ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২
মেহজাবিন নাদিয়া
ভোরের আলো তখনো গুলশানের বিশাল বাংলোর কাঁচের জানালা গলে ঠিকঠাক ফুটে ওঠেনি। চন্দ্রমল্লিকার সুবাস মাখানো এক হিমেল হাওয়া জানালার ভারী পর্দাটাকে সামান্য দোলাচ্ছিল। গেস্টরুমের নরম, ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা তেরো বছরের কিশোরী অরি প্রথমে একটা তীব্র ব্যথার অনুভূতিতে শিউরে উঠল। ঘুমের ওষুধের কড়া ঘোরটা যখন আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছিল, তখন ওর অবশ হয়ে থাকা মস্তিষ্কে প্রথম আঘাত করল শরীরের ভেতরের এক অসহ্য জ্বালা। মনে হচ্ছিল, পুরো পিঠ আর হাত-পা জুড়ে কেউ যেন জ্বলন্ত কয়লা বিছিয়ে রেখেছে।
অরি খুব কষ্ট করে নিজের ভারী চোখের পাতা দুটো মেলল। কিন্তু চোখ মেলা মাত্রই সে এক পরম বিস্ময় আর আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার চেনা সেই ভাঙা ঘরের টিনের চাল নেই, মাথার ওপরে ঘুরছে এক রাজকীয় ঝাড়বাতি। যে জরাজীর্ণ কাঠের চৌকিতে সে ছ্যাঁতছ্যাঁতে চট বিছিয়ে ঘুমাত, তার বদলে তার শরীরটা ডুবে আছে তুলতুলে নরম, ধবধবে সাদা এক বিছানায়। অরি চমকে উঠে ঝটকা দিয়ে উঠে বসতে গেল, কিন্তু সাথে সাথেই পিঠের চামড়া ফেটে যাওয়ার মতো তীব্র ব্যথায় তার মুখ দিয়ে একটা অবরুদ্ধ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো—
“আহ্!”
ব্যথার চোটে ওর চোখের কোণ দিয়ে নোনতা জল গড়িয়ে পড়ল। সে হাত দিয়ে নিজের শরীরটা দেখল। কোথায় তার সেই বিয়ের লাল বেনারসি শাড়ি? তার গায়ে এখন জড়ানো অত্যন্ত নরম, হালকা নীল রঙের একটা সুতির টপ। ওর সারা শরীরে, হাতে, কবজিতে সাদা ব্যান্ডেজ করা।
মুহূর্তের মধ্যে অরির ছোট্ট মস্তিষ্কে গত কালকের ঘটে যাওয়া প্রতিটি দৃশ্য চলচ্চিত্রের মতো ভেসে উঠতে লাগল। বিয়েবাড়ির সেই কোলাহল, মানুষের বাঁকা চাহনি,ওর বরের সেই গাড়ি হাঁকিয়ে উদভ্রান্তের মতো চলে যাওয়া, চাচির সেই পৈশাচিক বাঘিনী রূপ, অন্ধকার স্টোররুম, আর… আর সেই ভারী কাঠের ব্যাটের প্রতিটি নির্মম আঘাত! অরি ভয়ে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। তার মনে হলো, এখনো যেন চাচির সেই হিসহিসানি আওয়াজটা তার কানের কাছে বাজছে,
“তুই একটা অলক্ষ্মী! তুই একটা ডাইনি!আজ তোকে আমি মেরেই ফেলব”
অরি ভয়ার্ত চোখে ঘরের চারপাশটা দেখতে লাগল। রুমটা বিশাল। এক কোণে দামী কাঠের আলমারি, ড্রেসিং টেবিল,আরেপাশে পাতানো একসেট সোফা আর টি টেবিল,ঘরের দেয়াল গুলো কাচের। আর সেই কাচের দেয়াল থেকে বাইরে দেখা যাচ্ছে এক বিশাল সবুজ বাগান। অরি বুঝতে পারল, এটা সেই লোকটার বাড়ি—যে লোকটা কালকে তাকে সেই নরক থেকে কোলে তুলে নিয়ে এসেছিল। যার সাদা পাঞ্জাবিতে অরির পিঠের তাজা রক্ত লেগে লাল হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এই রাজকীয় পরিবেশ অরির মনে কোনো শান্তি দিল না। উল্টো এক তীব্র হীনমন্যতা আর ভয় তাকে গ্রাস করতে লাগল। অরির তেরো বছরের কাঁচা মনটা ভাবল,
“আমি এখানে কেন? ওনারা তো অনেক বড় লোক। ওই লোকটা তো দেশের মন্ত্রী। ওনার ছেলে তো কালকে আমাকে ফেলে চলে গেছে। কেউ আমাকে চায় না। চাচি তো ঠিকই বলত, আমি একটা মস্ত বড় বোঝা। যার জীবনে মা-বাবা নেই, তাকে সবাই ফেলে দেয়। এই যে এতো বড় একটা ঘরে আমাকে এনে রাখা হয়েছে, এখানেও তো আমি একটা উটকো ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই না।”
অরির মনে পড়ে গেল তার বরের সেই অবহেলাপূর্ণ উক্তি-“বিয়ে করতে বলেছ, করেছি। এখন আমার কাজ শেষ।”
তার মানে, ওই গম্ভীর চেহারার বরটাও তাকে ঘৃণা করে। সেও তাকে ফেলে চলে গেছে। অরির মনে হলো, এই বিশাল বাড়িতে যদি সে আর এক মুহূর্তও থাকে, তবে এখানকার মানুষগুলোও তাকে একদিন চাচির মতোই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে, অলক্ষ্মী বলে গালি দেবে। তার চেয়ে ভালো, সে নিজেই কোথাও চলে যাক। কিন্তু কোথায় যাবে সে? তার তো এই বিশাল পৃথিবীতে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।
“বাবা… তুমি কেন আমাকে একা ফেলে চলে গেলে?”
অরি দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে এনে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কিন্তু তার কাঁদারও অধিকার নেই। এই অচেনা বাড়িতে কেউ যদি তার কান্নার আওয়াজ পেয়ে যায়, তবে হয়তো ধমক দেবে।
ভয়ে আর নিজের জীবনের প্রতি তীব্র ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে অরি বিছানা থেকে নামল। পায়ের পাতায় কোনো জুতো নেই। অত্যন্ত ধীর পায়ে, চোরের মতো চারপাশ তাকাত তাকাতে সে রুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল। অরি আস্তে করে কবাটটা ঠেলে বাইরে উঁকি দিল। বিশাল করিডোর একদম নিঝুম। বাড়ির কাজের লোক বা বডিগার্ডরা হয়তো তখনো ওদিকের অংশে ব্যস্ত।
অরি নিজের ব্যথায় অবশ হয়ে যাওয়া শরীরটাকে টেনে টেনে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। বসার ঘর পার হয়ে পেছনের একটা ছোট দরজা খোলা পেয়ে সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না। তীব্র আতঙ্ক আর বোকা অবুঝ মনের তাড়নায় অরি সেই বিশাল বাংলোর পেছনের গেট দিয়ে বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। কেউ তাকে দেখল না, কেউ তাকে আটকাল না। একটা তেরো বছরের অনাথ, ভীতু মেয়ে নিজের ভাগ্যকে এড়াতে আবার এক অজানা অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল।
এদিকে সকাল ১০টা। ঢাকার বেইলি রোডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তখন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও থমথমে মিটিং চলছে। সামনেই জাতীয় নির্বাচন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দলের আন্দোলন সামলানো এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়ে দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা।
আরিশান মৃধার পরনে আজ একটি গাঢ় ধূসর রঙের সাফারী স্যুট। ওনার চিরচেনা সেই গম্ভীর, ইস্পাতকঠিন মুখাবয়ব। চোখের চশমার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক তীক্ষ্ণ, দূরদর্শী দৃষ্টি। ওনার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দে সভাকক্ষে উপস্থিত আইজিপি, র্যাব মহাপরিচালক এবং স্বরাষ্ট্র সচিবরা তটস্থ হয়ে বসে আছেন। আরিশান মৃধা ওনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কখনো কোনো দায়িত্বে অবহেলা সহ্য করেননি। ওনার প্রশাসনিক দক্ষতা এতটাই কড়া যে, অপরাধীরা ওনার নাম শুনলে কাঁপে।
কিন্তু আজ, এত বড় একটা রাষ্ট্রীয় মিটিং পরিচালনার মাঝেও আরিশান মৃধার মনের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল মৃধা নিবাসে ফেলে আসা সেই ছোট মেয়েটি। মেয়েটার পিঠের সেই ক্ষতচিহ্নগুলো ওনার চোখের সামনে থেকে সরছিল না। ওনি মনে মনে ভাবছিলেন, মিটিংটা শেষ করেই সোজা বাড়ি যাবেন, ডাক্তারকে ডেকে অদ্রিজার আজকের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেবেন। নিজের কুলাঙ্গার ছেলে সারিমের ওপর ওনার ক্ষোভের সীমা ছিল না,ছেলে ওনার কালকে রাতে ফোনে টেক্স করে জানিয়েছেন ও আর এই বাড়িতে ফিরবেনা, রাজশাহী নিজের মায়ের বাড়িতে একেবারে শিফ্ট হয়ে গেছে। যতদিন না সারিম ঐ মেয়েটাকে ডিভোর্স দিচ্ছে ততদিন পযন্ত সে এই বাড়িতে এমনকি তার বাবার সঙ্গে ও কোনো সম্পর্ক রাখবেনা, সারিমের সিধান্তে আরিশান মৃধা কিছুই বলেনি ছেলে যখন সংসার করতে চাচ্ছে না তো না করুক, তবে তিনি অরিকে নিজের পরিচয়ে একটা সুন্দর জীবন উপহার দিতে চান। একজন দ্বায়িত্ববান বাবা হয়ে। এখন ওনার প্রধান লক্ষ্য অরিকে আগে সুস্থ করে তোলা।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা আরিশান মৃধার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি ভাইব্রেট করে উঠল। ওনার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (পিএ) আরিফ স্ক্রিনে ভাসছে। মিটিং চলাকালীন অত্যন্ত জরুরি ছাড়া আরিফ ফোন দেয় না।
আরিশান মৃধা হাত উঁচিয়ে মিটিং সাময়িকভাবে থামাতে বললেন। ওনার গম্ভীর গলার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো,
“এক মিনিট।”
ওনি ফোনটা কানের কাছে নিলেন।
“বলো আরিফ। কী খবর?”
