Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৬৩

এক দেখায় পর্ব ৬৩

এক দেখায় পর্ব ৬৩
সুরভী আক্তার

মিহি কে ফিক ফিক করে হাসতে দেখে শান্ত নিজের দিকে তাকায় ‌। নিজের অবস্থা দেখে চোখ বড় করে তাকায় মিহির দিকে । চোখ ঝাপটে ঝাপটে পুরু কন্ঠে বলে ওঠে….
“ এই পরী , এভাবে হাসছিস কেনো হ্যাঁ ? আগে কখনো নতুন বর দেখিস নি ? হাসার কি আছে এভাবে ?
“ কই ভাইয়া , হাসছি না তো ।
রুহি পড়েছে মহা জ্বালায় ‌। নুইয়ে যাচ্ছে ও । ও মাথা নত করলো । মিহি ওর বাহুতে আলতো ধাক্কা মারে । শান্তর উদ্দেশ্যে বলে টিটকারী স্বরে….
“ তোমার ফ্রেন্ড এসেছে ভাইয়া , নিচে যাও । তোমার জন্য ওয়েট করছে হয়তো ।
রুহি ঝলমলিয়ে তাকালো মিহির পানে ।
“ ভাইয়া এসেছে ?
“ হুম ।

“ এ্যাহ , ভাইয়া এসেছে তো এভাবে খুশি হওয়ার কি আছে ? ভাইয়া হওয়ার আগে ও ভাসুর লাগে তোমার , আমার থেকে কদিনের বড় রাফি । ভুলে যেও না । ভাসুরের সামনে যেতে নেই । লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছো ? আমার বোনটার সামনে লজ্জা পাচ্ছো , বড় কথা আমার সামনে লজ্জা পাচ্ছো । অথচ কাল লজ্জা হরণ……
রুহির কান গরম হয়ে আসে । কথা শেষ করতে না দিয়ে ও ঝাঁজিয়ে ওঠে চোখ মুখ পাকিয়ে….
“ চুপ করুন অসভ্য লোক , বেরিয়ে যান ঘর থেকে ।
শান্ত চুপসে গেলো । নিজেও থতমত খেলো মিহির সামনে । মুখ ফসকে বেফাঁস বেরিয়ে গেছে । ওর কি দোষ ?
শান্ত তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে খাট থেকে নেমে পড়লো । দ্রুত চেঞ্জ করলো ওয়াশ রুমে গিয়ে । ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললো মিহির উদ্দেশ্যে….
“ আধি ঘর ওয়ালি , ঘরেই থাকো । আমি আসছি এক্ষুনি । তোমার বোনের ভাসুরের সাথে দেখা করে আসি গিয়ে ।
বলেই চটজলদি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো শান্ত । ও বেরোতেই পেট চেপে হো হো করে হেসে উঠলো মিহি । হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেলো খাটে । রুহি মুখে অসহায়ের ছাপ ফোটালো । বললো কন্ঠ খাদে নামিয়ে….
“ এভাবে হাসার কি আছে ? হাসছিস কেনো ?
মিহি হাসি থামায় । নিজেকে সংবরণ করে । শরীর টান টান করে উঠে বসে । গলা খাঁকারি দেয় । প্রসঙ্গ ঘেঁটে শুধোয় আলতো করে…

“ ভাইয়া তোকে কাল কি গিফট দিলো ?
রুহির মুখের আভা পাল্টে যায় পুরোপুরি ‌। লাজুকতা বৃদ্ধি পায় । মাথা নুইয়ে নেয় ও । মিহি আবার বলে ব্যাকুল হয়ে…
“ কি রে পাখি , বল না , ভাইয়া তোকে কি দিয়েছে ?
“ দাঁড়া, দেখাচ্ছি !
বলেই আলমারির দিকে এগোলো ও । সকালে শান্ত ওকে কিছু দিয়েছে । রুহি আলমারিতে তুলে রেখেছে সেগুলো । আলমারি থেকে কিছু বের করলো রুহি । এগিয়ে এসে মিহির পাশে বসলো । প্রথমেই বাড়িয়ে দিলো মাঝারি আকারের একটা পুতুল । মোটামুটি ছোটই বলা চলে । পুরনো একটা প্লাস্টিকের পুতুল । চিপকে গেছে অনেকটা । তবে পুরনো পুতুল টার শরীরে ছোট্ট ছোট্ট নতুন পোশাক ।
মিহি অবাক হয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো । পুতুল টা উল্টে পাল্টে দেখলো । না বুঝে শুধালো সন্দিহান হয়ে…
“ এই পুরনো পুতুল টা তোকে গিফট করেছে ভাইয়া ?
রুহি সচকিতে উপর নিচ মাথা নাড়ায় । হাসে ওষ্ঠাপূট চেপে ধরে । মিহি কপাল অত্যাধিক কুঁচকালে হাসি প্রগাঢ় করে রুহি । বলে নরম কন্ঠে….

