কিশোরী কন্যা পর্ব ৩
হামিদা আক্তার ইভা
ময়ূরী হতভম্ব হয়ে তাহসিনের ধমক শুনে এক মুহূর্ত স্থির রইলেও পরক্ষণে আবার ওর প্যান্টের দিকে ঝুঁকে হাত বাড়াতে গেলে তাহসিন তাড়াতাড়ি ময়ূরীর হাত শক্ত করে চেপে ধরে থামিয়ে দিল।
ময়ূরী তাড়াহুড় করে বলল,
“হাত ধরলেন কেন?মুছতে দিন?নাহলে পুড়ে যাবে তো!”
তাহসিন দাঁত চেপে বলল,
“আর একবার হাত বাড়ালে সত্যি বলছি খুব খারাপ হবে।”
ময়ূরী হকচকিয়ে হাত সরিয়ে নিল।চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তাহসিনের দিকে।মুখ শুকনো, শ্বাস আটকে আসছে।আবার কী করতে যাচ্ছিল সে?লজ্জায় মুখ লাল হয়ে এলো হুঁশ ফিরতেই।
আদনান বহু কষ্টে হাসি চেপে রেখেছে।
ফিরোজা বেগম মুখ হাত দিয়ে ঢেকে তাকিয়ে আছেন।তার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হয়েছে।এই মুহূর্তে যদি চেয়ারম্যান সাহেব হঠাৎ এসে পড়তেন তবে তাদের মানসম্মান মাটিতে মিশে যেত।
তাহসিন কপালে হাত দিয়ে দাঁত চেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।কণ্ঠে বিরক্তি,
“এই মেয়েকে আর কারো সামনে চা ধরতে দিয়েন না চাচা।”
ময়ূরী বলল,
“আমি… আমি ইচ্ছা করে করিনি।”
“তাহলে এখন ইচ্ছা করে আমার প্যান্টেই হাত মুছতে আসছিলে?” তাহসিন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল।
ময়ূরী লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো।
ফিরোজা বেগম এবার চিৎকার করে উঠলেন,
“ময়ূরী! ঘরে যা,এক্ষুনি ঘরে যা!”
ময়ূরী চোখ নামিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।হৃদপিণ্ড তখনো ধুকপুক করছে তার।আজই দ্বিতীয়বার ঐ লোকটার সামনে এমন লজ্জাজনক অবস্থায় পড়ল সে।
বক্কর অস্বস্তি গোপন করে তাহসিনের দিকে তাকালেন,
“বাবা,মেয়েটা ছোট।ভুল হয়েই গেল।”
তাহসিন মৃদু কপাল চুলকে গম্ভীর গলায় বলল,
“ভুল মানুষ মাত্রই হয়।ঠিক আছে,সমস্যা নেই।”
তাহসিন উঠে দাঁড়াল।আড়চোখে ঘরের জানালার দিকে তাকাতেই ময়ূরীর সাথে চোখাচোখী হয়ে গেল।মেয়েটা তাড়াতাড়ি আড়াল করে নিল নিজেকে।তাহসিন শুকনো ঢোক গিলে বক্করের থেকে বিদায় দিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো।ভাবল পুকুর থেকে গোসল সেরে বাড়ি ফিরবে,নাহলে সবার হাজারটা প্রশ্নের উত্তর সে দিতে পারবে না।
আদনান আজ লুঙ্গি পড়েছিল।সেটা একপাশে ধরে হাঁটছে আর তাহসিনকে খ্যাঁপাচ্ছে।ঘাটের কাছে আসতেই আদনান বলল,
“অনুভূতি কেমন ছিল বাবু?গরমে জ্বলেছে নাকি হাতের ছোঁয়ায়?”