ফোনের ওপাশ থেকে আরিফের গলা কাঁপছিল। ভয়ে তার কণ্ঠস্বর প্রায় বুজে আসার মতো,
“স… স্যার… চরম সর্বনাশ হয়ে গেছে!”
আরিশান মৃধার কপালে এক মুহূর্তের জন্য বিরক্তির ভাঁজ পড়ল, তবে ওনার কণ্ঠস্বর আগের মতোই শান্ত কিন্তু ভারী রইল,
“পরিষ্কার করে বলো।”
“স্যার… ওই… অদ্রিজা মেয়েটা… মানে ছোট ম্যাম… ওনাকে ওনার রুমে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালের নাস্তা আর ওষুধ নিয়ে সেবিকা রুমে গিয়ে দেখে বিছানা খালি। আমরা পুরো বাংলো, চারপাশের বাগান, সিকিউরিটি পোস্ট—সব জায়গায় সিসিটিভি চেক করেছি। স্যার, পেছনের মালিদের যাতায়াতের একটা ছোট পকেট গেট ভোরের দিকে খোলা ছিল, হয়তো উনি ওইদিক দিয়ে বাইরে চলে গেছেন। ওনাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না স্যার!”
“কী বললে?!”
মুহূর্তের মধ্যে আরিশান মৃধা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। ওনার এই আকস্মিক চিৎকারে এবং মুখের চরম ভয়ানক রুদ্ররূপ দেখে মিটিং রুমে বসা আইজিপি থেকে শুরু করে সমস্ত বড় বড় কর্মকর্তারা কেপে উঠলেন। আরিশান মৃধার হাতের মুঠোয় থাকা কলমটা মড়মড় করে ভেঙে মাঝখান থেকে দু টুকরো হয়ে গেল। ওনার চোখ দুটো রাগে আর আতঙ্কে টকটকে লাল হয়ে উঠল, কপালের রগগুলো ফুলে উঠল।
“একটা তেরো বছরের অসুস্থ মেয়ে, সে আমার এত বড় সিকিউরিটি বেষ্টনী পার হয়ে চলে গেল, আর তোমরা কেউ টের পেলে না?! কমান্ড্যান্ট ইরফাদ কোথায়? ওর সিকিউরিটি টিম কী করছিল?!” আরিশান মৃধার গলার গর্জন যেন পুরো মন্ত্রণালয় ভবনকে কাঁপিয়ে দিল।
“স্যার… স্যার… আমরা দেখছি…” আরিফ ওপাশ থেকে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
“কোনো কথা শুনতে চাই না! যদি আগামী আধ ঘণ্টার মধ্যে অদ্রিজাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে ওখানকার প্রতিটি সিকিউরিটি গার্ডকে আমি চাইল্ড অবহেলার দায়ে বরখাস্ত করব! আমি নিজে আসছি।”
ফোনটা সশব্দে টেবিলে ছুড়ে ফেলে আরিশান মৃধা আইজিপির দিকে তাকালেন। ওনার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল।
“আইজিপি সাহেব! এই মুহূর্তে ঢাকার সমস্ত সোর্স অ্যাক্টিভ করুন। গুলশান, বনানী, মহাখালী—আশেপাশের যত সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, কন্ট্রোল রুম থেকে ট্র্যাক করুন। একটা তেরো বছরের মেয়ে, পরনে হালকা নীল রঙের জামা,। দশ মিনিটের মধ্যে আমাকে ওর লোকেশন চাই!”
মিটিং রুমের সবাই স্তব্ধ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এভাবে ওনার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো কারণে এতটা উন্মত্ত, পাগলের মতো বিচলিত হতে কেউ কখনো দেখেনি। ওনার এই রূপ দেখে আইজিপি আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তখনই ওয়ারলেসে সমস্ত জোনের ডিসি এবং এসপিদের নির্দেশ দিতে লাগলেন।
এদিকে সকালের ব্যস্ত ঢাকা শহর যেন এক জীবন্ত নরক। গাড়ির হর্ন, মানুষের চিল চিৎকার, কালো ধোঁয়া আর ধুলোবালির এক মহাসমুদ্র।
অরি তখন হেঁটে হেঁটে গুলশান পার হয়ে বনানীর দিকে চলে এসেছে। তার পায়ে কোনো জুতো নেই। পিচের রাস্তার গরম আর ছোট ছোট পাথরের টুকরো তার কচি পায়ের পাতাকে রক্তাক্ত করে তুলছে। কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও তার ভেতরের ভয়টা অনেক বড়। অরি ডানে-বামে তাকাচ্ছে, আর তার বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছে। এত এত মানুষ, এত বড় বড় দালানকোঠা, শত শত গাড়ি ধেয়ে আসছে তার দিকে। সে তো কখনো গ্রামে নিজের বাড়ির বাইরে একা বের হয়নি। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে যখন বাবার সাথে থাকত, তখনো বাবার হাত ছাড়া কোথাও যায়নি।
অলিগলিতে যখন দুই-একটা লোক তার দিকে বাঁকা নজরে তাকাচ্ছিল, কেউ কেউ ওকে দেখে ফিসফিস করছিল, তখন অরির ভেতরটা ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই মানুষগুলোও হয়তো তাকে মারতে আসছে। সে তার ছোট হাত দুটো দিয়ে জামার কোণা শক্ত করে ধরে মাথা নিচু করে শুধু হেঁটেই চলল।
“আমি কোথায় যাব? বড় চাচা তো আমাকে আর বাড়িতে নেবে না। চাচি তো আমাকে মেরেই ফেলত। আর ওই বড় লোকটার বাড়িতেও আমি উটকো ঝামেলা।”
অরির চোখ ফেটে জল আসছিল। তার শরীরটা তীব্র ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। ওষুধের অ্যাকশন শেষ হওয়ায় পিঠের ক্ষতগুলো থেকে আবার নতুন করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, যা নীল জামার পেছনটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার। ক্ষুধার তীব্রতায় পেটটা চুঁইচুঁই করছে। ঢাকা শহরের এই কোলাহল আর মানুষের ভিড়ে অরি নিজেকে এক টুকরো খড়কুটোর মতো অসহায় মনে করতে লাগল।
মন্ত্রণালয় থেকে বের হয়ে আরিশান মৃধা ওনার রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী কালো গাড়িতে উঠলেন। ওনার পেছনে ও সামনে আট-নয়টা সাইরেন বাজানো পুলিশ এবং বডিগার্ডের গাড়ি। গাড়িগুলো যখন গুলশানের দিকে ছুটছিল, ভিতরে বসা আরিশান মৃধার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিচ্ছিল বারবার । ওনি ওনার রাজনৈতিক জীবনে কখনো কোনো পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা হারাননি, কিন্তু আজ ওনার হাত কাঁপছিল।
“মেয়েটা অত্যন্ত ভীতু। কেউ সামান্য ধমক দিলেই ভয় পেয়ে যায়। কাল রাতে ওর গায়ে জ্বর ছিল। এই অবস্থায় এই জনাকীর্ণ শহরে ও একা কোথায় যাবে? যদি কোনো খারাপ মানুষের পাল্লায় পড়ে? যদি কোনো গাড়ি ওকে ধাক্কা দেয়?”
