এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৮
সেঁজুতি আক্তার
মাইরা বিছানার সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। পাশে শেহরান ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। মাইরা কয়েকবার ল্যাপটপটা রাখতে বলেছে, কিন্তু শেহরান কিছুতেই শুনছে না। এই নিয়ে মাইরার বিরক্তির শেষ নেই।
— শেহরান একবার আড়চোখে মাইরার দিকে তাকাল। বউ যে বড্ড খেপে আছে সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মাইরা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল, আপনার সমস্যা কী আমি তো বুঝতেই পারছি না। নিজে অসুস্থ, সেদিকে কোনো খেয়াল আছে? সেই কখন থেকে ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে আছেন।
— শেহরান ল্যাপটপের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, দাঁড়াও। আর পাঁচ মিনিট। হয়ে গেছে প্রায়। মাইরা বিরক্ত হয়ে বলল, আপনার ওই পাঁচ মিনিট কখনো পাঁচ মিনিট হয় না।
শেহরান এবার মুচকি হাসলো। সত্যিই পাঁচ মিনিট। মাইরা মুখ বাঁকিয়ে শুয়ে পড়ল। এই লোকটাকে আসলে বোঝাই যায় না। মনে বিড়বিড় করে বলল, ইচ্ছা করে আর কোনোদিন দেখব না। বলেই চোখ বন্ধ করে ফেলল।
— শেহরান মাইরার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। তারপর নিজের কাজটা শেষ করে ল্যাপটপটা পাশে রেখে দিল। বেডসাইড টেবিলের লাইটটাও নিভিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর মাইরা টের পেল ঘরটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে। শীত লাগায় কম্বলটা নিজের দিকে টেনে নিতে হাত বাড়াতেই শেহরান ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে এলো। মাইরা চোখ মেলে তাকানোর আগেই শেহরান কম্বলটা ভালোভাবে ওর গায়ে জড়িয়ে দিল। মাইরা আস্তে করে বলল, এত ঠান্ডা করে রেখেছেন কেন? শেহরান হাসিমুখে বলল, আমার ভীষণ গরম লাগছিল।
— মাইরা কিছু বলল না। শেহরান একটু থেমে বলল, রাগ করেছো?
মাইরা মুখ ঘুরিয়ে বলল, না। শেহরান মৃদু হাসলো। তোমার এই ‘না কথাটার মানে আমি বুঝি। মাইরা এবার আর উত্তর দিল না। কম্বলের ভেতর মুখটা লুকিয়ে ফেলল।
— শেহরানও আর কিছু বলল না। পাশে শুয়ে থেকে চুপচাপ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
— হঠাৎ মাইরা বলে উঠল, আমাকে না নিয়েই চলে আসলেন কেন?
— সঙ্গে সঙ্গে শেহরান মাইরার দিকে তাকাল। শুকনো অধর ভিজিয়ে বলল, সেই সময় পরিস্থিতি এমন ছিল। আমার কাছে এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
— কী এমন পরিস্থিতি, যা আমাকে বলা যায় না?
— শেহরান মাইরার দিকে একটু এগিয়ে আসলো। আস্তে করে নিজের হাতটা মাইরার পেটে রাখল। সঙ্গে সঙ্গে মাইরা খানিক কেঁপে উঠল। কিন্তু কিছুই বলল না। চুপচাপ গুটিসুটি হয়ে শুয়ে রইল।
— শেহরান বলা শুরু করল, যেদিন আমি দেশ থেকে এখানে আসি, তার কিছুদিন আগে জানতে পারি তোমার কাগজপত্রে কিছু সমস্যা। যার জন্য তোমার পাসপোর্ট রেডি হতে সময় লাগবে। আর আমার কাছে…. শেহরানের কথা মাইরা শেষ করতে দিল না। তার আগেই বলল, শুধু এই বিষয়ের জন্য আমাকে একা ছেড়ে চলে আসলেন?
— শেহরান অপরাধীর ন্যায় বলল, সেই সময় আমার কাছে এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো নিজেকে দূরে রাখলেই তোমার ভালো হবে। কিন্তু যখন আমি বুঝতে পারি যে তোমাকে ছাড়া আমি ভালো থাকতে কখনোই পারব না, তখন আমি যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই যে এক্সিডেন্ট হলো। আর দেখো, ভাগ্য তোমাকে আবার আমার কাছে নিয়ে চলে আসলো।
— ওই সময় আসাটা কি খুব দরকার ছিল? মাইরা শান্ত কণ্ঠে বলল।
— শেহরান মাইরাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল, বিশ্বাস করো, সেই সময় আমার কাছে এটাই সঠিক মনে হয়েছিল। শেহরানের তপ্ত নিশ্বাস মাইরার ঘাড়ে গিয়ে পড়ছে। মাইরা চোখ বন্ধ করতেই দু ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। আপনাকে খুব মনে পড়েছে। ভীষণভাবে মনে পড়েছে। কথাটা বলে মাইরা শেহরানের দিকে ঘুরে ওকে জড়িয়ে ধরল। শেহরান নিজের পিচ্চি বউকে শক্ত করে নিজের বুকে আগলে নিল। তারপর ফিসফিস করে বলল, আমি জানি।
— মাইরা!
