Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪৯ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৯ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৯ (২)
তানজিনা ইসলাম

রাত বাড়ার সাথে সাথে এহসান বাড়িতে অতিথিদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করলো। রাত অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্যহীন হয়ে পরলো। শাবিহার বন্ধুরা চলে এসেছে, রেহানের বন্ধুরাও চলে এসেছে। তারপরও রাত কার জন্য অপেক্ষা করছে ও নিজেও না। ওর নিজেরও তো কোনো বন্ধু নেই। ছিলোও না কখনো। সবাই তাগাদা দেওয়ায় ও ফরমাল ড্রেসআপে রেডি হয়ে নিয়েছে। পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি ওর সবচেয়ে পছন্দের। ও কোনো অকেশনে গেলে, অবশ্যই পাঞ্জাবি পরে যায়।তবে আজ যেহেতু পার্টিতে ড্রেসকোড আছে, সে রেহানের সাথে শার্ট মিলিয়ে পরলো।

হাতা দু’টো ফোল্ড করে দিলো কনুই পর্যন্ত। সিল্কিচুলগুলোতে জেল দিয়ে, সেট করে রাখলো। কোর্টটা হাতের উপর রাখলো। বাইরে বড্ড শীত। যদিও জনসমাগমে শীত লাগবে না, তবুও বুকে কাপন ধরলে চট করে পরে নেওয়া যাবে।ওর গায়ে শীত লাগার আগে, বুকে কাপন ধরে যায়। হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়।এ সমস্যা টা ওর ছোট বেলা থেকেই।
সবাই কোর্ট পরে থাকবে, তাই ও পরবে না। ওর মানুষের মাঝে মিশে যেতে ভালো লাগে না। সবার থেকে বড্ড আলগা ও। নিজেকে আলগা করে রাখতেই ভালোবাসে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রাস্তায় কোলাহল অনেক। রাত খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। গভীর কুয়াশা সবকিছু নিজের চাদরে গ্রাস করে নিয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে আলো জ্বলছে রাস্তা জুড়ে। সরু গলি টা দিয়ে, এলাকার সাবেক এমপির বাড়ি। সে হিসেবে রাস্তাঘাটের সাথে সাথে, তার আশেপাশের সবকিছু বড্ড উন্নত।আঁধার স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে।
চাদনী নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ওর পাশে। মাঝে মাঝে চঞ্চল চোখে দেখছে বাইরে।ওর ঠোঁটে গাঢ় ডার্ক লিপস্টিক।
আঁধার লিপস্টিক মুছে দেওয়ায় পর, ও নিজের ঠোঁটে আবার লিপস্টিক মেখেছে পূর্বের তুলনায় আরো গাঢ় করে মেখেছে। চাদনী নিজের হ্যান্ডব্যাগে লিপস্টিক নিয়ে নিয়েছে। সাথে টিস্যুও। আঁধার যতবার ওর লিপস্টিক মুছে দেবে, ততবার ও লিপস্টিক দেবে ঠোঁটে। দেখা যাক আঁধার কতবার টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছতে পারে, চাদনী কতবার লিপস্টিক লাগাতে পারে!আঁধার এবারে আর মুছে দেয়নি।কিছু বলেওনি ওকে।

আঁধারের ইদানীং ওর জেদে রাগ লাগে না। ভালোই লাগে। মনে হয়, থাক দেখাক জেদ। সমস্যা কী? ওকেই তো দেখাচ্ছে। আর কারো সাথে তো জেদ ধরতে পারে না। ওর কাছে কম্ফোর্টেবল ফিল করে, ওকে নিজের মনে করে বলেই তো জেদ দেখায়।ওর মানুষ ওঁকে জেদ না দেখিয়ে আর কাকে দেখাবে?
রাত দশটা বাজে। আজ রাস্তায় বড্ড জ্যাম ছিলো।সাবেক এমপির বাড়িতে পার্টি চলছে, আবার তার ছেলে বর্তমান এমপি হিসেবে জয় লাভ করেছে। অনেক গণ্য মান্য মানুষ এটেন্ড করবে সেখানে। রাস্তায় গাড়িবহরের অভাব নেই। তবুও কালো শার্ট পরা পালোয়ান সাইজের কিছু লোক ডাইরেকশন দিচ্ছে। কোনো গাড়ি থেমে থাকছে না। সিরিয়াল মেনেই সামনে আগাচ্ছে।