এইসব ভাবতেই আরিশান মৃধার ভেতরের পিতৃসুলভ সত্তাটা হাহাকার করে উঠল।
গাড়ির স্পিকারে আইজিপির ফোন এলো,
“স্যার, গুলশান ও বনানী জোনের ট্রাফিক জ্যামের কারণে সিসিটিভি ফুটেজে মেয়েটিকে ট্র্যাক করা কঠিন হচ্ছে। অলিগলিতে কোনো ক্যামেরা নেই।”
আরিশান মৃধার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। ওনি ওনার চিরচেনা গম্ভীর কিন্তু বজ্রকঠিন কণ্ঠে আদেশ দিলেন,
“আইজিপি! এই মুহূর্তে পুরো গুলশান, বনানী, মহাখালী এবং তেজগাঁও জোন লকডাউন করো! সমস্ত সিগন্যাল রেড করে দাও। কোনো গাড়ি নড়বে না। প্রতিটি মোড়ে পুলিশ, র্যাব এবং আর্মি ফোর্স নামাও। চিলড্রেন মিসিং কেসের সর্বোচ্চ প্রোটোকল অ্যাক্টিভ করো। দশ মিনিটের মধ্যে পুরো ঢাকা শহর যেন অরিকে খোঁজার জন্য স্থবির হয়ে যায়!”
“কিন্তু স্যার, এতে তো সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি হবে, মিডিয়া…” আইজিপি আমতা-আমতা করলেন।
“মিডিয়া আমি বুঝব! আমি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।আমার মেয়ের যদি আমার কারনে সামান্য কিছু হয় তাহলে এই ক্ষমতার কোনো মূল্য নেই আমার। ডু ইট নাও!” আরিশান মৃধা ফোনটা কেটে দিলেন।
মন্ত্রীর এক আদেশে মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরের বুক চিরে এক অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটে গেল। গুলশান-১, গুলশান-২, বনানী ১১ নম্বর রোড, মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা—সব জায়গায় পুলিশের শত শত গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা ব্লক করে দিল। র্যাবের টহল গাড়িগুলো অলিগলিতে ঢুকে পড়ল। সাধারণ মানুষ এবং গাড়িচালকরা অবাক হয়ে দেখল, হঠাৎ করেই যেন পুরো শহর স্থবির হয়ে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় খাকি পোশাকের পুলিশ আর কালো পোশাকের র্যাব সদস্যরা তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালাচ্ছে।
মন্ত্রী আরিশান মৃধা নিজেই গাড়ি থেকে নেমে বনানীর একটা ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে ওয়ারলেসে কমান্ড দিচ্ছিলেন। ওনার প্রোটোকলের বডিগার্ডরা চারপাশ ঘিরে রেখেছে। ওনার চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল,বয়স ৫০ এর কৌঠায় গেলেও দেখতে ঠিক ৩৪, ৩৫ বছরের পুরুষ এর মতো ফিট দেখায়।মুখের গম্ভীর ভাবটা এতটাই তীব্র ছিল যে কোনো পুলিশ অফিসারের ওনার সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস হচ্ছিল না। ওনি অস্থির চিত্তে প্রতিটি জোনের আপডেট নিচ্ছিলেন। ওনার ভেতরের সেই গম্ভীর, স্ট্রং চরিত্রটি আজ একটা বাচ্চার জন্য পুরোপুরি উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।
সময় যেন কাটছিল না। প্রায় বিশ মিনিট পর, কমান্ড্যান্ট ইরফাদের ওয়ারলেস থেকে মেসেজ এলো,
“স্যার! স্যার! গুলশান লেক পার্কের ভেতরের একটা নির্জন কোণে একটা বাচ্চার সন্ধান পাওয়া গেছে। পরনে নীল জামা, শরীরে কিছু অংশে ব্যান্ডেজ। ওনি পার্কের একটা বেঞ্চে মুখ গুজে বসে আছেন।”
“আই অ্যাম কামিং!”
আরিশান মৃধা আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। ওনার গাড়ি তীব্র গতিতে ছুটে চলল গুলশান পার্কের দিকে।
গাড়ি পার্কের গেটে থামতেই আরিশান মৃধা প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করে নিজেই দ্রুত পায়ে ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। ওনার পেছনে ওনার সশস্ত্র বডিগার্ডরা দৌড়াচ্ছিল।
পার্কের একদম শেষ প্রান্তে, একটা পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে থাকা কাঠের বেঞ্চের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে ছোট অরি। সে তার দুই হাঁটুর মাঝখানে মুখ গুজে অঝোরে কাঁদছে। তার সারা শরীর কাঁপছে। চারপাশের পুলিশের সাইরেন আর মানুষের হট্টগোল তাকে আরও বেশি ভীত করে তুলেছে।
আরিশান মৃধা দূর থেকে মেয়েটিকে দেখতে পেলেন। ওনার বুকের ভেতর থেকে যেন একটা বিশাল পাথর নেমে গেল। ওনি ওনার পেছনের বডিগার্ডদের হাত উঁচিয়ে থামতে বললেন,
“তোমরা কেউ সামনে আসবে না। এখানেই দাঁড়াও।”
আরিশান মৃধা ওনার দীর্ঘ রাজনৈতিক আভিজাত্য আর গাম্ভীর্যকে একপাশে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত ধীর পায়ে অরির দিকে এগিয়ে গেলেন। ওনার বুটের মৃদু শব্দ পেয়েও অরি মাথা তুলল না, সে আরও বেশি নিজেকে গুটিয়ে নিল।
আরিশান মৃধা বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এরপর, দেশের কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করা সেই ক্ষমতাধর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অত্যন্ত গম্ভীর আর স্ট্রং প্রকৃতির মানুষটি, ধুলোবালি মাখা মাটির ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসলেন অরির সামনে। ওনার দামি সাফারী স্যুটের প্যান্ট মাটিতে লেপ্টে গেল, কিন্তু ওনার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
ওনি অত্যন্ত কোমল, পরম মমতায় ভরা গলার আওয়াজে ডাকলেন,
“অদ্রিজা মা…”
বাবার মতো সেই পরিচিত গভীর কণ্ঠস্বরটা শুনে অরি চমকে উঠে নিজের মুখটা হাঁটু থেকে তুলল। তার ফর্সা গাল দুটো চোখের জলে ভিজে লাল হয়ে গেছে, বড় বড় নিষ্পাপ চোখ দুটোতে তখনো একরাশ অবুঝ ভয় আর ক্লান্তি। সামনে আরিশান মৃধাকে এভাবে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকতে দেখে অরি বোকার মতো বড় বড় চোখ করে চেয়ে রইল।
“তুমি… তুমি এখানে কেন এসেছ?”
অরি কাঁপানো গলায়, অত্যন্ত বোকা বোকা বাচ্চাদের মতো জিজ্ঞেস করল।
“তুমি কি আমাকে বকতে এসেছ? আমি… আমি আর তোমার বাড়িতে যাব না। আমি একটা বোঝা। চাচি বলেছে আমি অলক্ষ্মী।”
আরিশান মৃধার চোখের কোণটা পলকেই ভিজে উঠল। ওনি অরির সেই ছোট, ধুলাবালি মাখা বরফশীতল হাত দুটো নিজের দুই বিশাল উষ্ণ হাতের মুঠোয় নিলেন। ওনার গলার আওয়াজ আবেগাক্রান্ত হয়ে কাঁপছিল, কিন্তু ওনি নিজেকে সামলে নিলেন।
“মা অদ্রিজা,” আরিশান মৃধা অত্যন্ত শান্ত কিন্তু গভীর কণ্ঠে বললেন,
“তুমি জানো, প্রবাদ আছে—সবুজ পাতা ঝরে গেলে যেমন বসন্ত থেমে থাকে না, তেমনি মেঘের আড়ালে সূর্য কখনো তার আলো হারায় না।’ তোমার জীবনে যে মেঘ এসেছে , তা সাময়িক। তুমি কোনো বোঝা নও, তুমি কোনো অলক্ষ্মী নও।”
অরি বোকার মতো মাথা চুলকে ওনার দিকে চেয়ে রইল। এই কঠিন প্রবাদের অর্থ বোঝার মতো বয়স তার নেই। সে চোখ পিটপিট করে বলল,
“আমি… আমি তো অত শত বুঝি না। আমি শুধু জানি, আমার মা-বাবা নেই। যার কেউ নেই, তাকে সবাই ফেলে দেয়। তোমার ছেলেও তো কালকে আমাকে ফেলে চলে গেল। তুমি কেন আমাকে ওই বড় ঘরে নিয়ে গেলে? আমিও তো ওই ঘরে একটা উটকো ঝামেলা।”
আরিশান মৃধা এবার আর ওনার ভেতরের কান্নাটা চেপে রাখতে পারলেন না। ওনার এক ফোঁটা চোখের জল অরির ছোট হাতের ওপর গিয়ে পড়ল। ওনি অরির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ইমোশনাল হয়ে বললেন,
“মা, শোনো। তোমার এই বাবাটারও কিন্তু এই বিশাল পৃথিবীতে কেউ নেই। আমার একটা ছেলে আছে, কিন্তু সে অহংকারে অন্ধ, সে আমার কথা শোনে না। আমার ঘরটা অনেক বড়, কিন্তু সেখানে কোনো আলো নেই, কোনো মমতাকর সুর নেই। আমি কি খুব অপরাধী মা, যে একটা বীর শহীদের সন্তানকে নিজের মেয়ের মতো করে আগলে রাখতে চেয়েছি? তুমি যদি আমাকে ফেলে এভাবে চলে যাও, তবে এই বুড়ো বাবাটা কার জন্য বাঁচবে বলো?”
