Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৩৭

কাজলরেখা পর্ব ৩৭

কাজলরেখা পর্ব ৩৭
তানজিনা ইসলাম

আঁধারের ডানহাতে সাদা বেন্ডেজ পেঁচানো। চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে ছিটিয়ে আছে কপালের উপর।শার্টের উপরের দু’টো বোতাম খোলা। হাসিমুখে কথা বলছে সবার সাথে। অথচ মুখে যেন রাজ্যের ক্লান্তির ছাপ। চাদনী অবাক না হয়ে পারছে না। আঁধার নিজের সৌন্দর্য নিয়ে বড়ই কনসারনিং একজন মানুষ। এভাবে এলোমেলো হয়ে ও কখনো ভার্সিটির জন্যও বেরোতো না। দুনিয়া উল্টে যাক তবুও তার ফিটফাট হওয়া চায়। সেখানে এই অবস্থায় ঢাকা থেকে সোজা চট্টগ্রামে চলে এসেছে। হয়েছে টা কী ছেলেটার? চাদনী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো আঁধারকে। ও সোফায় না বসে সিড়ির পাশে দাড়িয়ে থাকলো।

আঁধারের মতিগতি বোঝার চেষ্টায় আছে ও। অথচ আঁধার একবার ওঁকে ডাক দিয়েই, আর একবারও ফিরে তাকায়নি ওর দিকে। দেখছেও না ওঁকে। সে কথা বলায় ব্যস্ত অন্যদের সাথে।
আকিব শিকদার, অপূর্ব শিকদার আর আরমান শিকদার সোফায় বসে আছেন। রাফিয়া বেগম বসে আছেন, আঁধারের পাশে। নিজের সব নাতি নাতনী দের চেয়ে তিনি আঁধারকে খুব বেশিই ভালোবাসেন। জবা বেগম মাঝে মাঝে আসছেন সেখানে, আবার চলে যাচ্ছেন নিজের কক্ষে। বর্ষা বেগম কিচেনে টুকটাক কাজ করছেন। আঁধারের জন্য তার তোড়জোড়ের শেষ নেই। হুট করে কাউকে কিছু না জানিয়ে এভাবে যে ছেলেটা চলে আসবে সেটা কারো ভাবনাতেও আসেনি। সবাই ভীষণ রকম অবাক হয়েছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আঁধার এসেছে বিকেলের একটু পরপর। তখন স্বাভাবিক বাড়ির সবাই ঘুমােচ্ছিলো। দরজা খুলে দিয়েছিলেন বর্ষা বেগম। আঁধার কে দেখে কিছুক্ষণ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। তারপর আধ ঘন্টা জড়িয়ে ধরে রেখেছেন।
অপূর্ব শিকদার অনেক্ষণ ধরে জিজ্ঞেস করছেন, আধার এভাবে হুট করে চলে এসেছে কী করে? আসলে তো খবর দিয়ে আসে। ও তো বলেছিলো ওর এক্সাম।এক্সাম না দিয়েই চলে এসেছে! আঁধার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। বারংবার বলছে ভালো লাগছিলো না, তাই চলে এসেছে। বাড়ির সবাইকে মনে পরছিলো। কিন্তু অপূর্ব শিকদার বিশ্বাস করতে পারছেন না। আঁধারের জিন্দেগীতে বাড়ির কারো কথা মনে পরে না। ও আসলে পাথর মনের একটা মানুষ। পরিবার পরিজনের জন্য হৃদয়ে ভালোবাসা ওর খুব কম। ওর বছরে ছ’মাসেও বাড়ির কারো কথা মনে পরে না। কারো খোঁজ নেয় না৷ বর্ষা বেগম আসতে বলতে বলতে গলার পানি শুকিয়ে ফেলেন, তবুও আঁধারের পায়ের ধুলো এ বাড়িতে পরে না। সেখানে এবারে ছেলেটা বাড়ির মানুষকে এতো মিস করছিলো যে পরীক্ষা ফেলে দেখতে চলে এসেছে সবাইকে।
আকিব শিকদার উদগ্রীব স্বরে বললেন

