এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৯
সেঁজুতি আক্তার
মাইরা স্লিপ কেটে ধপাস করে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে শেহরানের চোখ-মুখ পাল্টে গেল। এক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা পায়ের ব্যথায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল, মাইরা পড়তেই তার সব ব্যথা বেমালুম হাওয়া। হাঁটু গেড়ে বসে একটানে মাইরার হাত চেপে ধরল। অস্থির কণ্ঠে শুধালো, কোথায় লেগেছে?
মাইরা কোমরে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
মরে গেছি! আল্লাহ গো মরে গেছি! আমার কোমর শেষ, একদম শেষ! শেহরান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মাথা থেকে পা অবধি একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বাঁকা কন্ঠে বলল, এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটল, অথচ তোমার মুখের স্পিকার এখনো বন্ধ হয়নি। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে অবস্থা বেশি খারাপ না।
মাইরা সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে তাকাল। আপনি আমার সাথে মজা করছেন?
–“না।”
–“করছেন।”
–“একদম না।”
–“তাহলে হাসছেন কেন?”
শেহরান ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর বৃথা চেষ্টা করল। পারল না। মুখ ঘুরিয়ে ফেলতেই মাইরা আরও ক্ষেপে গেল, দেখেছেন! দেখেছেন! আপনি হাসছেন! শেহরান এবার গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, আচ্ছা বাবা হাসছি না। তুমি ঠিক আছো তো?
আমি ঠিক আছি কিনা সেটা আমি নিজেও জানি না। আপনি আগে আমাকে উঠিয়ে বসান।শেহরান হাত বাড়িয়ে মাইরাকে টেনে তুলল। নিজে উঠতে গিয়েই উফ করে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। পায়ের ব্যথাটার কথা মনে পড়ে গেল।
মাইরা সেটা দেখেই নিজের ব্যথা ভুলে গেল। ঝাঁঝিয়ে উঠল,
আপনার পায়ে লেগেছে তাই না? মিথ্যা বলবেন না একদম।
–“না।”
–“মিথ্যুক।”
–“কিছু হয়নি।”
–“তাহলে মুখ এমন করেছেন কেন?”
তুমি পড়ে যাওয়ার পর তোমাকে তুলতে গিয়ে একটু চাপ পড়েছে। এই আর কী। মাইরা কপাল কুঁচকে ফেলল।
আমি পড়ে গেলাম আর আপনি নিজের ব্যথা পা নিয়ে নায়ক সাজতে গেলেন? আপনাকে কতবার বলেছি, বেশি হাঁটাচলা করবেন না! শেহরার নাক মুখঁঁচকে বলল “তুমি পড়ে গেলে আমি কী করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম? দেখতেন! আগে নিজেকে বাঁচাতেন। আপনি নিজেই তো অসুস্থ।
–“তুমি পড়লে তোমাকে তুলতে হবে না?”
*-“না।”
–“না?”
–“না। আমি নিজেই উঠতাম।”
শেহরান চারপাশের ভেজা ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বলল, এই ভেজা ফ্লোর থেকে?মাইরা নিচের দিকে তাকাল। তারপর আস্তে করে বলল, হ্যাঁ।কীভাবে? মাইরা আবার কোমরে হাত দিয়ে বলল, জানি না। শেহরান এবার আর হাসি ধরে রাখতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠল। তোমার যুক্তিটা খুব সুন্দর।”
–“কী সুন্দর?”
–“নিজে কীভাবে উঠবে জানো না, কিন্তু আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলছো।”
–মাইরা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “আপনি বেশি কথা বলেন।”
–“তুমি কম বলো?” বলেই শেহরান দুই ভ্রু নাচালো।
–মাইরা কোমরে দুই হাত দিয়ে বলল “আমি কখন বেশি কথা বললাম?
–এখনই তো বলছো।
মাইরা মুখ ঘুরিয়ে নিল। আপনার সাথে কথা বলাই ভুল।
শেহরান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল এই ভুলটা তুমি প্রতিদিন করো।”
মাইরা আর উত্তর দিল না। রান্নাঘরের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা আটা আর মেঝের পানি দেখে তার চোখ কপালে উঠল। নিচে তাকিয়ে বলল, “সব আপনার জন্য হয়েছে।”
“আমার জন্য?”
