ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৬
নওরিন কবির তিশা
অদ্ভুত অস্বস্তি চারদিকে। চৈত্র শেষের তীব্র রৌদ্ররশ্মি কৃষ্ণচূড়ার পাতা ফুঁড়ে পিচঢালা চত্বরে এসে পড়েছে। তিয়াশা ওর ওড়নাটা কাঁধে ঠিকঠাক টেনে নিয়ে আদ্রিতার হাত ধরে কলেজের করিডোর দিয়ে এগোচ্ছিল।
কিন্তু গজকয়েক যেতেই ছন্দপতন ঘটল। করিডোরের কোণে আড্ডা দেওয়া থার্ড ইয়ারের একটা গ্রুপ হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তিয়াশা ওদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই চার-পাঁচটা ছেলে একসঙ্গে হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে বলে উঠল,
— আসসালামু আলাইকুম, ভাবি!
তিয়াশা থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে ও আদ্রিতার দিকে চাইল, আদ্রিতাও সমান অবাক। তিয়াশা ভাবল হয়তো অন্য কাউকে বলছে কিংবা আর টিচ করছে, তাই পা বাড়াল লাইব্রেরির দিকে। কিন্তু না, এ যেন কোনো এক অদৃশ্য নাটকের স্ক্রিপ্ট! লাইব্রেরির সিঁড়ির কাছে দাঁড়ানো আরও দুটো ছেলে ওদের দেখে সরে দাঁড়িয়ে বেশ সমীহের সুরে বলল,
— ভাবি, গুড মর্নিং!
বিরক্তির পারদ এবার চড়চড় করে ওপরে উঠতে লাগল তিয়াশার। যে-ই দেখছে, সেই অদ্ভুত এক চোর-চোর চাউনি দিচ্ছে, আর মুখে ওই একই বানোয়াট সম্বোধন! এক প্রকার দমবন্ধ করা অস্বস্তি আর রাগ নিয়ে ও যখন মেইন অডিটোরিয়ামের সামনে পৌঁছাল, তখন আরেকটি ছেলে হুট করে ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে বলল,
— সালাম, ভাবি! রোদ তো অনেক বেশি, রোদে না ঘুরে ক্লাসে যান।
মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ে গেল তিয়াশার। ভেতরের জমানো পুরো ক্ষোভটা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফেটে পড়ল। ও এক পা এগিয়ে এসে জলদগম্ভীর কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
— এক্সকিউজ মি! আপনাদের প্রবলেমটা কী বলুন তো? সকাল থেকে যার তার মুখে এক কথা! ছ্যাবলামির একটা লিমিট থাকে। কাকে ভাবি ভাবি করছেন আপনারা? মাথা কি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে সবার?
ছেলেটা তিয়াশার এমন রুদ্রমূর্তি দেখে আমতা আমতা করে খানিকটা থতমত খেল। পরক্ষণেই মাথা চুলকে, অপ্রস্তুত এক হাসি দিয়ে বলল,
— আরে ভাবি, রাগ করছেন কেন? আমরা তো জাস্ট রেস্পেক্ট দিচ্ছিলাম। আপনি তো আরাভ ভাইয়ের বাগদত্তা! ভাই নিজে আমাদের বলে দিয়েছেন, ক্যাম্পাসে যাতে ভাবির কোনো প্রবলেম না হয়, সবাই যেন আপনাকে নজরে নজরে রাখি। তাই আর কি…!
‘আরাভ ভাইয়ের বাগদত্তা’ শব্দ দুটো তিয়াশার কানে যেন ফুটন্ত সিসার মতো বিঁধল। মুহূর্তের মধ্যে ওর ফর্সা মুখশ্রী তীব্র ক্ষোভে রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। ওই সাইকোটা তবে এত দূর পর্যন্ত হাত বাড়িয়েছে! নিজের নোংরা জাল এভাবে পুরো ক্যাম্পাসে বিছিয়ে দিয়েছে ও!
এদিকে সম্পূর্ণ রাগটা ও সম্মুখের ছেলেটার উপর উগলে দিতে চাইলো। খানিক চেঁচিয়ে বলল,,
— জুতার বাড়ি খাইতে না চাইলে সামনে থেকে সরেন। আজাইরা লোকজন কোথাকার!
