Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৩

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৩

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৩
মেহজাবিন নাদিয়া

নিজের রুমে পা রাখতেই অরির দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে এক বুক ক্লান্তি বেরিয়ে এলো। ঘরের নরম আলোয় চোখ পড়তেই সে দেখল, জেবা বই-খাতা একপাশে ঠেলে দিয়ে খাটের ওপর আড়াআড়িভাবে পড়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। পড়াশোনার বিন্দুমাত্র নামগন্ধ নেই সেখানে। অরি নিজের পরনের হালকা কালো সুতি শাড়িটার দিকে তাকিয়ে চরম বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে ফেলল। শাড়ির কুঁচিগুলো সামলাতে গিয়ে ওর মেজাজটা আরও চটে গেল। মনে মনে একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই AI-এর ওপর ওর প্রচন্ড রাগ হতে লাগল।
আজ সন্ধ্যায় পড়া না এগিয়ে ও যখন ইন্টারনেটে সার্চ করছিল-‘কীভাবে স্বামীকে বশ করে নিজের কাজ করিয়ে নেওয়া যায়’, তখন চতুর এআই তাকে বুদ্ধি দিয়েছিল,স্বামীকে শাড়ি পরে চমকে দিন, তার সামনে গিয়ে একটু সোহাগ ও ভালোবাসা দেখালেই সে গলে জল হয়ে যাবে এবং আপনার সব আবদার এক নিমেষে পূরণ করে দেবে।

কিন্তু অরির কাছে এখন পুরো বিষয়টাই একটা মস্তবড় ‘আকাম বুদ্ধি’ বলে মনে হলো। সারিমকে শাড়ি পরে দেখানোর পর তার মধ্যে এমন কোনো বিশেষ বা জাদুকরী প্রতিক্রিয়া ও দেখেনি। উল্টো সারিম শিয়াল-মুরগির উদ্ভট ভালোবাসার সংজ্ঞা দিয়ে ওকে জ্বালিয়েছে। যদিও নোটগুলো উদ্ধার হয়েছে, কিন্তু এই ভারী শাড়ি পরে থাকার ঝক্কি আর ও নিতে পারছে না।
“ধুর! যতসব ফালতু এআই-এর ফালতু বুদ্ধি! ওটা কি আর সারিমের মতো জল্লাদের ওপর কাজ করে?”
বিড়বিড় করে অরি আলমারি থেকে আরামদায়ক একটা শার্ট আর ঢিলেঢালা প্লাজো বের করে নিল। বাথরুমে গিয়ে দ্রুত শাড়িটা বদলে ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।বাদামী চুলগুলো একটা হাতখোঁপা করে বেঁধে, নিজের কষ্টার্জিত সেই কেমিস্ট্রির নতুন খাতা আর কিছু প্রয়োজনীয় বই হাতে তুলে নিল। জেবা যেভাবে ঘুমাচ্ছে, এই রুমে বসে পড়া সম্ভব নয়।নয়তো দেখা যাবে ওর পড়ার আওয়াজে মেয়েটার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে। তাই ও সিদ্ধান্ত নিল,দুতলার লাইব্রেরি রুমে গিয়ে বাকি রাতটুকু পড়াশোনা করবে।
কথামতো বই-খাতা বুকে চেপে অরি সিড়ি বেয়ে দুতলায় নেমে এলো।করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ প্রধান ফটকের খটখট শব্দে অরির পায়ের গতি থমকে গেল। ঘড়িতে তখন ভোর সাড়ে চারটে ছুঁইছুঁই। এই শেষ রাতে কে এলো?

অরি উঁকি দিয়ে দেখল, আরিশান মৃধা ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন। ওনার অবয়ব দেখে অরির বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। আরিশান মৃধার চোখ-মুখ প্রচন্ড শক্ত, চোখের কোণগুলো রক্তবর্ণ হয়ে লাল হয়ে আছে। ওনার চওড়া কপালে ক্লান্তির চেয়েও বেশি এক গভীর,মানসিক ট্রমার স্পষ্ট ছাপ। যে মানুষটা সবসময় মেরুদণ্ড সোজা করে,গম্ভীর আর আভিজাত্য নিয়ে চলেন, আজ ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ ওনার সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে।
বাবার এমন বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে অরির খুব কষ্ট হলো। বুকের ভেতর এক তীব্র অপরাধবোধ এসে ওকে গ্রাস করল। কিছুক্ষণের জন্য ওর নিজের কাছে মনে হতে লাগল-জেবার সঙ্গে বাবাকে এভাবে জোর করে বিয়েটা না দিলেই বোধহয় ভালো হতো। হয়তো এই অসম, জবরদস্তিমূলক বিয়ের ধকল আর সমাজের চাপটাই ওনার এই অবস্থার জন্য দায়ী।

অরি নিজের অপরাধবোধ কাটিয়ে ধীর পায়ে আরিশান মৃধার দিকে এগিয়ে গেল। ওনার হাতটা ছুঁয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, এমন সময় আরিশান মৃধা নিজের ডান হাতটা বাতাসে তুলে অরিকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন। ওনার সেই হাত তোলার ভঙ্গিতে ছিল এক অদ্ভুত দূরত্ব।
ওনার চিবুকটা শক্ত হয়ে রইল। অত্যন্ত নিচু, অথচ পাথরের মতো শক্ত ও ভারী গলায় ও বললেন,
“অদ্রিজা… যাও, নিজের কাজ করো।”
কণ্ঠস্বরটা এতই রুক্ষ আর শীতল ছিল যে, অরির পায়ের তলার মাটি যেন কেপে উঠল। আরিশান মৃধা ওকে যতই শাসন করুন না কেন,যতোই রেগে থাকুন না কেন-কখনো ওর সঙ্গে এমন শক্ত পরকীয় গলায় কথা বলেননি। অরিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আরিশান মৃধা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিলেন।
করিডোরের আবছা আলোয় অরির চোখের কোণে সামান্য জল চিকচিক করে উঠল। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই ও সেটা আঙুল দিয়ে মুছে ফেলল। নিজেকে শক্ত করে ও পা বাড়াল রিডিং রুমের দিকে।
রিডিং রুমে ঢুকে টেবিলের ওপর বই-খাতাগুলো রাখল অরি। চেয়ার টেনে বসে ও অর্গানিক কেমিস্ট্রির মেকানিজমগুলোর দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু মগজের ভেতরের আলোড়ন কিছুতেই থামছিল না। যতবারই বইয়ের দিকে তাকাচ্ছিল, ততবারই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আরিশান মৃধার সেই লাল টকটকে চোখ আর শক্ত কণ্ঠস্বর।
“আমি কি আসলেই সারিমের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বড্ড অন্যায় করে ফেলছি?বিয়েটা না দিয়ে অন্য ভাবেও কি বাবা সুস্থ হতে পারবে না!”