“ জানিস , এটা আমার ছোট বেলার পুতুল । তুই হারিয়ে যাওয়ার পর ফুপি এটা কিনে দিয়েছিল আমায় । আমি সবসময় এটা নিয়ে খেলতাম । এটাকে নিজের কাছে রাখতাম প্রতিটা ক্ষণ । হাতছাড়া করতাম না একটুও । ঘুমোতে গেলেও এটাকে জড়িয়ে ঘুমাতাম । কিন্তু হঠাৎ করে একদিন এটা হারিয়ে যায় । আমি তখনো খুব ছোট । খুব কেঁদেছিলাম জানিস এটা হারানোর পর । সবসময় কান্না করতাম পুতুল টার জন্য । আমার খুব প্রিয় ছিল এটা । পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এটাকে পাওয়া যায় নি তখন ।
আব্বু আমাকে নতুন করে আরো অনেক পুতুল কিনে দিয়েছিল । কিন্তু আমি জেদ ধরে ছিলাম ,এটাই লাগবে আমার । কিন্তু এটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি । অবশেষে এক সময় এটার ধান্দা কেটে গেছে মাথা থেকে । আজ জানতে পারলাম , আমার এই পুতুল টা হারায় নি কখনো । চুরি হয়েছিল !

“ হ্যাঁ ?
মিহির অস্পষ্ট প্রশ্ন । রুহি বললো শীতল হেসে…
“ হুম । উনি চুরি করেছিলেন এটা । আমাকে সবসময় হিংসে করতেন উনি । আমার জিনিস কেও হিংসে করতেন । আমি এই পুতুল টা নিয়ে খেলতাম , এটা সহ্য হতো না ওনার । তাই এটা চুরি করেছিলেন আমার থেকে । আমরা কি জানতাম নাকি উনি চুরি করেছেন ? এতো দিন উনি সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন এটা ।
আজ আবার এটা ফেরত দিয়েছেন আমায় ‌। আমার পুরনো একটা স্মৃতি কে স্বরন করিয়ে দিলেন । সবটা স্বীকার করেছেন আজ । আজই জানলাম ।
মিহি আশ্চর্য বনে । একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকায় ও । বিস্ময়ে অভিভূত সে । ও আশ্চর্য হয়েই শুধালো…
“ ফেরত দেওয়ার পর কি বললো ?
“ খুব করে সরি বললো ।
“ রাগ করেছিলি ?

না বোধক মাথা নাড়ে রুহি । শান্ত ওকে আরো অনেক কিছু বলেছে । শান্ত জ্বেলাস ছিলো এই পুতুল টার উপর । তাই রাগে ক্ষোভে এটাকে সরিয়েছে রুহির থেকে । রুহি সবসময় পড়ে থাকতো এটাকে নিয়ে । যেটা ওর মোটেও সহ্য হতো না । আজ এটাকে ফেরত দিয়ে খুব করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে শান্ত । পুতুলের সাথে সাথে আরো কিছু দিয়েছে ।
একটা হিরের আংটি পড়িয়েছে রুহির অনামিকা আঙ্গুলে । বেশ কতকগুলো শাড়ি কিনে দিয়েছে । যদিও রুহি শাড়ি পড়বে না কখনো । ও শাড়ি সামলাতে হিমশিম খায় । তবুও শান্ত বলেছে প্রত্যেক রজনীতে ওর সম্মুখে শাড়ি পরে আসতে হবে রুহি কে । এটাই শান্তর নরম উৎকন্ঠিত আবদার ।
টুকিটাকি আরো অনেক গিফট আছে । রুহি মিহি কে দেখালো সব ।
এদিকে শান্ত সোজা নিচে নেমেছে । রাফি যেই রুমে ছিলো সেই রুমে ঢুকে বিশাল বড় একটা সালাম দিলো শান্ত…
“ আসসালামুয়ালাইকুম বড় শালা বাবু …
চরম বিরক্তি নিয়ে দাঁত কিচে কটমটিয়ে তাকালো রাফি । শান্ত কে সে আসার পর থেকে ফোন করে যাচ্ছে । ওর ফোন ধরার কোনো খবর আছে ?
প্রচন্ড বিরক্ত রাফি । সে শক্ত কন্ঠে তপ্ত ঝাড়ি মারলো…

