কিশোরী কন্যা পর্ব ৪
হামিদা আক্তার ইভা
“কী বলবেন চাচা?”
“দেখো আমি ঘুড়িয়ে প্যাঁচিয়ে কথা বলতে পারি না।আজ আমি তোমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।”
বক্কর আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলেন।বোরহান সওদাগর বললেন,
“আমি তাহসিনের জন্য তোমার ছোট মেয়ের হাত চাইছি।ময়ূরীকে আমার নাতবউ হিসেবে বেশ পছন্দ।”
বক্কর স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।এমন সময় চেয়ারম্যান সাহেবের এমন প্রস্তাব যেন কিছুতেই মানতে পারছেন না।তাহসিন হাত মুঠো করে কপালে ঠেকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে।মাহতাব নিঃশব্দে হাত রাখলো তাহসিনের কাঁধে।আজ দাদার ঘরে বেশ কথা কাটাকাটি হয়েছে তাহসিন আর দাদার মধ্যে।
বক্কর চুপ করে রইলেন।কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।চেয়ারম্যান সাহেবকে মানা কী করে করবেন?তিনি শুকনো ঢোক গিলে কথা গুছিয়ে নিলেন।বললেন,
“মাফ করবেন চাচা।আমার মেয়ে এখনো অনেক ছোট।স্বামী সংসার বুঝার মতো বয়স তার হয়নি।পড়াশোনা করছে করুক।এখন এই বিয়ের চাপটা আমি দিতে চাই না।”
বোরহান সওদাগর হাসলেন।তিনি জানতেন বক্কর এমনটাই বলবেন।তিনি বললেন,
“তোমার মেয়েকে পড়াবো আমি।একবার ভেবে দেখো,মেয়ে তোমার বাড়ির কাছেই থাকবে।যখন ইচ্ছে হবে তখনই দেখতে পারবে।আমার তাহসিনের মতো আর একটা যোগ্য পাত্র কই পাবে তুমি?”
বক্কর আড়চোখে তাহসিনের দিকে তাকালেন।ঠিক কথাই বলেছেন।তাহসিনের মতো পাত্র তিনি পাবেন না কিন্তু কী করবেন তিনি?মেয়েটা যে অনেক ছোট।আবার বড় মেয়েরও এখনো বিয়ে হয়নি।
“আমি মানছি এ কথা।কিন্তু আমার বড় মেয়েরও তো এখনো বিয়ে হয়নি আপনি জানেন।বড় মেয়েকে ঘরে রেখে ছোট মেয়েকে বিয়ে দেই কী করে?”
বোরহান সওদাগর গম্ভীর হলেন।
“আমার প্রস্তাব দেয়ার ছিল দিয়েছি।এখন তুমি রাজী না হলেও তোমার মেয়েকে আমার বাড়ির বউ বানিয়ে নিয়ে যাব।ইচ্ছে তোমার,জোর করে নিয়ে যাব নাকি নিজে থেকে বিয়েটা দিবে?”
“আপনি ক্ষমতার জোর দেখাচ্ছেন আমাকে?”
“দেখাচ্ছি।”
বক্কর কথা বাড়াতে পারলেন না।মাহতাব এই গ্রামের এমপি,বোরহান সওদাগর চেয়ারম্যান।অন্য গ্রামের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পারলেও চেয়ারম্যান বাড়ির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না।হয়তো খারাপ কিছু হবে এই ভয়েই।বোরহান সওদাগর ঘাড় ঘুরিয়ে মাহতাবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কাজী ডাকো মাহতাব।”
তাহসিন আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আজকেই?”
