উপসংহারে তুমি পর্ব ৭
রুহানিয়া ইমরোজ
নাফিমকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এই খবরটা মুহূর্তের মধ্যে ঝড় তুলে দেয় গোটা শিকদার ভিলায়। শেষবার ড্রাইভওয়েতে ন্যানির সাথে লুকোচুরি খেলতে দেখা গেছে নাফিমকে। খেলা চলাকালীন সময়ে সে এমন একখানে লুকায় যে তাকে আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। পুরো অংশটুকু তিন বার চক্কর দেওয়ার পরেও হদিস মিলেনি ছোট্ট নাফিমের।
হৃদয়বিদারক সংবাদটা থমকে দেয় সবাইকে। নাতির চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেন আশরাফ সাহেব এবং উনার স্ত্রী। গোটা বিল্ডিংয়ে পর পর তিনবার খোঁজা হয় নাফিমকে কিন্তু তার খবর মেলে না। নাজনীন বেগম তো হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন নাতির শোকে। আশরাফ সাহেব বাধ্য হয়ে থানায় জানান অতঃপর নাওয়াফকে কল দেন।
ইম্পোর্ট এক্সপোর্টের বিজনেস আছে নাওয়াফের তাই বেশিরভাগ সময় তাকে বাইরেই কাটাতে হয়। শত ব্যস্ততা থাকার পরেও, খবরটা কানে পৌঁছানো মাত্র বাড়ি ছুটে আসে নাওয়াফ। অসময়ে ছেলেকে আসতে দেখে ভয় পেয়ে যান নাজনীন বেগম৷ এবার কী হবে সেটা ভেবেই কলিজা শুকিয়ে যায় উনার। সন্তানের বেলায় ভীষণ কঠোর নাওয়াফ। নাফিমকে দেখে রাখতে না পারার অপরাধে সম্পর্ক শেষ করে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করবে না সে ।
এসব ভেবেই কলিজা মোচড় দিয়ে উঠে নাজনীন বেগমের। অসহায় চোখে তাকান নাওয়াফের দিকে ৷ সর্বদা ফিটফাট হয়ে চলা ছেলেটা কে এলোমেলো দেখাচ্ছে ভীষণ। চাল চলনে অস্থির ভাবটা স্পষ্ট। সন্তান হারানোর ভয়ে চোখমুখ শুকিয়ে এইটুকুনি হয়ে গেছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির দিকে যেতে যেতে নাওয়াফ চাপা গলায় বলে,
–” উপরে এসো তোমরা।
কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি। কেবল আতঙ্ক বুকে চেপে নিঃশব্দে পিছু নিয়েছে নাওয়াফের। ফ্ল্যাটে আসার পর হুলুস্থুল করে টিভিতে কিছু একটা সেট আপ করে নাওয়াফ। পরপরই মনিটরের স্ক্রিনে ভেসে উঠে গোটা বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ। সকলেই আরেকদফা চমকায়৷
কারণ কেউই জানতো না এই বাড়িতে হিডেন ক্যামেরা আছে এমনকি স্বয়ং আশরাফ শিকদারও অবগত ছিলেন না এই বিষয়ে। মনিটরের স্ক্রিনে একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠে। নাওয়াফ শুধু নাফিম কে ফলো করে পুরোটা সময়। সিসিটিভিতে দেখা যায়, খেলতে খেলতে লুকানোর জন্য লিফটের কাছে আসে নাফিম। ওখানে স্কুল পড়ুয়া এক ছেলে তাকে দেখে আদর করে এবং তৃতীয় ফ্লোরে নামিয়ে দিয়ে যায়।
ছোট্ট নাফিম গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে আর তার পরপরই ” বাবা তুকিইইই ” বলে ঘরে ঢোকে। ঘরের মধ্যে কাউকে না পেয়ে আবারও বেরিয়ে আসে নাফিম। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায় চিত্রার ঘরের দিকে। নাওয়াফ তড়িঘড়ি করে চিত্রার ঘরের হিডেন ক্যামেরার ফুটেজে ক্লিক করে।
সাথে সাথেই সবার কর্ণকুহরে ভেসে আসে অপ্রীতিকর কিছু কথা। যেখানে নাজনীন বেগম চিত্রাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ” আমার ছেলেকে ধ্বংস করার জন্য জন্ম হয়েছে তোদের? ওর ঘাড়ে এসে জুটছিস কেনো? বসে বসে আমার পোলার অন্ন ধ্বংস করতে লজ্জা লাগে না? হাহ্! কাকে কী বলছি আমি। শরীর বিকিয়ে আহার কেনা তো তোদের পেশা। ”
ফুটেজটা ৩৬০° এঙ্গেলে ঘুরিয়ে দেয় ঘটনার মোড়। নাফিমের খোঁজ পাওয়ার সাথে সাথে মায়ের এক নতুন রুপের সাথে পরিচিত হয় নাওয়াফ। বিস্ময়ে কথা বলতেই ভুলে যায় সে। মায়ের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে,
–” মা?
