কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৫
তন্ময়ী তিতিক্ষা
“এইগুলা করলে প্রেমিকা পটবে তো?”
“হুহ?”
আর্শি সচকিত নয়নে চাইল আযরানের পানে। গাঢ় তমসার আবছা আবছা আলোয় স্পষ্ট দেখতে পারছে না সে আযরানের মুখটা। তবুও চক্ষুদ্বয় পিটপিট করে আযরানের মুখভঙ্গি বুঝার চেষ্টা চালালো। পুনরায় শ্রবণশক্তিতে এসে বারি খেল আযরানের গম্ভীর কন্ঠস্বর,
“বললাম এতক্ষণ যা যা করলাম তাতে প্রেমিকা পটবে নাকি না?”
কিছু সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল আর্শি। যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে কি শুনল। কপাল কুঁচকে গেল তার। আযরানের দিকে প্রশ্নবোধক চাহনি নিক্ষেপ করে বলল,
“কি বললি তুই?”
আযরান এবার হাসল। বৃষ্টির ফোঁটা তার চোখের পাপড়িতে জমে আছে। একহাতে চুলগুলো ঝাঁকিয়ে নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“মুটি তুই বয়রা হলি কবে?”
আযরানের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। আর্শি বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোনোভাবে কি আযরান এইগুলো অভিনয় করছিল? কি অভিনয় বুঝি এত নিখুঁত হয়? কি জানি। এবার পুনরায় দৃষ্টি তাক করল আযরানের পানে। আযরান তারই দিকে তাকিয়ে। ছেলেটার দৃষ্টি সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কেমন যেন নির্লিপ্ত দৃষ্টি! আযরানের দিকে তাকিয়েই আর্শি বলে উঠল,
“তারমানে এতক্ষণ তুই অভিনয় করছিলি আযু?”
“হুম!”
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল আর্শি। অভ্যন্তরে তোলপাড় করতে থাকা সমস্ত প্রশ্নগুলো মূহুর্তে বিদেয় নিল। তবে অন্তস্থলে হওয়া ভূমিকম্পের ন্যায় কম্পন এখনও চলছে। সে সত্যিই ঘাবড়ে গিয়েছিল। আযরানের থেকে এমন কিছু সে কিছুতেই এমন কিছু মানতে পারবে না। দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালাল আর্শি। আযরানের গভীর দৃষ্টির আর্শির পুরো মুখশ্রীতে চলমান। খুঁটে খুঁটে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে সবটা। হুট করে দৃষ্টি স্থির হলো ঠোঁটের কোণে লালচে তিলটার দিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো সেটা। হুট করে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল আযরান। আর্শির ভেজা শরীরের দিকে নজর পড়তেই মুখ শক্ত হয়ে এল আযরানের। চোয়াল শক্ত করে কঠিন কন্ঠে বলে উঠল,
“রুমে যা আর্শি।”
পিলে চমকে উঠল আর্শি। আযরানের দিকে তাকাতেই আবছা আলোয় আযরানের শক্ত মুখটা দেখল। নিমিষেই ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে গেল তার। কপাল কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বলল,
“বৃষ্টি হচ্ছে মন ভরে ভিজে নেই তারপর। তুই যা!”
“আর একটা কথা বললে থাঁপড়ে তোর গাল লাল করে দিবো বেয়াদব! যা এখান থেকে।”
আযরানের ধমকে ব্যথিত হলো আর্শির মন। অভিমান এসে জমল মন কুঠুরিতে। ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ পরক্ষণেই আযরানের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে বলে উঠল,
“তুই বেয়াদব তোর বউ বেয়াদব, শয়তান একটা।”
কথাটুকু বলেই আর্শি তড়িৎবেগে ছাদ ছাড়ল। আযরান তাকিয়ে রইল তার যাওয়ার পানে। গম্ভীর হয়ে এলো মুখশ্রী। বিরবির করে বলে উঠল,
“আসলেই তোর গাল লাল করে দিবো। তবে অন্যভাবে।”
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল আর্শি। ঠান্ডায় তার শরীর অনবরত কাঁপছে। একে তো বৃষ্টিতে ভিজেছে তার ওপর আবার মাতব্বরি করে গোসল করে এসেছে। এতেই শীতে তাকে জড়িয়ে নিয়েছে খুব করে। তালুতে তালু ঘরে কাঁপতে কাঁপতে আয়নায় সামনে এসে বসল। আরশিতে নিজেকে একবার দেখে নিল মনোযোগ দিয়ে। কিছু একটা শূন্য শূন্য লাগছে। কিন্তু সেটা কি? বুঝল না আর্শি। পুনরায় গভীর নয়নে তাকাল আয়নার ওপারে থাকা নিজের বদনের পানে। সে কি খুব বেশি মোটা হয়ে গেছে? কি জানি হয়তো। সে জন্যই তো ছোট মা তাকে এত কথা শোনায়। তবে আগে সে মোটা কখনোই ছিল না। অন্য মেয়েদের মতোই ছিল চিকন গড়নের। তারপর…! হুট করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্শি। নিজের দিকে তাকিয়েই বিরবির করল,
