এক দেখায় পর্ব ৬৪
সুরভী আক্তার
পুরো হলরুমের সবার মাঝে তীব্র বজ্রপাত হলো । রাফির টাটানো স্বরে স্তব্ধ হয়ে গেলো উপস্থিত সবাই । রাফি থামতেই গুমোট ভাব ছড়িয়ে পড়লো । সবাই মূর্ত বনে অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল রাফির শক্ত মুখশ্রীর পানে । রাফির কোনো হেলদোল নেই । শান্ত ব্যাতিত এখানকার সবাই চমকেছে । শান্ত পায়ের উপর পা তুলে বেশ ভাবসাব নিয়ে বসলো । মিহির অবস্থা আরো শোচনীয় । সেও চেয়ে আছে তাজ্জব চোখে । রাফি কি বললো এসব ? ভুল শুনলো না তো ? মিহি ঘন শ্বাস ফেলার চেষ্টায় রত । সাবিনা বেগম রাফির থেকে অবাক দৃষ্টি সরিয়ে পাশে বসে থাকা নিজের মেয়ের পানে দৃষ্টি তাক করলেন ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী মুখো ভঙ্গিমা শক্ত করলেন পুরোপুরি । রাশভারী কন্ঠে বললেন তিনি…
“ আমরা সিরিয়াস রাফি ! এখানে মশকরা হচ্ছে না । ভেবেচিন্তে কথা বলো । যা তা বলে ফেলছো তুমি !
“ আমি মশকরা করার মতো কেউ নই আব্বু । আর এখানে সিরিয়াস বিষয়ে মশকরা করবো না নিশ্চয়ই ? আমি যা বলছি , সিরিয়াসলি বলছি ।
“ রাফি , কি সব হচ্ছে এখানে !
হেনা বেগমের কন্ঠে ধমক । রাফি কপালে ভাঁজ ফেলে আম্মুর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো । শুধালো তৎক্ষণাৎ…
“ কি হচ্ছে আম্মু ?
“ আমরা একটা সিদ্ধান্ত জানিয়েছি তোর কাছে । তুই শোন আগে , অমত থাকলে অমত কর । আমরা তো তোকে জোর করছি না । তাহলে এমন উল্টো পাল্টা বকছিস কেনো তুই ? সব ছেড়ে নিজের বিয়ে ? বিবাহিত তুই ? কবে বিয়ে করেছিস ? আর নিজের সাথে সাথে মিহি কেও জড়াচ্ছিস দেখছি ? মিহি বিবাহিত ?
কথা শেষ করেই হেনা বেগম প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি পাত করলেন মিহির দিকে । হেনা বেগমের সাথে সাথে উপস্থিত সবাই । সবার এতো গুলো দৃষ্টি নিজের দিকে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মিহি । সে নিজেও কিছু বুঝতে পারছে না । মিহি থতমত খেয়ে যায় । ঢোক গেলে শুষ্ক । থতমত স্বরেই বুলি ফুটায় রুদ্ধ গলায়…
“ আমি তো বিয়ে করিনি । এভাবে কেনো দেখছো আমায় । আমি কাউকে বিয়ে করিনি । বিয়ে হয় নি আমার ।
“ উঁহু , বিয়ে হয়েছে তোমার ।
মাহিতা ইসলাম মিহি ম্যারেইড । বিয়ে হয়ে গেছে তার । আর রুজান রাফি চৌধুরীর ও । দে বোথ আর ম্যারেইড ।
সবাই শুনে রাখো , মিহি ইজ মাই ওয়াইফ । রুজান রাফি চৌধুরীর ওয়াইফ । উই আর আলরেডি ম্যারেইড ।
এবার দ্বিতীয় দফা বাজ পড়লো সবার মাঝে । আঁতকানো দৃষ্টিতে চাইলো সকলে । সকলের চোখ ঝলকানি দিয়ে উঠছে । টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে সবার মাঝে । রাফি কথা শেষ করে থামতেই শুকনো কেশে উঠলো মিহি । রুহি এক মুহুর্ত থমকালেও চটপট নিজেকে সামলে উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসলো । মিহির দিকে গ্লাস এগিয়ে দিতেই ঢকঢক করে পুরো গ্লাসটা ফাঁকা করলো মিহি । অতঃপর শ্বাস টানলো হাঁসফাঁস করে ।
রাফির দিকে তাকাতেই রাফির স্থির দৃষ্টির সম্মুখীন হলো । যে দৃষ্টিতে এক রাশ শান্তনার ভাষা । মিহি ফের শুকনো ঢোক গেলে । মাথায় ঝিঁঝিঁ ধরেছে ওর । শরীর অবস হয়ে আসছে ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিজেকে আরো কঠোর করলেন । তপ্ত স্বরে মুখ খুললেন….
