Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৮

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৮

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৮
নুসরাত ফারিয়া

কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং অপ্রত্যাশিত বাক্য মূহুর্তেই ব্যক্তিকে থমকাতে, চমকাতে, ও স্তব্ধ করতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনই আজ আলোর মুখে ছোট বোনের ব্যাপারে এমন কথা শুনে আধার কয়েক মিনিটের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। মেয়েটার কোমর আঁকড়ে ধরা হাত দুটোও ঢিলে হয়ে গেল। আলো নিজের ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য মানুষটার টিশার্টের গলা খামচে ধরল। খেয়াল করল, লোকটার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। সাথে দুচোখের সাদা অংশও লালচে ধারণ করেছে। আলোর হঠাৎই বুকটা ধক করে উঠল। তাহলে কি সে ভুল জায়গায় কথাগুলো বলল? কিন্তু…একটু আগেই তো তিনি বললেন যে, উনি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন। তাহলে এখন এমন অস্বাভাবিক রিয়াকশন কেন?
আলোর ভাবনার মাঝেই আধার তাকে বিছানায় রেখে, দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আলো হতবাকের মতো কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে মূহুর্তেই দৌড়ে বাইরে যায়।

-“এই তিথি? দরজা খোল!”
আধার বোনের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে দরজায় নক করছে। কিন্তু ভেতর থেকে কোনোরকম সাড়াশব্দ এল না। আর না মেয়েটা দরজা খুলে দিল। আধারের মনটা অস্থির হয়ে যায়। চোখের পাতায় পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠছে। সে হাসফাস করতে করতে আরো কয়েকবার ডাকল বোনকে। কিন্তু ফলাফল আগের ন্যায় শূন্য।
অন্যদিকে আধারের চিল্লাচিল্লি শুনে তাহমিনা খান ও সোবহান খান হন্তদন্ত হয়ে দোতলায় উঠে এলেন। ততক্ষণে আলোও এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। আধারের পক্ষে আর ধৈর্য ধরা সম্ভব হলো না। দরজার কাছ থেকে আলোকে দূরে সরিয়ে দিয়ে,সে চোখের পলকেই দরজাটা ভেঙে ফেললো। তড়িঘড়ি করে রুমের ভেতরে এসে সবাই দেখল—তিথি বিছানার মাঝে এলোমেলো ভাবে শুয়ে আছে৷ আধার ছুটে এসে বোনের দু’গালে হাত রেখে ডাকতে শুরু করল। কিন্তু মেয়েটা চোখ মেলে তাকাল না!
তাহমিনা খান খুব ভয় পেয়ে যান। একমাত্র আদরের মেয়ে উনার। তার কিছু হলে তিনি কিছুতেই সইতে পারবেন না। তিনি ছুটে এসে মেয়েটার মাথা কোলের ওপর নিয়ে ডাকতে থাকলেন। সোবহান খান চিন্তিত মুখে নাতনির পাশে বসলেন। আলো কপালের ঘাম মুছে আশেপাশে তাকায়। তিথির শরীরে কোনোরকম ক্ষত নেই! নিঃশ্বাসটাও পড়ছে খুবই ধীরে। তার এলোমেলো দৃষ্টি গিয়ে আঁটকায় টি-টেবিলের ওপর রাখা ঔষধের পাতায়। আলো ছুটে এসে ঔষধের পাতা হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল,

-“তিথি তিনটে ঘুমের ঔষধ খেয়েছে।”
আধার চমকে উঠল। সে কাউকে কিছু না বলে তিথিকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে রুমের বাইরে ছুটল। উদ্দেশ্যে তার হাসপাতালে যাওয়া। কারণ সে তার বোনকে নিয়ে কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চায় না।
-“তোমাকে যেতে হবে না। তুমি বাড়িতে থাকো!”
আলোকে গাড়িতে উঠতে দেখে আধার শান্ত গলায় বলে। এমনিতেই মেয়েটার শরীর ভালো নেই, তারওপর হাসপাতালে গেলে আরো শরীর খারাপ করবে। তাই সে চাচ্ছে না মেয়েটা তাদের সাথে যাক। আলো পাশে ফিরে অস্থির কণ্ঠে বলল,
-“না, আমিও যাবো।”
-“ভেতরে যেতে বলেছি!”
-“আপনি এমন করছেন কেন? আমি তিথির সাথে যাবো।”

