এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৩৯
সুহাসিনী
রাহির চোখ বন্ধ। চোখ বন্ধ করেই শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে প্রেমকে আঘাত করেছে সে।প্রেমের কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ খোলে সে।দেখে প্রেম তার থেকে এক হাত দূরে শুয়ে। রাহির কথার ধাঁচে প্রেম আগেই বুঝেগেছিল তার সাথে কিছু একটা হবে আজ,তাই আগেই সতর্ক হয়ে সরে গেছে রাহির কাছ থেকে। রাহির লাথিটা লেগেছে বালিশে।
রাহি চোখ ছোটো ছোটো করে বললো,
“সরে গেলেন কেনো আপনি?”
“সরবো না তো কি শুয়ে শুয়ে তোমাকে আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার করতে দিবো, বেয়াদব।”
“ভবিষ্যৎ তো আপনার এমনিতেই আজকে অন্ধকার হবে এমপি সাহেব,আপনি আজকে বউ হারাবেন।”
“হোয়াট ননসেন্স? আবোল তাবোল না বকে ফ্রেশ হয়ে নিচে যাও,তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, শুধু তোমার জন্য না বাসার সবার জন্য।”
“হুম হুম চলেন,আপনার জন্যও সারপ্রাইজ আছে আজকে।”
রাহি কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ফ্রেশ হয়ে নিচে গেলো।কিছুক্ষণের মধ্যে প্রেমও ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হলো। রাহিকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে আমজাদ খান কিছুটা অবাক হলেন।যেই মেয়ে কাল রাতেও নিজের মধ্যে ছিল না নিজের স্বামী পরকীয়া করছে জেনে,সেই মেয়ে এক রাতের মধ্যে এতোটা স্বাভাবিক হলো কীভাবে।প্রেমকে দেখে আমজাদ খান গলা খাকরি দিয়ে বলল,
“সারারাত কোথায় ছিলে?”
প্রেম ফোন স্ক্রল করতে করতে উত্তর করলো,
“বউ এর পাশে।”
প্রেমের হেয়ালিপনায় এবার আমজাদ খান রেগে গেলেন।
“কয়টা বউ তোমার?একটা বাড়িতে রেখে আর কোন বউ এর পাশে ছিলে?”
“যাকে বাড়িতে রেখে গিয়েছিলাম তার পাশেই সারারাত ছিলাম আব্বু, শুধু পাশে বললে ভুল হবে তাকে বুকে নিয়েই ঘুমিয়েছি।”
প্রেমের শেষ কথা শুনে রাহির কাশি উঠে গেলো।আসলেই এই লোকের কখনো লজ্জা সরম হবে না।
তাদের কথার মাঝেই লিয়ন আর শান্ত মিষ্টির প্যাকেট হাতে বাড়িতে ঢুকলো।তাদের দেখেই বুঝা যাচ্ছে তারা কতটা খুশি।কিন্তু খুশির কারণটা কি।
শান্ত এসেই আয়েশার কাছে গিয়ে এক প্রকার জড়িয়ে ধরার মতো অবস্থা। শান্তর কাণ্ডে আয়েশা কটমটিয়ে তাকালে শান্ত নিজেকে সামলে নেয়।বোকা বোকা হেসে আমজাদ খান আর প্রেমের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
“আসলে বেশি একসাইটেড হয়ে গিয়েছিলাম তো তাই টিকিট ছাড়ায় ট্রেনে উঠে পড়ছিলাম।”
শান্তর কথায় ফোস করে শ্বাস ছাড়লেন আমজাদ খান। শান্ত আর প্রেম দুইটা দুই রকমের বজ্জাত।তার দুই মেয়ের কপালেই বজ্জাত দুটোকে ঝুলালো আল্লাহ্।ভালো কাউকেও তো রাখতে পারতো তাদের জন্য।
শান্ত আয়েশাকে বললো,
“কংগ্রাচুলেশন রাজকুমারী,তোমাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।”
আয়েশা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।শুধু আয়েশা না, ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই কৌতূহল দৃষ্টিতে তাকিয়ে। লিয়ন বললো,
“কাকে কংগ্রাচুলেট করার কথা আর আপনি কাকে করছেন শান্ত ভাই?”
“অর্জন যারই হোক আমি তো শুধু আমার রাজকুমারীকে শুভেচ্ছা জানাবো।”
বলেই প্রেমের দিকে তাঁকালো।প্রেম ভাবলেশহীন। আমজাদ খান শক্ত কণ্ঠে বললেন,
“তোমাদের মশকরা রেখে বলোতো কি হয়েছে?এতো ঘটা করে মিষ্টি আনার কারণ কী? ফ্রিজে তো মিষ্টি আছেই।”
শান্ত এবার আমজাদ খান এর কাছে এসে বলল,
“আরে মামা, মিষ্টি তো আনতেই হতো, আমার রাজকুমারী যে এখন আর এমপির বোন নেই, সেতো এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বোন হয়ে গেছে।”
আমজাদ খান তো অবাক।একবার প্রেমের দিকে,একবার শান্তর দিকে তো একবার লিয়নের দিকে তাকাচ্ছেন।এটা কিভাবে সম্ভব,এক রাতের মধ্যে কীভাবে একজন এমপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যেতে পারে।
আমজাদ খান যেই প্রেমকে প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই প্রেম তার বাবার কৌতূহল বুঝে উত্তর করলো,
“কাল রাতে আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথেই পরকীয়া করতে গেছিলাম আব্বু, উনি সেই খুশিতেই আমাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়ে দিয়েছেন।”
“বেয়াদব ছেলে, সিরিয়াস মুহূর্তে আর সিরিয়াস হতে শিখলে না।”
“সিরিয়াস আর হতে দিলে কই তোমরা।”
আমজাদ খান আর এদের কথার আশায় বসে না থেকে টিভি অন করলেন।এতো বড় খবর অবশ্যই নিউজ এর হেডলাইন হবে। খবরে দেখাচ্ছে,
‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুদিন যাবৎ খুব অসুস্থ থাকায় উনাকে এক সপ্তাহ আগে সিঙ্গাপুর চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। আর এমপি তাহির খান প্রেমের সাথে উনার আর প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক ভালো থাকায় এমপি তাহির খান প্রেমকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব হস্তান্তর করে যান। কাল রাত দুইটায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্তেকাল করেছেন সিঙ্গাপুর চিকিৎসাধীন অবস্থায়।এখন আলোচনা হচ্ছে বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এমপি তাহির খান প্রেমই কি হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? এই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী নিজে সায় জানিয়েছে বলে জানা গেছে। এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রেসমিট করে প্রধানমন্ত্রী নিজে আজ দুপুরে জানাবেন।’
নিউজ এতক্ষণ সবাই মনোযোগ দিয়ে দেখছিল।তার মানে প্রেম কাল রাতে এই বিষয়ে গোপন মিটিং করতেই গিয়েছিল। প্রেম এসবে পাত্তা না দিয়ে বলল,
“আম্মু খুদা লেগেছে,এখন কি বসে বসে টিভি গিলবো নাকি নাস্তা দিবে?”
