Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৪৬

এক দেখায় পর্ব ৪৬

এক দেখায় পর্ব ৪৬
সুরভী আক্তার

পরিত্যক্ত বিশাল সুগার মিল । শহরের শেষ প্রান্তে যা এখন এক প্রকার ধ্বংস স্তূপের ন্যায় । দেয়াল থেকে সিমেন্ট খসে পড়া । এখানটায় মানুষের উপস্থিতি নেই বছর দশেক । জঙ্গল , গাছ গাছালির আড়ালে আপতিত হয়েছে মিলটা । একেবারে পরিত্যক্ত, বন্ধ । জং ধরা বিশাল লোহার গেটের তালা ভাঙা । হাট হয়ে খুলে আছে গেট ।
ভেতরটা পোকা, মাকড়, মাকড়সার জাল দিয়ে পরিপূর্ণ । ছাদ আকাশ চুম্বি উপরে । এক হাঁটু ময়লার স্তর মেঝেতে । সেই আবর্জনার মাঝেই মেঝের মাঝ বরাবর একটা নড়বড়ে কাঠের চেয়ারে বেঁধে রাখা কেউ ‌ । শরীর নেতিয়ে তার । কপালের পাশ ঘেঁষে রক্ত গড়াচ্ছে ।
সামনে কয়েক ধাপ দূরে আরো দুজন যুবক । সারফারাজ নিভু চোখ দুটো টেনে টুনে তুললো । রাফি আর শান্ত কে ঝাপসা চোখে দেখে হাসলো অদ্ভুত ‌। বললো কেমন করে…
” আমায় মারলি রাফি ? হাত কাপলো না তোর ? এতো জোরে জোরে মারতে পারলি আমায় ? ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে রে আমার । জ্বলে যাচ্ছে শরীর , খুব ব্যাথা হচ্ছে শরীরে, বিশ্বাস কর ?
তোর হাতে আগের তুলনায় শক্তি বেরেছে কিন্তু , আগে যখন মারতি তখন একটুও ব্যাথা লাগতো না । আজ খুব লাগলো তোর মার গুলো…

বন্ধুদের আঘাতে লাগে না । কিন্তু বন্ধু রুপি শত্রুর আঘাতে খুব লাগে রে…
রাফি হিসহিসিয়ে উঠলো । হাতের মুঠো খিচে কাঠের স্টিক টা ছুড়ে মারলো মেঝেতে দূরে কোথাও ‌। বিকট শব্দ হলো নীরবতার মাঝে । দুর্বলতায় চোখ বুজলো সারফারাজ । রাফি তেড়ে আসলো ।
” তোর হাত কাঁপলো না একটুও আমার উপর গুলি চালাতে ? কলিজা কাঁপলো না ? আমি না তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম ! ছিলাম কি না বল ? শত্রুতা কে তৈরি করেছে আমাদের মাঝে , আমি না তুই ? তুই খুব ভালো করেই জানিস ছয় বছর আগে কি ঘটেছিল ।
তোর জন্য সিঙগিং ক্যারিয়ার ছেড়েছি আমি । দু-দুটো বছর নিজের ফ্যামিলি থেকে দূরে ছিলাম । তোর পাগল বোন লাইফ টাই হেল করে দিয়েছে আমার ।
” খবরদার পাগল বলবি না ওকে । ও আমার বোন । আমার কলিজার টুকরা ও ।
আমি কিচ্ছু বুঝি না , আমি শুধু বুঝি , তোর জন্য সুইসাইড করেছে ও ! কেনো মেরেছিলি সেইদিন ওকে ?
” কেনো মেরেছিলাম এটা জেনেও ভাই হয়ে বারবার শুনতে আসিস কেনো ? তুই তো জানিস সেদিন কেনো মেরেছিলাম আমি ওকে ! কারন জেনেও লজ্জা করে না তোর ?

” না ,,, লজ্জা করে না আমার !
কষ্ট হয় আমার , বুঝলি ? কষ্ট হয় ! আমার বোন মরেছে , তোর নয় ! আজ যদি আমার বোনের জায়গায় তোর বোন থাকতো , তাহলে , তাহলে কেমন হতো বল !
সেদিন যদি ভুলের জায়গায় সঠিক হতো ? মিহির জায়গায় যদি তোর বোনই আসতো ? তাহলে ? তাহলে কিন্তু আজ তোর বোন ও কারোর সামনে মুখ দেখাতে পারতো না । হয়তো আমার বোনের মতো ও মরতো….
এবার আসলো শান্ত । সারফারাজের সম্মুখে অগ্রসর হয়ে একটু হেলে কলার চেপে ধরলো ওর । দাঁত পিষে কটমট করে উঠলো….
” এইইই ,, খবরদার আমার জানের সাথে নিজের বোনের তুলনা দিবি না ! তোর বোন নোংরা মস্তিষ্কের । নোংরা চিন্তা ভাবনা ছিল তোর বোনের । ভাই হয়েও এসব জানিস , তবুও মিনিমাম লজ্জা নেই তোর…
গা দুলিয়ে হাসলো সারফারাজ ।

” তোর মারটাই বাকি আছে । রাফির মতো তুইও মার আমায় । তুই কেন হাত গুটিয়ে বসে আছিস ? মার তুইও ! একেবারে মেরে ফেল আমায় , বিশ্বাস কর এভাবে বাঁচতে খুব কষ্ট হয় । ততদিন এই কষ্ট থাকবে , যতদিন না আমি মরবো আর নয়তো রাফি মরবে ! রাফি কে তো আমি মারবোই , যদি বেঁচে থাকি তাহলে ওকে আমি মারবোই !
” আমাকে মারলে মারতিস ,, কিন্তু আমার ব্লোসোম ? ওর দিকে হাত বাড়িয়েছিলি কেনো তুই ? প্রথম কোনো মেয়েকে ভালোবেসেছি আমি , বুঝলি ? ওকে ভালোবেসেছি আমি ! আর তুই ওকেই টার্গেট করলি ! শুট করলি ওকে ? যদি ওর কিছু হয়ে যেতো ?
তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি আমার জিনিসের উপর কারোর হস্তক্ষেপ পছন্দ করি না । আর তুই আমার জিনিসের দিকেই হাত বাড়ালি ?
দূরে সরিয়েছিলি তো মিহি কে আমার থেকে ! তুই জানিস পাগল হয়ে গেছিলাম আমি…

