Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৪৬

এই অবেলায় পর্ব ৪৬

এই অবেলায় পর্ব ৪৬
সুমনা সাথী

কলরব নিস্পৃহ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। নিযানার একেকটা আকুল কণ্ঠে বলা শব্দ যেন তপ্ত লাভার মতো ওর কানে এসে বিঁধছে। বুকের ভিতরটা দুমড়েমুচড়ে একাকার করে দিচ্ছে। জীবনের এই ছকে এসে এমন অদ্ভুত কোনো দৃশ্য তো থাকার কথা ছিল না! ও তো চেয়েছিল নিযানার মনে ওর জন্য এক সমুদ্র ঘৃণা জমা হোক। তাহলে আজ এখন মেয়েটা কেন ওর বুকের ওপর আছড়ে পড়ে এভাবে কাঁদছে? কেন ওর নিজের বুকটাও আজ পাঁজরের হাড় ভেঙে গুঁড়ো হতে চাইছে? নিযানা ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা তুলে তাকাল কলরবের মুখের পানে। চোখের চাউনিতে কেবলই আকুলতা। কলরব সেই চোখের দিকে চেয়ে নিজের ভেতরের দুর্বলতাটুকু সামলাতে পারল না। তাড়াহুড়ো করে চোখ সরিয়ে নিল বাইরের শূন্য আকাশের দিকে। নিজের কণ্ঠস্বরকে যতটুকু সম্ভব শীতল করে বলল,

“কিন্তু আমার তোকে বিন্দুমাত্র সহ্যই হয় না, নিযানা। তুই ভালোবাসতে না বললেও আমি তো অন্তত এভাবে সারাজীবন এমন একটা ফালতু আর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সম্পর্কে বাঁধা থাকতে পারব না। তাই যা হওয়ার তা এখনই ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে যাক। কেন আমরা শুধু শুধু একটা মিথ্যে মায়ার টানে একে অপরের গোটা জীবনটা নষ্ট করব, বল?”

কলরবের কথাটুকু শোনামাত্রই নিযানার মনে হলো ওর পায়ের নিচের শক্ত মেঝেটা এক নিমেষে ধসে গেছে। চড়চর করে সরে গেছে তলার সমস্ত মাটি। চোখের সামনে কি এই মস্ত বড় পৃথিবীটা তীব্র এক ঘূর্ণনে দুলে উঠল? সে বেশ কিছুক্ষণ পলকহীন, শীতল চোখে চেয়ে রইল কলরবের ওই নিরাসক্ত মুখের দিকে। ঠোঁটের কোণের বাক্য গুলো স্তব্ধ হয়ে গেল। অতঃপর, সে ধীর পায়ে দুই কদম পিছিয়ে এলো কলরবের থেকে। বা হাতটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরলো নিজের চোখের সামনে। সেখানে কলরবের দেওয়া সেই কাচের চুড়িগুলো। নিযানা কোনো কথা বলল না। খুব শান্ত হাতে নিজের কবজি থেকে একটা একটা করে চুড়ি খুলতে লাগল। আর সেই রঙিন কাচের চুড়িগুলো এক এক করে খসে খসে পড়তে লাগল শক্ত মেঝেতে। ঝনঝন করে একটা বিকট শব্দে সেগুলো ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগল কলরবের পায়ের ঠিক সামনেই। কাচের সেই শব্দে কলরব চমকে তাকাল নিচের দিকে। নিযানা তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। খুব শান্ত লাগছে ওকে।

অদ্ভুত শীতলতা ভর করেছে ওর চোখেমুখে৷ হাত থেকে শেষ চুড়িটার ভাঙা অংশটুকু মেঝেতে আছড়ে পড়তেই নিযানা ওর নিচু করা মাথাটা ধীরলয়ে তুলল। কলরব এতক্ষণ ওর দিকেই অপলক চেয়ে ছিল। মাথা তুলতেই অবলীলায় দুজনের চার চোখ আবারও এক হলো। নিযানার সেই জলে ভরা টলটলে শান্ত চোখের গভীরে ঠিক কী লুকিয়ে ছিল তা কলরবের জানা নেই। তবে ওর বুকের ভেতরটা এক তীব্র অপরাধবোধে মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো সে আজ খুব বড়, ক্ষমার অযোগ্য একটা অপরাধ করে ফেলেছে। যে অপরাধের কোনো শাস্তি এই নশ্বর পৃথিবীতে অন্তত হয় না। নিযানা আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না। ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কলরব নিজের শূন্য চোখ দুটো তুলে অপলক চেয়ে রইল ওর প্রস্থানের দিকে। ঘরের বাতাস থেকে শরীরটা মিলিয়ে যেতেই, কলরব হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেঝের ওপর। চারধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই ভাঙা কাচের রঙিন টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে তার চোখের কোণটা সামান্য ভিজে উঠল বোধহয়। সে যত্ন করে, নিজের অজান্তেই মেঝে থেকে একটা একটা করে সেই ভাঙা কাচের টুকরো হাতের মুঠোয় তুলে নিতে লাগল। ঠিক তখনই ঘরের খোলা দরজায় আলতো করে নক করল কেউ।
“আসতে পারি?”

