কিশোরী কন্যা পর্ব ১
হামিদা আক্তার ইভা
“আমার ছোট মেয়ের বয়স সবে ১৫।আমি ওকে এখনই বিয়ে দেব না চাচা।”
“এত বড়লোক বাড়ির প্রস্তাব ফিরায় দিবা? বুইঝা কথা কইলা বক্কর?”
“ঘরে আমার বিয়ের যোগ্য আরও একটা মেয়ে আছে।তাকে রেখে ছোট মেয়েকে বিয়ে দেই কি করে?”
কাসেম ঘটক মুখ কালো করলেন।মুখের ভেতর এক গাদা পান।তিনি লাল দাঁত গুলো বের করে বললেন,
“তোমার ছোট মাইয়ারে পছন্দ করছে উনারা।মাইয়ারে সুখে রাখব বুঝো না কেন?”
“এত সুখ দরকার নেই।আপনি এখন যান,আমি এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাচ্ছি না।”
কাসেম চাচা নিজের রাস্তা ধরলেন।একবার পিছু ফিরে বললেন,
“আরেকবার ভাইবা দেইখো বক্কর।সোনায় ঢাইকা থাকব তোমার মাইয়া।এত সুখ টিনের ঘরে পাইবো না।”
বক্কর ফরাজী বিরক্ত হয়ে বাজারের রাস্তা ধরলেন।পাশের গ্রাম থেকে তার ছোট মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।খানদানি বংশ।তবে তিনি চান না ছোট মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে।গরমে গ্রামের মানুষ অতিষ্ট প্রায়।বিকেল বেলা গাছের নিচে কিংবা পুকুর ঘাটের পাড়ে বসে আছেন অনেকেই।আজ তুলনামূলক একটু বেশি’ই গরম পড়েছে।ফিরোজা বেগম সবে রান্না সেরে পাকঘর থেকে বের হলেন।মাটির ঘরের সামনে তার ছোট ছেলে ফাহাদ খেলনা দিয়ে খেলছে।তিনি মৃদু হেসে কপালের ঘাম শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে ঘরে ঢুকলেন।চারপাশে চোখ বুলিয়ে দুই মেয়েকে খুঁজেও পেলেন না।কপাল কুঁচকে এলো তার।তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গলা ছেড়ে ডেকে উঠলেন মেয়েকে।
“ময়ূরী কই তুই?”
খানিকক্ষণ পর বাড়ির পেছন দিক থেকে এক কিশোরী মেয়ের পায়ের নূপুরের শব্দ কানে ভেসে এলো।তিনি পাশ ফিরে তাকাতেই ময়ূরী খিলখিল করে হেসে উঠল।হাতের শাপলা গুলো দেখিয়ে বলল,
“মা পুকুরে শাপলা ফুটেছে,দেখেছ তুমি?”
ফিরোজা বেগম চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের নিকট এগিয়ে এলেন।মেয়েকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে কোমরে হাত রেখে রাগ দেখিয়ে বললেন,
“পুকুরে কেন নেমেছিলি?মধু কোথায়?”
“আপা তো বাড়িতে নেই মা।”
“সে ঢঙ্গি গেছে কই?”
ময়ূরী জানে না বোন কোথায় গেছে।সে শাপলা গুলো ছোট ভাইয়ের সামনে রেখে উঠোনে সোজা হয়ে দাঁড়াল।কলপাড়ের দিকে যেতে গিয়ে আবার পিছু ফিরে মায়ের ক্লান্ত বদন পানে তাকিয়ে বলল,
“ওমা,আমাকে একটা কাপড় বের করে দাও ঘর থেকে।”
ফিরোজা বেগম বিরক্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন।মেয়ের জন্য একটা কাপড় বের করে কলপাড়ে গিয়ে দিয়ে এলেন।ময়ূরী গোসল সেরে বের হলো।ছোট ভাই ফাহাদ বোনকে দেখে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো উঠোনের মাঝখানে।ময়ূরী ভেজা জামা কাপড় গুলো দড়িতে ছড়িয়ে দিচ্ছিল।হঠাৎ শাড়ির আঁচলে টান লাগায় মাথা নিচু করলো।ছোট ভাইকে অমন মায়া মায়া চোখে ঠোঁট ফুলিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে কোলে তুলে নিলো।গায়ে জায়গায় জায়গায় মাটি লেগে আছে।সে ভাইয়ের গাল টেনে দিয়ে বলল,
“তোকে কতবার পরিষ্কার করে দেব ভাই?এত মাটি দিয়ে খেলিস কেন?”
