Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৭

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৭

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৭
নওরিন কবির তিশা

— আসসালামু আলাইকুম শ্বশুর আব্বা?
তাহের চৌধুরী সবেমাত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে মনোনিবেশ করেছিলেন। চারদিকের নিস্তব্ধতার মাঝে আচমকা ওনার ব্যক্তিগত ফোনের তীব্র কর্কশ আওয়াজ সেই একাগ্রতা ভেঙে চুরমার করে দিল। কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে, অত্যন্ত বিরক্ত মুখে ওনার অবাধ্য ফোনটি হাতে তুলে নিলেন তিনি। অচেনা নাম্বার দেখেও বেশ কিছুক্ষণ পর যখন কলটি রিসিভ করলেন, ওপাশ থেকে ভেসে আসা প্রথম বাক্যটিতেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল উনার। ওনার মতো একজন ডিআইজি-র পার্সোনাল নাম্বারে ফোন করে এতবড় স্পর্ধা দেখানোর সাহস কার হতে পারে, তা ওনার ভাবনার অতীত। অত্যন্ত কর্কশ গলায় উনি ধমকে উঠলেন,,

— হু দ্য হেল ইজ দিস? কার ঘাড়ে কটা মাথা যে ডিআইজি তাহের চৌধুরীকে ফোন করে ফাজলামো করছিস? রাস্কেল!
ওপাশ থেকে আরাভ একগাল হাসল। চুরুটের ধোঁয়ার কুন্ডুলি বাতাসে উড়িয়ে;অত্যন্ত শান্ত তবে শ্লেষ জড়ানো কণ্ঠে বলল,,
— আরে, জাস্ট চিল শ্বশুর আব্বা! এত হাইপার হচ্ছেন কেন? বয়স বাড়ছে, বিপি-টা শুট আপ করলে প্রবলেম হবে তো। আমি আপনার হবু জামাই, আরাভ।
— শাট আপ! ইউ ব্ল্যাকমেইলার! মুখ সামলে কথা বল, নইলে তোকে লকআপে পুরে থার্ড ডিগ্রি দিতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না!
আরাভ ফোনের ওপাশে সোফায় আরামছে পা তুলে বসল। ঠোঁটের কোণে বক্র হাসির রেখা টেনে ঠান্ডা গলায় বলল,,

— আরে ধুর! লকআপের ভয় অন্য কাউকে দেখায়েন, আমার ওসব স্যুট করে না। কাজের কথায় আসি। আপনার মেয়েটা বড্ড বেশি জেদি আর ত্যাঁড়ো, লাইক টু মাচ এটিটিউড! কিন্তু শ্বশুর আব্বা, মেয়েটা শেষমেশ আমারেই দিয়েন। বিশ্বাস করেন, একদম কলিজার ভিতর গাঁথা রাখমু।
তাহের চৌধুরী টেবিলের ওপর সজোরে হাত চাপড়ালেন,
— ইউ বাস্টার্ড! তোর মতো একটা রাস্কেলের হাতে আমি আমার মেয়েকে দেব? তোর এতবড় সাহস কী করে হয়! আই উইল ডেস্ট্রয় ইউ, আরাভ! জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!
আরাভের চোখের মণি দুটো মুহূর্তের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল। তার কণ্ঠের সেই রসিকতার সুর নিমেষেই উধাও হয়ে সেখানে ভর করল এক ভয়ঙ্কর শীতলতা। চোয়াল শক্ত করে, একদম নিচু ও তীক্ষ্ণ স্বরে ও বলল,,
—শোনেন মিস্টার তাহের চৌধুরী, ভালোয় ভালোয় বলছি, মিষ্টি কথায় শুনলেন না তো? আরাভ কিন্তু রিকোয়েস্ট একবারই করে। এরপর যখন আপনার মেয়েকে ডিরেক্ট তুলে আনব না, তখন বুঝবেন আরাভ জিনিসটা কী! তখন আইনি পাওয়ার কিংবা আপনার এই ডিআইজি পদের অহংকার—কোনো কিছুই আপনার মেয়েকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। সো, ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস!
রাগে-ক্ষোভে রীতিমতো তোতলাতে লাগলেন তাহের চৌধুরী, ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে মুহূর্তের মাঝেই,,

