এক দেখায় পর্ব ৬০
সুরভী আক্তার
রাফি কপালে ভাঁজ ফেলে তড়িতে তাকায় । মেহজাবিন কে দেখে ভাবুক ভঙ্গিতে না চেনার ভান করে বলে….
“ আরে বড় বেয়াইন যে ? কাকে ভাইয়া বলছেন বেয়াইন ? বেয়াই বলুন বেয়াই !
ফিক করে হাসে সকলে । মিহি ভেংচি কাটে । মুখ বাঁকিয়ে উপেক্ষায় তিরিক্ষি স্বরে বলে….
“ হুহহহহ , কোথা থেকে আসে সব ?
দেখুন , আপনারা যেই হোন না কেনো , আপনাদের সাথে অতো কথা বলার সময় নেই আমাদের !
টাকা দিন , গেটের ভেতরে ঢুকুন , আর নয়তো এখান থেকেই বিদায় হন । বেশি কথা বললে আমরা চটে যাবো কিন্তু । তখন আমাদের বাড়ির মেয়ের সাথে আপনাদের ছেলের বিয়ে দেবো না বলে রাখলাম ।
“ এই যে বেয়াইন সাহেবা , ভাব নিয়েন না এতো ।
ফের রাফির ভ্যাঙ্গানো স্বরে ফুঁসে উঠলো মিহি । এই লোকটাকে সহ্য হচ্ছে না । আর ইনি একদম গায়ে পড়ে কথা বলতে ছুঁতো খুঁজছেন । তড়তড়ে মেজাজে বলে উঠলো মিহি…
“ আপনি তো ভারী গায়ে পড়া লোক । বাড়িতে কি বউ টউ নেই,নাকি ? দেখছেন আপনাকে পাত্তা দিচ্ছি না , তবুও এমন গায়ে পড়ছেন কেনো ?
“ বউ টউ নেই বেয়াইন । ভাবছি আপনাকে বউ বানাবো ! পছন্দ হয়েছে আপনাকে । হবেন আমার বউ ?
আশেপাশে সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো দুটোর মশকরা দেখে । রাফির কথাগুলো ইয়ার্কির ছলেই ধরলো সবাই । মিহি, মেহজাবিন আর লিনা ব্যাতিত কেউ বুঝলো না রাফির কথার অর্থ । মিহি বিষম খেলো শুকনো । ভাগ্যিস আশেপাশে বড়রা কেউ নেই ।
মিহি রাফি কে তবুও পাত্তা দিলো না । মুখ ফিরিয়ে শান্ত কে লোভ দেখালো..
“ কি ভাইয়া , বিয়ে করবে না তুমি ? ইউ নো , রুহি কত্তো সুন্দর করে সেজেছে । আমাকে বারবার বলছিলো , তুমি যে কখন আসবেএএএএ ! তোমাকে দেখার জন্য তর সইছে না রুহির । যাবে না রুহির কাছে….?
শান্ত নিরিহ করে মুখো ভঙ্গিমা ।
“ দেখ পরী , লোভ দেখাস না । গেইট ছেড়ে দে না বোন ।
“ ফেলো কড়ি মাখো তেল…..
মিহি হাত বাড়িয়ে দিয়ে দায়সারা ভাবে বললো । অনেকক্ষণ হলো এসবের । মেহজাবিন ও তাল দিলো এবার ।
“ ভাইয়া , আর সময় নষ্ট করো না । দেরি হয়ে যাচ্ছে । দিয়ে দাও না টাকা । বিয়ে তো জীবনে একবারই করবে বলো ! খুব বেশি তো চায় নি । এটা তোমার কাছে হাতের ময়লা । যা চাইছে দিয়ে দাও । তোমার ঘরের টাকা তোমার ঘরেই থাকবে ।
রাফি কথা বাড়ালো না আর ।
হাজার টাকার একাধিক নোট দিয়ে তৈরি বিশাল একটা বুকে বের করে আনলো গাড়ি থেকে । বুকের মাঝে কতগুলো একই নোটের বান্ডিল । মিহি সহ সবার চোখ চিকচিক করে উঠলো এতেই । রাফি বুকে টা বাড়িয়ে দিতেই মিহি ধরতে চাইলো সেটা । ধরার আগেই রাফি আবার ফিরিয়ে নিলো সেটা । বললো….