তাহসিন গায়ের শার্টটা খুলে সিঁড়িতে রেখে হঠাৎ পিছু ঘুরে দাঁড়াল।আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে খোঁপ করে আদনানের লুঙ্গির গিট ধরে টান দিয়ে খুলে ফেলে বলল,
“ছোঁয়াটা ভালো লেগেছে।”
বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল পুকুরে।আদনান চিৎকার দিয়ে তাড়াতাড়ি লুঙ্গি উঠিয়ে গলা ফাটিয়ে বলল,
“হারামি তোর কপালে বউ নেই।আমার ইজ্জত নিয়ে খেলছিস তুই।”
আদনানের কথা শেষ হতেই পেছন থেকে এক বয়স্ক মহিলা লাঠি ভর দিয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।সামনে পা বাড়ানোর আগে আদনানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কালা চাঁদ দেইখা ফালাইছি।”
আদনান বেক্কলের মতো তাকিয়ে রইল মহিলার দিকে।কালা চাঁদ মানে?সে হঠাৎ লুঙ্গি খুলে উকি মারল ভেতরে।তৎক্ষণাৎ নাক ছিঁটকে বিড়বিড় করে বলল,
“কালা চাঁদ বলল কেন?এটা তো শ্যামলা চাঁদ।”
পরক্ষণে ভাবল তাহসিনকে একবার দেখিয়ে জিজ্ঞেস করবে আসলেই কালা নাকি শ্যামলা।পর-মুহূর্তে নিজের ভাবনায় বিরক্ত হয়ে সেও ঝাঁপিয়ে পড়ল পুকুরে।লুঙ্গির গিট আলগা থাকায় লাফ দেয়ার সাথে সাথে মাথার উপর দিয়ে লুঙ্গি খুলে ভেসে উঠলো।তাহসিন লুঙ্গিটা নিয়ে সিঁড়িতে উঠে দাঁড়াল।
আদনান পানির নিচ থেকে উঠে তাকাতেই দেখে তাহসিন সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে লুঙ্গি ঘুরাচ্ছে হেলিকপ্টারের মতো।
তাহসিন গম্ভীর মুখে বলল,
“এইটা এখন পতাকা।বগুড়ার ঘাটে আজ থেকে এটাই ওড়ানো হবে।”
আদনান চিৎকার করে উঠল,
“ভাইরে,ফাজলামি করিস না! আমার প্যান্টও নাই, জাঙ্গিয়াও নাই,লুঙ্গিও নাই! আমি এখন জাতীয় নগ্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ী।”
“চিন্তা করিস না,তোর লুঙ্গি আমি ফেরত দিব,তবে শর্ত আছে।”
“শর্ত? আবার কী শর্ত?”
তাহসিন ধীর কণ্ঠে বলল,
“ঘাটে দাঁড়িয়ে তিনবার জোরে জোরে বলতে হবে— আমারটা কালা না,আমারটা শ্যামলা।”
আদনান রাগে দাঁত কিরমির করে বলল,
“হারামজাদা! তুই আমারে রাস্তায় নাচাইতে চাইছিস?”
ঠিক তখনই পুকুরের ধারে দু’জন বাচ্চা ছেলেপিলে এসে দাঁড়িয়ে হেসে বলল,
“চাচা,চাচা,আপনার কালা চাঁদটা একটু দেখান না।”
আদনান পানির নিচ থেকে শুধু চোখ দুটো বার করে তাকিয়ে থাকল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তাহসিন,তোরে আমি ছাড়মু না।”
তাহসিন হেসে লুঙ্গি কাঁধে ফেলে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।আদনান চিৎকার করে উঠল,
“একদিন আমারও সময় আসবে হারামি।তোকে দেখে নিব আমি!”
সওদাগর বাড়িতে দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে।মাহতাবের বড় বউ আফিয়া ব্যস্ত হাতে রান্না ঘর সামলাচ্ছে।শরীরটা তার ভালো না থাকলেও জোর করেই করতে হচ্ছে।
কাজের মেয়েটা আজ কাল ভীষণ দেমাগ দেখায়।ছোট চাচা শ্বশুরের জন্য কিছু বলতেও পারে না সে।কিছু বললেই যেন তিনি পেছনে লেগে পড়েন।
আফিয়া শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে হাত চালালো।নুপুর রান্না ঘরে ঢুকে ভাবিকে দেখে ভীষণ মায়া হলো তার।গায়ের ওড়না খুলে শরীরে মুড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“বড় ভাবি,কী কাজ করতে হবে বলো?আজ তুমি আর আমি মিলে রান্না করব।”
আফিয়া ক্লান্ত চোখে নুপুরের দিকে তাকাল।ঠোঁটে জোড়পূবর্ক হাসি টেনে বলল,
