Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৪৭

এক দেখায় পর্ব ৪৭

এক দেখায় পর্ব ৪৭
সুরভী আক্তার

কেবিনের দরজার কাছে মিহি । দরজায় হেলে পড়ে কোনো রকমে নিজের ভার ধরে রেখেছে । হালকা ছিপছিপে শরীরটার অবস্থা যাচ্ছে-তাই । ঢিলেঢালা নীলচে হসপিটালের পেসেন্ট পোশাক পড়নে । মাথার বেনি টা একেবারে এলোমেলো । চোখ মুখ শুকনো ফ্যাকাশে । কোমরে মোটা ব্যান্ডেজ । ব্যাথায় জর্জরিত পুরো শরীর । দাঁড়িয়ে থাকার মতো কষ্ট এই মুহূর্তে আর কোনো কিছুতে নেই । হাতের উপরি পিঠে এখনো ক্যানুলা । মিহি কে আটকাতে পারেননি ডাক্তার । সাবিনা বেগমের উচ্চ স্বরের তীব্র কান্নার শব্দে ছুটে বেরিয়েছে মিহি । ওর জন্য,ওর অবস্থার জন্য ওর আম্মু কাঁদছে , ও থাকতে পারে কি করে । যেটুকু জ্ঞান শূন্য ছিল , আম্মুর কান্নার শব্দে সেটুকু ফিরে এসেছে পুরোপুরি । নিজের ব্যাথা তুর অচল শরীর টাকে কোনো রকমে টেনে ডাক্তার কে ছাড়িয়ে ধড়ফড়িয়ে বেরিয়েছে মিহি । শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণ । দরজার কাছে থেমে আর এগোতে পারে নি । সাবিনা বেগমের দু একটা কথা কানে পৌঁছেছে । তবে বোধগম্য হয় নি । শুধু বোধগম্য হয়েছে তার আম্মুর কান্না ।
দরজার কাছেও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না মিহি । হেলে থাকা শরীরটা ধরে রাখতে পারলো না । পড়লো ধপ করে । তীব্র যন্ত্রণায় কোমর চেপে কুঁকড়ে উঠলো ।
আঁতকে উঠলো উপস্থিত সবাই । ডাক্তার ওকে সামলাতে পারেন নি । তিনিও পিছু পিছু বেরিয়েছেন ।
মিহি ওভাবে পড়তেই সাবিনা বেগম কে ছেড়ে ছ্যাত করে উঠলো রাফি ।

” মিহি..!
ছুটে গেলো ও মিহির নিকট । দুহাতে আগলে নিলো ওকে । মিহির হাঁসফাঁস নিভু কন্ঠ স্বর…
” আম্মু কাঁদছে কেনো ?
আম্মু ! কিচ্ছু হয়নি আমার ! এই দেখো আমি ঠিক আছি । কেঁদো না প্লিজ ! আমি ঠিক আছি আম্মু …
সাবিনা বেগম চোখ সরিয়ে কেঁদে উঠলেন । রাফি তেঁতে উঠলো ডাক্তারের উপর….
” ও এই অবস্থায় বাইরে আসলো কি করে ? আপনাকে তো বলেছিলাম ওকে দেখে রাখতে ।
” ছাড়ুন আমায় ! আমার কিচ্ছু হয় নি । আমার আম্মু কাঁদছে কেনো ?
আম্মু , কাছে এসো আমার । আমি ঠিক আছি বললাম তো । কাঁদছো কেনো তুমি ?
ব্যাথা তুর আওয়াজ মিহির । সাবিনা বেগম তাকালেন না তবুও ।
রাফি শান্তনা দিলো…
” মিহি , রিল্যাক্স প্লিজ ! আন্টি কাঁদছে না তো । তোমাকে এই অবস্থায় দেখে শকড হয়েছেন একটু । আর কাঁদবেন না উনি । তুমি প্যানিক করো না প্লিজ ।

” আম্মু কে আমার কাছে আসতে বলুন না , আমার খুব কষ্ট হচ্ছে । কোমরে ব্যথা হচ্ছে ভীষণ । আমার আম্মু কে কাঁদতে বারন করুন প্লিজ । আব্বু চলে যাওয়ার পর তো আম্মু আর কোনো দিন কাঁদে নি , আজ কেনো কাঁদছে ? আমি তো চলে যাবো না আম্মু কে ছেড়ে । আমি মরবো না এখন…
” মিহি , মুখ সামলে । খবরদার মরার কথা বলবে না । বলছি তো আন্টি আর কাঁদবেন না…
রাফির চড়া কন্ঠ । মিহির সাথে সাথে চমকে উঠলো সবাই । ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেললো মিহি..
” আবার বকছেন আমায় । আমার কষ্ট হচ্ছে । আমার আম্মু কে আমার কাছে আসতে বলুন । আম্মু আমার কাছে এসো প্লিজ…
সাবিনা বেগম উঠে দাঁড়ালেন । চোখের পানি হাতের পিঠে মুছে বিপরীতে হাঁটা লাগালেন তড়িঘড়ি করে । আম্মু কে উল্টো পথে হাঁটতে দেখে কান্না চেপে ডাকলো মিহি..
” আম্মু । আমি এখানে… ওদিকে কোথায় যাচ্ছো তুমি ..?
থামলেন সাবিনা বেগম । রাফি সহ চৌধুরী বাড়ির সবাই তার দিকেই চেয়ে । তিনি কান্না গিললেন রুদ্ধ গলায় । বললেন এলোমেলো স্বরে….

