এক দেখায় পর্ব ২৩
সুরভী আক্তার
শুক্রবার সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়েছে মিহি । অনেক দিন পর আজ চৌধুরী বাড়িতে এসেছে । রাফির কথা মতো বিয়ের দু’দিন আগে আর যাওয়া হয়নি মিহি আর রুহির । মিরা একাই গেছে । নাদিয়া মুখ ফুলিয়ে বসে আছে ওরা না যাওয়ার কারণে ।
আজ বিয়ে, না গেলে তো আর হয় না । সকাল সকাল যাবে এই ভেবে একেবারে রেডি হয়ে চৌধুরী বাড়িতে এসেছে মিহি । এখান থেকে রুহি সহ একেবারে নাদিয়া দের বাড়িতে যাবে । আবার ফিরবে সন্ধ্যায় , রাফি বলেছে ও নিজেই গিয়ে নিয়ে আসবে । একটু তাড়াতাড়ি গেলে আরো বেশি সময় পাওয়া যাবে ।
দশটার দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই বাড়িতে এসেছে মিহি, এখন সাড়ে এগারোটা । পাক্কা দেড় ঘণ্টা ধরে বসে বসে রুহির ছেলে মানুষি দেখেই যাচ্ছে ও । আলমারির সমস্ত কাপড় পরে আছে মেঝেতে , খাটের উপর ঝট পাকিয়ে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো কাপড় । আজ বিয়েতে পড়ার জন্য একটা নতুন গাউন সিলেক্ট করে রেখেছিল রুহি,, পুরো আলমারি তন্য তন্য করে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না সেটা । এক সপ্তাহ আগে নাদিয়ার বিয়ের জন্য খয়েরী রঙের সুন্দর একটা গর্জিয়াস গাউন কিনেছিল সে । ভেবেছিল এটাই পড়বে, কিন্তু এখন সেটা খুঁজে পাচ্ছে না । আলমারিতেই তো গুছিয়ে রেখেছিল, কোথায় গেলো ?
খুঁজে না পেয়ে বাচ্চাদের মতো হাত পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে আছে রুহি । চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে ।
মিহি সেই তখন থেকে সোফায় পা তুলে বসে গালে হাত রেখে দেখে যাচ্ছে ওর কান্ড । হেনা বেগম ঘরে এসে সবকিছু এলোমেলো দেখে কোমরে হাত গুজে চোখ পাকিয়ে বললেন….
” হায় আল্লাহ…
ঘরের কি অবস্থা করেছিস এটা ? এটা তোর ঘর , নাকি স্টোর রুম ? স্টোর রুমের অবস্থাও ভালো আছে এর থেকে !
রুহি ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল….
” আম্মু,, আমার ড্রেস কোথায় ?
কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না কেনো ? এখন আমি কি পড়ে যাবো বিয়ে বাড়িতে ?
হেনা বেগম অবাকের ন্যায় শুধালেন….
” তোর ড্রেস ?
ওটা তো কাল রাতেই শান্ত নিয়ে গেছে ! ও বললো তোর নাকি পছন্দ হয় নি ওটা । তাই রিটার্ন করে নতুন একটা ড্রেস নিয়ে এসেছে । আমাকে আজ সকালেই দিয়েছে এটা, আমিই ভুলে গেছিলাম তোকে দিতে ।
একটা প্যাকেট রুহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কথাটা বললেন হেনা বেগম । রুহি এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো । দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে হেনা বেগমের হাত থেকে প্যাকেট টা নিয়ে তড়িঘড়ি করে খুললো । প্যাকেটের ভেতরে সেই একই ডিজাইনের একটা গাউন, শুধু কালার আলাদা । এটা কালো রঙের । গাউন টা উল্টে পাল্টে দেখে রুহির বুঝতে বাকি রইলো না সবকিছু ।
সেইদিন গাউন টা কেনার সময় রুহি শান্ত কে ভিডিও কল করেছিল । খয়েরী আর কালো,এই দুটো গাউন দেখিয়ে বলেছিলো….
” কোনটা নেবো বলুন তো , আপনি যেটা বলবেন সেটাই নেবো ?
শান্ত দুটো গাউন ভালোভাবে দেখে উত্তরে বলেছিলো….
” কালোটা নাও জান । তোমাকে কালোটা বেশ ভালো মানাবে ।
রুহি ফটাফট ভেংচি কেটে বলেছে….
” কেনো, কালো টা কেনো নেবো আমি ? আর আপনার কথাই বা কেনো শুনবো ? আমার ইচ্ছের কোনো দাম নেই ? আমি তো এই খয়েরী টাই নেবো । রাখুন ফোন….
বলেই ফোন কেটে মুচকি হেসেছিল রুহি । শান্ত কে খোচাতে ওর ভালোই লাগে । শান্তর উপর জেদ দেখিয়ে সেই খয়েরী রঙের গাউন টাই কিনেছিলো রুহি ।
কিন্তু শান্তও তো কম নয় । খয়েরী টা সরিয়ে নিজের পছন্দের সেই কালো গাউন টাই হাজির করেছে রুহির সামনে ।
রুহি গাউন টা জড়িয়ে লাজুক হাসলো শান্তর পাগলামো দেখে । হেনা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন….