“তুই বলেছিস এই অনেক।এত গরমের মধ্যে এখানে থাকতে হবে না।তুই বাইরে যা।”
নুপুর মুখ বাঁকিয়ে নিচে বসে ডালায় রাখা রসুন ছিলতে ছিলতে বলল,
“বাহরে!তোমার বুঝি গরম লাগে না?ছোট ভাবি সারাদিন পায়ের উপর পা মেলে দিয়ে ঘরে আরাম করে,আর তুমি?সারাদিন এই রান্না ঘরে পড়ে থাকো।”
আফিয়া মুচকি হাসলো।তবে সেই হাসিতে সুখ নয় দুঃখ ছিল।তবুও বলল,
“তোর ভাইয়ের আদুরে ভালোবাসার বউ সে।একটু তো যত্নে থাকবেই।”
নুপুর চোখ তুলে ভাবির দিকে তাকাল।
“তোমার খুব কষ্ট হয় তাই না বড় ভাবি?নিজের স্বামীকে অন্য এক নারীর সাথে শেয়ার করা কত কষ্টের।”
“সুখ কপালে নেই বোন।আমার কপালটাই খারাপ।”
নুপুর আর কথা না বাড়িয়ে কাজে মন দিল।মাহতাব দুই বিয়ে করেছে।বড় বউয়ের বাচ্চা হয় না বলে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে দুমাস আগে।আফিয়াকে সে বিয়ে করেছিল ৭ বছর আগে।ছোট বউয়ের নাম শান্তা।ভীষণ অহংকারী।বাড়ির কেওই তাকে পছন্দ করে না।নিজের রূপ নিয়ে অনেক বড়াই তার।উচ্চঘরের মেয়ে বলে অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না।আফিয়ার তার উল্টো।যেমন নম্র-ভদ্র তেমন তার ব্যবহার।বাচ্চাটা ছাড়া কোনো খুঁত নেই তার মধ্যে।স্বামী যদি তাকে একটু বুঝত,তাহলে বোধহয় এত দুঃখ সইতে হতো না।
কনক জগে পানি নিতে রান্না ঘরে ঢুকে নুপুরকে কাজ করতে দেখে মেঝেতে ওর পাশে বসল।নুপুর কনককে রান্না ঘরে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“তুই এখানে কেন?”
“পানি নিতে আসছিলাম।তাহসিন ভাই কই?”
“ভাই বাইরে গেছে।”
“ওহ!”
আফিয়া কাজ করতে করতে আড়চোখে কনকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এত তাহসিন ভাই তাহসিন ভাই করিস কেন?কিছু চলে নাকি?”
কনক লাজুক হেসে দৃষ্টি নত করে মিনমিন করে বলল,
“উনি তো বুঝতেই চায় না ভাবি।”
“মনের কথা একবার বলেই দেখ।”
“যদি ফিরিয়ে দেয়?”
নুপুর বলল,
“ বলেই দেখ।”
তাহসিন আদনানকে নিয়ে বাড়ি ফিরল।দুজনে জামা কাপড় পাল্টে ঘরের দরজা আঁটকে দিয়ে আলোচনায় বসেছে।ঠিক কী নিয়ে আলোচনা তারা ছাড়া কেও জানে না।
বোরহান সওদাগর নিজের ঘরে ডেকেছেন তাহসিনকে।তাহসিন আদনানকে নিয়ে দাদার ঘরে এলো।পালঙ্কে বসতেই বোরহান সওদাগর বললেন,
“তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে তাহসিন।”
“বলুন।”
“বিয়েটা এবার করো।একা আর কত থাকবে?”
“বিয়ে নিয়ে আমি এখনো কিছু ভাবিনি।”
“আমি একটা মেয়ে দেখেছি তোমার জন্য।তুমি রাজী থাকলে মেয়ের বাড়িতে প্রস্তাব দেব আমি।”
তাহসিন ভ্রুযুগল কুঁচকে ফেলল।
“কে সে?”
“এই গ্রামেরই।”
তাহসিন বলল,
“পুতুলকে কবুল করতে পারলে আমার কোনো সমস্যা নেই।আম্মাকে বলুন,আপনারা রাজী থাকলে আমি আর কী বলব!তবে একটা কথা,বিয়েটা হবেই পুতুলের জন্য।”
বোরহান সওদাগর খুশি হয়ে মাথা নাড়লেন।তাহসিন যে এত তাড়াতাড়ি বিয়ের জন্য রাজী হয়ে যাবে সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল।
আদনান হাঁ করে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে রইল।এই বাটপারের মনে নিশ্চিত কিছু একটা চলছে।তাহসিন জীবনেও বিয়ে করার মানুষ নয়।বিয়ের নাম ওর সামনে নিলেই পরিস্থিতি বিগড়ে যায়।আর আজ দেখানে এত সহজেই মেনে নিল?আদৌ এটা সম্ভব?
ঘরের বাইরে বেড়িয়ে এলে আদনান বলল,
“তুই কী সত্যি বিয়ে করবি?”