গাড়ি গেইট পেরিয়ে ঢুকতেই আঁধার লনের সাইডে গাড়ি পার্ক করলো। এখানে সব গাড়ি সিরিয়ালি, থামানো আছে। বাড়িতে ঢুকতে হলে ইনভিটেশন কার্ড দেখিয়ে ঢুকতে হবে। আঁধার চাদনীকে, ইনভিটেশন কার্ড ব্যাগে নিতে বলেছিলো। যেহেতু চাদনী ব্যাগ আনছিলো।
চাদনী ব্যাগ খুঁজে দেখলো কার্ড নেই। ও অপরাধী চোখে তাকালো আঁধারের দিকে।
আঁধার স্বাভাবিক কন্ঠে বললো

-“আনিসনি?”
-“ব্যাগে তো নিয়েছিলাম।শিউর আমি।”
-“ভুতে নিয়ে গেছে চাদ?”
-“সরি।”
-“সরি কেন বলছিস, আমি কিছু বলেছি তোকে।”
চাদনী মনে করে, মিনমিন করে বললো
-“ব্যাগে লিপস্টিক আর টিস্যু নেওয়ার সময় বের করেছিলাম। তখন হয়তো আর ব্যাগে ঢোকানি হয়নি।”
-“গুড!ভালো করেছিস।”
-“আমরা কী এখন ফিরে যাবো? কার্ড ছাড়া তো ঢুকতে দেবে না।”

-“হুম, দুই ঘন্টা জ্যাম পারি দিয়ে যুদ্ধ করে আসার পর।৷ আমরা গেইট থেকেই ফিরে যাবো।”
চাদনী ঠোঁট উল্টে তাকালো। আঁধার গাল টেনে দিলো ওর। শাবিহাকে কল করে বললো, ওরা আটকা পরেছে। উদ্ধার করে যাতে নিয়ে যায়।চাদনী অপেক্ষা করতে থাকলো। একটু পর শাবিহাকে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো৷ আঁধার হাসলো ওর দিকে তাকিয়ে। শাবিহা ওঁকে জড়িয়ে ধরতে গেলো, আবার ওর বদলে জড়িয়ে ধরলো চাদনীকে। চাদনী সৌজন্যতা রক্ষায় হাসলো। শাবিহা আহ্লাদী কন্ঠে বললো

-“এতো লেইট করে আসলি কেন?”
-“খুব জ্যাম।”
-“আয় আমার সাথে আয়।”
-“কার্ড তো আনলাম না রে!”
-“ধুর! তোর জন্য কার্ড লাগবে কেন।”
চাদনী আঁধারের পিছু পিছু ধীর পায়ে হাঁটতে থাকলো। ওর কাছে সবাই অচেনা। ও নিঃসন্দেহে একজন কনজার্ভেটিভ ফ্যামিলির মেয়ে। কিন্তু এখানে সবার চলাচল, পোশাক আশাকে কেমন নিশ্চুপ উগ্রতা। চাদনী আঁধারের হাত ধরতে চায়লো। কিন্তু আঁধার শাবিহা সাথে বড় বড় কদমে এগিয়ে যাচ্ছে। চাদনী ডাকতে চায়লো ওঁকে। কিন্তু ওর মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না।

