Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৫৪

কাজলরেখা পর্ব ৫৪

কাজলরেখা পর্ব ৫৪
তানজিনা ইসলাম

রাতের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আঁধার নাক ফুলিয়ে বললো
-“ধুর! অভদ্র একটা।”
​পরপর সে তাকালো কান্নারত চাঁদনীর দিকে। ওর চোখের পাতা এখনও ভেজা। ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো আঁধারের। হৃদয়ের সর্বত্র হিংসের দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করে বললো, ‘এই চোখের পানি তোর জন্য না আঁধার। এই চোখদুটো আজ তোর জন্য কাঁদেনি তো। ইভেন কখনোই কাঁদেনি, তোকে হারানোর ভয়ে। অথচ চোখদুটোসহ আস্ত মানুষটাই তো তাের!’ নিজের ভেতরের আওড়ানো কথাগুলো খুব করে চেপে ধরলো আঁধারকে। ধুপধাপ পা ফেলে ও এগিয়ে গেলো চাঁদনীর দিকে। আঁধার বিষাদ দৃষ্টিতে তাকালো চাঁদনীর দিকে। অঢেল বিরহ মাখা কণ্ঠে বললো—

​-“কার জন্য তোর এতো মায়া, চাঁদনী? এতো চোখের জল কার জন্য? আমাকে তো কখনো এভাবে মায়াময় দৃষ্টিতে দেখিসনি। এতো আবেগ কার জন্য? বুক কাঁপছে তোর? কষ্ট হচ্ছে? দুদিন আগে আসা একটা ছেলের জন্য এতোটা কষ্ট কেন পাচ্ছিস? এতো ঠুনকো তোর আবেগ? আমি বোধহয় পারতাম না রে! আমি খারাপ ছিলাম, জঘন্য ছিলাম তবুও আমার আবেগ ভাগ হয়নি। চাঁদনী ছাড়া অন্য কারো জন্য আমার আবেগ আসেনি। তুই এতো ভালো হয়েও কেন ভাগ করে ফেললি? আমার তো অর্ধেক আবেগে পোষায় না। মুক্তি চাস চাঁদনী? বল, মুক্তি চাস? মুক্তি নেই তোর। আমার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তোর মুক্তি নেই।”

​চাঁদনীর মুখে কোনো শব্দ ফুটলো না। নেতিয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে শুধু দেখে গেলো ও। আশ্চর্য! ও করেছে টা কী? এখন কি ও কাঁদতেও পারবে না? কান্নার কারণ না জেনেই তো আঁধার চোটপাট শুরু করলো। অবশ্য এটাই আঁধারের সাথে যায়। এমন বিহেভ না করলেই বরং চাঁদনী অবাক হতো। যে ছেলে, জাস্ট অন্য ছেলের সাথে ওঁকে দাঁড়ানো দেখে ওর অবস্থা খারাপ করে দিতে পারে। সে আজ দেখলো, চাঁদনী ওই ছেলের জন্য কাঁদছে। তিলকে তাল বানানোর স্বভাব তো আঁধারের বহু আগে থেকেই। তাই বলে মুক্তি? এখানে মুক্তির কথা আসলো কোত্থেকে? চাঁদনী মুক্তি চাইলেই কি আঁধার ওঁকে মুক্তি দেবে? চাঁদনীর এসব ভাবনার মাঝেই আঁধার ওঁকে অবাক করে দিয়ে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
​দরজায় বসানো ছোট্ট কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে থেকে সবটাই অবলোকন করলো রাত। ও মলিন হাসলো সেদিকে তাকিয়ে। খুব অযাচিত একটা ভুল হয়ে গেলো ওর দ্বারা। ও নিজের মায়া বিলিয়ে ফেললো, এমন একটা মানুষের জন্য যে আগে থেকেই অন্য একজনের মায়ায় আবদ্ধ। অন্য আরেকজনের বাহুডোরে থেকে, ওর মায়া দেখার সময় তার নেই।ও মায়া দেখায়নি সেজন্য। সস্তা হয়ে যাবে যে। যে মায়ার দাম নেই, সে মায়া দেখিয়ে ও নিজেকে সস্তা বানাতে চাচ্ছে না। ও ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসার কাঙাল, এটা যেমন সত্যি। তার চেয়েও বড় সত্যি, কখনো কারো ভালোবাসা চায়নি ও। ভালোবেসেছে কিন্তু ভালোবাসা ফেরত চায়নি। ছোট্ট শ্বাস ফেললো রাত, ওকে একবার থানায় যেতে হবে। রিকের ব্যাপারটা ও সুহাশের উপর ছেড়ে দিতে পারছে না। যদিও সুহাশ নিজের দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করবে। কিন্তু রাতের যে ক্ষোভ বা আক্রোশ জেগেছে ওর প্রতি, সেটা ওর অবস্থা সামনাসামনি না দেখলে, কলিজা ঠান্ডা হবে না।

