কিশোরী কন্যা পর্ব ২১
হামিদা আক্তার ইভা
চারপাশটা তখন অন্ধকার।নিশ্চুপ নীরব রাস্তায় ময়ূরী ফরাজী বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে।পাশে আদনান ঘুমন্ত ফাহাদকে কোলে নিয়ে সঙ্গ দিচ্ছে।হাঁটতে হাঁটতে ওরা ফরাজী বাড়ির সামনে চলে এলো।পুরোটা রাস্তা ময়ূরী চুপ ছিল।বাড়ির কাছে আসতেই সে হাত বাড়িয়ে ফাহাদকে কোলে নিয়ে নিচু গলায় বলল,
“আপনাকে ধন্যবাদ ভাইয়া।”
আদনান শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে অনুরোধ স্বরে বলল,
“ভাবি,এটা কী ঠিক হচ্ছে?এত রাতে আপনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন।এসব যখন সবাই জানতে পারবে তখন কী হবে ভেবেছেন?”
ময়ূরী আপছা আলোয় আদনানের চিন্তিত বদন পানে তাকাল।বলল,
“কী হবে?সবাই বলবে সওদাগর বাড়ির ছোট বউ রাত করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে?আপনি চিন্তা করবেন না ভাইয়া।আপনাদের কারোর বদনাম হবে না।হলে ময়ূরীর হবে।”
সে বাড়ির দরজার সামনে হেঁটে গিয়ে পিছু ফিরে বলল,
“বাড়ি ফিরে যান।আজ আসি!”
সে বাড়ির দরজায় শব্দ করল।আদনান তখন আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।এই রাত করে বক্কর ফরাজীর মুখোমূখী হওয়ার সাহস তার নেই।মিনিট কয়েক পর বক্কর এসে বাড়ির দরজা খুলে দিলেন।এই রাত করে আপছা আলোয় মেয়ের অস্পষ্ট মুখশ্রী দেখে চমকে উঠলেন।ময়ূরী তাকাল বাবার চমকিত বদনে।বক্কর চোখ বড় বড় করে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
“তুই এত রাতে?ময়ূরী,আম্মা আমার কী হয়েছে?”
ময়ূরী বাবার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল।গুটি গুটি পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল।ফাহাদের ঘুম ভেঙে গেছে।তাকে ময়ূরী নিচে নামিয়ে দিতেই ভেতরের ঘর থেকে ফিরোজা বেগম ঘুমঘুম চোখে বেরিয়ে এলেন।হঠাৎ ছোট মেয়েকে এই সময়ে বাড়িতে দেখে ঘুম ছুটে গেল।আতঙ্কিত হয়ে এগিয়ে এসে বললেন,
“কিরে তুই এখানে?জামাই কোথায়?”
ময়ূরী ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ঘরের কোনায় বিছানায় গিয়ে পা উঠিয়ে বসল।মাথার কাপড় সরিয়ে ফেলতে গিয়েও থেমে গেল।জেদ ধরে এক মুহূর্ত চুপ থেকে মাথার কাপড় নামিয়ে ফেলল।ফিরোজা বেগম আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলেন।বক্কর তাড়াহুড়ো করে ঘরে প্রবেশ করলেন।ফাহাদ চাদর টেনে বিছানায় উঠে বোনের মুখের সামনে উকি মেরে বলল,
“আপা,আমারে কুলে নিবা?”
ময়ূরী কোল পেতে ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরল।বাচ্চাটার ঘুম হয়নি।মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে নিশ্চিত এখন ঘুমিয়ে যাবে।ঘুমিয়েও গেল সে।এতদিন পর বাবা মাকে দেখেও কাছে এগিয়ে গেল না।উল্টো বোনের বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করল।
বক্কর এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে বসলেন।গলা শুকিয়ে এসেছে ভয়ে।তিনি নিচু স্বরে বললেন,
“কী হয়েছে ময়ূরী?এত রাতে একা এসেছিস কেন?জামাই কোথায়?”
ময়ূরী বলল,
“আব্বা,আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।”
ফিরোজা বেগম কিছু বলতে গেলে বক্কর থামিয়ে দিলেন চোখের ইশারায়।বক্কর শুকনো ঢোক গিলে শান্ত গলায় বলেন,
“রাতে খেয়েছিস?”
