উন্মাদনা পর্ব ৪
কায়নাত খান কবিতা
“অভীর মতো একজন নীচ ও উচ্ছৃঙ্খল মানুষের পাল্লায় তুই জড়িয়ে পড়লি কীভাবে আন্দু?”—প্রশ্নটি যেন নিছক শব্দ নয়, একরাশ বিস্ময়, অভিযোগ আর উদ্বেগ মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস হয়ে এসে পড়ল আনন্দীর বুকে।
এমন কিছু প্রশ্ন থাকে, যার উত্তর হয়তো মনের গহীনে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকে, তবু ভাষায় প্রকাশ করতে গেলেই তা জড়িয়ে যায় অনিশ্চয়তার জালে। কোথা থেকে শুরু করবে, কোন স্মৃতির দ্বার খুলবে, আর কোন জায়গায় গিয়ে ইতি টানবে—তা নির্ধারণ করাই যেন হয়ে ওঠে দুরূহ।
আনন্দীও সেই অদৃশ্য দ্বিধার সীমানায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আনন্দী কলিকে কিছু একটা বলতে যাবে
ঠিক সেই সময় করিডোর জুড়ে নরম পায়ের শব্দে আবির্ভূত হলো স্নেহা।
তার উপস্থিতি যেন হঠাৎ করেই পরিবেশের সুর বদলে দেয়।আনন্দীর মুখাবয়বে মুহূর্তেই ভিন্ন ছায়া নেমে আসে।চোখের কোণে জমে রয়েছে একরাশ গোপন ব্যথা, যা সে সচেতনভাবেই আড়াল করতে চাচ্ছে।
স্নেহা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আনন্দীর দিকে।
যেন তার নিঃশব্দ কোনো ভাষায় উচ্চারিত সংকেত, যেন অনুচ্চারিত বাক্যে ভরা এক দীর্ঘ বার্তা চোখ বহন করছে। চোখের এই নিঃশব্দ সংলাপ বুঝবার ক্ষমতা সবার থাকে না।কিন্তু আনন্দীর আছে। সে জানে স্নেহা কেন তার পানে এভাবে তাকিয়ে রয়েছে।
এক মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নেয়।মুখে টেনে আনে নির্লিপ্ততার পর্দা, যেন অন্তরের ঝড়ের কোনো চিহ্ন বাইরে ফুটে না ওঠে।নীরবে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ায় সে।
আর এমনিতেই তো আজকের ক্লাস শেষ হতে বেশি দেরি নেই।তার আগে বই-খাতা গুছিয়ে নেওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।ক্লাসে প্রবেশ করে নিজের নির্দিষ্ট আসনে বসে পড়ে আনন্দী।
চারপাশে চেনা পরিবেশ,তবু আজ যেন সবকিছুই এক অদ্ভুত অপরিচিত আবহে আবৃত।বসতেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয় ব্যাগের ওপর।চেইনটি একটুখানি খোলা।ভ্রু কুঁচকে উঠে তার।পানি ভরতে যাওয়ার সময় সে নিজ হাতে তো ব্যাগটি বন্ধ করেছিল।
তাহলে এই অপ্রত্যাশিত খোলামেলা অবস্থার কারণ কী?
অন্তরে এক শীতল শঙ্কা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে লাগে আনন্দীর।যেন অদৃশ্য কোনো আশঙ্কা নিঃশব্দে এসে তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।
সতর্ক আঙুলে ধীরে ধীরে ব্যাগের চেইনটি পুরো খুলতে থাকে সে।চারপাশে তখন সহপাঠীদের হাসি-আড্ডা, ক্ষীণ কোলাহল।কিন্তু আনন্দীর
কাছে সবকিছুই যেন দূরাগত, অস্পষ্ট।তার মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ হলো ব্যাগের অভ্যন্তরে।
সম্পূর্ণ চেইন খুলে ব্যাগের ভেতরে হাত ঢুকাতেই যেন অচেনা এক স্পর্শে থমকে যায় আনন্দী। আঙুলে লেগে রয়েছে মসৃণ কাগজের ছোঁয়া আর সঙ্গে টাটকা গোলাপের নরম পাপড়ির শীতলতা। বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে ব্যাগের ভেতর থেকে বের করতেই দেখা যায় ।একটি সাদা খাম, তার সঙ্গে লাল গোলাপ।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বান্ধবীরা যেন এমন মুহূর্তের অপেক্ষাতেই ছিল।
“এই দে, দেখি দেখি!” বলে মুহূর্তেই খামটা কেড়ে নেয় তারা। কারো চোখে দুষ্টুমি, কারো মুখে চাপা হাসি।খাম খুলতেই ভেসে উঠল সুস্পষ্ট হাতের লেখা।অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষের এক বড় ভাইয়ের প্রেম নিবেদন।