তাহসিন বলল,
“আজীবন কুমার সেজে বসে থাকব?”
“তা নয় কিন্তু তুই আসলেই এখন বিয়ে করবি?মেয়ে কে সেটাও দেখবি না?”
“দাদা যখন দেখেছেন তাহলে ভালোই হবে।বাকিটা আল্লাহ ভরসা।”
তাহসিন নিজের ঘরের দিকে চলে গেলে আদনান হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে।কী দিন কাল এলো,এখন তাহসিনের বিয়েও খেতে হবে তাকে।সেও তাহসিনের পিছু নিয়ে গলা ফাটিয়ে বলল,
“কই যাচ্ছিস?”
“বাসর করতে।”
“কার সাথে?”
“তুই এলে তোর সাথেই করব।”
তখন বিকেল হয়েছে সবে।আলতা রাঙা আকাশ খানায় পাখিরা কিরচিরমিচির শব্দ করে উঁড়ে যাচ্ছে নিজেদের গন্তব্যে।সজিব মাস্টার এসেছে ময়ূরীকে পড়াতে।বয়স ২৭।ময়ূরীদের স্কুলের অংক স্যার।সম্পর্কে ফুপাতো ভাই হয়,তবে প্রতিবেশী হিসেবে।ভীষণ ভালো ছাত্র,গ্রামে বেশ নাম ডাক আছে পড়াশোনার জন্য।মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে।দেখতেও বেশ সুন্দর,গোছালো।
ময়ূরী ঘরের বারান্দার চৌকিতে বই খাতা নিয়ে বসেছে।ফাহাদ বোনের শরীর ঘেঁষে বসে বসে সব পর্যবেক্ষণ করছে।সজিব আড়চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ময়ূরী,তোর বোন কই?”
ময়ূরী বলল,
“আপা তো চাচার বাড়ি গেছে।চাচির শরীর খারাপ তাই সেখানেই আছে।”
“ওহ!”
ফাহাদ ঠোঁট উল্টে হামাগুড়ি দিয়ে বোনের কোলে উঠে এলো।ময়ূরী চোখ গরম করল।
“পড়ছি না আমি?বিরক্ত করছিস কেন?”
ফাহাদ বোনের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“বালো নাগে না।”
“ঘরে গিয়ে ঘুমা,আমাকে বিরক্ত করবি না।”
ফাহাদ শুনল না কথা।সজিব টেনে এনে নিজের কোলে বসালো ওকে।তারপর ময়ূরী পড়তে বসল ভালো করে।ঘণ্টা খানিক যাওয়ার পর সজীব উঠে দাঁড়াল।তখন বাড়িতে ফিরল মধু।সজিবকে দেখেই সালাম দিল।সজিব সালামের উত্তর নিয়ে বলল,
“তোমার কী অবস্থা?”
“ভালো আছি ভাইয়া।”
“পড়াশোনা?”
“আব্বা জানে।”
“তুমি কী জানো?পড়ার ইচ্ছে নেই?”
“নেই।বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি চলে যাব।”
“এসব না বকে পড়াশোনায় মন দাও।আজ আসি।”
সজিব চলে যেতেই ময়ূরী তাকাল বোনের দিকে।চোখ মুখে কেমন লাজুক লাজুক ভাব।সে ভ্রু কুঁচকে হঠাৎ ফুঁসে উঠল।
“তুই আবার ঐ লোকটার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলি?”
মধু মাথা নাড়ায়।ময়ূরীর গলায় যেন কথা আঁটকে এলো।বাড়িতে আম্মা আব্বা কেও নেই।বাজারে গেছে দুজন মিলে।মধু গিয়ে চৌকিতে বসল।ময়ূরী বোনের পাশে বসে ধীর কণ্ঠে বলল,
“আপা,ঐ লোকটা ভালো না।কত খারাপ তোর ধারণার বাইরে।”
মধু হঠাৎ রেগে বলল,
“খারাপ খারাপ করছিস কেন?খারাপের কী দেখেছিস?”
