Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২২

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২২

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২২
সেঁজুতি আক্তার

ভাবি, তুমি এত রাতে এখানে কি করছো? ভাইয়া চলে গেল। আর তুমি এখানে?
–কথাটা কানে পৌঁছাতেই মাইরার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালো। বিচলিত কন্ঠে সায়রাকে জিজ্ঞাসা করলো। কখন গেল উনি? আমাকে কেউ ডাকলো না কেন?
–সায়রা মাথা নত করে বলল, আম্মু বলতে চেয়েছিলো, ভাইয়া বলতে দেয়নি।
–মাইরা অবাক চোখে চাইল সায়রার দিকে। আপু এটা কিভাবে সম্ভব? তোমার ভাই এটা কিভাবে করলো?

সায়রার মুখে বলার মতো কোনো ভাষা নেই। তারপরেও ওকে কিছু একটা বলতেই হবে। তাই মিনমিনে কন্ঠে বলল, ভাবি তুমি আমার ভাইকে কতটুকু বিশ্বাস করো আমি জানি না। কিন্তু আমি একটা জিনিস গ্যারান্টি দিতে পারি।
মাইরার চোখ চকচক করে উঠলো। নতুন আশার আলো দেখতে পেল। সায়রা বলল, আমার ভাই যদি তোমাকে ভালোবেসে থাকে তাহলে আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি আমার ভাই খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে। কিন্তু!
কিন্তু কি সায়রা আপু! কথাগুলো ফটাফট বলে ফেলল মাইরা। সায়রা মাথাটা নিচু করে বলল, কিন্তু যদি ভাইয়া তোমাকে ভালো না বাসে। আর কোনোদিনই হয়তো ফিরে আসবে না।

–কথাটা শুনে মাইরার বুক ভার হয়ে আসলো। সায়রা ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো। আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল। তোমার ভাগ্যে যদি আমার ভাই থাকে। আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আমার ভাইকে তোমার কাছে আবার ফিরিয়ে দিবে। কিন্তু তার জন্য তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে ভাবি। এটা আমি তোমার ননদ হিসেবে না। তোমার বড় বোন হিসেবে বলছি। ধৈর্য ধরো মাইরা। শক্ত করো নিজেকে। নিজের আবেগগুলোকে লুকিয়ে ফেলো। এগুলা কাউকে দেখতে দিও না। তাহলে যে সবাই তোমার দুর্বলতাকে সুযোগ ভেবে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করবে। এটা হতে দিও না মাইরা।
–মাইরা ছাদে আর এক মিনিটও দাঁড়ালো না। দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে আসলো। রুমের সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা একটি শ্বাস নিল। আস্তে করে দরজা খুলতেই বুকের মধ্যে হু হু করে উঠলো। এই রুমে কি করে থাকবে ও একা। চোখ দিয়ে দু ফোটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।

–বিয়ে হয়ে যেদিন আসলো। সেদিন থেকেই এই রুমে ওই মানুষটার সাথে থাকা হচ্ছে। মানুষটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। ওষুধ যেমন মানুষের সঙ্গী। মানুষটাও মাইরার ঠিক একই রকম সঙ্গী হয়ে গেছে। না দেখলে চলে না। মন অসুস্থ হয়ে যায়। মাইরা শুকনো ঢোক গিলে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো। পা দুটো যেন ফ্লোরের সাথে টেনে ধরেছে। আস্তে আস্তে রুমের মধ্যে এগিয়ে গেল। পরিচিত ঘ্রাণটা রুমের মধ্যে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কি করে ভুলবে ও সব স্মৃতি। কত শত স্মৃতি আছে এই ঘরে। মাইরা বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়লো। বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে রইল। ফোঁপানোর তালে তালে শরীর দুলে উঠছে।