আঁধার নিজেই চাদনীকে না পেয়ে থেমে গেলো। পিছু ফিরে দেখলো, চাদনী ওর থেকে অনেক দূরে পরে গেছে।ও নিজেই এগিয়ে এসে চাদনীর হাত ধরলো। ধীর পায়ে হাটতে থাকলো ওর সাথে। চাদনী কম্ফোর্টেবলি হাঁটতে পারছে না।ও আজ গাউনের সাথে পেন্সিল হিল পরে এসেছে।চাদনী মোটামুটি লম্বায়। কিন্তু চিকন বলে ওঁকে পিচ্চিদের মতো লাগে। ও আঁধারের বুকের কাছে পরে থাকে। তো আজ সিগমা ওমেন হওয়ার জন্য বা এটিটিউড দেখানোর জন্য হলেও হিল পরে এসেছে। কিন্তু ওর হিল পরার অভ্যাস নেই।যার ফলে ও হাঁটতে পারছে না।
পার্টিটা এরেঞ্জ করা হয়েছে বাগান জুড়ে। অনেক বড় বাগান। সবাই এক এক স্হানে দাড়িয়ে আছে তাদের পরিচিতদের সাথে।

শাবিহার অনেকগুলো বন্ধুবান্ধব। তার মধ্যে কিছু আঁধারের খুব ক্লোজ, কিছুর সাথে জাস্ট হাই হ্যালোর সম্পর্ক। আঁধারের ফ্রেন্ড গ্যাং এর সবাই চাদনীকে দেখে অনেক খুশি হলো। তটিনী জড়িয়ে ধরলো ওঁকে। চাদনীর খুব অকওয়ার্ড লাগলো। ওরা সবাই ওয়েস্টার্ন পরেছে। কয়েকজন তো ওড়নাও নেয়নি সাথে। ছেলেমেয়েরা কীভাবে সংকোচহীন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছে। চাদণী অপেক্ষা করলো, আঁধারকে কেও জড়িয়েধ ধরার। তাহলেই ও আঁধারকে বাঁশ মারার অনেক বড় একটা টপিক পাবে। কিন্তু আঁধার নিজেকে কাওকেই জড়িয়ে ধরতে দিলো না। চাদনীর ইচ্ছে পূরণ হলো না, কিন্তু হৃদয়ের আশপাশ অজস্র ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো।
আঁধারের বন্ধুদের মধ্যে একজন শাবিহাকে বললো

-“যার জন্য এ পার্টি, সে কই? একবারও তো দেখলাম না তাকে।”
-“ভাইয়া, দলের ছেলেপেলেদের সাথে কথা বলছে।”
-“ডেকে নিয়ে আয়।”
-“দাঁড়া তোরা।”
চাদনীর বুক ধ্বক করে উঠলো। একপলক ও তাকালো আঁধারের দিকে। হেঁসে হেঁসে ওর অন্য বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। জাস্ট কিছু সময়ের মধ্যেই ওর এ হাসি গায়েব হয়ে যাবে। পারলে, চাদনীকেও গায়েব করে দেবে।
শাবিহা রাতকে সাথে করে নিয়ে এলো। ও ওর ভাইয়ের বাহু ধরে হেঁটে হেঁটে এলো। ওঁদের কাছে এসে এনাউন্স করলো

-“আবরার ভাইয়া।”
চাদনী মাথা নিচু করে ঘাসের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওর ঘাম ছুটে যাচ্ছে ভয়ে। রাতের চোখ পরলো ওর দিকে। ঝটকা খেয়ে, মুহুর্তেই চোখ ঘুরিয়ে ফেললো ও। এই মেয়ে এখানে কী করছে? ও যে রেহানের বন্ধুদের ভীড়ে পিচ্চিটাকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যাচ্ছে, অথচ সে দাঁড়িয়ে আছে শাবিহার বন্ধুদের সাথে। দু’টো কাজল চোখ দেখার জন্য, ও রেহানের পাশ ছেড়ে একটুও নড়েনি। অন্যদিন রেহান ওর পায়ে পায়ে ঘোরে। আজ ও রেহানের পিছু পিছু ঘুরেছে। কেন ঘুরেছে? শুধু ওর বন্ধুদের সাঝে মেয়েটাকে খোঁজার জন্যই তো। তবে ও শাবিহার বন্ধুদের সাথে কী করছে? ওর তো রেহানের সাথে থাকার কথা।