আলো জেদি কণ্ঠে বলে গাড়ির ডোর খুলে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে, আধার তেড়ে এসে হাতের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে এক ঝটকায় বাহিরে নিয়ে এসে গর্জে উঠল,
-“তোমাকে আমি যেতে না করেছি। তারপরেও এত জেদ করছো কেন? তুমি কি বুঝতে পারছো না? তোমার জন্য আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে!”
বাজখাঁই গলার ধমকে আলো কেঁপে উঠল। একই সাথে হাতের ব্যথায় ও মানুষটার এমন ব্যবহারে চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। আধার আজ দেখেও না দেখার ভান করে আলোকে ছেড়ে গাড়িতে উঠে বসল, তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হাওয়ার বেগে ছুটে চলে গেল। আলো মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করল। সে তো একটু যেতেই চেয়েছিল। তাই বলে মানুষটা এমন করবে?
হঠাৎই আলোর পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। সে একহাতে মুখ চেপে ধরে বাড়ির ভেতরে ছুটে যায়। কোনোমতে রুমে এসে ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করতে লাগল। মেয়েটার শরীর ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে গেল। সে মুখ ধুয়ে একহাতে মাথা ও আরেক হাতে নিজের পেট চেপে ধরে, চোখ বুজে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথাটা তার হালকা ঘুরছে! কিছুক্ষণের মধ্যে আবারো পেট গুলিয়ে উঠল। মেয়েটা আরেকদফা বমি করল এবং একসময় তার শরীরটা নেতিয়ে পড়ল।

অফিসে অনেকটা দেরি হয়ে যায় রাতের। সব দোষ ওই বেয়াদব মেয়েটার। নিজের কাজ ফেলে রেখে মেয়েটার ফাইল রেডি করেছে। তাই তো এখন নিজের কাজ করতে করতে লেট হয়ে গেল। রাত বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে সবকাজ শেষ করে, হাতে ব্যাগ নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল। পার্কিং প্লেস থেকে নিজের বাইকে উঠে গেট দিয়ে বেরিয়ে কিছুদূর আসতেই ব্রেক কষলো। কারণ সামনে রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ওই বেয়াদব মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো রিকশা খুঁজতেছে।

রাত বাইকের ওপর বসে থেকে অচেনা মেয়েটাকে দেখছে। একটা রিকশাওয়ালার সাথে ভাড়া নিয়ে ঝগড়া করছে। রাগারাগি করার ফলে উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের চেহারাটা হালকা লালচে হয়েছে। নাকের পাতা দুটো বারবার ফুলে উঠছে। মেয়েটার ঝগড়া করার অঙ্গভঙ্গি দেখে অজান্তেই ঠোঁট কামড়ে হাসল রাত। এই মেয়েলোকগুলো এত ঝগড়া করতে কীভাবে পারে? এদের কি মুখ ব্যথা করে না? সারাক্ষণ হাঁসের মতো প্যাক প্যাক করতেই থাকে।
নিজের ভাবনার মাঝে খেয়াল করল—মেয়েটার বকাবকি শুনে রিকশাওয়ালা চলে গিয়েছে। রাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাইক নিয়ে মেয়েটার সামনে থামল। মাথায় হেলমেট পরে থাকার জন্য ঈশিতা প্রথমে চিনতে পারল না। যখন যুবকের সর্বাঙ্গে নজর বুলিয়ে নিল, তখনই চিনতে পারে এই ব্যক্তি কে।
-“সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ঝগড়া করছেন, মিস?”
রাতের কথা শুনে ঈশিতা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

-“বড়লোকের ছেলেরা কি বুঝবে টাকার মূল্য! তারা তো দু’হাতে টাকাপয়সা উড়ায়।”
মেয়েটার বলা কথাগুলো রাতের বড্ড গায়ে লাগল। কারণ সে এতগুলো বছর ধরে বড় ভাইয়ের টাকা নষ্ট করে এসেছে। আগপাছ কিছুই ভাবেনি! অথচ সে এখন একটু হলেও উপলব্ধি করতে পারছে, টাকা কামানো কতটা কষ্টের।
রাত নিজেকে সামলিয়ে হেলমেট খুলে শান্ত গলায় বলল,
-“লিফটের প্রয়োজন?”
-“থ্যাংকস! বাট…আমার লিফটের প্রয়োজন নেই। আমি চলে যেতে পারব।”
-“ওকে ফাইন।”
একথা বলে রাত পুনরায় হেলমেট পরে বাইকের চাবি ঘুরিয়ে, স্টার্ট দিয়ে বাতাস চিঁড়ে ছুটে চলে যায়। ঈশিতা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সামনে হাঁটতে শুরু করল। এই রাস্তাটা শুনশান হওয়ায় তেমন গাড়িঘোড়া পাওয়া যায় না।
ঈশিতা আনমনে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করল, সামনে থেকে একটা রিকশা আসছে এবং এসে সোজা তার সামনেই থামল। ঈশিতা নিজের ঠিকানা বলে—জিজ্ঞেস করল যাবে কি’না। লোকটা সাথে সাথে হ্যাঁ বললেন। এবং এটাও জানালেন, সে যা ভাড়া দিবে ওইটাই নিবে। এতে ঈশিতার মনে খটকা লাগে। এই লোকটার আবার কোনো খারাপ মতলব নেই তো? দেখে তো তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। কিন্তু তার মন বলছে, কিছু একটা গন্ডগোল আছে। তাই সে সরাসরি নাকচ করে দিল। যাবে না ওই রিকশায়।
লোকটা হয়তো মেয়েটার সন্দেহ বুঝতে পরেছেন। তাই তিনি হেঁসে বললেন,