​-“ভাইয়া।”
কারো ডাকে রাতের ভাবনার সুতো কাটলো। তটিনী এসেছে। রাত নিজেকে সামলালো। পিছু ফিরে তাকালো, তটিনীর দিকে।
-“কথা বলেছেন?”
-“হুম। চলে যাবো এখন। তুমি থাকবে?”
-“নাহ। আঁধার না আসলে, থাকতাম। এখন তো ও চলে এসেছে। বাড়ি চলে যাবো।”
-“একা যাবে? অনেকটা রাত হয়ে গেছে তটিনী।”
-“আম্মু বারবার কল দিচ্ছে। চিন্তা করছে আমার জন্য।”
-” এতো রাতে তো গাড়িও পাবে না।সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত তোমার।”
-“সমস্যা নেই। চেনা রাস্তা ভয় লাগবে না।”
-“তারপরও একা একটা মেয়ে তুমি! দেশের পরিস্থিতি তো ভালো না।” আবার চুপ করে বললো
-“আমি থানায় যাচ্ছি। আসো, তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”
-“আপনাকে আবার উল্টো রাস্তায় যেতে হবে। শুধু শুধু কষ্ট করবেন। আমি একা যেতে পারবো তো।”
-“সমস্যা নেই। বড় ভাইয়ের মতো ট্রাস্ট করতে পারো।”

রাতের এ ব্যক্তিত্ব দারুণ। ও মেয়েদের ব্যাপারে এসব বিষয় নিয়ে বড্ড সেন্সিটিভ। একটা মেয়ে শুধুমাত্র অসাবধানতার কারণে বিপদে পরবে, তার ক্ষতি হবে। রাত এসব নিতে পারে না কেনো যেন! ও যদি পারতো, পুরো বাংলাদেশের সিস্টেম চেঞ্জ করে দিতো। মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ টুকু দিতো নিজের। হয়তো ও পুরো বাংলাদেশের মেয়েদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারবে না। কিন্তু ওর অধীনস্থ ঢাকা-১০ এর সব মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সেখানে ওর পরিচিত একটা মেয়েকে এতো রাতে, কী করে একা ছাড়বে ও? সিদ্ধান্ত হলো, ও তটিনীকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে। তটিনীও দ্বিমত না করে রাজি হয়ে গেলো।

​রাত জানে না, তটিনী রাতকে ট্রাস্ট করে; কিন্তু সেটা বড় ভাইয়ের মতো নয়। রাতের প্রতি ওর অনুভূতিটা কোনো দিক দিয়েই ভাইয়ের মতো লাগে না। তটিনী অবশ্য এখনো এই অনুভূতির কোনো নাম দেয়নি। বিপরীত পাশের মানুষটা যে বড্ড পাথর! তটিনীর অনুভূতি তার নিজের কাছে খুব দামি। সেই অনুভূতির দাম দিতে হয়। রাত যে সেই দাম দেওয়ার চেষ্টাও করবে না, সেটা ওর জানা। বান্ধবীর বড় ভাইকে এটুকু তো চিনেছে ও। শাবিহাদের বাড়িতে, প্রথম থেকেই সবচেয়ে বেশি যাতায়াত ছিল তটিনীর। শাবিহা যখন বলতো, “আজকে বড় ভাইয়া আসবে”, তখন সে অধীর হয়ে বসে থাকতো কখন শাবিহার বাড়িতে যাবে ও। রাতকে একপলক দেখার আশায়, কতোবার ও হাজার রকমের এক্সকিউজ বানিয়ে শাবিহাদের বাড়িতে গেছে, সেসব তো ও ছাড়া কেও জানে না। রাত যতবার এহসান বাড়িতে ওর দাদুভাইকে দেখতে যেতো। সেই দিনগুলোতে তটিনীর যাতায়াতও বাড়তো ওই বাড়িতে। কোন অদৃশ্য টানে সে বারবার ছুটে যেত! সেটা ওর অজানা ছিলো না। ভালোবাসা টের পাওয়া যায়।
​ভাবনার মাঝেই গন্তব্যে পৌঁছাল তারা। তটিনীর বাড়ির সামনে গাড়ি থামালো রাত। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই, রাত জানালা দিয়ে তাকিয়ে বললো

