এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৬
সুহাসিনী
প্রেমের কানে কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। রাহির চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা পানি পড়লো। এরপর সে চোখ বন্ধ করে নিলো। চোঁখ বন্ধ করার আগে যেনো সেই চোখ দিয়েই প্রেমকে কতশত কথা বলে গেলো।প্রেমের প্রতি কত অভিযোগ জানালো। প্রেম পাথরের ন্যায় স্তব্ধ।
এর মাঝেই হঠাৎ আর একটা গুলির শব্দ হলো। তৎক্ষণাৎ প্রেমের মস্তিষ্ক জানান দিলো সে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। এতে তার বউকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে,তার উপর সেও বিপদে পড়ে যাবে। এখন তার বউকে বাঁচাতে হলে তাকে লড়তে হবে।
গুলি চলার সাথে সাথে প্রেম সাইড হয়ে সরে যায়।এতে করে গুলিটা প্রেমের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।প্রেম এক সেকেন্ডও দেরি না করে গাড়ি থেকে নিজের লাইসেন্সকৃত গান বের করে তার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন দুষ্কৃতীদের দিকে তাক করে একের পর এক শুট করতে থাকে।
প্রেম জানে এভাবে সে একা এতগুলো লোকের সাথে একটা গান নিয়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না।এখন তার কাজ হলো যেভাবেই হোক রাহিকে নিয়ে সেইফ জায়গায় যাওয়া।রাহির যেভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তাতে বুঝা যাচ্ছে রাহির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।প্রেম নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রাহির দিকে এগিয়ে গেলো।রাহির কোনো হুশ নেই। খুব ধীরে ধীরে বুকটা উঠানামা করছে। রাহির দিকে তাকাতেই প্রেমের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। তবু নিজেকে কোনরকম সামলে রাহির কাছে এসে তাকে কোলে তুলে নিলো সে।
পেছন থেকে মুখোশধারী লোকগুলো একের পর এক গুলি চালাচ্ছে।প্রেমের উপর হামলা করার এর চেয়ে ভালো সুযোগ হয়তো তারা আর পাবে না।এই মুহূর্তে প্রেমের সাথে কোনো বডিগার্ড বা পুলিশ কেউ নেই।আবার এমন একটা রাস্তায় আছে যেখানে কয়েক মাইল এর মধ্যে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই।তারা এসেছিল মূলত প্রেমকে মারতে।কিন্তু মাঝখান থেকে নিরপরাধ,বাচ্চা মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। লোক গুলো এতক্ষণে বুঝে গেছে প্রেম নিজের জীবনের মায়া না করলেও এই মেয়ের জীবনের দাম প্রেমের কাছে অনেক বেশি।
আশে পাশের গাড়ি গুলো এতো দ্রুত গতিতে চলছে যে গাড়ির ভেতর থাকা কেউ সঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারবে না এখানে কি হচ্ছে।প্রেম রাহিকে নিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি লক করে দিলো। প্রেমের গাড়ি বুলেট প্রুফ।তাই কোনো রিস্ক নেই।