“না!”
বুকটা কামড়ে ধরল বক্করের।তিনি বললেন,
“আম্মা খাইয়ে দিক।তারপর ঘুমা।”
ময়ূরী বালিশ ঠিক করে ভাইকে শুইয়ে দিতে দিতে বলল,
“আব্বা,আমার খিদে নেই।আমার গলা দিয়ে কিছু নামবে না।তোমরা গিয়ে ঘুমাও।”
সে বালিশে মাথা রেখে উল্টো ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করল।ফিরোজা বেগম ঘরের লাইট বন্ধ করে তাদের ঘরে গেলেন।মেয়েটা খাওয়ার ঘরের বিছানায়’ই ঘুমিয়ে পড়ল।বক্কর ঘরে আসতেই তিনি চিন্তিত হয়ে বললেন,
“আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।মেয়েটা এই রাত করে কেন এই বাড়িতে এলো?”
বক্কর বিছানায় বসে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“সকাল হোক তারপর ওর সাথে কথা বলা যাবে।জোর করে কিছু জানতে যেও না।”
সারাটা রাত নির্ঘুমে কাটল ষোড়শীর।ভোর হতেই ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।তখন ভালো করে আলো ফুটেনি।ময়ূরী গুটি গুটি পায়ে পুকুর পাড়ের দোলনায় গিয়ে বসল।আকাশটা আস্তে আস্তে রঙিন হচ্ছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।ফিরোজা বেগম নামাজ শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এলেন।আপছা আলোয় ময়ূরীর অবয়বটা দেখে তিনি এগিয়ে গেলেন মেয়ের কাছে।পুকুরের সিঁড়িতে বসে ময়ূরীর দিকে ফিরলেন।ময়ূরী তখনও চুপ-চাপ।তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আম্মাকে বলবি না কী হয়েছে?”
ময়ূরী দোলনার দড়িতে মাথা ঠেকিয়ে পুকুরের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
“সংসার কিভাবে করে আম্মা?তুমি সংসার সামলানো শিখেছ কিভাবে?”
থেমে আবার মৃদু গলায় বলল,
“তোমার কাছে আর কী আড়াল করে রাখব আম্মা?আমি না সংসার কী জিনিস এখন অব্দি বুঝতে পারিনি।তোমার উচিত ছিল বিয়ে দেয়ার আগে সব শিখিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠানো।”
“কী হয়েছে ময়ূরী?এসব কেন বলছিস মা?”
ময়ূরীর কণ্ঠে কাঁপন ধরল।চোখ বন্ধ করে নরম গলায় বলল,
“যদি বলি আমি একেবারে চলে এসেছি এই বাড়ি,তাহলে কী তুমি আমায় রাখবে এই বাড়িতে?”
ফিরোজা বেগম বাকরুদ্ধ মেয়ের কথায়।তিনি মেয়ের বিষণ্ণ মুখখানা দেখে উদগ্রীব হয়ে বললেন,
“জামাইয়ের সাথে ঝগড়া করেছিস?রাগারাগী করে এসেছিস তাই তো?”
“নাহ!”
“তাহলে হয়েছে কী?”
ময়ূরী সোজা হয়ে বসল।শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইল।নিজের কথা গুছিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আম্মা,একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“হুম?”
“আমি কী একটু বেশি’ই অবুঝ?”
ফিরোজা বেগম যেন উত্তর দিতে পারলেন না।ময়ূরীও আর উত্তরের আশা করল না।সে বসে রইল,চুপটি করে বসে রইল।বেলা গড়াল নিজ নিয়মে।রান্না-বান্না হয়ে গেছে তখন।ময়ূরী হাত-মুখ ধুইয়ে বারান্দায় চৌকিতে বসে ছিল।ঘরের ভেতর থেকে ওয়াহিদ এসে তার পাশে বসল।আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ময়ূরীকে এই বাড়িতে দেখে বেশ অবাক হয়ছিল সে।গতকাল বিকেল বেলা গিয়ে আবার রাত করে একা ফিরেছে মেয়েটা।সে বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে।ময়ূরীর স্বভাব কিছুটা চাপা।দুনিয়া উল্টে গেলেও কারোর সাথে নিজের লুকায়িত কথা শেয়ার করতে পারে না কিংবা নিজ ইচ্ছায় করে না।যন্ত্রণায় ছটফট করে যদি বুকে ব্যথাও হয়,তবু মেয়েটা চুপচাপ সেটা সহ্য করতে পারে।
“কিরে,সাতসকালে পেত্নির মতো বসে আছিস কেন?”
