খান সাহেব পর্ব ১৭
সুমাইয়া জাহান
ভোরের আলো ফুটেছে অনেকক্ষণ আগে। ঘড়ির কাঁটা সকাল নয়টায় ছুঁই ছুঁই। সিকদার বাড়ির সকলের সকালের নাস্তা করা শেষ। আনোয়ার সাহেব সকালের নাস্তা করে স্কুলে চলে গেছেন, কারণ সুমুর বিয়ের জন্য তাকে আবারও দুদিনের জন্য ছুটি নিতে হবে। সুমুরা সকলে শপিংয়ে যাবার জন্য রেডি হয়ে গেছে। তাদের শপিংমলে নিয়ে যাবে নয়ন। রাহিন তার বন্ধুদের সাথে পরে যাবে।
সকলে বেরিয়ে পরল শপিংমলের উদ্দেশ্যে। সুমুর মনটা অস্থির হয়ে আছে তার খান সাহেবকে দেখার জন্য। কালরাতে মাথা গরম করে কীসব উল্টাপাল্টা বলেছে সে। তখন রাগের মাথায় তার খেয়াল ছিল না যে, সামনে তার বড় ভাই আছে। এখন সেসব ভেবে প্রচুর গিল্টি ফিল করছে সে। গাড়িতে বসেই আনমনে এইসব কথা ভাবছে সুমু।
নয়ন গাড়ি স্টার্ট দিল। নয়নের পাশের সিটে মাইশা বসা। সুমুর পাশে নাজমিন আর সামিয়া বসেছে। সুমুদের পেছনের সিটে ইফতিয়া, লামিয়া আর রাইশা বসেছে। তিশা আর রাইফ আজ বাড়িতেই আছে। সুমুর বিয়ের খবর শোনার পর থেকে রাইশাদের ব্যবহার যেন অনেকটা পাল্টে গেছে। সুমুর সাথে ভালো ব্যবহার করছে তারা। সবসময় হেসে হেসে কথা বলছে সুমুর সাথে।
সুমুর কাছে ব্যাপারগুলো স্বাভাবিকই লাগল। কারণ ওরা তিনজন সুমুকে একটুও পছন্দ করেনা। ওরা তিনজন খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে সুমুর মনে অবস্থা। আর তাই সুমুকে আরও জ্বানালোর জন্য ওরা এতো ভালো মানুষি দেখাচ্ছে। মাঝে-মাঝে খুব হাসি পায় সুমুর। যার জন্য ওরা তার সাথে এমন ব্যবহার করছে, সেই মানুষটাকে ওরা কোনদিনও পাবে না। কারণ সেই মানুষটার যে অন্য একটা কেউ আছে। কিন্তু সুমু চায়না ওদের তিনজনেরও মন ভেঙে যাক। কারণ সুমু জানে, মন ভেঙে গেলে ঠিক কতোটা কষ্ট হয়। এই দুনিয়াতে যাদের মন ভেঙেছে, শুধু তারই জানে মন ভাঙার কষ্ট ঠিক কতোটা। তখন বেঁচে থেকেও মরে যেতে হয়।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে গাড়ি এসে থামল শপিংমলের সামনে। একে একে গাড়ি থেকে সকলে নেমে দাঁড়াল। সকলে একসাথে মলের ভিতরে ঢুকল। রিফাত আসলেই কেনাকাটা শুরু হবে।
হঠাৎ নয়ন বলল,
“এইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। ততক্ষণে চলো পাশের ক্যাফেতে যাই। ওখানে গিয়ে সুমু না হয় রিফাতকে কল করে শুনে নেবে, রিফাত কতোদূর এসেছে।”
সুমু আচমকাই বলল,
“আমি কল করতে পারব না ভাইয়া।”
মাইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেনো পারবি না? তোর কাছে নাম্বার নেই নাকি?”