“তুই মোটা হয়ে একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে রে আর্শি। মানুষের রুপ গুলো অন্তর চিনে ফেলেছিস। কতজন ভালোবাসা দেখালো। কিন্তু এখন হিসেব করলে ভালোবাসার খাতাটা একদম শূন্য।”
বুক চিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল মেয়েটার। হাইপোথাইরয়েডিজম এর কারনে হুট করেই তার ওজনটা বেড়ে গেছে। চাইলেও সে চিকিৎসা নিতে পারছে না। কিভাবেই বা চিকিৎসা করবে? আছেই বা কে তার? কেউ তো জানেই না তার ওজন বাঁড়ার কারন। শুধু সেই জানে। আর কেউ না। কারো জানারও প্রয়োজন নেই। কোনোদিন যদি মারাও যায় তাও কাউকে বলবে না। চক্ষুদ্বয় মূহুর্তে অশ্রুতে পরিপূর্ণ হলো আর্শির। মুখখানা মলিন হয়ে গেছে তৎক্ষনাৎ। সকলের প্রতি একরাশ অভিমান আর অভিযোগ বুকে চাপা দিয়ে রেখেছে সে। না আছে অভিমান দেখার মতো কেউ আর না আছে অভিযোগ করার মতো কোনো মানুষ। নিজের ভাবনার মাঝেই হুট করে নোমান নামক মানুষটার কথা মাথা চলে এলো। মূহুর্তে খুশিতে ভরে উঠল মুখশ্রী। দেরি না করে তড়িৎ বেগে উঠে দাঁড়াল। ফোন খুঁজতে লাগল হন্য হয়ে। সে যে ঢাকায় আসছে কথাটা নোমানকে জানাতে হবে তো নাকি। দেরিনা করে কল লাগালো নোমানের নাম্বারে। কয়েকবার রিং হয়ে কেটে গেল। তবে কেউ রিসিভ করল না। নিমিষেই মনটা খারাপ হয়ে গেল আর্শির। টলমলে আঁখিদ্বয় নিক্ষেপ করল মোবাইলের দিকে। আপনমনে আওড়াল,
“আমার বেলাতেই কেন তোমার এত অবহেলা নোমান?”
আর্শির চক্ষুকোণ ভিজে উঠেছে। কন্ঠে কাতরতা। হুট করে চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরতে শুরু করল নেত্রপল্লব বেয়ে। দু’চোখের পাতা এক করে বলে উঠল,
“আমার জীবনে কেন সুখ এসে ধরা দেয় না? কেন সকলের অবহেলায় নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়? এই জীবন রেখে কি লাভ…. যেখানে দুঃখের বোঝা বইতে বইতে নিঃস্ব হতে হয়?
হুট করে মাথায় কিছু খেলে যেতেই মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠল আর্শির। চক্ষুদ্বয় তড়িঘড়ি করে মুছে নিল দু’হাতে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল মন। আনমনে বিরবির করে বলে উঠল,
“কালকে ঢাকায় গিয়ে নোমানকে একদম চমকে দিব। নিশ্চয়ই নোমান খুশি হবে অনেক।”
রাত্রি কাটিয়ে প্রকৃতি সতেজতার রূপে সেঁজে উঠেছে। রাত থেকে হওয়া তুমুল বর্ষণ নিজের তেজী রূপ কমিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ পূর্বে। টেবিলে খাবার সাজিয়ে চলেছে আর্শি। মাথায় মেরুন রঙের ওড়না দিয়ে ঘোমটা টানা। একফালি চুল এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে গালের একাংশকে। সেদিকে মনোযোগ নেই মেয়েটার। মন দিয়ে টেবিল গুছাতে ব্যস্ত সে। আযরান সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছিল। আকস্মিক আর্শির দিকে নজর পড়তেই পদযুগল থমকে গেল তার। শরীর জুঁড়ে বয়ে গেল এক শীতল স্রোত। ঘোমটার কারনে মেয়েটাকে কেমন বউ বউ লাগছে। আযরানের ঠোঁটের কার্নিশে সামান্য হাসির রেখা দেখা দিল। পরক্ষণেই হাসি সরিয়ে নিজেকে গম্ভীর্যতায় আবদ্ধ করে নিল। নামতে নামতেই আর্শির উদ্দেশ্যে বলে উঠল
“বিয়ের ফুল বোধহয় খুব শীঘ্রই ফুটবে রে মুটি।”
অকস্মাৎ এহেন বাক্যে আর্শি চক্ষুদ্বয় বড় বড় করে চাইল আযরানের দিকে। নির্বাকতায় কয়েকমূহুর্ত কাটিয়ে দিল আর্শি। পরক্ষণেই মিনমিন করে বলে উঠল,
“কার বিয়ের ফুল?”
দূর্বোধ্য হাসল আযরান। পিনপতন নিরবতা বিরাজমান দুজনের মাঝে। আযরান চেয়ার টেনে বসল। চেয়ার হাতলে হাত রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
“আমার আর তোর….”
