কালকুঠুরি বোনাস পর্ব
sumona khatun mollika
বাসের মধ্যে বিরক্তি আটা চেহারায় বসে আছে সামির। পাশে কাশেম। পিচঢালা রাস্তার কোলাহলপূর্ণ ঢাকার বুক দিয়ে বাস চলেছে তার গন্তব্য ঢাকা স্কুল এন্ড কলেজের দিকে। ক্লাসে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিলনা সামিরের। রানিং ২টো গার্লফ্রেন্ড সমানে কল দিয়ে যাচ্ছে । ফোন ধরে জবাব করতে হিমশিম খাচ্ছে কাশেম। ব্যাপারটা এমন,, বড় অফিসার ব্যাস্ত তাই তার এসিস্টেন্ট সার্ভিস দিয়ে বেরাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে ফোনটাই সুইচটপ করে দিল কাশেম। কাশেম জিজ্ঞেস করল, যেখানেই যাক সামিরের এতগুলো করে গার্লফ্রেন্ড বানানোর রহস্য কি! সামির ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দিল,,
“ তুই তো পদ্মায় ভাইশসা আসা কাইশসা,, বুঝবি কেমনে? আমি বুঝায়া কই। এক নারীকে ভালোবেসে মারা খাওয়ার চে সব নারীকে ভালোবাসা উত্তম। “
কাশেম বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো।
বাস থেকে নেমে কলেজ প্রাঙ্গনে হাটা দিল৷ সে তো কখনো নিজের ব্যাগ বয় না। কাশেমকেই দুটো ব্যাগ একসাথে বইতে হয়। একটা সামনে ঝুলিয়ে নেয়। আরেকটা পেছনে।
কলেজের প্রিন্সিপাল পাভেল শিকদার তাকে ডেকে পাঠালেন। কাশেমও পিছু পিছু চলল। দড়জার কাছে দাড়িয়ে রইল সে। আর সামির বেয়াদবটা পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি জন্য একাই গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। পাভেল শিকদার চোখের চশমা এঁটে জিজ্ঞাসা করলেন,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ তুমি? ইন্টার ফাস্টের সাইন্সের রোল ২১৮? “
“ হু “
পাভেল শিকদার বড় করে দম ফেলে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। সামির ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করল,,
“ দেখছেন স্যার, আমার বাঙ্গিমারা রূপের ঝলক এতই ঝলমলে যে আপনার চশমাই পরতে হবেনা। “
পাভেল শিকদার মাথা নেড়ে সায় জানালেন। ধির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,,
“ নাম কি তোমার? “
“ নাম দিয়া কাম কি? আমার নাম সামির বাঙ্গি “
“ সবাই তোমাকে বাঙ্গি বলে ডাকে? “
“ উহু “
“ তবে? “
“ কি যায় আসে! বেডিরা বলে আশিকওয়ালা বেডারা বলে ফোরটুয়েন্টি “
“ বড্ড হারামি তুই বাপ! তোর মতো বখাটে জীবনে একটাই দেখেছিলাম। তাও তোর মতো এত ঘাড়ত্যাড়া না “
“ জ্বি জ্বি শুকরিয়া “
“ কমার্সের শাহিন কে ধরে পেদিয়েছিস কেন? “
“ হাত চুলকাচ্ছিল স্যার”
পাভেল শিকদার সামিরের দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
“ তুই এত্ত ঘাড়ত্যাড়া কেন? “
“ আসলে পয়দার সময় দাইমা ঘাড়টা একটু ভুল এঙ্গেলে টান মেরেছিল । তাই আরকি ত্যাড়া হয়ে গেছে !! “
পাভেল শিকদার হা করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। কানন ছিল এক ঘাড়ত্যাড়া যার সাথে কথা বলে তিনি হাপিয়ে উঠতেন। অনেক বছর পর আজ সামিরকে পেয়েছেন আরেক ত্যাড়া যার সাথে কথা বলে তিনি পদে পদে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছেন। খাতা বের করে তিনি একটা পেন হাতে নিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করলেন,,
“ তোর নাম বল, পুরো নাম “
“ সিকান্দার ! সামির সিকান্দার ভিরান “
“ হুমম ভিরান! বেশ আপডেট নাম। কে রেখেছে?”