সুমু কিছু বলার আগেই ইফতিয়া বলল,
“ওর কাছে নাম্বার আছে আপু। কাল রাতে আমি নিজে ওর ফোনে নাম্বারটা সেভ করে দিয়ে এসেছি।”
সুমু খুব বিরক্ত হলো। মাইশা আবারও বলল,
“তাহলে সমস্যা কোথায় সুমু?”
নয়ন হেসে বলল,
“আরে মাইশা! তুমি বুঝো না কেন? আমার শালিকা হয়তো লজ্জা পাচ্ছে। প্রথমবার বিয়ে করছে তো, তাই লজ্জাতো একটু পাবেই। আমিও তো পেয়েছিলাম।”
মাইশা নয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও আচ্ছা! তাই? তাহলে তুমি বলো, একটা মানুষ ঠিক কতোবার বিয়ে করে? আর ঠিক কতোবার বিয়ে করার পর একটা মানুষ আর বিয়ে করতে লজ্জা পায়না?”
নয়ন মাথা চুলকে বলল,
“পুরুষ মানুষ চারটা বিয়ে করতে পারে, বউ।”
মাইশা এক ভ্রু উঁচু করে বলল,
“তা আপনি ঠিক কতোগুলো বিয়ে করতে চান?”
নয়ন লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল,
“তুমি যদি পারমিশন দাও তাহলে আরো একটা…”
কথাটা শেষ করতে পারল না নয়ন। মাইশা নয়নের পেটে কনুই দিয়ে গুতো মারল। ব্যথাই নয়ন চোখ মুখ কুঁচকে পেটে ধরে “আহ্” বলে উঠল।
সকলে হো হো করে হেসে উঠল। মাইশা কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নয়নের দিকে। ব্যথা ভুলে নয়ন কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“মজা করেছি বউ। তুমি ছাড়া আমার জীবনে অন্য কারো প্রবেশ নিষেধ।”
মাইশা হেসে বলল,
“কথাটা যেন মনে থাকে।”
সে সুমুর উদ্দেশ্যে বলল,
“দুদিন পরে বিয়ে হবে তোদের। এখন এমন করলে হবে সুমু? এখন থেকে নিজেকে মানিয়ে নিতে জানতে হবে তোকে।”
মাইশার কথা শুনে সুমু মনে মনে বলল,
“যেখানে বিয়েটাই করতে চাইনা, সেখানে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
সুমুর আর কথা বলতে ইচ্ছা করল না। সে একা একা হেঁটে চলে গেল ক্যাফের দিকে। সকলে চলল সুমুর পিছু পিছু।
ক্যাফের ভেতরে ঢুকে সকলে টেবিলে বসল। নয়ন সকলের জন্য কফির অর্ডার করল। মাইশা সুমুর ফোন থেকে রিফাতের নাম্বার নিয়ে নয়নকে দিয়ে কল করালো। নয়ন উঠে একটু সাইডে চলে গেল। কথা শেষ করে এসে সে জানাল, “রিফাত প্রায় কাছাকাছি চলেই এসেছে। দশমিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছাবে।”
সকলে কফি খাচ্ছে আর টুকটাক কথা বলছে। সুমু নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। হঠাৎ সুমুর নজর গেল কর্নার টেবিলে বসে থাকা দুজন কপোত কপোতীর দিকে। “সেখানে একটি মেয়ে চাউমিন খাচ্ছে। তার মুখের ওপর কিছু চুল উড়ে এসে তাকে বিরক্ত করছে। ছেলেটা খুব যত্নসহকারে আলতো হাতে চুলগুলো সরিয়ে মেয়েটার কানে পাশে গুজে দিল। মেয়েটা ছেলেটার দিকে লজ্জামাখা মুখ নিয়ে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ছেলেটাও প্রতিউত্তরে মেয়েটাকে সুন্দর একফালি হাসি উপহার দিল।”