চোখ কপালে ঠেকেছে আর্শি। চক্ষুদ্বয় বড় বড় করে তাকাল আযরানের দিকে। আযরান থেমে গেল। আর্শির দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকাল। পরক্ষণেই বলে উঠল,
“আমার আর তোর ভাবির কথা বলেছি। চোখ এমন হাঁসের ডিমের মতো করে তাকাস কেন? তোকে বিয়ে করবো বলছি আমি? মুটি একটা। এক থাপ্পড় দিবো বিয়ের সখ মিটে যাবে।”
হতভম্ব আর্শি। হতবাক তার দৃষ্টি। সে কিছু বললও না আর এই ছেলে তাকে কতগুলো কথা শুনিয়ে দিল। রাগের নাক ফুলে উঠল আর্শির। এই ছেলেটা অযৌক্তিক কথায় একদম একশতে একশ। আর্শি কিছু বলল না। মুখ ঘুরিয়ে নিজের কাজে মনোযোগী হল। ততক্ষণে সকলে এসে হাজির হলো ডাইনিং টেবিলে। আজ শাহাদাত হায়দার নেই। সকাল সকাল অফিস চলে যান তিনি। আর্শির মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরই আযরানের সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। যাওয়ার আগে কি একবার বাবার দেখা পাবে না? উত্তপ্ত, সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস অন্তরিক্ষের তলে বিসর্জন দিল। দিনা হায়দার এসেই বিরক্ত হলেন। রাগান্বিত স্বরে আর্শির উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“কিসব নাস্তা বানিয়েছিস এইগুলা? ভালো মন্দ কিছু বানাতে পারিসনি? ছেলেটা চলে যাবে আজ। এইসব খায়িয়ে পাঠাবো?”
সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলল আর্শি। খুব থেকে উঠতে লেট হয়ে গেছে বিধায় তেমন কিছু করতে পারেনি। নাহলে তারও ইচ্ছা ছিল ভালোমন্দ রান্না করার। দিনা হায়দার পুনরায় চেঁচাল।
“সং এর মতো দাঁড়িয়ে না থেকে যা কিছু রান্না করে নিয়ে আয়।”
“আর কিছু লাগবে না চাচীমা। এইগুলো আমার পছন্দের খাবার।”
আযরানের গম্ভীর কন্ঠে দিনা হায়দারের মুখ যেন ভোতা হয়ে গেল। দিনা হায়দার শুষ্ক ঠোঁটযুগল জিহ্বার সাহায্যে ভিজিয়ে নিল। কিছুটা নিচু স্বরে বলে উঠল,
“তা কি করে হয় বাবা। তোমাকে না খাইয়ে কিছুতেই যেতে দিবো না।”
এইটুকু বলেই থামলেন দিনা হায়দার। পরক্ষণেই আর্শির দিকে তাকালেন চোখ কটমট। চক্ষুদ্বয় পাঁকিয়ে বলে উঠল,
“কিরে তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন যা।”
সূক্ষ্ম ঢোক গিলল আর্শি। শরীরটা সকাল থেকেই দূর্বল লাগছে তার। এইটুকু রান্না করতেই বহু কষ্ট হয়েছে। এখন আবার রান্না করতে হবে? আর্শির মুখ শুকিয়ে এল। ভয়ে ভয়ে মলিন মুখে বলে উঠল,
“আম..আমার শরীরটা ভালো লাগছে না আজকে ছোটমা। সকাল থেকেই খা..রাপ লাগছে।”
মূহুর্তে তেঁতে উঠল দিনা হায়দার। ক্রোধে ফেঁটে পড়ল। তেড়ে গেল আর্শির দিকে। হাত তুলল থাপ্পড় দেওয়ার উদ্দেশ্যে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“আমার মুখে মুখে তর্ক করিস। তোকে তো..”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৪
আর্শি ভয়ে শিউরে উঠল। চক্ষুদ্বয় খিঁচে বন্ধ করে ফেলল মুহুর্তে। চক্ষুকোণে অশ্রু এসে ভীরল। মনের দিক থেকে মেয়েটা বেশ দূর্বল। অল্পেই ঘাবড়ে যায়। কেটে যায় বেশ খানিকটা সময়। কিন্তু কোনোকিছু অনুভব না করে কিছুটা অবাক হল আর্শি। চক্ষুদ্বয় পিটপিট করে মেলে ধরতেই নজরে এল বলিষ্ট লম্বা চওড়া দেহ। ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর্শি হতভম্ব। অবাক হল বেশ। আযরান দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার সামনে। আযরানের গম্ভীর চক্ষুদ্বয় স্থির দিনা হায়দারের পানে। চোয়াল পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে আছে। হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“আপনার ভাগ্য ভালো আপনি সম্পর্কে আমার চাচী। নাহলে অন্যকেউ হলে এই দুঃসাহস করার হিসেব আমি কড়ায় গন্ডায় তুলতাম।”