–ড্রয়িং রুমের সোফায়। শাহানা বেগম মাথা নিচু করে বসে আছেন। পাশেই রায়হান মির্জা। মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তারা তো ছেলের একটি সুন্দর সংসার দেখতে চেয়েছিল কিন্তু ভাগ্য তাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। ভাবতেই বুক ভেঙ্গে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো।
আচ্ছা শেহেরানের বাবা, আমরা কি কখনো আর আমাদের ছেলেকে দেখতে পাবো না?
রায়হান মির্জা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন। এখন বলছ কেন এই কথা? তোমাকে আমি বারবার বারণ করেছিলাম। এই বিয়ের আগে! তুমি আমার কথা শোনোনি! এখন বোঝো। উঠে দাঁড়ালো তারপরে হনহুন করে রুমের দিকে চলে গেলেন।
সাহানা বেগম ছলছলে চোখে স্বামীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাহলে কি তিনি ভুল করেছেন? এই বিয়ে দিয়ে। আজ যদি শেহেরানের একটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সাথে বিয়ে হত। তাহলে হয়তো ছেলের এমন দিন দেখতে হতো না। কথা গুলো সাহানা বেগমের মাথায় ঘুরতে লাগল। মনটা কেমন বিষিয়ে উঠছে।

মাঝে কেটে গেছে এক মাস। এই এক মাসে মির্জা ভিলাতে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন।
যেই শাহানা বেগম রান্নাঘর ছেড়ে বেরোতেন না। সেই শাহানা বেগম এখন আর রান্নাঘরের দিকে ছুঁয়েও দেখেন না। তিনি তো রান্না করতেন ছেলের জন্য। তার ছেলে যে মায়ের হাতের রান্না ছাড়া খেতে চাইত না। এখন তো আর ছেলেও নেই। তাই আর রান্নাও করতে ইচ্ছা হয় না।
— রায়হান মির্জা আগের মতো বাসায় থাকে না। ব্যবসার কাজে প্রায়ই বাইরে থাকে।
লিনাও অনেকদিন আর মির্জা বাড়িতে আসেনি। সায়রার ভার্সিটি করে নিজের মতো জীবন চলছে।
যে যার মতো ব্যস্ত। কেউ কারোর দিকে নজর আর দেয় না।

এদিকে মাইরা। একটু একটু করে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। এখন আর কারো সাথে তার সামান্য একটা কথাও হয় না। খাওয়ার টেবিলেও সবাই যেন মাইরার সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলে।
সায়রার সাথে টুকটাক মাঝেমধ্যে কথা হয়। কিন্তু সাহানা বেগম যেন মাইরার সাথে অনেকটা দূরত্ব নিয়ে চলেন। আগের মতো আর মাইরার সব কিছুর দায়িত্ব নেন না।
গত সপ্তাহের কথা। সায়রা বাবাকে বলে মাইরার জন্য একটি ফোন কিনে এনে দিয়েছে। এতে শাহানা বেগম বেশ নারাজ হয়েছেন সায়রার উপর। কারণ কি? কারণ হলো মাইরার এখন পড়াশোনা করার বয়স, ফোন রাখার বয়স না। এই নিয়ে অবশ্য মাইরা কিছুই বলেনি। খাওয়া শেষে মাইরা ফোন নিয়ে শাশুড়ির রুমে যেতেই। শাহানা বেগম অনেক কথা শুনিয়ে দিয়েছেন। এই নিয়ে মাইরার কিছুদিন মনটা ভালো ছিল না।

কারো সাথে আর মন খুলে কথা বলে না। একাকীত্ব ওকে একটু একটু করে গ্রাস করে নিচ্ছে।
রোজ ভোরে ওঠে সকালের রান্নাটা ওই করে। কয়দিনেই যেন পাকা গিন্নি হয়ে গেছে। রান্নাবাড়া শেষ করে। তারপরে কলেজে যায়।কলেজ থেকে ফিরে। সংসারের যাবতীয় কাজ নিজের হাতেই করে। বসে বসে তো আর কারোর বোঝা হয়ে থাকা যায় না। মাইরা যে এত কাজ করে কেউ কখনো মানাও করে না। আবার খাবার টেবিলে খাবার সবাইকে বেড়ে দেওয়ার পরেও। কেউ ওকে খাবার কথা জিজ্ঞাসা করে না।ও তো ভেবেই নিয়েছে। হয়তো ওকে নিয়ে কেউ আর ভাবেই না। ভাববেই বা কি করে ওর জন্যই তো। তাদের আদরের ছেলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।
এসব ভাবতে ভাবতে মাইরা বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো। বালিশের কোনা থেকে ওড়নাটা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। দশ মিনিট পরে ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসে মুখ মুছে মাথায় ওড়নাটা ভালোভাবে পেঁচিয়ে নিচে নেমে গেল।