বাইরে থেকে কায়েফের গম্ভীর গলা ভেসে এলো। কলরব তড়িঘড়ি করে ওর হাতের মুঠোটা শক্ত করে বন্ধ করে সেই ভাঙা কাচের টুকরোগুলোকে আড়াল করে ফেলল। অসাবধানতায় ধারালো কাচের কুচিগুলো ওর তালুর চামড়া ভেদ করে ভেতরের মাংসে গিয়ে ফুটল। আঙুলের ফাঁক গলে তাজা রক্ত বেরিয়ে আসতে চাইল। নিজের দাঁতে দাঁত চেপে সেই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করল। দরজার দিকে না তাকিয়েই স্বভাবসুলভ রুক্ষ গলায় বলল,
“আয়। তুই-ও বাকিদের মতো নাটক শুরু করেছিস নাকি? আজব ব্যাপার তো তোদের!”
কায়েফ ঘরের ভেতর এগিয়ে বলল, “নিযানা! ও সত্যি সত্যিই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে।”
কলরব হাতের মুঠোটা আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরে জানালার ওপাশে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“জানি।”

কলরবের গলার স্বর ভাবলেশহীন। কায়েফ কয়েক পা এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“দেখ কলরব, তুই যদি এই সব নাটক আমার কথা ভেবে করে থাকিস। তবে বলব তুই একটা আস্ত বোকা। মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে তোর। তুই যেভাবে ভাবছিস। সবকিছু কি আসলেই এত সহজ?”
“আমি তোর জন্য কিছুই করিনি কায়েফ। এটাই সত্যি কথা।”
কায়েফ ম্লান হাসল। “ধারণা করেছিলাম। আমার জন্য হলে তো তুই ওকে কবেই ছেড়ে দিতিস। তুই তো আগে থেকেই জানতিস ওর সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। তাও আমাকে একটা শব্দও বলিসনি। কত সুন্দরভাবে, কত নিখুঁত ছকে ঠকালি আমাকে! আর আমি চিরকাল এক বোকা হয়েই রয়ে গেলাম।”
কলরব ক্লান্ত বোধ করল। ভেতরের দমবন্ধ করা কষ্টটা তখন ক্রমশ বাড়ছে। বিছানার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,

“এই মুহূর্তে তোর সাথে কোনো কিছু নিয়ে তর্ক করতে বা তোকে বোঝাতে আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগছে না। তুই বরং এখন যা। পরে আসিস। যার যা ভাবার ভেবে বসে থাক।”
বিছানার এক কোণে ধপ করে বসে পড়ল কলরব। কায়েফও ঠিক পাশে এসে বসল। কলরব শূন্যে চোখ রেখে তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। কায়েফ ওর থমথমে মুখটা কয়েক সেকেন্ড নিরীক্ষণ করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আটকাচ্ছিস না কেন ওকে?”
“কারণ আমি ওকে ভালোবাসতে পারি না। পারবো না।”
“কিন্তু আমার তো তোকে দেখে তেমনটা মনে হচ্ছে না।”
“তোর কী মনে হচ্ছে?”
কায়েফ সন্দিহান গলায় বলল, “তুই কি ওকে আগে থেকেই পছন্দ করতিস? মানে, আমি ওকে পছন্দ করি। এই কথাটা তোকে বলারও অনেক আগে থেকে?”
কায়েফের এই আকস্মিক প্রশ্নে কলরব বিব্রতবোধে কুঁকড়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার। নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে চড়া গলায় বলল,

“এসব আজেবাজে কথা বলে তুই আসলে কী প্রমাণ করতে চাইছিস, হ্যাঁ? আমি যদি ওকেই ভালোবাসব তবে ইরাকে কেন বিয়ে করতে যাচ্ছিলাম? এই সব ফালতু, যুক্তিহীন কথার কোনো মানে হয় না কায়েফ। আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপর আমাদের অফিসিয়ালি ডিভোর্স হয়ে যাবে। ওর পরীক্ষাটা শেষ হলেই ও স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে চলে যাবে। তারপর তুই-ও ফিরে যাস। ও নিজেও তোকে অপছন্দ করেনা। ভালোবেসে ফেলতেও সময় লাগবেনা। শার্ট-টার্ট বেশ গুছিয়ে-টুছিয়ে রাখে। দেখেছি আমি। ওখানে গিয়ে সবকিছু আবার নতুন করে গুছিয়ে নিস। কোনো ঝামেলা থাকবে না। আর ফেরার ও দরকার নেই। ব্যাস! তাহলেই তো সব চুকেবুকে গেল। গল্প শেষ!”
কায়েফ শব্দ করে হেসে উঠল। কলরব অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ চোখে ওর সেই হাসির দিকে তাকাল। কায়েফ হাসতে হাসতেই ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“জানিস, আম্মু ইদানীং আমার জন্য একটা মেয়ে দেখছে। অসম্ভব মায়াবী আর সুন্দর মেয়েটা। ওকে আমার ছবি দেখেই খুব পছন্দ হয়েছে।”