স্ত্রীর করা অন্যায়টা মানতে পারলেন না আশরাফ সাহেব। রাগে গা পিত্তি জ্বলে উঠল উনার। মেজাজ সামলাতে না পেরে রাগী গলায় বলে উঠলেন,
–” কীভাবে বলতে পারলে তুমি এসব? তোমার ঘরে একটা মেয়ে আছে নাজ ইভেন তুমি নিজেও একজন নারী। ওইটুকু বাচ্চা একটা মেয়েকে এসব বলতে বিবেকে বাঁধেনি তোমার?
নাজনীন বেগম ফাঁকা ঢোক গিলেন স্বামীর প্রশ্নে। তিনি জানেন কাজটা অন্যায় ছিল কিন্তু মনকে তো শাসন করতে পারেন না। যখনই মনে পড়ে ওই মেয়ে চৈত্রিকার বোন তখুনি ভেতরকার রাগটা মাথায় চেপে বসে।
স্ত্রীর থেকে কোনোরুপ উত্তর না পেয়ে নাওয়াফের দিকে তাকান আশরাফ সাহেব। ভীষণ তিক্ত কন্ঠে বলেন,
–” খুব শান্তি লাগছে তাই না? লাগারই কথা, তোমার চোখে তো সে অমানুষ। নিজের স্ত্রীর সম্মান টেনে কোন জায়গায় নামিয়েছ সেই খেয়াল আছে? তাকে স্লাট শব্দটা পর্যন্ত শুনতে হয়েছে তোমার ফ্ল্যাটে থাকায়। লানত তোমার উপর।
কথা গুলো বলেই বড় বড় শ্বাস ফেলতে থাকেন আশরাফ সাহেব। নাওয়াফ উত্তর দেয় না কেবল এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে নাফিমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকা চিত্রার পানে৷ মস্তিষ্কে কী চলছে কে জানে?
ছেলে এবং স্ত্রীর প্রতি বিরক্ত হয়ে হনহনিয়ে বাইরে চলে যান আশরাফ সাহেব। তার আর বুঝতে বাকি নেই, চিত্রার ভবিষ্যত কী হতে চলেছে। তাই কষ্ট হলেও কঠিন এক সিধান্ত নিয়ে বসেন মনে মনে৷
সময়টা বিকেলবেলা। রান্নাঘরে বুয়ার হাতে হাতে কাজ করছে চিত্রা। খানিকক্ষণ আগেই ঘুম থেকে উঠেছে ও। অবাক করা বিষয় হলো নাফিম দুষ্টু টা তখনও ঘুমিয়ে ছিল। ওই দৃশ্য দেখে চিত্রা তো অবাকের শীর্ষে চলে যায়। ভয়ও পায় খানিকটা। নাফিম যেই চঞ্চল তার তো এতক্ষণ ঘুমানোর কথা না। ওসব ভেবে চিত্রা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নাফিমকে ঝাঁকাতে থাকে৷
নাফিম বেচারা ভয় পেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে। চিত্রা কে জড়িয়ে ধরে সেই কী কান্না তার। নাফিমের রেসপন্স দেখে কলিজায় পানি আসে চিত্রার। সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেছিল সে। সময় নিয়ে নাফিমকে শান্ত করে তার ন্যানির কাছে দিয়ে শাওয়ারে যায় চিত্রা। পানি গুলো টপটপ মাথায় পড়ার সাথে সাথে পুরনো দৃশ্য গুলো ভেসে উঠতে থাকে তার মানসপটে।
এবার আর কাঁদে না চিত্রা উল্টো মনে মনে সিধান্ত নেয়, কারও অন্ন ধ্বংস করবে না সে। যতটুকু খাবে তার সবটুকুর পারিশ্রমিক কাজ করে পুষিয়ে দিবে। যেনো মানুষ খোঁটা দিলেও তার ভেতরটা হীনমন্যতায় কুঁকড়ে না যায়৷
ক্ষণে ক্ষণে বহু কিছু টের পাচ্ছে চিত্রা। যেমন আজ বুঝেছে এই দুনিয়ায় সব থেকে অসুখী মানুষ হলো তীব্র আত্মসম্মান বোধ ওয়ালা মানুষ। এরা না পারে বিবেকের দায়ে যা কিছু করতে আর না পারে কারও কথা সইতে। তবুও স্বার্থের দুনিয়া এদেরই হিংসা করে, খোদাতায়ালা কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন আর আপন মানুষ গুলো উপহার দেয় অমানুষিক যন্ত্রণা।