” এবার পছন্দ হয়েছে মহারানী ?
এটা খুঁজতে গিয়ে এতো গুলো কাপড় চোপড় এলোমেলো না করে আমাকে আগে বললেই হতো । এখন এসব কে করবে শুনি ?
রুহি গদগদ হয়ে বলল…
” তুমি তো আছো আম্মু ,, মহারানী আদেশ দিচ্ছে তোমায় , ফটাফট সব গুছিয়ে ফেলো দেখি , আমি এক্ষুনি রেডি হয়ে আসছি ।
আমার ভাবি জা…
না মানে, পাখি সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে আমার জন্য ।
হেনা বেগম মিহির দিকে তাকালেন । মিহি সোফা ছেড়ে উঠে এগিয়ে এসেছে । রুহি এক দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে পড়েছে চেঞ্জ করার জন্য । ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন হেনা বেগম । খাটের উপরে থাকা কাপড় গুলো গোছাতে গোছাতে বললেন….
” পাগলী মেয়ে একটা..!
মিহি একটু এগিয়ে হেনা বেগমের সাথে কাপড়ে হাত চালাতে চালাতে গলা ঝেড়ে একটু ভনিতার স্বরে বলল….
” শান্ত ভাইয়া রুহিকে খুব ভালোবাসে, তাই না আন্টি ? না মানে, সব সময় তো দেখি রুহির সব পছন্দ অপছন্দের খেয়াল রাখেন তিনি ।
হেনা বেগম হেসে উত্তর দিলেন….
” হুম… রুহিকে খুব ভালোবাসে শান্ত । শুধু রুহিকে নয় , জেনি, মেহজাবিন এদের কেও খুব ভালোবাসে । রাফি আর শান্ত দুই ভাইয়ের চোখের মনি এই তিন বোন ।
বোনদের ছাড়া চলেই না ওদের ।
মিহি স্মিথ হাসলো হেনা বেগমের কথা শুনে । কয়েকটা কাপড় ভাঁজ করতে করতেই রুহি বেরিয়ে আসে ওয়াশ রুম থেকে । দু’জনে তাকায় রুহির দিকে । রুহির ফর্সা শরীরে কালো রঙটা বেশ ফুটে উঠেছে । একদম জ্বলজ্বল করছে । হেনা বেগম সমস্ত কাপড় গুছিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন । রুহি চটজলদি একটা হিজাব জড়িয়ে নেয় মাথায় । তারপর মিহিসহ বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে ।
এরমধ্যে আর রাফির সাথে দেখা হয় নি । সকাল সকাল অফিসে চলে গেছে সে । ও অফিসে যাওয়ার পরপরই মিহি এসেছে ।
বাড়ির ড্রাইভার গাড়িতে করে মিহি আর রুহিকে পৌঁছে দেয় নাদিয়া দের বাড়িতে ।
বাড়িতেই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে । খুব বেশি বড় করে নয় , অত্যন্ত ছোট পরিসরে ।
মিহি আর রুহি সোজা চলে গেছে নাদিয়ার কাছে । নাদিয়ার ঘরে মিরাসহ আরো কয়েকজন কাজিন আছে নাদিয়ার । রুহি আর মিহি কে দেখে সবার মাঝ থেকে উঠে আসে নাদিয়া । গাল ফুলিয়ে অভিমানী স্বরে বলে….
” এতদিনে আসার সময় হলো তোদের ? এখন কেনো আসলি তোরা…? কোন দরকার ছিলো না তোদের আসার !
মিহি আর রুহি একসাথে জড়িয়ে ধরে নাদিয়া কে । রুহি আদুরে কন্ঠে বলে…
” সরি রে…
একটু বোঝার চেষ্টা কর ! সমস্যা না থাকলে নিশ্চয়ই আসতাম আমরা !
কিন্তু দেখ.. এখন তো এসেছি, মন খারাপ করিস না প্লিজ ।
নাদিয়া স্বাভাবিক হয়ে বললো….
” আচ্ছা ঠিক আছে । তা তোরা একা আসলি..? রৌনক আসে নি ?
” না..! ও এখন এসে কি করবে আমাদের মাঝে ? ও বিকেলে আসবে বলেছে !!
মিহির কথায় নাদিয়া খানিক ইতস্তত হয়ে নিচু স্বরে বলল…
” ওও…
আর সোহেল ? ও আসবে না ?
মিহি আর রুহি একে অপরের দিকে তাকালো নাদিয়ার কথায় । মিহি ভারী শ্বাস ফেলে বলল…
” তুই ভাবলি কি করে যে ও আসবে ?
সবটা বুঝিস তুই, বুঝেও না বোঝার ভান করিস না ।
ওর অপেক্ষায় থেকে লাভ নেই । আসবে না ও ।
নাদিয়া মাথা নিচু করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । ছলছল চোখ তুলে ভেজা কন্ঠে বলল….
” আমি তো ওর অপেক্ষায় নেই । আর না থাকবো ।
আমার কিছু করার ছিল না বিশ্বাস কর !!