“হ্যা।”
“কিন্তু আমি সময় চেয়েছি দাদা।”
“সময়ের দরকার নেই।”
বোরহান সওদাগরের সাথে যে দুজন লোক এসেছিলেন তাদের মধ্যে একজনের হাতে মিষ্টির প্যাকেট ভর্তি।আরেকজনের হাতে দুটো শপিং ব্যাগ।তিনি ব্যাগ দুটো নিয়ে বক্করের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“তোমার মেয়েকে তৈরি করো।”
বক্কর বললেন,
“একটু সময় নিলে হয় না?একটু বেশি তাড়াহুড় করে ফেলছেন আপনি।”
“আমার হাতে সময় নেই বক্কর।তোমার মেয়েকে নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।সে তোমার বাড়ির পাশেই থাকবে।”
তাহসিন হঠাৎ বলে উঠল,
“তার আগে আমি একা ওর সাথে একটু কথা বলতে চাই।”
বক্কর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।বুকটা হুহু করছে মেয়েটার জন্য।এমন প্রভাবশালী লোকদের সাথে তিনি পেরে উঠবেন না।হয়তো ভালো করতে যেয়ে মেয়েটার খারাপ করে বসবেন তিনি।
বক্কর ভেতরে গিয়ে স্ত্রীকে সব খুলে বললেন।ময়ূরী শব্দ করে কেঁদে উঠেছে বিয়ের কথা শুনে।তাহসিন বাইরে থেকে মেয়েটার কান্নার শব্দ শুনে রাগে চোখের পাতা বন্ধ করে ফেলল।কিছু বলতেও পারছে না সইতেও পারছে না।বিয়েতে রাজী হওয়াটাই ভুল হয়েছে বোধহয়।
ময়ূরীকে সাজানোর আগে তাহসিনের সাথে আলাদা করে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হলো।মধু নিজের ঘর ছেড়ে মায়ের ঘরে এসেছে।ময়ূরী আর তাহসিন মধুর ঘরে।ময়ূরী নাক টানছে বারে বারে।তাহসিন ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার কান্না দেখছে।নাক মুখ ইতোমধ্যে লাল বানিয়ে ফেলেছে কিশোরী কন্যা।সে গম্ভীর হলো।লম্বা শ্বাস টেনে গমগমে কণ্ঠে বলল,
“কাঁদবে না আমার সামনে।চুপচাপ আমার কথা শোনো।”
ময়ূরী রাগে দৃষ্টি সরিয়ে মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে ফিরল।তাহসিন বলল,
“তুমি বয়সে আমার থেকে অনেক ছোট জানো?আমার বয়স ২৮,মানে তোমার থেকে ১২ বছরের বড়।তুমি কী তোমার থেকে এত বছরের বড় লোককে বিয়ে করতে রাজী?রাজী না থাকলে বলো।”
ময়ূরী তাকালো তাহসিনের দিকে।
“আপনি তো বুড়ো।কয়েকদিন পর লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হবে আপনার।আপনি কোন আক্কেলে আমার মতো সুন্দরী এক বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছেন?”
তাহসিন ভ্রু কুঁচকাল।
“তুমি সুন্দরী?”
“অবশ্যই।”
“আমি সুন্দর নই?”
ময়ূরী তালে তালে বলে উঠল,
“আপনিও খুব সুন্দর।”
তাহসিন ঠোঁট কামড়ে গম্ভীর চোখে তাকাল।কিছু একটা ভেবে বলল,
“তুমি জানো?আমার একটা মেয়ে আছে।নাম পুতুল,বয়স ৪।”
ময়ূরী চোখ বড় বড় করে তাকাল।আশ্চর্য হয়ে শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,
“আল্লাহ গো,আমার আব্বায় আমারে এক বিয়াইত্তা বেডার সাথে বিয়া দিতে চায়।আমি আপনারে বিয়া করমু না।”
তাহসিন কিছু বলার আগে ফিরোজা বেগম দরজায় শব্দ করে ভেতরে ঢুকলেন।উদাসী হয়ে তাহসিনকে বললেন,
“বাবা তোমার কথা শেষ হলে ওকে এখন তৈরি করি?কাজী এসে গেছে।তোমার দাদাও তাড়া দিচ্ছেন।”
