ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১০
নওরিন কবির তিশা
সন্ধ্যা নামতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন অভূতপূর্ব এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে পুরো চত্বর ঘেরাও করে ফেলেছে। স্বয়ং ডিআইজি তাহের চৌধুরী এবং এসপি রুদ্রদ্বীপ সিনহা বিশাল পুলিশ ফোর্স নিয়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। এহেন হুলস্থূল কাণ্ডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার খান প্রচণ্ড রেগেমেগে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। ওনার মতো বাঘা মন্ত্রীর বাড়ি পুলিশ দিয়ে ঘেরাও করার ধৃষ্টতা দেখে ওনার চোখ-মুখে ক্রোধ ঠিকরে বেরোচ্ছে। বজ্রকণ্ঠে এক চূড়ান্ত হুঙ্কার ছাড়লেন উনি,,
— হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন হেয়ার? তাহের চৌধুরী, তোমার এত বড় সাহস! পুলিশ নিয়ে আমার বাড়ি ঘেরাও করেছ? কোন আইনের বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে পা রাখার স্পর্ধা হলো তোমার?
আনোয়ার খানের সেই সিংহগর্জনে চারপাশের সাধারণ কনস্টেবলরা কিঞ্চিৎ দমে গেলেও তাহের চৌধুরী একচুলও নড়লেন না। মেয়ের শোকে এবং ক্ষোভে ওনার পিতৃসত্তায় আগ্নেয়গির উত্তপ্ত লাভা ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি এক পা এগিয়ে এসে চোয়াল শক্ত করে অত্যন্ত কঠোর স্বরে বললেন,,
— আইনের কথা আমার মুখে শুনবেন না, আনোয়ার খান! আপনার ওই কুলাঙ্গার ছেলে প্রকাশ্য দিবালোকে আমার বাড়ি থেকে আমার মেয়েকে তুলে এনেছে। ক্ষমতার দম্ভ অনেক দেখিয়েছেন, আর নয়। এক্ষুনি আমার তিয়াশাকে আমার সামনে এনে দাঁড় করান, নইলে এই বাড়ি সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গুঁড়িয়ে দিতে আমি বাধ্য হবো!
পাশে দাঁড়িয়ে এসপি রুদ্রদ্বীপ সিনহাও ওনার গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর নিবদ্ধ করে রাখল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আনোয়ার খান কিছু বলতে যাবেন, ঠিক তখনই সবার নজর চলে গেল দোতলার বিশাল রাজকীয় সিঁড়ির দিকে। সেদিক থেকে অত্যন্ত ধীর পায়ে নিচে নেমে আসছে তিয়াশা। নীল রঙের সেই জামদানি শাড়িটা ওর অঙ্গে জড়ানো, অথচ অবিন্যস্ত। চোখের কোণে কান্নার জল শুকিয়ে এক অদ্ভুত অসাড়তা গ্রাস করেছে ওর মুখশ্রীকে। নিজের আদরের মেয়েকে এমন বিধ্বস্ত ও শাড়ি পরিহিত অবস্থায় পরপুরুষের বাড়িতে দেখে তাহের চৌধুরীর বুকটা এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ওনার চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে উঠল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রদ্বীপও ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল তিয়াশার এই রূপের পানে। ওর ভেতরের পুরুষালি সত্তা আর কর্তব্যবোধ এক লহমায় তিয়াশার এই অসহায়ত্বের তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। তাহের চৌধুরী তড়িঘড়ি করে সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গিয়ে মেয়ের হাত দুটো ধরে ব্যাকুল গলায় বললেন,,
— মা ! আমার মা তুই! কোনো ভয় নেই রে মা, তোর বাবা এসেছে। চল আমার সাথে, এই জাহান্নাম থেকে তোকে আমি নিয়ে যেতে এসেছি। চল মা!
