এক দেখায় পর্ব ৭১
সুরভী আক্তার
সকাল ঠিক আটটা । ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আনমনে হাসছে মিহি । দৃষ্টি নিচুতে । ঠোঁটে মিটি মিটি বেখেয়ালে হাসি । পড়নে একখানা কালো শাড়ি । শাড়ির আঁচলের এক কোণা বাম হাতের তর্জনীতে পেঁচাচ্ছে আবার ছাড়াচ্ছে ।
কিছু একটা ভেবেই লাজুকতায় দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললো নিজে নিজেই । আড়ালে হেসে উঠলো ফিক করে । সেকেন্ড কয়েক বাদ হাত সরিয়ে পিটপিট করে চোখ খুললো । সোজা তাকালো সামনে । মিররের নিজের লালিত চেহারা খানা দেখে আরো বেশি লজ্জা পেলো একা একা । রাফি রুমে নেই । বেরোলো একটু আগে । ব্রেকফাস্ট হয় নি । এখন বেরোবে ওরা । মিহি কে বসিয়ে রেখে রাফি বেরিয়েছে । আসছে না এখনো । অবশ্য এতে মিহি হাঁফ ছাড়ল । রাফির সম্মুখে পড়া মানে মিলিয়ে যাওয়া । চোখ তুলে তাকানো দায় কালকের পর থেকে । রাফি ঘর থেকে বেরোতে বেরোতেও ওকে জ্বালিয়ে বেরিয়েছে । মিহি আয়নার পানে পূর্ণ দৃষ্টি রাখলো । হাসি সমেত নিজেকে পরখ করলো খুঁটিয়ে । আনমনে ডান হাত উঠিয়ে নিজের গালে রাখলো । নিজেকে দেখে মৃদু হাসলো । ঘরের দরজা খোলার শব্দ হতেই তড়িঘড়ি করে পিছু ফিরলো মিহি । কাঙ্ক্ষিত জন নয় । রুহি এসেছে । মিহি প্রথমদিকে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলো । রাফি ডোর লক করে যায় নি । মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালো মিহি । রুহি চোখ সরু করে মিহি কে আগাগোড়া পরখ করে এগোতে এগোতে বললো…
” কি খবর পাখি ? শাড়ি পড়েছিস কেনো সকাল সকাল ?
থতমত খায় মিহি ।
এক পলক চোখ নামিয়ে রেখে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে….
” না , এমনি !
” আচ্ছাআআআ , এমনিইই ?
লম্বা করে টেনে বললো রুহি । বুকে আড়াআড়ি হাত উঠিয়ে মিহি কে দেখে ফিক করে হাসলো । এগিয়ে আসলো কদম বাড়িয়ে । বললো মোলায়েম কন্ঠে….
” তা ভাবি জান , সব ঠিকঠাক তো ? না মানে ভাইয়া….
” ছিঃ রুহি , চুপ করবি ! তুই না তোর ভাইয়ার বোন হোস ।
রুহিকে মাঝপথে থামিয়ে মুখ ফিরিয়ে বললো মিহি । রুহি কি বলতে পারে হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছে । রুহি মুখ গোল করলো । গোটানো হাত ছেড়ে বললো অবাক স্বরে….
” যাআআ বাবা , কি এমন বললাম আমি ? যে তুই ছিঃ ছিকারি করছিস । আর ভাইয়ার বোন হয়েছি তো কি হয়েছে ? তুই তো সবার আগে আমার পাখি । তারপর বাকি সব । আচ্ছা আগে বল , ছিঃ বললি কেনো তুই ?
মিহি উল্টোপাল্টা চিন্তা করে উল্টো বুঝেছে নষ্ট মাইন্ডে । জিভে কামড় বসালো ও । মনে মনে গালি দিলো নিজেকে । রুহি চোখ সরু করে তাকিয়ে । মিহি আমতা আমতা করলো…
” না মানে , কিছু না ।
রুহি ঠোঁট কামড়ে হাসলো । হয়তো বুঝলো । বললো ফিক করে…
” বিয়ের পর তুই ও বিগড়ে গেছিস পাখি । আমি ভালোমতো তোকে কি বলতে যাচ্ছিলাম , আর তুই কি বুঝে বসে আছিস ! দু লাইন বেশি বুঝেছিস । ছিঃ ছিঃ… আজকাল কার মেয়েরা বিগড়ে যাচ্ছে দিনকে দিন । কি দিন কাল এলো । গুরুজনদের সম্মান ও দেয় না । আবার গুরুজনদের কথার উল্টো মানে বুঝে বসে থাকে ।
উপহাস করে হাত নেড়ে বললো রুহি । মিহি বললো..