—ইউ… ইউ রাসকেল! স্টুপিড!
পুনরায় কোনোরূপ বাক্যব্যয়ের অবকাশ না দিয়ে তড়িৎ বেগে লাইন কেটে দিলো তাহের চৌধুরী। ধপ করে বসে পরলেন বিছানায়। স্বামীর চেঁচামেচিতে নিদ্রা টুটলো রেহানা বেগমের। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন তিনি,,
— কি হয়েছে? এত রাতে চেঁচাচ্ছ কেন?
তাহের সাহেব মাথা চেপে বসে আছেন। এক ঝলক মাথা তুলে সহধর্মিনীকে দেখলেন। অতঃপর অর্ধাঙ্গিনীর উরুতে নিজের মাথাটা রেখে চোখ বুঁজলেন,,
— বাবা সত্তা এত অসহায় কেন বলতে পারো রেহেনা?
স্বামীর দুশ্চিন্তা অসহায়ত্ব সব কিছু বুঝলেন রেহানা বেগম। আলতো হাত বুলালেন তাহের চৌধুরীর আধ পাকা সাদা চুলে,

— তুমি শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
— কিছু ঠিক হবে না রেহানা। আমার মেয়েটার কিছু হলে আমি মারাই যাব বিশ্বাস কর।
রেহানা বেগম মৃদু হাসলেন,,
— শুধু তোমার মেয়ে?
তাহের চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেহানা বেগমের দিকে তাকালেন। ওনার চোখ দুটো ক্লান্তিতে আর অজানা আশঙ্কায় বুজে আসছে। স্ত্রীর হাতের পরম মমতাময় স্পর্শও যেন ওনার ভেতরের সেই ভয়টাকে দূর করতে পারছে না।
— শুধু তোমার মেয়ে কেন হবে? ও তো আমারও কলিজার টুকরো,
রেহানা বেগম স্বামীর কপালে জমে থাকা ঘামটুকু নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিতে দিতে বললেন,,
— কিন্তু তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে তিয়াশাকে আগলাবে কে? তুমি তো অন্যায়ের সামনে কোনোদিন মাথা নোয়াওনি।
তাহের চৌধুরী ধীর শব্দে বললেন,

— অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াইনি রেহানা, কিন্তু আজ অন্যায়টা আমার মেয়ের সম্মানের দিকে হাত বাড়িয়েছে। আনোয়ার খানের ওই সাইকো ছেলেটা আজ আমাকে ফোন করে হুমকি দিচ্ছে। ও তিয়াশাকে তুলে নেওয়ার কথা বলে! আমার ক্ষমতা, আমার পদের অহংকার সব আজ ওই একটা জায়গায় এসে থমকে গেছে। একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে আমি আইনের কথা ভাবি, কিন্তু একজন বাবা হিসেবে আমি শুধু আমার মেয়ের নিরাপত্তা চাই।
রেহানা বেগম স্বামীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন,
— আমাদের টিয়া অত দুর্বল নয়। ওর গায়ে তোমার র-ক্ত, ও অন্যায়ের সাথে আপস করতে শেখেনি। আর তুমি একা নও, আল্লাহ আছেন। আনোয়ার খান যতই শক্তিশালী হোক, একটা বাচ্চার ক্ষতি করার ক্ষমতা ওর নেই।
স্ত্রীর কথায় তাহের চৌধুরীর মনের মেঘ যেন কিছুটা কাটল। অবশ হয়ে আসা স্নায়ুগুলো আবার সজাগ হয়ে উঠল। তাহের চৌধুরী রেহানা বেগমের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বললেন,
— তুমি ঠিক বলেছ। আমি আমার টিয়ার কিচ্ছু হতে দেব না। ওর হাসিমুখটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য যদি আমাকে নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়তে হয়, আমি লড়ব।
রেহানা বেগম স্বামীর বুকে মাথা রাখলেন। রাতের নিস্তব্ধতা তখন আরও গভীর হচ্ছে, কিন্তু সেই অন্ধকারের বুক চিরে এক পিতৃহৃদয় জাগ্রত এক নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে। আরাভ খান ক্ষমতার জোরে বাঘ হতে পারে, কিন্তু সে ভুলে গেছে, আহত সিংহ আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়।