ফাহাদ বোনের গলা জড়িয়ে ধরে গালে ছোট্ট করে চুমু খেলো।ময়ূরী হাসল।বাচ্চাটা বলল,
“তুমি গুছল কুরছো?”
ময়ূরী মাথা নাড়ল।ফাহাদ বলল,
“চুলো বাইরে গুত্তে যাই।”
ফিরোজা বেগম সলার ঝাঁড়ু হাতে নিয়ে মগে করে পানি একটু একটু করে উঠোনে ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন।ছেলের কথা কানে আসতেই বললেন,
“খবরদার কেও বাড়ির বাইরে পা রাখবি না।তোর আব্বা জানলে রাগ করবেন।”
ময়ূরী লক্ষ্মী মেয়ের মতন মাথা নেড়ে ভাইকে নিয়ে তাদের বাড়ির পুকুর পাড়ে এলো।পুকুর পাড়ে বড় একটা জামগাছ আছে।আর সেই গাছে ময়ূরীর আব্বা একটা দোলনা বেঁধে দিয়েছেন।পুকুরের এক কোনায় তাদের ছোট একটা নৌকা বাঁধা।ময়ূরীদের বাড়িটা বেশি বড় নয়।এইতো বাড়ির পাশে একটা ছোট পুকুর,উল্টো পাশে সবজির বাগান আর বাড়িতে টিনের দুটো মাঝারি সাইজের ঘর।আর রান্নাঘরের সামনে একটা মাটির ছোট ঘর।মাঝে আছে উঠোন।কোনোরকম মাটির ঘরের ছোট্ট একটা সোনার সংসার।
ময়ূরীর বাবা বক্কর ফরাজী।তিনি পেশায় কৃষক হলেও বাজারে তার একটা চায়ের দোকান আছে।সেটা তিনি রাতে চালান।সংসারটা ভীষণ ছোট।দুই মেয়ে এবং এক ছেলে নিয়ে দুজনের ছোট সংসার।বড় মেয়ে মধু,সে ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছে এইবার।ছোট মেয়ে পঞ্চদশী দিলরুবা।তবে ভালোবেসে সবাই ময়ূরী বলে ডাকে।সে দশম শ্রেণীর ছাত্রী।আর একমাত্র ছেলে ফাহাদ,সে বাচ্চা বলতে গেলে একটা বিচ্ছু।বয়স সবে ৩।
ময়ূরী ভাইকে নিয়ে দোলনায় বসল।ফিরোজা বেগমের কিছু মনে পড়তেই তিনি উঠোন ঝাঁড়ু দিতে দিতে আড়চোখে ছেলে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ময়ূরী তোর আব্বা তো আজকে ক্ষেত দেখতে যায়নি।ভাইকে নিয়ে একটু পেছনের রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ দিকের ক্ষেতে গিয়ে দেখ তোর আব্বা কই।”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে ভাইকে কোলে তুলে নিলো।বাগান পেরিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গ্রামের সরু রাস্তা ধরে দক্ষিণ পাড়ার ক্ষেতের দিকে রওনা হলো।তাদের মোট ৪টা ক্ষেত।একটা দক্ষিণ পাড়া,একটা চেয়ারম্যান বাড়ির পাশে আর বাকি দুটো চেয়ারম্যান বাড়ির পেছনে।সে জায়গা গুলো বিশাল বড়।
ময়ূরী ক্ষেতের কাছে গিয়ে চারপাশে চোখ বুলাল।ধানক্ষেতের মাথায় হালকা বাতাস দুলছে,কিন্তু তার বাবার কোথাও দেখা নেই।সে ফাহাদকে কোলে নিয়ে ক্ষেতের ধার ধরে হাঁটতে লাগল।ফরহাদ মাঝেমাঝে বোনের গলা জড়িয়ে ধরে বলছে,
“আব্বা কুই আপা?”