-“ভয় পাবেন না। আমি খারাপ লোক নই। আর আপনাকে সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আমাকে একজন পাঠিয়েছে।”
লোকটার কথা শুনে ঈশিতার পা জোড়া শ্লথ হয়ে যায়। সে চমকে উঠে পিছনে ফিরে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“কে সেই ব্যক্তি?”
-“সেটা তো বলতে পারব না। এখন শুধু আপনাকে আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।”
ঈশিতা দ্বিধায় পড়ে গেল। সে এখন কি করবে না করবে, ভাবতে ভাবতেই উঠে পড়ল রিকশায়। এরপর যা হবে দেখা যাবে। লোকটা তার কথামতো একদম একটা পুরাতন বিল্ডিংয়ের সামনে রাখল। ঈশিতা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে নেমে পড়ল। ভাড়া দেওয়ার সময় লোকটা বললেন,
-“উনি আগেই ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। আপনাকে আর দিতে হবে না!”
একথা বলে লোকটা রিকশা নিয়ে চলে গেলেন। আর ঈশিতা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবতে লাগল—কে এই অচেনা শুভাকাঙ্ক্ষী?

পরেরদিন সকালে হাসপাতাল থেকে তিথিকে নিয়ে খান বাড়িতে ফিরল আধার। রাতেই তাহমিনা খান ও সোবহান খানকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। শুধু শুধু হাসপাতালে থেকে শরীর খারাপ করার কোনো মানেই হয় না। তারওপর মেয়েটাকেও একা বাড়িতে রাখতে চায়নি। বিশেষ করে ছোট ভাইয়ের জন্য। তাই সে নিজে আসতে না পারলেও তাদেরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দেয়।
তিথি এখন কিছুটা সুস্থ আছে। ঔষধগুলো খুব বেশি ইফেক্ট ফেলতে পারেনি তার শরীরে৷ কারণ আধার সঠিক সময়েই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে। তারপর ডাক্তার স্টমাক ওয়াশ করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জ্ঞান ফিরে আনেন।
পুরো একটা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে আধার বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে এল। রাতে মেয়েটাকে অনেকবার কল দিয়েছিল। এমনকি এসএমএসও করেছিল। কিন্তু মেয়েটা কোনো রেসপন্স করেনি, আর না কল ধরেছে। হয়তো তখনকার ঘটনা নিয়ে অভিমান করে আছে। আধার জোরে শ্বাস ফেলে রুমে এসে দেখে, আলো পুতুল চেপে ধরে গুটিসুটি মে’রে ঘুমিয়ে আছে। তার আশেপাশে টুনা, টুনিও শুয়ে আছে। আধার অপলক নয়নে মেয়েটার ঘুমন্ত কিউট চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকল। কাছে আসতে চেয়েও কিছু একটা ভেবে এল না। এখন তার গোসল নেওয়ার প্রয়োজন। কারণ হাসপাতাল থেকে এসেছে। আর এই শরীরে মেয়েটার কাছে যাওয়া যাবে না। তাই সে আলমারি থেকে জামাকাপড় নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে চলে গেল।
ঘুমের ঘোরে নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে আলো মৃদুস্বরে গোঙাল। চোখেমুখে গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তেই ব্রেন সজাগ হলো। কিন্তু পুরোপুরি ঘুম ছুটে গেল না। হঠাৎই তার মনে হলো, বাড়িতে আধার স্যার নেই। তাহলে তাকে কে এইভাবে চুমু খাচ্ছে? তারমানে এটা ওই প্লে-বয় নয় তো?
ব্যস! আলোর সব ঘুম মূহুর্তেই উড়ে গেল। একই সাথে রুমের পিনপতন নীরবতা ভাঙল—এক জোড়ালো থাপ্পড়ের শব্দে।

-“আ….আপনি!”
আলোর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। সে ভয়ে ভয়ে সামনে ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বারবার শুকনো ঢোক গিলছে। এতবড় একটা ভুল কীভাবে করতে পারল সে? একবার তো চোখ মেলে তাকিয়ে দেখার উচিত ছিল। তাহলে হয়তো এই সর্বনাশটা ঘটত না।
অন্যদিকে, আধার নিজের বাম গালে হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টি সামনে বসে থেকে ভয়ে কাঁপতে থাকা রমণীর পানে। এই প্রথম বউয়ের নরম হাতের গরম থাপ্পড় খেয়ে সে বাকরুদ্ধ, হতভম্ব, হতবাক, আহাম্মক, হতবিহ্বল ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছু হয়ে থম মে’রে বসে আছে। সে এতোটাই শকড যে, নিজের ভাষায় হারিয়ে ফেলেছে।