-“আঁধার, তোমার না এক্সাম ছিলো বাবা! সেজন্যই তো আমাদের সাথে আসোনি!”
-“এক বছর ড্রপ দিব ভাবছি।”
-“কেন?”
-“প্রিপারেশন ভালো না। এক্সাম দিলেও অতোটা সুবিধার হতো না।”
কিন্তু মনে মনে বললো, তোমার বেয়াদব মেয়েটার জন্য চলে আসতে হয়েছে। এক মাস অনেক লম্বা একটা সময়। এতো সময় আমার পক্ষে একা কাটানো সম্ভব না।এখানে কি করবে না করবে, সেই নিয়ে তো একটা চিন্তা থেকেই যায়।আমি তো এভাবে ছেড়ে দিতে পারি না।”
অপূর্ব শিকদার ওঁদের কথার মাঝখানে বললেন
-“প্রিপারেশন ভালো না বলে এক্সামই দেবে না? এক বছর শুধু শুধু গ্যাপ যাবে আঁধার। এভাবে হটকারিতায় ডিসিশন নেওয়া ঠিক হয়নি তোমার। এটলিস্ট এটেন্ড করতে!”

-“ফেইল করলে ইজ্জত থাকতো?”
-“ফেইল কেন করবে? নিজের প্রতি এতটুকুও কনফিডেন্স নেই?”
-“নেই বলেই তো এক্সাম না দিয়ে চলে আসলাম।”
-“তারপরও আমার মন মানছে না। এক্সাম টা দিয়ে দিলেই ফোর্থ ইয়ার শেষ হয়ে যেতো। তারপর মাস্টার্স..
আধার ওনার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো
-“আরে বাবা, একটা বছরই তো। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। এতোটাও আফসোস করার কিছু হয়নি।”
বিরবির করে বললো
-“এক্সাম দিইনি, সেটা নিয়ে আফসোস নাহয় তুমিই করো। ওখানে থাকলে আমিই আফসোস করতে করতে মরে যেতাম।”
বর্ষা বেগম চায়ের ট্রে নিয়ে ড্রইং রুমে এসেছিলেন মাত্রই। ওঁদের কথা শুনে বললেন

-“হয়েছে থামেন এবার।এসেছে পর্যন্ত খালি এটা নিয়ে বিরক্ত করছেন ছেলেটাকে।কি হয়েছে এক বছর এক্সাম দেয়নি! আমার ছেলেটা ফিরে এসেছে এই অনেক।পরের বছর দেবে নাহয়!”
-“যেটা বোঝো না সেটা নিয়ে কথা বলো না!”
কিছুটা রাগী, গম্ভীর স্বরে বললেন অপূর্ব শিকদার। বর্ষা বেগম থতমত খেলেন।আকিব শিকদার আর আরমান শিকদার পরপর তাকালো। লজ্জা পেলেন তিনি বোধহয়। দ্রুত পায়ে প্রস্হান নিয়ে কিচেনে চলে গেলেন।
আঁধার কপালে ভাজ ফেলে দেখলো ওনার চলে যাওয়া। বিমূঢ় স্বরে বললো

-“আম্মুর সাথে এমন করছো কেন? ধমকাতে হলে আমাকে ধমকাও। আমার রাগ ওনার উপর ঝাড়ছো কেন?”
-“কই রাগ ঝাড়লাম?”
-“মাত্রই তো দেখলাম!”
-“এটাকে রাগ ঝাড়া বলে না।”
-“এটাকে কী বলে বাবা?”
-“তুমি হাইপার হয়ে যাচ্ছো কেন?”
আঁধার ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে শান্ত হলো। মুখ কালো করে বললো
-“তুমি সবসময় আম্মুর সাথে এমন করো। আম্মু কি বোঝে না বোঝে সেটা নিয়ে পুরো বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে ডেফিনেশন দেওয়া উচিত হয়নি তোমার। আমার আম্মুর সম্মান নেই? তোমার থেকে একটু রেস্পেক্ট ডিজার্ভ করে না সে?”