” আমি তোর আম্মু নই । আমি কেউ নই তোর ! তুই যাদের , তাদের কাছেই আছিস তুই ! তোর মায়ের কাছে যাস , উনি পাগল হয়ে গেছেন তোর জন্য । আমি তোর কেউ নই , কেউ নই , কেউ না….
আমি নিঃস্ব ,, অভাগা ,তোর কেউ নই , আর আমার কেউ নেই । কেউ নেই আমার । সন্তান নেই আমার , স্বামী নেই । সব হারিয়েছি আমি । তুই নোস আমার….
বলতে বলতে পেছাতে লাগলেন তিনি । চোখের পানি গাল বেয়ে গড়ালো ঠিকি । তবে কিছু বুঝলো না মিহি । কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল আম্মুর দিকে । ঢোক গিলতে গিয়ে অনুভব করলো গলায় কেমন তেতো স্বাদ অনুভুত হচ্ছে । শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । রাফি চোখ বুজলো সাবিনা বেগমের কথায় ।
মিহি বললো অবিশ্বাস্য হয়ে….
” আম্মু , কি বলছো এসব…?
” ডাকবি না আমায় আম্মু । তোর মুখে আম্মু ডাক শোনার অধিকার নেই আমার । কোনো যোগ্যতা নেই । আমি কারোর মা নোই ।
ঐ দেখ , বসে আছে তোর মা । উনি তোর মা ‌। বলেছিলি না একদিন , ওনার গায়ে মা মা গন্ধ আছে । মা তো উনি , মায়ের গায়ে তো মা মা গন্ধ থাকবেই । বুঝলি , দেখে নে তোর মাকে । উনিই তোর মা । আমি তোকে চুরি করেছিলাম ওনার থেকে , বুঝলি ? তোকে নিয়ে পালিয়ে গেছিলাম । কিন্তু লাভ হলো না , ওনারা খুঁজে নিয়েছেন তোকে । চলে যা ওনাদের সাথে । চেয়েছিলি তো একটা যৌথ সুখি পরিবার । আছে তোর সুখি যৌথ পরিবার ।
এই দেখ , কতো গুলো মানুষ তোর পরিবারে ! তাদের সাথে থাকিস , কেমন ? ভালো থাকিস , হ্যাঁ ? আমি যাই …
আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিস , এতো গুলো বছর তোকে তোর পরিবার থেকে দূরে রেখেছি , ক্ষমা করে দিস আমায় ।
বলতে বলতে কন্ঠ স্বর ক্ষিন হয়ে আসলো । পিছিয়েই যাচ্ছেন তিনি । সবাই বিমূর্ত । কারোর মুখে কথা আসছে না । কেউ কিছু বুঝে উঠতেই পারছে না এখনো ।
মিহি সরু চোখে তাকিয়ে । আম্মুর দিক থেকে চোখ সরিয়ে চোখে পলক ফেলে সে একে একে সবার দিকে তাকালো । সাবিনা বেগম কে পেছাতে দেখে শ্বাস টেনে বললো শীতল কন্ঠে…

” আম্মু , কিসব বলছো তুমি ? ওভাবে পেছাচ্ছো কেনো ? পড়ে যাবে তো ? দেখো আমার কষ্ট হচ্ছে না আর । রেগে আছো আমার উপর তাই না ? তোমার কথা রাখিনি আমি ! এবার রাখবো সত্যিই বলছি । কারোর সাথে সম্পর্ক রাখবো না আর । কথা বলবো না কারোর সাথে ।
রুহির সাথেও কথা বলবো না । তুমি যা বলবে তাই শুনবো । প্লিজ আমার কাছে এসো । একবার জড়িয়ে ধরো আমায় । তোমার মিহি কথা দিচ্ছে , আর সে কারোর সাথে সম্পর্ক রাখবে না ।
” তুই আমার মিহি নোস রে । তুই ওদের মিফতাহুল । ওদের সন্তান তুই ।
” আম্মু ….!
কেঁপে উঠে জোরে শ্বাস টানলো মিহি । এবার রাফির দিকে ফিরলো । দুহাতে আকড়ে ধরলো ওকে । ঝাঁপসা চোখে চেয়ে ফিকড়ে কেঁদে উঠলো….
” দেখুন না আম্মু কি সব বলছে ? আপনি তো বলেছিলেন আম্মু কে মানাবেন ! প্লিজ মানিয়ে নিন আম্মু কে । নয়তো বলুন , আমি আর তার কথার অবাধ্য হবো না । মেনে নেবো সব কথা । যা বলবে তাই শুনবো । আপনাদের সাথেও সম্পর্ক রাখবো না ।
প্লিজ মানিয়ে নিন আম্মু কে । আমার কাছে আসতে বলুন ওনাকে । কাঁদতে বারন করুন । প্লিজ ….
রাফি মিহি কে চেপে ধরলো বুকের সাথে । সাবিনা বেগমের দিকে তাকালো ,হতাশ করুন হলো কন্ঠ স্বর…
” আন্টি প্লিজ ,, মিহির অবস্থা দেখুন । ওর এই অবস্থায় আর এমন করবেন না প্লিজ । সবটা পরে হবে । ওর এখন আপনাকে প্রয়োজন ।
সাবিনা বেগম দাঁড়িয়েছেন ।
” আমি আর যাবো না ওর কাছে রাফি । যে দূর্বলতা টেনে বেড়ালাম , সেই দূর্বলতাই গুড়িয়ে গেলো আজ । ওকে বলছো না কেনো সত্যি টা । ও তো আমার কেউ নয় , আমার প্রয়োজন হবে না ওর ।
” আমি কিন্তু মরে যাবো এবার । বারবার কি বলছো তুমি ! আমি তোমার কেউ নই কেনো ? তুমি আমার আম্মু …
থেমে থেমে আধো স্বর মিহির ।