কথাগুলো ভেবে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে চিত্রার। রান্নাও শেষের পথে তার। প্রেশার কুকারে লাস্ট শিষ বাজতেই গ্যাস অফ করে দেয় ও। হাত ধুতে পেছনে ঘুরবে এমন সময় ছোট্ট নাফিম এসে তার জমিন ছুঁই ছুঁই লম্বা চুল গুলো খামচে ধরে বলে,
–” আম্ মা পেটে খিদা.. মুজা কাবোওও
চুলে টান পড়ায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে চিত্রা। চোখ ছোটো ছোটো করে নাফিমের দিকে তাকিয়ে বলে,
–” আমায় ভয় দেখানোর অপরাধে তোমার মজা খাওয়া বন্ধ। ন্যানিকে বলছি, উনি ভাত মেখে খাইয়ে দিবে তোমায়।
কথাটা পছন্দ হয় না নাফিমের। নাকের পাটা ফুলিয়ে কান্না করার প্রস্তুতি নেয় সে। দৃশ্যখানা দেখে ভীষণ মজা পায় চিত্রা। আধ ভেজা চুলগুলো খোপা করে চট করে কোলে তুলে নেয় নাফিমকে। ওকে স্ল্যাবের উপর বসিয়ে, খিচুড়ি নেয় প্লেটে। নিজের জন্য অল্প করে বানিয়েছিল ভাবল নাফিমকেও একটু দেওয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। খিচুড়ি প্লেটে নিয়ে মজা করে মাখাল আচার দিয়ে। এরপর নাফিমের মুখে দেয়। বাচ্চাটা নিঃশব্দে খেতে থাকে৷
চিত্রা একের পর এক লোকমা পুরে দেয় নাফিমও বিনা শর্তে খেতে থাকে। রান্নাঘরে এসে সেই দৃশ্য দেখে ন্যানি অবাক হয়ে বলে,
–” নাফি বাবা খিচুড়ি খেয়েছে?
চিত্রা একটু চমকায়। মনে মনে ভাবে বোধহয় কোনো ভুল করে ফেলেছে তাই আমতা আমতা করে বলে,
–” জ্ জ্বি।
ন্যানি বিস্মিত গলায় বলে,
–” গোটা তিন বছরে আমরা কেউই ওকে খিচুড়ি খাওয়াতে পারিনি কখনো। স্যার নিজেও অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু সম্ভব হয়নি। আজ কীভাবে কী হলো…
চিত্রা অবাক হয়ে নাফিমকে জিজ্ঞেস করল,
–” তুমি কেনো খিচুড়ি খেতে না আব্বু?
নাফিম সরল গলায় জবাব দিল,
–” ইতা পঁতা লাগে মা..
চিত্রা কপাল কুঁচকে শুধাল,
–” তাহলে আমার কাছে খেলে কেনো?
নাফিম মন খারাপ করে বলে,
–” ইতা না খেলে তো তুমি কাইয়ে দিতে না।
চিত্রার মনে হলো কেউ ওর বুকে ছুরি চালিয়েছে। ভাবা যায়? শুধু ওর হাতে খাইয়ে নেওয়ার জন্য এইটুকু বাচ্চা নিজের অপছন্দের খাবারটা পর্যন্ত খেয়ে ফেলেছে। চিত্রার চোখে জল জমলো। সে নিজেও তো কাঙাল তাই ভালোমতো উপলব্ধি করতে পারলো নাফিমের অবস্থা কিন্তু চিত্রা যে চায় না এমন কিছু।
মাত্র অল্প ক’দিনের মেহমান চিত্রা। সে চায় না নাফিম তার নেওটা হোক। অলরেডি অনেকটা এটাচড্ হয়ে গেছে। চিত্রা জানে, এটা নিয়েও কথা শুনতে হবে তার। এসব আর চাইছে না চিত্রা। আগামী ছয় মাসে কঠোর ব্যক্তিত্ব বরণ করে নিতে চায় সে। হতে চায় পাথরের মতো শক্ত। নাফিম নামক পিছুটানের জন্য নিজের ভবিষ্যত বিসর্জন দিতে রাজি নয় চিত্রা৷
একদিকে বিবেক অন্যদিকে আবেগ। দোটানায় পড়ে নিজেকে পাগল পাগল লাগে চিত্রার। খিচুড়ির প্লেট রেখে ফ্রিজ থেকে একটা আইস ললি বের করে নাফিমের হাতে দেয় চিত্রা অতঃপর কান্না আঁটকাতে অন্যপাশ ফিরে খিচুড়ির প্লেট ধুতে থাকে।
ওদিকে প্যাকেট হাতে নিয়ে বসে থাকা নাফিম চিত্রার মুখ পানে চেয়ে ঠোঁট উল্টে ফেলে। বাচ্চাটার বুঝতে বাকি থাকে না, মায়ের মন খারাপ হয়েছে। সে আধো আধো বুলিতে বলে,
–” আ..ম্মা , নাফি খিচুড়ি কাবে। আর দুষ্টু করবে না। তুমি দুঃখু পেয়ো না..
