Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ২

কিশোরী কন্যা পর্ব ২

কিশোরী কন্যা পর্ব ২
হামিদা আক্তার ইভা

“সকাল সকাল কোথায় গিয়েছিলি তুই?”
ময়ূরী কাঁচুমাঁচু করে ভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে আছে উঠোনে।ফিরোজা বেগম রেগে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে।সকাল হতে না হতেই মেয়েটা ঊড়াল দিয়েছে।ময়ূরীকে কোনো উত্তর দিতে না দেখে তিনি ভীষণ রেগে গেলেন।হাতে রাখা লাঠিটা উঁচিয়ে বললেন,
“বলবি নাকি মেরে হাড্ডি গুঁড়ো করবো?”
ময়ূরী আড়চোখে ফাহাদের কান্না দেখে মিনমিন করে বলল,
“চেয়ারম্যান বাড়ির ঘাটে গিয়েছিলাম।”
“কেন গিয়েছিলি?বাড়ি থেকে কেন বের হয়েছিস, হ্যা?তোর আব্বা কী বলেছিল ভুলে গেছিস?পাখা গজিয়েছে?”
“আম্মা আমি কী দরকার ছাড়া কখনো বাড়ির বাইরে বের হই?ভোর সকাল বলে ভাইকে নিয়ে একটু বের হয়েছিলাম।পুকুরে শাপলা দেখে তোমার ছেলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করেছিল,তাই তো পুকুরে নেমেছিলাম।”

“আজকেই শেষ।এমন দুঃসাহস আর দেখাবি না।যা গিয়ে পরিস্কার হয়ে রান্না ঘরে আয় আমার সাথে।”
ময়ূরী আঁতকে উঠে বলল,
“রান্না ঘরে যাব কেন?”
“রান্না শিখতে হবে না?শ্বশুর বাড়ি গিয়ে কী করবি?”
“পানি সিদ্ধ করে ডিম ভেঁজে খাইয়ে দেব আম্মা।”
“পানি আবার সিদ্ধ করে কিভাবে?”
“চুলায় গরম দিলেই সিদ্ধ হয়ে যায়।”
ফিরোজা বেগম কপাল চাপড়ে বিরক্ত হয়ে সরে গেলেন।মেয়ে দুটো হয়েছে একদম বদের হাড্ডি।বড়টা তো কোনো কথা শোনেই না আর ছোটটা হয়েছে বাঁদর।
ময়ূরী সকাল সকাল গোসল সেরে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।খাওয়া দাওয়া শেষে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পাশের বাড়ি মানে তার চাচার বাড়ির সামনে এসে উচ্চস্বরে শবনমকে ডেকে উঠল।শবনম তার চাচাতো বোন।দুজন একই ক্লাসে পড়ে।

খানিকক্ষণ পর বাড়ির ভেতর থেকে শবনম বেড়িয়ে এলো।মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ রেগে আছে।ময়ূরী জিজ্ঞেস করার আগেই শবনম ঝাড়ি মেরে বলল,
“বালের জীবন।আম্মা আবার শুরু করছে চিল্লানি।”
দুজনে স্কুলের পথে পা বাড়িয়েছে।স্কুল বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে।দুজনের গায়ে আকাশি রঙের বোরকা আর সাদা হিজাব।ময়ূরী চোখ জোড়া তাক করল শবনমের রাগান্বিত বদন খানায়।
“চাচি কেন বকেছে?”
“আব্বা মদ গিলে কাল রাতে বাড়ি এসে ঝামেলা করেছে।তোরা শুনতে পাসনি?”
“আমি তো ঘুমিয়েছিলাম।”
“উফ,কলিজা ভাঁজা ভাঁজা করে ফেলল আব্বা।এই মানুষটা একটু শান্তি দিল না।ভাইও ঢাকায় যাওয়ার পর আর খোঁজ খবর নেয় না।অশান্তি আর অশান্তি।”

