিলে পুরো কমেডি স্টাইলে নাচ।
মঞ্চে তুমুল হাসি-ঠাট্টা।
> “Tunak tunak tun… tunak tunak tun… tun ta ra!”
সবার নাচ দেখে মিম, বন্যা, মেঘ, আইরিন হাসতে হাসতে চোখে জল।
কিন্তু এত কিছুর মাঝে আবির ও মেঘের দুষ্টু-মিষ্টি চোখাচোখি, আবির বারবার মেঘকে ইশারা করে ডাকছে আর মেঘ মেয়ে বাহিনীর পুরো টিমকে ছেড়ে যেতে নারাজ।
বন্যা, আইরিন মুখ টিপে হাসছে।
আইরিন বললো—
— “আবির ভাই, বউ কি শুধু তোমারই আছে…!”
আবিরের অকপটে জবাব— “জ্বী তাতে তোর সমস্যা কি!
আইরিন দুষ্টু হেসে বলল: দুই বাচ্চার মা হয়ে গেছে।”
এবার আবির থমথমে মুখে বলল— “ তাতে কি ভালোবাসা কমে গেছে?”
সবাই হেসে ফেলে।
মেঘ লজ্জা পায়, আবির কানে ফিসফিস করে বলে—
— “তোর লজ্জায় আমি হারি প্রতিবার প্রতিক্ষণে…”
হঠাৎ মাইকে আবার আইরিনের কন্ঠ: এবার হবে
🎶 স্পেশাল পারফর্মেন্স— আদির “আমি হলাম রোমিও”
আবির অবাক চোখে পাশে তাকিয়ে দেখল আইরিন নেই। খানিকটা হতভম্ভ হয়ে বলল: এই মেয়েতো মাত্রই এখানে ছিল..
স্টেজে উঠে এলো আদি। ব্ল্যাক জ্যাকেট, দুষ্টু হাসি মুখে।
মিউজিক বাজতেই আদি নাচ শুরু করলো”
“আমি হলাম রোমিও,
লেডি কিলার রোমিও।
পাক্কা প্লেবয় রোমিও ”
পুরো বাড়ি হাততালি, আহিয়া, আহিয়ান, তৃধা, সুখ, মারিদ… সবার নাচ দেখছে আবার হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছে।
কিয়ারা, রাকিবের ছেলে, মাইসার ছেলে আর জান্নাতের মেয়ে এসে যোগ দিলো খেলায়।
গতকাল মেহেন্দি অনুষ্ঠানে মাইসা থাকতে না পারলেও আজ বিকেলেই স্বামী সন্তান নিয়ে এসেছে স্প্যারো ড্রিম হাউজে। এসে সবার আনন্দ দেখে বারবার বলছে গতকালকে না এসে অনেক বড় একটা মিস্টেক করে ফেলেছে।
বাচ্চাগুলো কখনো বল ছুঁড়ে মারছে, কখনো ওড়না টেনে দিচ্ছে, কখনো দৌড়ে গিয়ে বন্যা বা মেঘের কোলে লাফিয়ে উঠছে।
পুরো বাড়িতে হৈচৈ।
🌿 হলুদ মাখানোর সময়…
এক এক করে সবাই মিম আর আরিফের সামনে এসে দাঁড়ালো।
কাঁচা হলুদে ভেজানো পাতা হাতে…
প্রথমে বাড়ির বড়রা—
মা, চাচি, খালা, বড় আপা, দাদি…
স্নেহভরা ছোঁয়া দিয়ে বলছে—
— “আল্লাহ তোদের মঙ্গল করুক… সারা জীবন যেন এমনই হাসিখুশি থাকিস।”
চোখের কোণে আবেগ ঝিকমিক করছে।
💛 তারপর বান্ধবীরা আসছে এক এক করে…
তাহা বলল:
— “তোকে তো আজকের জন্য কাঁচা হলুদের রানী বলে ডাকবো!”
নুসরাত বলল:
— “আরিফ ভাই আপনার তো অনেক সৌভাগ্য… এমন বউ তো অন্য কোথাও নেই।”
এবার তামান্না হাসিমুখে বলল:
— “মিম, এই হাসি যেন সারা জীবন থাকে।”
সবাই মিমের গালে হলুদের ছোঁয়া দিয়ে হাসছে।
এদিকে মেঘ বারবার কাকে যেন কল দিয়ে যাচ্ছে। আমি লক্ষ করতেই এদিকে এগিয়ে এলো।
জিজ্ঞেস করল: কি সমস্যা? এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
মেঘ একটু মন খারাপ করে বলল: তামিম ও মিনহাজকে কল দিয়েছিলাম। ওরা বলছে আগামীকাল আসবে। ওদের কত করে বললাম… ভাবিদের নিয়ে আজকের হলুদ সন্ধ্যায় এটেন্ড কর। কিন্তু শয়তানগুলা কথা শুনল না। বারবার একটা কথাই বলছে আগামীকাল আসবে।
আমি স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল: ওহ.. ঠিক আছে এতে মন খারাপ করার কিছুই নেই। চলো ওই দিকে যাই।
🌸 এবার স্পেশাল গেস্টরা মিমের কাছে এলো:
পূর্ণতা বলল:
— “তোমায় দারুণ লাগছো। একজন নারীর জীবনে এই হলুদ সন্ধ্যা যেন সবসময় আশীর্বাদের প্রতীক হয়।”
মিমের এক গালে হলুদ ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে অরু বলল:
— “চোখের এই দীপ্তি সারা জীবন থাকুক, জীবনে যেন সব সুখ পাও।”
এবার অন্তু অন্য গালে হলুদ ছোয়াতে ছড়াতে বলল:
— “ভালোবাসা মানেই শ্রদ্ধা, তুমি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেটা গর্বের।”
পেছন থেকে মায়া এসে মিমের মাথায় হাত রাখল। তারপর ভালবাসার কন্ঠে বলল:
— “আজ আমি কেবল অতিথি নই, বড় বোনের মতো বলি— সুখী থাকিস।”
সবাই হাততালি দিচ্ছে। আহিয়া, আহিয়ান, তৃধা, সুখ, মারিদরা এসে মিমের সাথে বসলো।
তৃধা ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলল—
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮৩+৮৪+৮৫
— “মিম ফুপি, তুমি রাজকন্যা আজ।”
আহিয়া বললো—
— “আর আরিফ চাচ্চু হবে রাজা।”
মিমের মুখে হাসি, চোখে জল। আরিফ পাশ থেকে বললো—
— “এখন থেকে শুধু তুই
ও আমি… আর আমাদের এই ভালোবাসা।”
পেছনে বাজছে হালকা মিউজিক—
🎵 “Mehendi hai rachnewali… haathon mein gehri laali…”
হলুদ সন্ধ্যা শেষ…
কিন্তু এই ভালোবাসা যেন শুরু হলো নতুন করে।