” পাগল বানাতেই তো দূরে সরিয়েছিলাম ওকে ।
কিন্তু আফসোস , পাগল হয়ে মরলি না তবুও । আমি খুব ভালো করেই জানি , তুই তোর আপন জনদের হারানোর ভয় কতটা পাস !
এটাই তো তোর দূর্বলতা । এটাই কাজে লাগালাম । মিহি কে দূরে সরাতে একটুও কসরত করতে হয় নি আমায় । ওর মা’ই ওকে দূরে সরিয়েছে । আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছে । কি বলতো , মিহি ওর মায়ের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা । বিধবা হয়ে , বেচারি নিজের দূর্বলতা কে আঁকড়ে বাঁচতে চায় । তাকে তো বাঁচতে দিতে হবে বল !
কিন্তু না , আমি আর তাকে বাঁচতে দেবো না । মিহি কে মেরে দেবো আমি । কাল গুলি লেগেও মরে নি । আমি তো ভেবেছিলাম মরবে । মরে নি তো কি হয়েছে । এবার মারবো । মিহি কে মারলে , উনিও মরবে , আর তুইও মরবি আপনা আপনি ।
রাফির রক্ত চক্ষু । ক্ষিপ্ত তায় গর্জে উঠলো সে । চিবুক বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে ।

” মিহি কে মারবি ? আমার ব্লোসোম কে ? মেরে দেখা ? তুই বাঁচলে তবেই তো মারবি ওকে ?
” মারবি আমায় ? সত্যিই মারবি ? জানে মেরে দিবি একেবারে ? আচ্ছা মার , কিন্তু একটা কথা বলি , আমায় মারলেও মিহি কে কখনো পাবি না তুই ! মিহির মা ওকে ঠিক দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে । এর আসল কারন আর মিহির আসল পরিচয় কোনো দিন জানতে পারবি না তুই । আর না কোনো দিন মিহি কে পাবি …
কথা শেষ করে গা দুলিয়ে ঝংকার তুলে হেসে উঠলো সারফারাজ । এক মুহুর্তে হাসি থামিয়ে মুখখানা করুন করলো । চোখ দুটো ভেজা ওর । অদ্ভুত স্বরে বলল….
” মেরে দে আমায় রাফি । বাঁচিয়ে রাখিস না । আমায় বাঁচিয়ে রাখলে তুই বাঁচবি না । তোকে বাঁচতে দেবো না আমি । তোকে বাঁচিয়ে রাখলেও আমার কষ্ট হবে আর মারতে গেলেও আমার কষ্ট হবে । নিজে বাঁচলেও কষ্টে বাঁচতে হবে , আর মরলেও কষ্টে মরতে হবে ।
এক টাই বেছে নেই , মেরে দে আমায় । এভাবে বাঁচতে খুব কষ্ট হয় রে । প্রতি দিন ধুঁকে ধুঁকে মরি আমি । একেবারেই মেরে ফেল আমায় ।
টুপ করে পানি গড়ালো গাল বেয়ে । রাফি আর পারলো না ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে । নিজের মাথার চুল নিজেই দুহাতে খামচে ধরে ছটফট করে উঠে দাঁড়ালো ও । চিৎকার করে উঠলো ভেজা করুন স্বরে….

” আরে আমার সাথেই কেনো এমন হয় ? কেনো, কেনো, কেনো ? তুই তো আমার সব ছিলি রে , তাহলে কেনো এমন করলি । এমন পাল্টে গেলি কেনো তুই ? তুই তো জানিস তোর বোন কেমন ছিলো ? ওকে আমি সেদিন কেনো চড় মেরেছিলাম সেটাও জানিস ! তাহলে এমন কেনো করছিস তুই ? তোর বোন সুইসাইড করেছে এতে আমি কি করবো ?
কি করার ছিলো আমার ?
আমি তোকে আঘাত করেছি , মেরেছি আমি তোকে । কারন তুই আমার জানে হাত দিয়েছিস । আমায় মারলে আমি কিচ্ছু করতাম না তোকে । কিন্তু মিহি , ওকে আঘাত করলি কেন তুই ।
এখন কি করব আমি ? তোকে তো মারতে পারবো না আমি ।
রাফির দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসছে । চোখ বুজতেই ঝরঝরে পানি গড়ালো চিবুক বেয়ে । মাথা ফেটে যাচ্ছে । বাহুর ব্যান্ডেজ লাল তরলে ভিজে জবজবে ।
সারফারাজ বাঁকা হাসলো । নিজের শরীর কে নরম করলো । রাফি পিছু ফিরে । শান্ত রাফি কারোর নজর এদিকে নেই । সারফারাজের হাতের বাঁধন আলগা হয়েছে এতক্ষণে । শরীরের ক্ষিন শক্তিতেই ও ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ালো । মেঝে থেকে একটা কাঠের তক্তা তুলে নিলো । হেসে উঠলো বিকট শব্দে….
” আমায় মারতে পারবি না , তাহলে আমিই তোকে মেরে দেই ।
রাফি পিছু ফিরার আগেই শক্ত তক্তার বাড়ি ওর শরীরে পড়ার আগেই শান্তর চিৎকার …

” রাফি…?
সাথে সাথে পুরো গোডাউন হল জুড়ে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেলো এক মুহুর্তে । রাফি পিছু ফিরতেই ছলকে উঠলো । সারফারাজ স্তম্ভের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে । হাতের কাঠের তক্তা টা উপরে তুলেছিল রাফি কে আঘাত করার জন্য । তবে আঘাত করতে পারে নি ।
সারফারাজের হাত থেকে আপনা আপনি টলে পড়লো কাঠের তক্তা টা । এর সেকেন্ড কয়েকের মাথায় সে নিজেও টলে পড়লো । উবু হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ধুলো জমা মেঝেতে । নিঃশ্বাসের মৃদু কম্পনে প্রকম্পিত হলো আশপাশ । ধুলো উড়লো একটু । মিলিয়ে গেলো তা । মাথার পেছন দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে ভিজে গেলো মেঝে । রাফি স্তব্ধ । সারফারাজের ঠিক পেছনে শান্ত দাঁড়িয়ে । হাতের লোহার রড । চোখ মুখ বিকৃত ওর । ক্ষুব্ধ দৃষ্টি মেঝেতে পড়ে থাকা সারফারাজের পানে । রাফি অস্ফুটে উচ্চারণ করলো….

