Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৫৪

উন্মাদনা পর্ব ৫৪

উন্মাদনা পর্ব ৫৪
কায়নাত খান কবিতা

‘ ও বেহুলালললল…আমি মরলে..আমায় নিয়ে.. ভাসাইয়ো..ভেলা…!”
‘কচু করবো..!’
অভীর কথার কোনো উত্তর দিল না আনন্দী। শুধু সামান্য তিরস্কার মেশানো দৃষ্টিতে একবার তার দিকে তাকাল। পরক্ষণেই এমন নিস্পৃহ ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন অভীর গান তার বিরক্তিকে আরও খানিকটা উসকে দিয়েছে। পেছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না সে। দৃঢ় পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল আনন্দী।
কিন্তু অভীও নাছোড়বান্দা। আনন্দীর নীরব অভিমানকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে সে ঠিক তার পিছু পিছু চলতে লাগল। আনন্দী সিঁড়ির কাছে পৌঁছে সবেমাত্র প্রথম ধাপে পা রাখতে যাবে, ঠিক তখনই অভী দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে কোলে তুলে নেয়।আকস্মিক এমন ঘটনায় আনন্দী মুহূর্তেই বিস্ময়ে থমকে গেল। চোখেমুখে ফুটে উঠল আচমকা চমকে যাওয়ার স্পষ্ট ছাপ।

তবে আনন্দীকে কোলে তুলেও অভী আর এক পা এগোল না। যেন হঠাৎ কোনো কথা তার মনে পড়ে গেছে। মুহূর্তেই থেমে গেল তার পদক্ষেপ। ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে উঠে তার। তারপর ধীর দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকিয়ে কোলে থাকা আনন্দীর মুখের দিকে চোখ রাখল সে। তার দৃষ্টিতে ফুটে উঠল হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো ভাবনার আভাস। অভী শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করলো, ‘ওজন কত তোর?’
আনন্দী সঙ্গে সঙ্গে দুই ঠোঁট ভাঁজ করে সামান্য ভিজিয়ে নিল। অভীর প্রশ্নটা শুনতেই যেন অকারণ এক অস্বস্তি এসে ভর করল তার মনে। দৃষ্টি এড়িয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করল সে। তারপর আমতা-আমতা স্বরে বলল, ‘ওই তো… পঁয়তাল্লিশ। কেন?’
অভীর মুখে মুহূর্তেই ফুটে উঠে দুষ্টুমিভরা এক বাঁকা হাসি। চোখেমুখে যেন ধরা পড়ে আনন্দীকে খেপিয়ে দেওয়ার পুরোনো দুষ্টুমি।কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গিতে অভী বলল,
‘দিনদুপুরে কইলি তো ঠাডা পড়া মিথ্যা কথা!’

কথাটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই অভী আনন্দীকে বেশ জোরে মাটিতে নামিয়ে দেয়। আকস্মিক ধাক্কায় আনন্দী এক মুহূর্তের জন্য তাল হারিয়ে প্রায় পড়ে যেতে ন্যায়। শেষ মুহূর্তে কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সে। বিস্ময় আর বিরক্তির মিশেল ছড়িয়ে পড়ে তার চোখেমুখে।
কিন্তু ঠিক কী ঘটল, কিছুই বুঝে উঠতে পারে না আনন্দী। এক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা আচমকাই তাকে কোলে তুলে নিয়েছিল, পরক্ষণেই কেন এমন অপ্রস্তুতভাবে মাটিতে নামিয়ে দিল কোনো? হিসাবই যেন মিলছে না তার। বিস্মিত চোখে অভীর দিকে তাকিয়ে রইল সে।মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন উঁকি দিতে লাগল।
এদিকে অভী যেন কিছুই হয়নি, এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে দু’হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে গুনগুন করে গান ধরল। কণ্ঠে মিশে রইল নিখাদ দুষ্টুমি, আর কথাগুলো যেন ইচ্ছে করেই আনন্দীকে খেপিয়ে তোলার জন্য ছুড়ে দেওয়া,
‘তুমি এতো মোটা… তুমি এতো মোটা… দুই হাতে বেড় পাই না… তুমি এতো মোটা…!’
আনন্দী পুরোপুরি তব্দা খেয়ে গেল। গানের ছলে তাকে মোটা বলল অভী! মুহূর্তের জন্য যেন সে বুঝতেই পারল না, মানুষটা সত্যিই এমন শতান কীভাবে হয়।
অন্যদিকে আনন্দীকে খেপিয়ে দেওয়ার আনন্দে মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে অভী গুনগুন করতে করতেই নির্বিকার ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে যেতে লাগে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আনন্দীর মুখ রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠে। শেষ পর্যন্ত লোকটা তাকে মোটা বলেই ছাড়ল!