আনন্দীর কপাল সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল। বুকের ভেতর হালকা বিরক্তির ঢেউ উঠলো।
“আজ তো পাশের ভার্সিটি বন্ধ… তাহলে চিঠিটি এলো কীভাবে?”—মনে মনে প্রশ্ন জাগে তার।
একটু পরেই রহস্যের জট খুলে যায় । বান্ধবীদের মধ্যেই কেউ একজন লজ্জা মেশানো স্বীকারোক্তি দেয়, ‘’ভাইয়া অনেক দিন ধরেই তোমাকে পছন্দ করে।”
কথাটা শুনে আনন্দীর মুখে কোনো লজ্জা বা আনন্দ ফুটে উঠে না। বরং একধরনের অস্বস্তি তার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সে তো ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে, আর সেই ছেলে অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষে—বয়স, অবস্থান, মানসিকতার দূরত্ব যেন হঠাৎ করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাকে। এখন মোটামুটি সবাই প্রেম নামক মধুটি সেবন করেছে বলা চলে। কিন্তু আনন্দী।সে তো ক্লাস টেন থেকেই অভী নামক অভিশপ্ত নামের সাথে জড়িত। হয়তো নতুন কলেজের কেউ তেমন একটা জানে না অভীর সম্মন্ধে। তাই তারা এমন করছে।ঠিক তখনই ছুটির বেল বাজে।
ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজতেই চারপাশে এক অদ্ভুত কোলাহল ছড়িয়ে পড়ে। ছুটির সেই চেনা উচ্ছ্বাসের ভেতরেও আনন্দীর মন ভারী হয়ে ওঠে
চিঠিটা ব্যাগে গুঁজে নিয়ে বাইরে বেরোতেই তার দৃষ্টি আটকে যায় একটু দূরে।
রোদে ঝলমল করা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অভীকে দেখে ।
কালো বাইকের পাশে হেলান দিয়ে, চোখে সেই চিরচেনা গম্ভীর দৃষ্টি।তাকে দেখেই অভী হালকা হাত তুলে ইশারা করে,
“এদিকে আয়।”
আনন্দী এক পা এগোতে যাবে, ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
“এই শুন! ভাইয়া মাঠে দাঁড়িয়ে আছে… উত্তরের মাঠে। চিঠির উত্তর নাকি এখনই লাগবে।”
পা যেন থেমে যায় আনন্দীর। মুহূর্তের জন্য দ্বিধা তাকে গ্রাস করে ফেলে।দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা লক্ষ্য করে অভী।
হঠাৎ করেই বাইক স্টার্ট দিয়ে সরাসরি আনন্দীর সামনে এসে দাঁড়ায় সে।
কোনো কথা নয়, কোনো প্রশ্ন নয়,শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকায়।
“চিঠিটা কোথায়?”—গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে অভী।
আনন্দী কিছু বলার আগেই সে নিজেই ব্যাগটা টেনে নিয়ে খুঁজে দেখতে থাকে।একটি খাম এবং একটি গোলাপ। চিঠিটি পিছনে নিজের লোকদের দেয় অভী৷ তারপর আনন্দীর হাত ধরে বাইকের পিছনে বসায়। নিজের টি-শার্ট খুলে নিয়ে শক্ত করে আনন্দীর কোমরের সঙ্গে নিজের কোমর বেঁধে ফেলে সে।
এই অদ্ভুত, তীব্র, নিয়ন্ত্রণময় আচরণে আনন্দীর বুক ধড়ফড় করে উঠে।কিন্তু সে কিছু বলতে পারে না।অভী এক ঝটকায় বাইক স্টার্ট দেয়। বাইকের গতি এতোটাই জোড়ে ছিলো যে ভয়ে আনন্দীর রুহ অব্দি কেঁপে ওঠে।
উন্মাদনা পর্ব ৩
__শক্ত কইরা ধর বান্দীর বাচ্চা, পড়লে হাড্ডি ভাঙ্গবো।’’
আনন্দী ভয়ে অভীকে শক্ত করে ধরে। তাদের গন্তব্য সম্পর্কে জানা নেই। কিন্তু অভীর আচরণে বলে দিচ্ছে ভিষণ খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে আজ।
বাইক ঘুরে আনন্দীর কলেজ থেকে একটু দূরে একটা জনশূন্য মাঠে এসে থামে। চিঠিতে যেই মাঠের কথা উল্লেখ রয়েছে অভী সেই মাঠেই আনন্দীকে নিয়ে আসে। বাইক থেকে নেমে আনন্দীর হাত ধরে সোজা ছেলেটির কাছে চলে যায়।
__ওরে তোর পছন্দ?”
আনন্দী ভয়ে চুপসে যায়। মুখ থেকে কোনো প্রকার শব্দ বের হয় না।
__বান্দীর বাচ্চা কথা কো জলদী!”