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিয়াশা নিজের হাতটা বাবার মুঠো থেকে আলতো করে ছাড়িয়ে নিল। ও মাথা নিচু করে অত্যন্ত নিষ্প্রাণ, শান্ত কণ্ঠে বলল,,
— আমি যাব না, বাবা। আমি ওনার সাথেই থাকব। তোমরা চলে যাও।
মেয়ের মুখ থেকে এমন অবিশ্বাস্য কথা শুনে তাহের চৌধুরী যেন আকাশ থেকে পড়লেন। জড়িয়ে আসা কণ্ঠস্বর বড্ড প্রকম্পিত শোনালো,,
— মানে? কী বলছিস তুই টিয়া? ও তোকে জোর করে এনেছে! তোকে কি কোনো ভয় দেখানো হয়েছে? কোনো ব্ল্যাকমেইল করছে ও? তুই সত্যিটা বল মা, তোর বাবা বেঁচে থাকতে তোর কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না!
ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে ভেসে এলো সেই চেনা, পৈশাচিক ও শ্লেষাত্মক অট্টহাসি। আরাভ খান দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে, ঠোঁটে এক কামড় চুইংগাম চিবোতে চিবোতে অত্যন্ত আয়েশী ভঙ্গিতে নিচে নেমে এলো। ও এসে তিয়াশার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে একখানা মালিকানাসূচক হাত রেখে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে রুদ্রদ্বীপ আর তাহের চৌধুরীর দিকে চেয়ে বলল,,
— আরে অফিসার সাহেবরা! ঘটনা তো বহুত ঘটাইলেন, অনেক তো ড্রামা হলো! এবার শান্ত হয়ে যান। দেখছেন না বউ নিজের ইচ্ছায় আমার সাথে থাকতে চাচ্ছে? আসলে ওরে তো আমি সোহাগ একটু কম করি নাই, জামাইয়ের আদর পেয়ে বউ তো এখন আমার সাথেই থাকব। নাকি সুইটহার্ট?
আরাভের এই চরম উগ্র ও নোংরা কথাবার্তায় রুদ্রদ্বীপের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে পিস্তলের বাটের ওপর চলে গেল। ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভাঙলেও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে তীক্ষ্ণ তলোয়ারের ন্যায় ধারালো কন্ঠে ও বলল,,
— আরাভ খান, সীমা ছাড়িয়ে যেও না। আইন সবার ওপরে। আর তুমি যে বউ বলছ, তোমাদের তো এখনো আইনি বা ধর্মীয় কোনো বন্ধনই তৈরি হয়নি। তোমার এই বানোয়াট মিথ্যে আর ক্ষমতার দাপট বেশিক্ষণ টিকবে না!
আরাভ এবার সশব্দে হেসে উঠল, যেন কোনো বিশাল কৌতুক শুনছে। যেন খুব মজা পাচ্ছে রুদ্রদ্বীপের এই নৈতিক জ্ঞান শুনে। হাসি থামিয়ে আরাভ পকেট থেকে ফোনটা বের করে রুদ্রদ্বীপের চোখের সামনে মেলে ধরল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে তিয়াশা আর আরাভের বিয়ের কিছু ছবি, যেখানে তিয়াশা স্পষ্ট কাবিন নামায় স্বাক্ষর করছে।আরাভ ওষ্টাধর প্রান্তে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,
— আরেহ আরেহ এসপি, চশমাটা নেওয়ার সময় হয়েছে? এই যে দেখুন, আমাদের বিয়ের দলিল আর ছবি। সব অরিজিনাল! এখন তো আর বানোয়াট বলার উপায় নেই, তাই না?
রুদ্রদ্বীপ আর তাহের চৌধুরী হতভম্ব হয়ে ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিয়াশা প্রস্তরমূর্তির ন্যায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে, ওর চোখের পলকও পড়ছে না। আরাভ এবার তিয়াশার কোমরটা নিজের বাহুবন্ধনে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল, ফুরফুরে মেজাজে বলে উঠল,
— এবার তো বুঝলেন? শখ করে বিয়েটা সেরে নিয়েছি, তাই এখন বউকে আমার কাছেই থাকতে দিন। আপনাদের মতো মানুষেরা তো শুধু কাগজ কলম নিয়েই থাকেন, আসল সুখটা আপনাদের কপালে নেই!