“ কি বলছো ভেবে বলছো তুমি ? মিহি তোমার ওয়াইফ মানে ?
“ জ্বি আব্বু , মিহি আমার ওয়াইফ ।
আমরা অলরেডি ম্যারেইড ।
জুবায়ের চৌধুরী মুখ খুললেন এবার….
“ এসব কি বলছো রাফি ? মিহি তোমার ওয়াইফ কি করে ?
“ বিয়ে করেছি তাই ।
তৎক্ষণাৎ উত্তরে থতমত খান জুবায়ের চৌধুরী । হেনা বেগম শাসনের স্বরে ফের ধমকান ছেলেকে….
“ রাফি , বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে এবার ।
রাফি একটা কথাও বাড়ালো না আর । ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উদ্দাম পায়ে সিঁড়ি বেয়ে গটগটিয়ে উপরে উঠলো । হেনা বেগম চড়া কন্ঠে ডাকলেন , সাঁড়া দিলো না রাফি । মিহি এখনো তাজ্জব হয়ে বসে । সকলের দৃষ্টি বুঝে ও বিড়বিড় করলো….
“ আমি কিছু জানি না । আমাকে এভাবে দেখছো কেনো সবাই ? সত্যিই বলছি , আমি কিচ্ছু করি নি । বিয়ে কি করে,কি হলো,কি বললেন উনি , এসব আমি কিচ্ছু জানি না ।
রুহি এবার শান্ত কে কনুই দিয়ে খোঁচালো । কিছু মিছু আন্দাজ করতে পারছে সে । রাফি মিথ্যে বলবে না এটা ওর জানা । রুহি ফিসফিসিয়ে বললো শান্তর কানে কানে…
“ এই যে , এখানে এসব কি হচ্ছে ? ভাইয়া আর পাখি বিবাহিত মানে ? কি বলছে ভাইয়া ? কবে বিয়ে হলো ওদের ?
শান্ত ঠোঁট কামড়ে হাসে । একই ভাবে ফিসফিসিয়ে বলে…
“ জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ , জান । দেখো কি হয় । পিকচার আভি বাকি হে মেরা জান….
এরমধ্যেই রাফি নিচে নামলো আবার । যেভাবে গটগটিয়ে গেছিলো , মিনিটের মাথায় সেভাবেই গটগটিয়ে ফিরে আসলো । হাতে একটা কাগজ । সবার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাগজটা টি টেবিলের উপর ঠাস করে ফেললো রাফি । বললো কন্ঠ উঁচিয়ে…
“ এইযে আমাদের ম্যারেজ সার্টিফিকেট । আজ থেকে প্রায় এক মাস আগে আমার আর মিহির বিয়ে হয়ে গেছে । আমাদের বিয়ের কাবিন আছে এখানে । যেখানে আমাদের দুজনেরই সাইন আছে । বিশ্বাস না হলে দেখে নিতে পারেন । আমরা অলরেডি ম্যারেইড । ম্যারেইড ম্যারেইড ম্যারেইড…
জাস্ট সি….
রাশেদ রায়হান চৌধুরী কাগজ টা হাতে তুললেন । উল্টে পাল্টে দেখলেন । বিয়ের আইনি কাগজ পত্র । যেখানে দু’জনেরই সাক্ষর জ্বলজ্বল করছে ।
বেশ খানিকক্ষণ কাগজ টার দিকে থম মেরে তাকিয়ে রইলেন তিনি । তার হাত থেকে জুবায়ের চৌধুরী টেনে কাগজ টা নিয়ে নিলেন । তিনিও দেখলেন সবটা খুঁটিয়ে । তার মুখখানাও শুকিয়ে গেলো বড় ভাইয়ের মতো । আফসানা বেগম অধৈর্য হয়ে শুধালেন….
“ কাগজে কি আছে ভাইয়া ?
“ বিয়ের কাগজ , যেখানে সাইন আছে দুজনের । আইনি ভাবে ওরা বিবাহিত । অন্তত কাগজ তো তাই বলছে ।
“ এটাই সত্য । আমরা বিবাহিত । আজ থেকে নয় । প্রায় এক মাস আগ থেকে । আর নতুন করে নিশ্চয়ই বিয়ে করবো না অন্য কাউকে ? আমি অলরেডি ম্যারেইড , যাকে বিয়ে করেছি,সে আমার ওয়াইফ মাহিতা ইসলাম মিহি । তাকে বা আমাকে নিয়ে কারোর কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন ?
