এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৪
সেঁজুতি আক্তার
মাইরা ধীরে সুস্থে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসলো। হাতের শপিং ব্যাগগুলো সোফার এক কোণে রেখে দিল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
মাইরা বিড়বিড় করে বলল, আগে ফ্রেশ হতে হবে। তাই ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
এদিকে শেহরান রুমে ঢুকে দেখলো রুম ফাঁকা। মাইরা নেই।
ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। শেহরান ফোন হাতে নিয়ে নাম না দেখেই রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে রনির কন্ঠ ভেসে আসলো, ভাই আসসালামু আলাইকুম ভাই কেমন আছেন ভাই?
– হুম ভালো
– ভাই শুনেন, সমস্ত কিছু রেডি। একদম ওকে। আর ভাবি ইয়ে মানে সরি ভাই, আম্মার সব কাগজপত্র রেডি হয়ে গেছে।
– শেহরান কপাল কুঁচকে বলল, এতো বকবক করার দরকার নেই।
– রনি সাথে সাথে গলা খাঁকারি দিল, না ভাই মানে আমি তো জাস্ট আপডেট দিলাম। আপনি তো আবার রাগ করেন। তাই আগে থেকেই সরি বলে নিলাম।
-শেহরান দীর্ঘশ্বাস ফেললো এই ছেলেটাও একদম মাইরার মতো বেশি বকবক করে। আচ্ছা রাখ বলেই ফোন কেটে দিলো।
-পাঁচ মিনিট পরে মাইরা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
শেহরান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে তাঁকিয়ে আছে।
-মাইরা আস্তে করে গিয়ে সোফার উপরে রাখা ব্যাগগুলো হাতে তুলে নিল। আলমারির দরজা খুলে ড্রেসগুলো এক এক করে ভাঁজ করে রাখতে লাগলো। মেরুন জামদানিটা সবার উপরে রাখলো। তারপর আকাশি কালারটা। রাখার সময় একবার ব্যালকনির দিকে তাকালো। শেহরানকে দেখে চমকে উঠলো। এতক্ষণ খেয়াল করেনি শেহরানকে। মাইরা বিড়বিড় করে বলল, রুমে কখন আসলো আর আজ এই লোকের কি হয়েছে।
-আলমারির তাকে জুতার বক্স দুইটা রাখতে গিয়ে একটু উঁচু হতে হলো। হাত নাগালে পাচ্ছে না। তাই পায়ের উপর ভর দিয়ে রাখলো।
-ঠিক তখনই পিছন থেকে গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসলো, কি করছো?
মাইরা সাথে চমকে উঠলো। হাত থেকে একটু হলেই বক্সটা পড়ে যেত। মাইরা বিরক্তি নিয়ে পিছনে ঘুরে দেখলো শেহরান দাঁড়িয়ে আছে। মাইরা গলায় হালকা ঝাঁজ নিয়ে বলল, জুতাগুলো রাখছিলাম।
শেহরান কিছুই বলল না। দুই কদম এগিয়ে এসে বক্সটা মাইরার হাত থেকে নিয়ে উপরের তাকে রেখে দিল। তারপর আবার ব্যালকনির দিকে চলে গেল।
মাইরা ভ্রু কুঁচকে শেহরানের যাওয়ার দিকে তাঁকিয়ে বলল অদ্ভুত লোক একটা। পিছনে ফিরে আলমারির দরজা আটকাতে গিয়ে ভিতরে একটা ছবি চোখে পড়লো। ছবিটা আলমারির এক কোণে একটা ফাইলের নিচে চাপা দেওয়া রয়েছে। মাইরা আস্তে করে ছবিটা হাতে তুলে নিল। ছবিটা দেখেই বুকের ভিতরটা ধক করে উঠলো। এটা সেদিনকার সেই ছবিটা। এর আগেও একবার মাইরা এই ছবিটা দেখেছিল। শেহরানের হাতে ছিল তখন। কিন্তু তখন মাইরা গুরুত্ব দেয়নি। ছবিতে একটা মেয়ে। মাইরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। চোখের পাতা পড়ছে না।
ঠিক তখনই ব্যালকনি থেকে শেহরানের কন্ঠ ভেসে আসলো, মাইরা মাইরা চমকে উঠলো। তাড়াতাড়ি ছবিটা আগের জায়গায় রেখে আলমারির দরজা লাগিয়ে দিল।
শেহরান ব্যালকনি থেকে রুমে আসলো। দেখলো মাইরা আলমারির সামনে একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শেহরানের কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। মেয়েটাকে কেমন যেন লাগছে। শেহরান দুই কদম এগিয়ে এসে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে কোনো সমস্যা?
