কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১১
মুনমুন বুড়ি
পুরুষালী কণ্ঠটা শুনে সবাই দরজার দিকে তাকালো, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র। অভ্র মিহিদের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে আসতে বলল—
— কী জানো তো কৌশিক ব্রো, আমি না একটু গেম খেলতে ভালোবাসি। সেটা খেলার মাঠে হোক বা জীবনের মাঠে। আর আমি যখন গেমে নামি, তখন বিপরীত পক্ষকে ভেঙে গুঁড়িয়ে নিঃস্ব করে তবেই জিত ছিনিয়ে আনি।
কৌশিক অভ্রকে দেখেই রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল। হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে কৌশিক অভ্রর নাক বরাবর এক ঘুষি মেরে বসে। যা দেখে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই আঁতকে উঠে।
তিহি অভ্রর কাছে দৌড়ে এসে বিচলিত কণ্ঠে বলে—
— অভ্র, তুমি ঠিক আছো? কোথায় লেগেছে, দেখাও আমাকে।
তিহি যখনই অভ্রকে ধরতে যাবে, তার আগেই অভ্র হাত দিয়ে তিহিকে থামিয়ে দেয়। ঘুষির তীব্রতা এত বেশি ছিল যে অভ্রর নাক থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। অভ্র নাকের রক্ত মুছে তিহিকে পাশ কাটিয়ে কৌশিকের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। মুহূর্তেই কাউকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে কৌশিকের নাক-মুখ বরাবর এক ঘুষি মেরে বসে।
আলতাফ শেখ দু’জনের এমন মারামারি দেখে বলে ওঠেন—
— থামো তোমরা।এইভাবে মারছো কেন একে অপরকে তোমরা?
কৌশিক রেগে পুনরায় অভ্রর দিকে তেড়ে যেতে চাইলে এমন কিছু দেখে যা দেখে ওর মাথায় বাজ পড়ে। মিহি অভ্রর সামনে গিয়ে অভ্রকে প্রটেক্ট করে দাঁড়িয়ে আছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিহি বলে ওঠে—
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— খবরদার! আমার স্বামীর গায়ে যদি আরেকটা আঁচড় কেটেছেন আপনি, তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।
ব্যাস, এক কথায় পুরো ঘরে বোমা ব্লাস্ট করল মিহি। সবার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। কারো মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। অভ্র কৌশিকের দিকে তাকিয়ে গর্বের হাসি দেয়। কৌশিক ঢোক গিলে বহু কষ্টে বলে ওঠে—
— মনি, তুমি এসব কী বলছ?
— সত্যি বলছি।
— দেখো মনি, তোমার কাউকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমি আছি তো। কেউ তোমার কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তুমি মিথ্যে বলো না প্লিজ, আমার কষ্ট হচ্ছে।
— আমি কোনো মিথ্যে বলছি না।
মিহির কথা শুনে এবার কৌশিক ধমক এর সুরে বলে ওঠে—
— মনি, আমার মাথা গরম করো না। তুমি জান আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। এখন এসব মিথ্যে বলে কোনো লাভ নেই।
— আপনার কাছে যা আছে, ওগুলো সব মিথ্যে, বানায়াট।
— তাই নাকি? ঠিক আছে, আমি আজ সবাইকে বিয়ের সত্যিটা বলে দেবো। দেখি তারপর কিভাবে অস্বীকার করো তুমি।
ওদের কথোপকথনের মাঝে আলতাফ শেখ বলে ওঠেন—
— তোমরা কি নাটক শুরু করেছো? কিসের বিয়ে, কার বিয়ে? আর মিহি কী বলছিস এসব?
কৌশিক আলতাফ শেখের কাছে গিয়ে বলে—
— আঙ্কেল, আমার কথা ঠান্ডা মাথায় শুনুন। আমার আর মনির বিয়ে হয়েছে চার মাস আগে।
— কীহহ!
— আঙ্কেল, প্লিজ হাইপার হবেন না। আমরা পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছি।
নাসরিন বেগম কৌশিকের কাছে গিয়ে বলে ওঠেন—
— কী এমন পরিস্থিতি কৌশিক, যে আমাদের জানানো যায়নি? আমরা তো তোমাদের বিয়ে ঠিক করেই রেখেছিলাম। তারপরও এমন কেন করলে তোমরা?
— আন্টি, প্লিজ আমার কথাটা শুনুন। মনির এখানে কোনো দোষ নেই। আমি মনিকে জোর করেছি বিয়ে করতে।
— তাহলে মিহি কেন বললো অভ্র ওর স্বামী?
তিহির কথায় সবাই তিহির দিকে ফিরে তাকায়। তিহিকে দেখে বোঝা যাচ্ছে অতি প্রিয় কিছু হারানোর ভয়ে কতটা আতঙ্কিত ও।
তিহি মিহির দিকে এক কদম এগিয়ে এসে বলে—
— এই মিহি, বল। তখন কেন এমন বললি তুই? বল না প্লিজ।
মিহি তিহিকে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই কৌশিক বলে ওঠে—
— মিথ্যে বলছে মনি। যা যা বলছে সব মিথ্যে বলছে।
কৌশিকের কথা শুনে মিহি বলে ওঠে—
— আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি যখন বিশ্বাস করছেন না, তখন আপনাকে কিছু প্রমাণ দেখাই।
— কী প্রমাণ?
— এক মিনিট।
কথাটা বলেই মিহি দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যায়। অন্যদিকে তিহি অভ্রর কাছে এসে কাতর কণ্ঠে শুধায়—
— অভ্র, মিহি এসব কী বলছে? এগুলো মিথ্যে তাই না?