আমি কখনো চাই নি এই বিয়েটা করতে । কিন্তু কি বলতো – মেয়ে মানুষ তো, আমাদের কোন চাওয়া থাকতে নেই, আর চাওয়া থাকলেও সেটার কোন মূল্য নেই ।
সবার কপাল এক হয় না রে, সবাই সবকিছু পায় না , সব সম্পর্কের পূর্নতা পায় না । কিছু অপূর্ণতা আর নিঃসঙ্গতা নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিতে হয় ।
” তুই একটু চেষ্টা করলেই পূর্ণতা পেতে পারতো !!
মিহির কথায় তাচ্ছিল্য করে অদ্ভুত হাসে নাদিয়া !
” চেষ্টা ? চেষ্টার কথা বলছিস ?
আব্বু বলেছিল এই বিয়েটা না করলে তিনি কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলবেন । এটা শোনার পর আর কি চেষ্টা করতাম আমি ? চেষ্টা করার আগেই নিজের অনুভূতি গুলোর উপর বালি চাপা পড়ে গেছে ।
বাই দা ওয়ে… বাদ দে এইসব !
এই সব আর ভাবতে চাই না আমি । ভুলে যেতে চাই সব ।
চোখের কোনের টলটল জল টুকু মুছে নেয় নাদিয়া । তৈরি হতে হবে এখন ওকে । বাড়িতেই সাজানো হবে , পার্লার থেকে লোক এসেছে । খুব তাড়াহুড়ো করে হচ্ছে বিয়ে টা ।
বিকেল হতেই বর আসে । মিহি আর রুহি এক কোনে দাঁড়িয়ে ছিল । ভিড়ের মাঝে যায় নি ওরা । নাদিয়া বরের নাম
– ‘আফাজ রাহমান’ । রুহি মিহি অবাক হয় তাকে দেখে । নাদিয়ার থেকে কমপক্ষে পনেরো থেকে ষোলো বছরের বড় হবেন তিনি । বয়সের ছাপ ফুটে উঠেছে । এই লোকের সাথে নাদিয়া মানিয়ে নেবে কিভাবে ?
নাদিয়া এর আগে সামনা সামনি দেখে নি আফাজ কে । কথাও বলে নি তেমন । স্টেজে পাশাপাশি বসানো হয়েছে দুজনকে । নাদিয়া একবারের জন্যেও মাথা তুলে তাকালো না আফাজের দিকে ।
চোখ স্থির করে নিস্তেজ হয়ে বসে আছে পাশে । মুখে হাসি নেই । চোখ দুটো মাটিতে নিবদ্ধ । রুহি আর মিহির খারাপ লাগছে খুব নাদিয়া কে দেখে । ওর পরিবার কিভাবে পারলো এটা করতে । নিজেদের মেয়েকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে জোর পূর্বক বসিয়ে দিয়েছে এই বিয়েতে ।
বিয়ে পড়ানো হয় সন্ধ্যা হতেই । রৌনক এসেছে বিকেলে । ওদের সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে । একটু পর নাদিয়া কে নিয়ে চলে যাবে সবাই । রুহি আর মিহি বিদায় নেয় নাদিয়ার থেকে । এখানে আর থাকতে ভালো লাগছে না ওদের । বাইরে বের হয় দুজনে । রাফি আসছে ওদের নিতে । গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দু’জনে ।
বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে রুহি । রাফি বললো ও পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে । এই পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ওদের ।
রুহি বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বললো….
” নাদিয়ার সাথে এটা কি হলো বলতো ? বেচারি ঐ বুড়ো লোকটার সাথে থাকবে কিভাবে ? তাও আবার ঐ দুর দেশে – পরিবার, আত্মীয় স্বজন, আপনজন, নিজ দেশ সবকিছু ছেড়ে ঐ লোকটার সাথে কতদূরে থাকতে হবে ওকে !!
মিহি শ্বাস ফেলে বললো…
” যেটা হওয়ার ছিল সেটা হয়েছে । ভাগ্যের উপর কারো হাত থাকে না , এখন দোয়া কর যাতে সুখি হয় ওরা !!
ওদের কথার মাঝেই একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়ায় ওদের সামনে । গাড়ির হেডলাইটের আলোতে দুহাতে মুখ আড়াল করে চোখ খিচে নেয় মিহি আর রুহি । হাত সরিয়ে পিটপিট করে তাকায় দুজনে । সামনের গাড়িটা চেনা নয় , তার মানে এটা রাফি না । বিয়ে বাড়ী , অন্য কেউ আসতে পারে হয়তো । মানুষের সমাগম লেগে আছে এখনো । মিহি আর রুহি চোখ ফিরিয়ে একটু সাইট হয়ে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ায় । বাড়ির ভেতর থেকে ফেইরি লাইটের টিমটিমে আলো ভেসে আসছে । বাড়ির বাইরে লাইটিং করা হয় নি , তাই একটু অন্ধকার । তবে ভেতরের আলোয় বাইরে’টাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ।
রুহি আবারো হাতের ঘড়িতে সময় দেখে । হঠাৎ পেছন থেকে একটা পুরুষালি ভরাট কন্ঠের ডাক শোনা যায়….