” না , আমি তোর মা নই । তোর মা , রাবেয়া চৌধুরী । তোর পরিবার চৌধুরী পরিবার । তুই চৌধুরী বাড়ির সন্তান ‌। আমি তো চোর , স্বার্থপর । তোকে নিজের সন্তান বলে চালিয়ে এসেছি এতো বছর ।
সত্যিই বলছি , বিশ্বাস কর । আমি কেউ নই তোর । জিজ্ঞেস করে দেখ সবাইকে , আজ সবাই জেনে গেলো, আমি কেউ নই তোর । তুই কেনো বাকি থাকবি ? শুনে নে তুই ও । মিফতাহুল তুই । মিহি নোস ।
মিহি কাঁপল । রাফির বক্ষ থেকে আলগা হলো
। ভেজা অক্ষি যুগল‌‌‌ মূর্ত । অবিশ্বাস্য চাহনি সাবিনা বেগমের পানে । ও চোখ তুললো রাফির দিকে । ওর চোখের প্রশ্নাত্মক চাহনি বুঝতে বাকি রইলো না রাফির । দম খিচে উপর নিচ মাথা নাড়ালো রাফি ।
এতেই ছলকে উঠলো মেয়েটা । নড়ে উঠলো পুরো চিত্ত । গলা, ঠোঁট, মুখ একেই আগে থেকে শুকিয়ে । অচল মস্তিষ্ক তীব্র যন্ত্রণায় কাতর । আরো বেশি কাতর হয়ে পড়লো । ধ্যান জ্ঞান শূন্য হয়ে আসলো । চারদিক কেমন এলোমেলো হয়ে গুলিয়ে আসলো । থম মেরে রইলো মিহি । মুহুর্তেই থমথমে নিস্তব্ধ পুরো হসপিটাল করিডোর ।
চোখে একটা বৃহৎ পলক পড়লো মিহির । শ্বাস টানলো বুক ভরে । পরের শ্বাস টানার আগেই আর দ্বিতীয় পলক পড়ার আগেই রাফির বুক থেকে আলগা হওয়া শরীর খানা আবারো টলে পড়লো রাফির বুকেই । পুরো শরীর গুঁড়িয়ে আসলো ।
আকস্মিক মিহির এমন জ্ঞান হারিয়ে টলে পড়াতে ধক্ করে উঠলো রাফি । চিৎকার করে উঠলো সে….

” মিহি ?? এই ….
ডাক্তার সহ নিস্তব্ধ সবাই ঝটকে উঠলো । কেঁপে উঠলো রুহি আর সাবিনা বেগম । সাবিনা বেগমের মাতৃ সত্ত্বা ছ্যাঁত করে উঠলো । পুরো শরীরে ঝটকা মেরে বিদ্যুৎ বয়ে গেল বোধহয় । তিনি সব ভুলে মুহুর্তেই ছুটে আসলেন মেয়ের কাছে ! রাফির বুকে থেকেই মিহি কে ঝাঁকাতে লাগলেন । ডাকলেন কম্পিত চিত্তে….
” মিহি ? মা ,, এই মা , দেখ । চোখ খোল ! কি হলো তোর আবার ?
ডাক্তার এবার সিরিয়াস ভাবে গুরুগম্ভীর হুংকার ছাড়লেন….
” আপনাদের কমনসেন্স নেই ? বারবার বললাম পেসেন্ট কে স্ট্রেস দেবেন না । উত্তেজিত করবেন না তাকে । ফ্যামিলি ড্রামা শুরু করেছেন আপনারা এখানে ?
পেসেন্ট আউট অফ ডেঞ্জার হলেও যেকোনো ট্রেসে ট্রমায় ডিসোলেট হতে পারেন উনি ।
রাফি ঝেড়ে উঠলো । মিহি কে কোলে তুলে বুলি ফুটালো….
” ডক্টর প্লিজ , দেখুন কি হয়েছে ওর । ওর যেন কিছু না হয় প্লিজ ।
সাবিনা বেগম কেঁদে উঠলেন পুনরায় । এবার চৌধুরী বাড়ির সবার মাঝেই আতংকের মাত্রা অধিক । যদিও তারা এখনো ঘোরের মাঝে । এলোমেলো এখনো সবকিছু । তবুও তাদের মেয়ে । তাদের মেয়ে কে ফিরে পেয়েছে তারা । সেই দিনের সেই দুর্ঘটনায় মিফতাহুল‌ মারা যায় নি । এজন্যই তারা কোনো চিহ্ন খুঁজে পায় নি । শত খোঁজর পরও মিফতাহুলের লাশ তো দূর , একটা চিহ্নও পাওয়া যায় নি ওর মৃত্যুর । ওর মৃত্যু তো ধারনা ছিল সবার । যে ধারনা আজ এতো বছর পর ভুল প্রমাণিত হলো ।