“ দশ লাখ এতক্ষণ ধরে বকবক করার জন্য ।
আর এক লাখ আপনার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে দিলাম । টেক ইট । এতো সুন্দর থোবড়া দেখানোর জন্য এটা আপনার টিপস । এর বিনিময়ে পরে আমাকে কিছু দিলেও দিতে পারেন । আমি না করবো না নিতে ।
মুখ বাঁকায় মিহি । রাফির হাত থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নেয় বুকে টা । সাথে সাথে পিছু ফিরে ছুট লাগায় বাড়ির দিকে ।
স্টেজে ছটফট করে বসে আছে শান্ত । ভিতরে ভিতরে খই ফুটছে ওর । উদ্বিগ্ন লাগছে নিজেকে । রুহি এখনো আসে নি । এই আসবে হয়তো । সবাই উপস্থিত এখানে ।
গার্ডেনে স্টেজের সোজা বরাবর লাল গালিচা । সে পথেই হেঁটে আসবে লাল টুকটুকে বউ ।
সময় যেনো কাটতেই চাইছে না শান্তর কাছে । এক সেকেন্ড কে এক প্রহরের মতো মনে হচ্ছে ।
ওর বন্ধুরা টিটকারী মারছে । রাফি বরপক্ষের হয়েই ট্রিট নিচ্ছে সবার থেকে । সে যেন কাউকেই চেনে না !
খানিক সময় পেরোলে আশপাশের কোলাহল শান্ত হলো । মোলায়েম হয়ে আসলো পরিস্থিতি । লাল গালিচার দুপাশে জড়ো হলো সকলে । সবাই একসাথে চাইলো গালিচার শেষ মাথায় । ধক্ করে উঠলো শান্ত । বসে থাকতে পারলো না আর । ছটফট করে উঠে দাঁড়ালো সে ।
রুহি আসছে । স্টেজের পাশ থেকে মৃদু গানের লিরিক্স ভেসে আসলো এ পর্যায়ে …
— Sari duniya Se Jeet ke main Aaya Hoon Yedhar..
Tere Aage hi main Haara Kiya , Tune Kiya asar ..
Mein Dilka Rajj kehta Hoon , Ke jab jab Saansen leta Hoon … Tera hi naam leta Hoon , Yea tune Kya Kiya —
গানের তালে হৃদয়ের উদ্বিগ্নতা,কম্পন বাড়তে লাগলো ।
সদ্য সন্ধার আকাশের নিচে লাল টুকটুকে এক পরী । চার দিকের উজ্জ্বল ঝলসানো আলোকে নিজের সৌন্দর্যে ক্ষুণ্ন করে এক পা দু’পা করে ঠান্ডা পায়ে হেঁটে আসছে রুহি । মাথার বিশাল ওরনাটা গড়িয়ে আসছে পিছু পিছু । একটা মসৃণ সিল্ক ওরনা দিয়ে নাক অবধি ঘোমটা টানা । তবে মুখশ্রী সম্পুর্ন বোঝা যাচ্ছে ঘোমটার আড়ালেই । লজ্জা,জড়তায় নোয়ানো নাজুক মেয়েটার স্নিগ্ধ চেহারা ।
শান্ত এগিয়ে গেলো । ঠোঁটে ফুটলো এক পশলা হাসি । প্রগাঢ় সেই হাসির রেখা । মনে হচ্ছে বুকের মাঝে ঢোল পেটাচ্ছে কেউ । গলায় কিছু দলা পাকিয়ে আসছে খুশির জোয়ারে । হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে অনেক আগেই ।
ঢোক গিললো শান্ত । হাসলো ঠোঁট প্রসারিত করে ।
রুহির দুই পাশে মিহি , লিনা , বর্ষা আর বাকিরা । একটু পিছিয়ে আছে ওরা । মাথা নুইয়েই গালিচার শেষ মাথায় এসে থমকে দাঁড়ালো রুহি । সামনে স্টেজ । যেখানে একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শান্ত । চোখ নোয়ানো অবস্থায় শান্তর পা যুগল নজরে পড়লো রুহির ।