রাত ভাবতে থাকলো, চাদনী চোখ তুললো না।কিন্তু রাত তো এটা জানে না, ওর চেয়েও বড় ঝটকা অন্যজন খেয়েছে। সে এতোটাই ঝটকা খেয়েছে যে, জায়গাতেই পাথর হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে না, পায়ের নিচের মাটিটা বিলীন হয়ে গেছে, না আকাশ উড়ে চলে গেছে! আঁধার কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। ওর শুধু ইচ্ছে করছে, চাদনীকে নিয়ে এখান থেকে দৌড় দিতে।
শাবিহা সবার সাথে রাত কে পরিচয় করিয়ে দিলো। আঁধারের বেলা যখন এলো, ও শুধু হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশ্যাক করলো। কথা বললেই, এখন ও উল্টাপাল্টা বলবে। কি বলবে নিজেও জানবে না!
রাত শুধু চাদনীর পরিচয় জানতে চায়লো। মেয়েটা মাথা তোলে না কেন! ও এখানেই বা দাঁড়িয়ে আছে কেন! রাত কে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। শাবিহাই পরিচয় করালো

-“আর ও হচ্ছে, চাদনী।”
-“ওউ তোর ফ্রেন্ড?”
-“নাহ, ও আঁধারের কাজিন। কাজিন বউ!”
শাবিহা মুখ কালো করে ফেললো। রাত চোখ বড় বড় করে তাকালো শাবিহার দিকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরপর সামলে ফেললো নিজেকে। মনে মনে ভাবলো, শ্যামাঙ্গিনীর বিয়ে হয়ে গেছে! তবে যে ও বললো, ওর বিয়ে হয়নি। মিথ্যে কেন বলবে মেয়েটা!
রাত তবুও আরেকবার শিউর হতে বললো
-“তোর ফ্রেন্ডের ওয়াইফ!”
-“জ্বি।”

রাত কিছুক্ষণ ঘোর থেকে বেরোতে পারলো না।ওর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা খুব প্রখর। মানুষের চেহারা দেখে ও বুঝে যায় তার ব্যাপারে। চোখের দিকে তাকিয়ে মন পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এটা নিয়েও কিছুটা অহংকার ছিলো ওর। মানুষ ওর কালো মনিতে তাকিয়ে হিপনোটাইজ হয়ে যায়। আর রাত সে মানুষটাকে চিনে যায়। তবে রাতের আঁধারে, অনেক আলোকসজ্জা, জাঁকজমকের আড়ালে রাতের মনে হলো ও শ্যামাঙ্গিনী কে চিনতে পারেনি। চাঁদ কে চিনতে ওর বড্ড ভুল হয়ে গেলো। এভাবে ভুল করে ফেললো কেন ও? চাঁদের জীবনে একটা আঁধার থাকতে পারে, এটুকু কমনসেন্স তো ওর নিজের মাঝে রাখা উচিত ছিলো। এতোটা ননসেন্সের মতো বিহেভ করার কি খুব দরকার ছিলো? ওর তো চাঁদ অপছন্দই ছিলো। চাঁদ, রাতের মহত্ত্ব কমিয়ে দেয়, তাই জোৎস্না রাতে ও কক্ষ থেকে পর্যন্ত বেরোতো না। কেন সেধে গিয়ে এ জিনিসটার উপর মোহ ঢালতে গেলো ও? কেন?