রাবেয়া চৌধুরী অবুঝের ন্যায় বিমূক হয়ে চাওয়া চাওয়ি করছেন একেক জনের দিকে । হেনা বেগম পিছিয়ে বসলেন চেয়ারে । বাকিরা সবাই ডাক্তারের পিছু পিছু ভড়কে আতংকে কেবিনের ভিতরে ঢুকেছে । হেনা বেগম কে ওভাবে দেখে হালিমা বেগম থেমে গেলেন । তার কাছে আসলেন তিনি । যখন ষোলো বছর আগে সেই দূর্ঘটনা ঘটেছিল তখন তিনি চৌধুরী বাড়ির বউ ছিলেন না । তখন ও বিয়ে হয় নি তার আর জুবায়ের চৌধুরীর । পরবর্তীতে চৌধুরী বাড়ির বউ হয়ে আসার পর থেকে তিনি শুধু শুনেই গেছেন সেই দিনের বিভৎস ঘটনা টার কথা । শুনে গেছেন শরীফ চৌধুরী আর ছোট্ট মিফতাহুলের কথা ।
হালিমা বেগম হাঁটু মুড়ে সম্মুখে বসলেন হেনা বেগমের । তাকে ফোঁপাতে দেখে ডাকলেন…
” আপা ?
চোখ তুললেন হেনা বেগম ।

” মিফতাহুল বেঁচে আছে আপা ? মিহিই মিফতাহুল ?
কন্ঠে অবিশ্বাস । হেনা ফুঁপিয়ে উঠলেন । তার কন্ঠেও একই অবিশ্বাস…..
” জানি না রে , কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি । মিফতাহুল বেঁচে আছে । মিহিই আমাদের মিফতাহুল ! ও আমাদের মেয়ে ! কিচ্ছু হয়নি ওর ‌। এজন্যই রাফি ওর জন্য এতটা ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিল । ও আমাদের মেয়ে বলে ?
ও ওর সেই ছোট্ট পরী বলে ? আমাদের মেয়ে টার কিচ্ছু হয়নি । বেঁচে আছে ও !
বলতে বলতে ভেজা চোখ সমেত হেসে ফেললেন হেনা বেগম ।
কেবিনের ভেতরে চৌধুরী বাড়ির সবার ভিড় দেখে বিরক্ত হলেন ডাক্তার । সিস্টার’রা হিমশিম উপস্থিত মুহুর্ত সামলাতে । সিস্টার ইনজেকশন রেডি করে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে দিতেই ডাক্তার পিছু ফিরে ভরাট কন্ঠে বললেন….

” আপনারা সবাই বাইরে যান প্লিজ । এখানে বেশি ভিড় করবেন না ।
মুহুর্ত কয়েক বাদ অবস্থা বুঝে বেরোলো সবাই । সাবিনা বেগম কে কোনো রকমে বের করা হলো । বাইরে এসে কান্না থামালেন তিনি । চুপ হয়ে গেলেন আচমকা । কান্না গিলে নিস্তব্ধ হয়ে বসে পড়লেন ।
রাফি বেরোয় নি শুধু । সে ওখানেই মিহির মাথার পাশে ঝুঁকে বিচলিত হয়ে চেয়ে আছে । ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করতেই খানিক ঝাঁকা দিয়ে উঠলো মিহির শরীর টা । ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ল আরো । রাফি ডাক্তারের পানে চাইতেই তিনি আশ্বস্ত করলেন । কিচ্ছু হবে না মিহির । অতিরিক্ত প্যানিক আর ব্যাথার চোটে জ্ঞান হারিয়েছে সে ।
রাফি বাইরে আসলো মিহি কে রেখে । বাইরে গুমোট পরিস্থিতি । সাবিনা বেগম নেতিয়ে পড়ে আছেন এক দৃষ্টে কোনো এক দিকে চেয়ে । রাফি কারোর দিকে মনযোগ না দিয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসলো । দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বসলো তার পাশে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী সূক্ষ্ম নেত্রে ছেলে কে কিছু মুহূর্ত নীরবে পর্যবেক্ষণ করলেন । অতঃপর নীরবতা ভাঙলেন নরম কন্ঠে…