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অভীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল সে। বুকের ভেতর জমে থাকা বিরক্তি যেন আর আটকে রাখতে না পেরে গজগজ করে বেরিয়ে আসতে লাগল।
“অসভ্য একটা! ইচ্ছে করে জ্বালায়!”
অভী ততক্ষণে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। আর পেছনে দাঁড়িয়ে আনন্দী রাগে গজগজ করতে করতে মনে মনে ঠিক করে ফেলে, এই অপমানের জবাব সে একদিন ঠিকই দেবে।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরে ফিরে এল আনন্দী। ভেতরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেল বিছানার দিকে। অভী সেখানে দিব্যি আরাম করে শুয়ে আছে, একমনে ফোনের পর্দায় আঙুল চালাচ্ছে, যেন কিছুই ঘটেনি। যেন কিছুক্ষণ আগেই সে আনন্দীকে মোটা বলে খেপিয়ে আসেনি!
অভীর এমন নির্বিকার ভাব দেখে আনন্দীর মেজাজ যেন আরও এক ধাপ চড়ে গেল। রাগে চোখ দুটো কটমট করে উঠে তার।
মনে মনে অভীকে একশোটা গালিগালাজ করেও মুখে অবশ্য টুঁ শব্দটি করে না আনন্দী। অভীর দিকে ফিরেও তাকায় না সে, সোজা গিয়ে দাঁড়ায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে শাড়ির আঁচলটা গুছিয়ে নেয় সে। তারপর আঙুলের ফাঁকে এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে নিয়ে ধীর হাতে আঁচড়াতে শুরু করে। মুখে নীরবতা থাকলেও তার প্রতিটি ভঙ্গিতে যেন জমে থাকা অভিমানের ছাপ স্পষ্ট হয়ে রইল।

রাগে আনন্দীর মুখটা সামান্য ফুলে থাকলেও, সেই অভিমানের আড়ালেই তাকে তখন অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। চোখেমুখে জমে থাকা অভিমান, ঠোঁটের কোণে চাপা বিরক্তি, সব মিলিয়ে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য যেন আরও গভীর, আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
বিছানায় শুয়ে থাকা অভীর চোখও বেশিক্ষণ ফোনের পর্দায় আটকে রইল না। একসময় ফোনটা পাশে রেখে ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। তারপর কোনো কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আনন্দীর দিকে।
কিছুক্ষণ নীরবে আনন্দীর দিকে তাকিয়ে থাকার পর অভী হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,’মাইনষের বউরা তাগো স্বামীর লাইগা কত সুন্দর সুন্দর গান গায়! তুমি একটা গান গাইতে পারো না আমার জন্য?’
আনন্দী ধীরে ধীরে চিরুনিটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অভীর দিকে। মুখে তখনও রাগের রেশটুকু স্পষ্ট, তবে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল চাপা, রহস্যময় এক বাঁকা হাসি।
‘আমি তো আপনার জন্য একটা গান বানিয়েই রেখেছি ইতিমধ্যে!’
কথাটা শুনতেই অভীর মুখ মুহূর্তে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে। যেন এতক্ষণকার সব দুষ্টুমি, সব কাণ্ডকারখানা নিমেষেই ভুলে গেছে সে। খুশিতে প্রায় আত্মহারা হয়ে বিছানা থেকে একটু এগিয়ে এসে উৎসুক গলায় বলল,
‘ওমা! তাই? শোনাও না, বউ!’
আনন্দী বেশ গম্ভীর মুখে গলা পরিষ্কার করে। তারপর অভীর চোখে চোখ রেখে একেবারে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে গেয়ে উঠল,

