Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১৫

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১৫

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১৫
YASH

ইয়াশের নিশ্বাসের গতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসতেই কিয়ারা বুঝল লোকটা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। ও আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। বিছানা থেকে নেমে ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা ব্যাগ থেকে নিজের ফোনটা বের করল। ভাগ্য ভালো যে এতক্ষণে নেটওয়ার্কের বারগুলো পুরো দেখা যাচ্ছে। ও দ্রুত ইনায়াকে কল লাগাল। ওপাশ থেকে প্রথম রিং হতেই ইনায়া প্রায় চিৎকার করে কলটা ধরল, “কিয়ারা! তুই ঠিক আছিস তো ভাই? এতক্ষণ ধরে তোর ফোন পাচ্ছিলাম না কেন?”

কিয়ারা ঘরের জানালার দিকে এক নজর তাকিয়ে নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব শান্ত রেখে বলল, “আরে হ্যাঁ, আমি একদম ঠিক আছি। কিন্তু আপু, এখন আমাকে একটু হেল্প কর।”
ইনায়া ওপাশ থেকে উত্তেজিত হয়ে বলল, “হুম বল, কী হয়েছে? তুই কোথায় এখন?”
কিয়ারা ইয়াশের ঘুমন্ত অবয়বটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি এখন একটা গ্রামে আছি। এই জায়গার নাম ঠিকঠাক আমি নিজেও জানি না। আমি আমার ফোনের লাইভ লোকেশন অন করে রাখছি, তুই দয়া করে আমাকে এসে নিয়ে যা।”
কথাটা শুনে ইনায়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রায় স্তম্ভিত হয়ে বলল, “মানে? গ্রামের মধ্যে আছিস মানে কী? এখন বাজে রাত দেড়টা! এই মাঝরাতে তুই গ্রামে কী করছিস কিয়ারা? পাপা জানলে তো তুলকালাম হয়ে যাবে!”
কিয়ারা আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অবস্থায় ছিল না। সে ক্লান্ত গলায় শুধু বলল, “এত কিছু জিজ্ঞেস করিস না আপু, প্লিজ এসে নিয়ে যা আমাকে।”
বোনের গলার সেই অসহায়ত্ব টের পেয়ে ইনায়া আর দেরি করল না। সে বলল, “আচ্ছা, তুই লোকেশন অন রাখ। আমি আসছি।”

ফোনটা কেটেই ইনায়া নিজের এক চেনা পরিচিত পুলিশ অফিসারকে কল দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড সিকিউরিটির জন্য অ্যালার্ট করে দিল, যাতে মাঝরাস্তায় কোনো ঝামেলা না হয়। এরপর একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে সে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে নিচে নামল। গ্যারেজ থেকে নিজের গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে সে যেই মেইন গেটের বাইরে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই হেডলাইটের তীব্র আলোয় জানালার কাঁচের ওপাশে একটা চেনা অবয়ব ভেসে উঠল।
রুদ্র ছাতা মাথায় দিয়ে মোটরবাইকটা একপাশে রেখে সোজা এসে ইনায়ার গাড়ির জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। এই দুর্যোগের রাতেও ছেলেটার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত মায়া।
ইনায়া গাড়ির কাঁচটা কিছুটা নামিয়ে বেশ বিরক্তি আর রাগ মেশানো গলায় বলল, “কী চাও রুদ্র? এত রাতে তুমি এখানে কী করছ শুনি? আমার পিছু নিচ্ছ কেন?”
রুদ্র নিজের ভেজা চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “এত রাতে একা একা গাড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন আপনি? বাইরের আবহাওয়া দেখেছেন?”
ইনায়া স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “কোথায় যাচ্ছি আমি নিজেও জানি না। রাস্তা থেকে সরো এখন, আমার জরুরি কাজ আছে।”