“ মনে হয় বাঙ্গিমাতা ! “
“ গুড। এই পেপারে তোর বাপের সাইন নিয়াসবি। এবারে একটু লম্বা করে তোকে দুই মাসের লম্বা শীতের ছুটি দিলাম “
“ জ্বি অনেক ধন্যবাদ । “
কাগজটা নিয়ে সামির বেরিয়ে গেল । আবারো সাসপেন্ডেড। কাশেম ব্যাগে কাগজটা রেখে সামিরকে জিজ্ঞেস করল,,
“ আপনে টপার কেমনে হন ভাই? বছরের বারো মাসের তেরো মাসই তো সাসপেন্ডে থাকেন। “
“ এর জন্যই আমি ইউনিক বাঙ্গি। টিকিট কাট কাইল সকাল হতেই নিজের ক্ষেতে ফেরত যাব “
“ আচ্ছা ,, এইইই! যা “
কাশেম বলতে বলতেই সামির সামনে কালো শার্ট পরিহিত একজনের সাথে ধাক্কা খেল। শক্তপোক্ত দুই দেহে বাড়ি লেগে দুজনেরই সমান আঘাত লেগেছে। সামির বিরক্তি তে বলে উঠল,,
“ এই বাঙ্গি দেখে চলতে পারিস না! “
সামনের লোকটা পরে যাওয়া বই দুটো তুলল। একাদশ দ্বাদশের হিসাব বিজ্ঞানের বই। সামির ভ্রু কুচিয়ে দেখল তাকে। পড়নে কালো শার্ট, হাতে ঘড়ি, চুলগুলো সরু গোছালো। সামির তুলনায় অনেক ফর্সা। বিদেশিদের মতো সুন্দর । সামির ঝট করে কাশেমের শার্ট টেনে কানে কানে জিজ্ঞেস করল,,
“ এই বিদেশি ফ্লেভারের দেশি মাল টা কে বে ? “
“ সানান শাহরিয়ার কানন।কমার্সের নতুন লেকচারার। আরে এর ক্লাস করতেই তো সাইন্সের বেডিরাও চইলে যায় হিসাববিজ্ঞান ক্লাসে “
কানন বইটা তুলে সামিরের দিকে তাকালো। সামির বুঝলো এটাই তার আদি যুগের ঘাড়ত্যাড়া ভার্সন। যেটার কথা একটু আগে প্রিন্সিপাল বলছিল। তবে লোকটা সামিরের মতো চঞ্চল না। গম্ভীর । চেহারা দেখলেই বোঝা যায় । সে নিজেই জিজ্ঞেস করল,,
“ কে তুমি? “
“ ড্রেস দেখে বুঝতেছেন না? “
“ সামির!, আর্স না কমার্স? “
“ সাইন্স “
সাইন্স কথাটা যেন একটু অহংকার নিয়েই বলল সামির। কানন তাকে আপাদমস্তক দেখে বলল,,
“ নাম সিকান্দার কিন্তু গলায় ক্রস? খ্রিস্টান নাকি?”