“ কতক্ষন ধরে ফোন করছি , ফোন ধরছিলি না কেনো ?
শান্তর গা ছাড়া জবাব…
“ তোর আঙ্কেল কি হাঁটুর নিচে ? নতুন জামাই কে ফোন করার মানে কি ? অনেক বিজি আমি ,‌ বুঝিস না ? কেনো ফোন করছিলি বারবার ?
আসল কথা শান্তর ফোন সাইলেন্ট ছিলো । সেই কালকেই ডিস্টার্ব থেকে বাঁচতে সাইলেন্ট করে রেখেছে ফোন । এখনো সেই অবস্থাতেই পড়ে আছে । খেয়ালই করে নি । খেয়াল করার সময়ই পায় নি ।
রাফির ক্ষিপ্ততার মাত্রা বাড়ে । বকবকিয়ে তেড়ে আসে ও …
“ তোর ঐ পাশের বাসার দুঃসম্পর্কের ছমিনা আন্টি কে ছাড়বো না আমি । আমার ব্লোসোম কে কটাক্ষ করে ও ! ওর তো সাহস কম নয় , আমার ব্লোসোমের দিকে নজর দেয় ? ওনাকে তো আমি….
“ আরে ভাই থাম থাম , কি হয়েছে ? হঠাৎ ছমিনা আন্টির উপর এভাবে ক্ষেপে গেলি কেনো ? কি করেছেন উনি ?
রাফির উগ্রতা দেখে নিজেকে প্রটেক্ট করে অন্য দিকে সরে গিয়ে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো শান্ত । রাফি খেকিয়ে উঠলো…
“ বাইরে বসে কূটনামো করছেন উনি । এসব কূটনৈতিক মহিলাদের বাড়িতে জায়গা দিস কি করে তোরা ?
“ আরে কি হয়েছে বলবি তো ?

“ বললাম তো আমার ব্লোসোমের দিকে নজর দিয়েছেন উনি । আর যাই হোক , এক্ষুনি ওনাকে বাড়ি থেকে তাড়াবি । এক্ষুনি মানে এক্ষুনি । আমি আর একটা কথাও বলবো না । হয় তুই ওনাকে বাড়ি থেকে হটাবি , আর নয়তো আমি তোর বউকে তোর বাড়ি থেকে হটাবো । রুহি কে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরবো আমি । এখন তোর চয়েস , কি করবি ভেবে দেখ । জলদি ভাব , ফাস্ট । ঐ মহিলা কে এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের কর । নয়তো রুহি কে নিয়ে চললাম আমি…
শান্ত চমকে উঠলো । বড়সড় ঝটকা খেয়ে শরীর ঝাড়া মেরে বললো….
“ এসব কি বলছিস ভাই । আমার বউকে হটাবি মানে ? ওরেএএ তোর বোন আমার দীর্ঘ এক দিনের বিয়ে করা বউ । ওকে ছাড়া বাঁচবো না আমি । এসব কিসব ব্লাকমেইল করছিস ?
“ যা বলছি তাই , নেক্সট দুই মিনিটের মধ্যে যদি ঐ ছমিনা আন্টি বাড়ি থেকে না বেরোয় , তাহলে তিন মিনিটের মাথায় রুহি বেরোবে এ বাড়ি থেকে । অলরেডি দুই সেকেন্ড চলে গেছে । গো ফাস্ট , ঐ ছমিনাকে তাড়া আমার আশপাশ থেকে ।
শান্ত ভ্যাবাচ্যাকা খায় । কুলকিনারা হারায় । রাফির কথার আগাগোড়া কিছুই মাথায় ঢোকে নি ওর । ও ছলকে ছলকে উঠছে বারবার । রাফি কে দেখে বেশ সিরিয়াস মনে হচ্ছে ।
শান্ত বলতে গেলো….