” গুরুজন টা কে ?
” কেনো আমি , তোর থেকে চৌদ্দ দিনের বড় ! তোর বড় বোন আমি । ভুলে যাস না…..
” বয়স টা ফ্যাক্ট নয় । আমি যে সম্পর্কের দিক থেকে তোর বড় , এটা কে বলবে ? আমি তোর ভাবি জান । তার সাথে বড় জা । এটা ভুলে যাস না তুই ।
” এহহ্ , এসেছে বড় জা ।
” এহহ্ , এসেছে বড় বোন !
রুহিকে অনুকরন করে গলা ভেঙালো মিহি । অতঃপর দু’জনেই ফিক করে হেসে উঠলো মুখ টিপে । ওদের হাসি দেখে দরজা থেকে মেহজাবিন ডাকলো….
” এখনো এখানে এতো কি হাসাহাসি করছিস তোরা ? ব্রেকফাস্ট করবি না ? ভাইয়ারা নিচে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য । আর রুহি ,, মিহি কে ডাকতে এসে তুইও হারিয়ে গেছিস দেখছি । কখন , তোকে ডাকতে পাঠিয়েছি মিহি কে । আমি রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে হাঁপিয়ে গেলাম ।
মেহজাবিনের কন্ঠে খানিক ধমক । রুহি মিহি একে অপরের দিকে তাকালো । পরমুহূর্তে এক সাথে মেহজাবিনের দিকে দৃষ্টি পাত করে সমস্বরে আঙ্গুল তুলে বললো দুজনে….
” এহহ্ , এসেছে কুটনি ননদীনী । শোনো ননদীনি , হতে পারো তুমি আমাদের থেকে বয়সে বড় । কিন্তু আমরা দুজনে তোমার বড় ভাবি হই , সো রেসপেক্ট আস , ওকে ?
থামলো রুহি মিহি । থেমেই ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । মেহজাবিন মূক বনে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে । ক্রমান্বয়ে ছোট করলো চাহনি । রুহি আর মিহি ওর হতবাক অবস্থা দেখে শব্দ করে হেসে উঠতেই চোখ পাঁকালো মেহজাবিন ।
বোনদের হাসিতে নিজেও হেসে ফেললো এক মুহুর্ত বাদ ।
এই তিনটে কে ডাকতে এবার হাজির হলো রাফি । দরজা থেকে গলা খাঁকারি দিলো । বললো….
” ব্রেকফাস্ট কি করবে না আজ ? কটা বাজে খেয়াল আছে ?
একসাথে চাইলো ওরা । রাফি কে দেখে রুহি আর মেহজাবিন হাসি থামালো । মেহজাবিন বললো…
” এইতো যাচ্ছি ভাইয়া ? আমি ভাবিদের ডাকতে এসেছিলাম । ভাবি , চলুন , নিচে ব্রেকফাস্ট রেডি । এখন শুধু খাবেন । চাইলে আমি সার্ভ ও করে দেবো । তবুও এই কুটনি ননদীনির নামে আমার ভাইয়া দের কাছে নালিশ করবেন না প্লিজ ।
রাফি চোখ ছোট করে চাইলো । বুঝলো না এই নাটকীয়তা । আবারো ফিক করে হেসে উঠলো তিনজনে । মেহজাবিন পা ঘুরিয়ে আবার বললো….
” চলো ।
রাফি বললো প্রত্যুত্তরে…
” তোরা যা , আমি আসছি ।
মেহজাবিন দ্রুত বেরোলো রুম থেকে । পিছু পিছু ছুটলো রুহি । মিহি চোখ চুরিয়ে নামিয়ে নেয় । আঁচল টেনে ধীরে পা বাড়ায় দরজার দিকে । রাফি কে পাশ কাটাতে গেলে খপ করে ওকে ধরে ফেলে রাফি । ভড়কায় মিহি । ধক্ করে চোখ তুলে চায় শুল্ক ঢোক গিলে । রাফি বাম পাশের ভ্রু উঁচু করে ঠোঁট কামড়ে চেয়ে আছে । হয়তো ইশারায় বোঝাচ্ছে ,কি হয়েছে ? মিহি চোখ নামিয়ে আলগোছে দুদিকে মাথা নাড়ালো । মৃদু স্বরে বলল….
” চলুন !
” কোথায় !
” নিচে , খেতে যাবেন না ?