রুদ্র আর কোনো কথা শুনল না। সে ঝট করে গাড়ির অন্য পাশের দরজাটা খুলে ফ্রন্ট সিটে এসে ধপ করে বসে পড়ল। দরজাটা লক করে সে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কোথায় যাচ্ছেন জানেন না, অথচ একা যাচ্ছেন? আমাকে সাথে নিয়ে চলুন।”
ইনায়ার মাথার ভেতর তখন কিয়ারার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল, তার ওপর রুদ্রর এই আকস্মিক পাগলামি দেখে সে রেগে আগুন হয়ে গেল। সে রুদ্রর দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল, “একটা থাপ্পড় দিবো এখন! একদম ফালতু মজা করার সময় না রুদ্র। নেমে যাও গাড়ি থেকে এখনই!”
রুদ্র এবার নিজের মুখের হাসিখুশি ভাবটা এক পলকে মুছে ফেলল। সে ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, “আপু, প্লিজ জেদ করবেন না। এখন অনেক রাত বাজে, আর চারপাশের পরিস্থিতিও ভালো না। এই অবস্থায় আপনাকে আমি একা কোনো যেতে দিতে পারি না।”
ইনায়া রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারল না। সময়ের অভাব আর বোনের বিপদের কথা চিন্তা করে সে এক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে গাড়িটা মেইন রোডের দিকে এগিয়ে গেলো।
ঝমঝম বৃষ্টিটা তখন অনেকটাই কমে এসেছে, তবে আকাশের গুড়গুড় ডাক আর চারপাশের থমথমে ভাবটা কাটেনি। ইনায়ার হাত দুটো ভয়ের চোটে বরফ হয়ে কাঁপছিল, স্টিয়ারিং হুইলটা ঠিকমতো ধরতে পারছিল না সে। রুদ্র ওর দিকে এক নজর তাকিয়ে পরিস্থিতিটা বুঝতে পারল। ও শান্ত গলায় বলল, “আপু, আপনার হাত কাঁপছে। আপনি বরং পাশে গিয়ে বসেন, গাড়িটা আমি চালাই।”

ইনায়া আর জেদ করল না, ধীর পায়ে নেমে গিয়ে পাশের সিটে বসল। রুদ্র স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে বেশ সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করতে শুরু করল, আর ইনায়া নিজের ফোন দেখে লাইভ লোকেশনের ম্যাপটা বলে দিতে লাগল। জিপিএস ট্র্যাক করতে করতে ওরা ইতিমধ্যেই মেইন রোড ছেড়ে সেই কাদাভর্তি ঘুটঘুটে অন্ধকার গ্রামের কাঁচা রাস্তায় ঢুকে পড়েছে। এগোতে এগোতে হঠাৎ করেই একটা পরিত্যক্ত পুরনো টিনের ঘরের ঠিক সামনে এসে জিপিএস সিগন্যালটা একদম স্থির হয়ে গেল। ইনায়া তড়িঘড়ি করে বলল, “রুদ্র, গাড়ি থামাও! এইখানেই দেখাচ্ছে।”
সামনে আর গাড়ি নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো অপশন ছিল না। ইনায়া গাড়ি থামামাত্রই এক বুক আতঙ্ক নিয়ে নিচে নেমে পড়ল এবং ফোন বের করে সাথে সাথে কিয়ারাকে কল লাগাল।
এদিকে বন্ধ টিনের ঘরের ভেতর তখন কিয়ারার ফোনের স্ক্রিনটা তীব্র আলো জ্বেলে টুংটুং করে কেঁপে উঠেছে। কিয়ারা বুঝল ওর আপু চলে এসেছে। ও নিজের খুলে যাওয়া লাল শাড়ির আঁচলটা কোনোমতে গায়ের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু এক ঝটকায় কাঠের কবাটটা টেনেই ও দেখল সর্বনাশ! দরজাটা তো বাইরে থেকে মুরুব্বিরা শিকল দিয়ে লক করে দিয়ে গেছে! কিয়ারা চারদিকে চোখ বুলাতেই দেখল, ঘরের পেছনের কাঠের জানলাটা খোলা রয়েছে। ও জানলা গলে পালানোর জন্য যেই না পা বাড়াবে, ঠিক তখনই বিছানা থেকে একটা খুব অস্পষ্ট, ভেজা কণ্ঠস্বর ওর কানে এলো। ও পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল, শার্ট ছাড়া ইয়াশের শরীরটা প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে কাঁপছে। ও চোখ না মেলেই বিছানায় অবশ অবস্থায় ফিসফিস করে বলছে, “ঠান্ডা লাগছে আমার…”