শবনমের বাবা বক্কর ফরাজীর বড় ভাই।শবনম এবং লিটন দুই ছেলে মেয়ে তার।লিটনের বয়স ২৩।সে ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় চাকরি নিয়েছে বছর তিনেক আগে।আর শবনম পড়াশোনা করছে ময়ূরীর সাথেই।বাহাদুর ফরাজী নেশায় আসক্ত।কতবার বিচার হয়েছে তার ঠিক নেই।গ্রামের মানুষ ছিঃ, ছিঃ, করে তাকে নিয়ে।স্বামীর কারণে তার স্ত্রী বাড়ি থেকেও বের হতে পারেন না।কত মানুষ কত কটূ কথা বলে,যা তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে।
ময়ূরী মৃদু স্বরে বলল,
“শবনম, তোর আম্মারে আমি কাল দেখেছিলাম, কেমন কষ্টে মুখ ঢেকেছিল।চাচা তোকে মানুষ করছে না,উল্টো সর্বনাশ করছে।”
শবনম ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে নিলো।কিছুক্ষণ পর বলল,
“আম্মারে দেখলে বুক ফাইটা কাঁন্দতে ইচ্ছা করে।কেউ জানে না, রাতে কেমন নরক যাপন করি আমরা।শুধু আল্লাহই জানে।”

“তুই চিন্তা করিস না,একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
শবনম ম্লান হেসে বলল,
“সব ঠিক হয় না ময়ূরী,কিছু জিনিস কখনোই ঠিক হয় না।”
ওরা স্কুলে পৌঁছালো।প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকতেই খেলার মাঠ থেকে ভেসে এলো ছাত্রদের হাসি-ঠাট্টা।শবনম গিয়ে বেঞ্চে বসে বই বের করতে লাগল,কিন্তু ময়ূরীর মন আজ অন্য জায়গায়।ভোর সকালে ঘাটে দেখা সেই অচেনা চোখদুটো তার মাথায় ঘুরছে বারবার।
ওর বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি হচ্ছে।সে দেখেছিল শ্যামবর্ণের সেই সু-দর্শন পুরুষকে।সাহেব সাহেব একটা ভাব আছে লোকটার মধ্যে।হাতে ফোন নিয়ে গম্ভীর ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সিঁড়ির উপরে।অদ্ভুত চোখে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল লোকটা।ভীষণ অদ্ভুত সেই দৃষ্টির মানে।

বিকেল বেলা ময়ূরীদের বাড়িতে চেয়ারম্যান সাহেব এলেন কচিকে সাথে নিয়ে।সাথে তার ছোট নাতি রুহুল এসেছে।ফিরোজা বেগম ব্যস্ত হয়ে হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করলেন।বাড়ির উঠোনে বসেছেন সবাই।চেয়ারম্যান সাহেব গম্ভীর মুখে কচির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“বক্কর যা বলছে সব কথা সত্যি কচি?”
কচি চুপ করে রইলো।বয়স বেশি নয়,২৯-৩০ হবে।দুই বিয়ে করেছে।দুই বউ নিয়ে সংসার করতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা।দিনে বেলা মিস্ত্রীর কাজ করলেও রাতে চুরি করার স্বভাব আছে তার।গতকাল বক্করের দোকানে যা ছিল সব চুরি করেছে সে।চেয়ারম্যান সাহেবের ভয়ে আর মিথ্যে কথা বলতে পারল না সে।মাথা নিচু করে বলল,
“আমার ভুল হইছে,আর জীবনেও চুরি করমু না।”
চেয়ারম্যান সাহেব ধমক দিয়ে উঠলেন।

“কতবার এই এক কথা বলেছিস তুই?জেলের ভাত খাওয়াতে হবে এখন তোকে?”
“শেষবার একটা সুযোগ দেন চেয়ারম্যান সাহেব।”
“জরিমানা দিতে হবে নাহলে তোকে এবার জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব আমি।”
চেয়ারম্যান সাহেব ১৫ হাজার টাকা জরিমানা ধরলেন।কচির পক্ষে এত টাকা জরিমানা দেয়া অসম্ভব।সে চেয়ারম্যান সাহেবের পা ধরে কান্না কাটি শুরু করল।বক্কর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আড়চোখে একবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমার জরিমানা চাই না চাচা।আপনি শুধু ওকে বুঝিয়ে দেন,ও যেন কখনো আমার দোকানের আশেপাশে না আসে।”
চেয়ারম্যান সাহেব বুঝিয়ে শুনিয়ে কচিকে শাসিয়ে বাড়ি থেকে বের করলেন।তখন সূর্য ডুবু ডুবু ভাব।চেয়ারম্যান সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠছেন না।রুহুল দাদার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“সন্ধ্যা হয়ে এলো দাদা,আমরা যাবো কখন?”
চেয়ারম্যান সাহেব উত্তর দিলেন না।বক্করের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর বললেন,