বলতে বলতে কেঁদে ফেললো ও। চিত্রার নরম মন কী আর সইতে পারে সেই আর্তনাদ? সব ফেলে সে-ও নাফিমকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে। নাফিমের ন্যানি উপস্থিত ছিলেন সেখানে। উক্ত দৃশ্যখানা উনার চোখে জল এনে দেয়। বয়স্ক মহিলা বুঝতে পারেন, বিরাট বড় ভুল করছে নাওয়াফ। চিত্রাকে মেনে নিলে খুব সুন্দর একটা সংসার হতো তাদের।
ঘড়ির কাঁটায় তখন পাঁচটা বাজে। সারাদিন ঘরে বসে থাকায় দমবন্ধ লাগছিল চিত্রার। গ্রামের মুক্ত পরিবেশে বড় হওয়া চিত্রা বদ্ধ জায়গায় বন্দী হয়ে হাঁপিয়ে উঠে রীতিমতো। তার অবস্থা দেখে নাফিমের ন্যানি বলে,
–” আপনি চাইলে ছাদ থেকে ঘুরে আসতে পারেন ম্যাডাম। উপরে খুব সুন্দর ফুলের গাছ আছে আর সেখান থেকে গোটা শরের সুন্দর চিত্র দেখা যায়।
বর্ণনা শুনে কিঞ্চিৎ লোভী হয় চিত্রার মন। আর তাই নাফিমকে নিয়ে দুইজনে যায় উপরে। কথায় কথায় হুট করে নাফিমের ন্যানির সাথে ভাব জমে যায় চিত্রার। ভদ্রমহিলা জানান, তার নাম জেসমিন। স্বামী মারা গেছোন অল্প বয়সে। ভদ্রলোক কে ভীষণ ভালোবাসতেন তিনি তাই আর কখনো কারও প্রতি কোনো আগ্রহ জন্মেনি উনার। দীর্ঘ কয় বছরের সংসারে কোনো সন্তান ছিল না তার তাই পেটের দায়ে এবং একাকীত্ব কাটাতে এই পেশাটা গ্রহণ করেন তিনি।
উনার গল্পটা বেশ প্রভাবিত করে চিত্রাকে। সে ভাবছিল তার মতো দুঃখী আর একটাও নেই অথচ মানুষ এর চাইতেও খারাপ পরিস্থিতিতে আছে। তার ভাবনার মাঝেই জেসমিন বলে উঠে,
— ” পাঁচটা পয়তাল্লিশ বাজে ম্যাডাম। স্যারের আসার সময় হয়ে গেছে। ঘরে ফিরে নাফিম বাবা কে না পেলে রেগে যাবেন উনি। আজকে তো আবার আরেক কাহিনী হয়েছে…
জেসমিনের থেকে সবকিছুই শুনেছে চিত্রা। শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে কেবল। তার কপালটাই এমন৷ কিছু না করেও দোষী হতে হয়। আজ হয়তো আরেক সুনামি যাবে।
নাফিম কে নিয়ে নিচে নামতে চাইলে সে যাবে না বলে জেদ ধরে৷ চিত্রা বুঝিয়ে শুনিয়ে এরপর তাকে কোলে নিয়ে নিচে নামতে থাকে। নাফিম কী আর ভদ্র বাচ্চা? একদমই না। মাম্মা পেয়ে তার দুষ্টুমি হয়েছে আরও লাগামছাড়া।
চিত্রা শেষ সিঁড়িতে পা ফেলবে এমন সময় মেইন দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় নাওয়াফ। তাকে দেখা মাত্রই “বাবা ” বলে সাংঘাতিক এক চিৎকার দেয় নাফিম। সাথে সাথে পা হড়কে যায় চিত্রার। মুখের ভরে পড়তে নিবে এমন সময় মা ছেলেকে আঁকড়ে ধরে একজোড়া পুরুষালি হাত।
সেকেন্ড কয়েক ওভাবেই কাটে৷ আতঙ্কে জুবুথুবু চিত্রা খামচে ধরে রাখে সামনের জনের পিঠ এবং বুকের পরিচ্ছদ। নাফিম বেচারা ভয় পেয়ে চুপসে যায়। ওদের আগলে রাখা নাওয়াফ আলগোছে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে। ভাগ্যিস এসেছিল সময় মতো নয়তো দু’টো বান্দর কে নিয়ে হসপিটালে ছুটতে হতো তার।