ময়ূরী মৃদু হেসে বলল,
“আব্বা তো মনে হয় বাড়ি চলে গেছে ভাই,আমরা হয়তো দেখিনি।”
ঠিক তখনই দূরের মোড় ঘুরে চেয়ারম্যান সাহেব হেঁটে আসছিলেন।তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সম্মানিত লোক,পরনে ঝকঝকে পাঞ্জাবি-পায়জামা।সামনের লোকজনের হাতে পানের ডালা,ফল আর নানান প্যাকেট।
ময়ূরী দ্রুত রাস্তার পাশে সরে গিয়ে দাঁড়াল যেন তাদের চলাচলে অসুবিধা না হয়।ফাহাদ হাত নেড়ে হেসে বলল,
“ আপা,কুত্ত মানুষ।
চেয়ারম্যান সাহেব মেয়েটিকে দেখে পা থামালেন।চোখ মৃদু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
“এই সময়ে ক্ষেতে কি করছিস?”
ময়ূরী ভদ্রভাবে মাথা নিচু করে ফেলল।ফাহাদ ততক্ষণে বোনের কোলে থেকে হাত ছুঁড়ে সবাইকে দেখছে।বোনের মাথার কাপড় টেনে ধরেছে।
চেয়ারম্যান সাহেবের দৃষ্টি কিছুটা স্থির হয়ে গেল ময়ূরীর উপর।ময়ূরী ইতস্তত করে বলল,
“হ…জ্বি দাদা।আম্মা পাঠালো আব্বাকে দেখতে, ক্ষেতেই আছেন ভেবেছিলাম।”
“তোর আব্বা তো বাজারে গেছে।আসার সময় দেখা হয়েছিল।বাড়ি যা।”
লোকজনের ভিড় সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব পেছনে ফিরে একবার দীর্ঘক্ষণ ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।ময়ূরীর বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি খেলে গেল।সে দ্রুত ফাহাদকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বাড়ির পথ ধরল।
ময়ূরী বাড়ি ফিরে দেখল মধু পুকুর পাড়ে বসে গুনগুন করে গান গাইছে।আম্মা বোধহয় বাড়িতে নেই।ময়ূরী গুটি গুটি পায়ে মধুর নিকট এগিয়ে এলো।ডাগর ডাগর চোখে বোনের কাণ্ড দেখে অবাক স্বরে বলল,
“তুই কই ছিলি আপা?আমি পুরো গ্রাম খুঁজে এলাম তোকে।”
সামনে বসা মধু মায়াবী মুখে মিষ্টি হাসি টানল।ইশারায় কাছে যেতে বলল।ময়ূরী ভাইকে নিয়ে পুকুরের সিঁড়িতে বসতেই মধু ফিসফিস করে বলল,
“রাজু ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।”
“রাজু ভাইয়ের সাথে দেখা কেন করতে গিয়েছিলি?”
মধু লাজুক হাসল।ওড়নার কোণা মুচড়ে বলল,
“তুই বুঝবি না।”
ময়ূরী ভ্রু কুঁচকে বোনের লজ্জা রাঙা মুখশ্রী দেখে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলো।হঠাৎ বোনকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তোরা প্রেম করিস তাই না?আম্মা জানলে তোর পাছা লাল করবে।”
মধু তড়িঘড়ি করে ময়ূরীর মুখ চেপে ধরল।ছোট ভাইয়ের সামনে কিছু বলা মানে আম্মার কানে সে খবর পৌঁছে যাওয়া।ফাহাদ পিটপিট করে বড় বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আপার মুক দুরছো কেন?”