-“স….সরি! আ-আমি ইচ্ছে করে এমনটা ক…!”
আলো বাকী কথাগুলো আর বলতে পারল না। কারণ লোকটা উঠে চলে গিয়েছে বাইরে। আলো ছলছল চোখে নিজের ডান হাতের দিকে তাকায়। এই হাতটা দিয়েই কি-না সে তার প্রিয় মানুষটিকে আঘাত করেছে। উনি নিশ্চয়ই মনে মনে খুব কষ্ট পেয়েছেন। সে এটা কীভাবে করতে পারল? কীভাবে?
তাহমিনা খান নিজ হাতে মেয়েকে হালকাপাতলা নাস্তা করিয়ে দিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলেন। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধরা গলায় বললেন,
-“মায়ের ওপর এত অভিমান তোমার?”
তিথি কিছু বলতে যাবে তখনই তার গালে পুরুষালী হাতের থাপ্পড় পড়ল। মেয়েটা ছিটকে বিছানায় আছড়ে পড়ে! তাহমিনা খান চমকে উঠে মেয়েকে আগলে নিয়ে চিল্লিয়ে উঠল,

-“রাতততত!”
রাতের চেহারা অসম্ভব রকমের লাল হয়ে আছে। সে রাতে কিছু জানতে না পারলেও সকালে সবটা জেনেছে। তারপরই শরীরের র’ক্ত মাথায় অবধি উঠে গেছে। রাত রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“মেয়েকে এই করতে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছিলে? রাতে যদি ভাই সঠিক সময়ে ওকে হাসপাতালে না নিয়ে যেত, তাহলে কি ঘটতে পারত—একবারও সেটা ভেবে দেখেছো?”
তিথি মা’কে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কাঁদছে। তাহমিনা খান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গম্ভীর কণ্ঠে ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,

-“তাই বলে তুমি এইভাবে মা’রবে অসুস্থ মেয়েটাকে?”
-“মা’রব, হাজার বার মা’রব। ওর না খুব ম’রার শখ? আজ নাহয় এটা আমি নিজ হাতেই পূরণ করব। তারপর তোমার মেয়ের সো কোল্ড বয়ফ্রেন্ডকেও দেখে নিবো!”
রাত চিল্লিয়ে কথাগুলো বলে তিথির হাতের বাহু চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল। কতবড় সাহস মেয়েটার! অন্য কারোর জন্য নিজের জীবন দিতে চলেছিল।
-“রাত!”
বড় ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে রাত থেমে গেল। তিথি কাঁদতে কাঁদতে অসহায় চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়৷ আধার কিছু না বলে এগিয়ে এসে রাতের হাতের বাঁধন থেকে বোনের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চোখের পানি মুছে দিল। তিথি বড় ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।

-“আ…আমি! আমি এমনটা করতে চাইনি ভাইয়া। আমি শুধু একটু ঘুমানোর জন্য ঔষধ খেয়েছিলাম৷ কিন্তু…বুঝতে পারিনি এতে সমস্যা হবে৷”
আধার বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তেধীরে নিচে নেমে এল। এবং তিথিকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে সে সামনে হাঁটু ভেঙে বসল।
-“তুই কাউকে ভালোবাসিস? আর এটার জন্যই কি এই বিয়ে করতে চাচ্ছিস না?”
ড্রয়িংরুমে সবাই উপস্থিত! তিথি চোখের পানি মুছে মাথা নিচু করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-“হ…হ্যাঁ!”
-“ছেলেটাও কি তোকে ভালোবাসে?”
-“খুউউউউব!”
-“তোর সাথেই পড়ে?”
-“হুম, কিন্তু ও এবার মাস্টার্সে।”
-“ঠিক আছে। আমি আধার কথা দিলাম, তোর বিয়ে তোর ভালোবাসার মানুষটার সাথেই হবে। আর অনিমেষের সাথে বিয়ে ক্যান্সেল! এবার হ্যাপি?”
বড় ভাইয়ার কথা শুনে মূহুর্তেই তিথির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে চট করে ভাইয়ার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“আমি খুব খুশি ভাইয়া, খুউউব।”
আধার হাসল। ওইদিকে তাহমিনা খান কিছু বলার জন্য ছটফট করছেন। কিন্তু শশুর মশাইয়ের জন্য কিছু বলতে পারছেন না। আধার বোনের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে আদর করে দিয়ে বলল,
-“এখন রুমে গিয়ে রিল্যাক্সে ঘুম দিবি। একদম মন খারাপ কিংবা কান্নাকাটি করবি না। নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখ, আফটার অল সামনে তোর বিয়ে। সো জাস্ট চিল!”
তিথি মন খুলে হাসল। হঠাৎই তার নজর ভাইয়ের বাম গালের দিকে গেল। যেখানে লাল হয়ে আছে। সে আলতো হাতে গাল স্পর্শ করে বিচিলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“এখানে কি হয়েছে ভাইয়া? কেউ মে’রেছে?”
আলো সিঁড়ির মাঝখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটার বলা কথাগুলো শুনে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলেও ননদের কথা শুনে মূহুর্তেই হাসিটা গায়েব হয়ে গেল।
-“উঁহু, জাস্ট বিচ্ছু একটা পোকা ছুঁয়েছে। তাই লাল হয়েছে। তুই এসব নিয়ে না ভেবে রুমে গিয়ে রেস্ট নে। শেফালি চাচি ওকে নিয়ে যান!”
আধারের কথা শুনে তিথি আর কিছু বলল না। চুপচাপ শেফালি চাচির সাথে চলে গেল।