তাহসিন গম্ভীর হয়ে উঠে দাঁড়াল।পাঞ্জাবি ঠিক করে ঘরের বাইরে যেতেই ময়ূরী মাকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল।সে বিয়ে করবে না মানে করবেই না।ফিরোজা বেগম মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করে তৈরি করে দিলেন।বিয়ে পড়ানোর সময় কাজী যখন কবুল বলতে বললেন তখন ময়ূরী চুপ করে বসে ছিল।রাগে অভিমানে মা কিংবা বাবা কারোর সাথে কথা বলেনি।জেদ করে শেষে কবুল বলতেই সবাই একসাথে “আলহামদুলিল্লাহ” পড়লেন।কাজী বাইরে গিয়ে তাহসিনকে কবুল পড়ালেন।বিয়ে পড়ানোর পর তাহসিনকে মধুর ঘরে পাঠানো হলো।কিছুক্ষণ পর তারা রওনা হবে বাড়ির উদ্দেশ্যে।
তাহসিন ঘরে ঢুকে দেখল পালঙ্কে এক লাল টুকটুকে কিশোরী নববধূ মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে বসে আছে চুপটি করে।সে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসলো।দুজনেই একদম চুপ।তাহসিন কপাল কুঁচকে একবার তাকাল নতুন বউয়ের দিকে।সদ্য ১৬তে পা দেয়া কিশোরী শেষে তার বধূ হলো।ভাবলেও কেমন বিরক্ত লাগে।মেয়েকে বড় করতে গিয়ে যৌবন শেষ,এখন বউকে বড় করতে গিয়ে দম শেষ হবে।
ফাহাদ গুটি গুটি পায়ে ঘরে প্রবেশ করল।কোমরে দুই হাত রেখে চোখ পাকিয়ে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আপার গরে কী কুরো?”
তাহসিন ফট করে তাকাল নিচে।ভ্রু কুঁচকে এলো তাকে দেখে।লিলিপুট একটা।ফাহাদ প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আবার বলল,
“আপার কাচে কী কুরো?”
তাহসিন গম্ভীর হয়ে বলল,
“তোমার আপা আমার বউ লাগে।বউয়ের সাথে প্রেম করতে এসেছি।”
“পেম?পেম কি?”
“জানো না?”
ফাহাদ মাথা নাড়িয়ে না বুঝায়।তাহসিন হঠাৎ ময়ূরীর চিবুক উঁচিয়ে ধরল।ময়ূরী হকচকিয়ে তাহসিনের দিকে তাকানোর আগেই তাহসিন গাঢ় চুমু এঁকে দিলো বউয়ের কপালে।ফাহাদ রাগে ফুঁসে উঠল।তাহসিন বলল,
“এটাকে প্রেম বলে।”
ফাহাদ দৌঁড়ে এসে বিছানার চাদর টেনে ধরে বিছানায় উঠে ময়ূরীকে ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কারাপ মানুষ।আপারে চুমা দেয়।”
ময়ূরীর রাগে নাক ফুলছে।তাহসিন আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়।হায়-হুতাশ করে বলল,
“কত সখ ছিল একটা যুবতী সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করব।কিন্তু কপালে জুটলো এক পেত্নী,যে কিনা সারাদিন রেগেই থাকে।নতুন জামাই সামনে বসে আছে,একটা বার কী সালাম দিয়েছে?দেয়নি!উল্টো রাগে ফুঁসছে ফুঁসফুঁস করে।”
ময়ূরী কাঁদো কাঁদো চোখে লোকটাকে দেখল।কত খারাপ ভাবা যায়?তাকে পেত্নী বলছে এই লোক।ফাহাদ হামাগুঁড়ি দিয়ে তাহসিনের পেটের উপর উঠে বসল।তাহসিন চোখ ছোট ছোট করে তাকাল।
“তুমি আমার দুলাবাই?”
তাহসিন মাথা নাড়ায়।ফাহাদ বলে,
“তাইলে ট্যাকা দাও।”
তাহসিন আশ্চর্য হয়ে বলল,
“টাকা দিব কেন?”
“আপা কুইছে দুলাবাইরা ট্যাকা দেয়।”
“কোন আপা বলেছে?”
ফাহাদ হাত উঁচিয়ে ময়ূরীকে দেখিয়ে দিল।তাহসিন বলল,
“বিয়ে হয়েছে এক ঘণ্টাও তো হয়নি,এরই মধ্যে পকেট খালি করতে চাইছে।আমার কাছে কোনো টাকা নেই।”
ফাহাদ ঠোঁট উল্টে বোনের দিকে তাকাল।চোখ ছলছল।ময়ূরীর রাগ হচ্ছে ভীষণ।তাহসিনকে যেন সহ্যই হচ্ছে না।তাহসিন পকেট থেকে মনিব্যাগ বের করে শালার হাতে ৫০০ টাকার দুইটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“শালা বাবু এই ট্যাকা দিয়া একটা বউ কিনা ঘরে আইনো কেমন?”