ছেলেটা আর মেয়েটার এমন মিষ্টি ভালোবাসা দেখতে ভালোই লাগছিল সুমুর। মেয়েটির জায়গায় নিজেকে আর ছেলেটির জায়গায় সে তার খান সাহেবকে ভাবতেই, “এটা ঠিক না বলে” নিজের মনের সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করল সুমু। চোখ সরিয়ে ক্যাফের দরজার দিকে তাকাতেই একটি যুবকের দিকে চোখ গেল তার। যুবকটি এগিয়ে আসছে তাদের দিকেই। গায়ের রং ফর্সা। তবে তার খান সাহেবের মতো ওতো বেশি না। দেখতে সুন্দর, ক্লিন সেভ করা, চুলগুলো সেট করে রাখা, পরনে ফর্মাল ড্রেস পরা। ছেলেটিকে দেখেই মনে হচ্ছে, অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছে। জিম করা বডি। চোখে কালো চশমা। এক কথায় সুদর্শন বলা যায়।
ছেলেটি এগিয়ে এল সুমুদের দিকে। নয়নের সাথে হ্যান্ডশেক করে টুকটাক কথা বলে চেয়ারে বসল। সুমুর দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো তাদের। চটজলদি চোখ সরিয়ে নিল সুমু। কিন্তু রিফাত তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। সুমু মাথা নিচু করে বসে রইল। নয়নরা সকলে উঠে অন্য টেবিলে চলে গেল। এথে সুমুর কিছুটা অস্বস্তিবোধ হলো। রিফাত এখানো তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। হঠাৎ সে কিছু বলতে নেবে, তখনই সুমুদের টেবিলে এসে বসল রাহিন। সুমু মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল শেরাজরা সকলেই এসেছে। শেরাজ দুইহাত পকেটে গুজে স্টিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের চাহুনি শীতল, তবে অদ্ভুত রকমের ভয়ংকর। আচমকাই সুমু ভয় পেয়ে চোখে নামিয়ে নিল। পরিস্থিতি এখন থমথমে, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস।
রাহিন পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ খুলে বলল,
“রিফাত! রাইট?”
রিফাত ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
“হ্যাঁ! আর আপনি রাহিন? আনোয়ার আঙ্কেলের বড় ছেলে?”
“হ্যাঁ! তোমাকে অনেক ছোট বেলায় দেখেছি আমি। অনেক বড় হয়ে গেছো।”
রিফাত একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“হ্যাঁ, ভাইয়া!”
“তা আমার বোন সুমুকে তোমার কেমন লাগল?”
রিফাত একপলক সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“জি ভাইয়া, ভালোই!
“পছন্দ হয়েছে তো?”
“আসলে ভাইয়া, এইটুকু সময়ে সুমুকে দেখে যা বুঝলাম, ওকে কোনো ছেলেই অপছন্দ করতে পারবে না। কিন্তু…”
রাহিন, রিফাতকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
থাক না। তোমার কিন্তুটা, না হয় পরেই শুনব। এখন আপাতত যেটা করতে এসেছি সেটা করি।”
সে নয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নয়ন! তোমরা তো শপিং করতে এসেছো, শপে গিয়ে সুমুর কি কি ভালো লাগে দেখাতে বলো, আমরা একটু পরে আসছি।”
নয়ন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“কিন্তু ভাইয়া রিফাত যাবেনা ? আজ সবকিছুতো সুমুর জন্য রিফাতই পছন্দ করবে।”
“হ্যাঁ যাবে। তবে তার আগে রিফাতের সাথে আমার কিছু কথা আছে। বোন বিয়ে দিব আর একটু কথাবার্তা বলে, দেখেশুনে না নিলে হবে?”