“ বিয়ে কোথায় করেছো ?
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর কাঠ কাঠ প্রশ্ন । সবাই চুপ হয়ে গেছে। উত্তর করলো রাফি..
“ সিলেটে থাকাকালীন ।
“ আমাদের জানানোর প্রয়োজন টুকুও বোধ করো নি ?
“ জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিলো না তখন !
“ কেনো পরিস্থিতি ছিলো না ? কেউ জোর করেছে তোমায় ? হঠাৎ হঠাৎ নিশ্চয়ই বিয়ে করো নি । কাগজ পত্র সাজানো হুট করে হয় নি নিশ্চয়ই ? কেউ ফোর্স করে নিশ্চয়ই তোমার মতো একটা ছেলেকে বিয়ে দেয় নি ? স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় সবটা হয়েছে নিশ্চয়ই ? তাহলে আমাদের জানালে না কেনো ? আমরা তোমার গার্ডিয়ান , তোমার নিজের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আমাদের সিদ্ধান্তের ও যথার্থ মূল্য আছে !
“ আই এম সরি আব্বু । তখন সে সময়ে জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিলো না ।
“ মিহি ?
মিহি চমকে তাকালো বড় আব্বুর দিকে । চোখ জ্বলে উঠলো ওর । বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠলো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী কিছু বলতে যাবেন , এর আগেই কথায় বাঁধা প্রদান করলো রাফি….
“ মিহি কিছু জানে না আব্বু ।
যা বলার আমাকে বলুন ।
“ মানে টা কি ? বিয়ে হয়েছে তোমাদের দুজনের ! আর মিহি কিছু জানে না ? ওর সাইন আছে এই কাগজে । ওকে নিজের ওয়াইফ বলে দাবি করছো তুমি ।
“ করছি , কারন ও আমার ওয়াইফ ।
আই লাভ হার , সি ইজ মাই ওয়ান এন্ড অনলি অবসেশন । আই ওয়ান্ট হার । সি ইজ অনলি মাইন । ওকে বিয়ে করেছি আমি । সেটা ওর অজান্তে । কাগজে ওর সাইন আছে , যে সাইনটা ও নিজের অজান্তে করেছিলো । আমি করিয়েছি , কজ আই লাভ হার । আর আমি ওকে নিজের করে রাখতে চেয়েছি , এটাই ফ্যাক্ট ।
অনেক কিছু হয়ে গেছে আব্বু , গত আট মাসে অনেক কিছু হয়ে গেছে । মিহি আমার জীবনে আসার পর থেকেই অনেক কিছু হয়ে গেছে । সেই ফার্স্ট দিন থেকেই অনেক কিছু হয়ে গেছে । আমি জানতাম ও না ও আমাদের মিফতাহুল । তোমাদের সাথে সাথে আমিও জেনেছি এক দিনে এক সময়ে । এর আগে আমি ওকে শুধু মিহি হিসেবেই জানতাম । জানতাম আমি ওকে ভালোবাসি । রুহির বেস্ট ফ্রেন্ড কে ভালোবেসে ছিলাম আমি , কিন্তু সে যে আমার পরী এটা জানতাম না । ও কে এটা বড় বিষয় নয় , বড় বিষয় এটাই , আই লাভ হার । এন্ড নাউ , সি ইজ মাই লিগ্যালি ওয়াইফ । সেটা ওর অজান্তে হলেও ও আমার ওয়াইফ ।
আজ যখন সবাই জেনেই গেছেন , তখন মন দিয়ে শুনে রাখুন , আমি আর মিহি আমরা বিবাহিত । উই লাভ ইচ আদার । এটাই সত্য !
রাফি থামলো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী আবার শক্ত কন্ঠে মিহি স্বম্বোধন করলেন । এবারও চমকালো মিহি । ভয়ার্ত হয়ে ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলেছে এতক্ষণে । ও ফুঁপিয়ে উঠলো এবার । অমনি আঁতকে চাইলো সকলে । ধক্ করে উঠলো রাফি । সে সবাইকে উপেক্ষা করে দ্রুত কদমে ছুটে গেলো মিহির কাছে । মিহি মাথা নুইয়ে ফেলেছে । রাফি হাঁটু মুড়ে বসলো ওর সামনে । মিহির মুখ উঁচু করে ধরে ভড়কানো গলায় বলতে লাগলো….