আরাভের এহেন আচরণে রাগে কাঁপছে রুদ্রদ্বীপের সর্বাঙ্গ। ও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তিয়াশার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তিয়াশা, তুমি কি এখনো আমাদের সাথে যেতে রাজি নও? এখনো সময় আছে, আমাদের সাথে চলো।
তিয়াশা ধীরপায়ে আরাভের আরও কাছে সরে গেল; বাবার দিকে তাকিয়ে মলিন স্বরে বলল,
— বাবা, আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে ফেলেছি। তোমরা প্লিজ চলে যাও। এখানে দাঁড়িয়ে আর কোনো দৃশ্য তৈরি করো না।
তাহের চৌধুরী আর রুদ্রদ্বীপ জানতেন, তিয়াশাকে এখন জোর করে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো আইনি ভিত্তি তাদের হাতে নেই, কারণ আরাভ ধূর্ততার সাথে সমস্ত প্রমাণ তৈরি করে রেখেছে। তাহের চৌধুরীর দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু মেয়ের এই জেদের কাছে ওনাকে আজ পরাজয় স্বীকার করতেই হলো। রুদ্রদ্বীপ এক জোড়া জ্বলন্ত দৃষ্টি আরাভের ওপর নিক্ষেপ করে ঘুরে দাঁড়াল। আরাভ খান বিজয়ের হাসি হেসে তিয়াশার চুল নিয়ে খেলা করতে করতে বলল,
— গুড ডিসিশন সুইটহার্ট! অফিসার সাহেবরা, রাস্তা ক্লিয়ার করুন, আমার বউয়ের আজ মুড ভালো না।
বিশাল পুলিশ বাহিনীর মাঝ দিয়ে, চরম অপমানের গ্লানি আর অসহায়ত্ব নিয়ে রুদ্রদ্বীপ আর তাহের চৌধুরী বাধ্য হলেন ফিরে যেতে। ওরা চলে যেতেই এতক্ষণের শীতল সিংহিনীর নিজের আসল হিংস্র রূপে প্রত্যাবর্তন করল। ঝটকা মেরে আরাভের অধিকারপূর্ণ বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ধুপধাপ পা ফেলে দোতলার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো ও।
আরাভ ওর এই আকস্মিক দুরত্বে ওষ্টাধর প্রান্তে বক্র, কুৎসিত হাসিটা ঝুলিয়ে রেখেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। তিয়াশা যত দ্রুত ওপরে উঠছিল, আরাভও চুইংগাম চিবোতে চিবোতে ওর পিছু পিছু যাচ্ছিল,,
— ও বউ! শুনছ? এত রাগ কিসের শুনি? সুইটহার্ট, একটু আস্তে চলো, পড়ে যাবে তো!
তিয়াশা পেছনের ডাক অগ্রাহ্য করে নিজের গতি আরও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু আরাভের ডাক থামল না। ও যেন এই খেলায় পরম আনন্দ পাচ্ছে। ও সিঁড়ির রেলিংয়ে হাত বুলিয়ে আরও চড়া সুরে, শিস দেওয়ার ভঙ্গিতে ডাকতে লাগল,,
— ও আমার জানেমান! সোনা পাখিটা আমার! জামাইকে এভাবে ফেলে একলা একলা ঘরে চলে যাচ্ছ? একটু তো পেছন ফিরে তাকাও, রূপের আগুন তো বড্ড ছড়াচ্ছ আজ!