ছেলেটা কি ভড়কালো? হয়তো। ও আর কথা না বাড়িয়ে ধীর পদক্ষেপে স্থান ত্যাগ করল। ছেলেটা চলে যেতেই তিয়াশা রীতিমত মেজাজ হারিয়ে নিজের চুল টেনে ধরল। আদ্রিতা ওকে তৎক্ষণাৎ সামাল দিতে যেতেই তিয়াশা বলল,,
— তুই দেখছিস আদ্রু! বাস্টার্ড টা কতদূর এগোচ্ছে! আমি কি করবো? ও আমার পিছু ছাড়ছে না কেন। আল্লাহ!
আদ্রিতা এগিয়ে এসে ওর কাঁধে আশ্বস্তকারী হাত রাখল,,
— ডোন্ট ওয়ারি তিয়ু! তুই ভেঙ্গে পড়লে কিন্তু ও আরো বেশি সাহস পাবে। সো, বি স্ট্র্রং! ওর বাবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারে। কিন্তু তোর বাবারও কিন্তু ক্ষমতা কম নয়।
— আমি কি করবো আদ্রু? আমি চাইনা বাবা আবার এসব ঝামেলা জড়াক! কিন্তু..
— কিন্তু কি তিয়ু? এগুলা আঙ্কেলের সাথে শেয়ার করতেই হবে। না হলে এগুলো সলভ করবে কি করে তুই?
— দোস্ত আমি আর পারছি না। আগের দিন কি করেছে?
আদ্রিতা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতেই তিয়াশা বলতে শুরু করলো,,
— ও আগের দিন মাঝরাতে আমার বাসায় গিয়েছে। তাও মা-তাল অবস্থায়! গিয়ে কি বলে জানিস? ও বলে ও নাকি আমাকে বিয়ে করতে চায়! আমার ইচ্ছা করছিল ওকে ওইখানেই পুঁ তে দিতে!
চশমার আড়ালে আবৃত আদ্রিতার দৃষ্টি বিস্ফোরিত। বিষয়ে বাক্য হারিয়েছে ও। কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে ও বলল,,
— বলিস কি দোস্ত? কেশ পুরাই জন্ডিস তাহলে! এই ব্যাডারে চিনিস না ও যার দিকে একবার নজর দেয় তাকে নিজের করেই ছাড়ে যেভাবেই হোক।
বাইরের তীব্র দাবদাহ সঙ্গে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ সবমিলিয়ে অস্বস্তিতে নিজেকেই নিজে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে তিয়াশার। ও কপাল বেয়ে নেমে আসা স্বেদবিন্দুটুকু ওড়নার আঁচল দিয়ে মুছে আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,
— আজকে আর একটা ক্লাসও আমি করব না আদ্রু। এমনিতেই মেজাজটা পুরো চড়ে আছে, তার ওপর এই রোদে মাথাটা ফেটে যাচ্ছে। চল, পাশের ওই এসি মলটার ভেতরে যাই। ঠান্ডা কিছু না খেলে আমি জাস্ট ফেইন্ট করে যাব।
আদ্রিতা ওর অবস্থা বুঝতে পেরে আর অমত করল না। দুজনে দ্রুত পায়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গলির মোড়ের নামী শপিং মলটার দিকে পা বাড়াল। মলে ঢুকে সেন্ট্রাল এসি-র সুশীতল হাওয়া গায়ে লাগতেই তিয়াশার অবশ হয়ে আসা স্নায়ুগুলো কিছুটা শিথিল হলো। ওরা মলের দোতলার একটা কফি শপে গিয়ে বসল। আদ্রিতা দ্রুত দুটো কোল্ড ড্রিংকস আর পেস্ট্রি অর্ডার করল।
খাবার আসার পর দুজনে টেবিলে বসে চুপচাপ খাচ্ছিল। তিয়াশা ড্রিংকসের স্ট্র-টা নাড়াতে নাড়াতে জানালার বাইরে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে আনমনে নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই কাউন্টারের ওয়েটারটি বিলের ফোল্ডারটা হাতে নিয়ে ওদের টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। তিয়াশা ব্যাগ থেকে পার্সটা বের করতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে অতি পরিচিত পৌরুষ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,,
— ওদের বিলটা আমার অ্যাকাউন্টে চার্জ করো।
হচকিত নয়নের পিছনে ঘুরতেই ওদের দৃশ্যমান হলো সেথায় দাঁড়িয়ে আছে আরাভ। মেজাজের পারদ মুহূর্তেই চড়চড়িয়ে উঠলো তিয়াশার। ও তৎক্ষণাৎ পার্স থেকে টাকা বের করে ওয়াটারকে দিয়েই আদ্রিতার হাত ধরে বেরিয়ে এলো। তবে আরাভকে পাশ কাটিয়ে যাবার সময়,আরাভ খপ করে ধরলো তিয়াশার তুলতুলে হাতটা। ওষ্টাধরে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,,
— আরে সুইটহার্ট, এত তাড়াহুড়ো কিসের? বিলটা তো আমাকেই দিতে দিতে হবে আজ হোক বা কাল। তা, খাবারগুলো ওভাবে ফেলে রেখে যাচ্ছ কেন? রাগ করলে তোমাকে কিন্তু আরও বেশি মারাত্মক লাগে!