— সুইটহার্ট?
পেছন থেকে ভেসে আসা চেনা, কৌতুকী কণ্ঠস্বরটা কানে লাগতেই তিয়াশা চোখ-মুখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবেমাত্র কলেজের প্রধান প্রবেশদ্বারের সম্মুখে স্কুটিটা পার্ক করে নেমেছে ও,এমন সময় এই উৎপাত!
বিরক্তিতে ওর পুরো শরীর রি রি করে উঠল। ও এক ঝটকায় পেছনে ঘুরতেই দেখল, গেটের পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে ওর সেই দুর্ধর্ষ কালো ইয়ামাহা বাইকটাতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাভ। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে চিরাচরিত বিরক্তিকর হাসি, আর আঙুল দিয়ে ও বাইকের চাবিটা অনবরত ঘুরিয়ে চলেছে।
তিয়াশা অগ্নিদৃষ্টি হেনে দু-পা এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— আপনার লজ্জা-শরম বলতে কি কিচ্ছু নেই? সকাল-সন্ধ্যা মানুষের পিছু নেওয়া ছাড়া আপনার লাইফে আর কোনো কাজ নেই? জাস্ট গেট আউট,দূর হন আমার সামনে থেকে!
আরাভ বাইক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বণ্য পদক্ষেপে তিয়াশার দিকে এগিয়ে এল। ও তিয়াশার ঠিক এক হাত দূরত্বে এসে থমকে দাঁড়াল। চোখে সানগ্লাসটা ঠিক করতে করতে কেতাবি স্বর টেনে বলল,

— লজ্জা? ওটা তো ব্যাকডেটেডদের জন্য, সুইটহার্ট! আর আমি তো সবার পিছু নি না। আমার বউ বলেই তো নিচ্ছি তাই না? এটাকে বলে কেয়ার করা। কাল রাতে তো তোমার হবু শ্বশুর আব্বাকে ডিরেক্ট কল করে আমাদের বিয়ের পারমিশনও চেয়ে নিলাম। বুড়ো তো রাগে এক্কেরে ফায়ার!
আরাভের মুখে বাবার কথা শুনতেই তিয়াশার মাথার প্রতিটি রগ দপ দপ করে জ্বলে উঠল। ও নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রেখে, তীব্র ঘৃণায় বলল,
— আমার বাবাকে ফোন করার সাহস কী করে হয় আপনার? আপনি একটা মেন্টাল সাইকো, একটা চিপ ক্রিমিনাল! ক্ষমতার জোর দেখাচ্ছেন? মনে রাখবেন, পলিটিক্স আজ আছে কাল নেই। কিন্তু যেদিন আপনি আইনের জালে ফাঁসবেন, সেদিন আপনার ওই মন্ত্রী বাপও আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।
আরাভ এবার হো হো করে হেসে উঠল। আকস্মিক তিয়াশার বড্ড কাছে ঝুঁকে এলো ও,যার দরুন ওর কড়া পারফিউমের ঘ্রাণটা তীব্র বেগে নাসারন্ধ্রে ধাক্কা দিলো তিয়াশার।আরাভ সানগ্লাসের ওপর দিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,

— আইন? ড্যাম ইট সুইটহার্ট! আইন তো আমার বাবার টেবিলের ওপর ফাইল চাপা পড়ে থাকে। আর আমি সাইকো? হ্যাঁ, আমি সাইকো। শুধু তোমার এই রূপটার জন্য সাইকো! এই যে রাগলে তোমার চোখ দুটো যেভাবে চকমক করে ওঠে না… কসম, আমার ভেতরটা পুরো তছনছ হয়ে যায়।
তিয়াশা আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়াতে চাইল না। এই ছেলের সাথে তর্ক করা মানে নিজের রুচির অবমাননা করা। ও এক ঝটকায় ওর ব্যাগটা কাঁধে টেনে নিয়ে গটগট করে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল। তক্ষুনি পেছন থেকে আরাভের সেই শ্লেষাত্মক অট্টহাসি আর চড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,,
— ভয় পেলে সুইটহার্ট? পাও,পাও স্বামীকে ভয় পাবানা তো কাকে পাবে বলো?