” মিহি…..
নিজের নাম শুনে চকিতে পিছন ফিরে তাকায় মিহি । রুহিও তাকায় সাথে সাথে । কন্ঠের মালিক কে চিনতে অসুবিধা হয় না মিহির । চিরচেনা কন্ঠ । রুহি ভ্রু কুঁচকে তাকায় একটু দুরে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়ব টার দিকে ।
ওদের কাছে এগিয়ে আসে লোকটা । মিহি অবাক লোচনে চেয়ে জিজ্ঞেস করে….
” আপনি এখানে ?
রুহির কুঁচকানো ভ্রু আরো বেশি কুঁচকে যায় লোকটাকে দেখে । সে আপাদ মস্তক পর্যবেক্ষণ করে তাকে । দামি সুট বুটে বেশ পরিপাটি স্মার্ট, সুদর্শন একটা ছেলে । এক দেখায় যেকোনো মেয়েই ক্রাশ খেয়ে যাবে । হিরোদের মতো ফিটনেস, একদম রাফির মতো, অন্ধকারেও ফর্সা হাসি হাসি মুখশ্রী বোঝা যাচ্ছে ।
মিহির ছোড়া প্রশ্নে লোকটা হেসে উত্তর দেয়…
” হুম আমি… নিতে আসলাম তোমায় ।
এবার রুহির দিকে তাকিয়ে বলে….
” হাই… তুমি রুহি ,তাই না ?
তুমি সম্মধনে চোখ মুখ কুঁচকায় রুহি । অচেনা অজানা একটা ছেলের মুখে এমন আচমকা তুমি সম্বোধন টা খাপ ছাড়া লাগে রুহির কাছে । সে মুখে উত্তর না করে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি প্রকাশ করে ।
” তুমি করেই বলছি , কিছু মনে করো না ।
আসলে মিহির মুখে কয়েকবার শুনেছি তোমার কথা । তার উপর আবার তুমি বিখ্যাত রুজান রাফি চৌধুরীর বোন । তোমাকে না চেনার কথা নয় ।
আর আমি সাফি….
রুহি একটু হাসার চেষ্টা করে । মিহির দিকে প্রশ্ন সূচক নয়নে তাকায়…
মিহি সাফিকে শুধায়….
” আমাকে নিতে এসেছেন মানে ?
আপনি কি করে জানলেন আমি এখানে এসেছি ? আমি তো আপনাকে বলি নি । আব্বু বলেছে ?
” হুম…
এতো কথা বলার সময় নেই । তাড়াতাড়ি চলো !
” কেনো ? কি হয়েছে ? আব্বু ঠিক আছে তো ?
” আরে হ্যাঁ , আঙ্কেলের কি হবে ! উনি সম্পুর্ন ঠিক আছেন । তুমি চলো তো..!
চোখের ইশারায় মিহি কে আরো কিছু একটা বোঝায় সাফি । অমনি হাসি ফুটে ওঠে মিহির ঠোঁটের কোণে । মিহি রুহির দিকে তাকায় । রুহি আগে থেকেই জিঙ্গাসু লোচনে চেয়ে ছিল । মিহি একটু হেসে বলল…
” আমি যাবো পাখি ? এমনিতেও আমাকে পৌঁছে দিতে হলে তোদের অনেকটা ঘুরে বাড়িতে যেতে হবে ।
এই লোকটার তালে মিহি কেও তাল মেলাতে দেখে কপাল কুঁচকে দাঁত পিষলো রুহি । একটু খিটখিটে স্বরে মুখ বাঁকিয়ে বলে….
” এভাবে বলছিস কেনো ? তোর যাওয়ার ইচ্ছে হলে যা ।
” তাহলে তোর ভাইয়া আসুক, তার পর না হয় যাবো !
তাড়া দেয় সাফি….
” ওর ভাইয়া আসুক,, তুমি চলো । সারপ্রাইজ আছে, আঙ্কেল আন্টি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য !
রুহি খানিক বিরক্তি নিয়ে বলে….
” আমার ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না তোকে । তুই যেতে পারিস ? আমি আছি এখানে, ভাইয়া আসলে চলে যাবো !
মিহি একটু আদুরে কন্ঠে বলে….
” রাগ করলি জান ?
” না….
” আহ্ মিহি,, চলো তো , দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের !
সাফির তাড়ায় মিহি বলে….
” হুম…
আপনি এগোন, আমি আসছি ।
সাফি তাড়াহুড়ো করে গাড়ির দিকে এগোয় । মিহি রুহিকে জড়িয়ে বলে…
” আসি পাখি…
কাল দেখা হচ্ছে আবার ।
রুহি আর কিছুই বলে না । বুকে হাত গুটিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয় । মিহি এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে । সাফি নিজেই দরজা খুলে দেয়, বসে পড়ে মিহি । সাফি ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে । রুহি কটমট করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে । পেছনে আরো একটা গাড়ির শব্দ হয় । রাফি এসেছে । গাড়ির ভেতর থেকেই মিহিকে অন্য একটা গাড়িতে উঠতে দেখে রাফি , সাথে পিছন থেকে একটা ছেলে কে দেখে । রাফি সেখানেই থেমে তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে । সামনে আসতে আসতে সাফির গাড়ি স্টার্ট হয়ে গেছে । নিমিষেই ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যায় গাড়িটা । রাফি এসে দাঁড়ায় রুহির সামনে । অফিস থেকে একেবারে এখানে এসেছে । ক্লান্ত দেখাচ্ছে ওকে । রুহিকে উদ্দেশ্যে করে রাফি বলে….