“ময়ূরী কই?”
ফিরোজা বেগম বললেন,
“ঘরেই আছে।”
“ডাকো তো ফিরোজা,ওর সাথে একটু দেখা করে যাই।”
ফিরোজা বেগম ঘরে গিয়ে ময়ূরীকে নিয়ে এলেন।চেয়ারম্যান সাহেব চোখ তুলে তাকালেন ময়ূরীর দিকে।মেয়েটা একটু বেশিই সুন্দর।এই গ্রামে ময়ূরী আর মধু ছাড়া কোনো কুমারী বোধহয় শাড়ি পড়ে না।দুইবোন বেশ গোছালো,পরিষ্কার পরিপাটি।তিনি হাতের ইশারায় ময়ূরীকে কাছে ডাকলেন।ময়ূরী কাছে এগিয়ে এসে সালাম দিল।চেয়ারম্যান সাহেব সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
“পড়ালেখা কেমন চলতেছে ময়ূরী?”
“ভালোই যাচ্ছে দাদা।দোয়া করবেন সামনেই পরীক্ষা।”
“ভালো করে পড়।আমাদের বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসিস।”

ময়ূরী মাথা নাড়ল।চেয়ারম্যান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।বক্করের সাথে কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন।
চেয়ারম্যান বাড়ি হৈচৈ লেগেছে নুপুরের বিয়ে নিয়ে।একমাস পর বিয়ে আর বাড়ির মানুষ এখন থেকেই আয়োজন শুরু করেছেন।চেয়ারম্যান বাড়িতে সদস্য সংখ্যা অনেক।চেয়ারম্যান সাহেব অর্থাৎ বোরহান সওদাগর।তার তিন ছেলে।মেজ ছেলে মারা গেছেন আরও ১২ বছর আগে।বড় ছেলে রহমান সওদাগর তিনি অসুস্থ,বিছানায় পড়েছে।ছোট ছেলে রমজান সওদাগর ক্ষেত খামারের দেখা শোনা করছেন বর্তমানে।বড় ছেলের একটাই সন্তান,মাহতাব।সে রাজনীতি করছে।মেজ ছেলের তিন সন্তান।বড় ছেলে এবং ছেলের স্ত্রী গাড়ি একসিডেন্টে মারা গেছে বেশ কয়েক বছর আগে।আর বাকি দুই সন্তান তাহসিন এবং নূপুর।আর রইল রমজান সওদাগর,তার এক ছেলে দুই মেয়ে।কনক,কুসুম এবং রুহুল।
তাহসিন এবং পুতুল ছাড়া সবাই গ্রামেই থাকে।তাহসিন কাজের জন্য গ্রামে থাকতে পারে না।ঢাকায় তার নিজের ফ্ল্যাটে থাকে।
বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুমে শাড়ির দোকান খুলে বসেছে মেয়েরা।আগামী শুক্রবারে আংটি বদল হবে।আদনান চোখ মুখ কুঁচকে রেখে মেয়েদের কাহিনী দেখছে।রুহুলও পাশেই আছে।হঠাৎ করেই আদনান বলল,

“এই মেয়ে মানুষের কাজ কাম তো বুঝি না ভাই।সেই বিকেল থেকে শাড়ি দেখা শুরু করেছে আর এখন রাত ১০টা বাজতে চলল।”
রুহুল বলল,
“তুমি চোখ খুলে রাখছ কেন?বন্ধ করে রাখো।”
“তুই চুপ থাক রুহুলের বাচ্চা।বিয়ে কর তারপর বুঝবি।”
“বিয়ে করার সখ আমার নেই।তুমি যদি চাও তাহলে বলো একটা মেয়ে খুঁজে বিয়ে দিয়ে দেই।”
“আমি কী তোর আশায় বসে আছি হাদারাম?আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে আছি।”
রুহুল চোখ কপালে উঠিয়ে আশ্চর্য হয়ে তাকাল আদনানের দিকে।আর একটু শরীর ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল,
“এই তুমি কারোর সাথে প্রেম করো নাতো?”
আদনান লাজুক হাসলো।রুহুলের মনে হলো মেয়েদের মতো শুধু শুধু লজ্জা পাচ্ছে আদনান।
আদনান বলল,
“একটা আছে,মানে যার কাছে পুতুলকে রেখে এসেছে তাহসিন।”
“হিমি আপু?”