শত্রু হলেও এই অবস্থায় একটা মানুষকে এভাবে ফেলে যেতে কিয়ারার নিজের সহজাত মানবিকতায় বাধল। ও জানলার দিকে এক পা বাড়িয়েও আবার ফিরে এলো বিছানার কাছে। পাশেই একটা শুকনো সুতির চাদর ভাজ করা ছিল, ওটা তুলে নিয়ে ও ইয়াশের খালি গায়ের ওপর জড়িয়ে দিতে গেল। কিন্তু চাদরটা গায়ের ওপর পড়তেই ইয়াশ এক ঝটকায় নিজের দুই হাত বাড়িয়ে কিয়ারাকে এক টানে নিজের শক্ত বুকের সাথে ঝাপটে ধরল! ইয়াশের সেই জ্বরের ঘোরের অবশ বাঁধন এতটাই শক্ত ছিল যে কিয়ারা এক চুলও নড়তে পারল না।
এইদিকে ইনায়ার কলের পর কল আসছিল ফোনের স্ক্রিনে। কিয়ারা ছটফট করতে করতে বলল, “আরে ছাড়ুন! ছাড়ুন বলছি! আমার বোন বকবে রে ভাই”
ইয়াশ ওর কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না। ও প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে কাঁপতেকাতে কিয়ারার গায়ের ওপর নিজের মুখটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বিড়বিড় করল, “আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো মুরগির বাচ্চা… আমার অনেক ঠান্ডা লাগছে…”

কিয়ারা অবশ্য ওকে জড়িয়ে ধরল না। কিন্তু ইয়াশ যখন নিজের মুখটা একদম কিয়ারার বুকের মাঝে লুকিয়ে এক নিষ্পাপ শিশুর মতো আশ্রয় খুঁজল, তখন কিয়ারার ভেতরের অস্বস্তিটা চরম আকার ধারণ করল। একই সাথে ওর মনের নিভৃত কোণে এক অদ্ভুত মায়াও লাগছিল। এই প্রচণ্ড জ্বরে ছটফট করা মানুষটাকে এভাবে একা ফেলে ও চলে যাবে? কিন্তু পাপা যদি একবার জানতে পারে ও এই গভীর রাতে একটা পরপুরুষের সাথে বন্ধ ঘরে আছে, তবে তো মস্ত বড় কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! কিন্তু এই লোক তো ওর বর বিয়ে হয়েছে ওর সাথে। তাহলে?
ও নিজের মনকে শক্ত করল না, ওকে এখন এখান থেকে পালাতেই হবে। কিয়ারা নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে ইয়াশের সেই উত্তপ্ত লোহার মতো শক্ত বুকের বাঁধন থেকে নিজেকে কোনোমতে ছাড়িয়ে নিল। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে ও বিছানা থেকে দূরে সরে গেল। ইয়াশ তখনো বিছানায় অবশ হয়ে হাত দুটো শূন্যে বাড়িয়ে ফিসফিস করে আকুল গলায় আওড়াল, “আমাকে… আমাকে একা ছেড়ে যেও না বাটারফ্লাই…”
কিয়ারা আর পেছনের দিকে তাকাল না। ও একছুটে জানলার কাছে গিয়ে শাড়িটা সামলে নিয়ে কোনোমতে জানলা গলে নিচে মাটিতে লাফিয়ে পড়ল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর মেহগনি বাগানের জঙ্গল। ঠিক তখনই ইনায়ার কলটা আবার আসতেই কিয়ারা অন্ধকারের মাঝেই ফোনের স্ক্রিনের আলোটা দেখে হন্তদন্ত হয়ে ওদিকের রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।

ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে কিয়ারাকে ওভাবে উষ্কখুষ্ক চুলে, শাড়ি প্রায় খুলে যাওয়া এলোমেলো অবস্থায় বের হয়ে আসতে দেখে ইনায়ার কলিজা যেন এক মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে একছুটে গিয়ে বোনকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সামনে ছাতা মাথায় দিয়ে রুদ্রও দাঁড়িয়ে ছিল, ও চোখ বড় বড় করে কিয়ারার এই অদ্ভুত রূপ দেখছিল।
ইনায়া কিয়ারার গাল দুটো হাত দিয়ে ধরে ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছিল বুনু তোর? এই অবস্থা কেন তোর? কে তোকে এইখানে আনল?”
কিয়ারা নিজের হাঁপানো বুকটাকে একটু শান্ত করে জানলার দিকে এক নজর তাকিয়ে ইনায়াকে বলল, “সব কি এখনি শুনবি? আগে এই বাড়ি চল, তারপর সব বলছি।”
পাশ থেকে রুদ্র এবার কিয়ারার শাড়ির কুঁচি আর উষ্কখুষ্ক চুলের দশা দেখে এক গাল বাঁকা হেসে বলল,
“উম্ম… দেখে যা মনে হচ্ছে, হাসের বাচ্চাটা বোধহয় বড় কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ডিরেক্ট মারামারি করে ফেরত আসছেন!”

এমনিতেই কিয়ারার মেজাজটা আজ দিনভর চড়ে আছে, তার ওপর রুদ্রর এমন ফালতু রসিকতা শুনে ও রেগে আগুন হয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে চিল্লিয়ে উঠল, “আপু! এই ভ্যাড়াটাকে তুই এত রাতে নিজের সাথে কেন এনেছিস?”
রুদ্র ছাতাটা একটু উঁচিয়ে চোখ গরম করে বলল, “অ্যাই! অ্যাই মেয়ে! ভ্যাড়া বললে কিন্তু একদম খবর করে দিবো বলে রাখলাম!”
কিয়ারা নিজের কোমরে হাত দিয়ে ত্যাড়ামি করে বলল, “তা কয়টা খবর করবে শুনি? শুনি একটু তোমার খবরের বহর!”

ইনায়া এবার নিজের দুই কপালে হাত দিয়ে ওদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ও জাঁদরেল উকিলের মতো কড়া গলায় ধমকে উঠল, “আরে থাম তোরা! তোরা দুইজন যেখানেই যাস, সেখানেই কি এভাবে কুত্তা-বিলাইয়ের মতো ঝামেলা শুরু না করলে পেটের ভাত হজম হয় না? চল এখন জলদি গাড়িতে!”
ইনায়ার ধমক খেয়ে ওরা দুজন দুদিকে মুখ কুঁচকে গাড়ির পেছনের সিটের দিকে এগোল। কিয়ারা যেই না গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই রুদ্র পেছন থেকে সুযোগ বুঝে কিয়ারার মাথায় টুপ করে একটা ঠোকা দিয়ে দিল! ঠোকা খেয়ে কিয়ারার রাগ তখন সাত আসমানে চড়ে গেল। ও রাগে রি রি করতে করতে ইশারায় রুদ্রর দিকে থুথু দেওয়ার ভংগি করে ধড়ফড় করে গাড়ির ভেতরে উঠে দরজাটা দড়াম করে লক করে দিল। বাইরে দাঁড়িয়ে ইনায়া নিজের মাথায় হাত দিয়ে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল, “আল্লাহ! এই দুইটা রে নিয়ে আমি কই যাবো!”

গাড়ি মির্জা বাড়ির মেইন গেটের সামনে এসে থামল। পুরো বাড়ির চারপাশ তখন মাঝরাতের নিস্তব্ধতায় মগ্ন। ইনায়া আর কিয়ারা গাড়ি থেকে নেমে এগোল। রুদ্র পেছনের সিট থেকে নামতে যাবে, ঠিক তখনই নিজের খামখেয়ালি স্বভাবের কারণে দরজার নিচে থাকা একটা উবুড় হয়ে থাকা ইটের সাথে লেগে মারাত্মক এক হোঁচট খেল। টাল সামলাতে না পেরে ও প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়তে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কিয়ারা বাজপাখির মতো ওর দিকে এগিয়ে এলো। এমনিতেই ওর মেজাজ আজ দিনভর বিগড়ে ছিল, তার ওপর রুদ্রর এমন ছন্নছাড়া ভাব দেখে ও দুই চোখ বড় বড় করে ঝাঁঝালো গলায় বলল, “চোখ কি গিলে ফেলেছো? দেখে নামা যায় না?”
রুদ্র নিজের জ্যাকেটের কাদা ঝাড়তে ঝাড়তে কিয়ারার দিকে মুখ কুঁচকে তাকাল।
“হ! তোর বাপ চৌদ্দডা লাইট টাঙাইয়া রাখছে দেখে হাটার জন্য!”
বাপ শব্দটা শোনা মাত্রই কিয়ারার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। ও এক কদম এগিয়ে এসে নিজের এক আঙুল উঁচিয়ে কড়া গলায় চেঁচিয়ে বলল, “বাপ তুলে কথা বলবি না বলে রাখলাম!”

