কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫২
লামিয়া রহমান মেঘলা
বিকেল গড়িয়ে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে ধরণীর বুকে। পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্য শেষ আলোটুকু ছড়িয়ে দিয়ে সমুদ্রের বুকে এঁকে দিয়েছে রক্তিম আর সোনালি রঙের অপূর্ব ক্যানভাস। ঢেউগুলো একের পর এক তীরে এসে ভেঙে পড়ছে, যেন প্রকৃতি নিজেই নিঃশব্দে কোনো প্রেমের গান গেয়ে চলেছে। দূর দিগন্তে আকাশ আর সমুদ্র যেন একাকার হয়ে গেছে।
সেরিন কায়ানের বুকের ওপর মাথা রেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখছে। কায়ানের এক হাত তার মাথার নিচে, অন্য হাত আলতো করে জড়িয়ে আছে সেরিনের কোমর। চারপাশে এমন এক প্রশান্তি, যেন সময়ও তাদের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে।
কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যার আবছা আলো মিলিয়ে চারদিক ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে গেল। সমুদ্রের বুক চিরে শীতল বাতাস ধেয়ে এসে দুজনকে স্পর্শ করে গেল। ঠিক তখনই সেরিন হঠাৎ উঠে বসল।
তাদের ভিলার সবগুলো আলো একে একে জ্বলে উঠেছে। সমুদ্রের একেবারে তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ভিলাটি আলোর ছোঁয়ায় যেন স্বপ্নের কোনো রাজপ্রাসাদে রূপ নিয়েছে। কাঁচের দেয়ালে আলোর প্রতিফলন, চারপাশের নারকেল গাছ আর অন্ধকার সমুদ্রের পটভূমিতে ভিলাটিকে আরও মোহময় করে তুলেছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে, যেন সমুদ্রের বুকেই ভেসে আছে আলোকময় এক স্বপ্ন।
আকাশে আবার কালো মেঘ জমেছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বৃষ্টির আগমনী বার্তা।
সেরিন বালির ওপর শুয়ে থাকা কায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“লাইট একা একা জ্বলল?”
কায়ান আবারও সেরিনের কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের ওপর টেনে নিল।
“জ্বলতেই পারে। তোমার বাড়ি, তুমি চাইলে বন্ধ করে দেবে।”
সেরিন আবার কায়ানের বুকে মাথা রাখল।
আষাঢ়ের বৃষ্টির কোনো আগাম বার্তা থাকে না। মুহূর্তের মধ্যেই টুপটাপ করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। একফোঁটা, দুইফোঁটা, তারপর ধীরে ধীরে অসংখ্য বৃষ্টিবিন্দু আকাশ থেকে নেমে এসে সমুদ্র, বালি আর দুজন মানুষকে একসঙ্গে ভিজিয়ে দিতে লাগল। সমুদ্রের ঢেউ আরও উতাল হয়ে উঠল। বাতাসে ভেসে এলো ভেজা মাটির গন্ধ আর লবণাক্ত জলের মাদকতা। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের সমস্ত সৌন্দর্য উজাড় করে এই মুহূর্তটিকে আশীর্বাদ করছে।
সেরিন বালিতে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বহু দিনের শখ ছিল এভাবে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজে থাকার। আজ সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটা যেন নীরবে পূর্ণ হয়ে গেল।
হঠাৎই কায়ান সেরিনের ওপর ঝুঁকে এলো। তার গভীর দুটি চোখ স্থির হয়ে রইল সেরিনের চোখের দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল সীমাহীন ভালোবাসা, মুগ্ধতা আর অদম্য আকর্ষণ। ধীরে ধীরে কায়ান নিচু হয়ে সেরিনের ওষ্ঠদ্বয় নিজের ওষ্ঠে আবদ্ধ করল।
বৃষ্টির পানিতে দুজনের শরীর একাকার হয়ে গেল। কায়ানের চুল বেয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সেরিনের গালে এসে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। চারপাশের উত্তাল সমুদ্র, অবিরাম ঝরে পড়া বৃষ্টি আর নিস্তব্ধ সন্ধ্যা যেন তাদের ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।
কিছুক্ষণ ধরে দীর্ঘ এক চুম্বনের পর কায়ান ধীরে ধীরে সেরিনকে ছেড়ে দিল। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে তাকে পাঁজাকোলে তুলে নিল।
“ঠান্ডা লেগে যাবে।”
কথাটা বলেই কায়ান সেরিনকে বুকে আগলে নিয়ে সমুদ্রতীরের ভেজা বালির ওপর দিয়ে আলোকময় ভিলার দিকে এগিয়ে গেল। ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখনও তাদের চারপাশে এক অনিন্দ্য সুন্দর প্রেমের আবরণ বুনে চলেছে।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সেরিন রুমে কায়ানকে না পেয়ে ধীর পায়ে বাইরে চলে এল। পুরো ভিলাজুড়ে এক ধরনের প্রশান্ত নীরবতা ছড়িয়ে আছে। দূরে সমুদ্রের ঢেউয়ের মৃদু গর্জন ভেসে আসছে, আর কিচেন থেকে উষ্ণ খাবারের সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
কিচেনে দাঁড়িয়ে কায়ান ডিনার তৈরি করছে। সে ইতোমধ্যেই পোশাক বদলে নিয়েছে। কালো টি শার্ট আর ট্রাউজারে তাকে অদ্ভুত পরিপাটি লাগছে। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। যেন কয়েক ঘণ্টা আগের মানুষ আর এই মানুষটি সম্পূর্ণ আলাদা।