মাইরা চমকে উঠলো। তাড়াতাড়ি মাথা তুলে শেহরানের দিকে তাকালো। আমতা আমতা করে বলল, না কিছুনা এমনি মাথাটা একটু ধরেছে।
শেহরান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। মাইরা আস্তে করে চোখ নামিয়ে নিল।
শেহরান আর কিছু বলল না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা
বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
-মাইরা দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।
-শেহরান সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবলো, হঠাৎ কি হলো এই মেয়ের একটু আগেও তো ঠিক ছিল।
শেহরানের চলে যাওয়ার দিকে মাইরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ চোখ দিয়ে টপটপ করে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। মাইরা খুব আস্তে করে, বিড়বিড় করে বলল, আমি কি খুব বড় ভুল করে ফেলেছি কথাটা বলেই নিজের হাত দিয়ে চোখের পানি মুছলো।
সকাল সাতটা। জানালা দিয়ে রোদ এসে রুমের মেঝেতে পড়েছে। বাইরে থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে। মাইরা ঘুম থেকে উঠেছে প্রায় ঘন্টাখানেক আগে। এখনো বিছানা থেকে নামেনি। রাতের ঘুমটা ভালো হয়নি। চোখ দুটো ফুলে গেছে। মাইরা এক দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে।
এদিকে শেহরান সকালের জগিং সেরে বাড়ি ফিরলো
গায়ের টি-শার্টটা ঘামে ভিজে গেছে। শেহরান আস্তে করে রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। মাইরা বিছানায় বসে আছে। মাইরাকে দেখে শেহরান একটু থমকে দাঁড়ালো। মাইরাকে কেমন অস্বাভাবিক রকমের শান্ত দেখাচ্ছে। যেটা আগে কখনো ওর মধ্যে দেখেনি। শেহরান ধীরপায়ে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে।
মাইরা আনমনে চেয়ে আছে জানালার দিকে। যেনো গভীর কোনো ভাবনায় ব্যস্ত।
-শেহরান হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে মাইরার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো।
মাইরা চমকে শেহরানের দিকে চাইল। ও তো এতক্ষণ খেয়ালই করেনি।
-শেহরান শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কি কিছু হয়েছে মন খারাপ?
মাইরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে ছোট্ট করে বলল, না।
শেহরান লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল, সমস্যা হলে বলতে পারো আমার সাথে।
মাইরা মাথা নিচু করে বলল, না কোনো সমস্যা না।
শেহরান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর শুধু বলল, আচ্ছা।
মাইরা আস্তে করে বলল, হুম।
শেহরান আর কিছু না বলে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
রুমে আবার নীরবতা নেমে আসলো। মাইরা শেহরানের যাওয়ার দিকে তাকালো। একটা শ্বাস নিয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। কিচ্ছু ভালো লাগছে না।
শেহরান দশ মিনিট পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো। একবারে গোসল সেরে। রুমে এসে ভ্যানিটির সামনে দাঁড়িয়ে। চুলে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে। আয়নার মধ্যে মাইরার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বলল। তুমি কি লাগেজ গুছিয়েছো? তোমার আমাদের কিন্তু বেরোতে হবে।
মাইরা অবাক হয়ে শেহরানের দিকে তাকালো। উনি তাহলে যাবেন। আর ওনার মনে আছে আমরা আজকে কোথায় যাব। ভাবতেই মনটা একটু ভালো হয়ে গেল।
মাইরার নীরবতা দেখে শেহরান পিছনে ফিরে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে বলল তুমি কি যেতে চাওনা তোমার মামা বাড়ি?