“ উহু। মাই স্টাইল। “”
সামির এবার গা দুলিয়ে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে,,
“ আপনি সত্যি টিচার? । এরকম কচি টিচার আগে কখনো দেখিনি “
“ চোখ ভরে দেখে নাও। “
সামির ভেবেছিল অন্য দের মতো দুএকটা জ্ঞান বাণী দেবে। কিন্তু তার কিছুই হোলোনা। কানন তার গম্ভীর চেহারা দিয়ে ম্যাচ ড্র করে দিল। কেমিস্ট্রির স্যার দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেলেন। সামিরকে কাননের পরিচয় দিলে সামির বলে,,
“ এত টেলেন্ট হয়ে লাভ কি? সেইতো কমার্সসসস! “
স্যার বললেন,,
“ ওর বাবা জোর না করলে ও সাইন্সেই থাকতো। এবং তোমারচে ভালো স্টুডেন্ট ও। “
“ এসব ঢপ অন্য জায়গায় দিয়েন। যতই কন চশমা পরা বেডিরা কিউট, তো কি, কানা তো কানাই। “
কাশেম আবারো হিসাব কষতে শুরু করল এর মধ্যে চশমা পরা মেয়ে কে কেন টানলো সামির ভাই! কানন কোনো জবাব দিল না। চুপটি করে রইল। তার এমন গা ছাড়া ভাবটা সামিরের পছন্দ হোলোনা। কাশেম আর সে ওখান থেকে বেরিয়ে গেল। কানন কেমিস্ট্রির টিচারকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ এ আবার কেমন জিনিস স্যার? “
“ তুমি স্কুলে যেমন ছিলে, তার আপডেট ভার্সন বাবা। “
“ পড়াশোনা ? “
“ সামিরের? টপার স্টুডেন্ট ও। হাতের লেখা দেখলে চোখ ছানাবড়া হবে৷ এতই সুন্দর ওর হাতের লেখা। ক্লাসে সব ভুলভাল জবাব দেয় । পরীক্ষায় সবার আগে খাতা জমা দেয় । কিন্তু কেও ওকে টপকাতে পারেনা। নিরানব্বই এর কম কোনো সাবজেক্টে পায়নি কখনো। আবার শয়তানিতেও দেখবে সেরা। মারপিট, লাইন, কথা সবকিছুতেই এক্সপার্ট “
কানন মাথা নাড়ালো। তারপর স্যারের সাথে কথা বলতে বলতে চলে গেল।
ঝকঝকাঝক আওয়াজ থামিয়ে ট্রেন দাড়ালো রাজশাহী স্টেশনে৷ রনি সহ আরো কজন জনগণ এসেছে ওদের নিতে । ট্রেন থেকে নামতেই তার গলায় পনেরোটার মতো মালা পরালো ছেলেরা। মালার প্রস্হে ঢেকে গেল সামিরের চেহারা। পাবলিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে আর ভাবছে কোনো বড় নেতা ফেতা হবে হয়ত। সামির কিছু বলার আগেই রনি চেচিয়ে উঠলো,,
“ ১২ নাম্বার মাসে ১৪ নাম্বার সাসপেনশনের শুভেচ্ছা ভাই , জয় বাঙ্গি “
সামির ভাষণ দেয়ার মতো হাত উচিয়ে চেচিয়ে চেচিয়ে বলল,,
“ এ বাঙ্গির নাতিরা,, শুকরিয়া ,, শুকরিয়া রে শুকরিয়া ,শুয়োরগুলা শুকরিয়া , তোরে শুকরিয়া, তরেও শুকরিয়া”
সবাই হাসাহাসি করে স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল। গাড়িতে বসতে রনি রাজশাহীর ভাষায় জিজ্ঞেস করল,,
“ এবারে কি কইরা সাসপেন্ড হইলেন ভাই? “
সামির সানগ্লাস তুলে মস্করা করে গাইতে লাগলো,,
“ দিলপে পাথ্থার রাখকে
বাঙ্গি মারপিট কারলিয়া,,,
হায়েেে
জয় বাংলা কইয়া প্রিন্সিপাল
সাসপেন্ড মার দিয়া । “
রনি দুইদিকে ঘাড় নাড়িয়ে হাসলো। কাশেমও আওয়াজ করে হাসলো তবে পরক্ষণেই যখন মনে পরল সাফিনের কথা কাশেম পেছনে বসেই বলল,,
