Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪৪

কাজলরেখা পর্ব ৪৪

কাজলরেখা পর্ব ৪৪
তানজিনা ইসলাম

রাত কাউচের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। আকিব শিকদার আর চাদনী যাওয়ার পর, মোবারক হোসেন সেই তখন থেকে সন্দিহান দৃষ্টিতে পরখ করছে ওঁকে। রাত ভ্রু কুঁচকে বললো
-“কী? এভাবে দেখছো কেন?”
-“এটা তো আমার জিজ্ঞেস করার কথা? কাহিনী কী নানুভাই? তোমার মতিগতি তো আমার সুবিধের লাগছে না।”
-“কোনো কাহিনী নাই।”
রোদেলা এহসান ভেতর থেকে মাত্রই এসেছিলেন। অপরিচিত মানুষ দেখলেই, ওনি নিজের কক্ষে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। রাত ওনার হাত ধরে সোফায় বসালো। কোলে মাথা রেখে বললো

-“আঙ্কেলের সাথে কথা বললে না কেন তুমি?”
-“কী বলতাম আমি? তুমিই তো কথা বলার জন্য ডাকলে। আমি এমবারেসমেন্টে মরে যাচ্ছিলাম। অতীতে ওর সাথে আমি যা তা ব্যবহার করেছি।”
-“ঠিক করোনি।”
-“জানি আমি। কিন্তু তখন জেদের তোড়ে ঠিক ভুল বিচার করতে পারিনি। শুধু কী খালামনির হাসবেন্ডের সাথেই দেখা করতে চেয়েছিলে? আর কারো সাথে না।”
রাত গালের নিচে দু-হাত রেখে ওনার দিকে তাকালো৷ মিষ্টি হেঁসে বললো

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“নাহ, শুধু তার সাথে না,আমি আরেকজনের সাথেও দেখা করতে চাচ্ছিলাম।
তুমি বলেছো, রাত্রি খালামনির নিজের মেয়ে নেই।অথচ চাদনী কে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, আমার প্রথমেই রাত্রি খালামনির কথা মনে পরেছে। নিজের মেয়ে না অথচ তাদের চেহারায় কতটা মিল! তুমি জানতে আমি খালামনিকে কতটা মিস করতাম! ওঁকে দেখার পর থেকে আমার খুব বেশিই খালনির কথা মনে পরতো।
-“তা ঠিক বলেছো।আমিও খালি ওঁকে দেখছিলাম।কিন্তু কথা বলতে সংকোচ হচ্ছিলো।”
-“ওর সাথে সংকোচ কিসের! একটা পিচ্চি ও। বয়স কত হবে, এই ষোলো-সতেরো!”
মোবারক হোসেন ছোট ছোট চোখ করে তাকালেন ওর দিকে। সন্দিহান কন্ঠে বললেন
-“তুমি ওঁকে কোথায় দেখেছো? আবরার, শুধু এ কারণেই তোমার এতো তোড়জোড় ছিলো ওঁদের ডাকার জন্য।”
রাত ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললো

-“ঠিক বলেছো। ওঁকে আমি প্রথম দেখেছিলাম, ওদের কলেজে। রেহানের কলেজে প্রচারণার জন্য গিয়েছিলাম।ওঁকে দেখার পর থেকেই আমার শুধু রাত্রি খালামনির কথা মনে পরছিলো।রেহানের ফ্রেন্ড। ওর সাথে আমার কতবার যে দেখা হয়েছে। পৃথিবীটা গোল বলেই হয়তো। বা আমি খালামনি কে মিস করতাম তাই। এসেছিও এক ট্রেনে।সেখানেই আঙ্কেলের সাথে দেখা হয়েছিলো। ওনার কথা বার্তা বাড়ির ঠিকানা শুনে আমার এমন মনে হচ্ছিলো। যে ওঁদের আমি চিনি। না দেখলেও চিনি। অন্ধকারে তীর ছুড়েছি। সত্যি সত্যি মিলে যাবে ভাবিনি।”
মোবারক হোসেন ভনিতাহীন, সরাসরি বললেন

