কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৮
লামিয়া রহমান মেঘলা
সেরিন আহিকে সঙ্গে নিয়ে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত মেহমানদের সামনে এসে বসল। লজ্জায় আহির মুখশ্রী রক্তিম হয়ে উঠেছে। মাথা নিচু করে সে নীরবে বসে রইল। সেরিন ধীর পায়ে রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য নাস্তার আয়োজন করল। সার্ভেন্টও তাকে কাজে সাহায্য করছিল। এদিকে বানু মির্জা আপন ভঙ্গিতে অতিথিদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছেন।
কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো কায়ান। তার পাশেই জেবরান। দুই ভাই এসে সবার সঙ্গে সোফায় বসল। মুহূর্তেই চারপাশের পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠল নানান আলাপচারিতায়। সেরিন একে একে সবার হাতে নাস্তা তুলে দিয়ে এসে কায়ানের পাশে নীরবে বসে পড়ল।
কায়ান ও সেরিনের দিকে স্নেহমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে জাহেদের বাবা জনাব মনসুর আলি মৃদু হেসে বললেন,
“মাশাআল্লাহ কায়ান, তুমি আর তোমার স্ত্রী দুজনকে একসঙ্গে সত্যিই দারুণ মানিয়েছে।”
কায়ানও বিনয়ের হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে উত্তর দিল,
“আঙ্কেল, আপনাকেও আপনার স্ত্রীর সঙ্গে একদম পরিপূর্ণ মানিয়েছে।”
জেবরান মৃদু হাসল। তারপর শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে বলল,
“আসলে আঙ্কেল, মানুষের পাশে কে আছে, সে কতটা সুন্দর কিংবা কতটা ধনী, সেটাই আসল বিষয় নয়। যে মানুষটি আপনাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, আপনাকে নিজের পৃথিবী মনে করে, সেই মানুষটিই প্রকৃত অর্থে আপনার সবচেয়ে উপযুক্ত সঙ্গী।”
তার কথাগুলো যেন নিস্তব্ধতার বুক চিরে সবার হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করল। উপস্থিত সবাই সম্মতিসূচক দৃষ্টিতে মাথা নেড়ে তার কথার সত্যতাকে স্বীকার করল। কায়ানও অনুভব করল, ছোট ভাইয়ের কয়েকটি সাধারণ বাক্যের ভেতর কতটা গভীর জীবনবোধ লুকিয়ে আছে।
এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে আহির আঙুলে আংটি পরিয়ে দেওয়া হলো। দুই পরিবারের সম্মতিতে আগামী শুক্রবার তাদের শুভ বিবাহের দিন নির্ধারণ করা হলো।
দুপুর ধীরে ধীরে বিকেলের দিকে গড়াতেই একে একে সব মেহমান বিদায় নিলেন। সিকদার নিবাসজুড়ে নেমে এলো উৎসবের আবহ। পরিবারের একমাত্র মেয়ের বিয়ে ঘিরে আনন্দ যেন প্রতিটি দেয়াল ছুঁয়ে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেকের মুখে ছিল প্রশান্তির নির্মল হাসি।
দুপুরের সমস্ত কাজ শেষ করে সেরিন নিজের কক্ষে ফিরে এলো। কিন্তু ঘরে ঢুকেই দেখতে পেল কায়ান সেখানে নেই। কিছু না ভেবে সে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
অন্যদিকে ছাদের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে কায়ান নীরবে আকাশের বিস্তৃত শূন্যতার দিকে তাকিয়ে সিগারেটে ধোঁয়া ছাড়ছিল। একটু দূরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল শিমুল। বাতাসে এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা।
হঠাৎ কায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাতে ধরা সিগারেটটি নিচে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তুমি জানো শিমুল, আমার জীবনে এমন চারজন মানুষ আছে, যাদের আমি নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি। তাদের একজন তোমার বোন। আর বাকি তিনজন হলো আমার মা আর আমার দুই ভাইবোন। সেরিন আমার জীবনে আসার আগে ওদের নিয়েই ছিল আমার পুরো পৃথিবী।
আমি কোনো দিন আমার ভাইকে কাঁদতে দিইনি। এমনকি মেহেরীনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নিজের জন্য নিয়েছিলাম। কারণ আমি আমার প্রাপ্য ছিনিয়ে নিতে জানি। সেরিনকেও আমি আমার জন্য ছিনিয়ে নিয়েছি। কিন্তু জেবরানের জীবনটা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। আমার ভাই খুব আদুরে, খুব কোমল হৃদয়ের মানুষ। ওর জীবনে প্রথম যে নারীকে সে ভালোবেসেছে, সেই নারীই তুমি। আমি তোমাকে একজন ভালো মেয়ে বলেই জানতাম, শিমুল। অথচ নিজের বোনকে হিংসা করতে করতে আজ তুমি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছ, যেখান থেকে তোমার সামনে কেবল ধ্বংসের পথটাই খোলা। একবার ভেবে দেখেছ, কখনো মা হতে পারবে না জেনেও যে পুরুষ তোমার হাত শক্ত করে ধরে আছে, সে তোমাকে কতটা ভালোবাসে?”