-“এটা তুমি কি করলে আধার? চেনা নেই যা নেই, হুট করে একটা বেকার ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করে দিলে?”
আধার শান্ত চোখে তাহমিনা খানের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তো কি করতাম? বলুন আমি কি করতাম? আপনি নিশ্চয়ই অতীত ভুলে যাননি। আমি একবার আমার বোনকে হারিয়েছি, দ্বিতীয় বার আর বোনকে হারাতে পারব না।”
-“তাই বলে একটা বেকার ছেলের সাথে….!”
-“আপনার মেয়ে ওই বেকার ছেলেকেই ভালোবাসে, আর তাকেই বিয়ে করতে চায়। মেয়েটাকে একবার দেখছেন? ওর কি হাল হয়েছে? এখনো বিয়ে ঠিক হয়নি, জাস্ট কথাবার্তা চলছিল! এতেই মেয়েটা কেমন রিয়াক্ট করল সেটা তো জলজ্যান্ত প্রমাণ পেলেন। আর কি চাই আপনার বলুন তো? সারাক্ষণ টাকা আর টাকা করেন। তা আপনি টাকা কি কবরেও সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন? ছেলেটা এখন না-হয় বেকার আছে, নিজের লেখাপড়া শেষ করলে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করবে। আর আমি লোক লাগিয়ে দিবো সবকিছু জানার জন্য। ওই ছেলেটা যদি খারাপ হয়, তাহলে কখনোই তিথির সাথে বিয়ে দিবো না। এইটুকু বিশ্বাস রাখতে পারেন আমার ওপর। আমি আর যাই করি না কেন, কখনো আপনার ছেলে-মেয়ে কোনো ক্ষতি চাইনি। বরং তাদেরকে ভুল পথে যাওয়া থেকে সাবধান করেছি। কিন্তু আপনার ছেলে-মেয়ে কেউ-ই আমার কথা শোনেনি। এখন আপনি ভাবুন কি করবেন৷ টাকাপয়সা নিবেন নাকি নিজের মেয়েকে জীবন্ত অবস্থায় চোখের সামনে দেখবেন।”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল আধার। তারপর রাতের সামনে গিয়ে দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“বোনকে তো কখনো আগলে রাখতে দেখলাম না তোকে। তাহলে এখন এত দরদ কই থেকে আসছে হুহ্? মেয়েটাকে যেই থাপ্পড়টা মে’রেছিস না? ওটা তোকে মা’রা উচিত। নিজের চরিত্র ঠিক নেই আর এসেছে অন্যকে জাজ করতে।”
একটু থেমে পুনরায় হিসহিসালো,
-“আই উইশ….ছেলেটা যেন তোর মতো না হয়!”
রাত ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলল,
-“আমি নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছি। তুমি চাইলে খোঁজখবর নিতে পারো।”
আধার হালকা হেঁসে বলল,
-“আমি আমার দায়িত্ব সবসময় পালন করি। এখন না-হয় তুই একটু দায়িত্ব পালন কর।”
-“বলো কি করতে হবে?”
-“চট্টগ্রামে গিয়ে ছেলেটার চৌদ্দ গুষ্ঠির খবর বের কর, সাথে পুরো বায়োডেটা! ভুলভাল যদি কোনো ইনফরমেশন আনিস, তাহলে ওইদিন তোকে আমি জুতা দিয়ে পেটাবো। আশা করছি মন দিয়ে কাজ করবি!”
রাত হালকা ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“সে না-হয় করব! কিন্তু তুমি তো নিজেই বউয়ের হাতে মা’র খেয়ে বসে আছো। সেখানে আমাকে মা’রবে কি? উল্টো বোম্বাই মরিচ তোমাকেই উত্তম-মধ্যম দিবে। উমম….অলরেডি দেওয়া শুরু করেছে!”
একথা বলে রাত দাঁত কেলিয়ে হাসল। আধার রাগে দাঁতে দাঁত পিষলো। সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময় শুধু বলল,
-“দোয়া করি, তোর কপালে এমন একটা মেয়ে জুটুক যে কি-না তোকে তিনবেলা সর্ষে ফুল দেখাবে!”