গানের তালে তালে মৃদু হাওয়া বইছে । মিষ্টি একটা পরিবেশ । যার মাদকতা ছেয়ে গেছে উদ্বিগ্ন দুই নরনারীর মাঝে । একই অনুভূতি দুজনের । অদ্ভুত রহস্যময় ভালোলাগা ।
রুহি থমকে দাঁড়াতেই কেউ বোধহয় ফিক করে হেসে উঠলো পাশ থেকে ।
শান্ত চেয়ে অদ্ভুত আবেশে । দৃষ্টিতে ঘোর । চোখে পলক নেই । ওর বন্ধুরা গলা খাঁকারি দিতেই ঘোর কাটলো শান্তর । রুহি কে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে আশপাশ না তাকিয়ে দ্রুত রুহির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো । তৎক্ষণাৎ না ধরলেও ধীরে ওর বাড়ানো হাত ধরে উপরে উঠলো রুহি । দুজনকে বসানো হলো পাশাপাশি ।
রুহির ঘোমটার সাথে সাথে মুখখানাও নামানো এখনো । চিবুক ঠেকিয়ে রাখা গলায় । শান্ত বসার পরও ওকেই দেখে যাচ্ছে । চোখ সরছে রুহির থেকে । দৃষ্টি গেঁড়ে গেছে , জোরপূর্বক টেনে টুনে সরানো ও দায় এই দৃষ্টি ।
রাফি দুটোকে পাশাপাশি দেখলো দূর থেকে । অনেকক্ষণ অবধি তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলো । এগিয়ে এসে রুহির সম্মুখে দাঁড়ালো । গলা ঝেড়ে ভরাট কন্ঠে বলল..
“ ভাবির ঘোমটা খানা একটু তুলে দে শান্ত । তার চাঁদ মুখখানা দেখি একটু….
রুহি ভাইয়ার কথায় ঘোমটার নিচে নাক ফোলায় । শান্ত সুযোগ পেলো , এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে তড়িতে আলতো করে ঘোমটা খানা সরিয়ে দিলো রুহির । ঝুঁকে গলায় চিবুক ঠেকানো রুহির চেহারা খানা সম্পুর্ন রুপে বিরাট মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে আকস্মিক অস্ফুটে উচ্চারণ করলো বুকের বাম পাশে হাত রেখে…
“ হায়য়য়য়য় মাশাআল্লাহহহহ….
রাফি হাসে । একটু হেলে রুহির আদুরে মুখখানা দেখে । রুহি কে সাজানোর পর দেখতে পায় নি ও । কেবলই দেখলো পুরোপুরি । মুগ্ধতায় দৃষ্টি ভরে উঠলো । বুক খানা শীতল হয়ে গেলো বোনের বউ রুপি সৌন্দর্যে ।
দীর্ঘ শ্বাস পড়লো নিঃশব্দে । ঠোঁট চেপে আহ্লাদ করলো রাফি…..
“ আসসালামুয়ালাইকুম ভাবি …
মাশাআল্লাহ আমার ভাবি তো দেখি খুব বেশি সুন্দর । আমার বন্ধুর মতো বাঁদরের গলায় একেবারে মুক্তোর মালা ঝুলেছে দেখি ।
রাফির কথায় হেসে উঠলো সবাই । ঠোঁট উল্টে খানিক হাসে রুহি । শান্ত ভেংচায়..
“ আমি বাঁদোর ?
“ হনুমান তুই ।
কিন্তু আমার ভাবি সুন্দর ।
রুহি কে এখনো একই ভাবে মাথা নোয়ানো অবস্থায় দেখে আবার বলতে শুরু করে রাফি….