কলরব মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “ফালতু কথা বলিস না।”
“সিরিয়াসলি বলছি ভাই। মেয়েটা কালকেই আমাদের বাসায় আসবে। তখন দেখিস। কী সুন্দর।”
“নিযানার চেয়ে সুন্দর হবে না।”
কলরবের মুখ থেকে অবচেতনের সত্যটা অসাবধানতাবশত বেরিয়ে এলো। কায়েফ ওর এই অকপট স্বীকারোক্তি শুনে মৃদু হাসল,
“তা ঠিক বলেছিস। তোর বউটা আসলেই একটু বেশিই সুন্দর। বিয়ের আগে থেকে সুন্দর ছিলো? নাকি বিয়ের পর থেকে তোর কাছে সুন্দর লাগে?”
কলরব পুরোপুরি চুপ করে গেল। ওর চোখের সামনে নিযানার স্নিগ্ধ, টলটলে চোখ দুটো ভেসে উঠল। কায়েফ ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
“আটকা ওকে কলরব। তুই একটা পাগলামি করছিস। এই জিদ ধরে রাখলে দুটো পরিবারের ভেতরের সম্পর্কটা চিরকালের জন্য বিষিয়ে যাবে। পরে তোকে পস্তাতে হবে। নিযানার সাথে তোর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমি কখনো, একটা মুহূর্তের জন্য ও ওর কথা অন্যভাবে ভাবিনি। ওকে পাওয়ার ইচ্ছে মনে ঠাঁই দিইনি। কারণ আমি জানি এটা অসম্ভব। জীবনের কিছু জিনিস আমাদের নিজেদের হাতে থাকে না রে ভাই। ওসব ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে হয়। মেয়েটা খুব কাঁদছে।”
কলরব শীতল গলায় বলল, “আমার সাথে থাকলে ওকে সারাজীবন কাঁদতে হবে।”

নিযানা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে। কুহু অনবরত ওর পেছন পেছন হেঁটে ওকে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কতশত কথা বলছে কিন্তু নিযানার কানে যেন কোনো শব্দই পৌঁছাচ্ছে না। সে এক আশ্চর্য মৌনতায় পাথর হয়ে আছে। ড্রয়িং রুমে বাড়ির ছোট-বড় সবাই এক থমথমে নীরবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিযানা নিচে নেমে এসে সোজা গিয়ে থামল মৌনিতার সামনে। মৌনিতা ওর দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। মেয়েটার ফর্সা মুখখানি কান্নার চোটে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আছে। অথচ চোখ দুটো কেমন যেন শান্ত। মৌনিতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিযানা হুট করে দু-হাত বাড়িয়ে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মৌনিতা ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল। ভেবেছিলো নিযানা বোধহয় কাঁদবে কিন্তু নিযানা কাঁদল না। ওর শরীরটা পর্যন্ত একটুও কাঁপল না। পরমুহূর্তেই সে মৌনিতার বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। শুষ্ক ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান, স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে বলল,

“এই বাড়িতে যতদিন ছিলাম তুমি আমায় আগলে রেখেছ। সবসময় কত হেল্প করেছ। তোমার কাছ থেকেই তো আমি জীবনের আসল ধৈর্য কাকে বলে তা শিখেছি। এখানে থাকার দিনগুলোতে অবুঝের মতো যদি কোনো ভুলত্রুটি করে থাকি। তবে ওসবের জন্য তোমার এই ছোট বোনটাকে প্লিজ একটু ক্ষমার চোখে দেখো ভাবি। পারলে আমায় মাফ করে দিয়ো। আই অ্যাম স্যরি।”
মৌনিতা অবাক হয়ে বলল, “এসব কী আজেবাজে কথা বলছ নিযানা? কেনই বা এমন করছ বলো তো? ভাইয়া কি এখনো জেদ ধরে রেগে আছে তোমার ওপর? ও ওপরে কী বলেছে তোমাকে? ওই ছেলেটার ইদানীং মাথাটা একদম ঠিক নেই। রাগের মাথায় ও যা তা বলে বসেছে। তুমি একদম ওর কথায় কান দিয়ো না। আমি নিজে ওপরে গিয়ে ওর সাথে কথা বলছি, দাঁড়াও।”
মৌনিতা যেই না ওপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে যাবে, নিযানা চট করে ওর হাতটা আলতো করে ধরে ওকে থামিয়ে দিল। মাথা নেড়ে ধীরস্থির গলায় বলল,