” শান্ত ,, কি করলি এটা ?
সারফারাজ ??
” চুপ , একদম চুপ । একটাও কথা বলবি না আর । বাঁচার তাগিদে এমন দু একটা কীট রাস্তা থেকে সরাতে হয় ।
চল এখান থেকে…
সারফারাজ নিভু চোখে চেয়ে নিঃশব্দে হাসলো । রাফির কাতর ভেজা দৃষ্টি লক্ষ্য করে চোখ বোজার আগে থেমে থেমে ফিসফিস করলো….
” আমার বাপ মারে একটু দেখিস রাফি । ওরা আজও তোকে ছেলে মানে । ওদের কাছে আজও তুই সেই রাফিই আছিস । ওদের একটু দেখিস প্লিজ । আমার বোনের পর আমি ছাড়া ওদের আর কেউ ছিল না । আজ থেকে আমিও আর থাকবো না । ওদের খেয়াল রাখিস…
রাফি কেঁপে উঠলো । শান্ত ওর বাহুতে নিজের শক্তি খাঁটিয়ে ওকে টেনে নিয়ে আসলো বাইরে । গজগজ করছে সে । চক্ষু আড়াল না হওয়া অবধি রাফি তাকিয়ে রইল ওর কোনো এক কালের প্রাণ প্রিয় বন্ধুর দিকে ।
বিধ্বস্ত মিলটার মেঝেতে যে পড়ে রইলো এখন । মিলের বাইরে বেরিয়ে ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো রাফি । এক মুহুর্তে বিধ্বংসী মিলটার চেয়ে থাকার মাঝেই বিস্ফোরণ ঘটলো সেখানে । ভড়কে চমকালো রাফি । তবুও নড়লো একটু । ধা ধা অগ্নি শিখা জ্বলছে চোখ সম্মুখে । তার তাপ রাফির গায়ে এসে লাগছে । জ্বলে যাচ্ছে ওর শরীর । শান্ত দাঁড়িয়ে থেকে হাতের ছোট্ট লাল বোতাম মতো কিছু একটা গর্জে ছুড়ে মারলো কোন এক দিকে । দাঁত পিষলো অগ্নিকাণ্ডের দিকে তাকিয়ে । আবারো টেনে তুললো রাফি কে ।

” কি দেখছিস ওভাবে ?
” সারফারাজ আর নেই শান্ত ? মেরে দিলাম আমরা ওকে ? ও আর আসবে না ?
” মেরে দিলাম নয় , মেরে দিয়েছি । আমি মেরেছি ওকে বুঝলি ? তুই কিচ্ছু করিস নি । আমি মেরেছি ওকে । ওর মৃত্যু প্রাপ্য ছিল । অবধারিত ছিল ওর জন্য । কিছু করিস নি তুই । এখন চল এখান থেকে….
রাফি আচমকা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শান্ত কে । বাচ্চাদের ন্যায় কেঁদে উঠলো ও । বিলাপ করতে লাগলো…
” ওকে তো মারতে চাই নি আমি । ও এমন কেনো হলো বলতো ? কেনো বদলালো ও নিজেকে ?
শান্ত কিয়ৎকাল থমকে দাঁড়িয়ে রইল । রাফি কে সময় নিয়ে সামলে স্থান ত্যাগ করলো তড়িঘড়ি করে । এখানে থাকাটা বিপদ জনক । ওরা জায়গা থেকে সরতেই অন্য কারোর উপস্থিতি ঘটলো সেখানে । শান্তর ছুড়ে মারা ছোট্ট রিমোট মতো জিনিসটা খুঁজে হাতে তুললেন তিনি । একবার দীর্ঘ শ্বাস ফেলার শব্দ হলো ফোঁস করে ।

হাসপাতালে কেবিনের বাইরে চৌধুরী বাড়ির সবার ভিড় । শান্ত রাফি কে নিয়ে নিস্তেজ হয়ে পৌঁছালো সেখানে । শুকনো চোখ মুখ নত রাফির । রুহি হেনা বেগম কে জড়িয়ে ফোপাচ্ছিলো এতক্ষণ । ভাইয়া কে দেখে কান্না থামিয়ে ছুটে আসলো ও । রাফি কিংকর্তব্য বিমূঢ় । রুহি ঠোঁট উল্টে বললো…
” ভাইয়া , পাখির জ্ঞান ফেরেনি এখনো ।
রাফি তাকালো । তবে উৎকর্ষতা বিহীন । শান্ত নিরিহ চোখে তাকালো রুহির করুন মুখ খানার পানে । পেছনে রাশেদ রায়হান চৌধুরী ছেলেকে পরখ করলেন আগা গোড়া । গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন…
” মিহি মামনির জ্ঞান ফেরেনি এখনো । এতো কিছু ঘটলো , এতো কিছু করলে ,অথচ একটা বারও জানানোর প্রয়োজন বোধ করলে না আমাদের ?
তার তপ্ত স্বর । রাফি তবুও তাকালো না । রাবেয়া চৌধুরী ধড়ফড়িয়ে আসলেন…
” রাফি ,, এই দেখনা । ঐ মেয়ে টা আছে না , হারিয়ে গেছিল যে ? তোকে তো বলেছিলাম খুঁজে দিতে । ওকে খুঁজে পেয়েছি জানিস ? ঐ ঘরটায় ও শুয়ে আছে কেমন । আমার রক্ত ওকে দিয়েছি । আমি ডেকেছি , কিন্তু ও উঠলো না । কি হয়েছে ওর ? ডাক না ওকে , ও উঠছে না কেনো ?
রাফি তাকালো মামনির দিকে । সবাই কে উপেক্ষা করে কেবিনের দিকে পা বাড়ালো । হেনা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন অবাক লোচনে ।
কেবিনে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দিলো সে । একটু দাঁড়িয়ে মিহি কে দেখলো । মুখে অক্সিজেন মাস্ক নেই এখন । একজন নার্স ভেতরে । রাফি কে দেখে মাথা নামিয়ে নিজে থেকেই বেরোলেন তিনি । রাফি এগোলো ধীর পায়ে । দাঁড়ালো মিহির পাশে ।