“ দেখ ব্রো….
“ দশ সেকেন্ড চলে গেছে , আর মাত্র একশো দশ সেকেন্ড বাকি আছে ।
রাফির চটচটে গলায় শান্ত লাফিয়ে উঠলো । বউ হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে বললো হাঁসফাঁস করে….
“ আরে ভাই যাচ্ছি তো , বেকার বেকার ভয় দেখাস কেনো এভাবে ? আমি কি আমার বউকে হারাতে পারি ? আমি গিয়ে ঐ ছমিনা আন্টি কে খেদিয়ে আসি, ওয়েট….
শান্ত ছুটলো ঘরের বাইরে । ও বেরোতেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো রাফি । শান্ত ধড়ফড়িয়ে ড্রইং রুমে আসলো । চেঁচিয়ে উঠলো….
“ ওরে ছমিনা আন্টি , আপনার মেয়ে ভেগেছে । কোথায় আপনি , বাঁচান রতন বলদা রে ।
ড্রইং রুমের সবাই আতংকে চমকে উঠলো শান্তর চেঁচানোতে । ছমিনা বেগম বিরাট নয়নে তাকালেন । কিছু বুঝে ওঠার আগেই শান্ত ঝট করে এসে টেনে দাঁড় করালো তাকে । আঁতকে উঠলেন ছমিনা বেগম । শান্ত হাঁসফাঁস করে উঠলো….
“ ও আন্টি , আপনার খাটাস গুণধর মেয়ে পাড়ার রতনের সাথে পালিয়েছে । বেচারা রতন কে বলদ পেয়ে ওকে টোপ বানিয়ে ভেগেছে আপনার মেয়ে । কে কোথায় আছেন , আপনার মেয়েকে ছেড়ে ঐ‌ রতন বলদা টারে বাঁচান….
শান্তর উল্টো পাল্টা বকবক । আফসানা বেগম শক্ত গলায় ধমক দিলেন….

“ এসব কি বলছিস শান্ত ? মাথা ঠিক আছে তোর ?
“ হ্যাঁ আম্মু , আমার মাথা একদম ঠিক আছে । তা না হলে বউকে হারানোর ভয়ে এমন করি আমি । তুমি বাদ দাও , তোমার সাথে কথা বলার সময় নেই ।
ও আন্টি , আমার কাছে টাটকা তাজা খবর আছে , আপনার মেয়ে রতনের সাথে পালিয়েছে একটু আগে । থানার ওসি ফোন করেছিল আমায় । ওসি সাহেবও বলদা রতন কে নিয়ে হেব্বি টেনশনে আছে ! আপনার মেয়ে আবার ওকে খেয়ে ছেড়ে দেবে না তো ? না মানে ওর টাকা পয়সার কথা বলছিলাম আরকি ! আপনার মেয়ে তো খুব লোভি , এটা আপনি হাড়ে হাড়ে জানেন । আপনার মেয়ে আপনার মতোই হয়েছে একদম । আপনি যান আন্টি , নিজের মেয়ে কে খুঁজুন । একটা ছেলের সর্বনাশ হতে দেবেন না এভাবে । আপনার মেয়ে ঐ বলদা টারে চিবিয়ে খাবে ।
আপনি বাঁচান ওরে । যান যান , বেরোন বাড়ি থেকে । তাড়াতাড়ি গিয়ে খবর করুন । দেখবেন আমি একশো পার্সেন্ট ভুল….

ছমিনা বেগম অবাকের চরম পর্যায়ে । শান্তর কথা সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার । উপস্থিত সবাই হতবাক । শান্ত ঠেলে ঠুলে ছমিনা বেগম কে একেবারে সদর দরজা থেকে বাইরে বের করলো । কিছু বলার সুযোগ টুকুও দিলো না ভদ্র মহিলা কে । একেবারে বের করে দিয়ে আবার মুখ খুললো….
“ যান আন্টি , আমি ভুল হলে আমাকে ক্ষমা করবেন । আসলে দিনে এমন দু চারটা ভুয়া খবর আসে আমার কাছে । ভুয়া টিভির সাথে যুক্ত আছি তো তাই । আপনি যান , পরে আমার ব্লাকমেইলার শালা চলে গেলে আবার দেখা হবে আপনার সাথে । বাই বাই…
শান্ত খট করে মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো । এখনো ওভাবেই বাইরে থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন ছমিনা বেগম । বাক রুদ্ধ তিনি । মাথা ভনভন করছে শান্তর পেঁচাল শুনে । বড় কথা হলো, তার তো কোনো মেয়েই নেই । দুটো ছেলে আছে তার । মেয়ে কোথা থেকে এলো ।
আর পাড়ার রতন , এটা আবার কে ? এই নাম তো এ জীবনে কোনো দিন শোনেন নি তিনি ।
এদিকে শান্ত দরজা লাগিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । ঘাম ছুটেছিল মুহুর্তেই । শান্ত কপালের ঘাম মুছলো । পিছু ফিরে তাকাতেই আফসানা বেগমের রগরগে ক্ষিপ্ত দৃষ্টির সম্মুখীন হলো সে । অমনি ভ্যাট ভ্যাট করে দাঁত কেলালো । ধমকে উঠলেন আফসানা বেগম….