“তার আর কোনো দরকার নেই ভাবি। কলরবের মনে যা ছিল ও মুখ ফুটে পরিষ্কার করেই তা আমায় বলে দিয়েছে। আর ওর সেই না-বলা কথাগুলোর আসল মানেও আমি খুব ভালো করেই বুঝে নিয়েছি।”
কথাটা শেষ করে নিযানা ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে থাকা দিয়া, ইহান আর ইভানের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। দু-হাত বাড়িয়ে আলতো করে ডাকতেই দিয়া চট করে ওর কোলের কাছে এগিয়ে এলো। নিযানা তিনটি বাচ্চাকেই নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে একে একে ওদের কপালে, গালে চুমু আঁকল। ওদের মুখের দিকে চেয়ে হাসিমুখে বলল,
“আমি তোমাদের সবাইকে খুব মিস করব। আমি ওখান থেকে তোমাদের কল দেব, ঠিক আছে? ফুফির সাথে কথা বলবে তো তোমরা?”
দিয়া বড় বড় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বাধ্য মেয়ের মতো ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। ইহান, ইভান ও মৃদু মাথা নাড়লো। নিযানা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে চেয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আব্বু, চলো।”

আনতাসার মনের ভেতর ঠিক কী যে হলো, কে জানে! তার মাতৃসুলভ মনটা বুঝি মেয়েটার এই অস্বাভাবিক শান্ত রূপ দেখে তীব্র এক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। হঠাৎ করেই এক প্রকার ছুটে এসে নিযানার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরলো। টেনে ওকে সবার আড়াল করে ড্রয়িং রুমের এক কোণায় নিয়ে গেল। নিযানা অবাক হয়ে ওর মায়ের আকুল মুখের দিকে চাইল। আনতাসা গলার স্বর যতটা সম্ভব নরম করে বলল,
“আমাকে একটা কথা একদম সত্যি করে বলো তো বেবি। তুমি কি সত্যিই কলরবের সাথে থাকতে চাও না? আমার কেন যেন তোমাকে দেখে বিন্দুমাত্র ঠিক মনে হচ্ছে না। দেখো, অহংকার আর রাগ সরিয়ে তুমি আর একটুখানি ভালো করে ভেবে আমায় বলো। তোমার মাম্মা তোমাকে কথা দিচ্ছে। তুমি যদি একবার মুখ ফুটে বলো যে তুমি ওকে চাও, তবে তোমার খুশির জন্য, মাম্মা আজ সব কিছু উলটপালট করে দেবে! দরকার হলে আমি নিজে কলরবের সাথে কথা বলব। ওর কাছে হাত জোড় করে রিকোয়েস্ট করব। দিনশেষে আমি শুধু আমার মেয়েটাকে একটু হ্যাপী দেখতে চাই। বলো বেবি, থাকবে এখানে?”
নিযানা মায়ের চোখের দিকে চেয়ে উদাসীন হাসল। মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল,
“নাহ মাম্মা! আমি আর এই বাড়িতে একটা মুহূর্তও থাকতে চাই না। তুমি প্লিজ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আমায় এখান থেকে নিয়ে চলো।”

নওয়াজ চৌধুরী এতক্ষণ দূর থেকে ওদের দেখছিলেন। তিনি ওখান থেকেই গম্ভীর গলায় বললেন,
“একটা কথা আজ নিজের মগজে ভালো করে ঢুকিয়ে নিও নিযানা। এটাই কিন্তু শেষ। আজ এই বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর। ভবিষ্যতে তুমি যদি কখনো এখানে কলরবের স্ত্রী হয়ে ফিরতে চাও, তবে সেটা অসম্ভব হবে। আমি নিজে বেঁচে থাকতে তোমায় আর কোনোদিন এইখানে ফিরতে দেব না। তাই ভেবেচিন্তে তোমার শেষ সিদ্ধান্তটা বলো। তুমি চাইলে এখনো এখানে ওই ছেলেটার সাথে থাকতে পারো।”
নিযানা বাবার কড়া নির্দেশের জবাবে এক মুহূর্তও সময় নিল না। নিজের শূন্য ও ঝাপসা চোখ দুটো তুলে শেষবারের মতো কলরবের ঘরের দিকে চাইল। তারপর মৃদু মাথা নেড়ে বলল,
“আমি যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভালো করে ভেবেচিন্তেই নিয়েছি আব্বু। চলো!”
আরশাদ তালুকদার এতক্ষণ একরাশ অপরাধবোধ আর বিরস মুখ নিয়ে সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন নিযানার খুব কাছে। কাঁপতে থাকা হাতটা নিযানার মাথায় রেখে ভাঙা গলায় বললেন,
“আই অ্যাম স্যরি, মা। আমি জানি, নিজের জেদ দিয়ে তোদের দুটো বাচ্চার জীবন এভাবে ছারখার করে দেওয়ার পর আমার এই অপরাধের কোনো ক্ষমা হয় না। তাও এই বুড়ো মানুষটা তোর কাছে হাত জোড় করে মাফ চাইছে। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস।”