অরির এই দোটানায় থাকা মন বারবার মনোযোগ আরিশান মৃধার আচরণের দিকে চলে যাওয়ায় পড়াশোনায় এক নাগাড়ে ব্যাঘাত ঘটছিল। এক পৃষ্ঠা পড়তেই ওর আধা ঘণ্টা কেটে গেল, অথচ মাথার ভেতর কিছুই ঢুকল না। একপর্যায়ে চরম হতাশায় অরি বই-খাতাগুলো একসাইডে ঠেলে সরিয়ে রাখল। চেয়ারের পিঠে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। নিজের মস্তিষ্ককে একটু রিল্যাক্স ফিল করাতে চাইল ও। এক গভীর নীরবতা পুরো রুমটাকে গ্রাস করে রেখেছিল।
ঠিক তখনই দরজার লকটা আলতো শব্দে খুলে গেল। অরি চোখ মেলতেই দেখল সারিম রুমে প্রবেশ করছে। ওর পরনে এখন স্যুটের বদলে একটা হালকা টিশার্ট, চোখেমুখে এখনো সেই কয়েক ঘণ্টার টানা খাটুনির রেশ।
সারিমকে দেখেই অরি নিজের ভেতরের অস্থিরতা ও মন খারাপের ভাবটা এক নিমেষে লুকিয়ে ফেলল।অরি নিজেকে একদম নরমাল দেখানোর চেষ্টা করল।সে চায় না বাবার এই অদ্ভুত আচরণ আর নিজের মন খারাপের কথা বলে সারিমকে নতুন করে আপসেট করতে। এমনিতেই ছেলেটা তার বাবা জন্য ভেতর-ভেতরে কতটা টানটান উত্তেজনায় থাকে, তা অরি জানে। ও নতুন কোনো অশান্তি তৈরি করতে চাইল না।
কিন্তু সারিম যেন অন্য মুডে ছিল।সে ঘরে ঢুকেই অরির এই গম্ভীর রূপ দেখে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল।এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অরির টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসল।

“কী ব্যাপার বউ? এখানে একা একা পেঁচার মতো মুখ করে বসে আছ কেন? আনোয়ার সিমেন্টের জোড় কি এখনই আলগা হতে শুরু করেছে?” সারিম চোখ টিপে দুষ্টামি শুরু করে দিল।
অরি একটা বিরক্তিকর ভঙ্গি করে বলল,
“দেখুন সারিম, ফালতু বকবক করবেন না। এমনিতেই আমার মাথা ধরে আছে। যান এখান থেকে।”
সারিম অরির এই বিরক্তিকে মোটেও পাত্তা দিল না। ও আলতো করে অরির সামনে থাকা বই আর খাতাগুলো এক ঝটকায় সরিয়ে একপাশে রেখে দিল। তারপর নিজের পেছনে লুকিয়ে রাখা দুটো কাঁচের বোতল এনে টেবিলের ওপর রাখল।
বোতল দুটোর ভেতরে চমৎকার রঙিন তরল। অরি ভাবল, হয়তো সারিম ওর জন্য ফ্রিজ থেকে কোনো ফ্রুট জুস বা এনার্জি ড্রিংক নিয়ে এসেছে। সারিম কিছু বলার আগেই, অরি নিজের তৃষ্ণা আর মানসিক ক্লান্তি দূর করতে একটা বোতল টেনে নিল।
“আরে অরি, শোনো! এটা কিন্তু…” সারিম হাত বাড়িয়ে থামানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু অরি সারিমের কোনো কথা না শুনেই বোতলের মুখ খুলে একেবারে একটানে অর্ধেকটা তরল গলায় ঢেলে দিল। তীব্র, ঝাঁঝালো আর একটা অদ্ভুত মাদকতাময় স্বাদ ওর কণ্ঠনালী বেয়ে নেমে যেতেই ও কাশতে শুরু করল।

“উফ! এটা কী জুস? এত ঝাঁঝালো কেন?” অরি চোখ-মুখ কুঁচকে বলল।
সারিম বোতলটা ওর হাত থেকে টেনে নিয়ে হাহা করে হেসে উঠল।
“পাগলী, এটা জুস না! এটা হলো হাই-লেভেল ড্রিংক। ভাবছিলাম আমি একা খাব, কিন্তু তুমি তো দেখি আমার চেয়েও বড় খাদক!”
নেশার প্রথম ধাক্কাটা অরির মগজে গিয়ে লাগতেই ওর চারপাশের চেনা জগৎটা কেমন যেন দুলতে লাগল। ওর ভেতরের সমস্ত সংকোচ, বাবার দেওয়া সেই মানসিক কষ্ট আর ক্লান্তি এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।অরি এক অদ্ভুত হালকা অনুভব করতে লাগল। সারিমও বোতল থেকে বাকি অংশটা গ্লাসে ঢেলে চুমুক দিল।

ঘণ্টাখানেক পরের দৃশ্য।
রিডিং টেবিলের ওপর এখন দুটো খালি বোতল আর অর্ধেক শেষ হওয়া একটা কাঁচের গ্লাস এক কোণায় পড়ে আছে। সারিম আর অরি আজ সীমার চেয়ে একটু বেশিই ড্রিংক করে ফেলেছে। দুজনেরই চোখ ঘুমে আর নেশায় জড়িয়ে আসছে, কিন্তু শরীরের ভেতরের এনার্জি যেন দপ করে উপচে পড়ছে। মদের তীব্র অ্যালকোহল ওদের অবচেতন মনকে পুরোপুরি শাসন করছে।
সারিম ড্রিংকের ঘোরে নিজের সমস্ত ভাবগাম্ভীর্য ভুলে সোফার ওপর জুতোসুদ্ধ দাঁড়িয়ে পড়েছে। আর অরি নিচে পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর দুই পা ছড়িয়ে বসে মাথা দোলাচ্ছে। ওর বাদামী চুলগুলো ইতিমধ্যে খুলে পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম আলগা।
সারিম টেবিলের ওপর থেকে একটা প্লাস্টিকের স্কেল তুলে নিয়ে সেটাকে কাল্পনিক মাইক বানাল। ওটা ঠোঁটের সামনে ধরে, চোখ দুটো বন্ধ করে পুরো ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন! দ্য গ্রেট মিক্সোলজিস্ট,মৃধা আবরার সারিম আজ আপনাদের সামনে শোনাবে এক ঐতিহাসিক, ক্লাসিক সঙ্গীত! অরি… মাই লাভ, বিট ড্রপ কর!”
অরি নিচে বসে মাতাল গলায় খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর একটা তীব্র হিক্কা উঠল, ও হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বলল,