আরাভের এই নোংরা, সস্তা সম্বোধনগুলো তিয়াশার কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছিল। ও নিজের কান দুটো চেপে ধরে আরও দ্রুত গতিতে ওপরে ছুটে গেলো।
তিয়াশা চলে আসার খানিক পর আরাভ দীর্ঘ কদমে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে নিজের রুমের দরজায় ধাক্কা দিতেই দেখল দরজাটা খোলাই আছে। কিন্তু রুমের ভেতর তিয়াশা নেই, বরং এটাচড ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে। আরাভ বাঁকা হেসে ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় নক করে শ্লেষাত্মক গলায় বলল,
— কী বউ? রাগ ভাঙার জন্য এত রাতে গোসল করা হচ্ছে? দরজাটা খোলো, একলা একলা ভালো লাগছে না।
ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ এলো না। পানির শব্দটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু তিয়াশা কোনো উত্তর দিল না। আরাভ এবার একটু বিরক্ত হয়ে দরজার হ্যান্ডেল ধরে বেশ কয়েকবার ঝাঁকালো,,
— তিয়াশা! ফাজলামো ভালো লাগছে না কিন্তু। দরজা খোলো, নইলে আমি লাথি মেরে দরজা ভাঙতে বাধ্য হবো।
তবুও নিস্তব্ধতা। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আরাভের ভেতরের সন্দেহ আর রাগের পারদ চড়চড়িয়ে বৃদ্ধি পেল। ও আর সময়ক্ষেপণ না করে সজোরে একটা লাথি মারল ওয়াশরুমের দরজায়। ছিটকিনিটা এক আঘাতেই মট করে ভেঙে গেল।
আরাভ বিজয়ের হাসি হেসে যেমনই এক পা ভেতরে বাড়াল, অমনি ওর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল! ফ্লোরে পা রাখতেই তীব্র গতিতে পা পিছলে গেল ওর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিকট শব্দে ধড়াম করে ও শক্ত টাইলসের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। পিঠ আর কোমরে তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়তেই আরাভ মুখটা সামান্য কুঁকড়ে ব্যাথায় একটা গোঙানির মতো শব্দ করে উঠল,
— আহহ্! শিট!
কোমরের ব্যথাটা সামলে ও যেই না চোখ তুলে তাকাল, ওখানেই থমকে গেল। সামনেই শাওয়ারের পাশে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাত বুকের ওপর ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে তিয়াশা। ঠোঁট কার্নিশে এক চিলতে পৈশাচিক, শয়তানি হাসির রেখা স্পষ্ট। আর ফ্লোর জুড়ে লেপ্টে আছে দামী বডি ওয়াশের পিছল ফেনা। তিয়াশা যে ইচ্ছাকৃত-ই সমগ্র মেঝেতে বডি ওয়াশ ঢেলে রেখেছিল,তা ওর দর্শনেই স্পষ্ট।আরাভ নিজের মেজাজকে কোনোমতে নিয়ন্ত্রণে রেখে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— কী হলো এটা? এই নোংরা ফাজলামোর মানে কী তিয়াশা?
তিয়াশা ওর দিকে এক কদম এগিয়ে এসে সেই শয়তানি হাসিটা বজায় রেখেই তীব্র উপহাসের সুরে বলল,
— কেন মিস্টার আরাভ খান? শয়তানি কি শুধু আপনি একাই পারেন? ভেবেছিলেন প্রকাশ্য দিবালোকে আমাকে তুলে এনে, জোর করে সই করিয়ে, বাবাকে খুন করার হুমকি দিয়ে আর দশটা অবলা নারীর মতো আমাকে সংসারী বানাবেন? হাত জোড় করে আপনার সেবা করব? ভুল ভেবেছেন। এখন থেকে প্রতি মুহূর্তে আমার দেওয়া বিষাক্ত জ্বালায় জ্বলতে শুরু করুন। ওয়েলকাম টু হেল, মিস্টার আরাভ খান!
কথাটা শেষ করেই তিয়াশা অহংকারী ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতে উদ্যত হতেই তীব্র আরাভ পিঠের ব্যথা অগ্রাহ্য করে ও চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় শোয়া থেকে এক ঝটকায় উঠে বসল। তিয়াশা দরজার চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই আরাভ পেছন থেকে ওর হাতটা ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারল। তিয়াশা সামলাতে না পেরে ছিটকে এসে পড়ল সরাসরি আরাভের শক্ত, চওড়া বুকের ওপর।
আরাভের এক হাত মুহূর্তের মধ্যে তিয়াশার কোমরে সাপটানো বাঁধন তৈরি করল, আর অন্য হাত দিয়ে ও তিয়াশার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। আরাভ ওর চোখের খুব কাছে নিজের মুখটা এনে তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে পুরুষালি, গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো সুইটহার্ট, বাঘকে খাঁচায় বন্দি করলেও সে বিড়াল হয়ে যায় না। খেলাটা তুমি শুরু করেছ ঠিকই, কিন্তু শেষটা আমি আমার মতো করেই করব।
তিয়াশা ওর বুক থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে বলল,
— ছাড়ুন, ছাড়ুন আমাকে! আপনার এই নোংরা ছোঁয়া সরাতে বলছি আরাভ!