নিযানা কথার পিঠে কোনো প্রত্যুত্তর দিতে পারল না। চুপ করে রইল। এই মুহূর্তে ঠিক কী বলা উচিত বা কীভাবে রিয়াক্ট করা উচিত তা অবুজ মন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। সবার সামনে নিজেকে এমনিতেই ছোট আর তুচ্ছ মনে হচ্ছিল ওর। এই দমবন্ধ করা তালুকদার বাড়ির চত্বরে আর একটা সেকেন্ডও ব্যয় করতে মন সায় দিচ্ছে না। বুকের ভেতরটা যেন এক অদৃশ্য যন্ত্রণায় ফেটে আসছে। আরশাদ তালুকদারের দিকে চেয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে ধীরপায়ে সদর দরজা পার হয়ে বেরিয়ে এলো। পেছনে পেছনে আনতাসা আর নওয়াজ চৌধুরীও বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। নিযানা বাইরের চত্বরে এসে সোজা গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে বসল। গাড়িটা যখন স্টার্ট নিয়ে ধুলো উড়িয়ে চলতে শুরু করল, নিযানা একটিবারের জন্যও ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে চাইল না। ও যদি তখন একটিবারের জন্যও ফিরে তাকাত, তবে হয়তো দেখতে পেত। তালুকদার বাড়ির সেই নির্দিষ্ট ঘরের ব্যালকনির রেলিং ধরে একজন উন্মাদ, চাতক পাখির মতো অপলক চোখে কেবল ওর চলে যাওয়ার পথের দিকেই চেয়ে রয়েছে। গাড়িটা একসময় দৃষ্টির একদম অগোচরে তলিয়ে যেতেই, কলরব রেলিং ছেড়ে হুড়মুড় পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। ভেতরের এতক্ষণের চেপে রাখা আগ্নেয়গিরিটা যেন এক নিমেষে দাউদাউ করে ফেটে পড়ল। উন্মাদের মতো ঘরের ড্রেসিং টেবিলের জিনিসপত্র, বিছানার চাদর, টেবিলে রাখা বইখাতা সবকিছু টেনেহিঁচড়ে মেঝেতে ফেলে এলোমেলো করে দিতে লাগল। নিজের বুকের ভেতরের হাহাকারটুকু আড়াল করতেই সেই জখম হওয়া হাতটা দিয়েই বার কয়েক সজোরে আঘাত করল ঘরের শক্ত দেওয়ালে। আঙুলের চামড়া ফেটে তাজা র ক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল মেঝেতে। ক্লান্ত হয়ে ঘরের এক কোণে হাঁটু গেড়ে বসলো কলরব। দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরে একটাই মিথ্যে বাক্য আওড়াতে লাগল,
“উঁহু! আমি… আমি ওকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসি না! এটা স্রেফ একটা সাময়িক মোহ। সাময়িক মায়া! আর কয়েকটা দিন গেলেই সবকিছু একদম ঠিক হয়ে যাবে। আমি? আমি ওকে কোনোদিন ভালোবাসি না! ভালোবাসতেই পারি না ওকে…!”

রাতের খাওয়া-দাওয়া সবার মোটামুটি শেষ। তবে আরশাদ তালুকদার অবশ্য আজ রাতে ডাইনিং টেবিলে আসেননি খেতে। সারাটা বাড়ির পরিবেশটা থমথমে। রান্নাঘরে নবনী তখন বেশ মনোযোগ দিয়ে কফি বানাচ্ছিল। ঠিক পাশেই মিলু রাতের থালাবাসনগুলো টুংটাং শব্দে পরিষ্কার করছে। এমন সময় রান্নাঘরের দরজার ঠেলে মৌনিতা ভেতরে ঢুকেই কৌতুহলী গলায় বলল,
“নবনী, তোমার আব্বু-আম্মুকে কি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বলে দিয়েছ? উনারা আসছেন তো?”
নবনী অন্যমনস্ক ছিল। সে চট করে মৌনিতার দিকে তাকাল। মৌনিতা ওই শুকনো মুখ আর চাউনি দেখে সামান্য চমকে উঠে বলল,

“কী হলো? এমন করে তাকাচ্ছ কেন? যেন কোনো ভূত দেখলে! পরশুই তো ইহান আর ইভানের অনুষ্ঠান। সবকিছু গোছাতে হবে না?”
নবনী আলতো করে মাথা নেড়ে কফির মগের চামচটা নাড়তে নাড়তে বলল,
“হ্যাঁ। আম্মা একটু আগেই ফোন করেছিলেন। উনারা আসবেন বলেছেন।”
“তোমার মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন? কী হয়েছে?”
“কই, কিছু না তো !”
মৌনিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চারপাশটা দেখে নিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া কি রাতেও খেতে আসেনি?”
“নাহ। সেই দুপুরের পর থেকে ও আর নিচেই নামেনি। ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করে পড়ে আছে।”
মৌনিতা কপালে হাত দিয়ে বলল, “ছেলেটা চিরকালই একরোখা আর খামখেয়ালি। কিন্তু তাই বলে সবার সামনে এতটা জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে। আমি সত্যি ভাবতেই পারছি না। নিযানার মতো একটা মেয়ের সাথে এতটা করা ওর মোটেও ঠিক হয়নি।”