“কোনো বিট নাই রে ভাই! এই দুনিয়ায় সব বিট শেষ! তুই খালি গা… আমি আছি তোর ব্যাকআপ সিঙ্গার! মার টান!”
সারিম সোফার ওপর দাঁড়িয়ে পুরো দমে মাতলামি শুরু করল। শরীরটাকে ডানে-বামে হেলেদুলে, এক হাত আকাশে ছুড়ে দিয়ে গাইতে লাগল,
“সা-গ-র ক-লা_!”
অরি নিচে বসে দুই হাত আকাশে তুলে, চোখ বন্ধ করে পুরো মুখ হা করে চিৎকার দিয়ে ব্যাকআপ দিল,
“হে_!”
সারিম আবার কোমর দুলিয়ে গাইল,
“সবরি কলা_!”
অরি আবার তালি বাজিয়ে চিৎকার করল,
“হে_!”
সারিম এবার সোফার ওপর এক পায়ে তাল ঠুকে গাইল,
“চম্পা কলা_!”
অরি সোফায় ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“হে_!”
সারিম চোখ বন্ধ করে দরদ ঢেলে গাইল,
“কবরী কলা_!”
অরি এবার টাল সামলাতে না পেরে আবার কার্পেটে আছাড় খেয়ে হেসে উঠল এবং গলার রগ ফুলিয়ে টান দিল,
“হে-এ-এ-এ_!”

সারিম এবার সোফা থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামল। ও অরির দুই হাত ধরে ওকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে করতে অত্যন্ত দ্রুত লয়ে, র‍্যাপারদের মতো গাইতে লাগল,
“সাগর কলা, সবরি কলা, চম্পা কলা, কবরী কলা…”
দুজনে মিলে একসাথে হাতের তাল মিলিয়ে, পা দুলিয়ে, ঘরের মাঝখানে টালমাটাল হতে হতে একসঙ্গে সমস্বরে গাইতে লাগল,
“এত রকম কলার ভিতর… নাইকো কোনো ছলাকলা! কলা কলা… কলা কলা…_!”
গান শেষ হতেই দুজনে একসাথে হাসতে হাসতে একে অপরের ওপর ভেঙে পড়ল। সারিমের শক্ত বুকটার ওপর অরির মাথাটা এসে ঠেকল। অরির তপ্ত নিশ্বাস সারিমের গলায় লাগতেই সারিমের ভেতরের সুপ্ত পুরুষটা যেন এক ঝটকায় জেগে উঠল।
হাসির রেশটা আস্তে আস্তে কমে এলো, কিন্তু ঘরের ভেতরের বাতাসটা কেমন যেন ভারী আর উষ্ণ হয়ে উঠল। সারিম নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করল।সে ড্রিংকের ঘোরে চন্দ্রিমা তথা অরির দিকে তাকাল। এই মুহূর্তে অরিকে কোনো বিদ্যাসাগর বা রাগী মেয়ে বলে মনে হচ্ছে না। ওর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই মাতাল হাসি, নেশাগ্রস্ত ডাগর চোখ আর এলোমেলো চুল সারিমকে পুরোপুরি পাগল করে দিচ্ছে।
সারিম আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারল না।সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে অরিকে কোমরে জড়িয়ে ধরে এক ঝটকায় তুলে নিল। অরি নেশার ঘোরে প্রথমে একটু চমকে উঠে সারিমের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল,

“আরে… সারিম, ছাড়ো… কী করছ?”
কিন্তু সারিম কোনো কথা শুনল না। ও অরিকে সোজা নিয়ে গিয়ে ঘরে থাকা সেই বিশাল কাঠের রিডিং টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। টেবিলের ওপর রাখা দু-একটা কলম আর ডায়েরি মেঝেতে পড়ে গেল সশব্দে। সারিম অরির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর দুই হাত শক্ত করে টেবিলের ওপর চেপে ধরল।
এরপর অত্যন্ত উগ্র গভীর ভালোবাসায় অরির শার্টের কলারটা ধরে এক টানে ওপরের বোতামগুলো আলগা করে দিল। অরির ফর্সা, মসৃণ বুকটা উন্মুক্ত হতেই সারিম নিজের মুখটা সেখানে গুঁজে দিল। ওর ঠোঁটের আর দাঁতের তীব্র ছোঁয়া অরির গলার নিচে, কলারবোনে আছড়ে পড়ল।
নেশার ঘোরে অরি প্রথমে কিছুটা কুঁকড়ে গিয়েছিল,সে অবচেতনভাবেই সারিমের চুলগুলো খামচে ধরেছিল সরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সারিমের ঠোঁটের সেই তীব্র উষ্ণতা আর পৈশাচিক ভালোবাসার টান অল্পক্ষণের মধ্যেই অরির ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। মদের নেশা আর শরীরের হরমোনের জোয়ার মিলে অরিকেও এক অন্য দুনিয়ায় নিয়ে গেল।
অরি আর বাধা দিল না। উল্টো সে নিজের দুই পা দিয়ে সারিমের কোমরটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, যেন ও সারিমকে নিজের অস্তিত্বের ভেতর টেনে নিতে চায়।অরি নিজের মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়ে সারিমের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিল।

জানালার বাইরে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু লাইব্রেরি ঘরের ভেতরের অন্ধকার আর কামনার আগুন তখন তুঙ্গে। সারিম অরির শার্টটা পুরোপুরি শরীর থেকে সরিয়ে ফেলে ওর ওপরে ঝুঁকে পড়ল।
দুজনের উত্তপ্ত নিশ্বাসের শব্দ, কাপড়ের খসখসানি আর টেবিলের কাঠের মৃদু আওয়াজ মিলে পুরো ঘরে এক অবর্ণনীয় রোমান্টিক পরিবেশ সৃষ্টি করল। কোনো নিয়ম নেই, কোনো সামাজিক দেওয়াল নেই-আজ রাতে কেবল দুটো মাতাল শরীরের তীব্র মিলন ঘটল। সারিম অরির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে ওকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিল। অরিও সমস্ত লজ্জা ভুলে, নেশার ঘোরে সারিমের প্রতিটি ছোঁয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে লাগল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা বই-খাতাগুলোর মাঝেই আজ রাতে ওদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মিলন সম্পন্ন হলো।