” ঐ গাড়িতে মিহি….
ও কার সাথে ছিল ? কে নিয়ে গেলো ওকে ?
রুহি দুরে যাওয়া গাড়ির থেকে রাগি দৃষ্টি সরিয়ে রাফির পানে তাকায় । খিটখিটে স্বরে বলে…
” জানি না কে ছিল ওটা ! একদম সহ্য হচ্ছিল ওকে আমার ?
রাফি খানিক উঁচু স্বরে বলে….
” জানিস না মানে ? তাহলে মিহি ওর সাথে গেলো কেনো ? আর তুই ওকে যেতে দিলিই বা কেনো ?
” মিহি ওকে চেনে !
” চেনে মানে ?
” আমি জানি না ?
বলেই গটগট পায়ে গাড়িতে গিয়ে বসে রুহি । রাফি চোখ মুখ শক্ত করে নিজেও গিয়ে বসে । গাড়ি স্টার্ট দেয় কোন কথা না বাড়িয়ে । চিবুক শক্ত হয়ে আছে ওর । রুহি রাফির দিকে তাকিয়ে গজগজ করতে করতে বলে….
” জানো ভাইয়া,, ঐ ছেলেটা কেমন গায়ে পড়া ? মিহি কে কেমন তুমি তুমি করে কথা বলছিল । আর কেমন জোর দেখাচ্ছিলো মিহির উপর । একদম বিরক্তিকর…
রাফি কিছু বললো না প্রতি উত্তরে । ওর চোয়াল আরো বেশি শক্ত হয়ে গেল । রুহি একটু স্থির হয়ে নিজে নিজেই বললো…
” ছেলেটাকে এই প্রথম দেখলাম , তবুও কেমন চেনা চেনা লাগলো । মনে হলো আগে দেখেছিলাম কোথাও ।
নাম টা কি যেনো বললো – সাফি বোধহয় , তোমার নামের সাথে মিল আছে অনেকটা ।
রাফি ভ্রু গুটালো ।
শরীর জ্বলছে ওর । রাগ উঠছে ভীষণ । মিহিকে একবার দেখার উদ্দেশ্যে বাড়ি না গিয়ে সোজা অফিস থেকে এখানে এসেছে । আর সেই মিহি কে কিনা অন্য একটা ছেলের সাথে দেখলো ? রাফি চোখ মুখ খিচে গাড়ি চালিয়ে কোন রকমে বাড়িতে আসে । আর একটাও কথা বলে নি । রুহির কথা গুলো কানে বাজছে ওর ।
ঘরে এসেই ফ্রেশ হয়ে মোবাইল হাতে বসে পড়েছে রাফি । সম্পুর্ন মনযোগ দিয়ে কিছু একটা করছে ফোনে । অফিস থেকে ফিরে এক কাপ গরম কফি না হলে চলে না রাফির । হেনা বেগম সেই কখন কফির মগ রেখে গেছেন ছেলের ঘরে । সেটা এখন ঠান্ডা হয়ে গেছে । ছুঁয়েও দেখেনি রাফি ।
রাফি প্রথমে মিহির ফেসবুক প্রোফাইল এ ঢুকলো । এমনিতেও ওর ফেসবুক প্রোফাইল লক করা । রাফি ঘেটেছে কয়েকবার । ফ্রেন্ড নেই তেমন, এক্টিভ ও থাকে না । পোস্ট ও করে না । প্রোফাইলে একটা সুন্দর ফেস হাইড পিকচার । রাফি মিহির একাউন্টের সমস্ত ফ্রেন্ডদের স্টক করলো । সাফি নামে কেউ নেই । এই একটা নাম তখন থেকে মাথায় ঘুরছে । মাথাটা ঝালাপালা করে দিচ্ছে একদম । কে এই সাফি ? মিহির সাথেই বা কি সম্পর্ক ওর ? আর এতদিনে এই সাফির খবর রুহিও জানে না । মিহিও বা কি ? ও বলে নি কেনো একবারও ?