আদনান মাথা নাড়ায়।রুহুল নাক ছিঁটকে বলে,
“ইশ,হিমি আপু তোমার থেকে বয়সে বড় জানো না?”
“তো?”
“তো মানে?তোমার আব্বা তোমার পুক্কি ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিবে জানো?”
আদনান বিরক্ত হয়ে নাক মুখ কুঁচকে সেখান থেকে উঠে দাঁড়াল।হিমি তাদের টিমের একজন।বয়সে আদনানের থেকে দু’বছরের বড়।মেয়েটাকে সে পছন্দ করে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশেপাশে তাকিয়ে তাহসিনকে খুঁজেও পেল না।সে বাড়ির বাইরে বের হলো।তাহসিন বাগানে এসে সিগারেট ধরিয়েছিল।আদনানকে দেখতেই দুজন বাড়ি থেকে বের হলো অন্ধকারে,নিশ্চুপে।
রাত ১০টা মানে গ্রামে তখন গভীর রাত।প্রত্যেকটা বাড়ির লাইট বন্ধ হয়ে গেছে।ঘাট পেরিয়ে ওরা দুজন আর একটু সামনে আসতেই দুজন নর-নারীর ফিসফিসিয়ে কথা বলার শব্দ শুনতে পেল।আদনান ভয়ে তাহসিনের হাত জড়িয়ে ধরে ভীতু কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“দেখ ভাই আমি এখনো বিয়ে সাদি করিনি।এই অকালে ভূতে ঘাড় মটকালে আমার বউ বিধবা হয়ে যাবে।”
তাহসিন বিরক্ত হয়ে আদনানের হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে বলল,
“মূর্খ এটা মানুষের কণ্ঠস্বর।”
“অসম্ভব,এই রাত করে কে বটগাছের নিচে প্রেমালাপ করবে?”
তাহসিন দাঁত চেপে বলল,
“শালা,চুপ করবি নাকি থাপড়ে মুখের আঁকার বদলে দেব?”
আদনান চুপ হলে তাহসিন এগিয়ে যায় গাছের নিকটে।চওড়া গলায় বলে,
“কে ওখানে?”

সাথে সাথে তার পাশ দিয়ে কেও দৌঁড়ে ছুটে গেল।তাহসিন হতভম্ব হয়ে তাড়াতাড়ি ফোনের ফ্লাশ অন করে পেছনে ধরেও দেখতে পারল না কিছু।আদনান চিৎকার দিয়ে তাহসিনের পা জড়িয়ে ধরেছে।তাহসিন ফোন সামনে ধরতেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“মধুমিতা?”
মধু ভয়ে কাঁপছে।মেম্বারের ছেলে রাজুর সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক।দেখা করতে এখানে এসেছিল।ভয়ে চোখে পানি চলে এসেছে।তাহসিন গম্ভীর হলো মুহূর্তেই।দৃষ্টি নত করে আদনানের অবস্থা দেখে দাঁত চাপল।
“উঠবি নাকি অন্য ব্যবস্থা নেব?”
আদনান উঠল না।অমন করেই বসে রইল।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর চোখে মধুর দিকে তাকাল।
“এই রাত করে এখানে কী করছ মধুমিতা?”
মধু আমতা আমতা করে বলল,

“আগে বলুন,আব্বাকে কিছু বলবেন না?”
“বলব না।”
মধু শুকনো ঢোক গিলে মাথা নিচু করে বলল,
“মেম্বারের ছেলে রাজু ভাইয়ের সাথে আমার একটা সম্পর্ক আছে।”
“হোয়াট?”
মধু হাত একত্রিত করে বলল,
“দয়া করে আব্বাকে কিছু বলবেন না ভাইয়া।আব্বা জানলে আমাকে মেরেই ফেলবে।”
তাহসিন ধমকে উঠল মধুকে।রাগ যেন মাথায় চড়ে বসেছে।
“রাজুর ব্যপারে কিছু জানো তুমি?কোন আক্কেলে এত রাতে বাড়ির বাইরে বের হয়েছ?আবার বলছ আব্বাকে না বলতে।”
মধু ডুকরে উঠল ভয়ে।তাহসিন মাথা ঠান্ডা করে আদনানকে সাথে করে মধুকে ওর বাড়ি অব্দি দিয়ে এলো।রাজুকে নিয়ে সাবধানও করল।যত পারে তত যেন ওর থেকে দূরে থাকে।বক্কর চাচার মেয়ে যে এমন হবে সেটা তাহসিনের ধারণার বাইরে ছিল।তার আদর্শে বড় হয়ে কিনা মেয়ে কালো জগতে পা রাখছে।রাজু এই গ্রামের মেম্বারের ছেলে।বখাটে,গ্রামে মেয়েদের বিরক্ত করা ওর কাজ।আর সেই ছেলের সাথেই কিনা মধু প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছে।