” রাফি ,, কিছু জানার আছে আমার । আমার নয় , আমাদের সবার !
রাফি চোখ তুলে চাইলো । প্রশ্ন করলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী…
” তুমি কি করে জানলে , মিহিই মিফতাহুল ?
” ডিএনএ রিপোর্ট ।
” ডিএনএ টেস্ট এখানে কোথা থেকে আসলো ?
” ডক্টর কে জিজ্ঞেস করুন । তিনি ব্লাড স্যাম্পল থেকে কি কি টেস্ট করেছেন করেন নি , কিসের কিসের প্রয়োজন হয়েছে হয়নি , আমি কি করে জানবো ?
আর এমনিতেও আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল মিহি কে ! আমি তো সেদিন দেখেছিলাম ওর বার্থ মার্ক ! ওর গলার নিচে ওর বার্থ মার্ক আছে । সেদিন আমি দেখেও কিছু বুঝি নি । ধারনাই করতে পারি নি আমি ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী ভ্রু গুটালেন । রাফি আনমনে কথাটা বলেছে বুঝতে বাকি নেই । মিফতাহুলের গলার নিচে ছোট একটা জন্ম দাগ ছিলো । জন্মের দাগ মোছে না কখনো । মিফতাহুলের জন্মের পরিচয় ওর সেই জন্ম দাগই বহন করে । মিহিই যদি মিফতাহুল হয় , তাহলে ওর শরীরেও সেই জন্মদাগ আছে নিশ্চয়ই । তবে প্রশ্ন হলো , রাফি সেই দাগ দেখলো কি করে ?
গলা ঝাড়লেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । নিচু স্বরে শুধালেন, কম্পিত কন্ঠে খানিক অবিশ্বাস ….

” মিহিই সত্যিই আমাদের মিফতাহুল ?
হাসলেন সাবিনা বেগম । রাফি কিছু বলার আগেই মুখ খুললেন সাবিনা বেগম…
” এখনো অবিশ্বাস আছে আপনাদের ? মিহি তো আমার মেয়ে নয় । আর ও যে আপনাদের মেয়ে , এটা ঢাকায় আসার পর জানতে পেরেছিলাম আমরা । আমি স্বার্থপর , কিন্তু আমার স্বামী স্বার্থপর ছিলেন না বিশ্বাস করুন । তাকে দোষারোপ করবেন না । তাকে ক্ষমা করবেন দয়া করে ।
ষোলো বছর আগে এক্সিডেন্ট স্পটে জানতে পেরেছিলাম , যাদের এক্সিডেন্ট হয়েছিল তারা শহরের অনেক নামি দামি মানুষ । কিন্তু এক্সিডেন্টের পর নাকি গাড়ির কেউ বেঁচে ছিল না । মা বাবা কেউই বেঁচে ছিলো না সেই ছোট্ট বাচ্চাটার । তাইতো ওর মা বাবা হয়েছিলাম আমরা । ও ওর মা বাবা কে হারিয়ে আমাদের কাছে আসলো , আর আমরা পেলাম একটা মিষ্টি সন্তান কে । খুব মায়া লেগেছিলো জানেন ? তাইতো আপনাদের কাছে ফিরিয়ে দেই নি ওকে । পালিয়ে গেছিলাম ওকে নিয়ে , যদি কেড়ে নেন ,তাই ! কিন্তু লাভ হলো না । আবার আসলাম এই অভাবের শহরে । যে শহর কিচ্ছু দেয় নি আমায় । শুধু কেড়েই নিয়েছে সব । প্রথমে বাড়ি ছাড়লাম , তারপর শহর । ফিরে আসলাম আবার । এসে জানতে পারলাম আপনাদের বিষয়ে । মিহি জড়ালো রুহির সাথে । রক্তের সম্পর্ক আছে তো একটা , টান তো থাকবেই । মিহি যখন আপনাদের সম্পর্কে বললো তখন ওর পালিত বাবা মানে আমার স্বামী , খোঁজ করেছিল আপনাদের সম্পর্কে । যখন জানতে পারলো , আপনারাই তারা , আর মিহির আসল মা বেঁচে আছে যিনি এখন তার মেয়ের শোকে মুহ্যমান – মানসিক রোগী । তখন উনি সব জানাতে চেয়েছিলেন আপনাদের । ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আপনাদের মেয়ে কে আপনাদের কাছে । কিন্তু এখানেও স্বার্থপরতা করেছি আমি । কিচ্ছু বলতে দেই নি তাকে । মিহি তো সব বলুন , আপনাদের তো অনেকেই আছে , কিন্তু আমার তো কেউ নেই । মিহি কে হারাতে চাই নি আমি ।