“ আই এম সরি ব্লোসোম , আই নো তুমি এসব, আমাদের বিয়ের বিষয়ে জানতে না । আমিও জানাই নি , বাট এটা করা প্রয়োজন ছিলো । তোমাকে না জানিয়ে এটা করেছি এর জন্য আই এম রিয়েলি সরি । প্লিজ কেঁদো না । কেউ কিচ্ছু বলবে না । ইউ শাট্ প্লিজ । প্লিজ ডোন্ট ক্রাই…
সবাই আহম্মক বনলো রাফির কান্ডে । মিহির প্রতি রাফি কে এতো টা উদগ্রীব দেখে মুচকি হাসলো শান্ত রুহি আর মেহজাবিন । রাশেদ রায়হান চৌধুরী চোখ নামিয়ে গলা খাঁকারি দিলেন । পিছিয়ে গেল মিহি ।
রাফির পরিবর্তন নেই । রাশেদ রায়হান চৌধুরী খানিক হাসলেন । হাসি চেপে কন্ঠ ভার রেখেই বলে উঠলেন….
“ তাহলে আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের কি হবে ?
আমরা যে চাইছিলাম বাড়িতে আরো একটা বিয়ে হোক । আমাদের সিদ্ধান্তের, চাওয়ার মূল্য নেই কোনো ?
রাফি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় । ধীর কন্ঠে বলে….
“ আমাদের দুজনের মধ্যে কেউই অবিবাহিত নয় ।
“ তোমরা তো বিবাহিত । চুপিসারে বিয়ে করে ফেলেছো , বউ জানেই না সে বিবাহিত,সে কারোর স্ত্রী । অথচ স্বামী তাকে নিজের বউ হিসেবে দাবি করছে । বাহ্ বাহ্, চমৎকার দৃশ্য । এ তো বিরল দৃশ্য , আগে কখনো দেখেছো এমন , নাকি শুনেছো ?
একটু থামলেন । আবার বললেন….
“ তোমরা কান্ড ঘটিয়েই ফেলেছো । তবে আমরাও আমাদের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু পা হবো না । আমরা যখন বলেছি বিয়ে হবে, তার মানে বিয়ে হবে ।
“ আব্বু ?
“ হুম , বিয়ে তো হবেই । তোমার কথা বাদ । আমি আমার মেয়ে মিহি কে নিজের পছন্দের পাত্রের সাথেই বিয়ে দেবো । আমার মেয়ে , মাহিতা ইসলাম মিহির বিয়ে হবে চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলে রুজান রাফি চৌধুরীর সাথে । এতে পাত্রের মতামত জানার আগ্রহ প্রকাশ করছি না আমি । আমি আমার মেয়ের মতামত জানতে চাইছি ! মিহি….
রাফি বিরাট নয়নে তাকায় । সাথে সাথে কান্না থামিয়ে ভ্যাট ভ্যাট করে চায় মিহিও ।
ছেলের সাথে চোখাচোখি হতেই ঠোঁটের কোণে ভিড় জমানো হাসি টুকু ঠেলে দূরে সরালেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । মুখখানা করলেন গুরুগম্ভীর । এবার রাফির নিজের কানকে বিশ্বাস হলো না । শূন্য মাথায় নিজেকে, নিজের কানকে ভুল মনে হলো ওর । রাফি অবিশ্বাসে অস্ফুটে উচ্চারণ করলো….
“ এ্যাহহহহ ?
“ এ্যাহ নয় হ্যাঁ । আমার মেয়ের জন্য একটা সুযোগ্য পাত্র পছন্দ করেছিলাম আমি । সেই পাত্র আমার গুণধর পুত্র । চৌধুরী পরিবারের একমাত্র ছেলে রুজান রাফি চৌধুরী । আজ এখানে তার মতামত জানার ছিলো , সে কি আমার মেয়ে কে বিয়ে করবে ? আমরা আমাদের মেয়েকে অন্যথায় দূরে সরাতে চাইছি না । তাই এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া । কিন্তু এটা জানা ছিলো না পাত্র পাত্রী আগে থেকেই একটা বিশাল বড় কান্ড ঘটিয়ে বসে আছে । তারা যে একে অপরকে পছন্দ করে এটা জানা ছিলো আমার । কিন্তু এটা জানা ছিলো না তারা ইতিমধ্যে বিবাহিত …
রাফি অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছালো । হা বনলো সে আব্বুর কথায় । রাশেদ রায়হান চৌধুরীর শান্ত দৃষ্টি । বাকিরা সবাই নীরব দর্শক । মিহির অবস্থাও দূর্বোধ্য । রাফি তার আব্বুর শান্ত দৃষ্টির পানে তাকিয়ে সন্দিহান হয়ে শুধালো….