রাত ঢোক গিললো। ওর এবার ঠান্ডা লাগছে। মনে হচ্ছে শীতল হাওয়া ওর গা ছুঁয়ে দিচ্ছে। অথচ কোথাও ঠান্ডা নেই। জায়গায় জায়গায় হিটার বসানো হয়েছে। তারউপর, সবার জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকের ভীড়ে ঠান্ডা লাগার তো কথায় না। তবুও রাতের বুকে কাপন ধরলো। লোমগুলো খাঁড়া হয়ে গেলো। ওর শীত লাগলে, গায়ে লাগার আগে বুকে লাগে। অস্হির লাগে বুকের ভেতর। এখনও লাগছে। কিন্তু ওটা শীতের কারণে না, অন্য কারণে রাত বুঝতে পারছে না।

কোর্টটা গায়ে জড়িয়ে নিলো রাত। ও বরাবরই একজন নির্বিকার মানুষ। চোখের সামনে প্রতিনিয়ত খুনোখুনি দেখে।কবে শত্রুরর ছোঁড়া গুলিতে ওর জান যায় তারও কোনো নিশ্চিয়তা নেই। কোনো কিছুই ওর উপর প্রভাব ফেলতে পারে না। ওর বাবা ওঁকে পাথর হৃদয়ের অনুভূতিহীন মানুষ বলতো। এখনও বলে।শুধু একটা ভুলের কারণে মানুষটার এতো আহাজারিও ওর উপর প্রভাব ফেলে না।কিন্তু আজ রাতের উপর প্রভাব পরলো। ও এটাই মানতে পারছে না, এমন ননসেন্সের মতো কাজ ও করলো কী করে? আরেকজনের বউকে ও শ্যামাঙ্গিনী ডাকে! ছিহ! উফ, চাদনী! এই মেয়েটা ওঁকে বললো কেন যে ওর বিয়ে হয়নি! মিথ্যুক একটা! এভাবে কে মিথ্যে বলে? মানুষের ইমোশনের কোনো দাম নেই। এই যে ওর ইমোশনের দফারফা হয়ে গেলো সে ব্যাপারে কী! মেয়েটা কী সে দ্বায় নেবে? সব দ্বায় ওর কেন খালি?
রাত কিছু না বলে চলে গেলো। চাদনী এতোক্ষণে মাথা তুললো। নিচু করে থাকতে থাকতে ওর ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেছে।
চাদনী ফিসফিস করে ডাকলো

-“আঁধার ভাই।”
আঁধার নাক ফোলাচ্ছে। চাদনী পাংশুটে মুখে তাকালো ওর দিকে। শাবিহা বললো
-“চাদনী, তুমি রেহানের সাথে দেখা করেছো?”
চাদনী না বোধক মাথা নাড়লো।
-“যাও, দেখা করে এসো। ও তোমার জন্য অনেক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে। তোমার সব বন্ধুরাও এসেছে।”
চাদনী অবাক হয়ে তাকালো। শাবিহা স্বাভাবিক কন্ঠে বললো
-“তুমি যে রেহানের ফ্রেন্ড সেটা আমি জানি। দু’জন যেহেতু একি ক্লাসে পড়ো, ফ্রেন্ড হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাট তুমি যে ওর ক্লোজ ফ্রেন্ড সেটা জানতাম না। সেটা জানলাম আজ সন্ধ্যায়।
চাদনী আঁধারের দিকে তাকালো পারমিশনের জন্য।
আঁধার নিজের ঘড়ির সাথে চাদনীর সিল্কের ওড়না আঁটকে দিলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো
-“খবরদার! যদি একটুকুও চোখের আড়াল হোস তুই। আমি এবার সত্যিই কবর দিয়ে দেবো তোকে চাদনী। তুই অজ্ঞান হলেও এবারে রেহাই পাবি না।”