ফাহাদ খুশি হয়ে মাথা নাড়ায়।বিদায়ের সময় এলো।বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ আগে।ফিরোজা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন।ময়ূরী একটুও কাঁদলো না আর না কারোর সাথে একটা কথা বলল।বক্কর মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
“আব্বা চায়নি এত তাড়াতাড়ি তোকে বিয়ে দিতে।কিন্তু পরিস্থিতির জন্য বাধ্য হয়েছে।মনে রাগ রাখিস না মা।”
ময়ূরী অভিমানী চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমি আর কোনোদিন এই বাড়িতে পা রাখব না আব্বা।তোমরা সবাই ভালো থেকো।”
বক্করের বুক কামড়ে ধরল মেয়ের মুখে এহেন কথা শুনে।ময়ূরী আর একটা কথাও বলল না।যাওয়ার আগে শুধু মধুর সাথে একান্তে কিছু কথা বলেছে।ঘরের বাইরে আসার পর মাহতাব বলল,
“বাইরে রাস্তায় পানি জমেছে বোধহয়।ময়ূরী যাবে কী করে?”
ফিরোজা বেগম বললেন,
“কাছেই তো বাড়ি।যেতে পারবে সমস্যা নেই।”
তাহসিন উঠোনের দিকে তাকিয়ে দেখল সন্ধ্যার আপছা আলোয় ভেজা উঠোন দেখা যাচ্ছে।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাঞ্জাবির হাতা গুঁটিয়ে হঠাৎ করে ময়ূরীকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো।মেয়েটা ভয়ে শক্ত করে তাহসিনের গলা জড়িয়ে ধরল।সবাই কিছুটা ভড়কালেও পরক্ষণে স্বাভাবিক হয়েছেন।বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর পর দেখা গেলো সত্যি’ই রাস্তায় বেশ পানি জমেছে।ময়ূরী অস্বস্থি নিয়ে লেপ্টে আছে স্বামীর বুকে।তাহসিনের শরীর থেকে অদ্ভুত এক সু-ঘ্রাণ ভেসে আসছে।মাথা ধরে আসছে তার।লোকটার হাতের ছোঁয়া লেগে আছে শরীরে।ভীষণ অস্বস্থি হচ্ছে।
রাস্তায় মানুষ জন নেই।বৃষ্টি হওয়ার কারণে চারপাশ খালি।ময়ূরীদের বাড়ি থেকে চেয়ারম্যান বাড়ি কিছুটা দূরে।পুরো রাস্তা তাহসিন ময়ূরীকে কোলে করেই নিয়ে এলো।সওদাগর বাড়ির সামনে এসে থামতেই ময়ূরী লাজুক চোখে সামনে তাকাল।বিশাল বড় বাড়ি।এই বাড়িতে সে কখনো আসেনি।এই বাড়ির ধারের কাছেও কখনো আসেনি।আজই প্রথম,তাও আবার এই বাড়ির বউ হয়ে।
বাড়ির দারোয়ান দরজা খুলে দিতেই সর্বপ্রথম তাহসিন প্রবেশ করল নববধূকে নিয়ে।একে একে সবাই সদর দরজার সামনে আসতেই ভেতর থেকে নূপুর সদর দরজা খুলে দিল।ভাইয়ের কোলে লাল টুকটুকে শাড়ি পড়া একটা মেয়েকে দেখে চিৎকার করে উঠল।আদনান নুপুরের মাথায় হালকা চাপড় মেরে বলল,
“থাপড়ে চাঁপা ভেঙে ফেলব ফাজিল।চিল্লাচ্ছিস কেন?”