“না… না! সারিম, প্লিজ…”
একটা তীব্র আর্তনাদ গলা চিরে বেরিয়ে আসার আগেই অরি ধড়ফড় করে টেবিলের ওপর উঠে বসল। ওর পুরো শরীর ঘামে লেপ্টে গেছে, বুকের ভেতরটা যেন কোনো এক বুনো ঘোড়ার মতো অবাধ্য গতিতে ওঠানামা করছে।দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল অরি। চোখ দুটো বড় বড় করে ও চারপাশের অন্ধকার ঘরটার দিকে তাকাল।কোথায় সারিম?
জানালার ভারী পর্দার ফাঁক গলে ভোরের এক চিলতে ধূসর আলো এসে পড়েছে লাইব্রেরি ঘরের মেঝেতে। টেবিলের ওপর ঠিক আগের মতোই সাজানো রয়েছে অর্গানিক কেমিস্ট্রির মোটা বইটা, পাশে খাতা আর কলম। কোনো ড্রিংকের বোতল নেই, কোনো খালি গ্লাস নেই। সবকিছু একদম পরিপাটি, নিস্তব্ধ।
অরি নিজের শরীরের দিকে তাকাল। ওর পরনে সেই ঢিলেঢালা প্লাজো আর শার্টটা হুবহু অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। একটা বোতামও আলগা হয়নি।
তার মানে… এতক্ষণ ও যা কিছু দেখছিল, যা কিছু অনুভব করছিল-তার সবটুকুই একটা স্বপ্ন ছিল!
অরির হৃদপিণ্ডের ধকধকানিটা ওর কানের পর্দায় এসে ধাক্কা মারছিল। অরি নিজের দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে টেবিল থেকে নেমে দাঁড়াল। নিজের ভেতরের এই তীব্র লজ্জাবোধ ও কিছুতেই সামলাতে পারছিল না।আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের লাল হয়ে থাকা মুখটা দেখতে পেল।
“ছিঃ ছিঃ ছিঃ অরি! তুই শেষে এই সমস্ত নোংরা, লজ্জাজনক জিনিস স্বপ্নে দেখলি? ওই জল্লাদটার সাথে… ছিঃ!”

অরি নিজের গালে নিজেই হালকা একটা থাপ্পড় মারল।
“তোর মগজ কি একদম পচে গেছে? পড়ার টেবিলে বসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তুই এসব স্বপ্ন দেখছিলি?”
আসলে কাল রাতে লাইব্রেরি রুমে পড়তে বসে অরির মনটা বারবার আরিশান মৃধার সেই রক্তবর্ণ চোখ আর পাথরের মতো শক্ত কণ্ঠস্বর-সবকিছু মিলিয়ে ওর মস্তিষ্কের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। বাবাকে নিয়ে অতর্কিত দুশ্চিন্তা আর পড়ার ক্লান্তিতে চোখটা কখন যে লেগে এসেছিল, বেচারি নিজেই টের পায়নি। আর সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন অবচেতন মনই ওকে এমন এক নিষিদ্ধ, তীব্র গোলকধাঁধায় নিয়ে ফেলেছিল, যা ও কখনো কল্পনার জগতেও স্থান দেয়নি।
অরি ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিল। কিন্তু স্বপ্নের সেই অনুভূতিগুলো, সারিমের সেই তীব্র চাদরের মতো জড়িয়ে ধরার টান যেন কিছুতেই ওর মন থেকে মুছছিল না।অরি নিজেকে নিজে বারবার ধমকাতে লাগল,

“মনোযোগ দে অরি, পড়াশোনায় মনোযোগ দে। এসব ফালতু চিন্তা মাথা থেকে বের কর।”
সকাল তখন সাতটা আটটা।
অরি লাইব্রেরি রুমের জানালাটা খুলে দিয়ে সকালের ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে মাখছিল, নিজের মনটাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ হলো। অরি পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল জেবা দাঁড়িয়ে আছে।
জেবাকে দেখেই অরির বুকের ভেতরটা আবার খচখচ করে উঠল। কিন্তু আজ জেবার অবয়বটা অন্যরকম লাগছিল।চোখের নিচে কালচে দাগ আর মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে আছে। পরনের কাপড়টা কিছুটা কুঁচকানো। দেখলেই বোঝা যায়,ওর মুডটা আজ ভীষণ রকমের খারাপ।
জেবা ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে অরির মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ওর দুই চোখ উপচে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু ও দাঁতে দাঁত চেপে সেটা আটকে রাখার চেষ্টা করছে।অরি কিছুটা শঙ্কিত হয়ে বলল,
“কী হয়েছে জেবা? তোর মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”
জেবা অরির প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না।সে সরাসরি অরির চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভাঙা, অপরাধবোধে জর্জরিত গলায় বলল,

“দোস্ত… আমি কি তোদের জীবনে বড্ড বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়ালাম রে? আমার জন্য কি তোদের বাবা-মেয়ের এই এত সুন্দর, পবিত্র বন্ডিং টা ভেঙে গেল?”
জেবার মুখ থেকে এই কথাটি শুনে অরি পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল।সে আমতা আমতা করে বলল,
“তু-তুই এসব কী বলছিস জেবা? বাবা-মেয়ের বন্ডিং ভাঙবে কেন?”
জেবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইব্রেরির একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল।নিজের দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে নিয়ে মুখটা নিচু করল। ওর চিবুক কাঁপছিল।
“আমায় আর লুকানোর চেষ্টা করিস না অরি। গতকাল রাতে তোর সঙ্গে আঙ্কেল… আই মিন ওনার হওয়া সব ব্যবহার, ওনার সেই রুক্ষ কণ্ঠস্বর-সবকিছু আমি নিজের চোখে দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি।”
অরি অবাক হয়ে বলল, “তুই দেখেছিস? কিন্তু তুই তো রুমে ঘুমাচ্ছিলি!”
“ঘুম ভেঙে গিয়েছিল রে,” জেবা ঝাপসা চোখে অরির দিকে তাকাল।

“হঠাৎ মাঝরাতে জেগে দেখি তুই রুমে নেই। ভেবেছিলাম হয়তো নিচে জল খেতে গেছিস বা কিছু। তোকে খুঁজতে আমি যখন রুম থেকে বের হই, তখন দোতলার সিঁড়ির ওপর থেকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই আঙ্কেল ভেতরে ঢুকছেন। তুই যখন ওনার কাছে এগিয়ে গেলি, ওনি যেভাবে তোকে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলেন আর শক্ত গলায় কথা বললেন… সেটা দেখার পর আমার নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে অরি।এই সবকিছু জন্য আমি দায়ী শুধু।”
জেবার চোখ বেয়ে এবার টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।সে নিজের ওড়না দিয়ে মুখটা চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
“আমার এই ভালোবাসাটা কেন পাপ হলো বল তো অরি? সমাজ কেন এটাকে এভাবে দেখছে? ওনার আর আমার বয়সটা এক নয় বলে? কেন অরি… আমিতো ওনার বয়স নিয়ে, ওনার অতীত নিয়ে কোনোদিন কোনো প্রশ্ন তুলিনি! আমার মনে ওনার জন্য যে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আছে, সেখানে তো কোনো খামতি ছিল না। তাহলে বাধাটা কোথায়?”