অরি স্তব্ধ হয়ে গেল। ওনার মুখে ‘বাবা’ শব্দটা শুনে আর ওনার চোখের জল দেখে অরির ভেতরের সেই ভীতু, অবুঝ মনটা এক অদ্ভুত তীব্র আবেগে কেঁপে উঠল। ওনি দেশের এত বড় মন্ত্রী, অথচ ওনি অরির সামনে বসে কাঁদছেন? ওনাকে নিজের বাবা বলে পরিচয় দিচ্ছেন?
“আমার মেয়ে হবে অদ্রিজা?
“তুমি… তুমি সত্যি আমার বাবা হবে?”
অরি অত্যন্ত অবুঝ শিশুর মতো নিষ্পাপ গলায় জিজ্ঞেস করল।
“তুমি আমাকে চাচির মতো মারবে না তো? আমাকে পড়াশোনা করতে দেবে? আমার বাবা যে বলেছিল আমাকে ডাক্তার হতে হবে…”
“হ্যাঁ মা, হ্যাঁ!”
আরিশান মৃধা পরম আবেগে অরিকে টেনে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
“আমি তোমায় কথা দিচ্ছি মা, আরিশান মৃধার জীবদ্দশায় তোমার গায়ে কেউ একটা আঁচড়ও কাটতে পারবে না। তুমি পড়াশোনা করবে, তুমি দেশের সবচেয়ে বড় ডাক্তার হবে। তোমার বাবার সেই শেষ ইচ্ছে আমি আমার নিজের রক্ত দিয়ে হলেও পূরণ করব মা।”
বুকের সেই চিরচেনা উষ্ণতা, বাবার মতো সেই নিরাপদ ঘ্রাণ পেয়ে অরি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আরিশান মৃধার সাফারী স্যুটটা তার ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে খপ করে শক্ত করে চেপে ধরল। ওনার চওড়া বুকে মুখ গুঁজে অরি করে কেঁদে উঠল,
“বাবা… ও বাবা! আমি আর কোথাও যাব না বাবা! তুমি আমাকে তোমার কাছে রেখে দাও!”
পার্কের নির্জন কোণে, কুয়াশা আর রোদের আলো-ছায়ার মাঝে, একজন অত্যন্ত শক্ত মনের, গম্ভীর রাজনীতিবিদ একটা অনাথ, অবুঝ বালিকাকে নিজের মেয়ের পরিচয়ে আপন করে নিলেন। উপস্থিত সিকিউরিটি ফোর্সের প্রত্যেকে মন্ত্রীর এই আবেগঘন, মানবিক রূপ দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারল না।
আরিশান মৃধা অরিকে আলতো করে নিজের কোলে তুলে নিলেন। অরি তখন ক্লান্তিতে ওনার বুকেই চোখ বুজে ফেলেছে, যেন সে তার হারিয়ে যাওয়া বাবাকে এই মানুষের মাঝে ফিরে পেয়েছে। আরিশান মৃধা অরিকে কোলে নিয়ে ওনার গাড়ির দিকে হেঁটে চললেন, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন,আজ থেকে শুরু হলো অদ্রিজার এক নতুন জীবন, আর আরিশান মৃধার এক নতুন লড়াই।
ঢাকা শহরের বুক চিরে পিচঢালা রাজপথ ধরে যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইরেন বাজানো কনভয়টি এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন ট্রাফিকের প্রতিটি মোড়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা স্যালুট পজিশনে দাঁড়িয়ে ছিল। বসন্তের শেষ বিকেলের হালকা তপ্ত হাওয়া এসে লাগছিল কালো রঙের গাড়ির গ্লাসে। পাঁচটা বছর কেটে গেছে। এই পাঁচটি বছর বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ক্ষমতার সমীকরণে অনেক বড় বড় পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু একটি জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসেনি-সেটি হলো আরিশান মৃধার ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব এবং দেশের শাসনব্যবস্থায় তাঁর অমোঘ নিয়ন্ত্রণ।
আজকের দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে টানা চতুর্থবারের মতো দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আরিশান মৃধা। পঞ্চান্ন বছর বয়সে পদার্পণ করলেও ওনার শারীরিক গঠন, ধারালো চোয়াল আর চোখের মনিতে থাকা সেই তীক্ষ্ণ আভিজাত্য এখনো যেকোনো তরুণকে হার মানাতে বাধ্য। ওনার ঘন কালো চুলে এখন হালকা রুপালি আভা দেখা দিয়েছে, যা ওনার ব্যক্তিত্বে যোগ করেছে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য। ওনার এই লুক এবং অসম্ভব পুরুষালী ‘হ্যান্ডসাম’ অ্যাপিয়ারেন্সের কারণে রাজনীতি থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ—সবখানেই ওনার এক আলাদা মুগ্ধতা রয়েছে। ওনি কথা বলেন মেপে, ওনার গম্ভীর কণ্ঠস্বরের একটি শব্দই যেকোনো পরিস্থিতি শান্ত বা উত্তপ্ত করার জন্য যথেষ্ট। ওনার রাগ যেমন ভয়ংকর, ওনার নীরবতা তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।
আজ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন, প্রথম পার্লামেন্ট। আরিশান মৃধার পরনে আজ ওনার সিগনেচার কালো রঙের বন্ধগলা জোধপুরী স্যুট, যা ওনার সুঠাম ও দীর্ঘ দেহকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। গাড়ির পেছনের সিটে বসে ওনি কিছু জরুরি ফাইলের ওপর চোখ বোলাচ্ছিলেন। ওনার পাশে বসা ওনার বিশ্বস্ত সিকিউরিটি ইনচার্জ কমান্ডার ইরফাদ অত্যন্ত সতর্ক চোখে বাইরের দিকে নজর রাখছিল।
ঠিক একই সময়ে, জাতীয় সংসদ ভবনের ভিআইপি গেটের সামনে এসে থামল আরেকটি নতুন বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়ি থেকে যিনি নেমে এলেন, তাঁকে দেখে উপস্থিত মিডিয়া এবং তরুণ সাংসদদের মধ্যে এক অন্যরকম গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। তিনি আর কেউ নন—মৃধা আবরার সারিম। বয়স এখন বত্রিশ। সাতাশ বছর বয়সে যে ক্ষোভ আর ঔদ্ধত্য নিয়ে সে বাবার বাড়ি এবং ঢাকার রাজনীতিতে একলা চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বিগত পাঁচ বছরে সে নিজেকে প্রমাণ করে দেখিয়েছে। গত নির্বাচনে সে সম্পূর্ণ নিজের মেধা, আধুনিক শিক্ষাগত যোগ্যতা আর তরুণ প্রজন্মের অকুন্ঠ সমর্থনে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছিল। সেবার ওকে ওর বাবা আরিশান মৃধা ওকে বিন্দুমাত্র সাহায্য করেননি, ওনার ক্ষমতার কোনো ছায়াও সারিমকে ছুঁতে দেননি। ফলে গত ক্যাবিনেটে সারিমের মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নটা অধরাই থেকে গিয়েছিল।
কিন্তু সারিম দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে গত পাঁচটি বছর নিজের নির্বাচনী এলাকায় এমন এক আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে যে, এবার দল তাকে আর উপেক্ষা করতে পারেনি। এবার সে বিপুল ব্যবধানে জিতে সরাসরি ক্যাবিনেটে নিজের জায়গা পাকা করেছে। আজ সে দেশের সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এই পার্লামেন্টে পা রাখছে। বাবার মতোই সারিমের চেহারাতেও সেই বংশগত তীব্র, ধারালো রাজকীয় আভিজাত্য। জিম-ফিট সুঠাম শরীর, নিখুঁতভাবে ট্রিম করা দাড়ি আর চোখে দামি ব্র্যান্ডের সানগ্লাস—সব মিলিয়ে সারিমকে এদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে ‘হ্যান্ডসাম’ ও কাঙ্ক্ষিত পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ওর স্বভাবটাও বাবার মতোই—প্রচণ্ড গম্ভীর, রাগী এবং প্রয়োজনের বাইরে একটা শব্দও উচ্চারণ না করা।