রাফি ফোন ছুড়ে মেরে মাথা চেপে বসে রইল কিছুক্ষণ ।
এদিকে রাত বারোটা বাজতে আর কিছুটা দেরি । আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম ঘুমে বিভোর । মিহিকে ঘুম পাড়িয়ে আজমাল হোসেন শুয়ে পড়েছেন । শুতেই ঘুমেরা ঘিরে ধরেছে তাকে । পুরো বাড়ি অন্ধকার । গ্রাউন্ড ফ্লোর পুরোপুরি ফাঁকা এখন । আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম শিফট করেছেন উপরে মিহির পাশের ঘরে।
হঠাৎ একটা বিকট শব্দে ঘুম ছুটে যায় সাবিনা বেগমের । বড্ড চোখ পাতলা তিনি । একটা শব্দেই কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেছে । তড়িঘড়ি করে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসেন তিনি । আধো আধো চোখ খুলে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করেন কিসের শব্দ । আর কিছু শোনা যাচ্ছে না । নিজের মনের ভুল ভেবে আবারো শুয়ে পড়েন তিনি । চোখ বোজার আগে আবারো কোন কিছু পড়ার ঝনঝনে শব্দে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসেন তিনি । পাশ ফিরে আজমাল হোসেন কে দেখে নেন একবার । তিনি আরামে ঘুমিয়ে আছেন ।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আজমাল হোসেন কে একটু ঝাঁকান তিনি । নিচু স্বরে ডাকেন….
” শুনেছেন ? একটু উঠুন না….
নিচ থেকে কোনো কিছুর শব্দ পেলাম আমি । মনে হয় বাড়িতে কেউ ঢুকেছে । ভয় করছে আমার… উঠুন প্লিজ….
আজমাল হোসেন পাশ ফিরে শুয়ে ঘুম কাতুরে কন্ঠে বুলি আওড়ালেন….
” কি হয়েছে সাবিনা ? এতো রাতে ডাকছো কেন ? ঘুমিয়ে পড়ো….
সাবিনা বেগম আরো জোরে ঝাকালেন আজমাল হোসেনকে ।
” ঘুম পরে হবে , আগে উঠুন । বাড়িতে কেউ ঢুকেছে মনে হয়…
যদি চোর হয়… মিহি ঘরে একা আছে ,,
আজমাল হোসেনের ঘুম ছুটে গেল মুহুর্তেই । চট করে উঠে বসলেন তিনি । চোখ কচলে তাকালেন সাবিনা বেগমের ভীত মুখের পানে । খাটের পাশ থেকে চশমাটা হাতড়ে চোখে লাগিয়ে তড়িঘড়ি করে খাট থেকে নামতে নামতে বললেন….
” তুমি বসো … আমি দেখে আসছি কি হয়েছে ।
বাইরে বেরোবে না একদম ।
সাবিনা বেগম খাট থেকে নেমে পথ রোধ করে বললেন….
” আমিও যাবো আপনার সাথে , আপনি একা একা গিয়ে কি করবেন ।
চলুন….
আজমাল হোসেন বাঁধা দিলেন না । দিলেও সাবিনা বেগম শুনতো না । তাই কথা না বাড়িয়ে ঘরের দরজা খুলে পা টিপে টিপে বাইরে আসেন তারা । মিহির ঘরের দরজায় যান প্রথমে, দরজা হালকা খুলে ডিম লাইটের আলোয় উঁকি দিয়ে দেখেন মিহি ঘুমাচ্ছে । আজমাল হোসেন বাইরে থেকে দরজাটা আটকে দেন । করিডোর থেকে মাথা বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখেন নিচে । নিচের লাইট অফ । রান্না ঘরের ভিতর একটু আলো জ্বলছে । কয়েকজনের ছায়া দেখা যাচ্ছে বোধহয় , আন্দাজ করলেন তিনি । অবয়ব কিছু দেখতে পেলেন রান্না ঘরে ।
পা বাড়াতেই সাবিনা বেগম আটকে দেন আজমাল হোসেন কে । অন্ধকারে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে নিচে যাওয়ার জন্য না করেন তিনি । আজমাল হোসেন শুকনো ঢোক গিলে বলেন….
” কিচ্ছু হবে না,, তুমি ঘরে যাও …
আমি দেখছি…
বাইরে বের হবে না একদম….
সাবিনা বেগম আজমাল হোসেনের ফতুয়া খামচে ধরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন । মাথা ঝাকালেন দুদিকে, অর্থাৎ তিনি যাবেন না । আজমাল হোসেন সাবিনা বেগম কে নিজের আড়াল করে সামনে অন্ধকারে কোন রকমে সিঁড়ি হাতড়ে কয়েক ধাপ সিঁড়ি নিচে নামলেন । পিছু পিছু নামলেন সাবিনা বেগম । বুক ঢিপঢিপ করছে দুজনের ।
হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো পুরো বাড়িতে । ভয়ে আজমাল হোসেন কে পিছন থেকে জড়িয়ে চোখ মুখ খিচে চিৎকার করে উঠলেন সাবিনা বেগম ।
তার চিৎকারের মাঝেই একসাথে দু’টো কন্ঠ শোনা গেল…..
” সারপ্রাইজ….
সাবিনা বেগম এক ঝটকায় দূরে সরে পিটপিট করে চাইলেন নিচের দিকে । মিহি আর সাফি দাঁড়িয়ে আছে । মিহির হাতে একটা কেক । আজমাল হোসেন ওদের কে দেখে যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন । এতক্ষণ কি না কি ভেবেছিলেন তিনি । চোখ বুজে জোরে শ্বাস নিলেন তিনি । সাবিনা বেগম এখনো অবাক লোচনে হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে । মিহি হাতের কেক টা টেবিলের উপর রেখে ছুটে যায় আব্বু আম্মুর কাছে । দু’জন কে একসাথে দুহাতে জড়িয়ে গদগদ হয়ে বলে…..