“ এসব কি হলো শান্ত ? কি ধরনের ব্যবহার এটা ? অতিথি উনি , অতিথির সাথে এমন উদ্ভট রিয়াক্ট করার মানে কি ?
“ মেলা মানে আছে আম্মু ।
তুমি ওসব বুঝবে না । আমার বউ নিয়ে টানাটানির ব্যাপার আছে এতে । আর ওসব কূটনী মহিলাদের সাথে মিশতে নেই । রাফি বলেছে ঐ মহিলা কূটনী , তার মানে উনি কূটনী । এসব মহিলার থেকে দূরে থাকবে । কেমন ?
কথা বলেই আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না । দ্রুত পায়ে আগের ঘরটায় ঢুকলো । ড্রইং রুমে সবাই তাজ্জব বনে রইলো বিমুর্ত হয়ে । মহিলারা তাকালেন একে অপরের দিকে । আফসানা বেগম পড়লেন ভারী লজ্জায় । এই ছেলের ভাবমূর্তি কবে বদলাবে কে জানে ?
শান্ত ঘরে এসে দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল । যুদ্ধ জয় করে আসলো সে । রাফি হাসি চেপে বাহবা দিলো ওর পিঠ চাপড়ে…
“ ভেরি গুড ।
এভাবেই সাহসী হয়ে থাকবি সবসময় । আমার বোনকে তোর হাতে তুলে দিয়ে ভুল কিছু করিনি । আরো একটা বোন থাকলে সেটাকেও তোর হাতে তুলে দিতাম ।
এবার ক্ষুব্ধ হলো শান্ত । রাফির মশকরা বুঝে রুষ্ট স্বরে বলল ঝটকা মেরে…
“ সর সামনে থেকে ।

তোর একটা বোন কে সামলাতেই হিমশিম খাই । আবার আরো একটা ? লাগবে না আমার । আমার একটা হলেই চলবে । তুই তো আছিস ফ্রি ফ্রি । তোর বোন আমাকে যে প্যারা টা দিতে বাকি রাখবে , সেটা তুই দিয়ে দিবি ।
হেসে ফেললো রাফি ।
দুপুরের খাবার এ বাড়িতেই খেয়েছে ওরা । জেনি থাকবে রুহির সাথে এ বাড়িতে । মিহি আর রাফি কে ফিরতে হবে এখন । অনেক ক্ষণ হলো এ বাড়িতে আসার ।
রুহির থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ওরা । বাড়ির পথ না ধরে অন্য পথ ধরেছে রাফি । গাড়ি ছুটছে সেই পথে ।
মিহি পাশের সিটে চুপচাপ বসে । জানালার বাইরে দৃষ্টি ওর । দু’জনেই নীরব । পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে ।
মিহি এতক্ষণে বিপরীত পথ লক্ষ্য করে রাফির দিকে তাকিয়ে শুধালো….

“ এদিকে কোথায় যাচ্ছেন ?
“ তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি ।
হেসে ওঠে মিহি ।
“ আমাকে নিয়ে পালাবেন ?
“ হুম । কেনো , পালাবেন না আমার সাথে ?
“ উমমম , পালানো যায় আপনার সাথে । হ্যান্ডসাম আপনি । আপনার মতো দুটো খুঁজে পাবো না আর । কিন্তু কোথায় পালাচ্ছি আমরা ?
“ গন্তব্য হীন কোথাও । যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে ।
“ কিন্তু আমার যে গন্তব্য প্রয়োজন ! গন্তব্য হীন হাঘরে হতে চাই না আমি । একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে আপনার সাথে সংসার পাততে চাই ।