-“এটা তুমি বলছো?”
আকিব শিকদারের প্রশ্নে আঁধার প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে।
-“তুমিও চাদনীকে এভাবে বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে অপমান করেছিলে।শুধু বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে না, বাইরের মানুষগুলোর সামনে চাদনীকে যা তা বলেছিলে তুমি! তখন তোমার ওর সম্মানের কথা মনে আসেনি?”
আঁধার অসহায় স্বরে বললো
-“আমি তখন রেগে ছিলাম চাচ্চু।এজন্য আমি হাজারবার মাফ চেয়েছি।সরি বলেছি!”
-“সরি বললেই সব শেষ হয়ে যায়?”
আঁধার উত্তর দিতে পারলো না। আকিব শিকদার দেখলো আঁধার মুখ কালো করে বসে আছে। ওনার মায়া লাগলো। ওনি আসলেই ছেলেটাকে অনেক ভালোবাসেন। আঁধারেরও নিজের বাবার চেয়ে চাচার সাথে বন্ডিংটা ভালো। আকিব শিকদার তবুও মাঝে মাঝে মনে জমানো কষ্ট থেকে আঁধার কে অনেক কথা শুনিয়ে দেন। আঁকিব শিকদার কথা ঘোরানোর জন্য বললেন

-“এর চেয়ে আমাদের সাথে চলে আসতে।”
-“তখন তো বুঝিনি তোমরা চলে আসার পর সবাইকে এতোটা মিস করবো!”
-“মাত্র চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই বুঝে গেলে?”
-“বুঝিনি শুধু, হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এক্সামের চেয়েও না পরিবার বেশি ইম্পর্ট্যান্ট, ইউ নো!”
আঁধার জ্ঞানীর মতো করে বললো।ও খুব পেঁচিয়ে পেচিয়ে কথা বলছে। খোলাসা করে বলছে না কিছুই। আকিব শিকদার ওঁকে আর ঘাটালেন না।
অনেকটা সময় পর অর্পিতা নেমে আসলো সিড়ি বেয়ে। ও এতোক্ষণ নিজের কক্ষে ছিলো। আঁধার কে দেখে হতবাক হয়ে তাকালো। অর্পিতা চাদনীর পাশে এসে দাঁড়ালো। চাদনী একবার ওর দিকে তাকিয়ে সিড়ি বেয়ে চলে গেলো। অর্পিতা মুখ লটকে দেখলো ওঁকে। ও নেমে আসায় এভাবে চাদনীর মুখ ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার কারণ ধরতে পারলো না। তবুও বিষয়টা আমলে না নিয়ে আঁধারের সাথে আহ্লাদী কন্ঠে কথা বলতে গেলো

-“আঁধার ভাই,কেমন আছো?”
আঁধার একপলক তাকালো ওর দিকে। ও আগেই আকিব শিকদার থেকে শুনেছিলো অর্পিতা এসেছে। আকিব শিকদার যখন ঢাকায় গিয়েছিলো তখন বলেছিলো ওঁকে। তবুও আঁধার উপরিউপর দেখালো ও ভীষণ অবাক হয়েছে।
অর্পিতার সাথে খুব বাজেভাবে রিয়েক্ট করে বললো
-“তুই এখানে?”
পরক্ষনেই অপূর্ব শিকদারের দিকে তাকিয়ে বললো
-“অর্পিতা, অর্পিতা এখানে কী করছে বাবা?তুমি না বলেছিলে অর্পিতার জায়গা এ বাড়িতে হবে না। কোন সাহসে ও এখানে এসেছে?”

আঁধারের চেঁচামেচি শুনে জবা বেগম দৌড়ে এলেন। চাদনী দোতলা থেকে উঁকি দিয়ে দেখে আবার গায়েব হয়ে গেলো। আঁধার এ প্ল্যানটা ওঁকে জানিয়েছিলো। অর্পিতার আসাটা ও নিজেও সহ্য করতে পারছিলো না। বলেছিলো যেকরেই হোক অর্পিতা কে বাড়ি ছাড়া করবে, আসা মাত্রই শুরু করে দিয়েছে। এ ছেলে যা বলে সেটাই করে। এত্তো মাত্রাতিরিক্ত ইগো একটা মানুষের থাকতে পারে, সেটা আঁধার কে না দেখলে বুঝতো না চাদনী। পান থেকে চুন খসতে পারে না আধারের গায়ে লেগে যায়। তারপর এমন বাজেভাবে রিয়েক্ট করে। সেখানো তো অর্পিতা আঁধারের সম্মান নিলামে তুলে দিয়েছিলো।
আঁধার চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুললো। জবা বেগম ভয় পেলেন। উনি এ ভয়টাই পাচ্ছিলেন। আঁধার আসলে এমন রিয়েক্ট করবে, সেটা নিয়ে খুব আগে থেকেই ওনার মন কু ডাকছিলো। আঁধার কে উনি চেনেন, ছোটবেলা থেকে দেখছেন।