আরাভ ওর ছটফটানিকে পাত্তাই দিল না, বরং তিয়াশার অবিন্যস্ত চুলের সুবাস টেনে নিয়ে ওর গলার একদম কাছে মুখটা গুঁজে দিল। তিয়াশার শরীরটা এক লহমায় শক্ত হয়ে গেল। আরাভ ওর গলার নরম ত্বকে নিজের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
— এত সহজে ছাড়ার জন্য তো এত বড় রিস্ক নিইনি, বউ। তোমার এই রূপের আগুন আর জেদ— দুটোই আজ আমার বড্ড চেনা লাগছে। বিষ তুমি যত দেবে, আমি ততটাই নেশার মতো তা শুষে নেব। দেখি, তোমার জেদ জেতে নাকি আমার এই অধিকার!
আরাভের সেই গভীর, রোমাঞ্চকর কণ্ঠস্বর আর গলার কাছে ওর উষ্ণ নিঃশ্বাসের তীব্রতায় তিয়াশার ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ যেন ক্ষণিকের জন্য অবশ হয়ে আসতে লাগল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে শুরু করলো,হাপরের ন্যায় উঠানামা করছে বুকটা, অবাধ্য হৃদস্পন্দন সব মিলিয়ে বেহাল দশা। এদিকে তিয়াশার এই বেগতিক অবস্থা দেখে আরাভের ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিভরা হাসির রেখা ফুটে উঠল। ও এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না।
আরাভ ওর গলার কাছ থেকে মুখটা সামান্য সরিয়ে তিয়াশার লাল হয়ে যাওয়া কানের লতির কাছে ফিসফিস করে বলল,
— কী হলো বউ? বাঘের খাঁচায় আগুন দিতে এসে নিজেই দেখি গরমে গলে যাচ্ছো? হার্টবিট তো একদম ডিজে গানের মতো বাজছে!
তিয়াশা নিজের অবশ ভাবটা কাটিয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করে রেগেমেগে আরাভের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
— অসভ্য,ইতর, বদমাইশ। সস্তা লোক, ছাড় নাহলে…!
আরাভ তিয়াশার কোমরটা আরও একটু টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,
— সস্তা? আরে, কোটি টাকা খরচ করলেও এমন হ্যান্ডসাম বরের ফ্রি রোমান্স কেউ পাবে না। আর তুমি তো মাত্র একটা বডি ওয়াশ খরচ করেই এত কিছু পেয়ে গেলে! বাই দ্য ওয়ে, চয়েস ভালো… বডি ওয়াশের স্মেলটা দারুণ!
তিয়াশা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
— হাস, আরও হাস! মনে রাখিস, আজকের এই আছাড়টা জাস্ট ট্রেইলার ছিল। পুরো সিনেমা এখনো বাকি !
আরাভ এবার তিয়াশার চোখের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে হেসে বলল,
— ট্রেইলার তো বেশ হিট সুইটহার্ট! তবে কোমরের যা অবস্থা করেছ, ফুল সিনেমা দেখার আগে আমাকে মনে হয় কোনো ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য, ঘরের ডাক্তার যদি এমন কিউট হয়, তাহলে আমি রোজ আছাড় খেতে রাজি!
তিয়াশা এবার মরিয়া হয়ে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দু পা পিছিয়ে গেল। ও নিজের ওড়নাটা টেনে ঠিক করতে করতে কড়া গলায় বলল,
— মুখ সামলে কথা বলুন! আপনার মতো ফ্লার্টবাজকে শায়েস্তা করার ওষুধ আমার জানা আছে।
আরাভ ফ্লোরে ওভাবেই আধশোয়া হয়ে এক হাত মাথায় ঠেকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
— ওষুধ পরে দিয়ো বউ, আপাতত একটু হাতটা বাড়িয়ে তোমার এই জখমি বরটাকে টেনে তোলো? নাকি এখানেই রোমান্সটা কন্টিনিউ করবে?