“ সংসার ?
“ হুম ।
“ কি কি চান নিজের সংসারে ?
“ একটা সম্পুর্ন আপনি কে চাই ।
“ আর ?
“ আপনি হলেই চলবে ! আপনি থাকলে সবকিছু পেয়ে যাবো আমি ।
রাফি নরম হাসলো । মিহি মিষ্টি হেসে দৃষ্টি ঘোরায় জানালার বাইরে । মার্কেটের সামনে গাড়ি থামে ওদের । রাফি গাড়ি পার্ক করে নিজে নামে প্রথমে । ঘুরে এসে দরজা খুলে দেয় মিহির নামার জন্য । মিহি গাড়ি থেকে নেমে আশপাশ দেখে শুধায়…
“ এখানে আসলাম কেনো ?
“ কিছু কেনার আছে ।

রাফি কথা বাড়াতে দেয় না আর । ভেতরে ঢোকার আগে মুখে মাস্ক পড়ে নেয় একটা । একটা ফোনের শপে ঢোকে ওরা । মিহি চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে ব্যস্ত । আগে থেকেই শপে পার্সেস করা ছিলো কিছু । রাফি ভেতরে ঢুকতেই খুশিতে চিকচিক করে উঠলো শোরুমের সকলে । রাফির পার্সেস করা জিনিস টা তৈরিই রেখেছিলেন তারা । একজন ওয়ার্কার রাফি কে চেনা মাত্রই দ্রুত বের করে দিলেন একটা প্যাকেট । রাফি মাস্কের আড়ালে মুচকি হাসলো শুধু । বিল পে করা ছিলো আগে থেকেই । রাফি পার্সেল টা হাতে নিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল…
“ থ্যাঙ্কস ।
“ ওয়েল কাম স্যার ।
আর , একটা কথা ছিলো ?
“ ইয়েস !
“ একটা গ্রুপ ফটো তোলার ছিলো আপনার সাথে । ইউ ক্যান, প্লিজ ?
“ ইয়াহ , শিউর ।
সারি বদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো উপস্থিত সকলে । মিহি দূরে সরে এসেছে তাজ্জব বনে । এখানের কিছুই বুঝলো না সে । মাথায় ঢুকলো না কিছু । এটা বুঝলো শুধু , রাফির সাথে এখন ছবি তুলবে সকলে । মিহি কে দূরে দেখে সেই একই ব্যক্তি গলা নামিয়ে বললো রাফির উদ্দেশ্য…

“ অর , ম্যাম ?
“ নো , ইউ ক্যান অনলি টেক উইথ মি !
ছবি তোলা শেষে দ্রুত পায়ে মিহি কে নিয়ে শপ ত্যাগ করলো রাফি । বাইরে এসে চটজলদি গাড়িতে উঠে বসলো দুজনে । মিহি কিছুই জিজ্ঞেস করলো না । রাফি হাতে থাকা প্যাকেট টা এগিয়ে দিয়ে বললো….
“ এটা তোমার !
মিহি তাকায় সেটার দিকে । অতঃপর রাফির দিকে । সন্দিহান হয়ে শুধায়..
“ কি ?
“ ফোন !
“ হ্যাঁ ?
“ হুম ! এটা তোমার ফোন । নতুন সিম কার্ড ইন করা আছে অলরেডি । আমার নাম্বার সেইভ করে দেবো । সময়ে অসময়ে যেকোনো সময়ে ফোন আসবে এই ফোনে । যখন তখন ঘরের সামনে উঁকি ঝুঁকি দিতে ভালো লাগে না ।
মিহি পলক ঝাপটালো ঘন । রাফির দিক থেকে চোখ সরিয়ে প্যাকেট টার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো ।

মাঝে কাটলো আরো একটা রাত । পরদিন রবিবার । বাড়ির একটা মেহমান ও বাড়ি ছাড়া হয় নি এখনো । সেই বিয়ের ডেকরেশন ও একই আছে । কিছুই পরিবর্তন হয় নি । বাড়ির সবাই নির্বিকার । রাফি কাল বাড়ি ফিরেই রাশেদ রায়হান চৌধুরীর কাছে গেছিলো । তিনি বলেছিলেন ফিরে আসার পর রাফির সাথে কথা আছে তার । সেজন্যই মূলত তার কাছে গেছিলো রাফি । কিন্তু রাশেদ রায়হান চৌধুরী মূল কথায় আসেন নি । এটা ওটা টুকটাক কথা বলেছেন ছেলের সাথে । আরো বলেছেন কাল রুহিরা আসলে সবার সামনে কিছু জানাবেন তিনি ।
রাফি বেশি মাথা ঘামায় নি ।
আজ রুহি , শান্ত আসবে এ বাড়িতে । বিকেলের পর পর এসেও গেছে ওরা । জাকির হোসেন আর শাহরিয়ার শান্ত দুই বাপ ছেলে এসেছে তাদের শশুর বাড়িতে । এই প্রথম জামাই হিসেবে শশুর বাড়িতে আগমন শান্তর । সে আছে সেই ভাবসাবে ।