নয়ন সম্মতি জানিয়ে সকলকে নিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে মলে চলে গেল।
নয়নরা যেতেই শেরাজ গিয়ে বাসল সুমুর বসা চেয়ারটিতে। সে রাহিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“রাহিন! তোরা সবাই বাহিরে যা।”
“কিন্তু, এস. কে…”
“যা! শুধু আমি আর সান থাকব। তোরা যা।”
রাহিনরা সকলে বাধ্য হয়ে চলে গেল। শেরাজ বাঁকা হেসে রিফাতের দিকে তাকাল।
রাহিনরা বের হবার পনেরো মিনিটের মধ্যে শেরাজ, রিফাত আর স্যান্ডি বেরিয়ে এলো। রাহিনরা সকলে রিফাতকে অক্ষত অবস্থায় দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সেই সাথে অনেক অবাক হলো।
অমিত সারবাজের কাছে গিয়ে বলল,
“ব্যাপারটা কি বল তো, এস.কে ঠিক কি করতে চাইছে? এই রিফাত ছেলেটা এখনো অক্ষত। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
সারবাজ আফসোসের স্বরে বলল,
“আমিও কিছু বুঝতে পারছি না। কিন্তু যখনই কিছু বুঝবো, সাথে সাথে তোকে জানাবো।”
অমিত ভ্রু কুঁচকে সারবাজের দিকে তাকাল। সারবাজ দাঁত কেলিয়ে হাসতে লাগল।
সুমুর জন্য বেনারসি শাড়ি দেখা হচ্ছে। কিন্তু এখন পযর্ন্ত কোনোটাই পছন্দ করেনি সে। রিফাত আসতেই সকলে রিফাতকে বলল শাড়ি পছন্দ করতে। রিফাত তার পছন্দ মতো একটা ডিপ পিংক কালারের শাড়ি পছন্দ করল। তারপর একে একে শাড়ি, জুয়েলারি, মেকআপ কিট সবকিছুই কেনা হলো সুমুর জন্য। কিন্তু একটা জিনিসও সুমু পছন্দ করল না। তার চোখদুটো শুধু তার খান সাহেবকে খুঁজে চলেছে।
দুইটা লাগেজ ভর্তি জিনিস কেনা হলো সুমুর জন্য। লাগেজ দুটো গাড়ির ডিকিতে রেখে সকলে গেল রেস্টুরেন্টে। এর মধ্যে সুমু আর রিফাত একে অপরের সাথে কথা বলাতো দূরে থাক, একে অপরের দিকে তাকায়নি পযর্ন্ত।
রেস্টুরেন্টে গিয়ে সকলের পছন্দ মতো খাবার অর্ডার করা হলো। নাজমিন আর সামিয়া উঠে রেস্টুরেন্টের বাহিরে চলে গেল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আবারও ফিরে এলো তারা। ওদের দুজনের ঢোকার দু’মিনিট বাদে শেরাজ ঢুকল। তার হাতে রেড বুল ক্যানের বোতল। সে ক্যানের বোতলে ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিচ্ছে আর ফোনে স্ক্রল করছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ফোনে স্ক্রল করতে করতে গিয়ে বসল রাহিনদের টেবিলে। সুমু একপলক তাকিয়ে মাথা নিচু করে রাখল। সকলে খাচ্ছে। শুধু সুমু প্লেটে চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করছে। শেরাজ ব্যাপারটা লক্ষ্য করে বলল,
“খাবারের বিলটা আমি পেমেন্ট করব। সো, কেউ খাবার নষ্ট করতে পারবে না। কারো কিছু লাগলে অর্ডার করো, কিন্তু নষ্ট করা যাবে না।”