তিয়াশা নিজের হাতটা ছাড়ানোর জন্য সর্বশক্তি দিয়ে এক ঝটকা মারল, কিন্তু আরাভের ইস্পাতশক্ত বাঁধন শিথিল করা সম্ভব হলো না। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,
— হাত ছাড়ুন, আরাভ! জাস্ট লিভ মাই হ্যান্ড। আপনার সাহস কী করে হয় পাবলিক প্লেসে আমার হাত ধরার? এক্ষুনি হাত ছাড়ুন বলছি, নইলে আমি চেঁচিয়ে লোক জড়ো করব!
আরাভ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তিয়াশার অবাধ্য চুলের একটা গোছা আলতো করে আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,,
— চিৎকার করবে? করো না সুইটহার্ট! পুরো মলের লোক জানুক যে আরাভ খান তার হবু বউয়ের সাথে একটু সফট রোম্যান্স করছে। ক্যাম্পাসের সবাই তো অলরেডি জেনে গেছে, বাকিদের জানতে বাকি রাখা কি ঠিক হবে বলো?
রাগে-ক্ষোভে থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো তিয়ার ক্ষীণ কায়া। পাশে দাঁড়িয়ে আদ্রিতা এবার শক্ত গলায় বলে উঠল,,
— আরাভ ভাই, প্লিজ লিমিট ক্রস করবেন না। আপনি জানেন ও কার মেয়ে। হাতটা ছাড়ুন!
আরাভ আদ্রিতার দিকে একবার তেরছা নজরে তাকিয়ে আবার তিয়াশার দিকে মনোনিবেশ করল। তিয়াশার ফর্সা কবজিতে ওর আঙুলের চাপে লাল দাগ বসে যাচ্ছে। ও তিয়াশার কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,,
— তোর ওই এসপি রুদ্রদ্বীপকে বলিস, যেন আমার জিনিসে নজর না দেয়। তুই শুধু আমার, তিয়াশা। এই সত্যিটা যত জলদি তোর ওই লিটল ব্রেইনে ঢুকিয়ে নিবি, তোর বাপের উর্দির সম্মান তত সেফ থাকবে। কাল কলেজে দেখা হচ্ছে, সুইটহার্ট!
বলেই আরাভ এক ঝটকায় হাতটা ছেড়ে দিয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে শিস দিতে দিতে মলের ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল। তিয়াশা তখনো থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে ওর। নিঃশ্বাসের পাল্লা ভারী, থরথরিয়ে কম্পিত ক্ষীণ কায়া। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে কোনো মতে নিজেকে শান্ত করার ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছে ও।
আদ্রিতা ওর হাতটা চেপে ধরে ব্যাকুল গলায় বলল,
— তিয়ু, শান্ত হ। প্লিজ, নিজেকে কন্ট্রোল কর! ব্লাডি সাইকো একটা!
তিয়াশা কোনরূপ প্রত্যুত্তর করল না। ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা গম্ভীর অথচ অসম্ভব আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
— এক্সকিউজ মি, তিয়াশা না?