সংসদ ভবনের প্রধান লবিতে যখন নতুন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করছিলেন, ঠিক তখনই চারপাশের পরিবেশ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। লবির এক প্রান্ত থেকে হেঁটে আসছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা, আর অন্য প্রান্ত থেকে আসছিলেন নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী আবরার সারিম।
পিতৃ-পুত্রের এই মুখোমুখি দেখা হওয়াটা যেন লবির ভেতরের বাতাসের তাপমাত্রা এক ধাক্কায় কমিয়ে দিল। উপস্থিত সাংবাদিক এবং অন্য মন্ত্রীরা আড়চোখে ওনাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পাঁচ বছর পর বাবা আর ছেলে আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ অলিন্দে সমমর্যাদায় এসে দাঁড়িয়েছেন। দুই জোড়া চোখ একে অপরের দিকে নিবদ্ধ হলো। আরিশান মৃধার চোখে ছিল এক গভীর, অনুচ্চারিত গর্ব কিন্তু মুখাবয়ব ছিল সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন, গম্ভীর। অন্যদিকে সারিমের চোখে ছিল নিজের যোগ্যতায় বাবার সমকক্ষ হওয়ার এক তীব্র অহংকার এবং জেদ।
তারা একে অপরের একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা ছিল না। কোনো আনুষ্ঠানিক কুশল বিনিময় নেই, কোনো সালাম বা আলিঙ্গন নেই। দুজনেই ইচ্ছে করেই চুপ রইলেন, যেন ওনাদের ভেতরের সেই দীর্ঘস্থায়ী নীরব যুদ্ধটা এখনো এক ইঞ্চিও পিছু হঠেনি। আরিশান মৃধা অত্যন্ত ধীর পায়ে সারিমের পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন, আর সারিমও অত্যন্ত দৃঢ় পদক্ষেপে নিজের হলের দিকে চলে গেল। দুই সিংহের এই নীরব নীরবতা বুঝিয়ে দিল, ক্ষমতার মাঠে ওনারা কেউ কাউকে এক বিন্দু ছাড় দিতে রাজি নন।
সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ করেই আরিশান মৃধা, মৃধা নিবাসে ফিরে এলেন , তখন ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে আটটা। প্রোটোকলের গাড়িগুলো বাইরে রেখে ওনি যখন ভেতরের ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন, ওনার মুখের এখন সেই কঠিন গাম্ভীর্যটা কিছুটা শিথিল হলো।
বিগত পাঁচটি বছরে মৃধা নিবাসের ভেতরের অন্ধকার পুরোপুরি কেটে গেছে শুধু একটি মানুষের উপস্থিতির কারণে—সেটি হলো অরি। তেরো বছরের সেই ভীতু, মেয়েটি আজ আঠারো বছরের এক ডানাকাটা পরীতে পরিণত হয়েছে।অরি এখন দেখতে যতটা স্নিগ্ধ ও অনন্য সুন্দর, তার লাইফস্টাইল এবং চলাফেরা ঠিক ততটাই মডার্ন ও স্মার্ট। আরিশান মৃধা অরিকে দেশের অন্যতম সেরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করিয়েছেন।এখন সে কলেজে পড়ে,সামনেই অরির এইচএসসি পরীক্ষা।মেয়েটা পড়াশুনা নিয়ে এখন প্রচন্ড ব্যাস্ত,সারাদিন বইয়ের পাতায় মুখ গুজে বসে থাকে। এখানে আসার পর অরির একজন খুব ভালো ফ্রেন্ড হয়েছে। মেয়েটার নাম জেবা অরির সঙ্গে একই স্কুল শেষ করে এখন কলেজে পড়ছে। দুজনেই টার্গেট মেডিকেল এ পড়া।
অরির পরনে একটি ডিজাইনার অফ-হোয়াইট রঙের কুর্তি আর ব্লু ডেনিম জিন্স, চুলে একটা ক্যাজুয়াল পনিটেল করা। চোখে রিডিং গ্লাস। সে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে তার অ্যাসাইনমেন্ট চেক করছিল। আরিশান মৃধাকে ঢুকতে দেখেই অরি ল্যাপটপটা পাশে রেখে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল।
বাবার মুখোমুখি হয়ে অরি ওনার জোধপুরী স্যুটের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। অরি এখন আর সেই আগের মতো বোকা বোকা আচরণ করে না, তবে আরিশান মৃধার সামনে অরি এখনো সেই পরম আদুরে মেয়ে।
“আজকের দিন কেমন কাটল বাবা,টিভিতে আজকে সংসদ পার্লামেন্টে তোমায় দেখছি” অরি স্বাভাবিক গলায় বলল।
“ভালো”ছোট্ট করে উওর দিলেন আরিশান মৃধা, এরপর সোফায় বসতে বসতে ওনার চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। ওনার ক্লান্ত মুখে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
“টিভি দেখার সময় পাচ্ছ কোথায়? সামনে পরীক্ষা না তোমার? পড়াশোনার কী খবর?”
“পড়াশোনা একদম ট্র্যাকে আছে বাবা, ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না,”
বলতে বলতেই অরি ওর ব্যাগ থেকে কিছু ফাইলপত্র বের করতে গেল। কিন্তু ফাইলগুলো টান দিতেই অরির কলেজের একটা ভারী খাতা থেকে টুপ করে কয়েকটা রঙিন খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
আরিশান মৃধা ভ্রু কুঁচকে মেঝেতে পড়া খামগুলোর দিকে তাকালেন। অরি খামগুলো তুলে নিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল। সে খামগুলো বাবার সামনে টেবিলের ওপর মেলে ধরল।
“এগুলো কী, অদ্রিজা?” আরিশান মৃধার গম্ভীর গলা।
“এগুলো কী তুমি সত্যিই জানো না বাবা?”
অরি টেবিলের ওপর বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল।
“আজকে কলেজের কমনরুমে আমার ব্যাগের চেইনটা একটু খোলা ছিল। বাসায় এসে ব্যাগ খুলতেই দেখি এই চার-পাঁচটা ‘প্রেমপত্র’ ওটার ভেতরে গোঁজা। আর এগুলো কিন্তু আমার জন্য আসেনি, এগুলো এসেছে দেশের মোস্ট হ্যান্ডসাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধার জন্য! আমার ক্লাসের মেয়েরা তো তোমার ডাই-হার্ড ফ্যান। ওরাই লুকিয়ে চুরিয়ে আমার ব্যাগে এগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছে।”
আরিশান মৃধা এক মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন, তবে ওনার গম্ভীর মুখাবয়ব ওনি শক্ত রাখলেন। ওনি খামগুলোর দিকে না তাকিয়েই বললেন,
“ফালতু জিনিস। এসব ডাস্টবিনে ফেলে দাও।”
“আহা, ফেলব কেন? একটাতে তো আবার কবিতা লেখা আছে দেখলাম,”
অরি বাবাকে ক্ষেপানোর জন্য একটু মজা করে বলল।
“পঞ্চান্ন বছর বয়সেও তোমার এই ক্রাশ ভ্যালু থাকলে তো আমার পজিশন ডেঞ্জারাস বাবা! কলেজে কোনো ছেলে আমার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পায় না তোমার ওই খাকি পাওয়ারের ভয়ে, আর এদিকে আমার ফ্রেন্ডরাই আমার সৎ মা হওয়ার অ্যাপ্লিকেশন জমা দিচ্ছে!”