ওয়াহিদের কথায় ময়ূরী ভ্রু-কুঁচকে বলে,
“এখন কী তোমার ঘাড় মটকাবো?”
“সেটাই তো পারিস শুধু।”
“এখন কী আমার সাথে তোমার ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে?”
“আমি ঝগড়া করি?এত বড় অপবাদ?”
মেয়েটা আলতো হেসে মাথা নাড়ল।বলল,
“তোমার সাথে আমি পারব না।ফ্রেশ হয়েছো?”
“হ্যা!”
“তাহলে ঘরে যাও আম্মা খাবার দিবে এখনই।”
সকালে সবাই একসাথে খেতে বসলেন।ছোট ফাহাদ ময়ূরীর কোলে ছটফট করছে।বক্কর ছোট মেয়ের মুখ-পানে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ ধরে।ফিরোজা বেগম খাবার বাড়তে বাড়তে ফাহাদকে বললেন,
“আপাকে বিরক্ত করছিস কেন?এদিকে আয়।”
ফাহাদ ঠোঁট উল্টে ময়ূরীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি আপার কাচে থাকি।”
“এত আপা আপা করলে হবে?আপার এখন বিয়ে হয়েছে,তাকে তো জামাই বাড়ি থাকতে হবে আজীবন।তোকে নিয়ে থাকতে পারবে সে সব সময়?”
ময়ূরী ভাইয়ের আদুরে গালে হাত বুলিয়ে নাকে নাক ঘষে বলল,
“আমার ফাহাদ আমার কাছেই থাকবে।”
ফাহাদ খিলখিল করে হেসে উঠল।ময়ূরীর গালে গাল লাগিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“আমি তুমার কাচে থাকমু।”
“আচ্ছা।”
“মুজা কিনা দিবা না?”
“দিব।”
“কবে?”
“আজই।”
ফাহাদ খুশি হলো ভীষণ।ময়ূরী মাত্র ভাতে হাত দিয়েছিল,ঠিক তখন ফাহাদ শরীর দুলাতে দুলাতে বলল,
“আপা,দুলাবাই কুই?”
ময়ূরীর হাত থেমে গেল প্লেটে।দৃষ্টি নত করে সাদা ভাতের দিকে তাকিয়ে রইল।ভাত গুলো দেখে মনে হচ্ছে একটা ভাতও তার গলা দিয়ে নামবে না এখন।মেয়েটা শুষ্ক ঠোঁট ভেজালো।ফিরোজা বেগম সুযোগ পেয়ে বললেন,
“জামাই এলো না কেন?এত রাতে একা একা এলি যে?”
ময়ূরী ছোট করে জবাবে বলে,
“আসলাম।”
“এটা কী ঠিক করেছিস?জামাইকে রেখে একা এলি কেন?”
ময়ূরী চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল।ঠান্ডা গলায় বলল,
“সেটার উত্তর তো তোমাদের দেয়ার কথা আম্মা।”
ফিরোজা বেগম আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“আমাদের?”
ময়ূরী লম্বা শ্বাস টানল।ফাহাদকে পাশে ঠিক করে বসিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি..আমি ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি।”
ফিরোজা বেগমের হাতের চামচটা থেমে গেল মাঝ-পথে।বক্কর যেন নিঃশ্বাসটাই ভুলে গেলেন এই মুহূর্তে।ওয়াহিদ বিস্ময়ে চেয়ে রইল ময়ূরীর মুখের দিকে।ফাহাদ কিছুই বোঝে না,কেবল আপার গা ঘেঁষে বসে খিলখিল হেসে যাচ্ছে।মধু আশ্চর্য হয়ে বোনের কথা শুনছে।
প্রথমে বক্করই গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“মানে? বেরিয়ে এসেছিস মানে? ঝগড়া করেছিস?জামাইয়ের সাথে ঝামেলা হয়েছে?”