শিমুল নির্বাক। তার ঠোঁট কাঁপছে, অথচ কোনো শব্দ বেরিয়ে আসছে না।
কায়ান ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরে তাকাল। শিমুলের হাতে তখন সেই ড্রেসটি।
সে শান্ত স্বরে আবার বলল,
“এই ড্রেসটার দাম সেরিনের পরনের ড্রেসের চেয়ে তিন গুণ বেশি। আমার ভাই নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেবে, তবু তোমার মুখে কষ্টের ছাপ দেখতে চাইবে না। জেবরান পৃথিবীর সবকিছু সহ্য করতে পারবে, কিন্তু নিজের স্ত্রীর মনে নিজের ভাইয়ের স্ত্রী, নিজেরই বোনের প্রতি হিংসা সহ্য করতে পারবে না। শিমুল, তোমার সামনে এখন দুটি পথ খোলা। হয় আমার ভাইয়ের হাত ধরে নতুন জীবন শুরু করো, নয়তো নিজের হাতে নিজের ধ্বংস ডেকে আনো। একটা কথা মনে রেখো। আগুনে পুড়লে জমির অস্তিত্ব থেকে যায়, কিন্তু নদী ভাঙলে সবকিছু বিলীন হয়ে যায়। আর সিকদার কায়ান মাহবুব যখন কারও জীবনে ধ্বংস হয়ে আসে, তখন সে নদীভাঙনের মতোই আসে, যেখানে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।”
কথাগুলো শেষ করে কায়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দৃপ্ত পদক্ষেপে ছাদ ছেড়ে চলে গেল।
শিমুল স্থির দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। কায়ানের শেষ কথাগুলো কোনো সাধারণ সতর্কবার্তা ছিল না। ওগুলো ছিল এক নীরব ঘোষণা, এক ভয়ংকর হুঁশিয়ারি।
ধীরে ধীরে সে মেঝেতে পড়ে থাকা ড্রেসটি তুলে নিল। প্রাইস ট্যাগে চোখ পড়তেই তার দৃষ্টি বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
ছয় হাজার আটশ টাকা।
সেরিনের ড্রেসের চেয়েও বহুগুণ দামী। শুধু দামই নয়, পোশাকটিও ছিল অপূর্ব সৌন্দর্যে ভরপুর।
শিমুল ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। ড্রেসটি বুকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে উঠল।
অনুশোচনার বিষাক্ত আগুন ধীরে ধীরে তার অন্তরকে গ্রাস করতে লাগল। মনে হলো, নিজের লোভ, অহংকার আর হিংসার কাছে পরাজিত হয়ে সে আজ নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে।
বেডরুমে প্রবেশ করেই কায়ান থমকে দাঁড়ায়। মুহূর্তেই তার হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
সেরিন সবে গোসল সেরে বেরিয়েছে। বুক থেকে হাঁটু পর্যন্ত কেবল একটি সাদা তোয়ালে জড়িয়ে আছে তার। দীর্ঘ কালো চুলের ডগা বেয়ে টুপটাপ করে পানির ফোঁটা মেঝেতে ঝরে পড়ছে। স্নিগ্ধ জলকণাগুলো যেন বিকেলের শেষ আলোয় নীরব সৌন্দর্যের এক অনির্বচনীয় আবহ সৃষ্টি করেছে।
কায়ান ধীরে এগিয়ে এসে ঠাস করে দরজাটি বন্ধ করে দেয়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে সেরিন চমকে ওঠে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই কায়ান তার একেবারে কাছে এসে দাঁড়ায়।
সেরিন পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে কায়ানের দিকে।
“ড্যাম, হোয়াট আর ইউ ডুইং, সেরিন?”
“গোসল করে এসেছি।”
“গোসল করে এভাবে এসেছ কেন? আমাকে সিডিউস করতে ইচ্ছে করছিল?”
“না। ছাড়ুন। এখন বিকেল। বাড়িভর্তি মেহমান।”
কায়ান মৃদু অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে তার কাঁধ ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলে,
“যা করার করুক। আমার বউ এখন আমার কাছেই থাকবে।”
কথাগুলো উচ্চারণ করেই সে সেরিনকে নিজের বুকে টেনে নেয়। সেরিন নিঃশব্দে চোখ বুজে কায়ানের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফেলে। আঙুলগুলো অজান্তেই বিছানার চাদর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। কায়ানের অনুভূতির প্রবল স্রোতের সামনে সে আর কোনো কথা বলে না। নিস্তব্ধ ঘরটিতে কেবল তাদের নীরব উপস্থিতিই যেন সমস্ত শব্দকে গ্রাস করে নেয়।
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৭
বিকেল ধীরে ধীরে গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে ধরণীর বুকে। পশ্চিম আকাশের রক্তিম আভা ক্রমে মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে নেমে আসে কোমল নীলচে অন্ধকার। দূরের গাছপালার ফাঁক গলে শীতল বাতাস জানালার পর্দা আলতো দুলিয়ে দেয়। কোথাও কোথাও পাখিদের শেষ কোলাহল স্তব্ধ হয়ে প্রকৃতি ডুবে যায় এক রহস্যময় নীরবতায়। সন্ধ্যার সেই মায়াবী আবরণ যেন সমগ্র পৃথিবীকে নিঃশব্দে নিজের আঁচলে ঢেকে ফেলে।
রুমের ভেতরও আবার ধীরে ধীরে নেমে আসে শান্তি। সেরিন গভীর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। কায়ান স্নেহভরে তার গালে কয়েকটি চুমু এঁকে আলতো হাতে তাকে ঠিক করে শুইয়ে দেয়। তারপর শেষবারের মতো একবার ফিরে তাকিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়। তার সামনে অপেক্ষা করছে কয়েকটি জরুরি দায়িত্ব।