লিয়ন এর নাম্বার এ লোকেশন পাঠিয়ে দিয়ে বডিগার্ড নিয়ে এখানে আসতে বলে দিলো। শর্টকার্ট এ সমস্ত ঘটনাও জানিয়ে দিলো।বিপত্তি ঘটলো যখন সে গাড়ি স্টার্ট দিতে গেলো। গাড়ির চাকায় গুলি লেগে টায়ার পাংচার হয়ে গেছে। এবার কি হবে।হাতে সময়ও কম। রাহির নিঃশ্বাস খুব ধীরে ধীরে উঠা নামা করছে। রাগে প্রেম নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে স্টিয়ারিংয়ে পাঞ্চ মারলো।কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। লিয়ন দের এখানে পৌঁছাতে অনেকটা সময় লেগে যাবে।
প্রেম লিয়নকে আবার কল দিয়ে বলে,
“আমার এই মুহূর্তে হেলিকপ্টার লাগবে, ফাস্ট।”
“কিন্তু ভাই এই মুহূর্তে হেলিকপ্টার কোথায় পাবো, হেলিকাপ্টার ম্যানেজ এর জন্য তো সময়ের প্রয়োজন।”
“I don’t know those, আগামী পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার পাঠানোর লোকেশনে যদি হেলিকপ্টার না পাই তাহলে সবগুলোকে আমি নিজে হাতে জবাই করব, মাইন্ড ইট।”
কল কেটে দিলো।প্রেমের কাঠ কাঠ গলায় ভয়ে লিয়ন দ্রুত হেলিকপ্টার ব্যবস্থা করলো। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বেশি খরচও হলো।
দুটো হেলিকাপ্টার কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছালো। একটা খালি। আর একটাতে লিয়ন সহ বডিগার্ড। দুষ্কৃতীর দল হেলিকাপ্টার দেখে বুঝে গেছে এটা যে প্রেমের কাজ।প্রেমকে তারা চিনে। প্রেম এমন কোনো কাজ নেই যে করতে পারে না।তারা ভয়ে পালাতে নিলে হেলিকাপ্টার এর উপর থেকেই লিয়নের আদেশে গুলি ছুঁড়ে।
প্রেম রাহিকে নিয়ে হেলিকপ্টারে উঠে। এতক্ষণে চারপাশে খবর ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সদ্য হওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপর দুষ্কৃতির হামলা হয়েছে। প্রেম অনবরত রাহিকে ডেকে যাচ্ছে কিন্তু রাহির কোন সাড়া নেই। প্রেমের নিঃশ্বাস যেনো আটকে যাচ্ছে। হাসপাতালে পৌঁছাতেই রিপোর্টাররা এসে প্রেমকে ঘিরে ধরলো। প্রেমের কোলে একজন মেয়েকে অবচেতন অবস্থায় দেখে তাদের প্রশ্নের শেষ নেই। এইদিকে যে মেয়েটার প্রাণ যায় যায় অবস্থা সে দিকে লক্ষ্য নেই। প্রেম নিজেকে আর সামলাতে না পেরে সবার উদ্দেশ্যে গর্জন করে বলে,
“সামনে থেকে সর কুত্তারবাচ্চারা, তোদের চ্যানেল এর টিআরপি বাড়ানোর চক্করে যদি ওর কিছু হয়েছে আই সোয়ার কোনো চ্যানেল আমি বাংলাদেশে রাখবো না। আই অ্যাম ওয়ার্নিং ফর দা লাস্ট টাইম।”
প্রেমের গর্জনে সবাই ভয় পেয়ে গেলো। দ্রুত সবাই সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। প্রেম গটগট করে হেঁটে ভেতরে চলে গেলো।পেছনে রেখে গেলো দেশের কোটি মানুষের মনে এক গুচ্ছ প্রশ্ন।কে এই মেয়ে,কেনো এই মেয়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এতো উতলা হলো, নিজের ক্যারিয়ারের কথা একবারও না ভেবে এই মেয়েকে বাঁচানোর জন্য এতগুলো মিডিয়ার সামনে নিজের রাগ প্রকাশ করল।
সাঈদ রাঙ্গামাটি পৌঁছানোর পরপরই টিভি চ্যানেলে রাহীকে প্রেমের কোলে অজ্ঞান অবস্থায় দেখে সে প্রজেক্টর সব কাজ ফেলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। খবর জানতে পারে প্রেমের ওপর হামলা হয়েছিল, প্রেমের সাথে রাহিও ছিল।