“ আমরা একে অপরকে পছন্দ করি , আর এটা আপনি জানতেন মানে ?
“ চোখ এখনো পরিষ্কার আছে আমার । চশমা লাগিয়ে চোখে ঠুলি পড়ে বসে নেই আমি । খোলা চোখে যা দেখেছি তাই বুঝেছি….
ভ্যাবাচ্যাকা খায় রাফি । ঝটকা খায় বিশাল বড় ।
মিহি হতবাক হয়ে থম মেরে বসে আছে । রাফি গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে নিজের আব্বুর দিকে । ওকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তি বোধ করলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । কপাল গুটিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললেন….
“ দেখছো টা কি এভাবে ?
এরেন্জমেন্ট করাই আছে । এখন শুধু একে একে অনুষ্ঠান করার পালা । বাইরে কোথাও বিয়ে হচ্ছে না তোমার । ঘরেই হচ্ছে । তবুও দ্বিমত আছে ? বিয়ে করবে না ? যেটা হয়েছিল সেটাকে ওভাবেই থাকতে দাও । আমাদের মতামতের গুরুত্ব দাও একটু । আশা করছি এবার গুরুত্ব দেবে ।
আর মিহি … তোমার কিছু বলার আছে ?
মিহি নাক টানলো । গলায় চিবুক ঠেকালো বেশি করে । রাশেদ রায়হান চৌধুরীর ভারী কন্ঠস্বর । বুক ধড়ফড় করছে মিহির । রাফির বলা কথা গুলো , এই বিয়ে , এসব এখনো পরিষ্কার নয় ওর কাছে । শূন্য মস্তিষ্কে হিসেব মেলাতে পারছে না মিহি । কি করে হলো এসব ? আর কখন হলো ? ওর অজান্তেই ওর বিয়ে হয়ে গেলো ?
মিহির মাথায় ঢুকছে না কিছু । উপস্থিত সবাই সচকিত হয়ে বসে । রাফি কে নির্বিকার ভঙ্গিতে থাকতে দেখে রাশেদ রায়হান চৌধুরী থমথমে গলায় বললেন আবার….
“ আজব , কেউ কিছু বলছো না কেনো ? আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাদেরকে দুজন কে । আমার কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে ? পরিষ্কার করে বলবো ?
বলি, আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মিহি কে আমরা ঘরেই রাখবো । তুমি যে মিহি কে পছন্দ করো , আর এই পছন্দ টা যে ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে , এটা বুঝতে অসুবিধা হয় নি আমার । আমি তোমার বাবা , এটা ভুলে যেও না । তোমাকে যথেষ্ট চিনি আমি । আমি জানি হয়তো এসব খোলামেলা ভাবে বলাটা শোভা পায় না । এই নিয়ে তাই তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস ও করিনি আমি । ভেবেছিলাম একেবারে সিদ্ধান্ত জানাবো । এটা ভাবিনি সিদ্ধান্ত টা শোনার আগেই তুমি এতোবড় একটা লুকায়িত সত্য জানাবে আমাদের । আমি অন্তত তোমার কাছে এটা আশা করিনি রাফি ।
বিষন্ন শোনালো শেষের কথা গুলো । রাফি ঢোক গিলে তৎক্ষণাৎ ডাকলো…
“ আব্বু ? আমি….
“ ব্যস , আর কিছু শুনতে চাই না ।
অতিথিরা সবাই আছেন এখানে । সবাই শুনে রাখো একসাথে , আগামী পরশু রাফি আর মিহির বিয়ে হবে । কাল গায়ে হলুদ । আমি দেরি করাতে চাইছি না । রাফি আর মিহির আলাদা করে মতামত শোনার প্রয়োজন বোধ করছি না আর ।
কথা শেষ করলেন তিনি । রুহি আর শান্ত চিকচিক করে উঠলো । রুহি মিহির কাছে এগোনোর আগে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো মিহি । চোখ মুছে দ্রুত কদমে রাফি কে টপকে ছুটলো সিঁড়ির দিকে । ভড়কালো রাফি । আকস্মিক কান্ডে রুহি হতবাক হয়ে ওর পিছু নিতে গেলে বাঁধা দিলো রাফি ।
“ রুহি ।
রুহি থামতেই রাফি না বোধক মাথা ঝাঁকালো । উপস্থিত সবাইকে অবাক করে নিজে ছুটলো মিহির পিছু । ওরা দুজন চলে যেতেই হেসে উঠলো সকলে । আফসানা বেগম শান্ত আর রুহি কে পরখ করে দুদিকে মাথা নাড়ালেন । তার এসব জানা ছিলো না কিছু । আন্দাজেও ছিলো না । তিনি দীর্ঘ হাঁফ ছেড়ে বললেন….