“ভাইয়া আসলেই অবুঝ ভাবি। কখন যে হুটহাট একেকটা মারাত্মক কাজ করে বসে ও নিজেও জানে না। ও তো যথেষ্ট বড় হয়েছে। একটা সাজানো সংসার ভেঙে দেওয়া কি এভাবে হুটহাট করে ফেলার মতো কোনো ছেলেখেলা? নিযানার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। কেন যে হুট করে এই ঝড়টা এলো! অথচ শেষের এই কয়েকটা দিন কিন্তু ওদের দুজনকে বেশ হাসিখুশি আর স্বাভাবিকই মনে হতো, তাই না?”
মৌনিতা একটু তিক্ত হেসে বলল, “বাহির থেকে সবসময় আমরা যা দেখি নবনী, ভেতরে কি আসলেই তাই ঘটে? আমাদের হয়তো মনে হতো ওরা ঠিকই আছে কিন্তু ভেতরের খবর ওপরওয়ালাই জানেন। তবে আমার মনে হয়। সারাজীবন একটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া অসুস্থ ও যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্কে তিলে তিলে মরার চেয়ে। একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটাই অনেক ভালো। তাছাড়া নিযানার প্রতি ভাইয়ার তরফ থেকে কোনো রকম মায়া বা এফোর্ট তো আমি আজও অব্দি দেখতে পেলাম না।”
ওদের এই আলোচনার মাঝেই হঠাৎ মাজহা বেশ একরাশ প্রফুল্লতা নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকলেন। ওনাকে দেখেই মৌনিতা আর নবনী দুইজনেই চট করে চুপ করে গেল। নিজেদের ভেতরের কথাগুলো গিলে নিল পলকে। মাজহা বেশ চটপটে পায়ে এগিয়ে এসে ফোনটা বের করে একটা ছবি ওদের চোখের সামনে ধরে বেশ আমুদে গলায় বললেন,

“দেখো তো নবনী, মৌনিতা। মেয়েটা কেমন দেখতে? আমি আমাদের কায়েফের জন্য মনে মনে পছন্দ করেছি। আমার পুরনো এক বান্ধবীর একমাত্র মেয়ে। কালকেই ওনাকে একবার সপরিবারে আসতে বলেছি আমাদের বাসায়।”
মৌনিতা আর নবনী দুইজনেই বেশ আগ্রহ নিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে দেখল। এক নজরে মেয়েটা আসলেই সুন্দর। ঠিক তখনই মিলু ধোয়া একটা গামলা উপুড় করে রাখতে রাখতে একটু উঁকি দিয়ে ছবিটা দেখল। মুখটা বাঁকিয়ে বলল,
“তা চাচিআম্মা, মেয়েটার রূপ তো ঠিকই আছে কিন্তু নাকটা কি একটু বোঁচা বোঁচা ঠেকতাছে না?”
মাজহা এরূপ মন্তব্যে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে কড়া ধমক দিয়ে বললেন,
“তুই একদম চুপ করবি মিলু! ফালতু কথা বলার আর জায়গা পাস না? কোথায় বোঁচা দেখলি তুই ওঁর নাক, হ্যাঁ? আমি তো নিজে সামনাসামনি দেখে এসেছি। এই ছবিতে হয়তো এমন মনে হচ্ছে!”

মিলু ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে করে বলল, “না মানে চাচিআম্মা। আসলে আমাদের কায়েফ ভাইজান তো ধরতে গেলে এই তালুকদার বাড়ির সব ছেলেদের থেকে বেশি সুন্দর। রাজপুত্তুর একটা! এখন ওর বউয়ের নাক যদি একটু বোঁচা হয়। তবে বিষয়টা কেমন জানি বেমানান দেখায় না? আমি তো ওনার ভালোর জন্যই বললাম। আর তুমি শুধুই আমাকে ধমকাচ্ছো!”
মাজহা সেকথায় আর কান দিলেন না। তার চোখ-মুখে তখন ছেলের বিয়ের এক অদ্ভুত আনন্দ আর খুশির ঝিলিক। নবনী আর মৌনিতা উনার কথায় মৃদু সায় মেলাল। তিনি যেভাবে এক আকাশ খুশি নিয়ে রান্নাঘরে এসেছিলেন। ঠিক ওভাবেই আবার গটগট করে চলে গেলেন।

কফির গরম কাপটা ট্রে-তে সাজিয়ে নিয়ে ধীরপায়ে নিজের শোয়ার ঘরে ঢুকল নবনী। ঘরের ভেতরে জিরো ওয়াটের নীলচে আলো জ্বলছে। দিব্য সোফায় বসে। নবনী টেবিলের ওপর কফির কাপটা নামিয়ে রেখে ঠিক পাশেই এসে বসল। তারপর বিছানাটার দিকে অবাক চোখে চেয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“দিয়া এত তাড়াতড়ি ঘুমিয়ে গেছে নাকি?”
দিব্য মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, ঘুমিয়ে পড়েছে।”
“কীভাবে? ও তো সচরাচর এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না!”
“কাঁদছিল।”
নবনী অবাক হয়ে বলল, “কাঁদছিল? আপনি আমাকে কেন একবারও ডাকলেন না? কিন্তু ও হুট করে কেন কাঁদছিল?”

