কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৩
মুনমুন বুড়ি
নতুন দিনের সূচনা। ধরিত্রীতে সূর্য নতুনভাবে উদিত হয়েছে। ব্যস্ত নগরীতে মানুষজন নিজ নিজ কাজে লেগে পড়ছে।
ফোনটা একটানা ঊনষাটবার বেজে থেমে গেছে। ঠিক তখনই দরজায় করাঘাত। সঙ্গে সঙ্গে মিহির ঘুম ভেঙে গেল। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল সে। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিজেই টের পায়নি। উঠে বসতেই মাথাটা ভনভন করে উঠল। চোখ-মুখ ফোলা অতিরিক্ত কান্নার ফলে।
আবার দরজায় শব্দ। বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে রিনা বেগমের কণ্ঠ—
—মিহি মা, দরজা খোলো। মিহি… এই মিহি।
মায়ের ডাক শুনে মেঝে থেকে উঠে দরজা খুলে দিল মিহি। রিনা বেগম দেরি না করে ঘরে ঢুকলেন। মেয়েকে দেখেই আঁতকে উঠলেন তিনি। কয়েকদিন ধরেই মেয়েটা অস্বাভাবিক চুপচাপ, কারও সঙ্গে কথা বলে না, ঘর থেকেও বের হয় না। একসময় এই মেয়েটা কত প্রাণবন্ত ছিল।
মেয়ের এই অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন রিনা বেগম। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বললেন
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—কি হয়েছে আম্মু? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কাল রাতেও কিছু খাওনি। কতবার ডাকলাম, সাড়া দিলে না কেন? বলো মা, কী হয়েছে?
মায়ের মমতা পেয়ে আরও একটু গুটিয়ে গেল মিহি। সেভাবেই বলল
—কিছু হয়নি আম্মু। কাল ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তাই ডাক শুনতে পাইনি।
মেয়ের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রিনা বেগম। বুঝলেন, আজও কিছু বলবে না মেয়েটা। তাই আর জোর করলেন না। শান্ত স্বরে বললেন
—কৌশিকের সঙ্গে কি কোনো ঝামেলা হয়েছে? সে তোমাকে অনেকবার ফোন করেছিল। না পেয়ে তোমার ভাইকেও ফোন দিয়েছে তুমি ঠিক আছো কি না জানতে। তোমাদের মধ্যে কিছু হয়েছে নাকি?
কৌশিক আর মিহির সম্পর্কের কথা দুই পরিবারই জানে। বহুদিনের সুসম্পর্ক থেকে আত্মীয়তার বন্ধন গড়তে চেয়েছিল দুই পরিবার। কিন্তু মিহির বয়স কম হওয়ায় সিদ্ধান্ত হয় এইচএসসি পরীক্ষার পরেই তাদের বিয়ে হবে।
মায়ের কথা শুনতেই গত রাতের সব ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠল মিহির। অসহ্য বুকব্যথায় মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল সে। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।
মেয়ের কান্না দেখে রিনা বেগম নিশ্চিত হলেন নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। তবে তিনি আর চাপ দিলেন না। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
—কৌশিক ফোন করেছে, ওর ফোনটা ধরো। কথা বললে সমস্যা মিটে যাবে। আর তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো। তোমার আপু, আব্বু, ভাইয়া সবাই অপেক্ষা করছে।
যেভাবে এসেছিলেন, সেভাবেই চলে গেলেন রিনা বেগম।
মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল মিহি। কাল যা দেখেছে, তার পর আর কী বলবে? সত্যিই তো—সে কি আর কৌশিকের যোগ্য আছে? কৌশিক যদি এখন অন্য কারও সঙ্গে জীবন শুরু করতে চায়, করুক। মিহি বাধা দেবে না, যত কষ্টই হোক।
কিন্তু যে বন্ধনে সে কৌশিকের সঙ্গে বাঁধা পড়েছিল—সে বন্ধন কি এত সহজে অস্বীকার করা যায়?