চাদনী বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে দেখলো ওঁকে। আঁধারের গাল দু’টো লাল হয়ে আছে। ও অদূরে রাতের দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ সমানে শাসাচ্ছে চাদনীকে। রাতও তাকিয়ে আছে, আঁধারের দিকে। এক্সপ্রেশন বোঝার চেষ্টা করছে।
ওরা দু’জন একজন আরেকজনকে, ক্ষণকাল পরপরই কোণা চোখে দেখছে।অথচ মুখ দিয়ে টু শব্দ বের করছে না। আঁধার একবার যদি বিষয়টা জানতো, ও জীবনেও আসতো না এখানে। শাবিহা রাগ করলেও না। এটা খুব খারাপ হলো। খুব!ছেলেটার সাথে সম্পর্কগুলো এমন কুন্ডলী পাকিয়ে আছে কেন? রাত এতোটা পরিচিত কেনো হয়ে গেলো? প্রথমতো চাদনীর খালামনির ছেলে। আবার ওর বেস্টফ্রেন্ডের বড় ভাই। যে বেস্টফ্রেন্ডের সাথে এককালীন ও প্রেমের সম্পর্কে ছিলো। উফ! আঁধারের চিন্তায় মাথা ফাটার উপক্রম হলো।
চাদনীকে রেহানের সাথে দেখা করতে যেতে হলো না। রেহানই ওর ফ্রেন্ডদের নিয়ে চাদনীকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এলো। চাদনী ওঁদের দেখে রিলিফ পেলো। ও এতোক্ষণ খুব ইনসিকিউরিটিতে ছিলো। ওরা ওর এনার্জি ব্যাগ। চাদনী ওঁদের দেখলেই কোনো এক অজানা কারণে সাহস পায়।
চাদনী তাকালো আঁধারের দিকে। নিচু গলায় বললো

-“আমি ওঁদের সাথে যাই, আঁধার ভাই।প্লিজ। তুমি তোমার ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলো। আমাকে আমার ফ্রেন্ডদের সাথে যেতে দাও।”
-“না। তুই কোথাও যাবি না। আমার চোখের আড়ালে তো একদমই না।”
-“ওঁদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকবো। আমার খুবই বোরিং ফিল হচ্ছে।”
-“হলে হোক।”
-“আমি কাওকেই চিনতে পারছি না।”
-“পরিচয় করিয়ে দি।”
-“ওদের সাথে পরিচয় হয়ে আমি কী করবো?”

-“তোর এটাই তো চাওয়ার ছিলো। আমি সবাইকে বলে দেবো তুই আমার বউ। এটা বলতে আমার কোনো সংকোচ নেই।হচ্ছে না। আমার বন্ধুরা এটা জানে, কিন্তু অন্যরা জানে না। ওদেরও জানিয়ে দেই।তারপর যাস!”
আঁধার নিজের সব ফ্রেন্ড কে পরিচয় করাচ্ছে চাদনীর সাথে। এতোদিনে অনেকেই জেনে গেছে, আঁধারের বিয়ে হয়েছে ওর চাচার মেয়ের সাথে। সবাই সুন্দর করেই কথা বললো চাদনীর সাথে। তবে আঁধারের ভয় লাগলো, কেউ যদি চাদনীকে উল্টাপাল্টা বলে দেয়।ওর ক্লোজ ফ্রেন্ডদের নিয়ে ওর কোনো চিন্তা নেই। উল্টো ওরা আঁধারের চেয়ে আরো বেশি ভালো। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে পশ দেখানোর জন্য, যে সো কল্ড স্মার্ট ফ্রেন্ডদের সাথে ও বন্ধুত্ব করেছিলো, তারা তো ভালো কথা নাও বলতে পারে। আঁধারের ওঁদের প্রতি একটুও বিশ্বাস নেই। চাদনী কষ্ট পাবে এমন কিছু বললেই আঁধার তার নাক ফাটিয়ে দেবে।

শাবিহার একটা ফ্রেন্ড আছে রিক নামে। নামটা যেমন বিদেশি, কাজকারবারও করতে চায় পশ্চিমাদের মতো। বাঙালিয়ানার ছিটাফোঁটাও নেই ওর মাঝে। সবার থেকে নিজেকে একটু বেশিই পশ দেখাতে চায়।আঁধার যখন োর সাথে পরিচয় করাতে গেলো, সে গদগদ হয়ে বললো
-“ওয়াও আঁধার! এ পিচ্চি টা তোর বউ!”
আঁধার চোখ ছোট ছোট করে তাকালো ওর দিকে। এই ছেলেটাকে এতো জঘন্য লাগে ওর! শুধু শাবিহার ক্লোজ বলে ভালো বিহেভ করতে হয়। না পারতে কথা বলে। ওর ফ্রেন্ডদের মধ্যে একমাত্র এই বেয়াদবটা রেড লাইট এরিয়ায় যায়।তারপর সেসব এসে গসিপ করে ওঁদের সাথে। ক্যারেক্টার এমন চুড়ান্ত লেভেলের খারাপ। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে আঁধারের কাজকারবার দুধভাত ওর কাছে। শাবিহা এমন একটা ছেলেকে নিজের ফ্রেন্ডলিস্টে জায়গা দিলো আধার বুঝে উঠতে পারে।
রিক চাদনীর দিকে,হাত বাড়িয়ে বললো