“অদ্রিজা! লিমিট পার করছ কিন্তু,”
আরিশান মৃধা এবার একটু রাগী গলায় ধমক দেওয়ার ভান করলেন, কিন্তু ওনার চোখের কোণে হাসির রেখা স্পষ্ট ছিল। ওনি মনে মনে জানেন, এই মেয়েটা যদি ওনার জীবনে না আসত, তবে ওনার একাকীত্ব ওনাকে গ্রাস করে ফেলত। অরি খুব নরমাল ভাবেই ওনার সাথে এই খুনসুটিগুলো করে, যার কারণে আরিশান মৃধার ভেতরের সেই কঠিন একনায়ক মানুষটা ঘরের ভেতরে এসে একদম সাধারণ একজন বাবা হয়ে যান।
অরি খামগুলো নিয়ে হেসে ডাস্টবিনের দিকে চলে গেল। সে তার পড়াশোনা আর লাইফস্টাইল নিয়ে বেশ সচেতন। কলেজে অরি তার ক্লাসের টপার। রূপে ও গুণে অরি অনন্য হওয়ায় কলেজের প্রায় সব ছেলেই ওর জন্য পাগল।অরির এই সরাসরি খোলামেলা রুপে ছেলেদের বুকের স্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু কারো এতটুকু সাহস নেই যে অরিকে গিয়ে একটা প্রেমের প্রস্তাব দেবে বা ওনার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলবে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিশিয়াল প্রোটোকল আর আরিশান মৃধার সেই ভয়ানক পাওয়ারের কথা পুরো শহর জানে। ওনার মেয়ের দিকে বাঁকা চোখে তাকালে যে পরদিন নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না, এই ভয়টা সবার মনেই গেঁথে আছে।
তবে অরি এসবে একদম মাথা ঘামায় না। সে খুব সাধারণ ভাবেই নিজের দিন পার করে। তার একমাত্র লক্ষ্য পড়াশুনা করে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরন করা,তাকে খুব ভালো রেজাল্ট করে একটা ভালো মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে হবে, একজন আদর্শবান ডাক্তার হতে হবে।চলেফেরার আড়ালে, অরি এখনো সেই ভেতরের শান্ত, অন্তর্মুখী মেয়েটাই রয়ে গেছে।
রাতের খাবারের টেবিলে আরিশান মৃধা আর অরি মুখোমুখি বসেছে। টেবিলে নানা পদের খাবার সাজানো থাকলেও পরিবেশটা ছিল বেশ শান্ত।
“আজকে সংসদে সারিমের সাথে দেখা হয়েছিল,”
আরিশান মৃধা হঠাৎ করেই খুব স্বাভাবিক এবং গম্ভীর গলায় কথাটা পাড়লেন। পাঁচ বছরে ওনি কখনো সারিমের নাম মুখে আনেননি, কিন্তু আজ ওনার কণ্ঠে এক অন্যরকম গাম্ভীর্য ছিল।
অরি ভাতের চামচটা হাতে নিয়ে একটু থমকে দাঁড়াল। পাঁচ বছর আগে যে বর তাকে বিয়ে করে ফেলে চলে গিয়েছিল, তার প্রতি অরির মনে কোনো রাগ বা ক্ষোভ অবশিষ্ট নেই। সে এখন প্রাপ্তবয়স্ক, সে বোঝে যে সেই অসম বিয়েটা সারিমের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
“উনি তো এবার শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন বাবা।টিভিতে দেখলাম, ওনার নির্বাচনী এলাকার মানুষ ওনাকে খুব পছন্দ করে,”অরি প্লেটে খাবার নিতে নিতে খুব ক্যাজুয়াল টোনে বলল।
“হ্যাঁ। নিজের যোগ্যতায় এসেছে ও,”
আরিশান মৃধা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।
“আমি ওকে কোনো সাহায্য করিনি। ভেবেছিলাম আমার জেদের কাছে ও হেরে যাবে, কিন্তু ও মৃধা পরিবারের রক্ত। নিজের রাস্তা নিজেই তৈরি করে নিয়েছে।”
“তাহলে ওনার সাথে কথা বললে না কেন বাবা? কতবছর তোমরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলো না,নিজেদের মধ্যে কথা বলে ঝামেলা মিটমাট করে নিলেই তো পারো,ক্ষমতার লড়াই তো বাইরে, ঘরের ভেতরে তো উনি তোমার ছেলেই।”
অরি নিজের চিন্তাভাবনা থেকে বলল।
আরিশান মৃধা ওনার গম্ভীর চোখ দুটো তুলে অরির দিকে তাকালেন। ওনার মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতা ফিরে এলো।
“কিছু কিছু যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিরতি দেওয়া যায় না, অদ্রিজা। সারিম যতক্ষণ না বুঝবে যে ক্ষমতার চেয়ে সম্পর্ক অনেক বড়, ততক্ষণ আরিশান মৃধা ওর সামনে মাথা নোয়াবে না।”
অরি আর কথা বাড়াল না। ও জানে বাবা আর ওর সেই তথাকথিত স্বামীর জেদ একদম একই রকম। দুজনেই প্রচণ্ড রাগী এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল। এই দুই সিংহের লড়াইয়ের মাঝে অরি নিজেকে খুব স্বাভাবিক দূরত্বে সরিয়ে রাখে। সে তার রাতের খাবার শেষ করে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।
জানালার বাইরে তখন আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠেছে। অরি ওর পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। সামনে এইচএইসি পরীক্ষা, এখন ওকে সবকিছু ঝেড়ে আগে পড়াশুনার দিকে ফোকাস করতে হবে।অরি ওর চুলে একটা খোঁপা করে পেনটা হাতে নিল। পাঁচ বছর আগের সেই প্রত্যন্ত গ্রামের অত্যাচারিত অরি আর আজকের এই আত্মবিশ্বাসী অরি মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত। কিন্তু জীবনের এক কোণে থাকা সেই অসম বিয়ের সুতোটা যে এখনো কোথাও একটা জড়িয়ে আছে, তা সে নিজেও অস্বীকার করতে পারে না।
রাত তখন পৌনে বারোটা।মৃধা নিবাসে তিনতলার সুবিস্তৃত লাইব্রেরি কাম স্টাডি রুমে নিঝুম নীরবতা। কেমিস্ট্রি আর বায়োলজির প্র্যাক্টিক্যাল খাতার পাতা ওল্টানোর মৃদু খসখস শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। টেবিল ল্যাম্পের মায়াবী হলদেটে আলো এসে পড়েছে অরি ডানাকাটা পরীর মতো মুখে। বিগত পাঁচ বছরে অরির রূপ যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়ের মতো নিখুঁত আর মারাত্মক হয়ে উঠেছে এখন।অরির ত্বক দুগ্ধ-শুভ্র, যাতে এক স্বাভাবিক গোলাপি আভা খেলা করে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো অরির সিল্কি বাদামী রঙের চুলগুলো, যা পিঠ সমান লম্বা-খুব বেশি বড়ও না, আবার ছোটও না। ল্যাম্পের আলোয় সেই বাদামী চুলে এক সোনালী দ্যুতি চিকমিক করছিল। চোখে রিডিং গ্লাস পরা অবস্থাতেও ওর দীর্ঘ চোখের পাপড়ি আর গভীর চোখের মণি যে কাউকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে অরি নিজের এই মারাত্মক রূপ নিয়ে বিন্দুমাত্র সচেতন নয়; সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিজের মতো থাকে।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা আইফোনটি তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘বাদামনী জেবা’। অরির বেস্ট ফ্রেন্ড, একই সাথে ওর জীবনের সবচেয়ে বড় বিনোদন এবং যন্ত্রণার নাম। অরি গ্লাসটা কপালে তুলে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জেবার আর্তনাদ শোনা গেল,
“অরি রে! তুই জলদি নিচে আয়! চরম ইমার্জেন্সি! আমি তোর বাড়ির পেছনের গেটে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এক সেকেন্ডও দেরি করিস না, নাহলে লস হয়ে যাবে!”
“কী হয়েছে বাদামনী বলবি তো? এই মাঝরাতে কীসের ইমার্জেন্সি পড়ে গেল তোর?” অরি শান্ত টোনে জিজ্ঞেস করল।
“ফোনে বলা যাবে না! তুই জাস্ট নিচে নাম। তোর বাবার সিকিউরিটি গার্ডদের আমি অলরেডি ম্যানেজ করেছি, ওরা ভাবছে আমরা কম্বাইন্ড স্টাডি করব। জলদি আয়!” খট করে ফোনটা কেটে গেল।
অরি কিছুটা ঘাবড়ে গেল। জেবা মেয়েটা এমনিতে ভীষণ হাইপার এবং ছটফটে। কোনো বিপদে পড়ল নাকি? অরি আর সময় নষ্ট না করে টেবিল থেকে উঠে নিজের অফ-হোয়াইট কুর্তির ওপর একটা ডার্ক ব্লু রঙের লং শ্রাগ গলিয়ে নিল। পায়ে পরে নিল মেটালিক স্লাইডার্স। আয়নায় একবার নিজের মারাত্মক সুন্দর মুখটা দেখে নিয়ে সে খুব সাবধানে, বিড়ালের মতো পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। আরিশান মৃধা তখন নিজের স্টাডি রুমে দেশের এক অতি গোপনীয় সিকিউরিটি ফাইল দেখছিলেন, তাই ওনার ওদিকের করিডোরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। পেছনের মালিদের পকেট গেট দিয়ে বের হতেই অরি দেখল একটা ল্যাভেন্ডার রঙের হ্যারিয়ার গাড়ি স্টার্ট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভিং সিটে সানগ্লাস মাথায় তুলে বসে আছে জেবা।
অরি গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসতেই জেবা গাড়ি টান টান গতিতে ছেড়ে দিল। অরি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এবার বলবি কী হয়েছে? কার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে নাকি কারো ব্রেকআপ?”
জেবা একগাল হেসে গাড়ির মিউজিক সিস্টেমের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আরে দূর! কারোর কিচ্ছু হয়নি। আসলে হয়েছে কী, মাঝরাতে হঠাৎ আমার ফেসবুক স্ক্রলে একটা ফুচকার রিলস আসলো। ওই যে তেজগাঁওয়ের ‘ঝাল-ভেঁপু’ ফুচকাওয়ালা না? ও নাকি মাঝরাত পর্যন্ত স্পেশাল নাগা ফুচকা বানায়। ব্যস! আমার ভেতরের ফুচকা-আত্মা জেগে উঠল। তোকে ছাড়া তো একা একা ভণ্ডামি করে খাওয়া যাবে না, তাই তোকে ইমার্জেন্সির নাম করে তুলে নিয়ে আসলাম। হাউ ইজ দ্য সারপ্রাইজ, দোস্ত?”