নিজের জেদ রচানোর জন্য আঁধার সব করতে পারে। সব মানে সব। এখন অর্পিতা কে বাড়ি থেকে না বের করে দিতে বলে!ওনার মেয়ে টা কোথায় যাবে? ছেলের বাড়ির কেও ও তো ওঁদের মেনে নিচ্ছে না। না, উনার মেয়েরও এ বাড়িতে সম্পূর্ণ অধিকার আছে৷ দরকার হলে আরমান শিকদার কে নিয়ে আলাদা হবেন তিনি, তবুও অর্পিতা কে নিজের থেকে দূরে কোথাও যেতে দিবেন না। রাফিয়া বেগম শান্ত করার চেষ্টা করছেন আঁধার কে।
-“দাদুভাই শান্ত হও। কেন করছো এরকম?”
আঁধার শান্ত হচ্ছে না। অপূর্ব শিকদার কিছু বলতে যাবে তার আগেই আঁধার তিক্ত স্বরে বললো

-“আমার মান সম্মান নিলামে তুলে দিয়েছে ও। তোমাদের কারো কথা ভাবেনি।ভাবেনি ও চলে গেলে লোকে কি বলবে! লোকের কথার তো ধার ধারিনা আমি। কিন্তু তোমরা তো খুব ভয় পাও এসব। সেজন্য অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে একজনের সাথে জুড়ে দিলে আমাকে। অথচ যার জন্য এতোকিছু হলো সে বাড়িতে আরাম আয়েশ করছে। কিন্তু আমরা, যারা কোনো দোষই করলাম না, তাদের বাড়িতেই জায়গা হলো না। এটা তো বড্ড না-ইনসাফি হয়ে গেলো।আসার পর থেকেই একের পর এক প্রশ্ন করেছো তুমি আমার থেকে। কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর কথা তোমার। আমাকে উত্তর দাও ও এখানে কী করছে?”
অপূর্ব শিকদারের উত্তর দিতে হলো না, তার আগেই
জবা বেগম বললেন

-“ও এখানে না থেকে কোথায় থাকবে? এটা অর্পিতারও বাড়ি।তোমার মতো ওরও এ বাড়িতে সম্পূর্ণ অধিকার আছে৷”
-“সেদিন কেন তোমার মেয়ের মনে পরেনি এ বাড়ির কথা, মেঝো মা? খুব তো শাসন করছিলে চাদনীকে সেদিন। মারতেও গিয়েছিলো। অথচ নিজের মেয়েকে ডিফেন্ড করছো! শাসনটা অন্যের মেয়েকে না করে নিজের মেয়েকে করলে এ দিন দেখতে হতো না। তোমার জন্যই এভাবে বিগড়েছে ও।”
-“কীভাবে কথা বলছো তুমি আমার সাথে!সম্পর্কে কিন্তু আমি তোমার মেঝোমা হই!”
অপূর্ব শিকদার গম্ভীর স্বরে বললেন
-“আঁধার, তোমার মেঝো মা হয়। শান্ত হও। আমরা বসে কথা বলি?”

-“কী শান্ত হবো? আমিতো মনে করেছিলাম মেনে নিয়েছো, ব্যাস ওইটুকুই। বাড়িতে পর্যন্ত থাকতে দিয়েছো ওর জামাই নিয়ে, আর আমাকে শান্ত থাকতে বলছো। ওর জামাইয়ের ফ্যামিলি মেনে নিলো না ওঁদের আর তোমরা তোষামোদ করছো। কি মহান তোমরা!”
-“অর্পিতা খুব বিপদে পরেছিলো আঁধার। আমরা বাড়ির মানুষরাই যদি ওর পাশে না থাকতাম তাহলে ও কোথায় যেতো!”
-“জাহান্নামে যেতো। তারপরও এ বাড়িতে না আসতো। আমি ওর সাথে এক বাড়িতে থাকতে পারবো না৷ একটা হেস্তনেস্ত করবে তুমি। হয় ও যাবে নয়তো আমি চলে যাবো। আমি তোমাকে শেষ কথা বলে গেলাম, এর বাইরে আর কোনো কথা থাকতে পারে না।”