শ্বাস ফেললো দীর্ঘ । অতঃপর ওর পাশেই বেডে বসলো । মেয়েটার অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে সংবরন করলো নিজেকে । আজ কেনো জানি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ।
রাফি ঝুকলো মিহির দিকে । ঠোঁট ছোঁয়ালো অবচেতন মেয়েটার কপালে । কপালে কপাল ঠেকিয়ে ওর বন্ধ অক্ষি যুগলের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । অতঃপর নিজেও চোখ বন্ধ করলো । চোখ বন্ধ করতেই দুফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়লো মিহির বন্ধ চোখের বৃহৎ পাপড়িতে ।
” মিহি ,, মাই ডিয়ার ব্লোসোম ! ওঠো প্লিজ । ভালোবাসো তো আমায় , দেখো আমিও ভালোবাসি । আজ আর কোনো বাধা নেই । সব শেষ । আর কেউ আসবে না আমাদের মাঝে । কেউ আলাদা করতে পারবে না তোমায় আমার থেকে ! তোমাকে হারানোর ক্ষমতা কি আছে আমার বলো ? তোমার এভাবে দেখার ক্ষমতাই নেই ! নিঃশেষ আমি , আর কিচ্ছু শেষ হওয়ার নেই আমার মাঝে । এবার তোমাকে নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে চাই । সময় নষ্ট করতে চাই না আর । অনেক সময় শেষ করেছি । এই শোনো , আর কদিন পর কিন্তু ২৯ বছর বয়স হবে আমার । বুড়ো হয়ে যাচ্ছি কিন্তু । আর কবে আমার বিয়ে হবে বলো ?
প্লিজ উঠে পড়ো । এক মাস সময় চেয়েছিলাম না , এক মাসের মধ্যেই বিয়ে করবো তোমায় ‌। বিয়ের কথা বলছি তো , একটু লজ্জা পাও ‌। লজ্জা লজ্জা চোখে তাকাও আমার দিকে । ম্যাডাম,, আপনার বান্ধবীর বড় ভাই ডাকছে তো আপনাকে । এই দেখুন সে আপনার কতো কাছে । একবার চোখ মেলে তাকান তার দিকে । উঠুন একবার ।
এই মিহি , ওঠো প্লিজ । রুহি কাঁদছে বাইরে । দেখো তোমায় দেখতে সবাই এসেছে ।
আমাকে আর কষ্ট দিও না প্লিজ । ওঠো..

বলতে বলতে একেবারে সন্তর্পণে সেপ্টে জড়িয়ে ধরলো মিহি কে । এই মেয়ে টা তো তার একটা কথাও শুনছে না । রাফি ওর কানের লতিতে হাল্কা ঠোঁট ছুঁইয়ে আবার ডাকলো…
” আমি কিন্তু মরে যাবো , সত্যিই বলছি । একেবারে মরে যাবো আমি । আর কাউকে হারানোর শক্তি নেই আমার । তোমাকে এভাবে দেখারও শক্তি নেই । প্লিজ জান উঠে যাও । শুনবে না আমার কথা ? উঠবে না তুমি ? দেখবে না আমায় ? তোমার চোখের চাহনি দেখতে চাই আমি । একবার তাকাও আমার দিকে ‌। প্লিজ ওঠো….
মিহি শুনলো না । আর না উঠলো । রাফি ওকে ওভাবেই জড়িয়ে রাখলো অনেকক্ষণ । দরজার খট শব্দে ধড়ফড়িয়ে নিজেকে সামলে স্বাভাবিক করলো সে । ভেজা দৃষ্টি আড়াল করে মুছলো । অতঃপর তাকালো দরজার দিকে । ডাক্তার এসেছেন ‌। তিনি দরজার কাছে একটু থেমে পা বাড়ালেন ভেতরে । পেছনে রুহি , শান্ত , রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জুবায়ের চৌধুরী । রাফি নিজেকে ধাতস্থ করলো । অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো খানিক । ডাক্তার ওকে দেখে হাসলেন আলতো । হাতে কিছু রিপোর্ট তার । তিনি এগিয়ে এসে মিহির চেকাপ করলেন আরো একবার । রাশেদ রায়হান পুছলেন চিন্তিত স্বরে….

” ডক্টর , মিহি মামনির জ্ঞান এখনো ফেরেনি কেনো ? আর কি প্রবলেম আছে ?
ডাক্তার আশ্বাস দিলেন..
” ডোন্ট ওয়ারি …
ওনার সেন্স ফিরবে খুব তাড়াতাড়ি । উনি এখন সম্পূর্ণ আউট অফ ডেঞ্জার । ওনাকে নিয়ে টেনশনের কোনো কারন নেই ।
আপনারা এখানে বেশি ভিড় করবেন না । ডোন্ট মাইন্ড , বাট, যদি বাইরে যেতেন ভালো হতো ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী কথা বাড়ালেন না । জুবায়ের চৌধুরী কে ইশারা করে ছেলে কে বাঁকা চোখে এক পলক দেখে বাইরে বেরিয়ে আসলেন তিনি । রুহি কাঁচুমাচু মুখে বুলি ফুটালো রাফির উদ্দেশ্যে….
” আমি পাখির কাছে থাকি ভাইয়া ? প্লিজ ! আমি একটুও ডিস্টার্ব করবো না । শুধু বসে থাকবো ওর পাশে ….
রাফি চোখ তুললো বোনের দিকে । চোখ মুখ লালচে হয়ে ফুলে গেছে মেয়েটার । রাফি নরম হাসলো । শীতল কন্ঠে বলল…

” আমার কাছে আয় ।
রুহি এগোলো ধীর পায়ে । রাফি ওকে টেনে নিয়ে সামনে দাঁড় করালো । মেয়েটার ভেজা চোখ দুটো মুছিয়ে দিলো অতি যত্নে । নিজের পাশে ইশারা করে বললো..
” বস এখানে ।
রুহি বসলো তৎক্ষণাৎ । ডাক্তার এতোক্ষণ চেয়ে দেখলেন দুই ভাই বোন কে । রুহি রাফির নিজের বোন এটা অজানা নয় । ডাক্তার এবার তাকালেন মিহির দিকে । শীতল কন্ঠে বললেন…
” আপনি আপনার বোনদের একটু বেশিই ভালোবাসেন , তাই না মি. রাফি ?
রাফি চকিতে তাকালো ।
” আমার বোন একটাই , আমার জান , ওকে একটু নয় অনেক বেশিই ভালোবাসি আমি !
” নিজের বোনের মতো এনাকেও ভালোবাসেন ? একচুয়েলি , ওনাকে নিয়ে আপনার স্ট্রেস দেখলাম অনেক , তাই জিজ্ঞেস করলাম আর কি ?
মিহি কে ইশারা করে কথা গুলো । রুহি , শান্ত,রাফি একই সাথে তাকালো মিহির দিকে । রাফির শান্ত দৃষ্টিতে আনমনে ধীর জবাব…