অরি জেবার পাশে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসল। ও জেবার কাঁধে হাত রেখে ওনাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু জেবা আজ ওর ভেতরের জমানো সব ক্ষোভ আর কষ্ট উগরে দিতে চাইল।
“ওনি হয়তো আমাকে কোনোদিনও সেই নজরে দেখবেন না অরি। আমি হয়তো সারিম ভাইয়ার জোরে, তোদের পরিবারের ওনার স্ত্রী হিসেবে একটা সামাজিক স্বীকৃতি পাব, ওনার বাড়িতে ওনার স্ত্রী পরিচয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাব… কিন্তু ওনি মনে মনে আমাকে কোনোদিনও মেনে নিতে পারবেন না। ওনি কখনো আমাকে ভালোবাসবেন না।”

জেবা অরির হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।
“দরকার কী অরি? দরকার কী এই জোর করে তৈরি করা সম্পর্কের সামনে আগানোর? যেখানে কোনো আত্মিক টান নেই! দেখছিস না, ওনি আমার এই উপস্থিতির জন্য তোর থেকে,সারিম ভাইয়ার কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিচ্ছেন! ওনি নিজেকে একটা খাঁচায় বন্দি করে ফেলছেন। আমার কারণে তোদের এই হাসিখুশি পরিবারটায় একটা নীরব অশান্তির ছায়া নেমে এসেছে। আমি এটা সহ্য করতে পারছি না।”
জেবার এই তীব্র আত্মগ্লানি আর কান্না দেখে অরির নিজের চোখের কোণও ভিজে উঠল। ও খুব ভালো করেই জানে আরিশান মৃধার ব্যক্তিত্ব কতটা কঠিন। কিন্তু অরি এটাও বোঝে যে, জেবার মনে কোনো পাপ বা লোভ ছিল না। জেবা সত্যিই আরিশান মৃধাকে ওর সমস্ত খামতিসহ ভালোবেসেছে।
অরি জেবার চোখের জল আলতো করে মুছে দিল।এরপর জেবার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত নরম, শান্ত এবং বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“জেবা, শান্ত হ। নিজেকে এতটা অপরাধী ভাবা বন্ধ কর। তুই কোনো পাপ করিসনি, আর কারো সুন্দর জীবন তুই নষ্ট করতে আসিসনি। তুই একটা কথা ভেবে দেখিসনি দোস্ত… যেকোনো সম্পর্ক, বিশেষ করে এরকম একটা অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক ঠিক হতে কিছুটা সময় তো লাগেই।”
জেবা কাঁদতে কাঁদতেই অরির দিকে তাকাল।
অরি একটা মৃদু শ্বাস নিয়ে বলতে লাগল,
“বাবা সারাজীবন একটা নির্দিষ্ট নীতি, একটা কঠোর গাম্ভীর্য নিয়ে চলেছেন। মায়ের চলে যাওয়ার পর ওনি নিজের চারপাশটায় একটা শক্ত দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন। ওনার জীবনে এই পরিবর্তনটা এত দ্রুত, এত আকস্মিকভাবে ঘটবে-সেটা ওনি মানসিকভাবে একদমই প্রস্তুত ছিলেন না। বিশেষ করে তুই… তোকে ওনি এতদিন আমার বান্ধবী হিসেবে, নিজের মেয়ের মতো স্নেহের চোখে দেখে এসেছেন। ওনার মতো একজন গম্ভীর মানুষের পক্ষে সেই চেনা মানসিকতা ভেঙে হুট করে তোকে ওনার স্ত্রীর আসনে বসানো বা তোকে সেই নজরে দেখাটা কি আসলেই এতটা সহজ?”
অরির কথার গভীরতা জেবার মনের ভেতরের ক্ষোভটাকে কিছুটা প্রশমিত করল। ও চুপচাপ অরির কথাগুলো শুনতে লাগল।

“মানুষের মন তো কোনো রোবট নয় যে সুইচ টিপলেই অনুভূতি বদলে যাবে,”
অরি হাসার চেষ্টা করে বলল। “বাবা এখন একটা তীব্র আত্মদ্বন্দ্বে ভুগছেন। ওনি একদিকে নিজের নীতি আর সমাজের চোখের ভয় পাচ্ছেন, অন্যদিকে তোদের এই নতুন সম্পর্কের বাস্তবতা ওনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ওনি কাল রাতে যে রুক্ষ ব্যবহারটা আমার সাথে করেছেন, সেটা আমার ওপর রাগ থেকে করেননি রে। সেটা ওনার নিজের ভেতরের সেই অশান্তি,আর মানসিক ট্রমার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ওনি নিজেকে সামলাতে পারছেন না বলেই আমাদের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখছেন।”
অরি জেবার গালে হাত বুলিয়ে বলল,
“একটু সময় দে জেবা। একটু সময় দিতেই হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। যে আল্লাহ তোদের এই অসম পরিস্থিতিকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন, ওনি নিশ্চয়ই সামনে সব ঠিক করে দেবেন। আর তুই নিজেকে একা ভাবছিস কেন? আমি আর সারিম তো সবসময় তোর পাশে আছি। আমরা তোকে এই গোলকধাঁধায় একা ফেলে কোনোদিনও যাব না।”

অরির এই পরিপক্ব আর সান্ত্বনাদায়ক কথাগুলো জেবার বুকের ভেতরের সেই পাথরের মতো ভারী কষ্টটাকে এক নিমেষে হালকা করে দিল।সে অরির দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করল। এই কঠিন পরিস্থিতিতে, যেখানে নিজের পরিবারও হয়তো ওকে ভুল বুঝছে, সেখানে অরি ওর পাশে এক অটল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর কোনো ভুল ধরেনি, ওকে সমাজচ্যুত ভাবেনি।
জেবা অত্যন্ত ইমোশনাল হয়ে পড়ল।ও এক ঝটকায় অরিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখের জল কৃতজ্ঞতার অশ্রু হয়ে অরির শার্টের কাঁধটা ভিজিয়ে দিল।
“আমি সত্যিই খুব ভাগ্যবান রে অরি,”
জেবা ফিসফিস করে বলল, ওর গলাটা তখনো কান্নায় বুজে আসছিল।
“তোর মতো একজন ফ্রেন্ড আর সারিম ভাইয়ার মতো একজন মানুষের সাপোর্ট না পেলে আমি হয়তো এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে কবেই নিজেকে শেষ করে দিতাম। তোরা আমার জন্য যা করছিস, এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।”
অরি জেবার পিঠ চাপড়ে দিয়ে হেসে বলল,

“ধুর বাদামনী! বান্ধুবীদের মধ্যে আবার কিসের ঋণ? এখন চল, এই পেঁচার মতো মুখটা ধুয়ে আয়। আর শোন… পড়াশোনা একদম বাদ দেওয়া যাবে না।যেভাবেই হোক মেডিকেল এ চান্স পেতেই হবে কিন্তু।”
জেবা অরির কথায় একটু হেসে ফেলল। ওর মনের মেঘগুলো যেন কিছুটা কেটে গেল। ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো মুছে বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। তারপর দুজনে একসাথে মিলে পড়তে বসবো”
জেবা লাইব্রেরি রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর অরি আবার জানালার দিকে তাকাল। সকালের সদ্য রোদ তখন চারপাশটাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। অরি নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। জেবাকে ও সান্ত্বনা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওর নিজের মনের ভেতরের সেই দোটানায় ভুগছে। সে জেবাকে ক্ষানিকের সান্তনা দিয়ে জেবার ক্যারিয়ার দিকে ফোকাস ধরে রাখতে চাচ্ছে। অপর দিকে আরিশাধ মৃধার অবস্থা সম্পর্কেও অরি অবগত। বুঝতে পারছেনা এই অসম বয়সের প্রেমের শেষ পরিনাম আসলে কি হবে?