তিয়াশা একটা চরম বিরক্তিকর রূপে ওয়াশরুমের বাইরে পা বাড়িয়ে বলল,
— ওখানেই পচে মর শয়তান! আমার বয়েই গেছে তোকে তুলতে!
এতক্ষণ যাবৎ মগ্ন থাকায় তিয়াশার ‘তুই’ সম্বোধনটা হয়তো কর্ণ-কুহরে পৌঁছায়নি আরাভের। তবে এতক্ষণে এমন নিজ সম্বোধনটা শ্রবণগোচর হতেই আরাভের ঠোঁটের কোণের দুষ্টুমিভরা হাসিটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। এতক্ষণ তিয়াশাকে রাগানোর জন্য যে ঢংটুকু ও ধরেছিল, তা এক ঝটকায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ও এক ঝটকায় ফ্লোর থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল—কোথাও কোনো ব্যথার লেশমাত্র নেই!
আছাড়টা জোরে লাগলেও আরাভের মতো সুগঠিত ও শক্তপোক্ত শরীরের ছেলের জন্য ওটা তেমন কিছুই ছিল না, ও জাস্ট তিয়াশাকে কাছে টানার জন্য জখম হওয়ার নাটক করছিল। কিন্তু তিয়াশার মুখ থেকে তুই-তোকারি শুনে ওর ইগোতে চরম আঘাত লাগল। আরাভ দীর্ঘ কদমে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে এক লহমায় তিয়াশার পথ আগলে দাঁড়াল। ওর অবয়বে এখন আর কোনো ফ্লার্টের ছোঁয়া নেই, বরং এক আদিম ও গম্ভীর পুরুষালি মেজাজ ভর করেছে। ও তিয়াশাকে ড্রেসিং টেবিলের দিকে চেপে ধরে অত্যন্ত নিচু, ধারালো কণ্ঠে বলল,,
— কী বললি? আবার বল! তুই? এত বড় সাহস তোর, তুই আমারে তুই-তোকারি করস? শোন তিয়াশা, আদর দিয়ে মাথায় তুলছি দেখে নিজেকে বড্ড বেশি চালাক ভাবিস না। তুই আমারে বিষ দিবি, আছাড় দিবি,সব আমি হাসিমুখে সহ্য করব। কারণ এই আরাভ খান তোকে ভালোবাসে। কিন্তু নিজের লিমিট ক্রস করিস না। আমি যেমন তোরে নিজের কলিজায় স্থান দিতে পারি, তেমনই এক সেকেন্ডে তোরে ওই ফ্লোরে আছাড় মারার ক্ষমতাও রাখি।
তিয়াশা ড্রেসিং টেবিলের কাঠে পিঠ ঠেকে গেলেও একচুলও দমল না। ও আরাভের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে তীব্র অহংকারের সাথে বলল,,
— লিমিটের কথা আপনি আমাকে শেখাবেন না, মিস্টার আরাভ খান! যে মানুষটা নিজের ক্ষমতার জোরে একটা মেয়েকে তুলে আনতে পারে, তার জন্য তুই সম্বোধনটাও বড্ড বেশি সম্মানজনক। আমি আপনাকে ঘৃণা করি, আর আমার এই ঘৃণা প্রতি মুহূর্তে আপনার এই অহংকারকে চূর্ণ করবে।
আরাভ কয়েক মুহূর্ত তিয়াশার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই ওর রাগটা আবার এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসিতে রূপ নিল। ও তিয়াশার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৯
— ঘৃণা? দারুণ চিজ সুইটহার্ট! ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণার টান অনেক বেশি স্ট্রং হয়। তুই যত বেশি আমারে ঘৃণা করবি, তত বেশি প্রতিটা সেকেন্ড শুধু আমার কথাই ভাববি। সো, ওয়েলকাম টু মাই লাইফ, বউ! রাত অনেক হইছে, এবার শান্ত হয়ে ঘুমাও। কাল থেকে আমাদের এই নরকের আসল খেলা শুরু হবে।
বলেই আরাভ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, নিজের অবিন্যস্ত শার্টের বোতামগুলো ঠিক করতে করতে বেলকনির দিকে চলে গেল একটা সিগারেট ধরাবার জন্য। তিয়াশা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভারী শ্বাস প্রশ্বাস সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল।