-“ওঁকে পছন্দ করো?”
-“কাকে?”
-“যাকে দেখার জন্য এভাবে অতীত খুঁড়ে নিয়ে এলে।”
-“নাহ। পিচ্চি মানুষ! আমি শুধু একবার দেখতে চাচ্ছিলাম ওঁদের।”
-“সবসময় রহস্য রেখে কথা বলবে না। পছন্দ না, আবার দেখতে ইচ্ছে করে। মিথ্যুক!”
-“আমি মিথ্যে বলি না। পছন্দ টা খুব ছোট একটা শব্দ। পিচ্চিটাকে আমার খালি দেখতে ইচ্ছে করে। ওঁকে দেখতে অবিকল খালামনির মতো। তুমি তো জানো, খালামনিকে আমি কতটা ভালোবাসতাম!”
-“আবরার!”
রাতের মনে হলো, মোবারক হোসেন এবার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ওঁকে এখানে নিয়ে আসার কথা বলবেন। রাতের কিছু মুখ ফুটে ওনার সামনে বললেই হয়। সেটা এনে ওর সামনে হাজির না করা পর্যন্ত তার শান্তি নেই।তাই কথা ঘুরিয়ে বললো

-“আঙ্কেলের সাথে সবকিছু ঠিক করে নাও।মানুষটা অনেক অমায়িক নানুভাই! শুধুমাত্র খালামনির জন্য তোমার এককথায় সে চলে এসেছে, যেখানে এতো বছরে তুমি ওনার সাথে একবারো যোগাযোগ করোনি। এটলিস্ট রাত্রি খালামনির জন্য হলেও সব ঠিক করে নেওয়া উচিত তোমার। উনি যখন নিজের ওয়াইফের কথা ভেবে এতোকিছু সেক্রিফাইজ করলেন, আরেকবার বিয়ে পর্যন্ত করলেন না, তখন তোমার মেয়ের কথা একবার ভাবা উচিত। সব ঠিক করে নাও ওঁদের সাথে।”
-“তাহলে তো তোমারই লাভ তাই না!”
-“পিঞ্চ মারবে না তো। বলেছি না, যেমন ভাবছো তেমন কোনো ব্যাপার নেই। আমি চাইনা আমার সাথে কারো জীবন জুড়ে যাক। নিজের রক্তকেই ভয় লাগে আমার। আমি একাই ভালো আছি।আমার কারোও দরকার নেই। আর তাছাড়া বেশিদিন নেই আমি। ঢাকায় চলে যাবো। কিছুদিন পরেই নির্বাচন।”

-“চাঁদ!”
-“হু।”
-“কখন এসেছিস তোরা?”
-“সন্ধ্যার পরপরই। তুমি ঘুমাচ্ছিলে তখন।”
আঁধারের ঘুম ভেঙেছে মাত্রই। চাদনী বসেছিলো ওর পাশেও। ও হামি তুলে বললো
-“কীরে, এতো দেরি করলি যে?”
-“ওরা আসতে দিচ্ছিলো না।”
-“আচ্ছা! তো, ওখানে কাকে কাকে দেখলি?”
চাদনী সে উত্তর না দিয়ে গদগদ হয়ে বললো

-“জানো আমার খালাতো ভাই কে?”
-“কে?”
-“নেতাসাহেব।”
-“কীহ?”
-“হুম।”
-“বিশ্বাস হয় না।”
-“সত্যি বলছি।”
আঁধার ভ্রু কুচকে বললো
-“তো তুই এমন এক্সাইটেড কেন?এতো খুশির কারণ কী?”
-“এমনিই। আমার নতুন একজন কাজিন হয়েছে। খুশি হবো না?”
-“না, হবি না। তোকে বলেছি না আমি ছাড়া তোর কোনো কাজিন নেই। এতোক্ষণ ধরে গল্প করে আসছিলি তাই না?”

-“না, আমি গল্প করছিলাম না। গল্প করছিলো বাবা আর নেতা সাহেব। আমি তো শুধু শুনছিলাম।”
-“শুনবি কেন? তোর উচিত ছিলো না, চাচ্চুকে চলে আসতে বলা।সন্ধ্যার পর না, তোকে বাড়ির বাইরে থাকতে মানা করেছি।
-“আশ্চর্য! তুমি এমন করছো কেন?”
-“কেমন করছি?খুশি হবি কেন তুই? তোর তো নারাজ হওয়া উচিত।”
-“নারাজ কেন হবো?”
-“নারাজ হবি না কেন? নেতাকে খুব ভালো লাগে?”
-“না, ভালো লাগে না। উনি অনেক অ্যারোগেন্ট। বাট ওনার চোখগুলো অনেক রহস্যময়।”
-“আচ্ছা! কেমন?”
-“কালো, ভয়ঙ্কর। কৃষ্ণগহ্বরের মতো।”