সাঈদের গাড়ির সামনে হঠাৎ একজন বৃদ্ধা এসে দাঁড়ানোয় ব্রেক কষতে হয় তাঁকে।সামনে অসহায় মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে রফিক সাহেব।সে তো রাহির খবর শুনে বৃষ্টির কথা বেমালুম ভুলে বসেছিল।ভুলে গিয়েছিল সে যে এখন অন্য কারো নামে দলিল করা।তার এখন পর নারী নিয়ে চিন্তা করা পাপ।তবুও সে এই সব পাপ প্রত্যাখ্যান করে রাহির কাছেই ফিরে যেতে চায়।তার সবটা জুড়ে রয়েছে রাহি। বৃষ্টিকে তো কৌতূহল বশত দেখতে গিয়েছিল।এর মধ্যে যে সে এভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাবে কখনো চিন্তাও করতে পারিনি।
রফিক সাহেবকে দেখে সাঈদ গাড়ি থেকে নামলো। রফিক সাহেব অসহায় দৃষ্টিতে সাঈদের দিকে তাকিয়ে করুন স্বরে বলল,
“তুমি যাওনের পর থাইক্কা আমি এই রাস্তার মধ্যেই বইসা রইছি। যদি তুমি আমার মাইয়াডারে ফালায়া রাইখ্যা যাওগা এই ডরে।তুমি যাওনের পর থাইক্কা এহন পর্যন্ত অনেক মাইনষে আমার নিষ্পাপ ফুলের মতো মাইয়াডারে মেলা খারাপ খারাপ কথা হুনাইছে।বাপ হইয়া এইগুলা আমি কেমনে সহ্য করি কও তো বাবা।”
এরপর সাঈদের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“এইডাতে আমার মাইয়্যার ব্যাপারে সব কথা লেখা আছে। আমার মাইয়্যা ডারে যদি তুমি ছাইড়া দিবার চাও তাইলে শহরে লয়া যাইয়াই ছাইরো। এইহানে ওর তালাকের কথা ছড়ায়া গেলে গেরামবাসী ওরে বাঁচতে দিবো না। আত্মহত্যা করতে বাধ্য করবো।আমি চাই আমার মাইয়াডা বাইচ্চা থাকুক যেমনেই হোক। তুমি দয়া কইরা ওরে তোমার লগে লয়া যাও বাবা।”
বলেই সাঈদের হাত ধরে কেঁদে দিলেন লোকটা। সাঈদ দোটানায় ভুগছেন।একজন বৃদ্ধ লোক এভাবে তার কাছে অনুরোধ করছে সে ফেলতেও পারছে না। আবার তাকে এক্ষুনি ঢাকা ফিরতে হবে।সে যখন লোকটার কাছে সাহায্য চেয়েছিল তখন লোকটা নির্দ্ধিধায় তার উপকার করেছিল।এই অনুশোচনা থেকেই সে রাজি হয়ে গেলো।সে ভাবলো ঢাকা গিয়ে ডিভোর্স দিতে আরও সহজ হবে। তারপর মেয়েটার একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে সে মুক্ত হয়ে রাহিকে নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করবে।তাই তাড়াতাড়ি বৃষ্টিকে রেডি হয়ে আসতে বলল।পাঁচ মিনিটের মাথায় একটা ব্যাগ নিয়ে বৃষ্টি গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। রফিক সাহেব আরও অনেক কথায় বললেন। এরপর তারা রওনা হল ঢাকার উদ্দেশ্যে। রাহি অফ ওয়াইট এর মধ্যে একটা থ্রিপিস পড়েছে।অনেকক্ষণ কান্নার ফলে মেয়েটার চোঁখ মুখ লাল হয়ে ফুলে গেছে।এখন দেখতে আরও আদুরে লাগছে। প্রথম দেখায় যে কেউ রাহি আর তার মধ্যে প্যাচ লাগিয়ে দিবে। ভাববে দুজনে হয়তো যমজ বোন।কিন্তু ভুল।রাহির বয়স ষোলো, আর বৃষ্টির বয়স ঊনিশ তো হবেই।
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৫
পরবর্তী পর্বের অংশ,
চারপাশে শুধু একই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই মেয়ে কে?এই মেয়ের জন্য প্রেমের কেনো এতো চিন্তা? কেনো প্রেম মেয়েটাকে নিয়ে এত পজেসিভ?কি হয় মেয়েটা প্রেমের?
এতো এতো প্রশ্নের ভিড়ে প্রেমের মাথা বিগড়ে যায়। রাগে চিৎকার করে বলে উঠে,
“শি ইজ মাই লেডি।তিন কবুল পড়ে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ আমরা। আমার ওয়াইফ সে। আর কোনো প্রশ্ন আছে আপনাদের?”