“ এত কুইদেন না ভাই। সাফিন ভাই কোবাইবো”
“ দেইখে লিব “
বাড়ি ফেরার পর সামির সোজা বাড়ির পেছনে বাগানে। শিষ বাজাতেই ছুটে এলো ছোট এক কুকুরছানা । এইতো এক মাস আগে যখন ছয়দিনের সাসপেন্ড হয়ে এসেছিল,, তখন সাফিন একটা কাজে পাঠিয়েছিল। কাজ থেকে ফেরার সময় কুকুরছানাটাকে আহত দেখে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল । ইনায়া যত্ন করে সুস্থ করেছে।
সামির তাকে দুবেলা খাবার দিতো। মাত্র ৬ দিনেই কুকুরটা তার বেশ ভক্ত হয়ে যায় । শিষ বাজাতেই সাড়া দেয়৷ ইশারায় ডাকলে কাছে এসে লেজ নাড়ায়। সামির ওর রকেটের মতো গতি দেখে নাম দিয়েছিল রিটো।।
সামিরের ডাকে সাড়া দিয়ে রিটো তার চারপাশে ঘুরতে লাগলো। সামির একটা পাউরুটি ছুড়ে দিয়ে বলল,,
“ কি অবস্থা রিটো বাঙ্গি? “
উত্তর এলো ভাউ ভাউ! সামির দাঁত কেলিয়ে হাসলো। হাত ঝেড়ে বাড়ির ভেতরে যেতে সামনে পড়লো সিয়াম সিকান্দার। সিয়াম ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ আবার! দয়াল জানে তুই শান্তি কবে দিবি! “
“ কোনোদিনও না “
সামির নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। পুরুষালি ডাকে ঘাড় ফেরালো। সাফিন আর সালার সিকান্দার দাড়িয়ে । সাফিন জিজ্ঞেস করল,,
“ আবার সাসপেন্ড? “
“ হুউ! “
“ কাকে ধুয়েছিস? “
“ কমার্সের এক আবুল বাঙ্গি কে “
“ এটাই তোর শেষ সুযোগ । অনার্সে ওঠার আগে আর যদি একবারো রিপোর্ট আসে! তাহলে তোর একদিন আর আমার যতদিন লাগে “
সামির কথা কানেই তোলেনা। নিজের ঘরে চলে যায় । রাতের বেলা কাশেম, রনি, লেমন আরো কয়েকজন সিনিয়র, জুনিয়র ছেলেরা সামিরকে
ডাতে যায় । রনির বুদ্ধি তে কাশেম সামিরকে ক্লোরোফোর্ম শুকিয়ে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় । যথারিতী সে চিৎকার চেঁচামেচি করে গালাগালি. শুরু করে। ।। মোমবাতি হাতে এগিয়ে আসে এক মেয়ে । সামির চেনে তাকে। সোমা। সোমা এগিয়ে গিয়ে সামিরের সামনে উবু হয়ে বলে,,
“ মোমটাও গলে যাচ্ছে সামির জান্স, তুই শুধু গলছিস না,,, আমার সিরিয়াল কয় নাম্বারে? “
সামির বাম গাল টেনে হাসে। এতক্ষণে মেজাজ ঠান্ডা হয়। সোমা চোখের ইশারা করলে সামির ঠোঁট টা ভিজিয়ে আবার গান শুরু করে ,,
যেমন কোনো বাঙ্গি ক্ষেতে
মুলে ভুলেও ফলবেনা
লুঙ্গি ধরে টান মারিলেও জাইঙ্গা
আমার খুলবে নাআ,,
তেমন তোমার জন্য বাঙ্গির মন কখনো
গলবে না।।
সোমা চোখ উল্টে বলে,, শালার হারামজাদা!
“ সর বাল, আমার নষ্ট বেডিতে এলার্জি আছে! “
তাদের কথোপকথন এর মাঝেই ধাম করে আওয়াজ হলো। চারপাশে আলোকিত হলে সামির দেখলো চারপাশে অনেক জনগন। কাশেম, রনি, রকি, রুবায়েদ, রাফিদ, লেমন, শায়লা, সোমা, রানি, রাহিনা, বিনু, সাদাত আরো কজন।।। চারপাশ সাজানো, মাঝখানে একটা বড় টেবিলে কেক রাখা। ।
কাশেম, রনি, লিমন, সবাই দৌড়ে গিয়ে উইশ করল হ্যাপি বার্থডে ভাইজান,,,, ।!