হঠাৎ নিজের নাম শুনে তিয়াশা আর আদ্রিতা দুজনেই চমকে পেছনে তাকাল। সামনে দাঁড়ানো পুরুষটিকে দেখে আদ্রিতার চোখের পলক যেন চিরতরে থমকে গেল। অফ-হোয়াইট কালারের একটা ফরমাল শার্টের স্লিভ কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখে রোদচশমা। তীক্ষ্ণ, মায়াবী আর অসম্ভব ড্যাশিং চ্যাপ্টারের পুরুষালি অবয়বটায় আদ্রিতা মনে মনে আওড়াল, ‘হোয়াট আ গ্রীক গড!’
রুদ্রদ্বীপ মৃদু হেসে বললেন,
— হ্যাঁ, ঠিকই চিনেছি। কেমন আছেন আপনি?
তিয়াশা মুহূর্তের মধ্যে নিজের ভেতরের ঝড়টাকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ওড়নাটা টেনে কবজির লাল দাগটা লুকিয়ে কোনোমতে ঠোঁটে জোরপূর্বক একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,
— আই অ্যাম গুড। আপনি এখানে?
— একটা অফিশিয়াল ভিজিটে এদিকে এসেছিলাম। জাস্ট পাসিং বাই, ভাবলাম মল থেকে একটা কফি গ্র্যাব করি। তো, আপনাদের কী অবস্থা? কলেজ বাংকিং?
আদ্রিতা তখনো রুদ্রদ্বীপের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না। একজন মানুষের পার্সোনালিটি এতটা ক্রাশ-খাওয়ার মতো হতে পারে, তা ওর জানা ছিল না। ও একটু নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল,
— না… মানে, রোদ অনেক বেশি ছিল তো, তাই জাস্ট একটু রিফ্রেশমেন্টের জন্য আসা।
তিয়াশা আদ্রিতার কাণ্ড দেখে ওকে হালকা কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে রুদ্রদ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ও আমার ফ্রেন্ড, আদ্রিতা। আর আদ্রু, উনি এসপি রুদ্রদ্বীপ সিনহা। বাবার পরিচিত।
রুদ্রদ্বীপ আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে ভদ্রতাসূচক মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন,
— নাইস টু মিট ইউ, আদ্রিতা।
— ন-নাইস টু মিট ইউ টু, স্যার!
রুদ্রদ্বীপ এবার তিয়াশার দিকে তাকালেন। ওঁর তীক্ষ্ণ পুলিশি চোখ এড়াল না যে তিয়াশার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আছে, আর ও বারবার নিজের ডান হাতটা ওড়না দিয়ে আড়াল করছে। রুদ্রদ্বীপ জিজ্ঞেস করলেন,
— এনিথিং রং, তিয়াশা? আপনাকে একটু আপসেট লাগছে। কোনো প্রবলেম?
তিয়াশা বুক চিরে আসা একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে দ্রুত মাথা নাড়ল,
— নো, নো! নাথিং লাইক দ্যাট। একচুয়ালি চৈত্র মাসের এই জঘন্য রোদের কারণে একটু টায়ার্ড লাগছে, দ্যাটস ইট।
রুদ্রদ্বীপ পুরোপুরি বিশ্বাস করলেন না, তবে আর ঘাঁটালেনও না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— যেহেতু দেখা হয়েই গেল, আর আমার হাতেও মিনিট পনেরো সময় আছে… সো, হোয়াই নট আ কফি টুগেদার? চলুন, আই অ্যাম ট্রিস্টিং।
তিয়াশা অমত করতে চাইল,
— আরে না, ইটস ওকে। আমরা জাস্ট বের হচ্ছিলাম…
— কাম অন, তিয়াশা। স্যার জানতে পারলে বলবেন উনার মেয়ের সাথে দেখা হওয়ার পরও আমি এক কাপ কফিও খাওয়াইনি। লেটস সিট।
রুদ্রদ্বীপের সেই অকাট্য ব্যক্তিত্বের সামনে তিয়াশা আর না বলতে পারল না। ওরা তিনজন আবার একটা কর্নার টেবিলে গিয়ে বসল। রুদ্রদ্বীপ আইসড আমেরিকানোর অর্ডার দিলেন, আর মেয়ে দুটোর জন্য কোল্ড কফি।টেবিলে বসে কথা বলার সময় আদ্রিতা যেন পুরোই মন্ত্রমুগ্ধ। রুদ্রদ্বীপ যখন কথা বলছিলেন, ওঁর চশমার আড়ালের চোখ, ওঁর হাতের মুভমেন্ট, আর কথা ভঙ্গিতে আদ্রিতা বারবার ওঁর দিকেই তাকাচ্ছিল। রুদ্রদ্বীপ সেটা খেয়াল করে মনে মনে একটু বিরক্ত হলো বোধহয়, তবে তিয়াশাকে স্বাভাবিক করার জন্য উনি নরমাল টপিকেই কথা বলতে লাগলেন।
— পড়াশোনার কী খবর আপনার? ফাইনাল ইয়ার তো প্রায় চলে এলো, রাইট?