-” সাবধানে যেও।”
গেইটের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তটিনী। গেইট টা খুলেই একটুখানি পথ পেরিয়ে সদরদরজা। বেল বাজালেই ওর আম্মু দরজা খুলবে। এটুকু রাস্তাও রাত ওঁকে সাবধানে যেতে বলছে। এ ব্যাক্তিত্বটাই তো শেষ করে দিলো তটিনীকে।
পূর্ণগতিতে গাড়িটা আবারও স্থানত্যাগ করলো। তটিনী তাকিয়ে থাকলো গাড়িটার পানে। যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। ধীরে ধীরে গাড়িটা চোখের আড়ালে চলে গেল,মিশে গেল রাতের আঁধারে।
​হুট করেই কিছু মানুষের প্রতি আমাদের আবেগ জন্মে যায়। আমরা চাইলেও সেটাকে দমন করতে পারি না। চাইলেও নিজেকে কখনও কখনও আটকানো সম্ভব হয় না। তটিনী কখনো বলেনি এ বিষয়টা কাউকে, এমনকি শাবিহাকেও না। কিছু ব্যাপার থাকে খুব গোপন, একান্ত ব্যক্তিগত। যেগুলো কাউকে বলা যায় না। এ বিষয়টাও তার কাছে তেমনই।
​তটিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হাঁটা দিল বাড়ির ভেতর।

কক্ষে নীরবতা বিরাজমান। চাঁদনীর কাছে বড্ড ভারী লাগলো এই নীরবতা। বুকের উপর লেপ্টে থাকা মানুষটার মনের বিষণ্ণতাই হয়তো গুমোট পরিবেশটাকে আরও বিষিয়ে তুলেছে। নীরবতা ছিন্ন করে চাঁদনী ডাকলো—
​-“আঁধার ভাই।”
​আঁধার চাঁদনীর বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। নিজেকে শান্ত করার জন্য, এর চেয়ে ভালো উপায় বা ব্যতিক্রম কিছু এই মুহূর্তে পায়নি সে। মনের খুব খচখচ করছে ওর। চাঁদনী কে অনেকটা সময় জড়িয়ে ধরে বসেছিলো ও।বিপদ কেটে যাওযার পর, ভয় বেড়ে যাওয়ার সাইন্সটা বুঝতে পারছে না ও। চাঁদনী ঢোক গিলছে বারংবার, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ওর। আঁধার মুখ তুললো না, তাকালো না ওর ভয়ার্ত মুখের দিকে। ওভাবেই বললো—
-“কষ্ট হয়েছে তোর অনেক, তাই না জান?”
-“আমার খুব ভয় লাগছিল জানো! ওরা যদি আমাকে কলঙ্কিত করে দিতো? আমি আমার কলঙ্কিত মুখ তোমাকে কী করে দেখাতাম?”
-“তুই আমার কাছে কখনো কলঙ্কিত হবি না চাঁদনী! বলেছিলাম না তোকে—আকাশের চাঁদের গায়ে কলঙ্ক আছে, কিন্তু আমি আমার চাঁদের গায়ে কোনো কলঙ্ক লাগতে দেবো না।”

-“তুমি আরেকটু দেরি করে এলে আমার কী হতো বলো তো?”
-“তোর কী হতো জানি না! কিন্তু আঁধার শিকদারের আজীবন কারাদণ্ড হতো। ফাঁসিও হতে পারতো।”
​চাঁদনী আঁতকে উঠলো। খানিকটা বিস্ময় আর ভয় নিয়ে বললো
-“কী বলছো এসব? মাথা ঠিক আছে? কিসের সাথে কী?”
-“পান্তা ভাতে ঘি। তিনটে মার্ডার হতো আমার হাতে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একটা খুনেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসি হয়। সেখানে আমি তিন-তিনটে খুন করার পর আমার শাস্তি কী হতো ভাব! তবে আফসোস থাকতো না জানিস। জেলে গেলেও কোনো কষ্ট হতো না।এই ভেবে শান্তি পেতাম যে, আমি আমার চাঁদের অপমানের প্রতিশোধ নিতে পেরেছি। কিন্তু এটা ভেবে কষ্ট হতো যে, তোকে আমি প্রটেক্ট করতে পারলাম না।চাচ্চুকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম না। আফসোস থেকে যেতো, তোকে আর দেখতে পারতাম না, জ্বালাতে পারতাম না। আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো এই ভেবে, যে সংসার করার স্বপ্ন আমি দেখেছিলাম, সেটা আর পূরণ হতো না।”