মাইরা সাথে সাথে চঞ্চল পায়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। শেহরানের সামনে দাঁড়িয়ে একটু হাসতে হাসতে বলল। আপনি সত্যি যাবেন আপনার মনে আছে আজকে আমরা যাবো?
মনে থাকবে না কেন কালকে না তুমি যাওয়ার জন্য শপিং করে আসলে আচ্ছা তোমার হয়েছে কি বলতো? কথাটি বলেই শেহরান আবার ভ্যানিটির দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। মাইরা নিজের মন খারাপ কে প্রকাশ না করে বলল। আমার কিছুই হয়নি আপনি পাঁচ মিনিট দাঁড়ান আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। বলেই দৌড়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল।
শেহরান মাইরার যাওয়ার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে ফিক করে হাসলো। বিড়বিড় করে বলল, এই মেয়েটা না কখন কি করে ও হয়তো নিজেও জানেনা। এই দেখলাম মন খারাপ। আবার এখনই নাচতে নাচতে যাচ্ছে।
অবশেষে সেই সময় চলেই আসলো। ড্রাইভার একটা লাগেজ নিয়ে গাড়িতে তুলল। মাইরা এখনো আসেনি। শেহরান গাড়ি থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সাড়ে দশটা বাজে। মাইরার এখনো কোনো খোঁজ নেই। মাইরার মামা বাড়ি যেহেতু গ্রামে তাই যেতে প্রায় ৩-৪ ঘন্টা লেগে যাবে।
মাইরা একটি থ্রি-পিস পরে মাথায় হিজাব বেঁধে রেডি হয়েছে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। সদর দরজা পেরতেই দেখল শেহরান গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছে। মাইরা দুষ্টু হেসে একদম ভাব নিয়ে এগিয়ে এসে বলল, সরি সরি রাস্তায় জ্যাম ছিল।
শেহরান ভ্রু কুঁচকে বলল, বাড়ির গেট থেকে গাড়ি পর্যন্ত আসতে জ্যাম পাইলা কই?
মাইরা একটুও না ঘাবড়ে বলল, আরে ওই যে বিড়ালটা রাস্তা কেটে দিহয়েছিল অশুভ তাই ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলাম হি হি।
শেহরান বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে বলল। এতক্ষণ তো শান্তই ছিল। আবার শুরু হয়ে গেল।
মাইরা আবার হেসে বলল, আর হ্যাঁ, নাস্তা করছেন আমি কিন্তু ৪টা পরোটা, ২টা ডিম আর এক কাপ চা খেয়ে আসছি। বাড়িতে গিয়ে কি খাওয়াবে কে জানে। আগে থেকেই পেট ভরে নিলাম।
শেহরান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ড্রাইভারকে বলল, চলো।
মাইরা গাড়ির সামনের সিটে উঠতে যাবে, শেহরান ঠান্ডা কন্ঠে বলল, পিছনে আসো।
কেন? আমি পিছনে যাব না।
শেহরান দাঁতে দাঁত চেপে বলল। আমি যা বললাম তাই করো। পিছনে আসো।
মাইরা মুখ কালো করে পিছনের সিটে বসলো। তারপর শেহরানের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলল আস্ত একটা খাটাশ লোক।
-শেহরান রাগী চোখে তাকাতেই।
-মাইরা হি হি করে হেসে ফেলল।
শেহরান আর সহ্য করতে না পেরে বলল, চুপচাপ বসে থাকবা। একটা কথাও না।
মাইরা সাথে সাথেই চুপ মেরে গেল। কিছুক্ষণ পেরোতেই আবার ফিসফিস করে বলল, আচ্ছা গাড়িতে গান ছাড়বেন সায়রা আপুর ফোনে একটা নতুন গান শুনেছি বাঁশিওয়ালা রে…..
ড্রাইভার, গাড়ি থামাও আমি নেমে যাই।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৩
-মাইরা ভয় পেয়ে সাথে সাথে বলল, না না আমি চুপ একদম চুপ মুখে তালা বলেই নিজের মুখে হাত দিয়ে বসে রইলো। কিন্তু ১ মিনিট পরেই আবার ফিসফিস করে বলল ভাইয়া পানি খাবো।
-শেহরান জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলল, আল্লাহ ৪ ঘন্টা কেমনে কাটাবো?
