উন্মাদনা পর্ব ৪৩
কায়নাত খান কবিতা
‘ বাবার বুক ছাড়ো! স্বামীর বুকে আসো সোনামনি! ‘
আনন্দী অশ্রুসিক্ত চোখে একবার বাবার মুখের দিকে তাকায়। সেই চাহনিতে ছিলো অসহায় আর্তি, শেষবারের মতো আশ্রয় খোঁজার আকুতি। কাঁপা, মায়াভরা কণ্ঠে সে বলে,
“এই লোকটার সঙ্গে আমি যাব না, বাবাই…”
আকরাম শেখ মেয়ের মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে দিলেন। অথচ সেই হাতের উষ্ণতায় আজ কোনো আশ্বাস নেই, নেই নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। দীর্ঘশ্বাস চেপে তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতেই যেতে হয়, মা…”
কথাগুলো যেন বজ্রাঘাত হয়ে আছড়ে পড়ল আনন্দীর বুকের ভেতর। মুহূর্তেই মনে হলো, পায়ের নিচের মাটিটুকুও সরে গেছে। যে মানুষটা মাত্র একদিন আগেও বুক পেতে তাকে আগলে রেখেছিলেন, আজ তিনিই নিজের হাতে তাকে তুলে দিচ্ছেন এমন এক মানুষের কাছে, যার নাম শুনলেই তার অন্তর আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।হতভম্ব আনন্দী ছুটে গিয়ে মায়ের আঁচল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার কণ্ঠ ভেঙে এল কান্নায়।
“মা… মা গো… তুমিও কি আমাকে এমন একজন মানুষের কাছে থাকতে বলবে?”
আয়না বেগম মেয়ের কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে তাকে বুকে টেনে নিলেন। তাঁর বুকও ভারী হয়ে উঠেছে, তবু সমাজের কঠিন বাস্তবতার কাছে একজন মায়ের মমতা আজ বড় অসহায়।ধীরে ধীরে তিনি বললেন,
“এখন সে-ই তোর স্বামী, আনন্দী। পুরো এলাকা জেনে গেছে তোদের বিয়ের কথা। একবার তোর বাবার সম্মানের কথাটা ভাব, মা…”
কথাগুলো শুনে আনন্দীর হাত আলগা হয়ে এলো। ধীরে ধীরে সে মায়ের কাছ থেকে সরে দাঁড়ায়। আশ্চর্যের বিষয়, তার চোখে আর একফোঁটা পানি ও নেই। হয়তো কান্নারও একটা সীমা থাকে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষ আর কাঁদতে পারে না, শুধু ভেতরটা নিঃশব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।সে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল।মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগে।একটি মেয়ের ফুলের মতো কোমল, স্বপ্নে মোড়া জীবন যে মানুষটা নির্মমভাবে পদদলিত করেছে, তাকে কীভাবে ভালোবাসা যায়? কীভাবে তাকে নিজের জীবনের সঙ্গী হিসেবে মেনে নেওয়া যায়? যে মানুষটাকে দেখলেই বুকের ভেতর ভয় আর ঘৃণা একসঙ্গে জন্ম নেয়, তার সঙ্গে একই ছাদের নিচে বাকি জীবন কাটানোর শক্তি আদৌ কি কোনো মেয়ের থাকে?এরপর হঠাৎই অভী এগিয়ে এসে আনন্দীর কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরে। সেই আঁকড়ে ধরা স্পর্শে ছিল কর্তৃত্ব, ছিল একরাশ নির্দয় নিশ্চিন্ততা। এরপর আকরাম শেখ ও আয়না বেগমের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে,
“বউ নিয়ে চললাম। একদম আপনাদের নাতি-নাতনি নিয়েই ফিরব। দোয়া করবেন।”
কথাগুলো শুনে চারপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠে। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। প্রতিবাদের ভাষা ও যেন সবাই হারিয়ে ফেলেছে।চোখে কালো চশমা এঁটে অভী একরকম দম্ভভরা ভঙ্গিতে আনন্দীর হাত শক্ত করে ধরে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
আনন্দী একবারও হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না। প্রতিবাদ করার ইচ্ছেটুকুও যেন তার ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে গেছে। যে বাবার বুকে মাথা রাখলে এতদিন পৃথিবীর সব ভয় তুচ্ছ মনে হতো, সেই বটগাছের মতো বিশাল আশ্রয়টিই আজ তাকে রক্ষা করতে পারল না। তবে আর কোথায় যাবে সে? কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে?নীরবে অভীর সঙ্গে পা বাড়াল আনন্দী।গাড়ির কাছে পৌঁছে অভী দরজা খুলে তাকে ভেতরে বসিয়ে দিল। তারপর নিজেও চালকের আসনে গিয়ে বসল। ইঞ্জিনের শব্দে নিস্তব্ধতা ভাঙলেও, তাদের দু’জনের মাঝখানে জমে থাকা নীরবতা একটুও ভাঙল না।পুরো পথজুড়ে অভী একবারও কোনো কথা বলল না। আনন্দীও জানালার বাইরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গাড়িটা সামনে এগিয়ে চলল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দীর পরিচিত পৃথিবীটাও যেন ধীরে ধীরে পিছনে ফেলে হারিয়ে যেতে লাগল।