“ তা ভাবি , সব ঠিকঠাক তো ? মন খারাপ করে বসে আছেন কেনো ? বাড়ির সবাইকে ফেলে যাচ্ছেন বলে মন খারাপ হচ্ছে ?
ডোন্ট ওয়ারি , আমি তো আছি । যখন তখন আমাকে বলবেন , আপনাকে বাপের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার । এই বাঁদর টার অপেক্ষায় থাকবেন না সবসময় । তবে হ্যাঁ , বাঁদর বললাম বলে ও কিন্তু খারাপ নয় । আমার বন্ধু টা লয়াল ছিলো , একমাত্র আপনার প্রতি । এই বাঁদর টাকে একটু দেখে রাখবেন শুধু….
রুহির নাক টানার আওয়াজ আসে এবার । বেচারি সংযত করতে পারলো না আর নিজেকে । ভাইয়ার আদুরে স্বর গুঁড়িয়ে দিলো ওকে ।
বোনের নাক টানার আওয়াজ শুনে ভড়কায় রাফি । ছ্যাত করে উঠে তৎক্ষণাৎ ওর সম্মুখে বসে । সব ভুলে বোনের মুখ আগলে ধরে । রুহির মুখখানা উপরে তুলতেই ভেজা চোখ নজরে পড়ে । আঁতকে ওঠে রাফি….
“ Sissy , কাঁদছিস কেনো ?
আমি ইয়ার্কি করলাম বনু । সরি , আর এমন করে বলবো না !
মিহি তড়িতে স্টেজে ওঠে ।
“ কাঁদালেন তো আমার পাখি কে ? একেই সকাল থেকে কাঁদছে ও । তার উপর আপনি ইমোশনাল করে ফেললেন ওকে ।
রাফি কানে ধরে । মুখ নরম করে বলে….
“ সরি বনু । এই দেখ কানে ধরছি । আর এসব কথা বলবো না । কাঁদিস না তুই । মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে নয়তো । লাখ টাকা দিয়ে মেকআপ করেছিস কি কাঁদার জন্য ?
“ ওসব বলে লাভ নেই ভাই ! তোর ছিঁচকাদুনে বোন ওসব কথা বুঝবে না ।
রুহি এবার ঝট করে চড়কে তাকায় পাশে । শান্তর সাথে চোখ মিলতেই চমকায় । ওনাকে দেখা হয় নি বর বেশে । আড়ষ্টতায় চোখ তুলেই তাকায় নি রুহি । এখন চোখাচোখি হতেই ছলকে উঠলো মেয়েটা । দৃষ্টি হারালো শান্তর দিকে । সফেট শেরোয়ানিতে একেবারে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে শান্তর সৌন্দর্যে । চোখ থমকালো রুহির । ওকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঠোঁট কামড়ে পরপর ভ্রু নাচালো শান্ত । থতমত খেলো রুহি । চকিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো । রাফির পানে অভিমানী চোখে চাইলো । বললো রাফি…
“ সরি Sissy…