” হুম ! কিন্তু তুমি চোখ নামিয়ে কথা বলছো কেনো ? আমার দিকে তাকাও !
মিহির বুক দূরু দূরু । লজ্জায় ইতস্তত সে । চোখ তুলে তাকাবে কি করে ? শক্তি থাকলেও স্বস্তি নেই চাহনিতে । সিটিয়ে দাঁড়ালো ও । চিবুক গলায় মিশিয়ে নিলো । রাফি ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করে । মেয়েটাকে লজ্জা পেতে দেখতে বেশ লাগছে তার । উজ্জ্বল শ্যামলা মুখশ্রী কমলা বর্ন ধারন করেছে । রাফি খানিক ঝুঁকে আসে , ডান হাতের তর্জনী দিয়ে উঁচিয়ে ধরে লালিত মুখখানা । অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেয় মিহি । রাফি আরো হেলে আসে , টুপ করে বাম গালে চুমু খায় । মেয়েটা হাওয়াই মিঠাইয়ের ন্যায় লজ্জায় মিলিয়ে যায় আরো । দুহাতে মুখ লুকিয়ে ফেলে তড়িতে । শ্বাস আটকে নেয় গলায় । রাফি এবার শব্দ করে হাসলো । আলগোছে মিহি কে টেনে বুকে জড়িয়ে নিলো । সিঁথির কাছটায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো…..
” শাড়িতে খুব প্রিটি লাগছে । তার উপর এভাবে লজ্জা পাচ্ছো , একেবারে রসগোল্লা দেখাচ্ছে । ইচ্ছে করছে টুপ করে খেয়ে ফেলি ।
বুকের মধ্য থেকে মিহি উচ্চারণ করলো…
” ধ্যাত !
” আজ থেকে রোজ শাড়ি পড়বে !
মিহি অল্প বিস্তর মাথা তুলে তাকায় । বলে…
” রোজ ?
” হুম ।
” রোজ কেনো ?
” তুমি আমার বউ , তাই । বউদের শাড়ি না পড়লে বউ বউ লাগে না ।
” আজকাল শাড়ি কে পড়ে ?
” তুমি পড়বে । শুধু আমার জন্য !
” বাড়িতেও ?
” হুম ।
” সবসময় ?
” হুম ।
” আমার লজ্জা করবে না ?
” কিসের লজ্জা ?
” রুহি ক্ষেপাবে আমায় !
” সো হোয়াট ? তোমাকে শাড়িতে ভালো লাগে । পুরোটাই আমার আমার লাগে । আমার বউ লাগে । শাড়িতে আলাদা সৌন্দর্য আছে । যা তোমার উপর ভীষণ ভাবে ফুটে ওঠে । অন্য ড্রেসে তোমাকে যতটা মানায় , শাড়িতে তার থেকেও বেশি মানায় । দেখতে ভারী সুন্দর লাগে । বুঝলে ? তাই শাড়ি পড়বে তুমি ! সারাদিন শাড়ি পড়ে আমার সামনে ঘুরঘুর করবে । দূরে সরতে চাইলে যাতে আঁচল টেনে কাছে আনতে পারি , তাই শাড়ি পড়বে । শাড়ি পরিহিতা এই তোমার সৌন্দর্যে আমাকে বেঁধে রাখার জন্য শাড়ি পড়বে । শাড়ির আঁচলে আমার ভেজা চুল মুছিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও শাড়ি পড়বে । তবুও শাড়ি পড়বে । শাড়ি তুমি পড়বেই । বুঝলে ?
মিহি অবাক লোচনে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসে । রাফি ওর নাকের ডগায় আলতো টোকা মেরে আবার বলে…
” বুঝলেন ম্যাডাম ? শাড়ি কিন্তু আপনাকে পড়তেই হবে । তবে হ্যাঁ , যদি বলেন , তাহলে পড়িয়ে দেবো আমি । এতে আপনার খাটুনি কমবে একটু ।
ওদের সবার এখানে তিন দিন থাকার কথা ।
আজকের দিনটা ঘোরাঘুরির জন্য বরাদ্দ । ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়েছে তিন দম্পতি । একসাথে জোড়া বেঁধে বেরিয়েছে । বিচের দিকটায় বেরিয়েছে সর্বপ্রথম । মেহজাবিন পারবে না বেশি হাঁটা হাঁটি করতে । পারলেও মাহিম দেবে না । একটু এগিয়েই মাহিম আটকে দিয়েছে ওকে । সমুদ্রের পানির সংস্পর্শে যেতে দেয় নি একেবারেই । ঐ যে রেসোর্ট থেকে বেরিয়েই হাতটা শক্ত করে ধরেছে , এক মুহুর্তের জন্যও ছাড়ে নি । মিহি আর রুহি একে অপরের হাত ধরে জড়াজড়ি করে গল্প মেতেছে । দুজনে বিচের গোঁড়া সমান পানিতে হাঁটছে ছলাৎ ছলাৎ করে ।
রাফি আর শান্ত ওদের বউ দুটোর পিছু পিছু অসহায়ের মতো পা মেলাচ্ছে । অনুসরণ করছে ওদের ।
মাহিম মেহজাবিন কে আটকে গলা বাড়িয়ে বললো….