রুদ্র নিজের কান চুলকাতে চুলকাতে বাঁকা হেসে জবাব দিল, “তোর বাপ যে ভারি… আমি তুলবো কীভাবে?”
রুদ্রর এমন উত্তর শুনে কিয়ারার রাগ তখন সাত আসমানে চড়ে গেছে। ও আর এক সেকেন্ডও সহ্য করতে পারল না। ও শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিয়ে নিচ থেকে ছুড়ে মারার জন্য অন্ধকারের মাঝেই হন্যে হয়ে একটা শক্ত ইট খুঁজতে শুরু করল।
ওদের এই মাঝরাতের হুলস্থুল কাণ্ড দেখে ইনায়া নিজের কপালে হাত দিয়ে ওদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ও কড়া গলায় ধমকে উঠল, “ভাই থাম তোরা! এখন অনেক রাত হয়েছে, চারপাশের মানুষজন জেগে যাবে। কিয়ারা, তুই আর কথা না বাড়িয়ে সোজা ঘরে চল। আর রুদ্র, তুমি অনেক নাটক করেছো, এবার নিজের বাসায় যাও।”
রুদ্র এবার নিজের সেই মারকুটে ভাবটা এক পলকে বদলে ফেলে একদম এক নিষ্পাপ বিড়ালের মতো মুখ করল। ও ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মিনতির সুরে বলল, “বউ, আমাকেও নিয়ে চলো না তোমার সাথে!”
ইনায়া রুদ্রর দিকে চোখ রাঙিয়ে নিজের ডান হাতটা উঁচিয়ে বলল, “একটা থাপ্পড় দিবো এখন! আমি তোমার বউ হই?

পাশ থেকে কিয়ারা নিজের ইট খোঁজা বাদ দিয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বলল, “ভ্যাড়া একটা!”
রুদ্র এবার নিজের মুখটা ছোট করে ফেলল। চারপাশের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বিড়বিড় করল, “এই দুনিয়ায় কেউ আমাকে ভালোবাসে না!”
বলেই ও নিজের বাইকটার দিকে পা বাড়াল। রুদ্র চলে যেতেই ইনায়া আর কিয়ারা পা টিপে টিপে দোতলার নিজের রুমে গিয়ে ঢুকল। ঘরের দরজাটা লক করতেই কিয়ারার ভেতরের এতক্ষণের চেপে রাখা সব ক্লান্তি আর অস্থিরতা এক নিমেষে উছলে উঠল। ও বিছানায় ধপ করে বসে রাতের সেই ঝড়-বৃষ্টির রাস্তা থেকে শুরু করে অটোওয়ালার ফাঁদ, টিনের ঘরের গুন্ডাদের মারামারি এবং শেষমেশ সেই মুরুব্বি ও কাজি সাহেবের সামনে বিয়ে করার সব কথা একনাগাড়ে ইনায়াকে খুলে বলল।
পুরো ঘটনা শুনে ইনায়া যেন এক মুহূর্তে নিজের মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলল। ও পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে কিয়ারার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আইনি মারপ্যাঁচ জানা ইনায়া খুব ভালো করেই বোঝে যে পাত্র-পাত্রীর পূর্ণ হুশ ছাড়া, কোনো অভিভাবক বা সাক্ষী ছাড়া এমন চরম পরিস্থিতির চাপে পড়ে ডিক্লেয়ার করা সইয়ের কোনো আইনি ভিত্তি থাকতে পারে না।