মধু শুকনো ঢোক গিলল।মেয়েটার ঘাম ছুটে গেছে ভয়ে।ময়ূরী উঠে দাঁড়াল।একবার বোনের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে গলা শক্ত করে বলল,
“ধ্বংসের খেলায় নামিস না আপা।”
ভাইকে নিয়ে ঘরে এসে ঘরের লাইট জালিয়ে বাবার জন্য কল চেপে জগ ভর্তি পানি এনে ঠান্ডা সরবত বানিয়ে রাখল সে।
রাতে বক্কর বাড়ি ফিরলেন বেশ রাত করে।ছেলে মেয়ে গুলো ঘুমিয়ে গেছে।ফিরোজা বেগম চিন্তিত ছিলেন ভীষণ।স্বামীকে বাড়ি ফিরতে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন।বক্কর কলপাড় থেকে পরিষ্কার হয়ে ঘরে ঢুকলেন।তার ফ্যাঁকাসে মুখশ্রী দেখে ফিরোজা বেগম বললেন,
“কী হয়েছে?এত রাত করে বাড়ি ফিরলে কেন?”
বক্কর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্যানের নিচে বসলেন।বললেন,
“বাজারে বোধহয় দোকানটা আর রাখতে পারব না।কাল রাতে দোকানের সব জিনিস চুরি হয়ে গেছে।”
ফিরোজা বেগম আঁতকে উঠলেন।কিছুটা উচ্চস্বরে বললেন,
“এ কি বলছো তুমি?চুরি হয়েছে মানে?”
“হ্যা,চুরি হয়েছে।”
“কে করল এই কাজ?চায়ের দোকানে আর কিই বা আছে চুরি করার?”
“নিশ্চিত কচি চুরি করেছে।ভাবছি কালই চেয়ারম্যান বাড়ি যাব।বিচার না দিলেই নয়।”
শহর থেকে চেয়ারম্যান বাড়ির ছেলে মিসবাহ তাহসিন সওদাগর ফিরেছে আজ।চাকরির সুবাদে সে ঢাকায় থাকে।গত বছর কুরবানি ঈদে এসেছিল,তারপর যে গ্রাম ছাড়ল আর পা বাড়াল না এদিকে।
চেয়ারম্যান বাড়ি হৈচৈ লেগে গেছে।জমিদারদের মতো বিশাল বাড়ি খানায় আজ মানুষ দিয়ে গিজগিজ করছে।তাহসিন এসেছে বোনের বিয়ের জন্য।আজ পাত্রপক্ষ বোনকে দেখতে আসবে।আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে হচ্ছে বিধায় তেমন কোনো চাপ নেই।তাহসিনের সাথে তার খালাতো ভাই আদনানও এসেছে।তারা দুজনই ঢাকায় থাকে।এত রাস্তা জার্নি করে দুজনেই বেশ ক্লান্ত।
তাহসিনের মা অরুণিমা বেগম দুপুরের খাবার সার্ভ করছেন।তাহসিন ও আদনান ফ্রেশ হয়ে সবে খেতে বসেছে।নুপুর ভাইয়ের পাশে বসে আড়চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাই,তুমি এবার অনেকদিন থাকবে না?”
তাহসিন খাওয়ার মাঝে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আছি।”
নুপুর খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
“তাহলে এবার একেবারে বিয়েটা করেই গ্রাম ছাড়বে।”
তাহসিন কোনো জবাব দিলো না।নুপুর মুখ বাঁকিয়ে আদনানের দিকে তাকাল।আদনান দিন দুনিয়া ভুলে খাওয়ায় মন দিয়েছে।নুপুর নাক ছিঁটকে বলল,
“আদনান ভাই,তুমি এমন গরুর মতো খাচ্ছো কেন?”