পরেরদিন ছিল শুক্রবার।সেদিন সকালে তাহসিন আদনানকে নিয়ে ময়ূরীদের বাড়ি এলো।বক্কর হাত মুখ ধুয়ে গামছা দিয়ে মুখ পরিষ্কার করছিলেন।এত সকাল সকাল তাহসিনকে দেখে ব্যস্ত হয়ে বারান্দায় চৌকিকে বসতে দিলেন।তাহসিন সালাম দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করল।ফিরোজা বেগম রান্না ঘরে রান্না করছিলেন।তাহসিনকে দেখেই চা বসিয়েছেন।
বক্কর বললেন,
“গ্রামে কবে আসছো তাহসিন?কত বছর পর আমার বাড়িতে আসলা।”
তাহসিন বলল,
“পরশু এসেছি চাচা।ভাবলাম আপনার সাথে একবার দেখা করে আসি।”
“ভালো করেছ।পুতুল ভালো আছে?”
তাহসিন মৃদু হাসলো।কণ্ঠে উদাসীনতা থাকলেও হেসে বলল,
“আল্লাহ ভালো রেখেছে চাচা।কিন্তু ও তো গ্রামে আসতে চায় না।বাড়িতে এলেই কান্না কাটি করে,তাই ঢাকায় রেখে এসেছি।”
“কী বলো এসব?ওটুকু মেয়ে একা ঢাকায় থাকতে পারবে?”
“আমার এক বান্ধুবীর কাছে আছে।আগামী শুক্রবারে চলে যাব ভাবছি।”
“যাক ভালো।”

আদনান চৌকিকে পা উঠিয়ে বসে ময়ূরীদের পুরো বাড়িটা পর্যবেক্ষণ করছে।ছোট খাটো একটা বাড়ি।ফিরোজা বেগম গলা ছেড়ে ছোট মেয়েকে ডাকছেন রান্না ঘরে।তাহসিন আড়চোখে ফিরোজা বেগমের দিকে তাকিয়ে বক্করকে বলল,
“চাচা মধুমিতার কী খবর?পড়াশোনা করছে?”
“না আব্বা,ও উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে এবার।ছোট মেয়েটার মতো ওর পড়াশোনা তেমন একটা ভালো নয়।সে পড়তে চায় না।ভাবছি এবার বিয়েটা নিয়ে ভাববো।”
তাহসিন ভ্রু যুগল কুঁচকে বলল,
“ছোট মেয়ে মানে?”
ঠিক তখন ঘরের ভেতর থেকে এক কিশোরী কোমর সমান চুল গুলো হাত খোঁপা করতে করতে তাড়াহুড় করে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে এলো।রান্না ঘরের সামনে গিয়ে ঘুমঘুম কণ্ঠে বলল,
“আম্মা একটা দিনও কী তুমি আমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দিবা না?”
ফিরোজা বেগম ধমক দিয়ে বললেন,
“বাড়িতে মেহমান এসেছে আর তুই ঘরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস?”
“এই সাতসকালে আবার কে এসেছে?”

ময়ূরী ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের বারান্দার দিকে কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে তাকাল।তাহসিনের সাথে চোখাচোখী হতেই কিছুটা ঘাবড়ে গেল।পুকুর পাড়ের সেই লোকটা।অদ্ভুত চাহনীর অচেনা পুরুষ।
ফিরোজা বেগম তিন কাপ চা আর বিস্কুট ট্রে’তে দিয়ে ময়ূরীর হাতে দিলেন।অন্য চুলায় তিনি রান্না বসিয়েছেন যার জন্য তিনি উঠতে পারছেন না।
ময়ূরী বারান্দার নিকট এগিয়ে এসে একটু ইতস্তত করে ট্রে নামিয়ে একে একে তিন কাপ চা দিল।
বাবার হাতে দিল,তারপর আদনানের হাতে।শেষে কাঁপা কাঁপা হাতে কাপ এগিয়ে দিলো তাহসিনের দিকে।
ঠিক তখনই হাত ফোঁসকে কাপটা সামান্য হেলে গেল।গরম চা সোজা গিয়ে পড়ল তাহসিনের প্যান্টের গোপন অঙ্গে।তাহসিন দাঁত চাঁপল।
আদনান সঙ্গে সঙ্গেই চেঁচিয়ে উঠল,

কিশোরী কন্যা পর্ব ১

“গেলো গেলো গেলো! হায় হায়!তোর বংশবিস্তারের ক্ষমতা শেষ ! “
ময়ূরী ভয়ে আঁতকে উঠে দুই হাত মুখে চাপা দিল,
“হায় আল্লাহ! আমি ইচ্ছা করে করিনি।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