তার পর আর কি , যে দুটো শিকড়কে আঁকড়ে বেঁচে ছিলাম সেই দুটোর মধ্যে একটা শিকড় ছিঁড়ে গেলো । উনি আচমকা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে । মিহি ছাড়া তো আমার আর কেউ রইলো না বলুন ? ওকে হারাই কি করে ? তাই আবার শহর ছাড়লাম , চলে গেলাম অনেক দূরে ।
কিন্তু কি হলো ? আমি সেই একাই হয়ে গেলাম । সবাইকে হারালাম ।
সাবিনা বেগম কোনো রকমে কাঁপা গলায় কথা শেষ ফুঁপিয়ে উঠলেন ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী এগিয়ে আসলেন । ভেতর অশান্ত হলেও তার কন্ঠস্বর শান্ত….
” কাঁদবেন না আপনি ! কেউ হারাবে না আপনার থেকে । যাকে হারিয়েছেন তাকে তো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় । কিন্তু যে আছে তাকে হারিয়ে কাঁদতে হবে না আপনাকে । মিহি যেই হোক । সে আপনার মেয়ে হয়েই থাকবে । আপনাদের উপর অভিযোগ তুলতে একটুও হাত উঠলো না আমার, বিশ্বাস করুন , কোনো অভিযোগ নেই আপনাদের উপর । আমরা তো ভেবেছিলাম আমাদের মেয়ে নেই, তার মৃত্যু টাকে মেনে নিয়েছিলাম আমরা । কিন্তু সে যে জীবিত এটা তো জানতাম না । আজ জানলাম । আমরা ওকে সরাবো না আপনার থেকে ‌। বরং অনুরোধ করবো আপনার কাছে । আপনি ওকে আমাদের থেকে সরাবেন না আর , প্লিজ । আমরা আমাদের মেয়ে কে ফিরে পেতে চাই । আপনার থেকে দূরে সরিয়ে নয় । ও যতটা আমাদের , ঠিক ততটাই আপনার ও । আমরা ওকে যতটা চিনি না , যতটা না ওর উপর আমাদের মায়া , তার থেকে অধিক মায়া আপনার । আপনি ওকে আগলে বড় করেছেন । বাকি টা জীবন আমাদের কেও সুযোগ দিন ওকে আগলে রাখার । নিজেদের মেয়েকে কাছে পাওয়ার ।
” নিয়ে যান ওকে । আমি আর বাঁধা দেবো না । আমার যে অধিকার নেই ।
রাফি এবার সাবিনা বেগম কে নিজের দিকে ঘোরালো ‌। ওনার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হিমশীতল কন্ঠে বললো…

” আন্টি ,, মিহির উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার আপনার । আমরা তো বলছি আমরা ওকে দূরে সরাবো না আপনার থেকে । ও আপনার কাছেই, আপনার মেয়ে হয়েই থাকবে । আমরা কাড়বো না ওকে । শুধু ওর দায়িত্ব নেবো ‌। ওর দায়িত্ব দেবেন আমায় ?
আমাদের ? আমিও তো আপনার ছেলের মতোই , আমাকে বিশ্বাস করবেন না ? মিহি সুস্থ হোক , ওকে সবটা বুঝিয়ে বলবো আমরা । আপনি শুধু ওর সামনে আর কাঁদবেন না প্লিজ । ও আপনার মিহি হয়েই থাকবে । আর আপনারা থাকবেন আমাদের হয়ে…
” আমি কারোর বোঝা হতে চাই না বাবা । মিহি কে তোমরা নিয়ে যাও ।
” আপনি বোঝা হতে যাবেন কেনো ? বোন কি কখনো ভাইয়ের কাছে বোঝা হয় ? আমার তো একটাই বোন , আজ থেকে দুটো । আপনিও আমার বোন । আমার বোন আমার বাড়িতে থাকবে তার মেয়েকে নিয়ে । তার মেয়ে আমাদেরও মেয়ে ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর শান্ত বাক্যে দ্বয়ে চকিতে তাকালো সবাই । সাবিনা বেগমের ছলকানো দৃষ্টি বুঝে আলতো হাসলেন তিনি । আবার বললেন….

” আপনাদের কেউ নেই , আমাদের আপন বানালে খারাপ হয় না ! এতে আমাদের মেয়ে আমাদের ও থাকলো আর আপনার ও । ওকে তো দূরে সরাচ্ছি না আমরা । আপনি দূরে যেতে চাইছেন ওর থেকে । যেটা মিহি মেনে নিতে পারবে না । দূরে যাবেন না ওর থেকে । নিজের মেয়ে কে এতো গুলো বছর নিজের করে আগলে রাখলেন , এখন তাকে আমাদের কাছে রেখে যাবেন ? ভেবে দেখুন তো , মিহি মেনে নিতে পারবে এটা ?
সাবিনা বেগম চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে কেঁদে উঠলেন । রাফি মুচকি হাসলো । হেনা বেগম, হালিমা বেগমের ছলছল চোখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি । রুহি এতোক্ষণ নির্বেগ হয়ে ছিলো । সে এগিয়ে গিয়ে সাবিনা বেগমের পাশে বসলো । তাকে আলতো জড়িয়ে আদুরে গলায় বলল…
” আন্টি , আমার পাখি কে আর কষ্ট দেবেন না প্লিজ । ও আমার বোন হয় ! আপনি আর ও আমাদের সাথে থাকবেন বলুন ! আমরা অনেক আনন্দে থাকবো দেখবেন ।