আদনান বিরক্ত হয়ে নুপুরের দিকে তাকাল।
“কী সমস্যা তোর?তোর ভাই করল্লা খাইয়ে খাইয়ে আমার পেট খারাপ বানিয়ে ফেলেছে।কতদিন পর ভালো মন্দ খাচ্ছি তুই জানিস?”
“ভাই তোমাকে করল্লা কেন খাওয়ায়?”
“তোর ভাই তিন বেলা করল্লা দিয়ে ভাত খায়।শালা কীপটা,বাজারে গেলে কি কি যে কেনে তোর ধারণার বাইরে।”
নুপুর নখ কামড়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল।ভাই তার করল্লা খাওয়া শুরু করেছে কবে থেকে?ভাইয়ের গম্ভীর মুখ দেখে জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না তার।
ছোট চাচার মেয়ে কনক কোত্থেকে যেন ফিরল বাড়িতে।খাওয়ার ঘর থেকে কথোপকথনের শব্দ কানে আসতেই উকি মেরে দেখল তাহসিন এসেছে।খুশিতে চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল।তাড়াহুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকতে গেলে নিচে পানি ভর্তি কলসির সাথে বারি খেয়ে ঠাস করে নিচে পড়ে গেলো।তার চিৎকারের শব্দ শুনে হতভম্ব হয়ে তাকাল সবাই এদিকে।
নুপুর দৌঁড়ে এলো নিকটে।অরুণিমা বেগম বিচলিত হয়ে কাছে এগিয়ে আসতেই কনক ব্যথায় ডুকরে উঠল।নুপুর কনকের কোমরে হাত বুলিয়ে বলল,
“পড়ে গেলি কি করে?”
কনক কোমরে হাত রেখে নাক টেনে বলল,
“দরজার সামনে কলসি রেখেছে কে?আল্লাহ আমার কোমরটা ভেঙে গেলো।”
নুপুর চিন্তিত হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।অরুণিমা বেগম মেয়েকের সাহায্য নিয়ে কনককে উঠিয়ে টেবিলের সামনে চেয়ারে এনে বসালেন।কনক নাক টেনে টেনে তাহসিনের দিকে তাকাল।তাহসিন চোখ তুলে একবারও তাকাল না তার দিকে।অভিমান হলো কনকের।অরুণিমা বেগম বললেন,
“কিরে বেশি ব্যথা পেয়েছিস?”
কনক মাথা নাড়িয়ে বলল,
“খুব।”
“দেখে শুনে হাঁটতে পারিস না?”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাহসিনকে বললেন,
“আব্বা আর কিছু নিবা?”
তাহসিন মাথা নাড়িয়ে না করল।তিনি নুপুরকে বললেন,
“ভাইদের কিছু লাগলে এগিয়ে দিস।আমি একটু আসছি।”
অরুণিমা বেগম খাওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে কনক তাহসিনের দিকে তাকায়।কিছুটা অভিমানী গলায় বলে,
“তাহসিন ভাই,কেমন আছেন?”
তাহসিন আড়চোখে তাকায়।বলে,
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“আপনি জিজ্ঞেস করবেন না আমি কেমন আছি?”
আদনান মাঝ থেকে কথা কেটে বলল,
“ভালো না থাকার কি আছে?এমন বাঁদরের মতো মুছড়াচ্ছিস কেন?”
কনক রেগে তাকাল।নাক ফুলিয়ে বলল,
“আমি তোমার সাথে কথা বলছি না।তুমি কেন বা হাত দিচ্ছ?”
“বেয়াদব,বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানিস না?”