কথাটা শোনা মাত্রই অরির ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। সে জেবার দিকে ঘুরে বসল এবং কোনো ভণিতা না করে জেবার পিঠে আর কাঁধে পরপর কয়েকটা ‘ধিরিম ধিরিম’ করে জোরে জোরে কিল বসিয়ে দিল।
“আউচ! উফ অরি, মারিস না! গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করবে তো!” জেবা চিৎকার করে উঠল।
“তোর ফুচকার জো জেগেছে বলে তুই আমাকে এই মাঝরাতে মিথ্যা বলে বাড়ি থেকে বের করলি? সাহস কত তোর! তোকে তো আজ আমি কেমিস্ট্রির ল্যাবে ঢুকিয়ে অ্যাসিড দিয়ে ধুয়ে দেবো!” অরি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আরে রাগিস কেন? মাঝরাতের শহর দেখার একটা আলাদা মজা আছে না? চল, আজ মন ভরে ফুচকা খাব আর পুরো শহর ঘুরব,” জেবা হেসে বলল।
তেজগাঁওয়ের সেই নির্দিষ্ট স্পটটিতে যখন ওরা পৌঁছাল, তখন সেখানে আরও কিছু মাঝরাতের ভবঘুরে বাইকার আর তরুণ-তরুণীর ভিড়। অরি গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশের কয়েকটা ছেলের চন্ডীপাঠ বন্ধ হয়ে গেল। রাত বারোটাতে, একটা মারাত্মক সুন্দর মেয়ে এখানে এসেছে তা হয়তো ওদের কল্পনার বাইরে ছিল। কিন্তু অরি সেসবে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে জেবার সাথে ফুচকার প্লেট নিয়ে বসল।
ফুচকা মুখে দিয়েই জেবা চোখ বন্ধ করে বলল,
“উফ! দিস ইজ হেভেন! আচ্ছা অরি, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? মাইন্ড করবি না তো?”
“তোর লজিকলেস মার্কা কথা আমি এমনিতেও মাইন্ড করি না। বল,” অরি ফুচকা চিবোতে চিবোতে বলল।
জেবা ফুচকার টকটা চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে একটু হঠাৎ বলল,
“তোর বাবা… মানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা… ওনার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে তুই কখনো কিছু ভাবিস না রে? আই মিন, ওনার বয়স পঞ্চান্ন হলেও ওনার যেই গ্লেমার করা রুপ,আর পার্সোনালিটি… ওনার কি এই দীর্ঘ জীবনে ওনার পাশে কোনো স্পেশাল কাউকে প্রয়োজন হয়নি? তোর মা তো এখন আর এই দুনিয়ায় নেই, তাহলে অন্য কেউ?”
অরি জেবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। জেবা সাধারণত খুব বাচাল হলেও আরিশান মৃধাকে নিয়ে ওর কৌতূহলটা একটু অন্যরকম শোনাল। অরি নিজের গ্লাসটা ঠিক করে বলল,
“বাবার লাইফে ওনার দেশ, ওনার পলিটিক্স ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবার সময় নেই। ওনি মায়ের জায়গাটায় অন্য কাউকে বসাতে চান না। মাকে খুব ভালোবাসত বাবা,প্রেমের বিয়ে ছিল ওনাদের,খুব অল্প বয়সে ওনারা পালিয়ে বিয়ে করেন। তবে বাবার ভাগ্যে হয়তো মায়ের যাত্রা টা বেশিদিন ছিল না, তবুও ওনি মায়ের সঙ্গে থাকা সাময়িক সেই স্মৃতি নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চান। তুই হঠাৎ বাবাকে নিয়ে এতটা ইন্টারেস্টেড কেন?”
জেবা চট করে নিজের চোখের চাউনিটা লুকাতে চাইল। সে চামচ দিয়ে ফুচকা ভাঙতে ভাঙতে একটু হেসে বলল,
“আরে এমনিই। ওনার মতো একজন পাওয়ারফুল আর হ্যান্ডসাম পুরুষকে নিয়ে তো পুরো দেশের মেয়েদের মনেই ধোঁয়াশা থাকে। আমারও জাস্ট কৌতুহল হলো।”
জেবার এই কথার পেছনে যে অন্য কোনো হিসাব বা গভীর কোনো চিন্তা লুকিয়ে নেই নেই তা অরি বুঝল, তাই অরি সেসবে আর বেশি মাথা ঘামাল না। দুই বান্ধবী এরপর আরও কিছুক্ষণ নির্জন রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে চরম ইনজয় ও হাসাহাসি করে সময় কাটাতে লাগল।
ধানমন্ডিতে নিরিবিলি ও গাছপালা ঘেরা এক লেকের ধারের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো রঙের গাড়ি। গাড়ির হেডলাইট নেভানো, শুধু ভেতরের হালকা ড্যাশবোর্ড লাইটের আলোয় বসে ছিল নতুন শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিম। ওর পরনে এখন সাদা শার্টের ওপর কালো ব্লেজার, টাইটা কিছুটা আলগা করা। ওর সেই চিরচেনা গম্ভীর লুকটা রাতের অন্ধকারে আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।দেখেই বোঝা যাচ্ছে কারো জন্য এখানে অপেক্ষা করছে সে,
সারিমকে ওর ফ্রেন্ড নওমি হঠাৎ করে কল করে খুব জরুরি কথা আছে বলে এই নিরিবিলি জায়গায় ডেকে এনেছে। নওমি এমনিতে খুব ভালো ফ্রেন্ড সারিমের ওদের বন্ধুমহলে নওমি হচ্ছে একমাএ মেয়ে যে কিনা সবার মধ্যে ভুলবোঝা বুজি হলে সবার আগে এসে সব মিটমাট করে,ফ্রেন্ড সার্কেল এ নওমি একমাত্র মেয়ে হওয়াতে ওকে সবাই বেশ মান্য করে চলে।
তবে ইদানীং ওর আচরণে এক ধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করছিল সারিম।
ঠিক তখনই বাইরে মেঘের ডাক শোনা গেল। বসন্তের শেষ রাতের আকাশটা ভেঙে হঠাৎ করেই নীলচে আলোর বিদ্যুৎ চমকে মুষলধারে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। গাড়ির গ্লাসে বৃষ্টির জল ঝমঝমিয়ে আছড়ে পড়ছিল। সারিম জানালার কাচটা সামান্য নামিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। ওর নিখুঁত ট্রিম করা দাড়িতে ড্যাশবোর্ডের আলো পড়ে ওকে মারাত্মক হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছিল।
গাড়ির বাইরে ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নওমি অবশেষে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে এসে বসল। ওর পরনে একটা দামী জর্জেটের শাড়ি, পুরো শরীর বৃষ্টিতে ভেজা।
“কী এমন জরুরি কথা যে এই মাঝরাতে, এই বৃষ্টির মধ্যে তোকে এখানে আসতে হলো?ফোনেও তো বলা যেত,পরশু তো তোর বিয়ে,” সারিম অত্যন্ত গম্ভীর ও কর্কশ গলায় বলল।
নওমি নিজের ভেজা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে সারিমের দিকে তাকাল। ওর চোখে তখন এক উন্মাদনা। সে সারিমের একটা হাত খপ করে ধরে বলল,
“সারিম! আমি এই বিয়েটা করতে পারব না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি,সেটা হলি তুই। আমি শুধু তোকেই ভালোবাসি! বিগত চার বছর ধরে আমি এই ফিলিংসটা নিজের বুকে চেপে রেখেছি। কিন্তু পরশু আমার বিয়ে হয়ে গেলে আমি শেষ হয়ে যাব। প্লিজ সারিম, আমাকে এক্সেপ্ট কর। আমি জানি তোর লাইফে কোনো মেয়ে নেই।”
সারিম নিজের হাতটা এক ঝটকায় নওমির মুঠো থেকে মুক্ত করে নিল। ওর ধারালো চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখের মনিতে রাগ ফুটে উঠল। সে সিগারেটের ধোঁয়াটা নওমির মুখের ওপর ছেড়ে অত্যন্ত ঠান্ডা কিন্তু বেপরোয়া গলায় বলল,
“নওমি, তুই তোর লিমিট ক্রস করছিস। আমার মনে তোর জন্য ফ্রেন্ডশিপ ছাড়া আর কোনো ফিলিংস কোনোদিন ছিল না, আর কোনোদিন হবেও না। সো, এই ফালতু পাগলামি বন্ধ করে পরশু শান্তিমতো বিয়েটা কর যা।”
“কেন সারিম? আমার মধ্যে কী কম আছে? তোর কি কোনো মন নেই? তুই কেন আমার ভালোবাসা বুঝছিস না?” নওমি আরগুমেন্ট করতে শুরু করল। ওর গলা চড়তে লাগল।
সারিম ওর এই আরগুমেন্ট একদম সহ্য করতে পারছিল না। ওর বদমেজাজটা চট করে চড়ে গেল। সে কর্কশ গলায় বলল,
“মন আছে কি নেই, তা দেখার দায়িত্ব তোর না। আমি সাফ সাফ বলে দিচ্ছি, আই ডোন্ট কেয়ার। তুই এখন গাড়ি থেকে নাম।”
নওমি এবার চরম পাগলামি শুরু করল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“রিজেক্ট করার কারণ কী?প্লিজ সারিম এমনটা করিস না, আমি তোকে না পেলে মরে যাবো”
সারিম মনে মনে বিদ্রূপের হাসি হাসল। সারিমের বন্ধুমহলের কেউ ওর সেই অনাকাঙ্খিত বিয়ের কথা জানে না, কারণ সারিম ওটা নিজেই অত্যন্ত কঠোরভাবে গোপন রেখেছে। যে বিয়ে ও নিজে মনেপ্রাণে মানে না, যে বিয়ে ওর ওপর জোর করে চাপানো হয়েছিল, সেই বাল্যবিবাহের পরিচয় দিয়ে সমাজকে নাটক দেখানোর কোনো মানেই সারিমের কাছে নেই। ওর কাছে ওই তেরো বছরের পিচ্ছি মেয়েটা ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক স্পট, যার মুখও ও কখনো দেখতে চায় না।
নওমি হঠাৎ করেই গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। সারিমও বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামল ওকে বিদায় করার জন্য। বৃষ্টি তখন প্রচণ্ড বেগে পড়ছে। সারিম খেয়াল করেনি যে,ও যেই জায়গাটিতে এসেছে, তার ঠিক পেছনেই একটি মাঝারি মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে।
সারিম নওমিকে উদ্দেশ্য করে শুধু বলল,
“নওমি, গো টু হেল!”