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন আলতাফ শেখ, সিয়াম শেখ আর তিহি শেখ।
খবরের কাগজ পড়তে পড়তে আলতাফ শেখ বললেন
—তিহি, মিহিকে ডেকে নিয়ে আসো।
তিহি উঠতে যাবে, ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামল মিহি।
—আব্বু, মিহি আসছে—বলে উঠল তিহি।
তিন জোড়া চোখ গিয়ে পড়ল মিহির দিকে। সিয়াম বোনকে দেখে বলল—
—মিহি, আয় ভাইয়ার পাশে বস।
চুপচাপ গিয়ে ভাইয়ের পাশে বসল মিহি। সিয়াম স্নেহভরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
খবরের কাগজে চোখ রেখেই আলতাফ শেখ বললেন
—কাল রাতে কী হয়েছিল মিহি? এত ডাকলাম, সাড়া দিলে না কেন?
মিহি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ল। কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। বোনের অস্বস্তি বুঝে প্রসঙ্গ বদলাল সিয়াম
—আজ বিকেলে তোদের দু’জনকে নিয়ে বেরোব। রেডি থাকিস।
ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে তিহি খুব খুশি হলো। কিন্তু মিহি স্বাভাবিক রইল। যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও ভাইয়ের মুখের ওপর কিছু বলতে পারল না।
রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে তিহি, অভ্র, মিহি আর কৌশিক।
সকালে সিয়াম বলেছিল সবাইকে নিয়ে বেরোবে। কিন্তু শেষে গাড়ি পাঠিয়ে জানাল—ও পরে আসবে।
এখানে এসে অভ্র আর কৌশিককে দেখে সব বুঝে গেল মিহি। এটা সিয়ামের পরিকল্পনা। যদি জানত, কেটে ফেললেও এখানে আসত না সে।
এই দুই পুরুষের সামনে আসতেই সেই বিভীষিকাময় অতীত মনে পড়ে যায় তার।
হাসফাঁস করছে মিহি। দুই জোড়া চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। কৌশিক অস্বস্তি বুঝলেও অভ্র যেন মজা পাচ্ছে। বারবার কুটিল হাসি দিচ্ছে।
অবশেষে কৌশিক বলল
—ভাইয়া, তুমি তিহি আপুর সঙ্গে কথা বলো। আমি মণিকে নিয়ে খাবার অর্ডার দিয়ে আসছি।
কৌশিকের কথা শুনে অভ্র শান্ত স্বরে বলল—
—কেন? এখানে থেকেই তো অর্ডার দেওয়া যায়, তাই না?
অভ্র ভ্রু নাচিয়ে বলল
অভ্রর প্রশ্ন শুনে কৌশিক আমতা আমতা করে বলল
-না মানে ভাইয়া ওই আসলে
—আহা কৌশিক ব্রো, আসল কথা বললেই হয়। আমার শালিকার সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটাতে চাও। আমিও আমার ডার্লিংয়ের সঙ্গে একটু আদর-সোহাগ করব, কী বলো ডার্লিং?
লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল তিহি। অভ্রর লাগামছাড়া কথায় মিহির মুখ কুঁচকে গেল।
—মিহি, চলো বলল কৌশিক।
অভ্রর সামনে বসে থাকার চেয়ে কৌশিকের সঙ্গে যাওয়াই ভালো মনে হলো মিহির।
পেছন থেকে কুটিল হাসি দিয়ে অভ্র ফিসফিস করে বলল—
—নট ম্যাচ অ্যাট অল।
প্রায় দশ মিনিট ধরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মিহি আর কৌশিক। কৌশিক কিছুই বলছে না।
বিরক্ত হয়ে মিহিই বলল—
—আপনার কিছু বলার থাকলে বলুন। না হলে আমাকে যেতে দিন। এভাবে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
মুচকি হেসে কৌশিক বলল
—রাগলে তোমাকে খুব সুন্দর লাগে মণি। নাক আর গাল লাল হয়ে যায়… অভ্রকে শেষ করতে না দিয়ে মিহি বললো —হয়েছে । আপনার এইসব কাব্যিক কথা বন্ধ করুন। এখন এইসব অসহ্য লাগে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
—তুমি ভুল বুঝছো মণি। কাল যা দেখেছ—
—বিশ্বাস করব? বিশ্বাস প্রতিবার বিশ্বাস করি আর বদলে কি পাই এখানে ব্যথা পাই এখানে।
মিহির কথা শুনে কৌশিকের বুক কেঁপে উঠলো। সত্যি কি সে তার প্রেয়সীকে এতোটা কষ্ট দিয়ে ফেললো। কৌশিক আহত কন্ঠে বলল
—মণি, একবার বিশ্বাস করো। ওই মেয়েটাকে আমি চিনি না। সত্যি বলছি একবার বিশ্বাস করো। ঐ মেয়েটা হুট করে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমি ওকে ছাড়াতে চায়ছিলাম তখন তুমি আমাকে দেখে ফেলো। সত্যি বলছি আমি।
-বিশ্বাস! আচ্ছা করলাম আপনাকে বিশ্বাস। একটা সত্যি কথা বলবেন আমাকে?
কৌশিক হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
-সত্যি করে বলুন ভালোবাসেন আমাকে? যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাকে ভালোবাসার ক্ষমতা আছে আপনার? এমন কোনো দিন চলে আসবে না তো, যেদিন কোনো কারণে আপনার ভালোবাসা ফিকে হয়ে যাবে না তো?
কৌশিক এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল—
-আমি তোমাকে দুনিয়ার সব চাইতে বেশি ভালোবাসি মণি। তোমার থেকে বেশি আমি দুনিয়ার কোনো কিছুকে ভালোবাসিনি। এমন কোনো দিন কখনো আসবে না, যেদিন আমার ভালোবাসা তোমার জন্য কম হয়ে যাবে।
এক মুহূর্তের জন্য ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল মিহির মনে। মনে হলো—যাই কিছু হয়ে যাক, এই মানুষটা কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না, কোনো দিনও না। সেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই মিহি বলল জীবনের সবথেকে কঠিন সত্যটা—
-আ… আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি কৌশিক। আমি ব্যর্থ হয়েছি নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে। আমি ব্যর্থ হয়েছি।
কথাগুলো বলতে বলতেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল মিহি।
অন্যদিকে কৌশিকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আচ্ছা তার বুকে কি কেউ ছুরি চালিয়েছে—এত কষ্ট কেন হচ্ছে, কেন হচ্ছে! ভীষণ কষ্টে মুখ দিয়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করল
-কে?
মিহি কান্নারত কণ্ঠে বলল—
—অভ… অভ্র ভাইয়া।
কথাটা বলতেই মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কান্না শুরু করল মিহি। হঠাৎ অনুভব করল কেউ পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে। চোখ খুলে দেখতে পেল—কৌশিক চলে যাচ্ছে। মিহি জোরে চিৎকার করে বলা শুরু করল
কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ২
-আপনি কথা দিয়েছিলেন। আপনি বলেছিলেন না কখনো আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আপনার ভালোবাসা কখনো কমবে না। তাহলে আপনি এভাবে চলে কেন যাচ্ছেন? উত্তর দিন, উত্তর দিন।
মিহির এত এত অভিযোগের মাঝেও কৌশিক ফিরে তাকাল না। নিজের মতো করেই চলে গেল।
এক মুহূর্তে যেন মিহির সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে গেল। শেষ আশ্রয়স্থলটাও যেন মুখ ফিরিয়ে নিল। সব হারিয়ে মেঝেতে বসেই কান্নাকাটি শুরু করল মিহি। ঠিক তখনই কেউ একজন মিহির সামনে এসে কটাক্ষ করে বলতে লাগল—
—চু চু চু… ভালোবাসা ফুস হয়ে গেল।