নুপুর চোখ বড় বড় তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে।ভাই কী বিয়ে করেছে?তাহসিন ময়ূরীকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে আসতেই বিশাল ড্রয়িংরুমে হাজির হলেন বাড়ির প্রত্যেকে।সে কোল থেকে ময়ূরীকে নামিয়ে দিতেই ময়ূরী ভীতু হয়ে তাহসিনের শরীর ঘেঁষে হাত চেপে ধরলো।তাহসিন ওর ভয়ের কারণ বুঝতে পেরে কাঁধে হাত দিয়ে নিজের দিকে চেপে ধরল।কনক শ্বাস আঁটকে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে আছে।যা ভাবছে সেটাই কি হয়েছে?
অরুণিমা বেগম আশ্চর্য হয়ে ময়ূরীকে দেখে শ্বশুরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আব্বা আপনি আজই বিয়ে করিয়ে এনেছেন?আজ না শুধু কথা বলে আসার কথা ছিল?”
বোরহান সওদাগর এসে সোফায় বসলেন।তাহসিনকে চোখের ইশারায় ময়ূরীকে নিয়ে বসতে বললে তাহসিন ময়ূরীকে নিয়ে বসে পাশেই।
“মন চাইলো তাই আজই নিয়ে এলাম।”
“কিন্তু আব্বা,আপনি তো বলেননি এত ছোট একটা মেয়েকে ঘরের বউ করে আনবেন।এই মেয়ে এখনো কিশোরী।”
“কিশোরীদের কী বিয়ে হয় না মেজ বউ?”
অরুণিমা বেগম প্রতিবাদ করে বললেন,
“বাল্যবিবাহ অন্যায় আব্বা। ভুলে যাচ্ছেন আপনিও আইনের লোক।”
বোরহান সওদাগর উত্তর দিলেন না।তার স্ত্রী ভিড় ঠেলে অসুস্থ শরীর টেনে ময়ূরীর সামনে এসে চিবুক উঁচিয়ে ধরলেন।টুকটুকে বউ দেখে গাল ভরে হেসে বললেন,
“মাশাআল্লাহ,আপনে একটা কামের কাম করছেন।ও বক্করের ছোট মাইয়া না?কী সুন্দর কইরা বানাইছে আল্লাহ।”
বোরহান সওদাগর খুশি হলেন বউয়ের কথা শুনে।
“কিন্তু আপনে আমাগো কাওরে না কইয়া তাহসিনরে বিয়া করাইলেন কেন?”
“দেখতে গিয়ে বিয়ে পড়িয়ে এনেছি।”
মুখে এক কথা বললেও তিনি বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েই ঐ বাড়িতে গিয়েছিলেন।ময়ূরীর জন্য বিয়ের শাড়ি অব্দি কিনে রেখেছিলেন আগে থেকেই।রজনী বেগম কথা না বাড়িয়ে আদনান আর রুহুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তোরা ফুল কিন্না আন যা।নুপুর আর কনক মিলা বাসর ঘর সাজাবি।”
আদনান আর রুহুল তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বের হলো।ময়ূরীর ভয়ে বুক ধুকপুক করছে।কাউকে সে চেনে না।সবাই কেমন করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আফিয়া এগিয়ে এসে ময়ূরীর পাশে বসে মিষ্টি হেসে বলল,
“আমার দেবরের বউ কিন্তু ভীষণ সুন্দর।দেবর শেষে সুন্দরী বউ ঘরে নিয়ে এলো?”