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। আলো গুটিগুটি পায়ে খাবারের প্লেট নিয়ে ননদের রুমে এসে দেখে, তিথি মাত্র গোসল নিয়ে বেরিয়েছে। সে টি-টেবিলের ওপর প্লেট রেখে পিছনে ফিরতেই তিথি দু’হাতে ঝাপটে জড়িয়ে ধরল তাকে। আলো প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পর মূহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে, মেয়েটার পিঠে হাত রাখল।
-“তোমাকে এত্ত এত্ত থ্যাংঙ্কিউউউ ভাবী! আজ সবকিছু তোমার জন্য হয়েছে।”
তিথি একগাল হেঁসে কথাগুলো বলে। আলো মুচকি হেঁসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি কিছুই করিনি তিথি। যা করেছে ওপরওয়ালা এবং তোমার বড় ভাইয়া। এখন চুপচাপ খাবার খেয়ে নাও, তারপর ঔষধ খেতে হবে।”
তিথি ভাবীকে ছেড়ে দিল। আলো এলোমেলো হয়ে থাকা বিছানাটা সুন্দর করে গুছিয়ে দেয়। তিথি সোফায় বসে থেকে খাবার খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,

-“তোমার মন খারাপ ভাবী?”
আলো একপলক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। আসলেই তার খুব মন খারাপ। ওই লোকটা তার সাথে একটুও কথা বলেনি। এমনকি ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় তার কাছেও আসেনি। অন্যসময় তাকে আদর করে যেত, অথচ আজ আশেপাশেও ঘেঁষেনি। কোথায় ভেবেছিল সে অভিমান করে মানুষটার থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু এখন ওই লোকটাই একটা থাপ্পড়ের জন্য তার থেকে দূরে থাকছে। মানছে তার থাপ্পড় মা’রাটা একদম উচিত হয়নি! কিন্তু সে তো আর ইচ্ছে করে মা’রেনি। ভুলবশত হয়ে গেছে। তারজন্য এইভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিবে? এটা কেমন কথা?
-“তুমি ঠিক আছো ভাবী?”
তিথির কথায় আলোর ধ্যান ভাঙল। সে চটপট চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে জবাব দিল,
-“হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি। আর আমার মন খারাপ হবে কেন? আমি তো অনেক হ্যাপি। বিশেষ করে তোমার জন্য। অবশেষে তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে পেতে চলেছো।”
তিথি লাজুক হেঁসে বলল,

-“তুমি কখনো কাউকে ভালোবাসোনি?”
-“আমি সবসময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। এসব প্রেম, ভালোবাসায় পড়ে ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে থাকার কোনো ইচ্ছে ছিল না৷ কারণ আমার দ্বারা প্রেম সম্ভব নয়। বয়ফ্রেন্ডকে যেই সময়টা দিতাম, ওটা নিজেকেই দিয়েছি। আর এখনকার কথা যদি বলো, তাহলে আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি! উনিই আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা।”
-“ভাইয়া অনেক লাকি, তোমার মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে।”
-“উঁহু, তোমার ভাইয়াকে পেয়ে আমি লাকি। কারণ উনিই আমার সব পাগলামি, ত্যাড়ামি, অত্যাচার সহ্য করে।”
তিথি শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“মানতেই হবে, বড় ভাইয়ার প্রচুর ধৈর্য!”
আলো মুচকি হেঁসে আরেকটু গল্প করে চলে গেল।
-“দাদাজান আসব?”
সোবহান খান নামাজ পড়ে খাওয়াদাওয়া করে রুমে এসে বসেছিলেন। তখন আলো উঁকি দিয়ে দরজায় নক করল। তিনি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন। আলো ভেতরে এসে দাদাজানের পাশে বসতে বসতে বলল,
-“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
-“শুধু একটা কেন? একশোটা জিজ্ঞেস করো।”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে আওরাল,
-“তোমার আরো একটা নাতনি ছিল?”
নাতবউয়ের মুখে এহেন কথা শুনে সোবহান খান থমকে গেলেন। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকালেন। আলো অধৈর্য হয়ে বলল,

-“বলো না দাদাজান? তোমার বড় নাতি সকালে কেন বললেন, উনি তার বোনকে হারিয়েছেন? কি হয়েছিল উনার বোনের সাথে? প্লিজ বলো আমায়।”
সোবহান খান টেবিলের ড্রায়ার খুলে পুরোনো দুটো ছবি বের করে নাতবউয়ের পাশে বসলেন। আলো উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। প্রথম ছবিতে দুজন ছেলে-মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটাকে কোলে নিয়ে হাসিমুখে বসে আছে ছেলেটা। আর ছোট মেয়েটা দু’হাতে কেক মাখিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হাসছে। ফানি ছবিটা দেখে আলোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। দ্বিতীয় ছবির দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। হাসি মুখে বিড়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে চিনতে না পারলেও তার পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখে চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না। আলো অপলক নয়নে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,