রুহি কিছু বলার আগেই আফসানা বেগমের আগমন । হন্যে হয়ে ছুটে আসলেন তিনি । মুখে প্রসারিত উচ্ছাস । হাসি প্রগাঢ় । রুহি চোখ তুলে তাকিয়ে সব ভুলে মুহুর্তেই স্বাভাবিক হলো । মুচকি হাসলো সে । আফসানা বেগম রুহির পাশে বসলেন । রুহিকে নিজের দিকে টেনে ফেরালেন । মেয়েটা কে অমায়িক লাগছে । একেই সুন্দর । তার উপর সৌন্দর্য উপচে পড়ছে একেবারে । কেঁদেছে হয়তো , নাকের ডগা লালচে । চোখের কোণে কাজল ঘেঁটে গেছে খানিক । আফসানা বেগম ওর চোখের কোণা মুছিয়ে দিলেন । অত্যন্ত চমৎকার মুগ্ধতায় বললেন…
“ বাহ্ , রুহি । তোকে তো পুরো পরীর মতো লাগছে । ইশশ্ , অন্য কোথাও বিয়ে দিতে গেলে , তোকে এভাবে দেখলে আফসোস লাগতো তখন । তোকে বেছে নিয়ে এই খচ্চর টা ভুল করে নি ।
“ আমি ওকে বেছে নেই নি আম্মু । অনেকের মধ্য থেকে একটাকে নিলে সেটাকে বেছে নেওয়া বলে । মানুষ তো অনেকের মধ্য থেকে একটা বেছে নেয় । কিন্তু আমি একজনের মধ্য থেকে সেই একজনকেই চেয়েছি । আর সেই একজন কেই নিয়েছি । এটাকে বেছে নেওয়া বলে না ।
হাসেন আফসানা বেগম । আগে না হলেও এই কদিনে শান্ত কে রুহির দিক থেকে বেশ ভালো করেই প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি । আগে ঘটে যাওয়া কতো ঘটনা খেয়াল করেছেন । ভেবেছেন শান্তর আগের করা কার্যকলাপ নিয়ে । রুহির প্রতি শান্তর আলাদা এটেনশন ছিলো । যেটা বাহ্যিক ভাবেও প্রকাশিত ছিলো । কিন্তু কেউ কখনো বোঝেই নি । আন্দাজে ও এমনটা আসে নি কারোর । বোঝার চেষ্টাই করে নি কেউ ।
খানিক ক্ষণের মধ্যেই বিয়ে পড়ানো হলো শান্ত আর রুহির । বিয়ের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হলো ওরা । কেঁপে কেঁপে কবুল শব্দ টুকু গলা দিয়ে উচ্চারণ হলেও বিয়ের কাবিনে সাক্ষর করার সময় হাত প্রচন্ড কাঁপছিল রুহির । কিছুতেই কাগজে কলম বসাতে পারছিলো না সে । গলা কাঁপছিল হাতের সাথে সাথে । কাঁপছিল সর্বাঙ্গ । আশেপাশের সবার দৃষ্টি তখন ওর দিকেই । কতগুলো দৃষ্টির সম্মুখে পড়ে ভড়কেছে রুহি । আড়ষ্টতায় জড়িয়ে গেছে আরো । আব্বু যখন পাশে বসে একবার ডাকলো রুহি কে । তখন কান্না এসেছিল ভীষণ । ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপেছে মেয়েটা । রাফি সহ বাকিদের কতবার বলার পরও কম্পিত হাতে সাক্ষর করা সম্ভব হচ্ছিল না ওর পক্ষে । এমতাবস্থায় শান্ত চেপে ধরে ওর হাতখানা । নিজে ওর হাত ধরে নিজের শক্তিতে রুহির হাত কাগজে বসায় । কলম বসিয়ে কানের কাছে ধীরে বলে…
“ লাভ ইউ জান..