” ওনার প্রতি ভালোবাসার পন্থা আলাদা । ওনাকেও ভালোবাসি , অনেক বেশি , নিজের থেকেও বেশি ।
” আপনার বোনরা তাহলে লাকি আপনার মতো ভাই পেয়ে ?
” বোনরা নয় , একটাই বোন আমার !
” নিজের বোন তো একটা , আমি আপনার কাজিনের কথা বলছি !
রাফি কপাল কুঁচকালো । সাথে শান্ত ও । রাফি প্রশ্ন সূচক নয়নে রুহির পানে চাইলো ।
” মেহজাবিন এসেছিল ?
রুহি না বোধক মাথা নাড়ালো দুদিকে । ডাক্তার তৎক্ষণাৎ বললেন…
” আমি মিহির কথা বলছি ! উনিও তো আপনার কাজিন !
রাফি ভ্রু গুটালো অধিক । নরম কন্ঠ ভার করলো…
” সরি ,, ও আমার বোন বা কাজিন কেউই নয় ‌! ভুল বুঝেছেন আপনি !
এবার ভ্রু কুঁচকালো ডাক্তার । তিনি অবাক হলেন অত্যাধিক ‌। চোখ কপালে তুলে অবিশ্বাস্য কন্ঠে শুধালেন….
” হোয়াট ? উনি আপনার কাজিন নন ?
” না …
” এটা কি করে হতে পারে ? যিনি ওনাকে রক্ত দিলেন তিনি কে হন ওনার ?
রাফি বোধহয় বিরক্ত হলো । তবে প্রকাশ করলো না । উত্তর করলো স্বাভাবিক ভাবেই…

” উনি আমার মামনি ! ওনার কিচ্ছু নন !
ডাক্তার থমকালেন । খানিক মূক বনে দাঁড়িয়ে রইলেন । রাফি দৃষ্টি সরিয়েছে তার থেকে । তবে কপাল কুঁচকে সূক্ষ্ম নেত্রে চেয়ে আছে শান্ত ।
ডাক্তার তড়িঘড়ি করে রিপোর্ট ফাইল হাতে তুললেন । চোখ বোলালেন কাগজ গুলোতে । চোখ জোড়াতে বিস্ময় তার । মুখখানার ভঙ্গিমা অদ্ভুত ।
শান্ত চেয়ে থেকে প্রশ্ন করলো…
” হোয়াট হ্যাপেন্ড ডক্টর ? এনি প্রবলেম ?
ডাক্তারের এলোমেলো দৃষ্টি উঠলো শান্তর দিকে । তিনি জিভে অধর ভিজিয়ে আবারো প্রশ্ন করলেন…
” ওনার প্যারেন্টস কোথায় ? আই মিন , মা বাবা কে ওনার ?
” তারা নেই এখানে ? আসে নি এখনো । তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মিহির মা চলে আসবেন ।
” এটা কি করে হতে পারে ? হাউ ইজ ইট পসিবল ? ওনার মা তো এখানেই ?
ডাক্তারের হাঁসফাঁস কন্ঠস্বর । রাফি এবার সিরিয়াস ভাবে চাইলো তার দিকে । প্রশ্ন ছুঁড়ল…

” কি হয়েছে ডক্টর ? ওনার মা এখানে মানে ? ওনার মা তো এখনো আসেনি । কি বলছেন এসব আপনি ?
ডাক্তার এগোলো রাফির দিকে । কন্ঠ স্বর উঁচু করে বললো…
” মি. রাফি … লিসেন টু মি… আপনাদের বোধহয় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু । মিহি , আই মিন যিনি পেসেন্ট , তাকে যে লাস্ট এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন তিনি ওনার মা নন ?
চোখ কুঁচকালো রাফি । শান্ত বলে উঠলো…
” আরে আজব , এলোমেলো হতে যাবে কেনো আমাদের ! আর ইউ ওকে ডক্টর ? কিসব বলছেন আপনি , আপনাকে বলছি তো ওনার মা এখনো আসেন নি এখানে । ওনার মা কে নিয়ে কেনো পড়ে আছেন আপনি ?
রুহি অবাক লোচনে একেক বার একেক জনের দিকে তাকাচ্ছে । ডাক্তার কে অস্থির দেখাচ্ছে ভীষণ । তিনি নিজেকে সামলে শান্ত হয়ে বললেন…

” ওনার মা কে নিয়ে নয় , মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে পড়ে আছি আমি । ওনার মা এখানেই আছে । যিনি ওনাকে রক্ত দিয়েছেন তিনিই ওনার মা । ওনাদের দুজনের মেডিকেল রিপোর্ট তো তাই বলে । জাস্ট লুক….
মিসেস রাবেয়া চৌধুরী ইজ এ মাদার অফ মিস মাহিতা ইসলাম মিহি । ওনাদের ব্লাড থেকে ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছে । জাস্ট সি দিস রিপোর্ট…
ডাক্তার রিপোর্টের কাগজ গুলো মেলে ধরলো শান্তর সম্মুখে । রাফি ক্ষিয় কাল তাজ্জব বনলেও পর মুহুর্তে ছোঁ মেরে ও কাগজ গুলো টেনে নিলো ডাক্তারের হাত থেকে । হাত ক্রমান্বয়ে কাঁপছে ওর । ও উল্টে পাল্টে দেখতে লাগলো কাগজ গুলো । জিভে অধর ভিজিয়ে ঢোক গিললো । নিজের চোখ কে বিশ্বাস হচ্ছে না । ঘন পলক পড়ছে রাফির চোখে । শান্ত ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো..
” রাফি , কি বলছেন ডক্টর ? র.. রিপোর্টে কি আছে ?
রাফির হাত থেকে কাগজ গুলো আপনা আপনি গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে । ভরা চোখ দিয়ে এক ফোঁটা করে পানি গড়ালো । বাক্ আটকালো কন্ঠ নালিতে । শান্ত ডাকলো ফের…
” রাফি ? কি হয়েছে , কিছু বলছিস না কেনো ?
রাফি এলোমেলো হয়ে উঠলো বসা থেকে । ডাক্তারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করে উচ্চারণ করলো….