এবং নিজের গাড়ির দিকে ফিরতে চাইল, ঠিক তখনই নওমি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। সে পেছন থেকে সারিমকে শক্ত করে জাপটে ধরল। সারিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই নওমি ওর গলার টাইটা টেনে ধরে জোর করে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। বৃষ্টির জলের মাঝে নওমি ওকে পাগলের মতো কিস করতে লাগল, নিজের সমস্ত অবদমিত ভালোবাসা ও জেদ উগরে দিতে চাইল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, সেই আবাসিক হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে ল্যাভেন্ডার রঙের হ্যারিয়ার গাড়িটা চালিয়ে আসছিল জেবা। গাড়ির স্পিড কম ছিল বৃষ্টির কারণে। ওয়াইপারটা অনবরত উইন্ডশিল্ডের জল পরিষ্কার করছিল।
জেবা হঠাৎ করেই ব্রেক কষে গাড়িটা রাস্তার এক কোণে থামিয়ে দিল। ওর চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। সে অরির কনুইতে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
“এই অরি! অরি দেখ দেখ! তোর ভাই না ওটা? তোর ওই হ্যান্ডসাম শিক্ষামন্ত্রী ভাই আবরার সারিম!”
অরি ল্যাপটপ আর খাতা থেকে চোখ তুলে জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির ঝাপসার মাঝে হোটেলের নিয়ন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লম্বা, সুঠাম দেহের পুরুষটিকে চিনতে অরির এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। ওনি মৃধা আবরার সারিম। কিন্তু ওনার সাথে ওটা কে?মেয়েটাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে কিস করছে! দৃশ্যটি এতটাই স্পষ্ট এবং ঘনিষ্ঠ ছিল যে আঠারো বছরের অরির কুমারী মনটা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর এক অজানা অস্বস্তিতে রি-অ্যাক্ট করে উঠল।
জেবা ততক্ষণে গাড়িটা আবার আস্তে করে স্টার্ট দিয়ে ওই জায়গাটা পার করে নিয়ে গেল। কিন্তু ওর মুখের টিপ্পনী শুরু হয়ে গেল। সে অরির দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলল,
“বাব্বা! তোর ভাই তো দেখি যেমন হ্যান্ডসাম, তেমনই ডেসপ্যারেট! দেশের শিক্ষামন্ত্রী বলে কথা, রাতের বেলা প্রেমিকা সামলাতে পারছে না! তাও আবার একটা আবাসিক হোটেলের সামনে এই বৃষ্টির মধ্যে লাইভ কিসিং সিন! তোর বাবা যদি একবার এই দৃশ্য দেখে, তবে তো ওনার খাকি পুলিশ গিয়ে ওনার নিজের ছেলেকেই লকআপে ভরে দেবে!”
জেবা অনবরত সারিমকে নিয়ে খোটা দিতে লাগল,
“বুঝলি অরি, এই বড় বড় মিনিস্টারদের ক্যারেক্টার এমনই হয়। দিনে নীতিবাক্য শোনায় আর রাতে প্রেমিকা নিয়ে আবাসিক হোটেলের সামনে ভণ্ডামি করে। তোর ভাই তো দেখি সেই রোমিওর বাপ!”
জেবার এই টিপ্পনীগুলো শুনে অরির ভেতরের মেজাজটা চরম বিগড়ে গেল। তার মনে সারিমের জন্য এক তীব্র খারাপ এবং নোংরা চিন্তাধারা তৈরি হলো। সে ভাবল,
“এই লোকটা এতই নিচু মনের? ওনার বাবা দেশের এত বড় সম্মানিত মানুষ,ওনি নিজে একজন মন্ত্রী, অথচ এই মাঝরাতে একটা মেয়ের সাথে রাস্তার মোড়ে এমন নোংরামি করছে?বিয়ের দিন আমাকে একা ফেলে চলে যাওয়ার সময় ওনার খুব দেমাক ছিল, আর আজ একটা মেয়ের আঁচল ধরে আবাসিক হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে!”
অরির হাত দুটো রাগে আর ঘৃন্নায় কাঁপছিল, কিন্তু সে নিজের শান্ত স্বভাবের কারণে নিজেকে পুরোপুরি কন্ট্রোল করল। সে জেবাকে কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ওর চোখ দুটোতে সারিমের প্রতি এক চরম ঘৃণা আর অবজ্ঞার মেঘ জমে উঠল।
এদিকে রাস্তার মোড়ে, নওমি যখন সারিমের ঠোঁটে জোর করে কিস করছিল, তখন সারিমের ভেতরের সেই ভয়ানক বদমেজাজি আর বেপরোয়া রাক্ষসটা জেগে উঠল। ওর আত্মনিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে গেল।
সারিম নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে নওমিকে একটা তীব্র ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। নওমি ছিটকে গিয়ে ভেজা পিচের রাস্তার ওপর পড়ে গেল। ওর শাড়ি-ব্লাউজ কাদায় লেপ্টে গেল।
কিন্তু সারিমের রাগ তাতেও শান্ত হলো না। সে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল মাটিতে পড়ে থাকা নওমির দিকে। ওর চোখ দুটো দিয়ে তখন যেন জীবন্ত আগুন বের হচ্ছিল। সে নওমির চুলের মুঠি ধরে ওনাকে টেনে তুলল এবং কোনো প্রোটোকল বা নারী-পুরুষের বাছবিচার না করে নওমির ফর্সা গালে সজোরে একের পর এক থাপ্পড় লাগাতে শুরু করল!
ঠাস! ঠাস! ঠাস! ঠাস!
একটানা, পর পর একই সাথে প্রায় বিশটা কানফাটা থাপ্পড় সারিম নওমির দুই গালে বসিয়ে দিল। বৃষ্টির শব্দের মাঝেও সেই থাপ্পড়ের আওয়াজগুলো যেন চাবুকের মতো শোনাচ্ছিল। সারিমের হাতের প্রতিটি আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে নওমির ঠোঁট ফেটে তাজা রক্ত বেরিয়ে এলো এবং ওর নাক দিয়েও অনবরত রক্ত ঝরতে লাগল। নওমির মুখটা মুহূর্তের মধ্যে এক বীভৎস রূপ ধারণ করল। সিনটা দেখতে যেমন ভয়ানক, তেমনই এক অদ্ভুত ডার্ক কমেডির মতো শোনাল, কারণ নওমি ব্যথার চোটে ঠিকমতো চিৎকারও করতে পারছিল না, শুধু ব্যাঙের মতো গোঙাচ্ছিল।
“তোর সাহস কীভাবে হয় আমার গায়ে হাত দেওয়ার?!”
সারিম হাঁপাতে হাঁপাতে নওমিকে আবার মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিল। ওর সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিলেন।
“আজকের পর যদি তোকে কখনো আমার এক মাইলের মধ্যে দেখি, তবে তোকে আমি এই শহরের কোনো ডাস্টবিনে চালান করে দেবো। গেট আউট ফ্রম মাই সাইট!”
সারিম আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে গটগট পায়ে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসল, সশব্দে দরজা বন্ধ করল এবং গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চোখের পলকে সেখান থেকে ধুলো আর বৃষ্টির জল উড়িয়ে চলে গেল। নওমিকে সেই বৃষ্টির রাতে, রক্তাক্ত অবস্থায় একলা ফেলে রেখে চলে গেল সারিম।
মাটিতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত নওমি তখন নিজের ভাঙা নাক হাত দিয়ে চেপে ধরল। ওর চোখের সেই ভালোবাসার উন্মাদনা এক সেকেন্ডের মধ্যে তীব্র জেদে পরিণত হলো। সে সারিমের চলে যাওয়া গাড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১
“মৃধা আবরার সারিম! তুমি আমার ভালোবাসাকে এই চড় দিয়ে ফিরিয়ে দিলে?আমি একদিন তোমার আমার এই ভালোবাসার পূনর্মিলন করেই ছাড়বো, নয়তো আমার নাম ও তেজরিন খান নওমি না”
একটা মেয়ে কতটা নিলজ্জ হলে পরপর এতগুলো থাপ্পর খাওয়া আর রিজেক্টশন হয়েও তাকে তীব্র ভাবে পেতে চায় তা নওমি না দেখলে বোঝাই যেত না।