চালাক নাফিম কেমনে কেমনে জানি নেমে গিয়ে ভোঁ দৌড় দেয় ভেতরে। মিনিট খানেকের মধ্যে পায়ের ব্যথা কমে আসে চিত্রার। হুঁশ ফিরতেই সে-ও ঠাস করে ছেড়ে দেয় নাওয়াফকে। ওই হাতির শরীরের উপর পড়ে ছিল ভাবলেই আতঙ্কে জমে যাচ্ছে তার শরীর। নাওয়াফ অবশ্য কিছুই বলেনি তাকে। চিত্রা সরে আসতেই একবার তাকিয়ে সোজা বাসার ভেতর চলে গেছে।
তার আচরণ অদ্ভুত ঠেকে চিত্রার নিকট৷ কিছু ভাবার আগেই পেছনে থাকা জেসমিন খালা হুড়মুড়িয়ে নিচে এসে বলে,
–” আপনি ঠিকাছেন ম্যাডাম?
চিত্রা ঘোরের মাঝে উত্তর দেয়,
–” হুঁ।
জেসমিন খালা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলেন,
–” আল্লাহ বাঁচাইছে। জলদিই ভেতরে চলেন। আযান দিলো বলে..
ঘোরাচ্ছন্ন চিত্রা ওভাবেই গিয়ে টেবিলে বসে। ভুল করেও বিপরীত পাশে বসে থাকা নাওয়াফের দিকে তাকায় না। ওই কয়েক সেকেন্ডের হওয়া ঘটনাটা ক্ষণে ক্ষণে বিরক্ত করতে থাকে চিত্রাকে৷ এর মধ্যে আযান দেয়। সবাই ইফতারি করে। চিত্রাও অল্পস্বল্প খায়। নামাজের জন্য টেবিল ছেড়ে উঠবে এমন সময় গা হিম করা কন্ঠে নাওয়াফ ডেকে উঠে তাকে। বলে,
–” বসো এখানে। কিছু কথা ছিল।
ব্যস! আত্মা খাঁচা ছাড়া হয়ে যায় চিত্রার। আবার কী বলবে এই ভয়ে থমথমে মুখে বসে থাকে চেয়ারে। নাওয়াফ তার দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলে,
–” উকিলের সাথে কথা হয়েছে আজ। উনি বলেছেন বাধ্যতামূলক ভাবে অন্তত তিন মাস একসাথে এবং একরুমে থাকতে হবে আমাদের।
চিত্রার মনে হয় আকাশ ভেঙে পড়েছে ওর মাথায়। কী সাংঘাতিক কথা। আজরাইলের সাথে বসবাস করা যায় নাকি? কথাগুলো শুনে হতবুদ্ধির মতো চেয়ে থাকে ও। নাওয়াফ নিজেই বলে,
–” এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তোমার কিছু বলার আছে এক্ষেত্রে?
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে চিত্রা। মনে মনে ভাবে সবটা৷ রুলস ফলো না করলে ডিভোর্স হতে দেরি হবে। যত দেরি হবে তত বেশি সইতে হবে কটু কথা। সুতরাং এখান থেকে মুক্তি পেতে চাইলে এই অগ্নিকাণ্ডে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাধ্য হয়ে চিত্রা ধীর গলায় বলে,
উপসংহারে তুমি পর্ব ৬
–” আপনার সিধান্তই শিরোধার্য।
নাওয়াফ সম্মতি পেয়ে আর কথা বাড়াল না। বোকা না বুঝেই নিজের ডেথ সার্টিফিকেটে সাইন করল। বেচারি টেরও পেলো না, এই একটা সিধান্ত কী ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি করাতে চলছে তাকে৷