চাদনী ছাঁদ থেকে নেমে কক্ষে এলো। অনেকটা সময় ওখানে ঘাপটি মেরে বসেছিলো ও। আজ পুরোটা দিন আঁধারের জন্য মনটা পুড়তে পুড়তে কয়লা হয়ে গেছে। কিন্তু ছেলেটা আসার পর কথা বলতেই কেমন যেন লাগছে। মাত্র একদিনেই এতোটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে! আগে যেমন আধার একবছর, দু’বছর পরপর দু-তিন দিন থাকার জন্য আসতো, চাদনীর সাথে কথাও বলতো না সেরকম অনুভব হচ্ছে। মনেই হচ্ছে না গতকাল দেখা হয়েছে। তবুও চাদনী একটা কথাও বলবে না। আঁধারের কোনো কথায় গলবে না ও।
নিজের পড়ার টেবিলের উপর পাখির খাঁচা দেখে উৎফুল্ল হয়ে দৌড়ে গেলো চাদনী। ওর লাভ বার্ড দু’টো! কিচিরমিচির ডাকছে। চাদনী খুশিতে হাত তালি দিলো। আঁধার শিষ বাজিয়ে ওর মনোযোগ আকর্ষণ করলো। চাদনী তাকালো বিছানার দিকে। আঁধার পা ঝুলিয়ে বসে আছে। চাদনী নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে দেখলো ওঁকে। প্রথম কথা আঁধার বললো

-“চাঁদ, তোর না-কি খুব সাহস! এখানে এসেই তুই টিকটিকি থেকে কুমির হয়ে গেছিস! মানুষের মেসেজ সিন করে, কোনো রিপ্লাই না করে ব্লক মেরে দিচ্ছিস! বিরাট ব্যাপার।”
চাদনীর ভাবাবেগের পরিবর্তন হলো না। আঁধারের কথা বার্তার কোনো ঠিকঠিক নেই।সবসময় উল্টাপাল্টা কথা বলে ছেলেটা। আঁধার উঠে দাড়িয়ে ওর কাছে এলো। দু’হাতে গাল টেনে দিয়ে, মিষ্টি হেঁসে বললো
-“লং টাইম নো সি। কেমন আছিস?”
-“লং টাইম?গতকালই দেখা হয়েছে আমাদের।” ক্ষীণ স্বরে বললো চাদনী।আঁধার ভ্রু উচিয়ে বললো
-“তো? পুরো একটা দিন আমি তোকে দেখলাম না। চব্বিশ ঘন্টা! কত্তো লম্বা একটা সময়, বুঝিস? হিসাব আছে?১৪৪০ মিনিট, ৮৬৪০০ সেকেন্ড। এক একটা সেকেন্ড আমি তোকে মিস করেছি।তোর কথা মনে পরেছে আমার। তোকে দেখতে ইচ্ছে করেছে। আর তুই? তোর সাথে যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিস! ব্লক মেরেছিস কোন সাহসে?”

-“বেশ করেছি ব্লক মেরেছি! তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো না আমার!”
-“বেশ করেছিস? আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো না?”
-“হ্যাঁ।”
-“চব্বিশ ঘন্টায় এতোটা সাহস বেড়ে গেছে তোর?এতোটা? জানের ভয় কর চাদনী!বাপ জেঠার কাছে এসেছিস বলে ছাড় পেয়ে যাবি ভাবিস না। তোর পুরো চোদ্দগুষ্টি মিলে আমার কিছু করতে পারবে না। তুই আমার অবস্থা দেখছিস চাদনী! তারপরও তোর কোনো অস্হিরতা নেই আমার জন্য! আমি ভালো নেই।”
-“আমি ভালো আছি। তোমাকে ছাড়া দিব্যি ভালো আছি।”
-“এজন্যই তো তোর ভালো থাকা কেড়ে নিতে এসেছি আমি।”
চাদনী পাখিদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলো আবার।পাত্তা দিলো না আঁধার কে। আঁধার ছোট ছোট চোখ করে তাকালো ওর দিকে। বললো
-“কোথায় ছিলি এতোক্ষণ?”
-“ছাঁদে!”
-“আমাকে দেখেই ছাঁদে দৌড় দিয়েছিস, জানোয়ার।
কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলাম!”