‘ক্যাসে হুয়া… ক্যাসে হুয়া… তু ইতনা হা’রা’মি… ক্যাসে হুয়া…’
আনন্দীর গান শুনে অভী যেন মুহূর্তেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড তব্দা মেরে সেভাবেই বসে রইল সে। শেষমেশ কি না তাকে হারামি বলল আনন্দী! তাও আবার সরাসরি নয়, গানের সুরে, একেবারে নিষ্পাপ মুখ করে!
অন্যদিকে আনন্দীর মনটা বেশ খুশিতে ভরে উঠে।এতক্ষণে যেন প্রতিশোধটা ঠিকঠাক নেওয়া হয়েছে। তাকে মোটা বলার জবাবে সেও একই কায়দায় গানের আড়ালে অভীকে অপমান করে ছাড়ল। মুখে অবশ্য গাম্ভীর্য ধরে রাখলেও, ভেতরে ভেতরে আনন্দে যেন মুচকি হাসছিল সে।
আনন্দীর কথার কোনো জবাব দেয় না অভী। মুখখানা গম্ভীর করে নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। ভাবখানা এমন, যেন আনন্দীর গানের আঘাতে এইমাত্র জীবনের সবচেয়ে বড়ো ধাক্কাটা সে খেয়েছে! এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়ায় না, গাল ফুলিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে লাগে।আনন্দীও অবশ্য ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। অভীর পিছু পিছু কয়েক পা এগিয়ে ভারী নিরীহ গলায় ডেকে বলল, ‘আর গান শুনবেন, স্বামী?
অভী এবারও কোনো উত্তর দেয় না। রাগে ফুলতে ফুলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তবে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বিড়বিড় করে বলে গেল,

‘স্বামীকে অবমাননা করে! জাহান্নামী মহিলা…’
কথাটা আনন্দীর কান এড়াল না। সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে গলা উঁচিয়ে সে বলে উঠল, ‘তিনবেলা মদ গেলা শুদ্ধ পুরুষ রে…!’
অভী রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। মনে মনে তার একটাই কথা, এই মেয়েকে সঙ্গে রাখলে অপমান ছাড়া আর কিছুই কপালে জুটবে না! দিনকে দিন যেন আনন্দীর মুখে কথার খই ফুটছে। কখন যে কোন কথা দিয়ে তাকে ধরাশায়ী করে বসে, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।
বেশ বিরক্ত মুখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম এগোতেই অভীর চোখে পড়ে ছোটুকে। হাতে চায়ের কাপ, সম্ভবত কারও কাছে চা পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল সে। অভীকে দেখেই ছোটু থমকে দাঁড়ায় সে।

অভীর ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই ফুটে উঠল সেই চেনা দুষ্টু হাসি। ছোটুও অভীর মুখের দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল। কারণ অভী যখনই তাকে একা পায়, তার প্যান্ট খুলে দৌড় লাগায়। এবং এটা নতুন নয়। যতবার ছোটুকে সে একা পায়। ততবার প্যান্ট খুলে দৌড় দেয়। সকলের সামনে ছোটুর টাই-টাই ফিস হয়ে যায়। যার ফলে সে অভীকে দেখলেই একশো হাত দূর থাকে। যদি না সে চায়ের ওর্ডার দেয়। কারণ কাজ করার সময় অভী দুষ্টুমি করে। তবে ফ্রী যখন থাকে এবং অভীর দেখা পায়, তখনই তার প্যান্ট খুলে অভী দৌড় দেয়।
অভীকে সামনে আসতে দেখে ছোটু দূর থেকে বলে,

উন্মাদনা পর্ব ৫৩

‘ কাকা…দূরে..!’
অভী ছোটুর কোনো কথা কানে নিয়ে ঝুলতে ঝুলতে এগিয়ে যেতে থাকে। ছোটু আবার ও জোরে জোরে বলে, ‘ কাকা একদম না! দূরে..!’
অভী নির্বিকার ভাবে ছোটুর দিকে এগিয়ে যেতেই থাকে। একপর্যায়ে রাগে এবং অভিমানে ছোটু চায়ের কাপ গুলো মাটিতে ফেলে নিজেই নিজের প্যান্ট খুলে দূরে ছুঁড়ে মারে। এবং রাগে শরীর ঝাঁকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
‘ আর পড়তামই না প্যান্টনননমন!’

উন্মাদনা পর্ব ৫৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here