সকালের কড়া রোদ তখন জানালার কাঁচ গলে এসে পড়েছে সারিমের মুখের ওপর। এমনিতেই রাতে অরির সেই কেমিস্ট্রির নোটস লেখার চক্করে বেচারার সারা রাতের ঘুম হারাম হয়েছে। একটা একটা করে কঠিন কঠিন সমীকরণ আর বিক্রিয়া লিখতে গিয়ে হাতের আঙুলগুলোর বারোটা বেজে গেছে। ভোরের দিকে যখন অরি ওকে ফেলে নিজের রুমে চলে গেল, তখন সোফায় শুয়ে কোনোমতে চোখে একটু ঘুম লেগেছিল। কিন্তু সেই সাধের ঘুমটাও বেশিক্ষণ টিকল না।
হঠাৎই টেবিলের ওপর রাখা সারিমের ফোনটা এক কর্কশ, তীব্র শব্দে বেজে উঠল।
শব্দটা কানে যেতেই সারিম কপালে হাত দিয়ে একটা গভীর বিরক্তির আওয়াজ করল।
“ধুর বাল!

চোখ না খুলেই হাতড়ে হাতড়ে ফোনটা ধরল ও। স্ক্রিনে আলভির নামটা জ্বলজ্বল করছে।
“শালা আলভি! তোর কপালে আজ নির্ঘাত শনি আছে!”
বিড়বিড় করে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে নিল সারিম। ওর গলা তখন ঘুমে আর ক্লান্তিতে ভাঙা।
“কী চাও আলভি? সকাল সকাল মরার মতো চিল্লাচ্ছো কেন? তোমাকে না বলেছি আজ দুপুর বারোটার আগে আমাকে কোনো ফোন দিবে না?”
ফোনের ওপাশ থেকে আলভির কাঁদো কাঁদো আর আতঙ্কিত সুর ভেসে এলো,
“স্যা-স্যার! ও স্যার! আপনি দ্রুত হসপিটালে আসুন স্যার! দোহাই আপনার, জলদি আসুন… আমাকে ওই মহিলার হাত থেকে বাঁচান স্যার! আমি আর পারছি না!”
সারিম চোখ কুঁচকে সোজা হয়ে বসল। ওর ঘুম যেন অর্ধেক উবে গেল। ও বুঝতে পারল না আলভি আসলে কোন মহিলার কথা বলছে।

“মহিলা? কোন মহিলা? তুমি কার কথা বলছো?পরিষ্কার করে বলো!”
“স্যার, ঐ… ঐ বেডি আমাকে আস্ত চিবিয়ে খাবে! ওর হাত থেকে আমাকে একমাত্র আপনিই বাঁচাতে পারেন। ও স্যার, জলদি আসুন…”
আলভি এইটুকু বলেই ওপাশ থেকে হুট করে কলটা কেটে দিল। সারিম আবার ব্যাক কল করার চেষ্টা করল, কিন্তু ওপাশ থেকে ফোনটা সুইচড অফ দেখাল।
“ধুর শালা! কুত্তার বাচ্চা একটা!”
সারিম ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল।
“নিজে তো মরবেই, সকাল সকাল আমারও মেজাজটা চট চট করে দিল। কোন ডাইনির খপ্পরে পড়েছে খোদা জানে!”

অগত্যা বিছানা থেকে নামতেই হলো ওকে। পিঠের আর আঙুলের ব্যথাটা এখনো সামান্য চনমন করছে। আলভিকে মনে মনে কয়েকশ গালি দিয়ে সারিম বাথরুমে ঢুকে গেল ফ্রেশ হতে।মিনিট কুড়ি পর।
বাথরুম থেকে বের হয়ে আসল সারিম।পরনে একটা সাদা পাঞ্জাবি আর আলগা ফিটিংসের পায়জামা পরে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলোতে নিপুণ হাতে জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে সেট করল। চওড়া বুকটার ওপর পাঞ্জাবির পকেটে এনে রাখল দামি ব্র্যান্ডের সানগ্লাস। আয়নায় নিজের অবয়বটা দেখে সারিম নিজেই একটু বাঁকা হাসল।এরপর টেবিলের উপর থেকে ওয়ালেট আর ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে আসল রুম থেকে।
এদিকে অরি তখন লাইব্রেরি ঘর থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ওর চোখ পড়ল সারিমের ওপর।

শিক্ষামন্ত্রী জামাইকে আজ এই শুভ্র সাদা পাঞ্জাবিতে দেখে অরির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন এক অচেনা, তীব্র আলোড়নে কেঁপে উঠল।মনের এক কোণায় এক অদ্ভুত অনুভূতি দানা বাঁধতে শুরু করল, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি। কিন্তু অরি তো অরিই!সে এক ঝটকায় সেই অনুভূতিটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল, এক প্রকার পাত্তাই দিতে চাইল না।
“ধুর! কী ভাবছি এসব পচা জিনিস!ভোরের ওই নোংরা স্বপ্নের প্রভাব এখনো মগজ থেকে যায়নি দেখছি!” অরি মনে মনে নিজেকে শাসন করল।
কিন্তু মন মুখে যা-ই বলুক, অরির চোখ দুটো কিন্তু আজ সারিমের ওপর থেকে সরছিল না।নিজের অজান্তেই সারিমকে একদম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। আজকে ওর মনে হলো,লোকটা আসলেই অসম্ভব রকমের সুদর্শন আর পুরুষালি। যা এতদিন ওর নজরে পড়লেও ওভাবে কখনো গভীরভাবে লক্ষ্য করেনি।
সারিমের সেই ফর্সা গাল, নিখুঁতভাবে ট্রিম করা কালো দাড়ি, আর যখন সারিম ফোনে কথা বলার জন্য গলাটা সামান্য ওপরে তুলল-ওর গলার সেই অ্যাডামস অ্যাপেল বা কণ্ঠমণিটা দেখে অরির চোখের পাতায় এক মুহূর্তের জন্য ঘোর লেগে গেল।
নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে মনে মনে বলল,