” এই রিপোর্ট , এগুলো সত্যি ? সত্যি এগুলো ?
” অফ কোর্স ! মেডিকেল রিপোর্ট , মিথ্যে হতে যাবে কেনো ?
পেছালো রাফি । একাধারে কয়েক কদম পিছিয়ে টাল সামলাতে না পেরে পিছনের দিকে উষ্ঠা খেয়ে পড়ল ধপ করে । রুহি চেঁচিয়ে উঠলো ভাইয়া বলে । শান্ত ছলকে উঠলো…
” রাফি ? আর ইউ ওকে ?
শান্ত রাফির সম্মুখে বসলো । রাফি কে টেনে তোলার চেষ্টা করলো । ভেজা চোখে হেসে উঠলো রাফি । দুহাতে মুখ ঢেকে আহহ্ সূচক উচ্চ বাক্য উচ্চারণ করলো । মস্তিষ্ক ফেটে যাচ্ছে ওর । বুকের ভেতর কেউ যেন হাতুড়ির বাড়ি মারছে ঠকঠক করে । কাঁপছে ওর পুরো শরির । শান্ত বিচলিত হয়ে পড়লো..
” এই রাফি ,, কি হলো তোর ? কি হয়েছে , এমন করছিস কেনো ?
রাফি চোখ মুখ থেকে হাত সরালো । মুখে কথা ফুটছে না ওর । ও হাঁসফাঁস করছে শুধু । ইশারায় বোঝাচ্ছে কিছু ।
ভালো মতো মুখ খুলে কিছু বলার আগেই রুহি ডাকলো …
” ভাইয়া ,, পাখির জ্ঞান ফিরেছে । এই দেখো , হাত নড়ছে ওর !
তড়িতে তাকালো রাফি । ডাক্তার এগিয়ে আসলেন । মিহির বাম হাত নড়ছে । শরীরের সচলতা ফিরে এসেছে । চোখ খোলার চেষ্টা করছে ও । ডাক্তার তড়িঘড়ি করে পাল্স রেট চেক করলেন ওর । সব নর্মাল । তিনি ডাকলেন ধীর কন্ঠে একটু ঝুঁকে…

” মিস. মিহি । শুনতে পারছেন আমায় ? চোখ খুলুন আপনি । ধীরে ধীরে খোলার চেষ্টা করুন চোখ দুটো । আর ইউ হেয়ার মি..
মিহি ভ্রু উচালো । পিটপিট করে মেলার চেষ্টা করলো অক্ষি যুগল‌‌‌ । ঝাপসা চোখ খুলেই সামনে চোখে পড়লো রুহির মুখখানা । রুহি ডাকলো নিভু স্বরে..
” পাখি …?
পুরোপুরি চোখ খুলতে সময় লাগলো মেয়েটার । ডাক্তার সরে দাঁড়াতেই হুড়মুড়িয়ে আসলো রাফি । মেয়েটার অর্ধ জ্ঞান শূন্য শরীর খানা একটানে টেনে তুললো । দুহাতে জাপটে ধরলো মিহি কে । নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে । আচমকা টানে মাথা থেকে পুরো শরীর ঝাঁকুনি উঠলো মিহির । চক্কর দিয়ে উঠলো মাথা । রাফির তীব্র জোড়ালো হৃৎস্পন্দন স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে শূন্য জ্ঞানেই । রাফি ওকে জড়িয়েই গলার কাছে মুখ গুজে ফিসফিস করলো….
” আমার মিফতাহুল….
আমাদের মিফতাহুল ! মিহি নয় মিফতাহুল । আমার ছোট্ট পরী । মিফতাহুল…
ওর বিড়বিড় করা কথা গুলো মিহির কানে পৌঁছালো কি না কে জানে । তবে রুহি আর শান্তর কানে ঠিক পৌঁছেছে । ছলকে উঠলো দু’জনেই । সাথে সাথে তাকালো একে অপরের দিকে । অবাক বৃহৎ দৃষ্টি দুজনের । শান্ত মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজ গুলো হাতে তুললো । চোখ বোলাতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো সে ।
রাফি ওকে ছাড়ে নি এখনো ।
সাবিনা বেগম কে আনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে । তিনি পাগল প্রায় । মেয়ের অবস্থার কথা শুনে ছুটে এসেছেন । পিছু পিছু আমান । রাফির কথায় সেই নিয়ে এসেছে তাকে । সাবিনা বেগম কেবিনের বাইরে পুরো চৌধুরী বাড়ির সবাই কে দেখে থমকালেন কিছু মূহূর্ত । কেঁপে উঠলো তার মাতৃ ভীত সত্ত্বা । ঢোক গিললেন তিনি । সবাইকে উপেক্ষা করে কেবিনে ঢুকলেন তড়িঘড়ি করে । কেবিনের ভেতরের দৃশ্য দেখে আরো একবার থমকালেন । এবার বোধহয় শ্বাস আটকে আসলো তার । তিনি অস্ফুটে ডাকলেন….

” মিহি…
চকিতে ফিরলো ভেতরের সবাই । রাফি মিহি কে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেই ভেজা চোখে পিছু ফিরলো । ছুটে গেলেন সাবিনা বেগম । রাফির থেকে জোর দেখিয়ে মিহি কে ছাড়ালেন তিনি । মেয়েকে জড়ালেন নিজের বুকে । কেঁদে উঠলেন হাউমাউ করে..
” মিহি ,, মা আমার , কি হয়েছিল তোর ? কি করে হলো এমন অবস্থা ? কে করেছে তোর এমন অবস্থা ?
মিহির অস্ফুট স্বর এতক্ষণে..
” আম্মু !!
আরো জোরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন সাবিনা বেগম । বুক খানা কাঁপছে তার । শূন্য লাগছে বুকের ভেতর । তিনি মিহি কে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন । ছাড়বেন না আর । ছাড়লেই ওরা মিহি কে কেড়ে নিয়ে যাবে তার থেকে । আওড়ালেন সাবিনা বেগম..
” তোর আম্মু আমি ! তুই আমার মেয়ে । তোকে কোত্থাও যেতে দেবো না আমি । কেউ তোকে কেড়ে নিয়ে যেতে পারবে না আমার থেকে । তুই আমার মেয়ে..
ডাক্তার বাঁধ সাধলেন এবার….
” প্লিজ ! এতো জোরে কথা বলবেন না এখানে । পেসেন্টের সবে জ্ঞান ফিরেছে । তাকে স্ট্রেস দেবেন না । ছেড়ে দিন ওনাকে ।
সাবিনা বেগম ছাড়লেন না ।
বাইরে থেকে উচ্চ শব্দে চিৎকার শুনে সবাই ভেতরে ঢুকলো । মিহির জ্ঞান ফিরেছে দেখে খুশিতে গদগদ হয়ে এগিয়ে আসলেন রাবেয়া চৌধুরী..