এবার শুধু একটা সাক্ষর । এর পর তুমি সম্পুর্ন টাই আমার । এই শাহরিয়ার শান্তর । আই কান্ট ওয়েট জান , প্লিজ , টাইম ওয়েস্ট করো না ।
এটার সাথে সাথে শান্তর চোখের কাকুতি টুকুই যথেষ্ট ছিলো । অতঃপর রুহি এখন সম্পূর্ণ টাই শান্তর নামের দখল দারীতে সাক্ষরিত হলো । সে হলো মিসেস শাহরিয়ার শান্ত । যেটা হওয়ার স্বপ্ন বহু কালের । আজ পূরন হলো স্বপ্ন টুকু ।
সন্ধ্যা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ । রুহি আর শান্তর বিয়ে তো হলো । নাদিয়া ওদের বিয়েটা শেষ হাওয়ারই অপেক্ষায় ছিলো । মিরাও হয়তো বাড়ি ফিরবে আজ । বিয়ে পড়ানোর আগে আগে খেয়ে নিয়েছে ওরা । সন্ধা গড়িয়ে বেশি রাত হলে অসুবিধা হয়ে যাবে পরে । মিরার বাড়ি ফেরার তাগাদা নেই অতো । একটু জোর করলেই ও থেকে যাবে ।
তবে নাদিয়া ভিন্ন । সে থাকবে না । রুহির জন্য আনা গিফট টা ওকে আগেই দেওয়া হয়েছে ।
শান্ত রুহি পাশাপাশি বসে । ওদের ঘিরে রেখেছে ওদের বন্ধুমহল । মিহি, জেনি, লিনা, বর্ষা, ইভান, রাফি, কাজিনরাও আছে সকলে । হাসাহাসি করছে ওরা । নাদিয়া জড়তা নিয়ে স্টেজে উঠলো । রুহিকে দেখে মুচকি হেসে মিনমিন করে বললো…
“ আমি চলে যাই রুহি ? রাত হয়ে আসছে ! পরে দেরি হয়ে যাবে নয়তো । আম্মু ফোন করেছিল !
“ সে কি , এখনি যাবি ?
রুহির হয়ে মিহি প্রশ্ন করলো । নাদিয়া থেমে বললো…
“ হুম । রাত হলে সমস্যা হবে । আমি যাই…
কথা শেষ হয়েছে সবে । রুহি সামনে দৃষ্টি রেখে মুচকি হাসলো । নাদিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর পাশ থেকে একটা সুপরিচিত কন্ঠ ভেসে আসলো….
কেউ রুহির দিকে গিফট বাড়িয়ে দিয়ে বললো…
“ কনগ্রাচুলেশনস রুহি….
হার্টেস্ট কনগ্রাচুলেশনস অন ইউর ওয়েডিং !
নাদিয়া চমকায় । তড়িতে চায় পাশে । চেনা একটা মুখ । চেনা নয় খুব চেনা । ধক্ করে ওঠে নাদিয়া ।
অস্ফুটে উচ্চারণ করে..
“ সোহেল !
ডাক টুকু গলা থেকে বেরোয় না । আটকায় গলাতেই । রুহি মুচকি হাসে । কথা বলে এতক্ষণে….
“ থ্যাঙ্ক ইউ দোস্ত ।
কখন আসলি ?
“ কেবলই ।
মিহি অবাক লোচনে চেয়ে । সেভাবেই শুধোয়….
“ সোহেল , তুই ?
“ আরে মিহি , কেমন আছিস বল ?
“ আমি ভালো আছি । কিন্তু তুই ! তুই , এতো দিন পর ?
“ কোথায় কতদিন ! আট মাস পর আবার তোদের সামনে । আসার ইচ্ছে ছিলো না , রুহি ইনভাইট করেছে । আর আমি আসবো না ? তাই আসলাম ! জীবনে প্রথম কোনো ফ্রেন্ডের বিয়ের ফাংশন এটা , মিস করি কি করে !