সামির গাল টেনে একটু হাসলো। খুব একটা চকিত হয়নি৷ বরাবরি ছেলেরা ছোট থেকে এভাবেই তার জন্মদিন পালন করে। আশা করত একটাবার সালার সিকান্দার যদি মন থেকে কোনোদিন উইশ করত! করবে না। অবৈধ বাচ্চাকে আবার জন্মদিনের উইশ! সাফিনও ভুলে যায় মাঝেমাঝে। ইনায়ার তো খবরই থাকেনা। সিয়ামের মনে থাকে। সে গিফটও দেয় । কিন্তু তাতেও সামিরের মন ভরেনা। রাত ১২ টা বাজে প্রায়। সামির টেবিলের সামনে দাড়িয়ে দেখল এবারে একটা ভিন্নতা আছে। ।। সিনিয়র আদম ভাই মাথায় টুপি পরিয়ে দিল। ।।
শায়লা ছবি তুলে বলল ,,
” আরেব বাস!! লাল শার্ট আর বার্থডে ক্যাপে তো তোকে বেবি বেবি লাগছে বে সামির! ”
কেকের দিকে তাকিয়ে সামির অবাক হয়ে বলল,, ” এটা কি? ”
কাশেম আর রকি বলে উঠলো,, ” বাঙ্গিইই! ”
শায়লা বলল,, ” তুইতো বাঙ্গি ছাড়া কথাই বুলিসনা। এই সিজনে বাঙ্গি পাবো কই! তাই বাঙ্গি ডিজাইন কেক কাস্টমাইজ করাইছি। জোস হইছে না? ”
সামির বলল,, ” এক্কের বাঙ্গিমারা হইছে ”
সকলে হোহো করে হেসে কেক কাটলো। এটা শায়লাদের বাড়ি। বাড়িতে শুধু ওর মা যে কালকুঠুরির ন’রী আর শায়লা একাই থাকে। কেক কাটাকাটি করে কাশেমকে কেক খাওয়ানোর সময় সামির বলে,,
” তর খুব জানার ইচ্ছে না? আমি না পইড়াও টপার কেনে? ”
” হ ভাই ”
” কারণ আমি মহান বুদ্ধিজীবী দিবসে পয়দা হইছি। আইজ কত তারিখ? ”
” ১৪ ডিসেম্বর ! ”
” বুদ্ধিজীবী দিবস কবে? ”
” ১৪ ই ডিসেম্বর ”
” তাইলে আমি কি? ”
” আমাগো বুদ্ধিজীবী ভাই”
সাবাশ বাঙ্গি ” বলেই সামির সহ সকলে ছাদে গেল।। এবারে ওর ১৮ বছর পূরণ হয়েছে তাই সবার মনে একটু বেশিই ফুর্তি। । ছাদে সবাই একের পর এক আতশবাজি ফোটাচ্ছিল। সামিরও তাদের সঙ্গ দিচ্ছিল । তবে হুট করে তার চোখ যায় ,, চোখ বরাবর দাড়িয়ে থাকা বিল্ডিং টা এডভোকেট মীর মেহেদী উদ্দিন এর। সকল খোঁজ খবর রাখে সামির। । জানালারফাক দিয়ে টিপটিপ আলো দেখা যাচ্ছে। টেবিলে বসে আছে একটা মেয়ে । হয়ত পড়ছে। সামির কিছুক্ষণ হা করে দাড়িয়ে রইলো। বাড়ি ফেরার সময় কাশেমকে আগে পাঠিয়ে দিল । তারপর করলোকি,,