“ বাহ্ , আমাদের বাড়ির ছেলেরা দেখি শুধু তাদের বোনদের উপর পিছলা খায় ! ঘরের মেয়ে ব্যাতীত বাইরে চোখ যায় না ওদের । এটাই কি তবে কলি যুগ ? ছেলেরা দেখি , ঘরে বসে বসে নজরের হেফাজত করে ।
ফিক করে হেসে উঠলো সকলে । বেহায়া শান্ত চট করে ফোড়ন কাটল আম্মুর কথায়…..
“ বোন নয় আম্মু , বউ বলো । ওরা কোনো কালেই বোন ছিলো না আমাদের । বউ ছিলো বলেই পিছলা খাইছিলাম ।
মিহি ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে । রাফি দরজা ধাক্কালো । খুললো না মিহি । রাফি বেশ কবার ডেকে নিজের ঘরে ঢুকলো । সোজা ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো । দুই ব্যালকনির মধ্যবর্তী হাঁফ দেয়াল টপকে দ্রুত মিহির ঘরে ঢুকলো । মিহি তখন খাটের উপর বসে । দুই হাত বিছানায় ঠেসে নাক টানছে বারবার । ফোপাচ্ছে ও । রাফি দ্রুত এগিয়ে ভড়কানো গলায় ডাকলো….
“ মিহি !
মিহি ঝট করে এক পলক তাকালো । রাফি কে দেখে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো । মুখ ফিরালো বিপরীত দিকে । রাফি তড়িঘড়ি করে এলোমেলো পায়ে এগোলো । ওর সম্মুখে হাঁটু মুড়ে বসে শান্ত কন্ঠে ডাকলো…
“ মিহি , কাঁদছো কেনো ? কি হয়েছে কাঁদার মতো ? আমি কি ভুল করেছি ? বলো । আমি জানি তোমাকে এই নিয়ে কিচ্ছু জানাই নি । বাট , এটা ছাড়া আমার আর উপায় ছিলো না ট্রাস্ট মি । আমি তোমাকে আর হারাতে চাই নি । সেই মুহূর্তে আমার যা মাথায় এসেছে , তাই করেছি আমি । এতে এভাবে কাঁদছো কেনো তুমি ? এটা তো একদিন না একদিন হওয়ারই ছিলো । প্লিজ কেঁদো না !
মিহি তাকালো । কান্না গিলে শুধালো….
“ কাগজে আমার সাইন কোথা থেকে আসলো ? আমি তো….
রাফি ঠোঁট ভিজিয়ে উত্তর করলো…
“ তুমি সাইন করেছিলে । ক্যাফেতে আমাদের যে এক মাসের এগ্রিমেন্ট হয়েছিল , সেটা জাস্ট একটা বাহানা । তুমি যে পেপারে সাইন করেছিলে , সেটা কোনো এগ্রিমেন্ট পেপার ছিলো না । সেটা আমাদের বিয়ের পেপার ছিলো ।
চুপ করলো রাফি । মিহির সজল চাহনি দেখে ভেতর ভেতর আঁতকে উঠছে সে । মিহি আবার কোনো ভাবে ভুল বুঝবে না তো ওকে ? রাফি ঢোক গিললো ।
মিহি তাকিয়ে স্থির শক্ত দৃষ্টিতে । রাফি শীতল কন্ঠে বললো…
এক দেখায় পর্ব ৬৩
“ মিহি , আই এম…
কথাটা পুরোপুরি উচ্চারণ হলো না । এর আগেই আকস্মিক রাফি কে শক্ত করে জাপটে ধরলো মিহি । আকস্মিক কান্ডে টাল হারিয়ে পিছিয়ে গেলো রাফি । মেঝেতে এক হাত ঠেসে সামলে নিলো নিজেকে । মিহি হাতের বাঁধন শক্ত করলো । চোখ বুজে অভিযোগ করলো…