” এই মেয়ে , উঠেছিস তুই ? জ্ঞান ফিরেছে তোর ? এই দেখ আমি এসেছি , চিনতে পেরেছিস আমায় ? আমি কিন্তু তোকে চিনেছি দেখ…
” আসবেন না আমার মেয়ের কাছে । দূরে যান সবাই । ও আমার মেয়ে । কেউ আসবেন না ওর কাছে । ও ছাড়া কেউ নেই আমার । দয়া করে ওকে কেড়ে নেবেন না আমার থেকে , ও আমার সব । আমি বেঁচে আছি শুধু ওর জন্যই । আমার বাঁচার আশা ও ,, ওকে কেড়ে নেবেন না আপনারা…
সাবিনা বেগমের আকস্মিক এমন এলোমেলো কথার মানে কেউ বুঝলো না । তিনি কেঁদে কেঁদে আহাজারি করছেন । ডাক্তার ফের বারন করলেন উচ্চ স্বরে কথা না বলতে । সাবিনা বেগমের কানে ঢুকলো না ।
তিনি বিচলিত হয়ে মেয়ে কে জড়িয়ে একই কথা আওড়াচ্ছেন বারবার । রাফি শান্ত চোখে চেয়ে দেখলো তাকে । শেষ মেষ সে উঠলো । মিহি কে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো তার থেকে । সাবিনা বেগম ঝটকা মারলেন রাফির হাত ।
” দূরে যাও…
কেউ কাছে আসবে না আমাদের । আমার মেয়ে কে কাউকে দেবো না আমি । ও শুধু আমার….
রাফির রুদ্ধ স্বরে শান্ত কন্ঠ…
” আন্টি । ও আপনার , ওকে কেউ কেড়ে নেবে না আপনার থেকে । আপনি বোঝার চেষ্টা করুন , মিহি অসুস্থ । ওর কাছে এতো হইচই করা ঠিক হবে না । আপনি দেখুন , বাইরে চলুন । ডাক্তার দেখবে মিহি কে । আপনি চলুন আমার সাথে । মিহির কিচ্ছু হবে না আই প্রমিস ।
সাবিনা বেগম বোধহয় শান্ত হলেন একটু । সবাই অবাক লোচনে তাকিয়ে । কেউ বুঝতে পারছে না কিছু ।
সময় নিয়ে সাবিনা বেগম সহ বাকিদের নিয়ে শান্ত বেরিয়ে আসলো কেবিন থেকে । রাফি বেরোনোর আগে এক পলক মিহির দিকে তাকালো । নিজেকে সংযত করতে ব্যর্থ হয়ে ডাক্তারের সামনেই চুমু আঁকলো মিহির কপালে । শীতল কন্ঠে বলল…

” আমি আসছি জান….একটু অপেক্ষা করো । ডোন্ট প্যানিক ওকে ? ডাক্তার আছেন এখানে । উনি তোমার চেকআপ করবেন ।
ফিরে এসে কথা বলি ?
আ..আই লাভ ইউ… একটু সময়ের জন্য এই চার দেয়ালের মাঝে একটু অপেক্ষা করো আমার জন্য । আমি আসছি….
দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসবো আই প্রমিস । ওকে !
মিহি বিমূক হয়ে ঘাড় কাত করলো । রাফি আরো একবার চুমু খেলো ওকে । ডাক্তার অবাক নেত্রে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে । কিসব হচ্ছে তার সামনে ! গলা খাঁকারি দিলেন তিনি । রাফি উঠে তার উদ্দেশ্যে বললো….
” টেক কেয়ার হার…
বলেই বেরিয়ে গেল সে । কেবিনের বাইরে অশান্ত সাবিনা বেগম । হেনা বেগম তার সাথে কথা বলার চেষ্টায় ব্যস্ত । কিন্তু তিনি কারোর কথা শুনতে রাজি নন ।
রাফি ডাকলো শান্ত কন্ঠে…

” আন্টি ?
তৎক্ষণাৎ স্থির সাবিনা বেগম । বুক খানা কেঁপে উঠলো তার । পিছনে পেছাতে পেছাতে বসে পড়লেন চেয়ারে । রাফি এগোলো । হাঁটু মুড়ে বসলো তার সম্মুখে । সাবিনা বেগম বাচ্চাদের ন্যায় ঠোঁট উল্টালেন । গলায় এসে কান্না আটকে গেছে । তিনি না পারছেন চিৎকার করে কাঁদতে আর না পারছেন নিজেকে আটকাতে । রাফি সাবিনা বেগমের হাত দুখানা কাঁপা হাতে ধরলো । কপাল কুঁচকালেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । ছেলের মতি গতি অদ্ভুত ।
রাফি থেমে হিমশীতল কন্ঠে বললো….
” মিহি কে দূরে সরাবো না আপনার থেকে ! শুধু একবার বলুন ও কে ? ওর আসল পরিচয় কি ? শুধু শুনতে চাই আমি আপনার মুখে….
ছলকে উঠলেন সাবিনা বেগম । রাফির থেকে হাত ছাড়ালেন নিজের ।
রাফি আবার বললো… এবার থেমে থেমে কম্পিত কন্ঠে…

” আন্টি ,, আপনি তো সব জানেন ! একবার বলুন,,ও আমাদের মিফতাহুল তাই না ?
রাফির মুখ থেকে সম্পূর্ণ কথা বেরিয়েছে কি বেরোয় নি , চৌধুরী বাড়ির সবার মাঝে বাজ পড়ল এতেই । ছলকে উঠলো সবাই । একই সাথে সবাই কানে ভুল শুনলো বোধহয় । সাবিনা বেগম কেঁদে উঠলেন ঠোঁট ভেঙে ।
” আন্টি প্লিজ ,, কাঁদবেন না আপনি । আমি সত্যিই বলছি , মিহি আপনার থাকবে । ওকে কেউ আলাদা করবে না আপনার থেকে । আপনি শুধু একবার বলুন ও আমাদের মিফতাহুল । আমি শুনতে চাই আপনার মুখে ….
” রাফি কি সব বলছিস তুই , মাথা ঠিক আছে তোর ? মিহি মিফতাহুল মানে ? ও কি করে মিফতাহুল হয়‌ !
হেনা বেগমের অবিশ্বাস্য কাঁপা স্বর । তিনি থামতেই রাবেয়া চৌধুরী বাচ্চা সুলভ আচরণে হতবাক হয়েই এগিয়ে আসলেন । মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসলেন রাফির পাশে । রাফির হাত টেনে বললেন…
” রাফি ,, কি বলছিস ? আমার মিফতাহুল ? আমার মিফতাহুল কোথায় ? ওকে বাড়িতে ফেলে এসেছি আমি । ওর কাছে নিয়ে চল আমায় , আমার মেয়ের কাছে যাবো আমি । নিয়ে চল আমায় ….
রাফি এখনো সাবিনা বেগমের পানে তাকিয়ে । সে আবার বললো…