একেই যৌথ পরিবার । তার উপর আত্মীয় স্বজনে ভরপুর পুরো বাড়ি । গমগম করছে পুরো বাড়ি । সন্ধ্যার দিকে ভরে উঠেছে আরো । সবাই জড়ো হয়েছে ড্রইং রুমে এক জায়গায় । গল্পের আসর বসেছে সকলের । আফসানা বেগম বরপক্ষ হওয়ায় মিসিং ছিলেন গত ক’দিন । আজ আবার যুক্ত হয়েছেন তিনি ।
এসেছে থেকে রুহির দেখা মেলে নি নিচে । রুহি, মিহি,লিনা, বর্ষা ওদের মেয়েলি আড্ডা জমেছে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে । চিকন কন্ঠে হাসির ঝংকার উঠছে ঘরের মধ্যে । ইভান আর রাফি, শান্ত কে নিয়ে বেরিয়েছিল একটু । ওরা ফিরেছে ঠিক সন্ধ্যার পর । তাও শান্তর জোরাজুরিতে ফিরেছে । শান্তর মন টিকছে না বাইরে ।
ওরা ফিরেই উপরে উঠার জন্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো । অমনি ভরাট কন্ঠে ডাকলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী….

“ রাফি ?
রাফি থমকে উত্তর দেয়…
“ জ্বি আব্বু ।
“ এদিকে এসো সকলে । বসো , কথা আছে তোমাদের সাথে !
রাফি সিঁড়ি থেকে পা নামিয়ে সেদিকে এগোলো । ওর পিছু পিছু ইভান । বসলো ওরা । শান্ত মলিন মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে । ও এখন রুহির কাছে না গেলে শান্তি পাবে না । ও শান্ত আর রুহি ওর শান্তি ।
শান্ত কে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আফসানা বেগম ডাকলেন…
“ তুই ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো , আয় !
“ না , মানে এক মিনিটের মধ্যেই আসছি আমি । আমার শান্তিকে এক পলক দেখে আসি গিয়ে ।
বলেই চটভট করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো ও । পেছনে ফিক করে হাসলো বাকিরা । রাশেদ রায়হান চৌধুরী ওকে না থামিয়ে বললেন….
“ রুহি আর মিহি মামনি কে নিয়ে নিচে এসো শান্ত । তাড়াতাড়ি এসো !
শান্ত উঠে গেছে এর মধ্যেই । ঘরের ঢুকে সোজাসুজি চঞ্চল স্বরে তাড়া দিলো ও ….
“ আরে তোমরা এখানে বসে কি করছো । নিচে সবাই ডাকছে তোমাদের । এই লিনা , মাই ওয়ান এন্ড অনলি পাতানো বোন , নিচে যা বোন । আর মাই কিউটি ছোট শালিকারা তোমরাও নিচে যাও । আমার শশুর মশাই ডাকছে তোমাদের । যাও যাও , জলদি যাও…
লিনা আর বর্ষা তাড়া খেয়ে নেমে গেছে । দ্রুত ঘর ছেড়েছে ওরা । মিহি কপাল গুটিয়ে রুহি কে বললো…

“ চল পাখি !
শান্তর তৎক্ষণাৎ মোচড়ানো স্বর…
“ এই পরী , তুই যা । আমি আমার বউকে নিয়ে আসছি । যা বনু , ডিস্টার্ব করিস না ।
মিহি ঠোঁট উল্টে ভেংচি কাটলো । দ্রুত বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে । রুহি শান্ত কে উপেক্ষা করে ওর পিছু পিছু বেরোতে গেলে খপ করে ওর হাতটা টেনে ধরলো শান্ত ।
একটানে রুহি কে আঁচড়ে ফেললো নিজের বুকে । পিছন থেকে শক্ত করে রুহি কে জড়িয়ে কাঁধে থুতনি ঠেকালো । খোঁচা দাড়ি উন্মুক্ত কাধে বিদ্ধ হতেই কুঁকড়ে গেলো রুহি । বললো ভড়কানো অস্ফুট স্বরে…
“ কি করছেন টা কি ? ছাড়ুন !
“ একটু পর ছাড়বো বউ । অনেকক্ষণ ধরি নি তোমায় । এখন ধরেছি , ছাড়তে বলো না এতো সহজে ।