“হ্যাঁ। আপনি আগে আমার মুখে আটা লাগিয়েছেন।”
“তুমি আমাকে বানর বলেছিলে।”
“সত্যিই তো বলেছি।”
“তাহলে শাস্তি পেয়েছো।”
“আটা লাগানো শাস্তি?”
“হুম।”
মাইরা চোখ সরু করে তাকাল। আপনি খুব খারাপ।”
“জানি।”
“আর খুব ফাজিল।”
“সেটাও জানি।”
“আর অসুস্থ হয়েও আপনার কোনো বুদ্ধি হয়নি।”শেহরান মাথা নেড়ে বলল, এটা অবশ্য ঠিক।
মাইরা একটু অবাক হয়ে তাকাল। শেহরানকে এমন সহজভাবে নিজের দোষ স্বীকার করতে দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসলো। এই তো। এখন মানুষটার মতো লাগছে।”
মাইরা ভ্রু কুচকে বলল কাকে মানুষ বললেন?”
“তোমাকে।”
“আমি কি আগে মানুষ ছিলাম না?”
“ছিলে। তবে একটু আগে আটা মাখা ভূতের মতো লাগছিল।”
মাইরা সঙ্গে সঙ্গে শেহরানের বাহুতে হালকা চিমটি কাটল। আপনি চুপ করবেন?
শেহরান হাসতে হাসতে বলল, আচ্ছা, চুপ।”কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মাইরা আবার বলল, আপনি কিন্তু আমার কথা শুনবেন। এখনই রুমে যাবেন।”
“ঠিক আছে।”
“আর হাঁটবেন না বেশি।”
“ঠিক আছে।”
“আর নিজের পায়ের ব্যথা লুকাবেন না।”
“ঠিক আছে।”
মাইরা সন্দেহের চোখে তাকাল। সত্যি?”
“হুম।”
“তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
শেহরান মুচকি হেসে বলল, “তুমি আমাকে ধরে নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করছি।”
মাইরা চোখ বড় বড় করে বলল, “আমি?”
“হুম।”
“আপনি এত বড় মানুষ, আপনাকে আমি ধরে নিয়ে যাব?”
শেহরান শান্ত কণ্ঠে বলল,”তুমি তো আমার বউ। এতটুকু দায়িত্ব নিতে পারো না?”
মাইরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,”আপনার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে আপনি আমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন।”
“আমি অসুস্থ বলেই তো তোমাকে কাছে চাইছি।”
কথাটা শুনে মাইরা আর কিছু বলল না। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল। শেহরান সেটা দেখে হেসে ফেলল। তারপর রান্নাঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, তবে একটা কথা।”
“কী?”
“আগে এই পানি পরিষ্কার করো।”
“আমি করব?”
“না। আমি করব।”
“আপনি বসুন।”
“তাহলে তুমি করবে?”
“না।”
“তাহলে?”
মাইরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, কাজের মানুষকে ডাকব।
শেহরান মাথা নাড়ল।এই বুদ্ধিটা এতক্ষণে আসলো?”
মাইরা ভ্রু কুঁচকে বলল,সব বুদ্ধি আমার একসাথে আসে না।”
শেহরান আবার হাসল। তারপর ধীরে ধীরে মাইরার হাতটা ধরে বলল, চলো, আগে তোমার কোমরটা দেখি। তুমি যে বললে কোমর শেষ, সেটা সত্যি নাকি শুধু নাটক?”
মাইরা চোখ পাকিয়ে বলল,আপনি আবার আমাকে নাটকবাজ বলছেন?”
“না। পরীক্ষা করছি।”
“কী পরীক্ষা?”