ময়ূরী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল,
“আমি নিজে এসেছি।”
ফিরোজা বেগমের কণ্ঠ কাঁপল,
“কেন? কেন এসেছিস?এমন কী হয়েছে?”
ময়ূরী ঠোঁট চেপে ধরল।কথা জমে আছে কিন্তু বেরোতে পারছে না।অন্তরটা যেন পাথর চাপা ভারে ভরা।সে কীই বা বলবে সবাইকে?বলবে,তাহসিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছে?বলবে,তোমাদের জামাই আমায় বিশ্বাস করে না?নাকি বলবে,তোমাদের মেয়ে নিজের সংসার ধরে রাখতে পারেনি।বক্কর বললেন,
“তাহসিন কিছু বলেছে আম্মা?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে বলল,
“উহুম!উনি তো কিছুই বলেননি।তোমাদের মেয়েই সংসার করতে পারল না।তোমরা সংসারের আসল অর্থ না বুঝিয়েই মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছো।তোমাদের মেয়েই যদি সংসার ধরে রাখতে না পারে তাহলে তাদের দোষ দিয়ে লাভ আছে?”
“কী নিয়ে ঝামেলা হলো না বললে বুঝব কী করে মা?আমাদের না বললে আর কাকে বলবি?”
“কী বলব আব্বা?বলব,তোমরা আমার সাথে প্রতারণা করেছো?নাকি বলব,আমার শ্বশুর বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ আমায় এতদিন অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখেছিল?”
ফিরোজা বেগম স্বামীর সাথে চোখাচোখী করলেন।ভীতু কণ্ঠে বললেন,
“মানে?”
“যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে তার তো কোনো অতীত নেই আম্মা।আর না পুতুল তার সন্তান।তাহলে তোমরা কেন আমায় এতদিন সত্যি কথাটা বলোনি?তোমার গর্ভে জন্ম আমার।আচ্ছা আম্মা,তুমি তো সব জানতে বলো?উনি যে আগে কখনো বিয়ে করেননি এবং পুতুল তার সন্তান নয় এটা তো তোমরা সবাই জানতে।জানতে না বলো?”
ফিরোজা বেগমের মুখ শুকিয়ে এলো।তিনি আমতা আমতা করে কিছু বলতে গেলে ময়ূরী বলে,
“সব কিছুই জানতে।তোমাদের কী একটাবার এই ব্যাপারটা জানানো দরকার ছিল না?শুধু একটাবার কী বলা যেত না সত্য কথাটা?তোমরা সবাই’ই তো আমার সাথে ছলনা করলে আম্মা।একটা মানুষও আমাকে সত্য কথাটা বলার প্রয়োজনবোধ করেনি।এমনকি পুতুলের বাবাও না।লোকটা আমায় একটাবারের জন্য বিশ্বাস করল না।আমি কী শুধু কবুল পড়ে পুতুলের মা আর ঐ বাড়ির বউ হয়েছিলাম?”
ময়ূরী উঠে দাঁড়াল।তার দেখা-দেখি ফাহাদও উঠে দাঁড়াল।ময়ূরী মধুর ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
“আমি ঐ সংসার ছেড়ে চলে এসেছি আম্মা।আমায় আর কেউ কোনো প্রশ্ন করো না।কোনো প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।”
মেয়েটা ভাইকে নিয়ে বোনের ঘরে ঢুকতেই ফিরোজা বেগম আঁচলে মুখ চেপে কেঁদে উঠলেন।বক্কর গম্ভীর মুখে বসে আছেন।গতকাল রাতে তাহসিন এসেছিল বাড়ির আঙিনায়।বারান্দায় চুপটি করে বসে ছিল চৌকিতে।ছেলেটা একটা কথাও বলেনি,উল্টো শ্বশুর বিভ্রান্ত করে চলে গেছে।এখন তিনি পুরো ঘটনাটা বুঝতে পেরেছেন।
সওদাগর বাড়ি সকাল সকাল তোলপাড় শুরু হয়েছে ড্রয়িংরুমে।তাহসিন মাথা নিচু করে সোফায় চুপচাপ বসে আছে।বোরহান সওদাগর ঠিক তার পাশে বসে চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছেন।পুতুল ভয়ে হিমির কাছ থেকে গুটি গুটি পায়ে বাবার সামনে এসে দাঁড়াল।বাবার চোখের নিচে কালো দাগ দেখে ঠোঁট উল্টে বলল,
“মা কোথায় বাবা?সবাই তোমাকে বকছে কেন?”
তাহসিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে হিমিকে বলল,
“ওকে নিয়ে আমার ঘরে যা হিমি।বাইরে বের হোস না।”
হিমি তাই করল।পুতুলকে জোর করে উপরে নিয়ে গেল।আফিয়া আশ্চর্য হয়ে দেবরের কাণ্ড দেখছে।তাহসিন কিনা বউকে রাত করে বাইরে ছেড়ে দিয়েছে?এটা আদৌ সম্ভব?মেয়েটা শ্বাস আঁটকে দাঁড়িয়ে আছে শাশুড়ির পাশে।বোরহান সওদাগর ক্ষিপ্ত হলেন এবার।তাহসিন উত্তর দিচ্ছে না বলে তিনি ধমক দিয়ে বললেন,
“শিক্ষিত হয়ে অশিক্ষিতর মতো কাজ করলে কিভাবে?মূর্খের মতো বউকে একা ছেড়ে দিয়েছো রাত করে।কথা কেন বলছো না?একে তো বক্কর এই বিয়েতে রাজী’ই ছিল না,এখন তুমি যেই কাজ করেছো এটার পর আমি তাকে মুখ দেখাব কী করে?”
অরুণিমা বেগম শক্ত গলায় বললেন,
“আজ প্রথম এমন একটা নোংরা ঘটনা ঘটল।কোন আক্কেলে এমন একটা কাজ করেছো তাহসিন?”
তাহসিন ক্লান্ত চোখ জোড়া বন্ধ করে গম্ভীর স্বরে বলল,
“পুতুলের ব্যপারে ময়ূরীর সাথে কে কথা বলেছে?বড় ভাবি?”
আফিয়া শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“আমি ওকে কিছু বলিনি।”
“তাহলে ও জানলো কী করে এসব?কে বলেছে পুতুল আমার সন্তান নয়?”
রজনী বেগম ঠান্ডা স্বরে বললেন,
“সত্যি একদিন না একদিন সামনে আসেই।আজ নাহয় কালকে তো ও জানতেই পারত।”
তাহসিন গলা শক্ত করল।বলল,
“কেউ কিছু না বললে কীভাবে জানতে পারত দাদি?আমি বার বার বলেছিলাম বিয়েটা নিয়ে তোমরা বেশি লাফাচ্ছ।আমি বিয়ে করতে চাইনি,তবু তোমরা জোর করে বিয়েটা দিলে।”
“জোর কইরা বিয়া দিছি দেইখা আমাগো ভুল হইছে?তোর কী জীবন নাই?শখ নাই?পুতুলের লাইগা তুই কেন জীবন নষ্ট করবি?”