“এমন কিছুই দেখেছি যা আমি মুখে বলতে পারব না।ঐ লোকটা তোর সুন্দর জীবনটা ধ্বংস করে ফেলবে।”
“করলে করুক সেটা আমার ব্যাপার।ওকে নিয়ে আর কোনো কথা বলবি না।”
মধু রেগে ঘরের ভেতর চলে গেল।ময়ূরী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।বোন যে বড় একটা বিপদে পড়বে এটা সে বুঝতে পারছে কিন্তু কী করবে সে?আম্মা কিংবা আব্বাকে বললে মেরেই ফেলবে।
আকাশে হঠাৎ এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা করে বৃষ্টি নামল।
তারপর মুহূর্তের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো।
বাতাসে কাঁপছে তালপাতা,রান্না ঘরের ছনের ছাউনি থেকে চুইয়ে পড়ছে পানি।
ময়ূরী চমকে উঠে ছুটে গেল উঠোনে রাখা কাপড় তুলতে।
মধু তখনো ঘরে বসে আছে, মুখ ভার করে।
ঠিক এমন সময়ে দরজার বাইরে থেকে জোরে একটা আওয়াজ ভেসে এলো,
“এই বাড়িতে কেউ আছে?”
ময়ূরী দরজার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন চেয়ারম্যান সাহেব,সঙ্গে তাহসিন,এমপি মাহতাব ভাই,আদনান আর আরও দু’জন লোক।চেয়ারম্যান বাড়ির সবাই সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পড়ে এসেছে।
বৃষ্টির পানিতে সবার শরীর ভিজে যাচ্ছে,মাথা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে কপালের ওপর দিয়ে।
ফিরোজা বেগম তখনও বাজার থেকে ফেরেনি।
বাড়িতে শুধু ময়ূরী,ফাহাদ আর মধু।
“দাদা! ভেতরে আসেন।বাইরে তো খুব বৃষ্টি।”
বোরহান সওদাগর গম্ভীর মুখে ভেতরে ঢুকে আসন নিলেন।তাহসিন,মাহতাব আর আদনানও ভেতরে ঢুকল।তাহসিন হতবাক হয়ে দাদার দিকে তাকিয়ে আছে।চোখের ইশারায় কিছু যেন বলল,তবুও দাদা কোনো উত্তর দিলেন না।ময়ূরী আঁচল দিয়ে মাথা সহ শরীর ঢেকে দূরে দাঁড়িয়ে বলল,
“আব্বা আম্মা কেও তো বাড়িতে নেই।”
“কখন আসবে?”
“চলেই আসবে বোধহয়।”
“মধুমিতা বাড়িতে আছে?”
“হ্যা!”
ময়ূরী কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।মধু তাহসিনকে দেখে নিজের ঘরে দরজা লাগিয়েছে ভয়ে।ময়ূরী আড়চোখে তাহসিনের দিকে তাকাল।লোকটা দুদিন ধরে তাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।যখনই চোখের পাতা বন্ধ করে তখনই লোকটার গম্ভীর সুন্দর আনন খানা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।ময়ূরী ভ্রু কুঁচকে খুঁটিতে খুঁটিয়ে দেখল তাকে।লম্বা চওড়া শ্যাম বর্ণের লোকটাকে সাদা পাঞ্জাবিতে বেশ লাগে।লোকটা সুন্দর!একটু বেশিই সুন্দর।সে শুকনো ঢোক গিলে লাজুক দৃষ্টি সরিয়ে নিল।ফাহাদকে আদনান কোলে নিয়ে নাক টানছে তো আবার ঠেসে ধরে চুমু খাচ্ছে গালে।বাচ্চাটা ভীষণ আদুরে।ময়ূরী ভ্রু কুঁচকে আদনানের কাজ দেখল।তার রাগ হলো ভীষণ।বাচ্চাদের এমন করে চুমু খেতে দেখলে তার বিরক্ত লাগে।
বৃষ্টি বাড়ল।ময়ূরী ঘরে গিয়ে বিস্কুট আর কিছু শুকনো খাবার এনে রাখলো চৌকিতে।হঠাৎ এত মানুষ কেন এলো বাড়িতে বুঝতে পারছে না।
কিশোরী কন্যা পর্ব ২
মিনিট দশেক পর বাড়িতে ফিরলেন বক্কর এবং ফিরোজা বেগম।বাড়িতে ফিরে চেয়ারম্যান বাড়ির এত মানুষকে দেখে দুজনেই অবাক হলেন।বক্করকে দেখে বোরহান সওদাগর বললেন,
“কই ছিলা?সেই কখন থেকে বসে আছি।”
ফিরোজা বেগম মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।বক্কর চেয়ার টেনে বসলেন বারান্দায়।
“একটু বাজারে গিয়েছিলাম চাচা।আজকে ময়ূরীর জন্মদিন,তাই ভাবলাম কিছু কিনে দেব মেয়েটাকে।”
“ভালো,ভালো!কিছু কথা ছিল তোমার সাথে।”