দেয়াল আর বারান্দা টপকে ওই ঘরে গিয়ে দেখলো, মেয়ে টা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছে। সামির তার মুখের ওপরের চুলগুলো অতি সাবধানে সরিয়ে দিল।
মুখে মিচকি হাসি দেখা দিল সামিরের। মেয়ে টা নিঘোরে ঘুমাচ্ছে । ফর্সারাঙা চেহারা সামান্য জোড়া ভুরু। সুচিকন ঠোঁট । দেখার মতো সুন্দর । খাতায় নাম লেখা,, মাহাদিবা ফারনাজ ।
সামির গাল টেনে হাসলো। না সত্যি এবার তার জন্মদিনটা স্পেশাল ছিল।
ফেরত যাবার সময় কি মনে করে আবার ঘুরে এলো। আস্তে করে অতি সাবধানে মেয়েটার গালে ঠুস করে একটা চুমু বসিয়ে পালিয়ে গেল। মেয়ে টা হয়ত জানলোনা। কেও তাকে চুমু খেয়ে চলে গেছে।
বাড়ি ফিরে আর ঘরে মন টেকেনি সামিরের। হাতে একটা বিয়ারের বোতল আর গিটার নিয়ে ছাদে চলে গেল সে। ইনায়া দেখতে পেয়ে ছুটলো পেছন পেছন। কিন্তু কাছে গেলনা৷ সামির মানা করেছে অকারণে তার সাথে ঢলাঢলি না করতে। ইনায়ার পেছনে ছুটার কারণ সামিরের হাতে গিটার দেখে। সামিরের কণ্ঠে গান বড় ভালো লাগে ওর। তাই যখনি দেখে সামির ছাদে যাচ্ছে , চিলেকোঠায় দাড়িয়ে গান শোনে।
আজ সামির বিয়ারের বোতলটা খুলে না খেয়েই গুটারে দুটো টান মারলো। মনে মনে আওড়ালো,,
” ও হে পানির মতো সুন্দরী নারীটি,,
তুমহে দেখ কার হি যাব নেশা চাড় যাতি হে
তো ইস দারুকা কিয়া কারু! ”
বোতলটা পাশে রেখে সামির গিটার হাতে তুলে নিল। গলার লকেটটাতে চুমু খেয়ে বলল,,
” আজ আসলেই হ্যাপি বার্থডে রে বাঙ্গিমারা জিন্দেগী! ”
টুংটাং করে হৃদয়ে ঝড় তুলে সুর তুলল,,
~ inpe meraa haq nehi bantaaa
Aaa aa aa
Hall yea dil tujhko sunata
Dil agar iye bol pata
Ba khuda tujhkohi jatta jaan
Tere sang jo paal bitata
Waqt se me woo mang lata
Iyaad karke muskurataa haa
,,…….
আকাশে বাতাসে বাড়ি খেতে লাগল সামিরের কণ্ঠস্বর মনটা তার আজ আসলেই ভালো। একটা হ্যাপি ডে,,, হ্যাপি বার্থডে!! নিজেই নিজেকে বলতে লাগলো,,
” Happy birthday samir sikander! Happy birthday Birthday , অবৈধ হারামজাদা!