গাড়িটা এসে থামে ঠিক অভীদের বাড়ির সামনে। ব্রেক কষার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে দ্রুত নেমে পড়ে আনন্দী। এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে সে, যেন গাড়ির ভেতরটুকুও তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিলো।অভী অবশ্য তাড়াহুড়ো করল না। নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নেমে নিজের সাঙ্গোপাঙ্গদের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আগামী তিন দিন আমি বাড়ি থাইকা বাইর হবো না। কেউ আমারে ডিস্টার্ব করবি না।”
কথাটা শুনেই তার সাঙ্গোপাঙ্গরা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চাপা হাসি হেসে ফেলে। তাদের সেই অর্থবহ হাসি অভীর চোখ এড়াল না। তবে সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে সে অলস ভঙ্গিতে শরীরটা টানটান করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে।সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে প্রথমেই সদর দরজায় বড়সড় একটি তালা ঝুলিয়ে দিল সে। ধাতব তালার শব্দে পুরো বাড়িটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠে।
তারপর ধীর পায়ে শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল অভী।ঘরে ঢুকেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল বারান্দার কাঁচের দরজার সামনে। আনন্দী নিঃশব্দে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মাথাটা দরজার সঙ্গে হেলান দেওয়া, দৃষ্টি বাইরে কোথাও স্থির। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, যেন সমস্ত অনুভূতি এক মুহূর্তে পাথর হয়ে গেছে।
নিঃশব্দে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল অভী। দুজনের মাঝখানের সামান্য দূরত্বটুকুও ইচ্ছে করেই মুছে দিল সে। আনন্দীর পিঠে তার শরীরের উষ্ণতা লাগতেই আনন্দীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠতে শুরু করে। অজান্তেই সে শুকনো ঢোক গিলে ফেলে।অভী ধীরে ধীরে মুখটা তার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে নিচু, ভারী স্বরে বলে,
“আজ থেকে তুমি সম্পূর্ণ আমার। এক চুল পরিমাণও অন্য কারও নও।”
আনন্দীর ঠোঁট কেঁপে উঠে।
“আমি…”
শব্দটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই অভী এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়। এক হাতে বারান্দার কাঁচের দরজাটা টেনে বন্ধ করে, আর অন্য হাতে শক্ত করে চেপে ধরে আনন্দীকে। ঘরজুড়ে নেমে আসে এক ভারী, দমবন্ধ করা নীরবতা।অভী অজস্র চু’মুতে ভরিয়ে দিতে লাগলো আনন্দীকে। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত জেদ, যেন পৃথিবীর কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারবে না। অভীর এই জেদ এক প্রকারের অস্বস্তি বয়ে আনে আনন্দীর মন জুড়ে।
আনন্দী আতঙ্কে দু’পা পিছিয়ে যায়। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এত জোরে কাঁপছিলো যে মনে হতে থাকে , নিস্তব্ধ ঘরেও তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে দু’হাতে অভীকে সরিয়ে দিয়ে খাটের এক পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।অভী আবার সামনে এগোতেই আনন্দী অন্য দিকে সরে চলে যায়। এভাবেই শুরু হলো এক নিঃশব্দ ধাওয়া। খাটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে আনন্দী শুধু নিজেকে বাঁচানোর জন্য ছুটে বেড়াতে লাগলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল ভয়, প্রতিটি নিশ্বাসে ছিল অসহায়তা।অভী বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে বলল,
” দুষ্টুমি করো না সেনামনি। আমার আর তর সইতাছে না। কা:ছে আসো।?”
আনন্দীর চোখ দুটো রাগ আর ঘৃণায় লাল হয়ে উঠে।আচ্ছা সব কিছু কী সিনেমার মতো হয়? সবার কী রেড ফ্লাগ হিরো পছন্দ হয়? অতি কষ্টে আনন্দী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
” আপনি আমার কাছে আসলে বড্ড ঘিন্না লাগে অভী! বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ!”
কথাটা শুনে অভী কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থাকে। তারপর ধীর স্বরে বলে,,
“ কাছে আয়! আর লাগবে না!”
“ আমি আপানকে ঘৃণা করি অভী!’’