“এতো বড় খবর তুমি আগ কেনো বলোনি আমাদের প্রেম?”
“বলার সুযোগ দিয়েছো তুমি আর তোমার গুণবতী বউমা?তার আগেই তো পরকীয়ার ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছো।”
আমজাদ খান কিছু বলেন না আর।রাহির দিকে তাকালে দেখলেন রাহি এখনও হা করে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছে।
রাহিকে চিন্তা মগ্ন দেখে শান্ত এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কি ভাবছো বোন আমার?”
রাহি ওভাবেই হা করে উত্তর দিলো,
“আমি এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বউ ভাইয়া, ভাবা যায় ব্যাপারটা!”
রাহির কথায় আয়েশা, শান্তসহ লিয়ন হো হো করে হেসে দিলো।প্রেম নির্বিকার।
হঠাৎ নিজের অবস্থানের কথা চিন্তা করে রাহির মনটা কিছুটা খারাপ হলো।তার মত একটা এতিম মেয়ে এখন এতো উপরে উঠে গেছে।আজ তার মা বেঁচে থাকলে হয়তো অনেক খুশি হতো। রাহির চিন্তার মাঝেই প্রেমের কণ্ঠ শুনা যায়,
“কে বলেছে তুমি আমার বউ,আমি তো তোমাকে বউ বলে মানি না।”
প্রেমের এক কথায় রাহির মন খারাপ উড়ে গিয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।
আমজাদ খান সহ বাড়ির বড়রা সবাই এখন ডাইনিং এ গিয়ে বসেছে। তাই রাহি প্রেমকে খোঁচা দিতে বলল,
“হ্যাঁ বউ বলে মানেন না ঠিকই,কিন্তু রাতে এই না মানা বউ ছাড়া চলেও না।আবার অন্য কেউ এই না মানা বউকে বিয়ে করতে চাইলে আগুন জ্বালিয়ে দিতে চান। আমিও আপনাকে জামাই হিসেবে মানি না। দাঁড়ান আমি আপনার সামনেই ওই সাঈদ চৌধুরীকে বিয়ে করবো।”
কথা বলতে দেরি কিন্তু প্রেমের শক্ত হাতে রাহির গাল চেপে ধরতে দেরি হয়নি।দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“আর একবার যদি পরপুরুষের নাম মুখে নিয়েছিস তাহলে তোর ওই জিহ্ববা থাকবে না কথা বলার জন্য। নেক্সট টাইম যদি সাঈদ চৌধুরী তোর দিকে নজর দেই তাহলে তার চোখ তুলে নিতে আমি দুবার ভাববো না।আগে ক্ষমতার দিক দিয়ে আমার চেয়ে এগিয়ে ছিল বাট এখন সারা দেশ আমার হাতে, ওর মতো শত শত নাম্বার ওয়ান শিল্পপতির ছেলেকে আমি এখন টয়লেট টিস্যুর মতো ব্যবহার করতে পারি।”
“ছাড়ুন ব্যথা লাগছে আমার।”
“নেক্সট টাইম যেনো এই ভুল আর না হয়, মাইন্ড ইট।”
প্রেম চলে গেলো খেতে। শান্ত আর লিয়নও গেলো নাস্তা করতে।রাহি ভয়ে ভয়ে আয়েশার কাছে গিয়ে বলল,
“আপু গো,আমি তো মারাত্মক একটা কাজ করে ফেলেছি,তোমার ভাই আজকে যেই রাগ দেখলো,এখন যদি আমার ওই আকামের কথা জানতে পারে তাহলে তো কুরবানী ঈদ আসার আগেই আমাকে কুরবানী দিয়ে দিবে।”
“কি করেছো আবার?”
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৩৮
“কাল রাতে রাগের বশে বসে বসে তোমার ভাই এর সমস্ত জামাকাপড় কেটে ফেলেছি।কিন্তু অবাক করা বিষয় সকালে উঠে সেই এতো এতো টুকরো কাপড় কিছুই আমার চোখে পড়ল না।তোমার ভাই আমাকে বকলও না। আর সবচেয়ে বড় আকাম হলো কাল রাতে আমি সাঈদ চৌধুরীকে মেসেজ দিয়ে বলেছিলাম তাকে বিয়ে করতে আমি রাজী।”