রাত্রি আটটা । হসপিটাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে চৌধুরী বাড়ির সবাই । ক্লান্ত বিষন্ন শরীর নেতিয়ে সবার । তখনের পর মিহির জ্ঞান ফেরেনি এখনো । সাবিনা বেগম আসেন নি মেয়েকে একা রেখে । হসপিটালে একেই সকাল থেকে চৌধুরী বাড়ির সবার ভিড় ছিল । এখন আর নেই । নিস্তেজ হয়ে বাড়ি ফিরেছে সবাই । মিহি কে কমপক্ষে এক সপ্তাহ হসপিটাল থেকে ছাড়া হবে না । বাড়িতে সবার মাঝে যতটা চিন্তা ওকে নিয়ে , তার থেকেও অধিক উদ্বেগ নিজেদের হারানো মেয়েকে ফিরে পেয়ে । উদ্বেগ হীন , রাবেয়া চৌধুরী । তিনি তো বুঝলেনই না তার মেয়ে আছে ।
চৌধুরী বাড়িতে এখন আনন্দের জোয়ার নেমে আসবে , শুধু অপেক্ষা মিহির সুস্থতার । রুহি কেও বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে রাফি । অথচ সবার থেকে সে বেশি বিধ্বস্ত , ক্লান্ত । শরীর টা চলছে না আর । তবুও টেনে টুনে চালাচ্ছে । শান্তর ও একই অবস্থা । রাফি একটু সময়ের জন্য বাড়ি পাঠিয়েছে ওকে । ফ্রেশ হয়ে আসবে আবার । যদিও রাফি আসতে বারন করেছে , কিন্তু শান্ত তো শুনবে না ।

বাড়িতে এসে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে সবাই । রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিচে নামে নি । এতো সব কিছুর পর মাথা ধরেছে তার । হেনা বেগম তার জন্য কড়া করে এক কাপ চা করে নিয়ে ঘরে আসলেন । বিছানার ব্যাক বোর্ডে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে আছেন তিনি । সকালে একটা পাঞ্জাবি পড়নে ছিল । সেটা পাল্টে ফ্রেশ হয়েছেন । ঘর্মাক্ত পাঞ্জাবি টা সোফায় পড়ে আছে অবহেলিতের ন্যায় । হেনা বেগম তপ্ত শ্বাস ফেলে চায়ের কাপ এগিয়ে দিলেন । ডাকলেন মৃদু স্বরে । চকিতে চোখ খুললেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । চায়ের কাপ হাতে নিলেন । চুমুক বসালেন সাথে সাথে । হেনা বেগম হয়তো খচখচ করছেন কিছু বলার জন্য । কিন্তু পারছেন না । বুঝলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । মৃদু হেসে আলতো স্বরে বললেন….

” আমার অনুভূতি কেমন , জানতে চাইছো , তাই তো ?
অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়লেন হেনা বেগম । লেনিন হাসলেন তিনি । বললেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী…
” বিশ্বাস করো , বুকের উপর থেকে অনেক বড় ভার নেমে গেছে জানো ? যদি মেয়েটাকে একবার আদর করে জড়িয়ে ধরতে পারতাম , তাহলে হয়তো আরো বেশি শান্তি পেতাম । এতোটা আনন্দের অনুভূতি ষোলোটা বছরে কোনো দিন জাগে নি আমার ,জানো ? গ্লানিতে ভুগেছি আমি । আমি বাঁচাতে পারি নি আমার ভাই আর তার মেয়েকে । এই গ্লানি কুড়ে কুড়ে খেয়েছে আমায় । আজ বোধহয় আত্মগ্লানির মাত্রা টা একটু কমলো । বেঁচে আছে আমার ভাইয়ের মেয়ে । আমার ভাইটাই নেই শুধু …
কথা গুলো কাতর শোনালো । হেনা বেগম বললেন….

” একজন তো আছে । ওকে নিয়েই খুশি থাকুন । ও যে আমাদের মেয়ে , বিশ্বাস করুন শুরু থেকেই কেমন আপন আপন লাগতো ওকে । খুব মায়া লাগতো ওকে দেখলে ।
আজ বুঝলাম কেনো । আমাদের রাফিও এই জন্যই ওর প্রতি এতোটা পসেসিভ ছিলো ? সকালে তো বুঝি নি আমি । যখন হাসপাতালে গেলাম,তখন ও রাফির ব্যবহার কেমন অদ্ভুত লেগেছিল । এখন বুঝলাম , এই অদ্ভুত ছেলেটার অদ্ভুত হওয়ার কারণ কি । ও ওর বোনকে ফিরে পেয়েছে । ভাবুন তো কি অবস্থা ওর !
নিঃশব্দে হাসলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । হেনা বেগম তার ঘর্মাক্ত পাঞ্জাবি টা হাতে তুলে ওয়াশ রুমের দিকে এগোতেই মেঝেতে কিছু পড়ার শব্দ হলো ঠকঠক করে । কপাল কুঁচকে মেঝেতে তাকালেন তিনি । নিচে ছোট কিছু একটা পড়ে আছে । তিনি হেলে হাতে তুললেন সেটা । পাঞ্জাবির পকেট থেকে পড়েছে হয়তো । কালো চারকোনা রিমোট মতো কিছু , লাল বোতাম সেটার মাঝে । হেনা বেগম সেটা দেখে বুঝলেন না কিছু । হয়তো দরকারি কিছু । নয়তো পাঞ্জাবির পকেটে স্থান পেতো না নিশ্চয়ই । হেনা বেগম সন্দিহান হয়ে পিছু ফিরলেন । সেটার দিকে তাকিয়েই সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরীর উদ্দেশ্যে….