— শেহরানের মতো মাইরাও ফিস ফিস করে বলল, হুম!
— আমি আমার আগের মাইরাকে ফিরে পেতে চাই। যেই মাইরাকে আমি রেখে এসেছিলাম বাংলাদেশে তিন মাস আগে।
— মাইরা কোনো প্রতি উত্তর করল না। ঘাপটি মেরে স্বামীর বুকে পড়ে রইল।
— মাঝে কেটে গেল এক সপ্তাহ। গতকালই সায়রা নীলাদ্রির সাথে দেশে ফিরে গেছে। বাড়িটাও কেমন যেন একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মাইরা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রান্না করছে। শেহরান অবশ্য ওকে রান্না করতে বারবার বারণ করেছে। কিন্তু মাইরা কি আর শেহরানের কথা শুনছে? শেহরানের শরীর আগের থেকে অনেকটাই ভালো হয়েছে। এখন আর আগের মতো কষ্ট করে হাঁটতে হয় না। তবে পায়ের ব্যান্ডেজ এখনো খোলা হয়নি। ধীরে ধীরে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়।
— মাইরা চুলার আচটা কমিয়ে তরকারিটা নাড়ছিল। এমন সময় পেছন থেকে ধীর পায়ের শব্দ শুনতে পেল। মাইরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল শেহরান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে আসছে। মাইরা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল, আপনি এখানে কেন এসেছেন?
— শেহরান কোনো উত্তর না দিয়ে রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, তোমাকে দেখতে।
— মাইরা বিরক্ত হয়ে বলল, আমাকে দেখার জন্য রান্নাঘরে আসতে হবে?
— হুম।
— আপনি না অসুস্থ?
— ছিলাম।
— এখনো অসুস্থ।
— তুমি আছো তো। তাই আর অসুস্থ লাগছে না।
— মাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে শেহরানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার রান্নায় মন দিল। তারপরে বলল, আপনি রুমে যান।
— যাবো।
— তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
— শেহরান মুচকি হেসে বলল, তুমি বললে তো যাবো। কিন্তু আগে একটু তোমার সাথে কথা বলি।
— মাইরা বিরক্ত মুখে বলল, কী কথা?
— শেহরান একটু ভেবে বলল, আজকে কী রান্না হচ্ছে?
— মাইরা অবাক হয়ে তাকাল। এটা জানার জন্য এত কষ্ট করে এখানে এসেছেন?
— হুম।
— মাইরা গলায় খানিক ঝাঁজ নিয়ে বলল, আপনি যান।
— সঙ্গে সঙ্গে শেহরান মাইরার আরও একটু কাছে এগিয়ে আসল। দুষ্টুমি ভরা চোখে বলল, তুমি আমাকে জান বললে? সো সুইট। বলেই আরও একটু এগিয়ে আসলো।
— মাইরা অবাক হয়ে বলল, আপনি তো আচ্ছা দেখছি। আপনি অসুস্থ, হাঁটতে পারছেন না। কিন্তু আপনার ফাজলামো এখনো যায়নি। এক সপ্তাহ দেখছি আপনার এনার্জি দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে তো রাগী গম্ভীর বানরের মতো মুখ ফুলিয়ে থাকতেন। এখন কী হলো?
— শেহরান কপাল কুঁচকে বলল, তুমি কি আমাকে ইনডিরেক্টলি বানর বললে?
— মাইরা দুষ্টু হেসে বলল, বানর ইনডিরেক্টলি বলিনি, ডিরেক্টলি বলেছি।
— তৎক্ষণাৎ শেহরান একদম মাইরার কাছে এসে দাঁড়ালো। তারপর আটার ডিব্বা থেকে কিছু আটা নিয়ে মাইরার মুখে লাগিয়ে দিল। এইবার দেখো, কাকে বানরের মতো দেখা যায়।
— মাইরা অবাক হয়ে শেহরানের দিকে চাইল। এটা যেন ওর নতুন কোনো চেহারা। সেই রাগী গম্ভীর লোকটাকে চেনাই যাচ্ছে না। মাইরাও আটার ডিব্বা থেকে অল্প একটু আটা নিয়ে এসে শেহরানের মুখে লাগিয়ে দিয়ে খিল খিল করে হাসলো।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৭
— শেহরান একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তবে রে! দাঁড়া।
— বলেই এক মুঠো আটা নিয়ে মাইরার গালে লাগিয়ে দিল। তারপর নিজের গালটা এগিয়ে নিয়ে গেল মাইরার গালের কাছে।
মাইরা শেহরানের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে গেল। বিপত্তি ঘটলো তখনই। ফ্লোরে হালকা পানি পড়েছিল। তার উপরে মাইরা পা দিতে ধপাস……..