​চাঁদনীর চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়ালো। আঁধারের বলা কথাগুলো কল্পনায় আসতেই ওর চোখের সামনে সব ভেসে উঠলো। চাঁদনী চোখ বন্ধ করে ফেললো, আঁধারের মাথার ওপর রাখলো নিজের কাঁপা হাত। এতক্ষণে আঁধার মাথা তুলে তাকালো চাঁদনীর দিকে। চাঁদনীর চোখের কার্নিশ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পরছে বালিশে। ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদা ছাড়া আর কিছু ও পারে না। আঁধার নরম হাতে চোখের পানি মুছিয়ে দিলো। বললো
​-“আরে বাবারে, কাঁদছিস কেন? এমন রিয়েক্ট করছিস যেন কালকেই আমার ফাঁসি! মরে যাবো, আর দেখতে পাবি না। আরে খুন তো করিনি পাগলী! করার চান্সও নেই। বড়জোর আধমরা করতে পারি। আচ্ছা যা, একটু একটু শ্বাস নেবে এমন অবস্থা করে ছেড়ে দেবো। প্রমাণ লোপাট করে দিলেই জেল-ফাঁসির চান্স থাকবে না। আমাদের সংসারের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়নি রে চাঁদনী। কাঁদিস না। আছি আমি, সবসময় আছি তোর সাথে।”

রাতের কালো জিপটি, নিস্তব্ধ পরিবেশ ক্ষুণ্ণ করে এসে থামলো থানার সামনে। রাত সতর্ক পায়ে নেমে পড়লো জিপ থেকে; আশেপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরিবেশ পরখ করে নিল। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। থানার ভেতরেও দু-একজন কনস্টেবল ছাড়া আর কেও নেই হয়তো। রাত হাঁটা ধরলো থানার ভেতর, ওর পিছু পিছু সুহাসও পা চালাচ্ছে। সুহাশ বাড়ি থেকে এসেছে আবারো। ওর খুব চিন্তা হচ্ছিলো রাতকে নিয়ে। এভাবে রাত বিরেতে একা ঘোরা ফেরা করা উচিত না ছেলেটার। কোনদিক থেকে বিপদ চলে আসে। এমনিতেই তো শত্রুরা উৎ পেতে আছে রাতের ক্ষতি করার জন্য।বিপদের তো কমতি নেই।

ওরা থানার ভেতর ঢুকতেই, রাতকে দেখে কনস্টেবল দাঁড়িয়ে পড়লো। ওসি নেই।এতো রাতে থাকবেন না, এটাই স্বাভাবিক। সুহাস ইশারা করতেই লকআপের দরজাটা খুলে দেওয়া হলো। রাত ধীর পায়ে গারদের ভেতর ঢুকলো। করাদের ভেতর মোট তিনজন মানুষ। মেঝেতে পরে আছে সবাই। রাত ধীর পায়ে রিকের কাছে গেলো। শার্ট দেখে চিনেছে ও। শার্টের অবস্থা খারাপ, জায়গায় জায়গায় ছিড়ে গেছে লাঠির বারিতে। রাতের, চাঁদনীর ছেঁড়া গাউনটার কথা মনে পরলো। রিকের অবস্থা দেখে খুব শান্তি লাগলো ওর।
​রিক মাটিতে পড়ে আছে, ধুলোয় মাখামাখি অবস্থা ওর। শ্বাস নিচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। কিভাবে যে উত্তম-মধ্যম পরেছে, সেটা ওর অবস্থা দেখে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাত মন্থর গতিতে হাঁটু ভাজ করে মেঝেতে বসলো। রিকের মুখটা মেঝের সাথে লেপ্টে। ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। ওর চুলগুলো মুঠো করে ধরে মুখটা উপরে তুললো, রাত। ঠোঁট কেটে রক্ত ছড়িয়ে গেছে ওর মুখের আশেপাশে। নাক ফেটে রক্ত গড়িয়ে শুকিয়ে লেগে আছে। রাত ক্রুদ্ধ স্বরে বললো—