হঠাৎ তাহসিনের ফোনে একটা মেসেজ এলো।সে আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে ওদের থামিয়ে দিলো।হাত ধুয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।আদনানকে বলল,
“খেয়ে আমার ঘরে আয়,দরকার আছে।”
সন্ধ্যার সময় বাড়ির বড় ছেলে মাহতাব সওদাগর ফিরল।সে বংশের বড় ছেলে।এবার এমপি হয়েছে।রাজনীতির সাথে জড়িত।লম্বা চওড়া শ্যাম বর্ণের সু-দর্শন পুরুষ।বয়স ৩৩ এর ঘরে।তাহসিন ফিরেছে বলে সে তাহসিনের ঘরের দিকে রওনা হলো।
তাহসিন কলে কথা বলছিল,মাহতাবের কণ্ঠস্বর শুনতেই নিঃশব্দে কল কেটে দিলো।মাহতাব ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই তাহসিনও হাত রাখলো পিঠে।
“কী খবর তাহসিন?”
তাহসিন মৃদু হেসে জবাবে বলল,
“ভালো চলছে,তোমার কী খবর ভাই?”
“রাজনীতি নিয়ে আছি ভালোই।বাদ দে,খাইছিস রাতে?”
“হ্যা,তুমি খাওনি?”
“খাইতে যাব এখন।পেটে ইঁদুর দৌঁড়ায়তেছে,আমি খাইয়া আসতেছি।”
তাহসিন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।মাহতাব প্রস্থান করতেই তাহসিন কপালে ভাঁজ ফেলল।ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ নীরব থেকে কী যেন ভাবল।তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় কল আলাপে ব্যস্ত হলো।
ভোর সকাল।সবে আলো ফুটতে শুরু করেছে চারপাশে।আকাশে পাখি গুলো কিচিরমিচির শব্দ করে উঁড়ে বেড়াচ্ছে।চেয়ারম্যান বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে বের হলো তাহসিন।প্রতিদিন সকালে তার হাঁটতে বের হওয়ার অভ্যাস আছে।প্রতিদিনের মতো আজও সে হাঁটতে বের হয়েছে।গায়ে হালকা ছাই রঙা একটা গেঞ্জি আর ট্রাউজার।সকালের মোহনায় পরিবেশ চোখে আঁটকে আসছিল।পশ্চিম দিকের পুকুর ঘাটের কাছে আসতেই হঠাৎ পা থেমে গেলো তার।কপালে ভাঁজ ফেলে ঘাটের সিঁড়ির দিকে নজর যেতেই দেখতে পেল একটা ছোট বাচ্চা খিলখিল করে হাসছে।আর ঠিক তার সামনে এক অচেনা কিশোরী কন্যা ভেজা গায়ে শাপলা ছিঁড়ে এনে বাচ্চাটার সামনে রাখছে।গাঢ় নীল রঙের শাড়িটা ভিজে গেছে।মাথায় দুইপাশে বেননী গাঁথা লাল ফিতা দিয়ে।গালে এক অদ্ভুত রক্তিম আভা।
মেয়েটা নিজেও বাচ্চাটার সাথে খিলখিল করে হাসছে।পায়ের নুপুরের শব্দে চারপাশটা অদ্ভুত ভাবে থমকে আছে।তাহসিন কপাল কুঁচকে ফেলল।এই মেয়ে কে?এই গ্রামের মেয়ে বলে তো মনে হচ্ছে না।চিনতে পারছে না সে।হঠাৎ মেয়েটা চোখ তুলে উপরে তাকাল।শ্যাম বর্ণের অচেনা এক পুরুষকে দেখেই কিছুটা ঘাবড়ে গেলো সে।দুজনের চোখে চোখ পড়তেই তাহসিন নিজেও যেন বিব্রত হলো খানিক।বাচ্চাটা তাহসিনকে দেখে কেঁদে উঠল শব্দ করে।নীরবতা ছিন্ন করে বাচ্চাটার কান্নার শব্দ কানে গিয়ে বিঁধল।মেয়েটা চমকে ওঠে ভাইকে বুকে টেনে নিতেই তাহসিন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কে তুমি?”
মেয়েটা শুকনো ঢোক গিলে ভাইকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ানোর সময় একবার পিছু ফিরে তাহসিনের কুঁচকে আসা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দিলরুবা,আমি দিলরুবা ফরাজী।”