সে নিজের মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে কিয়ারার কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করার গলায় বলল, “শোন কিয়ারা… আইনি পরিভাষায় এটাকে কোনো বিয়েই বলে না। এটা সম্পূর্ণ একটা ভুয়া আর পরিস্থিতির চাপ ছিল। এই ফালতু বিষয় নিয়ে ভাবার কিচ্ছু বলার দরকার নেই। ইভেন কাউকেই কিচ্ছু জানাতে হবে না। তুই একদম চিল থাক!”
কিয়ারা নিজের বাঁ হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে একদম চুপ হয়ে রইল। মুখ দিয়ে কোনো কথা না বললেও ওর মনের ভেতর তখন কেবল সেই গম্ভীর পুরুষটির চোখ, গালের সেই ছোট কাটার দাগ আর ওর পেটে খাওয়া সেই চুমুটার কথাই বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ও বুঝতে পারছিল না—পেছনের সব স্মৃতি ও ভুলে গেলেও এই একটা রাতের ধাক্কা ও নিজের মন থেকে কীভাবে মুছে ফেলবে! এতো টান অনুভব হচ্ছে লোকটার জন্য। এর কারণ কি? তিন কবুলের জোড়?

কিয়ারা কান্না পেলো কিন্তু ও কাঁদে না। ইনায়ার সামনে কাঁদলে ধরা পড়ে যাবে।
পরের দিন সকালের
মিঠে রোদ যখন মির্জা বাড়ির খাবার টেবিলের ওপর এসে পড়ল, তখন চারদিকের পরিবেশটা বেশ শান্ত। কিয়ারা কাল রাতের সেই ঝড়ের ক্লান্তি কাটিয়ে
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। ডাইনিং স্পেসে পা রাখতেই ও দেখল বড় বড় দুটো কাঠের চেয়ারে মুখোমুখি বসে আছেন আবির মির্জা আর আদিল মির্জা। ওনাদের সামনে চায়ের কাপ থেকে হালকা ধোঁয়া উড়ছে।
কিয়ারাকে নিচে নামতে দেখেই আবির মির্জা চেয়ার ছেড়ে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন। মেয়েকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন তিনি। কাল রাতের ওই ভয়ংকর ঝড়ের মধ্যে মেয়ে বাইরে ছিল ভেবে ওনার বাবার মনটা খটখট করছিল। তিনি কিয়ারার কপালে একটা চুমু খেয়ে নিজের পাশের চেয়ারটায় ওকে বসালেন। এরপর নিজ হাতে প্লেট টেনে পরোটা আর ডিম ভাজি দিতে দিতে বললেন, “কাল রাতে ঝড় হয়েছিল মা। তোমাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলাম।”
ঠিক তখনই টেবিলের ওপাশ থেকে আদিল মির্জা চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বেশ কৌতূহল আর চতুর চোখ করে জিজ্ঞেস করলেন, “তা… কখন এসেছো মা?”

কিয়ারা নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “এই তো, সকালেই।”
‘সকালেই’ শব্দটা শোনা মাত্রই আদিল মির্জার মুখের হাসিখুশি ভাবটা উধাও হয়ে গেল। ওনার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ছোট হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলেন, “সে কী! ইয়াশ কি তবে কাল রাতে মেয়েটাকে নিজের কাছে আটকে রাখতে পারল না? ও কি সকাল হতেই পালিয়ে চলে এসেছে?”
ওনার পুরো হিসাব যেন এক সেকেন্ডে ওলটপালট হয়ে গেল। তিনি নিজের মনের খটকা দূর করতে আমতা আমতা করে আবার প্রশ্ন করলেন, “তা… বিয়ে কেমন হলো মা?”
কিয়ারা পরোটার টুকরোটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে বেশ অবাক হয়ে বাপির দিকে তাকাল। ও হেসে বলল, “বিয়ে কেমন হলো মানে বড় বাপি? বিয়ে তো আজকে রাতে হবে। কালকে তো জাস্ট রাহার গায়ে হলুদ ছিল!”
আদিল মির্জা নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে চট করে নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি শুকনো একটা ঢোক গিলে থতমত খেয়ে বললেন, “ওহ! আচ্ছা আচ্ছা… বুড়ো হয়ে যাচ্ছি তো, দিনক্ষণের হিসাব আজকাল একদম মাথায় থাকে না, হাহা!”