“লোকটা দেখতে এত সুন্দর কেন? আর এই সাত সকালে এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছে ওনি?”
একই সাথে অরির বুকের ভেতর এক তীব্র হিংসার উদয় হলো,যা ও নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারছিল না। অরির মনে হতে লাগল,এই লোকটা এভাবে বাইরে বের হলে তো অন্য মেয়েরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে!এই চিন্তাটা আসতেই অরির মেজাজটা আরও বিগড়ে গেল।
সারিম করিডোর দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসছিল। ঠিক তখনই ওর সামনে পড়ল অরি আর জেবা। জেবা ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে অরির সাথে পড়ার ঘরে যাওয়ার জন্য বের হয়েছে।
অরি ভেবেছিল সারিম ওকে দেখে হয়তো কাল রাতের সেই নোটস লেখার খাটুনির খোঁটা দেবে বা নতুন করে জ্বালাতন শুরু করবে। এই ভেবে অরি নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করাল।কিন্তু অবাক করার বিষয় আজ সারিম অরির দিকে তাকালই না।সে অরিকে দেখে এমন একটা উদাসীন ভাব নিল,যেন অরিকে সে চেনেই না!সারিমের চোখজোড়া সরাসরি অরিকে এড়িয়ে গিয়ে জেবার ওপর গিয়ে স্থির হলো।
সারিম অত্যন্ত ভদ্র এবং গুরুগম্ভীর গলায় জেবাকে জিজ্ঞাসা করল,

“জেবা,ঠিক আছো তো?কোনো সমস্যা হলে বা কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে বাড়িতে কাজের লোকেদের জানাবে,নয়তো আমাকে বলবে। আর পড়াশোনাটা মন দিয়ে করো।”
জেবা একটু মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ ভাইয়া, আমি ঠিক আছি। ধন্যবাদ।”
সারিম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ওর জুতোর খটখট শব্দ তুলে সে অরিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিচে নেমে চলে গেল।
সারিমের এই অবহেলা আর অচেনা ভাব দেখে অরির রাগ একদম সপ্তম আসমানে গিয়ে ঠেকল।সে নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করল।
“কী ভাবেন ওনি নিজেকে? অহংকারী জল্লাদ একটা!” অরি মনে মনে সারিমকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলার মতো রাগ দেখাল।
জেবা অরির এই লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“কী রে অরি? সারিম ভাইয়া তোকে একটা কথাও বলল না যে? তোদের মধ্যে আবার ঝগড়া হয়েছে নাকি?”
“ওনার সাথে ঝগড়া করতে আমার বয়েই গেছে! চল নিচে যাই বাদামনী, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে,” অরি জেবাকে টেনে নিয়ে নিচের দিকে পা বাড়াল।
এদিকে সারিম তখন ড্রয়িংরুম পার হয়ে মেইন করিডোরে এলো, তখন সে দেখল আরিশান মৃধা দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, বোধয় অফিসে যাবেন ওনি।পরনে ফর্মাল স্যুট,চোখ-মুখ পাথরের মতো শক্ত।সারিমকে দেখতে পেয়ে ওনি দ্রুত পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলেন।যেন সে এখান থেকে পালাতে চাইছেন।
সারিম বাবার এই অবয়ব দেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চতুর আর বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। গোটা একটা দিন পর,সে বাবার মুখোমুখি হচ্ছে।সারিম নিজের পকেট থেকে সানগ্লাসটা বের করে আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে ডাকল,

“মিনিস্টার আরিশান মৃধা! সকাল সকাল এত তাড়া কিসের?একটু দাঁড়িয়ে আমার কথাগুলো শুনে গেলে ভালো হতো?”
আরিশান মৃধা দরজার হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ওনি ধীর পায়ে পিছু ঘুরে সারিমের দিকে তাকালেন।ওনার চোখে এক তীব্র বিরক্তি আর অবজ্ঞা স্পষ্ট।তিনি অত্যন্ত ভারী গলায় বললেন,
“আমার অফিসের সময় হচ্ছে সারিম। তোমার এই ফালতু বকবক শোনার সময় আমার এখন নেই।”
সারিম এক কদম এগিয়ে এসে ওনার মুখোমুখি দাঁড়াল। ওর গলায় এক অদ্ভুত উপহাসের সুর,
“অফিসের সময় তো বুঝলাম। কিন্তু গোটা একটা দিন পর ছেলের সাথে দেখা হলো,একটা সৌজন্যমূলক কথাও বলবে না? কাল সারাদিন আর সারা রাত তুমি কোথায় ছিলে, সেটা কি আমি জানতে পারি?”
আরিশান মৃধা ওনার চোয়াল শক্ত করে বললেন,

“তোমাকে এত কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না আমি। আমি কোথায় থাকি,না থাকি-সেটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়।”
ঠিক তখনি ওপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে অরি আর জেবা একসাথে নিচে নেমে এলো। ড্রয়িংরুমে বাপ-ছেলের এই টানটান উত্তেজনার মুখোমুখি হতেই দুজনেরই পায়ের গতি থমকে গেল।অরি আর জেবা এক কোণায় দাঁড়িয়ে এই বাপ-ছেলের সকাল বেলার তামাশা দেখতে লাগল।
সারিম সিঁড়ির দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে অরি ও জেবাকে দেখে নিল। তারপর বাবার দিকে ফিরে আবার সেই চতুর,বাঁকা হাসিটা হাসল।গলার আওয়াজটা কিছুটা বাড়িয়ে বলল,
“বেশ! আমাকে না হয় কৈফিয়ত দিলে না, সেটা মেনেই নিলাম। আমি তো তোমার অবাধ্য ছেলে! কিন্তু নিজের ঘরে যে এত সুন্দর একটা বউ রেখেছ, তাকে তো অন্তত বলে যেতে পারো যে তুমি কোথায় যাচ্ছ বা কাল রাতে কোথায় ছিলে? নাকি তার প্রতিও তোমার কোনো দায়িত্ব নেই?”
সারিমের এই প্রকাশ্য এবং তীক্ষ্ণ খোঁচায় আরিশান মৃধার ফর্সা মুখটা রাগে এক নিমেষে লাল হয়ে গেল। ওনার কপালে রগগুলো ফুলে উঠল। ওনি আঙুল উঁচিয়ে অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন,