তাহসিনের মুখ গম্ভীর।ময়ূরী আর একটু গুটিয়ে নিলো নিজেকে তাহসিনের সাথে।দূর থেকে কনক ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।এত দিনের যত্নে গড়া ভালোবাসা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।এই যন্ত্রণার থেকে যেন মৃত্যুও শ্রেয় ছিল।সে মুখ ঢেকে দৌঁড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো।
মাহতাবের ছোট বউ শান্তা ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে আছে প্রথম থেকেই।তার কেমন হিংসে লাগছে।মেয়েটা তার থেকেও হাজারগুণ বেশি সুন্দর ভাবলেও শরীর জ্বলে যাচ্ছে।অরুণিমা বেগম শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নুপুরকে মিষ্টি আর পানি আনতে বললেন।নুপুর প্রস্থান করতেই রজনী বেগম তাহসিন আর ময়ূরীর দিকে মিষ্টি হেসে তাকিয়ে বললেন,
“আমার কালা চাঁন সুন্দরী বউ পাইছে।শুনো নতুন বউ,জামাই কিন্তু খুব ভালো।বেশি বেশি ভালোবাসবা তাইলে জামাই মাথায় উঠায়া রাখব।”
লজ্জায় মেয়েটার মুখ লাল বর্ণ ধারণ করল।এই লজ্জা আর সইতে পারছে না সে।তাহসিন ঠোঁট কামড়ে হালকা ঘাড় বাঁকিয়ে নববধূর লাজুক বদন পানে তাকাল।সত্যিই মনে হচ্ছে মেয়েটা একটু বেশিই সুন্দর।তার গায়ের রং চাপা হলেও ময়ূরীর গায়ের রং উজ্জল।
অরুণিমা বেগম মিষ্টির বাটি শাশুড়ির হাতে দেয়ার পর রজনী বেগম দুজনকে মিষ্টি মুখ করিয়ে পানি দিলেন।আদনান আর রুহুল ফুল আনার পর পরই নুপুর কুসুমকে নিয়ে বাসর ঘর সাজাতে ভাইয়ের ঘরে গেলো।ময়ূরীকে নিয়ে রজনী বেগম নিজের ঘরে গেলেন।তাহসিন কোথায় গেছে জানা নেই।তবে আদনান আর রুহুল আছে সাথে।
রজনী বেগমের ঘরে আফিয়া,ছোট চাচি,ময়ূরী আর রজনী বেগম আছেন।ময়ূরীকে পালঙ্কে বসিয়ে আফিয়া এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে।একই এলাকায় থাকলেও তাদের কখনো দেখা হয়নি।ময়ূরীকে তার বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হতো না অন্যদিকে চেয়ারম্যান বাড়ির কোনো মেয়ে বাড়ির বাইরে বের হয় না।
রজনী বেগম আলমারি খুলে একটা বড় বক্স বের করলেন।সেটা পালঙ্কের উপরে রেখে একজোড়া মোটা স্বর্ণের বালা,গলার চেইন আর নাকফুল বের করে বক্সটা তুলে রাখলেন আলমারিতে।আফিয়া ময়ূরীর গায়ে স্বর্ণ পড়িয়ে দিয়ে নাকে স্বর্ণের নাকফুল পড়িয়ে দিতেই রজনী বেগম মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন।নাকফুল পড়াতে যেন মেয়েটার সৌন্দর্য আরও বেড়েছে।একদম পাক্কা গিন্নি মনে হচ্ছে।তিনি ময়ূরীর পাশে এসে বসলেন।ময়ূরীর ছোট ছোট দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“আজ থিকা এই সংসার তোমার।সংসার কিন্তু মন দিয়া করতে হইবো।”
আফিয়া মুচকি হাসল।ময়ূরী শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়ল।তিনি আবার বললেন,
“এই বংশে একটাই নাতির মাইয়া।তুমি মনেহয় জানো তাহসিনের একটা মাইয়া আছে।তোমারও মাইয়া হয়।ওর নাম জানো কী?ওর নাম পুতুল।পুতুলের মতোই দেখতে।তারে মায়ের মতো ভালোবাইসো বুঝলা?”
ময়ূরী সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
“ও কোথায়?”
“ও ঢাকায়।ওর বাপে ওরে গ্রামে নিয়া আসে না।মাইয়াডা গ্রামে আইলে মেলা কাঁন্দে তাই ঢাকায় রাইখা আইছে।”
ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে ধরল।হাজারও প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।এসবের উত্তর দিবে কে?রজনী বেগম তাড়া দিয়ে আফিয়াকে বললেন,
“বাসর ঘর মনে হয় সাজানো শেষ আফিয়া।ওরে বাসর ঘরে দিয়া একটু বুঝায়া শুনায়া দিয়ো।”
আফিয়া মাথা নেড়ে ময়ূরীকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা দুতলায় তাহসিনের ঘরে নিয়ে এলো।ময়ূরী দেখল পুরো ঘর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।অদ্ভুত ব্যাপার!এই রাত করে এরা এত ফুল পেলো কোথায়?