“দাদি,ও আমার মেয়ে।ভাবনা-চিন্তা করে কথা বলো।”
বোরহান সওদাগর বিরক্ত হয়ে বললেন,
“পুতুল তোমার সন্তান নয়।তাকে তুমি জন্ম দাওনি তাহসিন।”
তাহসিনের চোখ ভিজে আসছে।বার কয়েক শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“আমি ওকে জন্ম দেইনি দাদা,কিন্তু ওকে বড় করেছি আমি।এই আমি একটা দুধের বাচ্চাকে বুকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়েছিলাম।নিজের কথা চিন্তা না করে আমার মেয়ের কথা ভেবেছি আমি।এই স্বার্থপর তাহসিন মেয়ের যত্ন নিতে গিয়ে দিনের পর দিন না খেয়ে কাটিয়েছি।কেন করেছি দাদা?আমি ওকে জন্ম দেইনি বলে আমি ওর বাবা হতে পারব না?আমি চাইলেই তো ওই বাচ্চাটাকে তোমাদের কাছে রেখে মানুষ করতে পারতাম।এত কষ্ট করার কোনো দরকার ছিল আমার?তোমরা মানো কিংবা না মানো,পুতুল আমার মেয়ে।আমি ওর বাবা।”
তাহসিনের গলা ভেঙে এসেছে।চোখ দু’টো লাল টকটকে।উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে তাহসিনের কথা শুনল।এটা সত্য কথা,চার মাসের একটা দুধের শিশুকে নিয়ে তাহসিন গ্রাম ছেড়েছিল।বাচ্চাটাকে সে একাই মানুষ করেছে। পুরুষ হয়ে একটা বাচ্চাকে একাই বড় করেছে।আফিয়ার একটা বাচ্চা নেই।সে বলেছিল পুতুলকে নিজের মেয়ের মতো করে বড় করবে সে।কিন্তু তাহসিন নিজের বুক খালি করে ভাবির কোলে তুলে দিতে নারাজ ছিল।স্বার্থপর হয়ে জেদ ধরে কোলে ছোট বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল।
কিছু বছর আগের ঘটনা।সওদাগর বাড়ি ভর্তি মানুষ তখন।তাহসিনের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে।সে ঢাকায় পড়াশোনা করেছে এসএসসি দেয়ার পর থেকেই।হোস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করতো তখন।কোরবানি ঈদ সামনে সপ্তায়।বাড়ি থেকে ঘনঘন ফোন আসছে।শুক্রবার দিন।সে জুম্মার নামাজ পড়ে না খেয়েই ব্যাগ গুছিয়ে বের হলো বাড়ির বাইরে।উদ্দেশ্য আজ বাড়ি গিয়ে সবাইকে চমকে দেবে।বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত হলো।সওদাগর বাড়ির গেটের সামনে আসতেই দারোয়ান আশ্চর্য হয়ে গলা চওড়া করে বলল,
“তাহসিন আইছো?আরে আব্বা ভেতরে আসো।”
শ্যাম বর্ণের সেই পুরুষ গাল ভরে হাসল।দারোয়ান চাচাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কী খবর তোমার?আমাকে ভুলে গেছো নাকি?”
“কী কও বাজান?তোমারে ভোলা যায়?তুমি’ই তো বাড়ি আসো না।”
“পরীক্ষা ছেড়ে বাড়ি ফিরি কী করে?”
সে টুকটাক কথা বলে সদর দরজা পেরিয়ে বিশাল ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল।সেখানে চৌদ্দ বছরের নুপুর বসে বসে ছোট ছোট কাঁথা সেলাচ্ছিল বড় আম্মার সাথে বসে।সদর দরজার সামনে ভাইকে দেখে চিৎকার দিয়ে দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে।তাহসিন হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ছাড় ফাজিল।আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গেছে।”
সিতারা বেগম তাহসিনকে দেখে কাঁথা রেখে উঠে দাঁড়ালেন।রাগ দেখিয়ে বললেন,
“কে রে তুই?হঠাৎ বাড়ি ফিরলি কেন?না এলেই পারতি।”
তাহসিন বড় আম্মার রাগ বুঝে কান চেপে ধরে বলল,
“এইযে কান ধরেছি বড় আম্মা।তুমি তো জানো আমার পরীক্ষা ছিল।”
“বুঝেছি আর বাহানা দিতে হবে না।”
ছেলের কণ্ঠস্বর শুনে রান্না ঘর থেকে অরুণিমা বেগম ছুটে বের হলেন।ছোট ছেলেকে এই সময়ে বাড়ি উপস্থিত দেখে হাতের খুনতি উঁচিয়ে ছুটে এসে বললেন,
“বাড়ি ফিরলে কেন তুমি?কেন এসেছো বাড়িতে?”
তাহসিন মায়ের হাতে মার খাওয়ার ভয়ে দূরে সরে গিয়ে গলা চওড়া করে বলল,
“তুমি রেগে যাচ্ছো কেন?এতদিন পর এলাম,কই একটু আদর-যত্ন করবে—তা না করে আমাকে মারতে আসছো?”
“মাথায় তুলে নাচব?কতবার বলেছি বাড়ি ফিরতে?পরীক্ষা শেষ হয়েছে সেই কবে আর তুমি এখন এসেছো ঢঙ করতে?”