“তুমি যদি এখনো আমার সাথে ঝগড়া করতে পারো, তাহলে বুঝব তুমি ঠিক আছো।”
“তাহলে আমি একদম ঠিক আছি।
শেহরান মুচকি হেসে বলল,সেটা তো আমি আগেই বুঝেছি।”
বলেই শেহরান মাইরার হাত ধরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত প্রায় অনেক বেজে গেছে। শেহরান এখনো রুমে আসেনি। মাইরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল বাদছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। বিরবির করে বলল,
এত রাত হয়ে গেল, অথচ ওই লোকের এখনো রুমে আসার নাম নেই! আজকে রুমে আসুক, মজা দেখাবো।
কথাটা বলেই ঠোঁটের কোণে দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল।
শেহরানের ভিলাটা শহর থেকে বেশ অনেকটা দূরে। চারপাশটা নিরিবিলি। দূরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই।
ভিলার ট্যারেসের একদম শেষ প্রান্তে সোফার উপর বসে আছে শেহরান। সামনে টি-টেবিলের উপর কয়েকটা জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আকাশের দিকে। ঠোঁটের কোণে জ্বলছে সিগারেট। যে পায়ে আঘাত লেগেছে, সেই পা-টা সামনে রাখা বেতের মোড়ার উপর তুলে রেখেছে। অন্য পা-টা ভাঁজ করে সোফার উপর রাখা। পুরো শরীরটা এলিয়ে দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে।
সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলো শেহরান। কিছুক্ষণ ধোঁয়াটা মুখে রেখে ছেড়ে দিলো। তারপর সিগারেটটা ঠোঁটে ধরেই হাত বাড়িয়ে টি-টেবিলের উপর রাখা গ্লাসটা তুলে নিলো। এক ঢোকে গ্লাসটা ফাঁকা করে ফেলল। গ্লাসটা আবার টেবিলের উপর রেখে বোতলটা হাতে তুলে আরেকটু ঢেলে নিলো।
হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে উঠল। শেহরান ভ্রু কুঁচকে ফোনটার দিকে তাকাল। হাতের গ্লাসটা টি-টেবিলের উপর রেখে, সিগারেটটা আঙুলের ফাঁকে ধরে ফোনটা তুলে নিলো। ওপাশ থেকে কী বলল, শোনা গেল না। শেহরান ছোট করে বলল,
“হুম, ঠিক আছে।”
কথা শেষ করে আর কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দিলো।
ফোনটা পাশে রেখে আবার সিগারেটের দিকে তাকাল। একটা টান দিয়ে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে চেপে নিভিয়ে দিলো। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর হঠাৎ নিজের আহত পায়ের দিকে চোখ গেল তার। ব্যান্ডেজটা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই বিরক্ত করছে। শেহরান নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে ব্যান্ডেজটা খুলতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে ব্যান্ডেজটা খুলে ফেলল। আবার সোফায় হেলান দিয়ে বসল। এক হাতে গ্লাসটা তুলে নিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল সামনের অন্ধকারের দিকে।
এদিকে রুমে বসে থাকা মাইরার রাগ কিন্তু ধীরে ধীরে আরও বাড়ছে। ঘড়িতে আবার চোখ গেল তার। সাড়ে দশটা পেরিয়ে গেছে। মাইরা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, মানুষটা কি আজকে আর আসবেই না? আসুক। আজকে আসুক শুধু। ঠোঁটের কোণে আবার সেই দুষ্টু হাসিটা ফুটে উঠল।
মাইরা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল কেবিনেটের দিকে। তারপর আস্তে করে কেবিনেটের দরজা খুলে একটা শাড়ি-ব্লাউজ বের করে নিল। শাড়িটা আসার সময় সায়রা কিনে দিয়েছিল। মাইরা দুষ্টু হেসে শাড়িটা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। এইটা আজকে পরে ওই দুষ্টু লোকটাকে শায়েস্তা করবে।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৮
কিছুক্ষণ পরে ব্লাউজ-পেটিকোট পরে বাইরে বেরিয়ে আসলো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শাড়িটা পরে নিল সুন্দর করে। শাড়ি পরায় সে বেশ পটু। ছোটবেলা থেকে কতবার যে পরেছে তার ঠিক নেই। ্শাড়িটা পরা শেষ হতেই চুলগুলো ছেড়ে দিল। তারপর ঠোঁটে গাঢ় করে লিপস্টিক, চোখে একটু কাজল দিয়ে নিল। ব্যাস, হয়ে গেল সাজগোজ। তারপর আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