” আচ্ছা ,, এটা কি ? দরকারি কিছু ? আপনার পকেটে ছিলো বোধহয় ।
হেনা বেগমের হাতের দিকে তাকাতেই নরম মুখশ্রীতে আঁধার নামলো তার । তিনি আয়েশ ছেড়ে তড়িঘড়ি করে উঠলেন । চায়ের কাপ রেখে এক প্রকার তেড়ে আসলেন হেনা বেগমের দিকে । তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন ছোট্ট জিনিসটা । বললেন নিরেট কন্ঠে…
” এটা কিছু না ।
বলেই নিজেই ওয়াশ রুমের দিকে ঝট করে এগোলেন । হাই কমোডে ফেলে দিলেন সেটাকে । ফ্লাশ করলেন সাথে সাথে । বেশ কয়েক বার । অবাক হলেন হেনা বেগম ।
” ওটাকে ওখানে ফেললেন কেনো । বাইরেও তো ফেলা যেত ।
” যার স্থান যেখানে তাকে সেখানেই ফেলতে হয় । ওটার কোনো কাজ নেই । কাজ শেষ ওটার । তাই ওখানেই ফেললাম, যাতে আর ওটার প্রয়োজন না হয় ।
হেনা বেগম বুঝলেন না । তারা দু’জনেই চকিতে ফিরলেন জুবায়ের চৌধুরীর ডাকে । হাঁসফাঁস করে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকলেন জুবায়ের ।

” ভাইয়া , এই দেখো ! নিউজ দেখছো আজ ? শহরের শেষ প্রান্তে যে বন্ধ সুগার মিল টা ছিল , সেটাতে বিস্ফোরণ হয়েছে আজ !
আমি তো সকাল থেকে সেভাবে নিউজ দেখিনি , সময়ই পাই নি । এখন দেখলাম , দেখো । ঐ প্লটটা নিয়েই তো কথা বার্তা চলছিল আমাদের । কেনার কথা ছিল তো ওটা । এখন পুলিশ ওটাকে ব্যান করে দিয়েছেন । উপর মহল থেকে রেস্ট্রিকশন জারি করা হয়েছে ওখানে ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী মুখশ্রী গুরুগম্ভীর করলেন । দায় সারা ভাবে বললেন…
” বলিস কি , এতো কিছু হয়ে গেছে ?
যাক , যা হবার হয়েছে । এমনিতেও ঐ জায়গা টা নিয়ে অতো বেশি ইন্টারেস্ট নেই এখন ‌। বাদ দে ওটার চিন্তা ।
” কি বলো ভাইয়া , তুমিই না কদিন আগে বললে ঐ প্লটটা যে করেই হোক নিজেদের হাতে আনতে হবে । শহরের শেষে ওটাকে হাতে রাখলে পরবর্তীতে সিটি স্পেস বাড়ালে সুবিধা হতো আমাদের ।
” চাই না আমার সুবিধা । আর কিচ্ছু চাই না আমার । যা আছে তাতেই চলবে । ওসব বিষয়ে মাথা ঘামাস না । সারাদিন অনেক স্ট্রেস গেছে , গিয়ে বিশ্রাম কর ।

কথা বাড়ালেন না জুবায়ের চৌধুরী । তিনি বেরিয়ে আসলেন ঘর থেকে ‌।
হাসপাতালের কেবিনে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে রাফি । মিহির মাথার কাছে নিজেও হেলে মাথা ঠেকিয়ে আছে । সাবিনা বেগম পাশের সোফায় মাথা এলিয়ে চোখ বুজেছেন সবে । চোখ বন্ধ অবস্থায় কেঁপে কেঁপে উঠছেন কিছু সময় বাদ বাদ । রাফি নীরবে নিভৃতে শীতল নেত্রে চেয়ে আছে তার ব্লোসোমের পানে । ডাক্তার বলে গেছেন ইনজেকশনের ডোজ কেটে গেলে যেকোনো সময় জ্ঞান ফিরবে মিহির । রাফি আর অপেক্ষা করতে পারছে না । ব্যাকুল হয়ে চেয়ে আছে ও । বুকের ভেতর হার্টবিট চলছে নিদারুণ গতীতে । নিস্তব্ধতায় নিজের হার্টের প্রত্যেকটা ধুকপুকানি শুনতে পারছে সে ।
শান্ত আসলো এমন সময় । নিঃশব্দে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো কেবিনের । রাফি কে ওভাবে দেখে সাবিনা বেগমের দিকে একবার তাকালো । ধীর গতিতে এগিয়ে গেল । ডাকলো আলতো স্বরে…

এক দেখায় পর্ব ৪৬

” রাফি..?
রাফি নড়ে চড়ে উঠে উত্তর করলো অপ্রস্তুত হয়ে…
” হ্যাঁ ? ওও তুই ?
” এভাবে আর কতোক্ষণ বসে থাকবি ? নিজের অবস্থা দেখেছিস ? একটু রেস্ট কর । এভাবে থাকলে তুই তো অসুস্থ হয়ে যাবি । তুই তো ঠিক নোস , মিহির থেকে কম কিছু হয় নি তোর ।
” আমার কিচ্ছু হবে না শান্ত । মিহি কে একবার ডাকবি তুই ? একবার ডেকে দেখ , যদি তোর ডাকে সাড়া দেয় । দেখনা কতক্ষন ডাকলাম আমি , শুনলো না । ডাক্তার তো বললো খুব তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরবে , এখনো ফিরছে না কেনো বলতো ?

এক দেখায় পর্ব ৪৮