ড্রয়িং রুমের সোফায় রায়হান মির্জা বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। শাহানা বেগম এখনো ঘুম থেকে ওঠেননি। শরীরটা এখন ভালো যায় না। বেশিরভাগ সময় রুমে কাটিয়ে দেন। সায়রা এখনো বাইরে আসেনি। মাইরা আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলো। শ্বশুরকে বসে থাকতে দেখে তাড়াহুড়ো করে রান্নাঘরে চলে গেল। এক কাপ চা বানিয়ে শেফালী খালার হাতে দিয়ে দিল। শেফালী ভ্রু কুচকে বলল, আপা মনি তুমি কাদের জন্য এত কষ্ট করো? এরা তো কেউ তোমাকে চায় না। বোঝো না? আমি বুঝি এদের অবহেলা দেখলেই তো বুঝতে পারি।
মাইরা মলিন হেসে বলল, চা টা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, দিয়ে আসুন। তারপরে এসে আমাকে কিছু পেঁয়াজ রসুন ছুলে দিন। শেফালী একটু ঝাঁজ নিয়েই বলল, তুমিও হয়েছ বাপু। একটুও নিজের ভালো বোঝো না। থাকো তুমি, আমি আর তোমাকে কিছু বলবো না। বলেই হনহন করে চলে গেলেন বাইরে। মাইরা শেফালী খালার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তার জীবনটাই তো অদ্ভুত। এই জীবন নিয়ে আফসোস করে কি লাভ। আজ আছি, কাল তো নাও থাকতে পারি। আল্লাহ যতটুকু দিয়েছে এতটুকুতেই না হয় সন্তুষ্টি খুঁজে নিই।

মাইরা ফ্রিজ থেকে কিছু সবজি বের করে কাটতে লাগলো। সবজি কাটা শেষ হয়ে গেলে কিছু ফ্রোজেন পরোটা ভেজে নিল। তারপরে ভাজি ভেজে বাটিগুলো খালার হাতে দিল। শেফালী একে একে সমস্ত বাটি নিয়ে গিয়ে টেবিলে রাখল। মাইরা রান্না শেষ করে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলো। কলেজের জন্য একবারে রেডি হয়ে এসেছে।
সবাইকে খাবার বেড়ে দিল। শাহানা বেগম একবার মাইরার দিকে চোখ তুলে চাইলেন। কিন্তু কিছু বললেন না, চুপচাপ খেতে লাগলেন। রায়হান মির্জা একবার মাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন, মাইরা তোমার কি কিছু হয়েছে? চোখ মুখ এমন শুকনো দেখা যাচ্ছে কেন? মাইরা সায়রার প্লেটে খাবার দিচ্ছিল। হঠাৎ এমন একটা কথা শুনে চমকে তাকালো। শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে বলল, না বাবা কিছু হয়নি তো?

–সত্যি?
–হুম!
আর কেউ কোন কথা বললেন না। যে যার মতো খেয়ে সবাই বেরিয়ে গেলেন। সায়রা নিজের ভার্সিটিতে চলে গেছে। আজ বাড়ির গাড়ি নিয়ে গেছে। রায়হান মির্জাও বাড়ির গাড়ি নিয়ে গেছে।
–মাইরা পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে আছে। একটা গাড়িও বাড়িতে নেই। শেহেরানের গাড়িটা কিছু সমস্যার কারণে মেকানিকের কাছে আছে। মাইরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপরে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। গেটওয়ালা আব্দুল কাদের মাইরার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললেন, মেয়েটার জন্য খুব মায়া হয়। অল্প বয়সে কত কিছুই না সহ্য করতে হচ্ছে।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২১

কথাগুলো মাইরার কানে আসলো। তার পরেও কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে একটি রিক্সায় উঠে পড়ল। রিকশা চলছে কলেজের উদ্দেশ্যে। মাইরা ড্রেস পরে ব্যাগটা হাতের ওপরে রাখা। দৃষ্টি রাস্তার দিকে স্থির। এই পৃথিবীর বুকে বিবাহিত মেয়েদের স্বামী একমাত্র ভরসা। কারণ যার স্বামী পাশে আছে এই মেয়ের সব আছে। তার স্বামী পাশে নেই। চেনা মানুষগুলো অচেনা হয়ে যায়। তার উদাহরণ তো ও নিজেই। এইসব ভাবনায় মশগুল ছিল মাইরা। হঠাৎ একটি গাড়ি পেছন থেকে এসে চাই ধাক্কা মারলো।
মাইরা ছিঁটকে গিয়ে রাস্তায় পরলো।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৩