“জানি।”
অভীর অনড় দৃষ্টি আর কঠিন নীরবতা দেখে আনন্দী বুঝে যায়। আজ তাকে কোনোভাবেই ফিরিয়ে রাখা যাবে না। শেষ চেষ্টা হিসেবে দ্রুত পায়ে হলরুমে গিয়ে টি-টেবিলের ওপর রাখা ফল কাটার ছোট্ট ছুরিটা তুলে নেয় সে। কাঁপা হাতে ধারা’লো ফলাটা নিজের গলার কাছে চে’পে ধরে অভীর দিকে তাকায়। চোখে ভয়, ক্ষোভ আর অসহায়তার এক অদ্ভুত মিশেল।
কিন্তু অভী যেন একেবারেই বিচলিত হলো না। দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দরজার চৌকাঠে ঠেস দিয়ে নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে না ছিল আতঙ্ক, না ছিল তাড়াহুড়ো।ছিল কেবল এক গভীর, দুর্বোধ্য স্থিরতা।আনন্দীর কণ্ঠ কেঁপে উঠে।
“আত্ম*হ*ত্যা মহাপাপ। কিন্তু আপনার সঙ্গে থাকার চেয়ে সেই পাপ করাটাই বোধহয় সহজ।”
কথাগুলো শুনেও অভীর মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না। ধীর, স্থির পদক্ষেপে সে সদর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একবারও পেছনে না তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“আমারে যেদিন বুঝবা… সেদিন পাগলের মতো খুঁজবা।”
এরপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। নিঃশব্দে দরজা খুলে বাইরে চলে যায় ।দরজা বন্ধ হওয়ার ক্ষীণ শব্দটুকু যেন পুরো ঘরজুড়ে দীর্ঘশ্বাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।আনন্দী ধীরে ধীরে ছুরি:টা টি-টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখে। তারপর সমস্ত শক্তি যেন এক নিমিষেই নিঃশেষ হয়ে গেছে এমনভাবে সোফায় শরীর এলিয়ে দিল। শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
মাত্র একটি দিনের ব্যবধানে জীবনটা যেন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। যে জীবন একসময় রঙিন স্বপ্নে, হাসিতে আর অগণিত সম্ভাবনায় ভরে ছিলো, সেই ফুলের মতো কোমল জীবন আজ মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেছে। চারপাশে সবকিছু আগের মতোই আছে, অথচ তার নিজের পৃথিবীটা যেন নিঃশব্দে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতেই এক মুহূর্তে আনন্দী অনুভব করল, পায়ের নিচের মাটি যেন হঠাৎ করেই সরে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভী তাকে অনায়াসে কোলে তুলে নিয়েছে।এতটাই আকস্মিক ছিল ঘটনাটা যে প্রতিবাদ করার সুযোগটুকুও পেল না সে।
পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে আসতেই আনন্দী ছটফট করে উঠে। হাত-পা ছুঁড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগে আনন্দী। কিন্তু অভীর বাহুর বাঁধন ছিল পাথরের মতো দৃঢ়। তার পদক্ষেপেও ছিল না কোনো দ্বিধা। নিশ্চুপ ভঙ্গিতে সে আনন্দীকে নিয়ে সোজা নিজেদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।ঘরে ঢুকেই অত্যন্ত সাবধানে আনন্দীকে বিছানার কিনারায় বসিয়ে দিল অভী। তারপর ধীর গতিতে ঘুরে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয় সে। দরজা লাগানোর ক্ষীণ শব্দে আনন্দীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে।দরজা থেকে সরে এসে অভী ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ঘরের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছিলো। আর আনন্দী, অজানা আশঙ্কায় বুক ধড়ফড় করতে করতে, বিছানার কিনারায় বসে তার প্রতিটি পদক্ষেপ গুনতে লাগে।
আনন্দীর একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায় অভী। ধীরে হাত বাড়িয়ে তার থুতনিটা আঙুলের ডগায় তুলে ধরল সে। বাধ্য হয়ে চোখ তুলে তাকাতেই অভীর ঠোঁটের কোণে হালকা এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
“কী সমস্যা তোর? আমি তো দেখতে খারাপ না। ব:ডি ও মন্দ না, উচ্চতাতেও তোর চেয়ে বেশি। তাহলে আপত্তিটা ঠিক কোথায়?”
আনন্দী এক ঝটকায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক আর ক্ষোভ একসঙ্গে গলায় এসে আটকাল।
“আমি প্রেগন্যান্ট, অভী।”
উন্মাদনা পর্ব ৪২
কথাটা শুনে অভীর মুখে বিস্ময়ের কোনো ছাপ ফুটল না। বরং চোখের কোণে যেন এক চিলতে দুষ্টু হাসি খেলে গেল। শান্ত, প্রায় নির্লিপ্ত কণ্ঠেই সে বলে,
” পা ঘেঁষা ঘেঁষি করলেই প্রেগন্যান্ট হয় না, সোনামণি।”