” Happy anniversary আব্বু আম্মু….
Happy Happy 26 year marriage anniversary…..
সাবিনা বেগম চোখের পলক ফেললেন । মিহি দু’জনকে নিয়ে নিচে নামে । পাশাপাশি দাঁড় করায় দু’জনকে । সাফি এগিয়ে এসে বলল….
” Happy anniversary আঙ্কেল আন্টি…
বিয়ের পর ২৬ বছর পূর্তির অনেক অনেক শুভেচ্ছা….
আজমাল হোসেন একটু সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করলেন….
” আজ ৩০ তারিখ….?
মিহি আর সাফি দু’জনে একসাথে মাথা দোলালো । মিহি উৎসুক হয়ে বলল…..
” আমাদের সারপ্রাইজ কেমন লাগলো বলো..?
ঠিকঠাক করতে পেরেছি তো সবটা ?
আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম চোখ বুলিয়ে দেখলেন পুরো হল রুমটা । বেলুন আর একটু আধটু ফুল দিয়ে হালকা সাজানো হয়েছে । টেবিলের উপরের কেকটার দিকে তাকালেন দু’জনে । কয়েকটা মোমবাতি গলে পড়ছে কেকের উপর ।
আজমাল হোসেন হেসে ফেললেন । মুখে বললেন….
” সব একদম পারফেক্ট হয়েছে আম্মু ! তোমরা এতো কিছু কখন করলে বলোতো , আমি তো একটু আগেই দেখলাম তুমি ঘরেই ছিলে, ঘুমাচ্ছিলে ।
মিহি ফিক করে হেসে বললো…
” ওটা আমি ছিলাম না আব্বু, ওটা কোলবালিশ ছিল ।
বলেই হেসে উঠলো মিহি । সাফিও তাল মিলিয়ে হাসলো । সাবিনা বেগম একটু রাগি কন্ঠে বললেন….
” তবে রে পাজি মেয়ে,,
তুমি জানো আমরা কতটা ভয় পেয়ে গেছিলাম । সারপ্রাইজ না ভয় দেখানো হচ্ছিল আমাদের ?
মিহি বললো…
” এভাবে বলছো কেনো ? তুমি জানো তোমাদের এই সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য কতটা খাটতে হয়েছে আমাদের ?
” সাফি, বাবা তুমি কি করে জানলে আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকী ?
আজমাল হোসেনের কথায় সাফি বরাবরের মতো হেসে উত্তর দিলো…
” ক’দিন আগে মিহি নিজেই বলেছিল , কিন্তু দেখুন আজ ও নিজেই ভুলে গেছিলো । টোইটোই করে গেছিলো বান্ধবীর বিয়েতে, তাইতো তখন ওকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমি নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছিলাম ।
” মোটেই না, আমি মোটেও ভুলে যাই নি , ঐ একটু মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিলো আরকি । আপনি না থাকলেও আমি এসব করতে পারতাম….
আজমাল হোসেন সাফি আর মিহিকে পাশাপাশি দেখে স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে হাসেন । সাবিনা বেগম কে ফিসফিস করে বলেন….
” দেখেছো দুজনের পাগলামি..?
সাবিনা বেগম আলতো হাসলেন ।
মিহির তাড়ায় চটজলদি কেক কাটলেন সাবিনা বেগম আর আজমাল হোসেন । একে একে সবাইকে খাইয়ে দিলেন কেক । পাশ থেকে কয়েকটা ছবি ক্লিক করেছে সাফি ।
খানিক পর নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে সে । আজমাল হোসেন সোফায় বসে গাঁ এলিয়ে দিয়েছেন একটু । মিহি আব্বুর পাশে বসে ফেসবুকে এখনকার তোলা কয়েকটা ছবি একসাথে স্টোরি দিয়ে আব্বুর কাছে এসে বসে । সাবিনা বেগম বাকি কেকটা ফ্রিজে রেখে হাত মুছতে মুছতে পাশে এসে দাঁড়ান । মিহি গালে হাত রেখে কিছু একটা ভেবে কৌতুহলী প্রশ্ন ছোঁড়ে….
” আব্বু, আজ তোমাদের ২৬ বছরের বিবাহ বার্ষিকী ! তার মানে তোমাদের বিয়ের আট বছর পর আমার জন্ম হয়েছিল ?
সাবিনা বেগম আঁতকে উঠলেন মেয়ের প্রশ্নে । আজমাল হোসেন আড়চোখে সাবিনা বেগমের গতি পর্যবেক্ষণ করে সময় নিয়ে বললেন….
” হ্যাঁ আম্মু…!
মিহি বাচ্চাদের মতো আবারো প্রশ্ন করে…
” তাহলে আমার কোনো ভাই বোন নেই কেনো ? আজ যদি আমার একটা ভাই বা বোন থাকতো তাহলে কতোই না ভালো হতো বলো তো । আমাদের পরিবার টা একটু বড় হতো । আমি ওদের সাথে খেলতাম,, আদর করতাম , ঝগড়া করতাম..।
আজমাল হোসেন শ্বাস ফেলে বললেন….