-“করেছো কেন অপেক্ষা? বলেছি?আমার রুমে এসেছো কেন? যাও নিজের রুমে গিয়ে রেস্ট নাও।”
-“এটুকু অপেক্ষার কথা বলছিস?রেস্ট নিতে গেলে তো আরো কতক্ষণ তোকে দেখা হতো না আমার। চব্বিশ ঘন্টা ধরে যে এক ফোটা ঘুম হয়নি আমার, সে খেয়াল আছে তোর?”
আধার ব্যকুল দৃষ্টিতে দেখলো চাদনী কে। চাদনী তাকালো না ওর দিকে। ওর একহাতের মুঠোয় দু’টো পাখি। একটা লাফিয়ে টেবিলে নামলো। ওর হাতের সাথে গা বাজিয়ে ভালোবাসা জানালো।পাখিটার গায়ে হাত বুলিয়ে, চাদনী উৎফুল্ল হয়ে বললো
-“ইশ! তুমি আমার পাখিগুলোকে নিয়ে এসেছো।থ্যাঙ্কিউ সো মাচ। জানো আমার কিভাবে মনে পরছিলো ওঁদের কথা!”
-“আর আমার কথা?”
-“কী?”
-“আমার কথা মনে পরেনি?”
-“একটুও না। আমার আরো অনেক ভালো লাগছিলো। নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছিলো।তোমার কথা একটুও মনে পরেনি আমার।”
-“বন্দী করতে চলে এসেছি তো! চব্বিশ ঘন্টা মুক্তির স্বাদ নিয়ে ফেলেছিস। ইট’স অ্যানাফ।”
-“নট অ্যানাফ। আমি আর ফিরছি না। ওখান থেকে একবার চলে এসেছি মানে চলে এসেছি। আর যাওয়ার সুযোগ নেই।

-“দেখা যাবে তোর ক্ষমতা।”
চাদনী ওর কথা কানে তুললো না। এতোক্ষণ মনে চেপে রাখা প্রশ্ন টা করলো
-“এক্সাম না দিয়ে চলে এসেছো কেন?”
-“ইচ্ছে করছিলো না। দেহটা ওখানে থাকলেও মনটা এখানে পরে থাকতো। সারাক্ষণ চিন্তায় থাকতাম তুই এখানে এসে উল্টাপাল্টা কিছু করছিস কি-না! এমনিতেও এক্সাম অতোটা ভালো হতো না। তারচেয়ে ভাবলাম একটা বছর না-হয় ড্রপ যাক। এক্সাম দেওয়ার সুযোগ অনেক পাবো। বাট তুই হাত ফস্কে গেলে তোকে কোত্থেকে ফিরিয়ে আনতাম, বল। তখন আমার খুব কষ্ট হতো।তোকে ছাড়া একটা দিন আমার একযুগের মতো লেগেছে।চাচ্চু কে পেয়েই তো সাপের পাঁচ পা দেখেছিস তুই! ভয় হচ্ছিলো তাই চলে এসেছি, তুই জানিস না। এক্সাম হারালে এক্সাম দেওয়া যায়।কিন্তু বউ হারালে বউ পাওয়া যায় না। বলেনি তোকে কেও!”

কাজলরেখা পর্ব ৩৬

-“তুমি একটা পাগল!”
-“বেশিই পাগলামি করছি? এমন কেন করছি রে আমি? আমি তো এমন ছিলাম না। তুই কেন আমাকে ছেড়ে চলে এলি বলতো? আমি নিজেকে নিজে চিনতে পারছি না। আমি ঘুমাতে পারছি না চাদনী, খেতে পারছি না। আমার কিভাবে যে বুকের ভেতরটা জ্বলছে। কোথাও শান্তি পাচ্ছি না। জানিস আমি তোর উপর রাগ করে পড়তে বসেছিলাম, ভেবেছিলাম আর কক্ষনো তোকে নিতে আসবো না৷ আমার কি মেয়ের অভাব হবে? মেয়ের অভাব হবে না, কিন্তু তোর অভাবটা তো কিছু দিয়ে কাটছিলো না।পাগল পাগল লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো তুই আছিস, অথচ ছুঁতে গেলে নাই।কিভাবে যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসেছি সেটা শুধু আমি জানি!আমার সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে রে। তুই আমাকে কেন এভাবে শেষ করে ফেলছিস? একটু দয়া কর আমার উপর।”

কাজলরেখা পর্ব ৩৮