-“মেয়েটার গায়ে হাত কেন দিয়েছিস? কোন পাকা ধানে মই দিয়েছিল ও তোর?”
রিক নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। আবার চোখজোড়া বন্ধ করে ফেললো। রাত ঝাকালো ওর মুখ।হিসহিসিয়ে বললো
-“বল, কিসের আক্রোশ তুললি? মেয়েটা কি ক্ষতি করেছিলো তোর? শাবিহা করতে বলেছে এসব? না, নিজ থেকে করেছিস? ও জানতো না। বল, চুপ করে থাকিস না।”
রিকের মুখ থেকে কথা বের হয় না। ​রাত বেশ শক্তপোক্ত সোলযুক্ত কেডস পরে এসেছে। আচমকাই, ধুম করে লাথি বসালো ও, রিকের সেন্সিটিভ জায়গা বরাবর। অ*ণ্ডকোষে আঘাত পেতেই মৃত্যু সমান যন্ত্রণা অনুভব করলো রিক। ব্যথায় ককিয়ে উঠলো রিক, কিন্তু শব্দ করার শক্তি পেল না। একই জায়গায় ও দুজনের লাথি খেয়েছে, আবার একটু আগে পুলিশের ডান্ডার বাড়িও পড়েছে পিঠের ওপর। কেউ রহম করেনি একটুও। ওর সাথের দুজনের অবস্থা ওর চেয়েও খারাপ।

​কনস্টেবলের থেকে রাত জানতে পারলো রিকের বাবা উকিল নিয়ে এসেছিল ছেলেকে ছাড়াতে। কিন্তু রাত এতো ধারা দিয়ে মামলা করেছে যে তারা ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। আগে রিককে কোর্টে চালান করা হবে। এরপর আদালত যা বিচার করে। কিন্তু জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে পারলে, বিচারের আশা থাকতো একেবারেই শূণ্য। এখন কেসটা আদালতে উঠলে, ডিসমিস হওয়ার সুযোগ পাবে না। রিকের বাবা এখন সিনিয়র উকিল হায়ার করবে। করুক।পারলে বাংলাদেশের সব উকিল হায়ার করে ফেলুক। রাতও দেখবে কী করে সে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।

বাইরে সকালের আলো ফুটছে। পর্দা গলিয়ে একটু আধটু আলো, ফাঁকফোকর দিয়ে প্রবেশ করছে কেবিনে। সে আলোয়, চাঁদনীর মুখটা মায়াবী লাগছে। নিরীহ একটা বাচ্চা মেয়ে, ট্রমার ওপর ট্রমা পেতে পেতে ভেতরের ক্লান্তি হয়তো মুখের ওপরেও ছাপ ফেলেছে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মেয়েটা চোখ দুটো বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে গেছে। আঁধার গালে হাত রেখে, পাংশুটে মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ও চাঁদনীর চুলে। গায়ের দাগগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দিচ্ছে ওকে। চাঁদনীকে এভাবে জখম করার অধিকার শুধু ওর। চাঁদনীর গায়ে শুধু ওর দেওয়া দাগ থাকবে। কিন্তু সেখানে অন্য কারো পৈশাচিক আচরণের সাক্ষী হয়েছে মেয়েটা, এটাই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। রিককে একবার হাতের নাগালে পাক ও, আঙুল আর দাঁতগুলো হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মেরে মেরে ভাঙবে! জানোয়ার একটা!
​তটিনী সাতসকালে কল করেছে আঁধারকে। আঁধার হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো, এত সকালে তটিনী কেন কল করতে পারে। ফোনটা সন্তর্পণে কানে চেপে ধরতেই, ওপাশ থেকে তটিনী তড়িঘড়ি করে বললো

-“শাবিহাকে কী বলেছিস?”
​আঁধার মুখ বাঁকিয়ে শ্লেষাত্মক হাসলো। তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে বললো
-“কিচ্ছু বলিনি তোর বান্ধবীকে। প্রমাণ ছিল না যে! এমপির বোন বলে কথা। আবার খুব পাওয়ারফুল ফ্যামলির একটা মাত্র মেয়ে। আমি সাধারণ একটা মানুষ, খুব বেশি কীই বা করতে পারতাম?”
-“এভাবে বলছিস?”
-“খুব হতাশ লাগছে রে, তনু! এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। শাবিহা শুধু আমাকে নয়, আমার সাথে জুড়ে থাকা প্রতিটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিসকে ভালোবাসতো। সেখানে চাঁদনী আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, ও জানতো না, তটিনী? ও কেন এমন করলো বলতো?”
-“আঁধার, ও কিছু করেনি।”
-“ওর বন্ধু করেছে তো!”
-“তো বন্ধু করেছে সেটা ওর দোষ? ও কিন্তু আমাদের সাথেই ছিল। আমাদের সাথেই গিয়েছিল চাঁদনীকে খুঁজতে।”
​চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো আঁধারের। দাঁতে দাঁত পিষে বললো