“সারিম! তুমি নিজের লিমিট ক্রস করছো! মনে রেখো, তুমি যার সাথে কথা বলছ, সে তোমার জন্মদাতা পিতা!”
সারিমের অবশ্য ওর বাবার এই রাগে বিন্দুমাত্র কিছু আসে যায় না।উল্টো সে নিজের সানগ্লাসটা চোখে পরে আবার ওটা নাকের ডগায় নামিয়ে এনে বলল,
“আরে রাগ করছ কেন পিতা? আমি তো জাস্ট একটা সাধারণ মানবিক প্রশ্ন করলাম। তুমি তো দেখি একটা আস্ত ‘শ্যামলেস ম্যান’ ঘরে এত সুন্দর, নিষ্পাপ একটা বউ থাকতে তুমি কেমন সবসময় পালাই পালাই করো! সারাক্ষণ মুখটা কালো করে রাখো। না মানে… তোমার অন্য কোনো সমস্যা নেই তো আবার? বয়সজনিত কোনো দুর্বলতা বা… অন্য কিছু? যদি তেমন কিছু থাকে, তুমি চাইলে আমাকে পারসোনালি শেয়ার করতে পারো। তোমার ছেলে হিসেবে আমি তোমাকে দেশের ভালো কোনো ডাক্তারকে সাজেস্ট করতে পারি।”
সারিমের মুখে এই চরম আপত্তিকর আর লজ্জাজনক কথা শুনে আরিশান মৃধার মনে হতে লাগল-এই ছেলেকে ওনি জন্ম দিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছেন! ওনার হাত দুটো রাগে কাঁপছিল। ওনি এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা জেবার দিকে একবার তাকালেন, জেবা তখন লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাওয়ার অবস্থা।

আরিশান মৃধা বুঝতে পারলেন, এই বেয়াদব ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে তর্ক করা মানে নিজের সম্মান আরও ধুলোয় মেশানো। ওনি সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানো কে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন না।তাই দ্রুত ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
কিন্তু সারিম ওনাকে এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।সে পিছন থেকে বেশ জোরে শিস দিয়ে বলে উঠল,
“ওহ মাই ড্যাডি ! যাচ্ছো ভালো কথা,যাও। কিন্তু নিজের স্ত্রীর থেকে পারমিশন কেন নিচ্ছো না?দুষ্টু বাচ্চা হয়ে যাচ্ছো দেখি।স্বামী কাজে যাওয়ার সময় স্ত্রীর দোয়া নিয়ে বের হতে হয়।নয়তো পাপ হয় পাপ। তুমি কি সেই নিয়মটাও জানো না?”

আরিশান মৃধা দরজার কাছে গিয়ে হুট করে দাঁড়িয়ে গেলেন। ওনার ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। ওনি ধপাস করে পিছু ঘুরলেন। ওনার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল। ওনি করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বললেন,
“আমি কোনো পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না! কার কাছ থেকে পারমিশন নেব? আর কিসের দোয়া?”
সারিম নিজের পকেট থেকে হাত দুটো বের করে বুক টান করে দাঁড়াল। ওর কণ্ঠস্বর এবার কিছুটা গম্ভীর ও চড়া হলো,
“কেন? কার কাছ থেকে মানে কী? জেবার কাছ থেকে! যেহেতু ওর সাথে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে,এখন সে তোমার বৈধ স্ত্রী।বউয়ের সমস্ত সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব কিন্তু এখন তোমার!”
সারিমের কথা শুনে আরিশান মৃধা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। ওনি সারিমের দিকে দুই কদম এগিয়ে এসে ছেলের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে, অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন,

“বিয়ে যেহেতু তুমি দিয়েছ,তাই জেবার সমস্ত দায়িত্ব তোমার! আমার না! ও আমার কেউ নয়, আর ওর কোনো দায়িত্ব নেওয়ার দায়বদ্ধতাও আমার নেই!”
কথাটা বলেই আরিশান মৃধা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না। ওনি দরজার পেরিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ওনার যাওয়ার শব্দে পুরো ড্রয়িংরুমটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
করিডোরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা জেবার চোখের কোণ বেয়ে এবার টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। আরিশান মৃধার এই চরম প্রত্যাখ্যান আর অস্বীকার ওর বুকের ভেতরটা তীরের মতো বিঁধেছে।জেবা আর সেখানে দাঁড়াতে পারল না,ও মুখ চেপে ধরে দৌড়ে ওপরের ঘরের দিকে চলে গেল।
অরি স্তব্ধ হয়ে বাবার যাওয়া দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সারিমের দিকে এগিয়ে গেল। ওর চোখ দুটো তখন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে।

“খুশি হয়েছেন আপনি?”
অরি সারিমের সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
“সকাল সকাল একটা নোংরা তামাশা তৈরি করে জেবা আর বাবাকে এভাবে অপমান করে আপনার ওই কুৎসিত অহংকারটা তৃপ্ত হলো তো?”
সারিম অরির এই চিল চিৎকার শুনেও মোটেও বিচলিত হলো না।নিজের চোখের সানগ্লাসটা ঠিক করে পরে নিয়ে অরির কানের কাছে ঝুঁকে এলো। অত্যন্ত নিচু আর শীতল গলায় বলল,
“তামাশা তো কেবল শুরু চন্দ্রিমা। আনোয়ার সিমেন্টের মনটা যদি এইটুকুতেই ভেঙে যায়, তাহলে সামনে যে বড় ঝড় আসছে, তা কীভাবে সামলাবে বউ? নিজের বান্ধবীকে গিয়ে সান্ত্বনা দাও, আমার এখন হসপিটালে একটা ডাইনিকে সোজা করতে যেতে হবে।”
কথাটা বলেই সারিম অরিকে একটা বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে করিডোর পার হয়ে গটগট করে বাইরে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল। আর অরি করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাগে, ক্ষোভে আর এক অজানা আশঙ্কায় কাঁপতে লাগল।

আলভি দুই হাত জোড় করার চেষ্টা করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“নওমি জান… আমার সোনা, আমার লক্ষ্মী বউ! এভাবে রাগ করে না প্লিজ! স্ট্যান্ডটা নামাও, ওটা লেগে আমি এমনিতেই পঙ্গু, ওটা দিয়ে মারলে একদম মরেই যাব!”
নওমি স্ট্যান্ডটা ওর দিকে উঁচিয়ে গর্জে উঠল,
“চুপ কর তুই! তোর মুখ থেকে ওসব জান-সোনা ডাক শুনলে আমার বমি আসে! তুই আমাকে কোন সাহসে বউ ডাকিস, হ্যাঁ?”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১২

আলভি আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে ঢোক গিলে বলল,
“আহা দেখো, রাগ করো না। বিয়েটা কিন্তু আমি ইচ্ছে করে একা একা করতে চাইনি। কাল রাতে তোমার সম্মতি ছিল বলেই তো কাজী অফিসে বিয়েটা হয়েছে। এখন হুট করে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে এভাবে অস্বীকার করলে কি চলে?”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here