-“হাই আমি রিক।”
চাদনী চোখ তুলে তাকালো আঁধারের দিকে। আঁধার হাত বাড়িয়ে ওর হাত সরাতে যাবে, তার আগে রিক এগিয়ে এলো চাদনীকে জড়িয়ে ধরতে। চাদনী আতঙ্কে দুপা পিছিয়ে গেলো। আঁধার হাত দিয়ে বাঁধা দিলো ওঁকে। বাঁধা টা কিছুটা ধাক্কার মতোই লাগলো। নিচু আওয়াজে, কিন্তু খুব রেগে বললো
-“ব্রো, কী করছিস! ও এসবে অভ্যস্ত না।”
রিক পিছিয়ে গেলো। আঁধার বাধাটা আসলে ধাক্কায় ছিলো। সব বন্ধু ওর দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকালো। ছেলেটার সম্মানে লাগলো ব্যাপারটা। মেইল ইগো হার্ট হলো খুব করে।
রেগে গিয়েও নিজেকে শান্ত করে,শ্লেষাত্মক স্বরে বললো
-“তোর বউ কে আমি খেয়ে ফেলছি না।ইট’স জাস্ট এ সিম্পল হাগ! নরমাল বিষয় ইয়ার। এমন করার তো দরকার ছিলো না।”

-“ধরতেও পারবি না।”
-“চাচ্ছি না তো। আসমান থেকে নেমে আসা কোনো হুরপরী না।”
আঁধার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো। কঠোর স্বরে বললো
-“নিজেই তো এগিয়ে এলি দেখলাম। সবাই তো তোর মতো, জড়াজড়ি করে না সবার সাথে।”
-“একটা সিম্পল হাগ কে, এভাবে ঘুরিয়ে পেচিয়ে ডেসক্রাইব করছিস কেন? সৌজন্যতার জন্য ছিলো। আমার অন্য ইন্টারেস্ট ছিলো না। ওর প্রতি আমার অন্য ইন্টারেস্ট আসবেও না।
চাদনী মুখে হাত দিয়ে ফেললো। ঘৃণায় গা কাঁপছে ওর।
আঁধার ওর কলার ধরে ফেললো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো

-“আরেকটা বাজে কথা বললে, তুই এখান থেকে সহি সালামত ফিরতে পারবি না। এমন অবস্থা করবো যে, তোর প্রতি অন্য মেয়েরই ইন্টারেস্ট আসবে না আর কোনোদিন।”
রিক কুটিল হাসি দিয়ে বললো,
-“গ্রামের মেয়ে শহরে আসলেই কী খাপ খাওয়াতে পারে? পারে না! আর না এসব জায়গায় অভ্যস্ত হতে পারে না।
-“না পারে না। তোর মতো রেড লাইট এরিয়ার মা*লের সাথে তো একদমই না। তোর ক্যারোক্টারের চেয়ে ওর পায়ের পাতা বেশি চকচক করে। বা*স্টার্ড একটা।”
আঁধার ধাক্কা দিলো ওঁকে। সে পরতে পরতে সামলালো নিজেকে। আঁধার কে এসে প্রহার করবে, তার আগে শাবিহা দাঁড়িয়ে পরলো আঁধারের সামনে।ঝাঁঝালো স্বরে বললো