— স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ হচ্ছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা কে নিয়ন্ত্রণে রাখা, অভ্যন্তরীণ সমস্ত কিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। কিন্তু তার ছেলেই যদি এসব অনৈতিক কাজ করে বেড়ায়, তাহলে কি করে হবে স্যার?
রুদ্রদ্বীপ সিনহার কন্ঠে থমথমে দেখালো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার খানের মুখশ্রী। প্রচন্ড গম্ভীর কন্ঠে সে বলল,,
— তুমি কি আমাকে থ্রেট দেওয়ার চেষ্টা করছো?
রুদ্রদ্বীপ মাথা নাড়ালো অত্যন্ত সমীহের স্বরে বলল,,
— নো স্যার। আপনি একজন রেসপেক্টফুল মানুষ আপনাকে তো একটু দেওয়ার প্রশ্ন ওঠেনা! জ্ঞানের পরিসর অত্যন্ত সীমিত হওয়া সত্বেও এই ক্ষুদ্র চুনোপুটি মানুষটা যতটুকু জানে তার আলোকে আপনার কাছ থেকে প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করলাম।
— দেখো এসপি সিনহা, খুব কম বয়সেই এত বড় একটা পদে আসতে পেরেছো তুমি। ব্যাপারটা প্রশংসনীয়। তবে, আমি তোমার সঙ্গে এই ব্যাপারে কোন আলাপ করতে রাজি নই। বলতে পারো এটা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু আনোয়ার খান করে না।
— আমি আপনাকে ঘাটতে চাই না স্যার। বাট ইয়্যু নো এভ্রিথিং। সো এটাও আপনার দেখার বিষয় ছিল। বাট আপনি যখন কথা বলতে চাচ্ছিলেন না তখন ব্যাপারটা আমাকে হ্যান্ডেল করতে হবে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে, আই হ্যাভ নাথিং টু ডু কিন্তু!
শীতল কন্ঠের হুমকি যাকে বলে! বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলেন রুদ্রদ্বীপ। আনোয়ার খান তাকিয়ে কিছু বলার অবকাশ পেলেন না তার আগেই রুদ্র ফের বলল,,

— তাছাড়া ইদানিং শহরে নারী পাচার চক্রটা বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে স্যার। ধর্ষণ তো নিত্যদিনের সাধারণ নিউজ এখন। তার ওপর নির্বাচন আসছে। বৃহৎ রাজনৈতিক দল তো ক্ষুদ্রদের দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় বড্ড বেশি তৎপর। কিছু কিছু ফাইল আমার কাছে জমা হয়েছে প্রমাণসহ। কিছুদিনের ভিতরেই এক্সপোজ করে অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করব, ইনশাআল্লাহ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার খান কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। ওনার মতো বাঘা রাজনীতিবিদের সামনে দাঁড়িয়ে, ওনারই দপ্তরে বসে এত বড় ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস সচরাচর কেউ করে না। আনোয়ার খান চোয়াল শক্ত করে কিছু একটা বলতে উদ্যত হলেন, কিন্তু রুদ্রদ্বীপ ওনাকে আর কোনো সুযোগ দিল না। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল:
— আজ তবে আসি স্যার। ফাইলগুলো টেবিলে রেখেই গেলাম। আশা করি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আপনি সঠিক সিদ্ধান্তটাই নেবেন।
কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই রুদ্রদ্বীপ উন্নত শির নিয়ে ওনার চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল।

সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশাল করিডোর পেরিয়ে রুদ্রদ্বীপ যখন চত্বরের পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই গেটের সামনে একটা কানফাটানো স্পোর্টস বাইকের হর্ন আর টায়ারের কর্কশ শব্দ শোনা গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই রুদ্রদ্বীপের চোখ পড়ল সেই কালো ইয়ামাহা আর-ওয়ানের ওপর। বাইক থেকে নামল আরাভ খান। অবিন্যস্ত চুল, চোখে চিরপরিচিত বেপরোয়া চাউনি।
রুদ্রদ্বীপকে মন্ত্রীর দপ্তরের গেটে দেখে আরাভ প্রথমে একটু থমকে গেল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে এগিয়ে এলো রুদ্রর দিকে,,
— আরে সতীন নাকি?
আরাভের এমন সম্মোধনে গুরুগম্ভীর ভ্রু যুগোল বেশ খানিকটা কুঁচকে গেল রুদ্রর,,
— হ্যোয়াট?
আরাভ বাইকের চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে একটা শ্লেষাত্মক হাসি দিল। ও রুদ্রদ্বীপের আরেকটু কাছে এসে আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,,
— আরেহ অফিসার? বাংলা ব্যাকরণ কি একটু উইক।তাই ছেলেদের সতীন বলে নাকি সতান সেটা জানা নাই। আচ্ছা বাদ দেন, আপনারে একটু সহজ ভাষায় বুঝাই। ইদানিং তো আবার দেখি আপনি আমার হবু বউয়ের সাথে ক্যাফেতে খুব কফি ডেট মারতাছেন! সতীন হওয়ার এই ট্রাইটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং, মিস্টার এসপি!
রুদ্রদ্বীপের চোখে এক মুহূর্তের জন্য তড়িৎ ক্রোধ খেলে গেল, কিন্তু ও নিজের কণ্ঠস্বরকে একদম শান্ত ও বরফের মতো শীতল রেখে বলল,,

— মুখ সামলে কথা বলো, আরাভ খান। তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, সেটা ভুলে যেও না। আইনের হাত কত লম্বা, সেটা তোমার বাবার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
আরাভ এবার শব্দ করে হেসে উঠল। কৌতুক কিংবা আফরানহীন এক পৈশাচিক ঔদ্ধত্যপূর্ণ হাসি। ও হুট করেই হাসা থামিয়ে রুদ্রর একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিষাক্ত গলায় বলল,,
— আইনের ভয় দেখাইয়া আরাভ খানের বাল ছেঁড়া যায় না, অফিসার! সোজাসুজি একটা ওয়ার্নিং দিয়া যাই—তিয়াশা চৌধুরী শুধু আমার। ওই জিনিসে নজর দিলে না, আমি চোখ উপড়ে ফেলার দম রাখি। বেশি সতীন সাজার শখ দেখাইলে এমন জায়গায় পাঠামু যেখান থেকে ব্যাক করার কোনো রাস্তা পাইবেন না। জাস্ট স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হার!
রুদ্রদ্বীপ এক পা-ও পেছাল না। ও আরাভের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় ও গম্ভীর কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করল,,

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৬

— ভয় অন্য কাউকে দেখাও, আরাভ। অপরাধীদের কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়, সেই ট্রেনিং আমি নিয়েই এই চেয়ারে বসেছি। তিয়াশা বা অন্য কোনো সাধারণ মানুষের গায়ে আঁচ লাগার আগে তোমাকে আমার মুখোমুখি হতে হবে। আর রুদ্রদ্বীপ সিনহা সহজে মাঠ ছাড়ে না।
আরাভ আর কোনো কথা বাড়াল না। ও দাঁতে দাঁত চেপে রুদ্রকে শেষবারের মতো এক ঝলক খুনে দৃষ্টিতে দেখল। তারপর আবার বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের বিকট গর্জন তুলে ও স্পোর্টস বাইকটা ঘুরিয়ে ঝড়ের গতিতে মিনিস্ট্রির মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
রুদ্রদ্বীপ শান্ত ভঙ্গিতে ওদিকে তাকিয়ে রইল। ও পকেট থেকে ফোনটা বের করে ডিলিং অফিসারকে ডায়াল করে শুধু বলল,,
— আরাভ খানের ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি বাড়াও। ওর প্রতিটি মুভমেন্টের আপডেট আমার চাই।

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here