ওনার মনের ভেতর তখন কেবল নিজের ছেলের ওপর প্রচণ্ড রাগ জমছিল যে ইয়াশ এত বড় সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করে দিল।
পাশ থেকে আবির মির্জা মেয়ের শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার মনে হলো বান্ধবী রাহার বিয়েতে সারারাত জেগে ধকল যাওয়ার কারণেই কিয়ারার এই দশা। তিনি কিয়ারার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, “এক রাতেই দেখতি দেখতে আমার মা-টা কেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে! আজকে রাতে আর ওই বিয়ে বাড়িতে থাকতে হবে না সোনা মা। বিয়ে শেষ হয়ে গেলেই সোজা বাড়ি চলে আসবি, কেমন?”
কিয়ারা বাপের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি নিষ্পাপ হাসি দিল। ও নিজের চামচ দিয়ে খাবারের লোকমাটা সবেমাত্র মুখের কাছে নিয়েছে, ঠিক তখনই ডাইনিং হলের সদর দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখল এক টা পুরুষ। সাদা ফর্সা গায়ের রঙের ওপর একটি কুচকুচে কালো রঙের শার্ট চুলগুলো নিখুঁতভাবে ব্যাকব্রাশ করা, আর চোখে গাম্ভীর্য। রুমে প্রবেশ করল ইয়াশ মির্জা।

নিজের ছেলেকে পনেরো বছর পর এই বাড়ির অন্দরে সুস্থ-সবল অবস্থায় পা রাখতে দেখে আদিল মির্জা নিজের সব রাগ ভুলে এক মুহূর্তে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি চওড়া গলায় ডেকে উঠলেন, “আসো, আসো মাই সন! ভেতরে আসো!”
আবির মির্জাও ভাতিজাকে এভাবে ঘরের ভেতর ঢুকতে দেখে বেশ সম্মানিত বোধ করলেন। তিনি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, “আরে ইয়াশ! এসো বাবা, টেবিলে বসো।”

এদিকে কিয়ারা ইয়াশকে দেখা মাত্রই ওর চোখের মণি দুটো এক সেকেন্ডে চড়কগাছে উঠল। কাল রাতের হ্যারিকেনের আবছা আলোয় শার্ট খোলা যে সাইকো ছিনতাইকারী আর কিডনি চোরটা ওকে নিজের গায়ের কোট জড়িয়ে দিয়ে বুকে আগলে রেখেছিল, আর যে ব্যাঙের বাচ্চাটা ওকে চড় মারার ভয় দেখিয়েছিল এ তো হুবহু সেই লোকটাই! কিয়ারা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ধাক্কাটা এতটাই তীব্র ছিল যে খাবারের লোকমাটা গলার কাছে আটকে গিয়ে ও একনাগাড়ে মারাত্মকভাবে কাশতে শুরু করল,

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১৪

মেয়ের হুট করে এমন বিষম খাওয়া আর কাশি দেখে আবির মির্জা তাড়াহুড়ো করে টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা তুলে কিয়ারার মুখের সামনে এগিয়ে দিলেন। পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলেন, “কী হলো মা? আস্তে খাও, আস্তে খাও!”
কিয়ারা জলের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতেও নিজের বড় বড় কুচকুচে কালো চোখ জোড়া মেলে ইয়াশের দিকেই তাকিয়ে রইল। আর ঠিক তখনই ইয়াশ নিজের পকেটে হাত দিয়ে, গম্ভীর পায়ে টেবিলের দিকে এগোতে এগোতে নিজের সেই তীক্ষ্ণ বাদামী চোখ দুটো দিয়ে একদম সোজা কিয়ারার দিকে তাকাল। কাল রাতে ওকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে আসার অপরাধে ইয়াশের চোখে তখন এক ভয়ংকর, রাগী চাউনি জ্বলজ্বল করছিল।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here