-“আধার স্যার….!”
সোবহান খান ছলছল চোখে ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“হ্যাঁ, আধার আর ওর বোন আফরিন।”
একটু থেমে পুনরায় বলতে শুরু করলেন,
-“আধারের দু বছরের ছোট আফরিন! আর পাঁচটা সংসারের মতো বড় বউমার সংসারও ছিল সুখের। আমরা সবাই ভালোই ছিলাম। আধারের যখন চার বছর পূর্ণ হয় তখন আমার ছেলে ও বউমার মধ্যে একটা ঝামেলা হয়। আশরাফ বিদেশি কোম্পানির সাথে অনেক বড় একটা ডিল সাইন করে এবং ওটার সব দায়িত্ব তার বন্ধু ওরফে ম্যানেজারকে দেয়। এটা নিয়ে বড় বউমা আপত্তি করেছিলেন। কারণ তার ওই লোকটাকে পছন্দ নয় আর সুবিধারও মনে হয় না। কিছু না কিছু গন্ডগোল পাকায়! আমি মেয়েটার পক্ষেই ছিলাম। এই নিয়েই তাদের মধ্যে বড়সড় ঝামেলা সৃষ্টি হয়। আশরাফ রাগের মাথায় মেয়েটার গায়ে হাত তুলেছিল। অথচ মেয়েটা সেসময় প্রেগন্যান্ট ছিল।

মরিয়ম রাগে-দুঃখে ছেলে-মেয়েকে রেখে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কারণ তার যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না, তাই সে নিজের সাথে সন্তানদের নেয়নি। ভেবেছিল আশরাফ তাকে বাঁধা দিবে, কিন্তু দেয়নি। আমি আশরাফকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ও নিজের ইগোতে অনড় ছিল। সে সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিল বড় বউমা কে আর ঘরে তুলবে না। ওপরওয়ালা তার কথা রেখেছে। ওইদিনের পর আর কখনো বড় বউমা জীবিত অবস্থায় খান বাড়িতে ফেরেনি। শেষ বার তার মৃ’তদেহ দেখেছিলাম। বাসে করে গ্রামে ফিরছিলো, কিন্তু শেষ অবধি আর পৌঁছাতে পারেনি। মাঝপথেই অন্য একটা বাসের সাথে বাসটার এক্সিডেন্ট হয়। এবং অর্ধেক যাত্রীই নিহত হয়। তাদের মধ্যে আমার বড় বউমাও ছিল।”

সোবহান খান থামলেন। চোখের পানি মুছে জোরে শ্বাস নিয়ে পাশে বসা নাতবউয়ের দিকে তাকায়। আলো পাথরের ন্যায় থমকে আছে। অথচ তার রক্তিম চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে এতদিন জানত, স্বাভাবিক মৃ’ত্যু! কিন্তু এখন জানতে পারল, অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে স্যার তার মা’কে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে। ইশশ! ওইদিন যদি উনার বাবা একটু বাঁধা দিত, তাহলে হয়তো এমনটা কখনো হতো না৷ বেঁচে যেত দুটো প্রাণ!
-“মা, ভাইকে হারিয়ে আধার প্রায় উন্মাদ হয়ে গেছিল। ওইটুকু বয়সে এই হারানোর শোক সইতে পারেনি ছেলেটা। ফলস্বরূপ একমাসের মতো হাসপাতালের বেডে ছিল। ছোট ছেলে-মেয়ে দুটো বিশ্বাসই করতে পারেনি তাদের মা আর নেই এই পৃথিবীতে। আমাকে শক্ত থাকতে হয়েছিল, শুধু আমার নাতি-নাতনির জন্য। আমি ভেঙে পড়লে তাদেরকে কে দেখত? ওরা তো তখন খুবই ছোট ছিল। এরমধ্যে আশরাফ আরো একটা অঘটন ঘটিয়ে দেয়। বড় বউমার মৃ’ত্যুর কয়েক মাস পরেই তাহমিনাকে বিয়ে করে এ বাড়িতে নিয়ে আসে। আমি দ্বিতীয় বারের মতো আমার ছেলের গায়ে হাত তুলেছিলাম। আশরাফ বলেছিল সে যা করেছে সবটা ছেলে-মেয়ের জন্য। কারণ তাদের মা প্রয়োজন। আমি প্রথমে মেনে না নিলেও আস্তে আস্তে মেনে নিয়েছিলাম। কারণ ছোট বউমা আধার ও আফরিন আদর করত, ভালোবাসত। একজন মায়ের দায়িত্ব সবকিছুই পালন করত। এসব দেখে আমার মন নরম হয়। এবং একসময় মেনেও নিই।