সেরিন এগিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“আমিই করতে পারতাম।”
কায়ান রান্না নাড়তে নাড়তেই শান্ত গলায় বলল,
“টেক রেস্ট সেরিন। আর বেশি কাজ করতে ইচ্ছে করলে রাতে করিও আমার নিচে একটু এক্সারসাইজ হয়ে যাবে।”
কথাটা শুনেই সেরিনের গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে সংকোচে কায়ানের হাতে আলতো একটা আঘাত করে বলল,
“নির্লজ্জ।”
কায়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল,
“বউয়ের সাথেই সবাই নির্লজ্জ হয়।”
সেরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে সেখান থেকে চলে এসে টিভির সামনে বসল। রিমোট হাতে নিয়ে একের পর এক চ্যানেল বদলাতে লাগল। বিনোদন, সিনেমা, গান, খেলা, কিছুই তার মন টানল না।
হঠাৎ একটি সংবাদ চ্যানেলে এসে তার আঙুল থেমে গেল।
পর্দাজুড়ে বড় অক্ষরে ভেসে উঠেছে,
“চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধস।”
শিরোনামটি দেখেই থেমেছিল সেরিন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংবাদ পাঠকের কণ্ঠে আরেকটি খবর ভেসে এলো।
জাকিরের মৃত্যুর সংবাদ।
মুহূর্তেই সেরিনের চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এলো। সেদিনের প্রতিটি দৃশ্য একে একে ফিরে আসতে লাগল তার চোখের সামনে। কায়ানের সেই নির্মম, শীতল, ভয়ঙ্কর রূপ, যা সে নিজের চোখে দেখেছিল।
তার আঙুল কাঁপতে শুরু করল।
তাড়াহুড়ো করে রিমোট তুলে চ্যানেল বদলাতে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ কেউ তার হাত থেকে রিমোটটি কেড়ে নিল।
চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল কায়ান দাঁড়িয়ে আছে তার একেবারে পাশে।
মুখে সেই পরিচিত কোমল হাসি নেই।
চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত। অথচ সেই শান্তির গভীরে এমন এক অন্ধকার লুকিয়ে আছে, যা যে কাউকে শিউরে উঠতে বাধ্য করবে।
কায়ান ধীরে ধীরে নিচু হয়ে সেরিনের মুখোমুখি বসল। তার চোখ সরাসরি স্থির হয়ে রইল সেরিনের চোখে।
একদম শান্ত, স্থির, বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
“জান, তুমি তো জেনেই গেছো আমি কেমন। আমি চাই না তোমার দ্বারা আর কোনো ভুল হোক। ভুল একবার হলে সেটা ক্ষমা করা যায়। বারবার হলে সেটা পাপ হয়। আর পাপের শুধু শাস্তি হয়, ক্ষমা নয়।”
এক মুহূর্ত থেমে সে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেরিনের চুলে হাত বুলিয়ে দিল। স্পর্শটা ছিল স্নেহের, অথচ সেই স্নেহের আড়ালে এমন এক মালিকানাবোধ লুকিয়ে ছিল, যা শ্বাসরুদ্ধকর।
“তুমি আমার অনেক প্রিয়, সেরিন। আমাকে বাধ্য কোরো না প্রিয় জিনিসটার ক্ষতি করতে। কোমরের নিচ থেকে সবটা অকেজো করে তোমাকে ঘরে বন্দি করে রাখব। বাকি জীবন শুধু আমার মুখ দেখা ছাড়া তোমার আর কোনো উপায় থাকবে না। সো রিল্যাক্স হয়ে সংসারে মন দাও। আমি চাই না আমাদের সংসারে আবার কোনো সমস্যা হোক। আমি যেভাবে সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি, আমাকে সেভাবে সবটা ভুলিয়ে দাও, সেরিন। এটা তোমার শেষ সুযোগ।”
কথাগুলো বলার সময় কায়ানের কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না। কোনো উচ্চস্বরে হুমকিও ছিল না। বরং তার স্বর ছিল ভয়ঙ্কর রকমের স্থির। যেন সে কোনো হুমকি দিচ্ছে না, শুধু একটি অনিবার্য ভবিষ্যতের কথা জানিয়ে দিচ্ছে। সেই অস্বাভাবিক শান্ত স্বরই সেরিনের বুকের ভেতর আতঙ্ককে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।
সেরিনের নিঃশ্বাস গলায় আটকে গেল। তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে, বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দনের শব্দ পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
সে কষ্ট করে একটি শুকনো ঢোক গিলল।
কায়ান ধীরে ধীরে আরও ঝুঁকে এসে সেরিনের ঠোঁটে একটি সংক্ষিপ্ত চুম্বন এঁকে দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখে আবার সেই স্বাভাবিক, নিরীহ হাসি ফিরে এল।
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫১
“চলো, ডিনার রেডি।”
যেন কয়েক মুহূর্ত আগের কথাগুলো কখনোই বলা হয়নি।
সেরিন কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। তারপর ভীত, নিস্তেজ পায়ে কায়ানের পাশে পাশে ডাইনিং টেবিলের দিকে চলে গেল। ভিলার উষ্ণ আলোয় সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক লাগছিল। শুধু সেরিনের মনে হচ্ছিল, এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধকারটা নীরবে শ্বাস নিচ্ছে।