সোজা এয়ার পোর্ট থেকে এখানে এসেছি ।
নাদিয়া মূক বনে চেয়ে । রুহির সাথে সোহেলের কন্টাক্ট ছিলো আগে জানা ছিল না ওর । এমনকি ওর জানা মতে সোহেলের সাথে ওদের ফ্রেন্ড গ্রুপের কারোরই যোগাযোগ নেই । রৌনকের সাথেও না । সবাই এখন আলাদা । রৌনক এক শহরে থাকা সত্ত্বেও ওর সাথে যোগাযোগ নেই তেমন । এমনকি কথাও হয় না । রুহির বিয়েতেও আসে নি ও ।
কিন্তু সোহেল এসেছে ? দূর দেশ থেকে ছুটে এসেছে সে । নাদিয়া ঢোক গেলে । চোখ নামিয়ে নত করে ।
রুহির সাথেও দীর্ঘ আট মাস সোহেলের কোনো যোগাযোগ হয় নি । নিজের বিয়ের কথা জানাতে রুহি চেষ্টা করেছে ওর সাথে যোগাযোগ করার । পুরনো মেইলে ইনভাইট করেছে ওকে । যদিও কখনো ভাবে নি সোহেল আসবে । বন্ধুত্বের খাতির দেখিয়ে রুহি নিজের দায়িত্ব পালন করছে ।
আজই দেশে ফিরল সোহেল । এক্ষুনি ফিরলো । এয়ার পোর্ট থেকে সোজা রুহির বিয়েতে এসেছে ।
বিদেশে সে একা । ফ্যামিলির কেউই নেই সাথে । সেখানকার ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে এখন ।
চেহারায় পরিবর্তন এসেছে বিরাট । এই ক মাসেই গায়ের রংয়ের উজ্জ্বলতা বেড়েছে ।
ঘন দাঁড়ি উঠেছে চোয়ালে । রুহি টুকটাক কথা বললো ওর সাথে । সোহেল পাশ ফিরে চায় নি একটা বারও । মিরা ও তাজ্জব । সেও ওদের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসুক হয়ে কুশল বিনিময় করলো । ততক্ষণ নাদিয়া চুপ ছিলো ।
অতঃপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ঘড়ির দিকে তাকালো । সাতটা পেরিয়েছে । নাদিয়া ওদের কথার মাঝেই বললো….
“ আমি গেলাম রুহি , দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
এতক্ষণে সোহেল নজর দিলো নাদিয়ার দিকে । খুব স্বাভাবিকের ন্যায় নম্র স্বরে শুধালো…
“ তুই কেমন আছিস নাদিয়া ?
হাসে নাদিয়া । জোর পূর্বক ঠোঁটের কোণে হাসি টানে । চোখের দিকে তাকতে পারে না । চোখ চুরিয়ে উত্তর করে…
“ আমি ভালো আছি ।
আচ্ছা তোরা থাক । আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে । আবার পরে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ । আজ আসি…
কথা শেষ করে এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । কাউকে কিছু বলার সুযোগ টুকুও দিলো না । দ্রুত উল্টো পথে হাঁটা ধরলো । রুহি ডাকলে আবার একই কথা বললো । সময় নেই ওর ।
চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়েছে নাদিয়া । গেইট পেরিয়ে এসে একটু থেমে বড় বড় শ্বাস টানলো । সামনে রাস্তার মোড়ে গিয়ে রিকশা ধরতে হবে । এর মধ্যেই বাড়ি থেকে আরো ক’বার ফোন এসেছে । নাদিয়া ধরে নি ।
শ্বাস টেনে বুক হালকা ঘরে পা বাড়ালো রাস্তার দিকে । কয়েক পা এগোতেই পিছন থেকে গাড়ির শব্দ আসলো । চকিতে তাকিয়ে গাড়ি যাওয়ার রাস্তা দিয়ে সাইড হয়ে হয়ে দাঁড়ালো নাদিয়া । চার চাকা একটা খয়েরী গাড়ি । বিয়ে বাড়ির ফেইরি লাইটের আলোয় ঝকঝক করছে ।
নাদিয়া সরে দাঁড়াতেই গাড়ি টা এগোলো একটু । কি একটা ভেবে থামলো নাদিয়ার সামনে । গাড়ির জানালার কাঁচ নামতেই চমকালো নাদিয়া । সোহেল ওকে দেখে মুচকি হাসলো । এবারো স্বাভাবিক হাসি । বললোও স্বাভাবিক কন্ঠেই..
“ ওঠ , ড্রপ করে দিচ্ছি ।
নাদিয়া উত্তর করে নির্লিপ্ত ক্ষিণ স্বরে….
“ প্রয়োজন নেই,আমি যেতে পারব । তুই চলে যাচ্ছিস যে ! কেবলই তো আসলি ।
“ রুহির সাথে দেখা করতে এসেছিলাম শুধু । বাড়িতে কেউ জানে না আমি দেশে ফিরেছি । কারোর সাথে কথা হয় নি । তাই বাড়ি যাচ্ছি এখন ।
“ গাড়ি টা তোর ?