— হ্যাঁ, প্রিপারেশন চলছে। বাট এই গরমের মধ্যে ক্লাস করাটাই একটা বড় টাস্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
— আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড। ঢাকা ক্রাইম রেটের সাথে সাথে এখন টেম্পারেচারও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
মিনিট পনেরো বেশ চমৎকার একটা হালকা মেজাজের কথপোকথন হলো ওদের মধ্যে। আরাভের নোংরা অধ্যায়টা আপাতত তিয়াশার মাথা থেকে কিছুটা হলেও দূরে সরল। কফি শেষ করে রুদ্রদ্বীপ উঠে দাঁড়ালেন।
— ওকে লেডিস, মাই টাইম ইজ আপ। আমাকে একটা সাইট ভিজিটে যেতে হবে। তিয়াশা, স্যারকে আমার সালাম জানাবেন। আর আদ্রিতা, আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগল।
আদ্রিতা চট করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
— সেম হিয়ার, স্যার! আই মিন, মিস্টার রুদ্রদ্বীপ।
রুদ্রদ্বীপ মুখ চেপে হেসে বিলটা পে করে মলের এক্সিটের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আদ্রিতা তিয়াশার হাত খপ করে ধরে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল,
— ওহ মাই গড, তিয়ু! এই লোক এত হট আর হ্যান্ডসাম? তুই আমাকে আগে কেন বলিসনি? আই সোয়েয়ার, আমার তো হার্টবিট স্কিপ করেছে!
তিয়াশা মৃদু হাসলো আদ্রিতার এমন কাণ্ডে।
নিশুতি রাতের নির্জনতা আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে ধরিত্রীকে। অবসাদগ্রস্ত শরীরটাকে একটু আরাম দিতে রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় সবে শরীর এলিয়ে দিয়েছে তিয়াশা। পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটা হাতে তুলে ছোট ওয়াইফাই কানেক্ট করেছে ও। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতে নোটিফিকেশনের ঝড় বয়ে গেল ওর ফোনে।
কিঞ্চিৎ ও প্রস্তুত হয়ে পড়লো তিয়াশা। সচরাচর এত মেসেজ তো আসে না। দুশ্চিন্তাও হলো খানিক, তৎক্ষণাৎ মেসেঞ্জার অন করতেই চড়কগাছ! আরাভের আইডি থেকে একগাদা মেসেজ জমা হয়ে আছে। ওপরের মেসেজগুলো স্ক্রল করতেই রিদমিক টোনে ভেসে উঠল বখাটে ফ্লার্টিংয়ের চেনা উপদ্রব,,
“কী খবর, সুইটহার্ট? সারাদিন তো অনেক রাগ দেখালে। রোদে মুখটা একদম লাল হয়ে ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করো সুইটহার্ট, রেগে গেলে তোমাকে আরও বেশি সেক্সি লাগে! কাল কিন্তু একদম লেট করবে না, জলদি কলেজে চলে এসো। ওহ হ্যাঁ, আরাভ খানের হবু বউ বলে কথা, একটু তো দাপট দেখাবেই, তাই না? শুনছ সুইটহার্ট? আই অ্যাম মিসিং ইউ ব্যাডলি!”