” দেখেছেন আন্টি , মিফতাহুলের মা ! আর আপনি আম্মু । নিজের মেয়ে কে হারিয়ে ওনার কি অবস্থা আজ । আমি চাই না আর কারোর এমন অবস্থা হোক । আপনার তো একেবারেই না । আপনি বলুন সবটা…
মিহি কোত্থাও যাবে না আপনার থেকে । আমি জানি সব , কিন্তু আপনার মুখে শুনতে চাই । কে মিহি ?
সাবিনা বেগম কান্না রত কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন….
” আমি জানি না ও কে ! আমি শুধু জানি ও আমার মেয়ে ! আর আমার সবকিছু ও । ওকে ছাড়া বাঁচব না আমি ।
” ওকে নিয়েই বাঁচবেন আপনি । ওকে ছাড়া বাঁচতে হবে না আপনাকে….
বলুন আন্টি…
ফুঁপিয়ে উঠলেন সাবিনা বেগম । আর চেপে রাখার মতো কিছু নেই । গত ষোলো বছর চাপা ছিল সব । আজমাল হোসেন ঠিক বলেছিলেন , সত্য কখনো চাপা থাকে না । পৃথিবীটা গোল , ঘুরে ফিরে সাবিনা বেগম আবার একই অবস্থার সম্মুখীন হলেন । কিন্তু আজ একা । আজ আজমাল হোসেন নেই তার সাথে । কে সামলাবে তাকে ?
ডুকরে উঠলেন সাবিনা বেগম । দুহাতে কান চেপে ধরলেন । সত্য বলতে গলা কাঁপল । বুক ফেটে যাওয়া আর্তনাদ বেরিয়ে আসলো ।

” সব যখন জানো , তখন আর কি শুনতে চাও আমার থেকে ?
মিহি আমার মেয়ে নয় এটা ? শোনো তাহলে , মিহি কেউ নয় আমার ? ও আমার মেয়ে নয় । ও অন্য কেউ ! বন্ধ্যা আমি । আমি কারোর মা হতে পারি নি কোনো দিন । কেউ নেই আমার । আমি কারোর মা নোই । মিহি আমার সন্তান নয় । ওকে তো কুড়িয়ে পেয়েছিলাম আমরা….
কথা শেষ করে ডুকরে উঠলেন । চোখ নামালো রাফি । বিন্দু বিন্দু অশ্রু কণা টপ করে ঝরে পড়লো মেঝেতে । সবাই অবাক , বিস্মিত । সাবিনা বেগম থামলেন । থেমে সামলালেন নিজেকে । আজ তো তাকে সামলানোর কেউ নেই । তাই নিজেই নিজেকে সামলাতে হচ্ছে । নিজের কপালের উপর আজ হাসতে ইচ্ছে করছে সাবিনা বেগমের । তিনি হাসলেন । বললেন….

” শুনেছো রাফি , মিহি আমার মেয়ে নয় । ও তোমাদের মিফতাহুল ।
সেদিন একটা ফুটফুটে ছোট্ট বাচ্চা কে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম আমরা । কিন্তু স্বার্থপর তো আমি , তাই নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করেছি । পালিয়ে গেছি ওকে নিয়ে । কেনো জানো , কারন ও মা ডেকেছিল আমায় । আটটা বছর , মা ডাক শোনার জন্য ছটফট করেছি আমি । আর ও আমার সেই ছটফটানি কমিয়ে মা ডাকলো আমায় । ছোট্ট ছোট্ট ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে মা ডেকেছিল ও আমায় । কি করবো বলো , আমি তো কারোর মা হতে পারি নি ।
যখন জানলাম ওখানকার এক্সিডেন্টে গাড়ির সবাই মারা গেছে , ওর মা বাবা মারা গেছে , তখন আর ওকে ছাড়ি নি । কিন্তু বিশ্বাস করো আমরা খোঁজ নিয়েছিলাম , উনি তো খোঁজ নিয়েছিলেন, মিহি কে ফিরিয়ে দিতেও চেয়েছিলেন । কিন্তু পারেন নি । পারেন নি উনি ফিরিয়ে দিতে ।
আবার একই ভাবে কেঁদে উঠলেন সাবিনা বেগম । সবাই স্তব্ধ , নিশ্চুপ । হেনা বেগমের চোখ থেকে পানি গড়াচ্ছে অনবরত । সাবিনা বেগম আবার বললেন… এবার তার কন্ঠস্বর হতাশ….

এক দেখায় পর্ব ৪৫

” ওকে নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছিলাম আমরা । কিন্তু দেখো , ভাগ্য আমাদের আবার ফিরিয়ে আনলো । ফিরে এসে এবার এক জন কে হারালাম । আবার পালালাম , আবার ফিরে আসলাম । এবার আর এক জনকেও হারালাম । আমার আর কিচ্ছু রইলো না । নিঃস্ব আমি । কেউ নেই আমার আর । ও আমার নয় , ও তোমাদের । ওকে নিয়ে যাও তোমরা । নিয়ে যাও । ওকে বলে দিও আমি ওর আম্মু নোই, আমি স্বার্থান্বেষী একজন । যে ওকে নিজের স্বার্থে চেয়েছিলাম । মা হতে চেয়েছিলাম ওর । কিন্তু আমি তো মা নোই , গর্ভে ধরি নি তো ওকে । ওকে নিয়ে যাও তোমরা । আমার আর কাউকে চাই না । আমি আর কারোর মিছে মা হতে চাই না ।
” আম্মু……

এক দেখায় পর্ব ৪৭