সবাই এখন নিচে উপস্থিত । একটু বাদ শান্ত আর রুহি ও নিচে আসলো । এতো গুলো মানুষের উপস্থিতিতেও পিনপতন নীরবতা পুরো হল রুমে । রাফি নিরবতা ভেঙ্গে মুখ খুললো সবার মধ্য থেকে …..
“ আব্বু, কিছু বলার ছিলো আপনার ?
রাশেদ রায়হান চৌধুরী সোজাসুজি বলতে শুরু করলেন…
“ হুম । আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি রাফি ! আমরা চাইছি এক সুযোগেই আরো একটা ইভেন্ট আয়োজন করতে । সেটা তোমাকে নিয়ে । তোমার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা । এখন শুধু তোমার মতামতের অপেক্ষায় । বাইরের ডেকরেশন চেঞ্জ করা হবে শুধু । অতিথি রাও সবাই আছেন । এখন তুমি যা বলবে তাই ।
রাফি মুখো ভঙ্গিমা নিরেট করে ফেললো মুহুর্তেই । কঠোর করলো চোয়াল । চোখের চাহনি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে এখনো তাকিয়ে আছে রাশেদ রায়হান চৌধুরীর দিকে । এদিকে মিহি ধক্ করে উঠেছে । সাবিনা বেগমের পাশে বসে ছিল সে । রাশেদ রায়হান চৌধুরীর এহেন কথায় ছলকানো দৃষ্টিতে ঝট করে চাইলো রাফির দিকে । সবার অবস্থা স্বাভাবিক । শুধু মাত্র রাফি আর মিহি ব্যাতীত । রুহিও ভড়কেছে একটু । শান্তর হাসি পেলো ভেতর ভেতর । এবার রাফির অবস্থা দেখার পালা ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী খানিক থেমেছেন । দম নিয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন শান্ত কন্ঠে….

“ মিহি আমাদের দায়িত্ব, রাফি । আর তুমিও । এখন হয় তুমি , আর নয়তো মিহি । আমাদের একটা সিদ্ধান্ত আছে । আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত যদি তোমার পছন্দ না হয় । তাহলে আমাদের অন্য কিছু ভেবে দেখতে হবে । এতো দিন তোমাকে কোনো কিছুতে জোর করি নি । এখনো করবো না । যদি তুমি এখন ও বিয়ে করতে না চাও , তাহলে আমরা মিহি কে নিয়ে ভেবে দেখবো । আর যাই হোক, তোমার জন্য তো আর ওকে অপেক্ষায় রাখতে পারি না । তুমি বিয়ে না করলে আমরা মিহি কে….
“ ব্যস আব্বু , কোনো বিয়ে হবে না । না মিহির , আর না আমার…
তৎক্ষণাৎ রাশেদ রায়হান চৌধুরী কে কথার মাঝে থামিয়ে উঠে দাঁড়ালো রাফি । মুখো ভঙ্গিমা শক্ত হলেও আব্বুর উপর কন্ঠ চড়াও হলো না । অত্যন্ত স্বাভাবিক শোনালো কথার টোন । রাশেদ রায়হান চৌধুরী কপাল গুটিয়ে অবান্তর ভঙ্গিতে তাকালেন ।
ছেলের উদগ্রীবতা দেখেও স্বাভাবিক ভাবেই বললেন তিনি…

এক দেখায় পর্ব ৬২

“ তার মানে তুমি বিয়ে করবে না এখন ? তাহলে তোমার কথা বাদ । আমরা মিহি কে নিয়ে ভাবছি তবে । ওকে অন্য কোথাও বিয়ে দেবো আমরা ।
রাফি কথাটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করলো না । শক্ত মুখশ্রী টানটান করলো । ভরাট কন্ঠে শান্ত হল‌ রুমে ঝংকার তুললো….
“ ফাস্ট অফ অল , আমি বিয়ে করছি না । বিকজ আই এম অলরেডি ম্যারেইড । আর বাকি রইলো মিহি । মিহি উইল নট গেট ম্যারেইড এইদার, বিকজ সি ইজ অলরেডি সাম ওয়ান ইলস ম্যারেইড ওয়াইফ…

এক দেখায় পর্ব ৬৪