মেসেজগুলো পড়া মাত্রই তিয়াশার ভেতরের ঘৃণা আর বিরক্তি চরম সীমায় পৌঁছাল। ও আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আরাভের আইডিটা মেসেঞ্জারে ব্লক করে দিল। স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা পাশে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই টুংটাং শব্দে এবার হোয়াটসঅ্যাপ আর ইমো সচল হয়ে উঠল।
বিস্ময় আর তীব্র বিরক্তিতে ও হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটলিস্ট খুলতেই দেখ ব্যঙ্গাত্মক সুরে আরেকটি মেসেজ জ্বলজ্বল করছে,,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড, সুইটহার্ট? ভেবেছিলে একটা জায়গা থেকে ব্লক করে দিলেই আরাভ খানের হাত থেকে বেঁচে যাবে? আই নো ইয়্যু ভেরি ওয়েল, তিয়াশা। আমার জানপাখিটা যে একটু বেশিই রাগী, কিছু হলেই ব্লক মারবে—সেটা আমি আগেই জানতাম। এই জন্যই তো সব ব্যাকআপ রেডি রেখেছিলাম! ফেসবুকে ব্লক মারলে হোয়াটসঅ্যাপ আছে, হোয়াটসঅ্যাপে মারলে ইমো আছে, আর সবশেষে বাসার রাস্তা তো চেনা আছেই! সো, ডোন্ট ট্রাই টু রান অ্যাওয়ে ফ্রম মি। গুড নাইট, সুইটহার্ট!”
খেই হারিয়ে ফোনটা আছাড় মারার জন্য তিয়াশা যেই না হাতটা ওপরে তুলল, ঠিক সেই মুহূর্তেই স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। আরেকটি নতুন মেসেজ,,
”ফোন ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টা একদম করো না যেন, সুইটহার্ট!”
তিয়াশা এবার নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে ওর পুরো শরীর কাঁপছে। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে ও সরাসরি আরাভের নম্বরে কল দিয়ে বসল। অপরপ্রান্ত থেকে কলটা রিসিভ হতেই তিয়াশা চিৎকার করে উঠল,
— তোর লজ্জা-শরম বলতে কি কিছু নেই, আরাভ? কোন সাহসে তুই আমাকে বারবার টেক্সট করছিস? নিজেকে ভাবিস কী তুই? একটা ব্লাডি সাইকো, ক্যারেক্টারলেস বাস্টার্ড! তোর মতো একটা নিচ, নোংরা ছেলের মেসেজ দেখার চেয়ে আমার মরে যাওয়া অনেক ভালো! জাস্ট স্টপ হ্যারাসিং মি, নইলে আমি এবার সত্যি বাবাকে বললো!
তিয়াশার এমন অগ্নিশর্মা কণ্ঠস্বর শুনেও ওপাশে থাকা আরাভ বিন্দুমাত্র দমে গেল না। বরং ওর ফোনের স্পিকার ফুঁড়ে ভেসে এলো এক পিশাচসুলভ, উচ্চৈঃশব্দের অট্টহাসি। এক চরম উন্মাদনায় হাসতে হাসতেই আরাভ জবাব দিল,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৫
— সো? ওহ কম অন, সুইটহার্ট! তোর বাপ কি করবে? শ্বশুর আব্বা তো নিজেই আমার ভয়ে কাঁপে! ভুলে যাস না, এই শহরের আইন-কানুন কার ইশারায় চলে। আর তুই বললেই আমি তোকে ছেড়ে দেব? নেভার! তুই হলি আমার একমাত্র রানী, আর আমি তোর রাজাধিরাজ! আরাভ খান যা একবার নিজের বলে ভেবে নেয়, তা সে ছলে-বলে-কৌশলে নিজের করেই ছাড়ে। পুরো পৃথিবী চষে বেড়ালেও আমার মতো এমন খাঁটি প্রেমিক তুই আর একটাও পাবি না, তিয়াশা! সো, জাস্ট একসেপ্ট ইট। কাল কলেজে দেখা হচ্ছে, মাই কুইন!
বলেই ও ফোনটা মুখের কাছে নিয়ে বিকৃতপূর্ন শব্দ করতে যাবে তার আগেই খট করে ফোনটা কেটে দিলো তিয়াশা। মাথার রগ গুলো রাগে দপদপ করছে ওর।