সবকিছু ঠিক থাকলেও যখন বছর ঘুরিয়ে রাতের আগমন ঘটল তখন হুট করেই ছোট বউমা পাল্টে গেল। ছোট মেয়েটা অত কিছু বুঝত না, কিন্তু আধার একটু হলেও তাদের প্রতি মা-বাবার অবহেলা বুঝতে পারত। বড় হওয়ার সাথে সাথে সে নিজেই বোনকে মানুষ করতে শুরু করে। একই সাথে আশরাফের প্রতি ঘৃণাটাও আরো বেড়ে গেল। আধার ওর বোনকে খুব ভালোবাসত। নিজের শখ, আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে বোনটার সব ইচ্ছে পূরণ করত। ওর স্বপ্ন ছিল বোনকে ডাক্তার তৈরি করার। কারণ এটা তার মায়েরও ইচ্ছে ছিল। আধার নিজেও চেয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার পর মেডিক্যালে এডমিশন দিবে। তারপর দুই ভাই-বোন একসাথে পড়াশোনা করবে। কিন্তু বেচারার সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হলো না।
রাতকে মা’রার কারণে আশরাফ সেই দিন ছেলেটাকে অনেক মে’রছিল এবং অনেক কথা শুনিয়েছে। এরপরই আধার বোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেশ ছেড়ে চলে যায়। এবং ওখানে থেকেই সমস্ত খরচ ও বহন করে। সে চেয়েছিল বোনকেও নিজের কাছে নিয়ে যাবে। কিন্তু আফরিন মেডিক্যালে চান্স পাওয়ার জন্য ভাইয়ের কাছে যেতে চায়নি। আর আধারও জোর করেনি।

সবটা স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। আধার যখন ছুটি নিয়ে চার বছর পর দেশে ফিরেছিল বোনকে দেখার জন্য, তখন এসে জানতে পারল তার বোনটা আর নেই। সে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল বোনকে, কিন্তু দেশে ফিরে ও নিজেই সারপ্রাইজ পেয়ে যায়। ওইদিন বোনের করব আঁকড়ে ধরে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদেছিল। পাগল মেয়েটা একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসে নিজের জীবনটাই দিয়ে দিয়েছে। অথচ আমরা টের অবধি পাইনি। ওই বেইমান ছেলেটার বিয়ের দিনই আফরিন সুইসাইড করে। আধার সবকিছু জানার পর ওই ছেলেটাকে রাস্তায় জনগণের সামনে মে’রেছিল। উদ্দেশ্য ছিল জানে মে’রে ফেলার।

আশরাফ কোনোমতে ছেলেকে টেনেটুনে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। তারপর খান বাড়িটা মূহুর্তেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। আধার সবকিছু ভেঙেচুরে আশরাফ কে শাসিয়ে ও চলে যায়। ছেলেটার অভিশাপ লেগেছিল আশরাফের। তার কয়েক মাস পরই সে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে শুরু করে। তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুই একদিন তার সবকিছু ছিনিয়ে নেয় এবং একসময় ওর অস্তিত্বই পৃথিবী থেকে মুছে যায়। সবকিছু জেনেশুনেও আধার কিছুই করেনি। এমনকি মৃ’ত বাবাকে শেষ বারের জন্য দেখতেও আসেনি। তার কাছে অনেক আগেই তার বাবা ম’রে গেছিল।
আধার তার বাবাকে ঘৃ’ণা করলেও কখনো তাহমিনাকে ঘৃ’ণা করেনি৷ অপছন্দ করত কিন্তু খারাপ ব্যবহার করেনি। তাহমিনা তাকে না ভালোবাসলেও আফরিন কে একটু হলেও ভালোবাসত। আর এটার জন্যই আধার কোনোদিন মানুষটাকে ঘৃ’ণা করতে পারেনি। সেও ছোট বেলায় মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাহমিনার শাড়ির আঁচল ধরে ঘুরঘুর করত। কিন্তু আফসোস! এতিম ছেলেটা কখনোই ভালোবাসা পায়নি আর না পরিবারের সুখ পেয়েছে। সে তার ভালোবাসার মানুষদের কে হারিয়ে আজ নিঃস্ব। ওর যতই কষ্ট হোক, তবুও কখনো মুখ ফুটে বলবে না। এইজন্যই সে সহজে কাউকে ভালোবাসতে চায় না।”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৮

ধরা গলায় কথাগুলো বলে থামল সোবহান খান। ওইদিকে আলোর চোখের পানি কিছুতেই থামছে না। সে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। মূহুর্তেই দাদাজানের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। অথচ লোকটা এত কষ্ট কীভাবে মনের মাঝে নিয়ে আছে? ওই লোকটার জায়গায় সে থাকলে হয়তো এতদিনে স্ট্রোক করেই ম’রে যেত।
আলো কাঁদতে কাঁদতে ওপরওয়ালার উদ্দেশ্যে চিল্লিয়ে বলে উঠল,
-“মানুষটাকে এত দুঃখ-কষ্ট না দিলেও পারতে….!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৯