“ও তোমাকে কবে যেন বলেছিল ওর মামা আর আন্টিকে এই বাড়িতে নিয়ে আসতে? তুমি কি তা এনে দিয়েছ? ব্যস, এই নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে খুব রাগ দেখিয়েছে। এখন তো ঘুমিয়েছে। তবে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠলে টের পাবে। রাগ ভাঙাতে ভাঙাতে আমার নিজেরই জান শেষ!”
নবনী আশ্বস্ত হয়ে হালকা হাসল, “আচ্ছা। সকাল হোক। আমি সামলে নেব।”
দিব্য ভ্রু নাঁচালো, “সত্যি পারবে তো?”
“হুহ্! আসলে আমি সত্যি ওর আবদারের কথাটা একদম ভুলে গিয়েছিলাম।”
দিব্য কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে নবনীর দিকে তাকাল,
“তুমি এত টেনশন কেন নিচ্ছ বল তো?”
“ব্যাস! এমনিই।”
“তোমাকে তো বইখাতা নিয়ে বসতেই দেখি না। সামনে তোমার পরীক্ষা অথচ পড়াশোনার এই হাল! তুমি পরীক্ষাটা ঠিক কীভাবে দেবে। এটাই আমার মাথায় ঢুকছে না৷”
নবনীর চোখের মণি দুটো আহত দেখাল। সে দিব্যর চওড়া কাঁধের ওপর নিজের মাথাটা আলতো করে ঠেকিয়ে হতাশ গলায় বলল,

“আমার কেন যেন বিন্দুমাত্র পড়তে ভালো লাগছে না।”
দিব্য সরু চোখে চেয়ে বলল, “তা, এই পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এত জেদ কে করছিল শুনি?”
“তাতে কী হয়েছে? পড়ার কথা ভাবতে ভালো লাগে, কিন্তু সত্যি বলছি। বই খুলে বসলেই আর পড়তে ভালো লাগে না। ক্লান্তি আসে।”
“আমার তো পড়তে বেশ ভালোই লাগত।”
নবনী নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “আপনার মতো তো আর আমি আস্ত একটা রোবট নই! এই যে কফিটা আপনি খাচ্ছেন। এটাও তো আপনার ভালো লাগে। যাতে মিষ্টির ছিটেফোঁটাও নেই। অথচ আমার তো এটা একটুও ভালো লাগে না। আমার এখন আইসক্রিম খেতে মন চাইছে।”
দিব্য নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে অন করল। স্ক্রিনে সময় দেখাল রাত দশটা পঁয়তাল্লিশ। সে কপালটা সামান্য কুঁচকে বিরস গলায় বলল,
“রাত তো একটু বেশিই মনে হচ্ছে নবনী। এই সময়ে বাইরে যাওয়া কি ঠিক হবে?”
“কোথায়?”

“কেন, আইসক্রিম খেতে?”
নবনী অবাক হয়ে বলল, “আরে, এখনই যেতে হবে কে বলেছে আপনাকে? আমি তো এমনি এমনিই মনে এলো তাই বললাম! এখনই যাওয়ার কোনো দরকার নেই। আপনি ওসব কাজের ফাইল বন্ধ করুন তো। এবার ঘুমাতে চলুন।”
দিব্য ফোনটা পকেটে রেখে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
“চলো, একটু ঘুরে আসি।”
“কোথায়?”
“এই রাতের শুনশান রাস্তায়।”
“পাগল হয়েছেন আপনি? এই মাঝরাতে কেউ বাইরে যায়?”
“আরে, অতটাও রাত হয়নি। চলুন তো ম্যাডাম।”

ল্যাপটপের সব কাজ শেষ করে সবেমাত্র বিছানায় গা এলিয়ে ফোনটা হাতে নিয়েছে কায়েফ। সারা দিনের ধকল শেষে শরীরটা তখন এক টুকরো বিশ্রামের খোঁজে ব্যাকুল। ঠিক তখনই ওঁর ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। একটা অচেনা আইডি থেকে একটা অদ্ভুত মেসেজ ভেসে এলো,
“এটা কি পুলিশ স্টেশন?”
কায়েফ অবাক হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে রইল। ওর নিজের আইডিটা প্রফেশনাল হওয়ায় চেনা-অচেনা অনেকেই ফ্রেন্ড লিস্টে যুক্ত আছে।কিন্তু এই আইডিটার নাম দেখে ওর কপাল কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। আইডির নাম লেখ “উড়ন্ত পাখির ঝুলন্ত লেজ!” সে বারকয়েক চোখের পলক ফেলে নামটা পুনরায় পড়ল। আশ্চর্য, এমন উদ্ভট আর হাস্যকর কোনো নামও যে মানুষের ফেসবুক আইডির হতে পারে। তা ওর দূরতম ভাবনাতেও ছিল না। তবে প্রোফাইল পিকচারে একটা মেয়ের হাত দেখা যাচ্ছে। যা দেখে বোঝা যায় ওপাশে কোনো রমণীই আছেন। কেন যেন এই মাঝরাতে হুট করেই কায়েফের মনে একটু দুষ্টুমি বুদ্ধি চাপল। সে রিপ্লাই টাইপ করল,