অভ্র তিহির কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে তাকিয়ে থাকে।
— কী হলো? চুপ করে আছো কেন? বলো না প্লিজ, এগুলো সব মিথ্যে।
তিহির কথার মাঝেই মিহি হাতে কিছু কাগজ নিয়ে নিচে নেমে এসে সোজা কৌশিকের সামনে গিয়ে বলে—
— নাও, দেখো। তোমার প্রমাণ লাগতো, আমি এনে দিয়েছি প্রমাণ।
কৌশিক মিহির দেওয়া কাগজগুলো দেখতে থাকে হঠাৎ কিছু না বলে কাগজগুলো এক টানে ছিঁড়ে ফেলে।
মিহি রেগে গিয়ে বলে—
— এটা কী করলে তুমি? আমার বিয়ের কাবিননামা ছিঁড়ে কেন ফেললে?
— এগুলো মিথ্যে। সব মিথ্যে। সব তোমাদের প্ল্যান। এগুলো বানিয়েছো তোমরা।
অভ্র বাঁকা হেসে কৌশিককে বলে—
— লাভ নেই ছিঁড়ে ওগুলো ডুপ্লিকেট কপি ছিল। আসলগুলো আমার কাছে আছে।
— তুই মনির ব্রেনওয়াশ করেছিস না? তুই বলেছিস ওকে এসব বলতে। আর এসব কাগজ তুই বানিয়েছিস। তুই কি ভাবলি আমি এত সহজে এসব বিশ্বাস করে নেবো?
কৌশিকের কথায় অভ্র কুটিল হেসে বলে—
— তুই বিশ্বাস কর বা না কর, আমার কোনো কিছু যায় আসে না। আমাদের বিয়ে হয়েছে আর এটাই সত্য।
— নাটক করছিস নকল কাবিন নিয়ে। আমাদের বিয়ের কাগজ আমার কাছে আছে।
— ওগুলো আসল তো?
— মানে?
— তোকে একটা গল্প শোনাই। মন দিয়ে শুনবি কেমন?
কথাটা বলেই অভ্র ওদের বিয়ের পুরো কাহিনি কৌশিককে বলে। শেষে কুটিল হেসে বলে—
— অ্যান্ড নাও উই আর হাজব্যান্ড ওয়াইফ।
অভ্রর কথা শেষ হতেই তিহি মিহির কাছে গিয়ে মিহির গালে জোরে থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে বলতে থাকে—
— কালনাগিনী একটা আমার থেকে এইভাবে আমার অভ্রকে কেন কেড়ে নিলি তুই? কেন ?তোর এত লোভ, এত লোভ! তোকে আজ আমি মেরে ফেলবো!
কথাটা বলেই তিহি পুনরায় মিহির গায়ে হাত তুলতে যাবে, তার আগেই কেউ তিহির হাত টেনে ধরে। তিহি চোখ তুলে দেখে অভ্র। চোয়াল শক্ত করে তিহির দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো কথা না বলে ঠাস করে এক থাপ্পড় মেরে বসে তিহির গালে। থাপ্পড়ের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে তিহি তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে ছিটকে পড়ে মুহূর্তেই জ্ঞান হারায়।
নাসরিন বেগম মেয়ের এমন অবস্থা দেখে আহাজারি করে উঠে ছুটে মেয়ের কাছে যান।
অভ্র চিৎকার করে বলে ওঠে—
— আর কেউ যদি আমার বউয়ের দিকে আঙুল তোলে, তাহলে ওর অবস্থা এর থেকেও খারাপ হবে। সে যেই হোক। এখন থেকে ওর একমাত্র পরিচয় ও অভ্র আহমেদের বউ। তাই যদি কেউ ওকে অপমান করতে আসে, তাকে প্রথমে আমার মুখোমুখি হতে হবে।
আলতাফ শেখ অভ্রর কথা শুনে মিহিকে বলে ওঠেন—
— বাহ মিহি, দেখ তোর স্বামী কী বলছে। নিশ্চয় এখন আমি যদি তোকে কিছু বলতে আসি, তাহলে আমাকেও তিহির মতো তোর স্বামীর কাছ থেকে থাপ্পড় খেতে হবে। বাহ, আর এর থেকেও খারাপ কিছু তাই না মিহি?
— বাবা…
— খবরদার! আর ওই মুখ দিয়ে বাবা ডাকবি না। আজ থেকে আমাদের চোখে তুই মরে গেছিস। তোর মতো মেয়ে আমার দরকার নেই। এখন এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা। তোর মুখ আমি আর দেখতে চাই না।
— বাবা, এমন করে বলো না…
মিহিকে শেষ করতে না দিয়ে আলতাফ শেখ চিৎকার করে বলে ওঠেন—
— সিয়াম, ওই মেয়েটাকে বেরিয়ে যেতে বলো এখনই। নাহলে আমার মরা মুখ দেখবে তোমরা।
মিহি আলতাফ শেখের কথায় আঁতকে উঠে।
সিয়াম মিহিকে বলে ওঠে—
— বেরিয়ে যা মিহি, প্লিজ। এমনিতেই তোর জন্য আমার পুরো পরিবার ভাঙতে বসেছে। এইবার একটু রহম কর, বাঁচতে দে আমাদের।
মিহি সবার কথা শুনে চুপ করে যায়। আর কিছু বলার ভাষা নেই ওর। অভ্র মিহির হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে তখনই কৌশিক বলে ওঠে—
কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১০
— মনি, তুমি তো বলেছিলে সারাজীবন আমার সাথে থাকবে। কখনো ছেড়ে যাবে না। তাহলে এই তার নমুনা?
— আফসোস হচ্ছে না? এত সুন্দর একটা মেয়ে ফসকে গেল হাত থেকে। মিহিকে আর ইতালির সব থেকে নিষিদ্ধ জায়গায় পাচার করতে পারলি না তাই না কোশিক?