” তুমি আসার পর আমাদের জীবনে আর কারোর প্রয়োজন হয় নি আম্মু । তুমি আমাদের সবকিছু, তোমাকে পাওয়ার পর আর কাউকে পাওয়ার ইচ্ছে জাগে নি আমাদের মনে । আমাদের একমাত্র আদরের রাজকন্যা তুমি, আমাদের সমস্ত আদর,ভালোবাসা শুধু তোমার জন্য । তাই তোমার আদরে ভাগ বসিয়ে আর অন্য কাউকে আনার কোন প্রয়োজন বোধ করিনি আমরা ।
মিহি আলতো হেসে জড়িয়ে ধরল আব্বু কে । আব্বুর বুকে মাথা রেখে বললো….
” লাভ ইউ আব্বু….
আমার জীবনে শুধু তোমরা থাকলেই হবে,,আর কারোর প্রয়োজন হবে না ।
সাবিনা বেগম অভিমানী কন্ঠে বললেন….
” লাভ ইউ শুধু আব্বুকে ,, আর আম্মু ?
মিহি উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আম্মু কে…
কোমল আদুরে কন্ঠে বলল….
” লাভ ইউ আম্মু….
লাভ ইউ,লাভ ইউ, লাভ ইউ…..
সাবিনা বেগম আজমাল হোসেনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন ।
আজ কোচিং ছিল সকালে । আজও লেট করেছে মিহি । ক্লাসের মাঝে ক্লাসে ঢুকেছে । রুহির পাশে মিহির বরাদ্দকৃত জায়গায় কেউ বসে না । মিহি গিয়ে বসে পড়ে সেখানে । নরম দৃষ্টিতে তাকায় রুহির দিকে । রুহি কপাল কুঁচকে স্যারের কথা শুনছে । মিহির দিকে একবারও ফিরলো না পর্যন্ত । মিহি শান্ত কন্ঠে ফিসফিস করে প্রশ্ন করলো….
” কখন এসেছিস পাখি…?
” সময় মতোই এসেছি আমি !
রুহির কাঠখোট্টা জবাবে ভড়কালো মিহি । আবারো ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল…
” কি হয়েছে তোর ? এভাবে কথা বলেছিস কেনো ?
রুহির আবারো রুক্ষ জবাব….
” কি আবার হবে ? কিছুই হয় নি ?
মিহি আর কথা বাড়ালো না । ক্লাসে মনোযোগ দিলো । রুহির ব্যাপারটা ক্লাসের পর সামলে নেয়া যাবে ।
রোজকার মতো মিহির সাথে চিপকে বসে নি রুহি , ব্রেঞ্চে দুরত্ব বজায় রেখে ফাঁক হয়ে বসেছে । মিহি দুরত্ব ঘুচিয়ে কাছাকাছি বসলো রুহির । তবুও রুহির মুখের কোন পরিবর্তন দেখা গেল না ।
ক্লাসের শেষে মিহিকে পাশ কাটিয়ে না বলেই বেরিয়ে এসেছে রুহি । দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে রুহির পেছন পেছন ছুটে আসে মিহি । মিহি বারবার পিছন থেকে রুহিকে ডাকছে…..
” কি হলো পাখি..? আমাকে রেখে কোথায় যাচ্ছিস ? দাঁড়া একটু…!
মিহির কথায় পাত্তা না দিয়ে রুহি হনহনিয়ে হেঁটেই চলেছে । গলির মাঝামাঝি দৌড়ে এসে পেছন থেকে রুহির বাহু টেনে ধরে মিহি….
” এই পাখি…
কি হয়েছে বলতো তোর ? কথা বলছিস না কেনো আমার সাথে ? আমি কি কোনো ভুল করেছি ? কালকে তোকে রেখে এসেছিলাম বলে রেগে আছিস আমার উপর ?
রুহি এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে সশব্দে উত্তর দেয়….
” আমি কেনো রেগে থাকবো তোর উপর ? কে হোই আমি তোর ? কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তোর সাথে, তাই কথা বলছি না ।
বলেই আবারো পিছন ফিরে হাঁটা লাগায় রুহি । মিহি এবারো আটকে দেয় রুহিকে । আদুরে কন্ঠে বলে….
” সরি পাখি,, রাগ করিস না প্লিজ । আসলে কালকে আব্বু আম্মুর anniversary ছিল । তাই তাড়াহুড়ো করে ওনার সাথে চলে এসেছিলাম আমি । সরি জান… এই দেখ কানে ধরছি.. আমি আর কখনো এমনটা করবো না । প্লিজ রেগে থাকিস না , কথা বল আমার সাথে । তুই এমন করলে কান্না পায় আমার । প্লিজ জান… রেগে থাকিস না…
এক দেখায় পর্ব ২২
” কি হইলো…
জান রাইগা আছে নাকি ? রাগ ভাঙানোর লাইগা আইমু আমরা…
পুরুষালি ভ্যাঙ্গানো কন্ঠে চমকে ওঠে মিহি আর রুহি । চকিতে আশেপাশে তাকায় দুজনে । মিহির ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ছেলে….