-“অফ যা এবার। দোষটা তোর। খবরদার! আধারের গায়ে হাত দিবি না। খুব খারাপ হবে।”
-“পার্টিতে ডেকে এনে এভাবে অপমান না করলেও পারতি।”
-“আর তুই যে আরেকটা মানুষকে অপমান করছিস, তার বেলা। প্লিজ। থাম এবার।”
আঁধার চাদনীর হাত ধরে নিয়ে গেলো সেখান থেকে। ওর রাগে গা কাঁপছে। এখানে থাকলে, ও ওই বি*চের থোবড়ার নকশা বদলে দেবে। ফালতু একটা! রেহান গেলো আঁধারের পিছু পিছু। সাথে চাদনীর অন্য বন্ধুরাও।
আঁধার চাদনীকে একটা চেয়ারে বসালো। চাদনী তাকালো ওর দিকে। ওর চোখে পানি টলমল করছে। কোনোমতে ভাঙা গলায় উচ্চারণ করলো

-“এজন্যই আমি আসতে চাইনি।”
-“আসবি না কেন? একটা আবালের জন্য। উফ! আমার মুখ দিয়ে খুব বাজে বাজে গালি আসছে।”
-“না, গালি দেবে না তুমি আমার সামনে।”
-“জুস খাবি?”
-“না।”
-“ওয়েট অর্ডার দিচ্ছি।”
আঁধার ওয়েটার কে দেখে, আপেলের জুস নিয়ে নিলো। চাদনীর হাতে দিয়ে বললো,

-“হাঁপাচ্ছিস তুই।গলা ভেজা একটু।এজন্যই তোকে আমার সাথে সাথে থাকতে বলছিলাম। পার্টিতে হাজার রকমের লোক থাকবে। একা তুই এদেরকে টেকেল দিতে পারবি না।”
চাদনী নাক টেনে চুমুক দিলো জুসে। রাত দূর থেকে দেখলো পুরো ঘটনাটা। ও আঁধারের কান্ডকারখানা থেকে চোখ সরাতে পারছে না। আঁধার কি কি যেন বলে, শাসাচ্ছে চাদনীকে! রাতের মনে হচ্ছে, ও চাদনীকে অর্ডার করছে। কোথাও না যেতে, কারো সাথে না মিশতে। ও মানুষের ঠোঁট রিড করতে পারে। রাত নিজেও জুসের গ্লাসে চুমুক দিলো। বিরবির করে বললো
-“সাচ এ রেড ফ্ল্যাগ! হাহ! শ্যামাঙ্গিনী, তোমার ভাগ্য খারাপ। তুমি, আমার মতো গ্রিন ফরেস্ট কে মিস করে ফেললে!”

কাজলরেখা পর্ব ৪৯

আধার এখন চাদনীর চুল ঠিক করে দিচ্ছে।স্বান্তনা দিচ্ছে ওঁকে। বলছে, মন খারাপ না করতে। রাত ওঁদের কথোপকথন শুনছে না। শুধু আঁধারের বলা কথাগুলো পড়ছে। রাতের এবারে মনে হলো, নাহ! রেড ফ্ল্যাগ হলেও, ভালোবাসাটা খাঁটি। রাতের খুব রাগ হলো নিজের উপর। সব মেয়ে বেছে বেছে,ও একটা বিবাহিত মেয়েকে শ্যামাঙ্গিনী ডাকতে গেলো। কি ননসেন্স একটা ব্যাপার। কেমন নিজের অজান্তেই, গর্হিত একটা কাজ হয়ে গেলো ওর দ্বারা।
রাত মলিন হাসলো ওঁদের দিকে তাকিয়ে। ওর না হওয়া শ্যামাঙ্গিনীর, অন্য জনের প্রতি ভালোবাসা উপচে পরা চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
-“তুমি অপরূপা, শ্যামাঙ্গিনী, সুস্নিগ্ধা, অন্য গ্রহের চাঁদ! আমি এক সাধারণ বামুন, চাঁদে হাত দেওয়া মানায় না!”

কাজলরেখা পর্ব ৫০

2 COMMENTS

Comments are closed.