“ হুম । চলে আয় , নামিয়ে দেবো বাড়ির সামনে ।
“ তোর আর আমার পথ ভিন্ন । উল্টো পথে যেতে হবে না তোকে । আমি চলে যেতে পারবো । তুই যা…
“ ভিন্ন হলেই বা কি ! তোর জন্য না হয় উল্টো পথে গেলাম । আয়, অনেক দিন পর দেখা হলো । অনেক কথা জমে আছে । যেতে যেতে একটু কথা বলে ফেলি ।
নাদিয়া গুড়িয়ে যায় । না করতে পারে না । হ্যাঁ করতেও ইতস্তত সে । ইতস্ততার মাঝেই গাড়িতে বসে থেকেই ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে দেয় সোহেল । আবার ডাকে …
“ কি রে আয়….
উঠে বসে নাদিয়া ।
চলতি পথে দুজনে নীরব থাকে কিছুক্ষণ । নাদিয়া আড়চোখে তাকায় । সোহেলের স্বাস্থ্য তেও পরিবর্তন এসেছে ।
সোহেল বলে ওঠে আচমকা….
“ বিয়েটা নিজের অমতে করেছিলি ?
চমকায় নাদিয়া । উত্তরে কথা বলে না । সোহেল ও তাকায় না ওর দিকে । সামনে তাকিয়েই স্টিয়ারিংয়ে হাত চালাতে চালাতে বলে আবার….
“ শুনেছি বিয়ের চার মাস পর ডিভোর্স হয়েছে তোর !
“ হু ।
শুনলি কোথায় ?
“ শুনেছি ।
এখন কি করছিস ?
“ কিছু না । বাপের ঘাড়ের উপর বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছি শুধু । তুই বল , তোর কি খবর ?
“ পড়াশোনা চলছে ।
“ আবার ফিরবি ?
“ এখানে পিছুটান থাকলে ফেরার ইচ্ছে নেই ।
“ অনেক বদলে গেছিস তুই !
“ স্মার্ট হয়েছি ?
হাসলো নাদিয়া । সোহেলের প্রশ্নটা উৎসুক লাগলো ।
“ হুম হয়েছিস ।
“ আগে স্মার্ট ছিলাম না !
“ বলদা ছিলি আগে ।
“ সেই জন্য রিজেক্ট করেছিলি ?
হাসি চুপসে যায় নাদিয়া নয় ঠোঁট থেকে । ঘাড় ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় । উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন করে সোহেল…
এক দেখায় পর্ব ৫৯
“ এখন তো বদলে গেছি । এখন যদি প্রপোজ করি তাহলে ফেরাবি না নিশ্চয়ই ?
“ এসব কি ধরনের কথা সোহেল ? এধরনের ইয়ার্কি পছন্দ নয় আমার , সেটা তোর অজানা নয় !
শক্ত কড়া স্বর নাদিয়ার । সোহেল বলে…
“ জানি ইয়ার্কি পছন্দ নয় । তাই ইয়ার্কি করছি না । সিরিয়াসলি বলছি !
“ আমাকে এখানেই নামিয়ে দে । বাকিটা আমি যেতে পারব । অনেক সাহায্য করেছিস আর প্রয়োজন নেই !
“ রেগে গেলি নাকি ?
“ গাড়ি থামা সোহেল , আমি নামবো !
“ বাড়ির সামনে গিয়েই নামিয়ে দেবো একেবারে । আঙ্কেল আন্টির সাথে অনেক দিন দেখা – কথা হয় না । ওনাদের সাথেও দেখা হয়ে যাবে এতে !
নাদিয়া আর কিছু বলে না । মুখ ফিরিয়ে থাকে সে ।
বিয়ে সাদি সবদিক থেকেই সম্পন্ন । খাওয়া দাওয়া শেষ সকলের । নয়টা পেরোতে চললো । এবার রুহির বিদায়ের পালা ।