নিচে হইহুল্লোড়ের শব্দ শুনে দো’তলার উপরে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়াল তাহসিনের বড় ভাইয়ের বউ,অর্পিতা।৯ মাসের ভরা পেট নিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়াল।তাহসিনকে দেখে দাঁত কটমট করে বলল,
“আম্মা,তুমি ওকে এখনই বাড়ি থেকে বের করো।বজ্জাত বাড়ি ফিরল কেন?”
তাহসিন আশ্চর্য হয়ে ভাবির দিকে ঘাড় উঁচু করে উপরে তাকাল।অভিমানী স্বরে বলল,
“তোমরা এত পাষাণ ভাবি?আমি এতটা রাস্তা কত কষ্ট করে এসেছি।আর বাড়ি ফিরতেই তোমরা সবাই আমাকে মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার প্ল্যান করছো?”
“তাহলে কী করব শুনি?”
“রাগ করছো কেন ভাবি?”
নুপুর দৌঁড়ে গিয়ে ভাবিকে সাথে করে সাবধানে নিচে নেমে এলো।তখন বাড়ির প্রত্যেক মহিলা প্রায় হাজির হয়েছে সেখানে।অর্পিতা এগিয়ে এসে তাহসিনের কান চেপে ধরে বলল,
“মার খাবে মিশু?আমার কল কেন ধরো না তুমি?”
তাহসিন দাঁত খিঁচে বলল,
“আগে কান ছাড়ো ভাবি।তোমাদের এই ঝগড়া-ঝাটি দেখে তোমার ছাও’টা না আবার ঝগড়ুটে হয়।”
অর্পিতা হাল ছাড়ল।তাহসিন ভাবিকে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল।ভাবির ইয়া বড় পেট দেখে অবাক হয়ে বলল,
“তোমার পুঁচকু আসছে না কেন এখনো?সেই বছর খানিক আগে শুনেছি আমি চাচা হব।”
অরুণিমা বেগম রান্না ঘরে ছুটে গেলেন।রান্না বসিয়ে এসেছেন তিনি।আফিয়া তখন দাদি শাশুড়ির ঘর থেকে বের হতে হতে বলল,
“ভাইয়ের দেখি সহ্য হচ্ছে না আর।বাবার থেকে চাচার টান বেশি।”
তাহসিন পিছু ফিরে আফিয়াকে দেখল।গায়ের শার্ট ঠিক করতে করতে বলল,
“তা তো হবেই।রক্ত তো আমারই।”
কিশোরী কন্যা পর্ব ২০ (২)
হেসে ফেলল তিন’জনই।তাহসিনের বড় ভাই তাহসান সওদাগর।পেশায় পুলিশ অফিসার।চাকরির কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে বাড়িতে তেমন একটা থাকা হয় না।মাহতাব তখন রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত।তাহসিন আর রুহুল বাদে বাড়ির প্রত্যেকটা পুরুষ নিজ কর্মে ব্যস্ত তখন।সেদিন বাইরে ঘনকালো মেঘলা ছিল।রাত প্রায় ১টার কাছাকাছি সময়।অর্পিতার সাথে অরুণিমা বেগম সেদিন ঘুমিয়েছেন।তাহসান বাড়ি ফিরেনি তখনও।রাত পেরিয়ে যখন ভোরের দেখা মিলল তখন তাহসান বাড়ি ফিরল ক্লান্ত শরীর নিয়ে।তাহসিন দাদার সাথে মসজিদে গিয়েছিল ভোরে।তারা যেহেতু জাগ্রত ছিলো তাই তাহসানের সাথে তাহসিনের ভোর বেলায় বাড়ির বাগানে দেখা হলো।তাহসান ছোট ভাইকে দেখে মুখ গম্ভীর করে বুক টানটান করে দাঁড়াল সদর দরজার সামনে।তাহসিন হালকা গলা কেঁশে দু’পা এগিয়ে এসে বলল,
“টানা ২মাস আমার পেট খারাপ ছিল ভাই।তুমি’ই বলো,এই পেট খারাপ নিয়ে আমি বাড়ি ফিরতাম কী করে?”