-“তোকে ভৌত আলোকবিজ্ঞান কে পড়িয়েয়েছিলো রে চাদনী? আমি। তুই যে আরেকটা ছেলের চোখের প্রশংসা করে এলি! তোর লজ্জা করলোনা। আবার আমাকে বড় মুখ করে বলছিস!”
আঁধার কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে।ওর টিশার্টে কাদামাটির ছিটা লেগেছে। হাঁটুতেও কাদামাটি তে ভরপুর।
চাদনীর হাত, পা মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা। এতোক্ষণ মুখও বাঁধা ছিলো। একটু আগে আঁধার বাঁধন খুলে দিয়েছে। যাতে চাদনীর চেঁচামেচি ওর কানে যায়। চাদনীর চিল্লানী ওঁকে পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছে।
চাদনী গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। আঁধার আজ ওঁকে বকা দেয়নি, মারেনি। কিচ্ছু বলেনি। শুধু টেনেহিঁচড়ে এখানে নিয়ে এসেছে। হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছে। চাদনী বড় বড় করে শ্বাস ফেলছে। ঘেমে নেয়ে একাকার ও। আঁধারের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় অনুনয় করে বললো

-“সরি আধার ভাই। প্লিজ মাফ করে দাও। আর হবে না। আর কোনোদিন কারও প্রশংসা করবো না আমি। কোনোদিন কোনো ছেলের নাম মুখেও নেবো না। এই তওবা খেলাম।আমাকে মেরো না। বাবা অনেক কাঁদবে।”
-“চাচ্চু কে আমি সামলে নেবো। তুই এখন নিজের কথা ভাব। আর আমি তোকে মারবো না। জ্যান্ত কবর দিয়ে দিব।”
চাদনী আবার কেঁদে দিলো। গলা ফেড়ে চেঁচালো। কেও আসলো না ওঁকে বাঁচাতে। বাড়ির পেছনের দিকের আওয়াজ তেমন একটা বাড়ির দিকে যায় না। এতো রাতে সবাই হয়তো ঘুমাচ্ছে। আঁধারের মাটি খোঁড়া শেষ।ও এগিয়ে আসছে চাদনীর দিকে। আজ সত্যিই ওর চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে যাবে! ও হারিয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে৷ আঁধার ভাই এতো নিষ্ঠুর কেন হয়ে গেলো হঠাৎ করে! ও সত্যিই চাঁদনী কে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিবে?
চাদনীকে ওভাবেই পাঁজা কোলে তুললো ও। হাত-পা বাঁধা থাকায় চাদনী হাত পা ছুঁড়তে পরলো না। শুধু অসহায় স্বরে অনুরোধ করতে থাকলো, এবারের মতো ওর জীবনটা ভিক্ষে দেওয়ার জন্য। ও আর ভুলেও কোনো ছেলের নাম মুখে নেবে না।

আঁধার শুনলো না। দয়া দেখালো না ওর উপর। চাদনী চারিপাশে ঝাপ্সা দেখলো। মাটি দেওয়া হচ্ছে ওর উপর৷ নিষ্ঠুর টা ওঁকে মাটি চাপা দেওয়ার আগে, একবার হাত পা পর্যন্ত খুলে দেয়নি ওর। অনেকবছর পর যখন চাদনীর দেহাবশেষ পাওয়া যাবে, সবাই দড়ি বাঁধা অবস্থাই পাবে।

কাজলরেখা পর্ব ৪৩ (২)

মাটি দেওয়া হচ্ছে ওর উপর।চাদনী শেষবার দেখেনিলো আঁধারকে।ওর দয়ামায়াহীন মুখটা দেখেও চাদনীর কান্না পেলো।বাবাকে শেষবার দেখা হলো না মানুষটা নিশ্চয়ই সকালে উঠে ওঁকে খুঁজবে। খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে যাবে। আঁধার তো চাদনীর কবরটার ঠিকানাও তাকে জানাবে না। রাতের অন্ধকারে আঁধারের মুখটা কেমন ভয়ঙ্কর লাগছে।ধীরে ধীরে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। চাদনী হারিয়ে যাচ্ছে অতলে। ও মারা যাচ্ছে বোধহয়। ওর আর সুন্দর পৃথিবীটা দেখা হলো না। কালকের সকালটা দেখা হলো না ওর। আঁধার শেষমেশ ওঁকে বেয়াদবির শাস্তি দিয়েই দিলো।

কাজলরেখা পর্ব ৪৪ (২)