অপ্রীয় সামির সিকান্দার ,,,
আপনার নামটা জানার জন্য অনেককে জ্বালিয়েছি৷ কলেজে গিয়ে প্রথম দিন আপনি আমায় বলেছিলেন,, এই বেডি, নতুন এসছো? আমি আস্তে করে মাথা নেড়ে হ্যা জানালাম। আপনি আমাকে দিয়ে ময়লা তুলিয়ে নিয়েছিলেন। আপনাকে দেখে ভয় লেগেছিল। সেদিন আপনার পড়নে ছিল একটা লাল শার্ট আর প্যান্ট৷ গলার ক্রসের লকেটটা ঝলমল করছিল সোনালী রোদে৷ সেদিন আপনি কলেজের নবীন বরণে গান গেয়েছিলেন ৷ বুঝলাম,, আপনি বখাটে টাইপ হলেও গুণী মানুষ৷ আপনার বন্ধুকে শাইয়ার বেটা বলে যখন গালি দিচ্ছিলেন, আমি আর বান্ধবীর দল অডিটরিয়ামে বসে, ওটা নিয়ে হাসাহাসি করছিলাম।
বলা বাহুল্য প্রথমদেখাতেই আমার আপনাকে বড্ড বিরক্ত লেগেছিল। তার কারণ আপনার ছন্নছাড়া ভাব। টিচাররাও শোনাতো, আপনি নাকি হেবি হারামি! ৩০টার ওপরে গার্লফ্রেন্ড আপনার! এরকম একটা ছেলে কে আমার পাঠিকারা কেন পছন্দ করে জানিনা। আমি কিন্তু আপনাকে আমার অরুচি থেকে লিখেছি। আপনাকে ঠিক লেখিনি৷ তবে আপনার মতোই চরিত্র । বখাটে, গালিবাজ ট্যালেন্টেড এক ছন্নছাড়া লোক। আপনার জীবনকাহিনী শুনেছি আপনার বন্ধু, আমার বান্ধবীর বয়ফ্রেন্ড রাজিব ভাইয়ের থেকে। আপনি নাকি ছোটবেলায় মা হারিয়েছেন । আপনার চাচাতো বোনটা বিধবা। এবং আপনি একটা পুলিশি কেসে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । কি কেস সেটা রাজিব ভাইয়া বলেননি। উল্টে আর জিজ্ঞেস করিনি। তারপর একদিন টি বাঁধ এ হঠাৎ দেখা৷ সেদিন সঙ্গে ইতিও ছিল৷ আপনি আমার পরিচয় দিলে ইতি আমাকে আন্টি বলে ডেকেছিল৷ তখন ওই মুহূর্তে মনে ভাসতো,, হায় আল্লাহ,, যাক যাক পার হয়ে যাক। কি করব! আপনাকে তখন আমি জমের মতো ভয় পেতাম।
কিন্তু সেদিন ওই ফকিন্নি বাচ্চাটাকে যখন ১০০ টাকাটাই দিয়ে দিলেন, বুঝলাম আপনার মন টা অতটাও খারাপ না। সঙ্গে পুরোনো নোটবুক আর পেন ছিল। লিখে রাখ লাম একটা প্লট। ধিরে ধিরে সাজালাম মন মতো! আপনার ওপরে ক্রাশ খাইনি। তবে আপনাকে একটু যদি মডিফাই করা যেত তবে হয়ত আপনার ওপরে ক্রাশ খাইতাম। আপনার কথা বলার ধরণটা কিন্তু খুবই ফানি। আমি যে আপনাকে কলমের কালিতে লিখব, বইয়ের পাতায় আনবো। এসব তো কিছু প্ল্যান ছিলনা। কলেজের মতো এখানেও আপনি সবার ক্রাশ বাঁশ হয়ে গেলেন। আপনাকে ক্রাশ বানাতে পারলামনা জাস্ট আমি। আপনার থেকে একটা জিনিস জানা হলোনা।বাঙ্গির নাতি মানেটা কি? তার আগেই আপনি কলেজ ত্যাগ করলেন । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হোলো। কমসম ব্যাপার নয়। তারপর আর কি,, আপনাকে শেষ দেখেছি আপনার জন্মদিনে। ১৪ই ডিসেম্বর ২০২৪ এ। কি আজব এক বছর পার হয়ে গেল। তবুও আমার চোখের সামনে সব ভাসে।
কালকুঠুরি পর্ব ৬০
আজ ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫। আপনাকে, আপনার বাঙ্গিমারা জন্মদিনের শুভেচ্ছা ।
Happy birthday samir sikander ,,, 💝🎃
ইতি,,
আপনার সেই জুনিয়র যাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন। ময়লা তুলিয়েছিলেন
মল্লিকা বাঙ্গি!