-“অবুঝের মতো কথা বলবি না তটিণী! এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে বলছিস, রিক সব এমনি এমনি করেছে! কারো উস্কানি ছিলো না। শাবিহারই বাড়িতে, শাবিহারই খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড এতো সাহস পাবে না তো কে পাবে? সিসিটিভি ফুটেজ গুলো সব এক টাইমেই বন্ধ হয়ে গেলো?বাগানবাড়ির চাবি রিক আসমান থেকে পেয়েছে? কতোটা সুক্ষ্ম ভাবে কাজ গুলো হয়েছে বুঝতে পারছিস না তুই? না, বুঝতে চায়ছিস না? কোনটা?”
-“পজিটিভ ভাবে ভাব। রিকের, তোর প্রতি আক্রোশ ছিলো। সে, আক্রোশ শাবিহা না বললেও ও যেকোনোভাবে তোর উপর তুলতো। তো এটার প্রমাণ তো প্রমাণও নেই যে আদোও শাবিহা বলেছে কি-না। সিসিটিভি ফুটেচ রিক আর ওর চ্যালাপ্যালারা নষ্ট করতে পারে না? এখানে শাবিহার হেল্প লাগবে কেনো?চাবি জোগাড় করা কি খুব কঠিন কাজ? আর ধরে নে জোগাড় হলো না, লকস্মিথ এনে চাবি ছাড়া দরজা খোলা যায় না? এখানে তো শাবিহার জড়ুত থাকার কোনো পার্ফেক্ট রিজনই দেখছি না আমি।”

-” তুই না দেখলেও, তোর বান্ধবী পরোক্ষভাবে জড়িত। মেনে নে।”
-“এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার।”
-“বাহ! বান্ধবীর কাজকে জাস্টিফাই করছিস? ভালো, ভালো।”

কাজলরেখা পর্ব ৫৩ (২)

তটিনী আরো কিছু বলতে চায়লো। কিন্তু ​আঁধার কল কেটে দিল। ওর ভালো লাগছে না কিছু। এরপর তটিনী নিশ্চয়ই শাবিহার পক্ষে আরও দু-এক লাইন সাফাই গাইবে। কিন্তু সেটা আঁধার শুনতে চাচ্ছে না। আঁধার তাকালো ঘুমন্ত চাঁদনীর দিকে।মেয়েটার দিকে তাকালেই থেকে থেকে বুকটা হাহাকার করে উঠছে ওর। ওর খামখেয়ালি আর দায়িত্বহীনতার আস্ত বহিঃপ্রকাশ, মেয়েটার এভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে থাকা। অপরাধবোধে পুড়ে যাচ্ছে ও। এখন আবার তটিনীর কাছে নানান যুক্তিহীন কথা শুনে, তটিনীকেও বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দিতে চায়ছে না আপাতত। এখন ওর একমাত্র কনসার্ন ওর চাঁদ, শুধু চাঁদ। আঁধার হাত বোলালো চাঁদনীর মাথায়। মনে মনে ভাবলো আরেকটু সকাল হলেই ও চাঁদনীকে নিয়ে যাবে।

কাজলরেখা পর্ব ৫৫

8 COMMENTS

  1. ধন্যবাদ আপু কথাটা রেখেছেন কিন্তু আপু তাড়াতাড়ি বাকি পর্বগুলো দেন না হলে কিন্তু আমি ধন্যবাদ দাও ফিরিয়ে নেবো তাই তাড়াতাড়ি বাকি পর্ব গুলো দেন ☺️

  2. আপু একটা একটা করে কতবার পর্ব দিবেন এর থেকে ভালো না দুই-তিনটা পর্ব একসাথে দিয়ে দিয়েন

  3. আপু আপনি কি আদৌ বেঁচে আছেন 🤨 যদি বেঁচে থাকেন তাহলে দয়া করে বাকি পর্বগুলো দিয়ে দেন 😑

  4. আপু আপনি কি বাকি পর্ব গুলো দিবেন না প্লিজ আপু তাড়াতাড়ি বাকি পর্বগুলো দেন আমাদের একটা ধৈর্য আছে তো

Comments are closed.