” আপনারা ওদিকটায় যান ভাইয়া । আমরা এখানেই আছি । মেহজাবিন এগোবে না আর ।
রাফি ঘুরে তাকালো । মেহজাবিন মুখ ভার করে বললো….
” আমি এগোবো । হাঁটতে পারবো আমি । চলতো । এই সময়ে একটু হাঁটাহাঁটি করলে কিচ্ছু হবে না । তুমি এমন ভাবে ট্রিট করছো , যেনো আমি নয় মাসের প্রেগন্যান্ট ।
মাহিম খানিক চোখ রাঙানি দিলো । ভরাট কন্ঠে বলল….
” তুমি হাঁটবে না মানে হাঁটবে না । চুপচাপ গিয়ে বসবে চলো ।
রাফি হাসি লুকিয়ে বললো…..
” মাহিম ঠিক বলছে । তোকে হাঁটতে হবে না । ওদিকটায় গিয়ে বসে রেস্ট কর একটু । আমরাও এখানেই আছি , যাবো না বেশি দূর ।
মেহজাবিন গাল ফুলিয়ে নেয় । মাহিমের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে সান বেডে বসে গিয়ে । মাহিম তপ্ত শ্বাস ফেলে পিছু পিছু গেলো । পাশে বসলো । অভিমান করেছে মেয়ে । মাহিম মৃদু হেসে বলল মেহজাবিনের চিবুক ধরে….
” মাঝে মাঝে একদম বাচ্চাদের মতো অভিমান করো তুমি । অথচ পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো । এই সময় টা সেনসিটিভ , যথেষ্ট সাবধানী হতে হবে তোমাকে । এটা ভুলে যাও কেনো ? আমাদের বেবি কে তো সেভ রাখতে হবে সবসময় । হুম ??
” আমি কি সাবধানি নই ?
একটু ঘোরাঘুরি করলে কি এমন হবে ? ঘোরার জন্যেই তো এসেছি ।
” হুম , তা ঠিক । তবে নিজের দিকটাও তো খেয়ালে রাখতে হবে !
” আমার খেয়াল রাখার জন্য তো তুমি আছো । তুমি না একেবারেই আন রোমান্টিক । হাঁটাহাঁটি করতে বারন করছো । বারন না করে , একটু কোলে নিলেও তো পারো ! কোলে করে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ালেই হয় ! তাহলেই আমাকে আর হাঁটতে হচ্ছে না ।
মাহিম ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো । হেসে ফেলে বললো….
এক দেখায় পর্ব ৭০
” বাব্বাহ , এসেছে আমার রোমান্টিক বউ ।
আমার বাচ্চা পেটে নিয়ে আমাকেই বলছে আমি নাকি আন রোমান্টিক ।
মেহজাবিন লজ্জা পায় এ পর্যায়ে । মুখ নামিয়ে লাজুক হাসে । মাহিম ওকে খানিক ঝাঁকিয়ে বললো….
” চলো, যেহেতু আন রোমান্টিক বললে , সেহেতু একটু রোমান্স দেখিয়ে আনি । কোলে উঠবে ? ছোট বোনের মতো জামাইয়ের কোলে ওঠার সখ হয়েছে ? তো চলো , কোলে নিয়ে সমুদ্রের পানি ছুঁইয়ে নিয়ে আসি ।
বলেই উঠে দাঁড়ালো । মেহজাবিন বাঁধা দেওয়ার আগেই মাহিম ঝট করে কোলে তুললো ওকে । দ্রুত পা চালিয়ে বললো….
” চলো আমার বাচ্চার মা । বাচ্চা সহ সেইফলি বহন করি তোমায় । তুমি শুধু আমাকে জড়িয়ে রাখো , যাতে পড়ে যেতে না পারো ।