“জি, আমি থানার ওসি বলছি।”
ওপাশ থেকে পরবর্তী উত্তরটা আসতে কিছুটা সময় লাগল। মেয়েটি বোধহয় অফলাইনে চলে গেছে ভেবে কায়েফ যেই না ফোনটা লক করে পাশে রাখতে যাবে। অমনি স্ক্রিনে টুং করে আবার উত্তরটা ভেসে এলো,
“কেমন ওসি আপনি, হ্যাঁ? সরকারি লোকেদের তো সবসময় অন ডিউটিতে থাকতে হয়। সেটা কি জানেন না? জনগণের সেবায় চব্বিশ ঘণ্টা নিযুক্ত থাকতে হয়।”
কায়েফ ওর এই ত্যাঁদড়ামি মার্কা কথা দেখে একটু হেঁসে লিখল,
“এতক্ষণ একটু ছুটিতে ছিলাম। তা হে দেশের জনগণ, বলুন আপনার এই ওসির কাছে কী সাহায্য চাই?”
“আমি মস্ত বড় একটা সমস্যায় পড়েছি স্যার।”
“কী সমস্যা আপনার?”
“আমার মূল্যবান একটা জিনিস চুরি হয়েছে। মানে হারিয়ে গেছে বোধহয়।”
কায়েফ ওর চুরির কথা শুনে টাইপ করল, “তা নদী-নালায় বা পুকুরে হারালে কিন্তু আমি ওসব খুঁজতে পারব না। আমি তো আর ডুবুরি নই!”

“ডুবুরি না হন। তবে চোর-ডাকাত ধরা কি আপনার কাজ না? ওসি সাহেব?”
“জি, অবশ্যই। তা ঠিক কী চুরি হয়েছে আপনার? যার জন্য এই মাঝরাতে ওসির দ্বারস্থ হতে হলো?”
ওপাশ থেকে স্রেফ একটা শব্দে উত্তর এলো, “মন।”
কায়েফ থতমত খেয়ে লিখল, “কী?”
“আমার মন চুরি হয়ে গেছে স্যার। আপনি কি পারবেন না আমার ওই চোরটাকে ধরে আমার মনটা খুঁজে দিতে?”
এমন উদ্ভট কথাবার্তা দেখে কায়েফের ফাজলামির মুড এক নিমেষে উবে গেল। সে কপাল কুঁচকে লিখলো,
“এত রাতে ফাজলামি করার জায়গা পান না? সাফ সাফ বলুন। আপনার আসল নাম কী?”
“নাম দিয়ে কী হবে? আমি তো আর আপনাকে বিয়ে করব না।”
“তাহলে এত রাতে এভাবে ফ্লার্ট করছেন কেন?”
“আল্লাহ! আমি ফ্লার্ট করব আপনার সাথে? সিরিয়াসলি?”
“ফ্লার্ট না তো কী? তা আপনি পুরুষ নাকি মহিলা? অন্তত এতটুকু তো বলবেন নাকি?”
উত্তর এলো, “আমি একটা এলিয়েন।”

“আচ্ছা। তা হে পরম পূজনীয় এলিয়েন। আপনার ওই অমূল্য মনটা ঠিক কীভাবে চুরি হলো। সেই ট্র্যাজিক গল্পটা একটু শুনি?”
“আজ বিকেলে পার্কে ওকে নিয়ে একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম। তারপর ওকে একা একা খেলতে দিয়ে আমি মনের সুখে ফুচকা খেতে গিয়েছিলাম। এসে দেখি ও সেখানে নাই! তারপর যে কত খুঁজলাম, কত খুঁজলাম। কোথাও পেলামই না ওরে! ও আমার খুব প্রিয়। ওর জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখমুখ পুরো ফুলে গেছে। তবে লোকমুখে শুনেছি। কায়েফ নামে একজন খ্যাপাটে ছেলে নাকি তখন সেখানে উপস্থিত ছিল। তিনিই নাকি আমার মনটাকে নিজের পকেটে পুরেছেন! একপ্রকার চুরি করেছেন।”
কায়েফ নিজের নাম দেখে স্ক্রিনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। ওর কপাল কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। চটপট টাইপ করল,

এই অবেলায় পর্ব ৪৫

“আপনার কোথাও মস্ত বড় ভুল হচ্ছে ম্যাডাম। আমি কোনো চোর নই। আমি অত্যন্ত ভদ্র আর সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে। কারো মন চুরি করার তো প্রশ্নেই ওঠে না আমার দ্বারা!”
“ভালো করে নিজের ঘরটা খুঁজে দেখুন না ওসি সাহেব, মন হয়তো আপনার ঘরেই কোথাও লুকিয়ে আছে। গায়ের রংটা ওর একদম ধবধবে সাদা। শুধু ওঁর মাথার কাছটায় সামান্য একটুখানি কালচে রঙের ছোপ আছে। দেখতে বড্ড মায়াবী আর সুন্দর ও।”
“মনের আবার এমন অদ্ভুত ডিজাইন আর কালার হয় নাকি?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো, “মন তো আমার বিড়ালের নাম!”

এই অবেলায় পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here