নুপুরের কাছে এক গ্লাস দুধ পাঠিয়ে দিলেন রজনী বেগম।সে দুধের গ্লাস বেড সাইডের ছোট টেবিলের উপর রেখে কুসুমের পাশে দাঁড়াল।ময়ূরী বিছানায় বসেছে।আফিয়া ফিসফিস করে কথা বলছে তার সাথে।ময়ূরীর দৃষ্টি নত।চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে।ওরা খানিকক্ষণ পর ঘরের দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে চলে যেতেই ময়ূরী লম্বা দম নিলো।এতক্ষণ মনে হচ্ছিল শ্বাস আঁটকে মরে যাবে সে।এত এত মানুষ এই বাড়িতে,তার মাথা ঘুরছে।
পেটে ব্যথা হচ্ছে ভীষণ।কিছু ভালো লাগছে না।আব্বা আম্মার উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে।জোর করে তাকে বিয়ে দেয়া হলো ঐ লোকটার সাথে।লোকটাও কেমন অদ্ভুত।একবার কমল চোখে তাকালে দ্বিতীয়বার সিংহের মতো তাকিয়ে থাকে।মনে হচ্ছে গোটা জীবনটাই অদ্ভূত!
বৃষ্টিতে ভিজে গেছে পুরো ছাদ।চারপাশে শীতল বাতাস বইছে এখন।তাহসিনের ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট।আদনান বেশ কিছুক্ষণ ধরে হাঁসফাঁস করছে।রুহুল ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার পরই সে আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“তুই যে বিয়ে করলি এটা যদি কেও জেনে যায়?উপর মহলে খবর গেলে কী হবে তুই জানিস?কিশোরী মেয়ে বিয়ে করেছিস বলদ।”
তাহসিন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“খবরটা দিবে কে?তুই?”
“আমি কেন দিব?”
“তাহলে আর আছেই বা কে?”
“যদি কোনো ভাবে জেনে যায়।”
“কিছু হবে না।”
আদনান শান্ত হয়ে নিজেও একটা সিগারেট ধরিয়ে ফোনে সময় দেখে বলল,
“ভাবি বোধহয় তোর জন্য অপেক্ষা করছে।রাত ১০টার বেশি বাজে এখন।বাসর রাত শেষ হলে বাসর ঘরে ঢুকবি নাকি?”
তাহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“মেয়েটাকে জোর করা হয়েছে।দাদার উপর মেজাজ খারাপ হচ্ছে ভীষণ।আজ কোনোরকম দেখে আসতে পারলে কাল সকালেই আমি ঢাকা চলে যেতাম।”
“কিছু করার নেই।বিয়ে তো হয়ে গেছে।”
“হলেই বা কী?ঐ মেয়ে সংসারের কিছু বুঝে?”
“সব কিছুর জন্যই সময় লাগে।সময় দে আসতে আসতে ঠিক হয়ে যাবে।এখন যা,অনেক রাত হয়েছে।নাকি আমার সাথে আমার ঘরে যাবি?”
“বাসর করতে?”
“চল যাই।”
“শালা খবিশ।”
“তুই আমাকে নষ্ট বানাচ্ছিস তাহসিন।”
“তুই ভালো ছিলি কবে?”
ওরা নিচে নেমে আসতেই আদনান রুহুলের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।তাহসিন নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।ভেতরে ঢুকবে নাকি ঢুকবে না বুঝতে পারছে না।শ্বাস টেনে বাইরে থেকে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল।পুরো ঘর থেকে তাজা ফুলের সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে।কী মিষ্টি ঘ্রাণ।সে দরজা আঁটকে দিয়ে এগিয়ে এলো দুপা।ময়ূরী ঘোমটা টেনে বসে আছে বিছানায়।ফুলে ছিটানো বিছানায় লাল টুকটুকে বউ।
তাহসিন এগিয়ে গিয়ে বসলো বিছানায়।হালকা গলা পরিষ্কার করে আলতো স্পর্শে লম্বা ঘোমটা তুলে মাথার উপরে রাখল।ময়ূরীর ঘুমঘুম চোখ।চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে বার বার।তাহসিন মাথার ঘোমটা সরাতেই আঁটকে উঠে চিৎকার দিয়ে উঠল।তাহসিন ভয়ে বুকে থুথু দিয়ে বলল,
“পেত্নী নাম দিয়ে ভুল কিছু তো করিনি।ফাজিল মহিলা বাসর রাতে স্বামীকে খু’ন করতে চাইছো?”
ময়ূরী নিজেকে সামলে চুপ করে রইল।পেটে ব্যাথায় শরীর ভেঙে আসছে।তাহসিন ময়ূরীর এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে বলল,
“কোনো সমস্যা?”
ময়ূরী লজ্জায় কথা বলতে পারল না।চোখে চিকচিক পানি টলমল করছে।তাহসিন কপাল কুঁচকে বুঝার চেষ্টা করল।ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ির কাউকে ডেকে দিব?ভাবিকে ডাকব?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে সায় জানালে তাহসিন বিছানা থেকে নামতে গেলে হঠাৎ চোখ যায় ময়ূরীর পাশে গোলাপি রঙের চাদরে।সে ফট করে তাকায় মেয়েটার দিকে।তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে বলে,
“দশ মিনিট ওয়েট করো আমি আসছি।”
তাহসিন সোজা বাড়ি থেকে বের হয়।বাজার বাড়ির কাছেই।আর বাজারে তিনটা ঔষধের দোকান।সেখানে দুইটা অনেক রাত অব্দি খোলা থাকে।বেশি সময় লাগলো না তার।বাড়ি ফিরে ময়ূরীর হাতে ছোট একটা ব্যাগ দিয়ে বলল,
“ভাবি শাড়ি দিয়ে গেছে।যাও গোসল করে এসো।”
ময়ূরী বিছানা থেকে নামল না।তাহসিন বুঝতে পেরে হঠাৎ মেয়েটাকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো।ময়ূরী ভয়ে আঁতকে উঠে বলল,
“আল্লাহ,কী করছেন আপনি?”
তাহসিন ওয়াশরুমের নিকট এগিয়ে গিয়ে ওকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
“শোনো মেয়ে,আমি তোমার স্বামী।কখনো লজ্জা না করে যা সমস্যা হবে সব আমায় বলবে।এবার যাও,গোসল করো নাহলে শরীর ধুয়ে বের হও।”
তাহসিন নতুন পাতলা শাড়িটা এনে ময়ূরীর হাতে ধরিয়ে দিলো।ময়ূরী অবাক হয়ে দেখল তাকে।তাহসিন ঠেলে ওকে ওয়াশরুমে পাঠানোর পর বিছানার চাদর উঠিয়ে নতুন আরেকটা চাদর বিছিয়ে দিলো।ময়ূরী ফ্রেশ হয়ে কোনোরকম শাড়ি প্যাঁচিয়ে বের হলো ওয়াশরুম থেকে।তাহসিন দেখল গাঢ় নীল রঙের শাড়ি পড়ে বের হয়েছে মেয়েটা।চুল শুকনো মানে শরীর ধুয়েছে।সে বিছানার চাদর নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“ঘুমাও তুমি।আলমারি খুলে দেখো নতুন কাঁথা আছে।”
কিশোরী কন্যা পর্ব ৩
ময়ূরী শাড়ি ঠিক করে আলমারি খুলে কাঁথা বের করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে।রাগারাগী করে তো এলো কিন্তু আম্মাও যে কষ্ট পাচ্ছে।সুন্দর সহজ জীবনটা হঠাৎ বদলে গেলো।এক কিশোরী সদ্য ১৬ তে পা দিয়েই বাবার বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়ি পা রাখল।যেখানে সে কাউকে চেনে না।এমন একজনের সাথে বিয়ে হয়েছে যার একজন সন্তান আছে।চোখের কোণা বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে উঠল সে।কী লেখা আছে আগামীতে?উচ্চবংশের পুত্রবধূ হয়ে ভাগ্য খুললো নাকি অন্ধকারে পা রাখল সে?কে জানে,এই কিশোরীর ভাগ্যে কী আছে,কী হবে কিংবা কী হতে চলেছে…!”