রাহিনরা ছাড়া সকলেই শেরাজকে ভয় পায়। কিন্তু সেটা কেনো, তার কারণটা কেউ বলতে পারে না। তাই আর কেউ শেরাজকে বিল দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে বারণ করার সাহস পেল না। সকলে মন মতো যার যেটা ভালো লাগে অর্ডার করল। শুধু সুমুই খেলো না ঠিকমতো কিছু। শেরাজের তখনের খাবার নিয়ে বলা কথাগুলো যে সুমুর জন্য ছিল, এইটা সুমু বুঝতে পেরে আরও ইচ্ছে করেই কিছু খেলোনা। খাওয়া শেষে রিফাত রাহিনদের সাথে হ্যান্ডশেক করে সকলকে বলে বেরিয়ে গেল। রিফাত চলে যেতেই সুমুরাও বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
ড্রয়িংরুমে সকলে উপস্থিত, শুধু রাহিনরা ছাড়া। শেরাজ বলেছে, নাইটে বাইক রাইডে বের হবে। এইটা শেরাজের অন্যরকম একটা ভালো লাগা। যখন মন অনেক বেশি ভালো থাকে, সে নাইটে বাইক রাইডে বের হয়। আর নরমালি অলওয়েজ গাড়ি নিয়ে বের হয়। ফ্রেন্ডদের সাথে অনেক রাত পযর্ন্ত মজা মাস্তি করে আবারও বাড়িতে ফিরে আসে। প্রতিমাসে দুইবার অন্তত ট্যুরে বের হয়।
ড্রয়িংরুমে সকলে বসেছে সুমুর বিয়ের শপিং দেখতে। প্রতিটা জিনিস সকলের খুব পছন্দ হয়েছে। হঠাৎ করেই ইফতিয়া বলল,
“আম্মু! রিফাত ভাইয়া দেখতে যেমন সুন্দর, রিফাত ভাইয়ার পছন্দও তেমন সুন্দর।”
সুমুর এইসব কিছুই সহ্য হচ্ছেনা। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোর ওনাকে পছন্দ হয়েছে ইফতিয়া?”
ইফতিয়া হেসে বলল,
“হুম, দারুণ দেখতে। কিন্তু রাহিন ভাইয়ার ফ্রেন্ডেদের মতো ওতো সুন্দর লাগেনি। তবে হ্যান্ডসাম আছে। আমার বেশ ভালোই লেগেছে।”
ইফতিয়ার কথা শুনে সুমু তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। সে রাগটা কন্ট্রোল করে বলল,
“তাহলে তুই বিয়েটা করে নে।”
সুমুর কথাশুনে মুখটা কালো করে ফেলল ইফতিয়া। হাসি বেগম মেয়েকে ধমকে উঠে বললেন,
“এইসব কি ধরনের অসভ্য কথাবার্তা সুমু? পরশু তোমার বিয়ে, আর আজ তুমি জানো না কাকে কি কথা বলতে হয়?”
“সরি আম্মু! আগে থেকেতো আর জানতাম না যে, এখানে এসে এমন হঠাৎ করে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে। যদি আগে জানতাম, তাহলে অবশ্যই আমি আরও একমাসে আগে থেকে কার সাথে কখন, কীভাবে কথা বলতে হয়, ওইটা প্র্যাকটিস করে রাখতাম। আর এইমুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে না আমি কোনো ভুল কথা বলেছি। ইফতিয়ার যদি ওনাকে এতোই পছন্দ হয়ে থাকে, তাহলে তোমার বোনকে বলো, তার মেয়ের সাথেই যেন বিয়ের ব্যবস্থাটা করে।”
কথাগুলো বলে ওপরে চলে গেল সুমু। খুশি বেগম সুমুর কথাশুনে রাগে ফুঁসছে। সুমুর কথাগুলো গায়ে কাটার মতো ফুঁটছে তার। তবুও নিজেকে সামলে রাখলেন তিনি। ওদিকে মাইশা লাগেজের মধ্যে সবকিছু ঢুকিয়ে রাখল আবারও।
ঘড়ির কাটায় রাত দশটা পনেরো বাজে। রাতের খাবার খেয়ে বড়রা সকলে যার যার রুমে চলে গেছে। শুধু ছোটোরা ছাদে গেছে। সুমুকে মেহেদী পড়ানোর জন্য পার্লার থেকে এই রাতের বেলা মেয়ে আর্টিস্ট আনা হয়েছে বেশি টাকা দিয়ে। তাই এখন ছোটোরা সকলে ছাদে। আনোয়ার সাহেব বলেছেন, “হাসনা বেগমরা সব আয়োজন করলে, তারাও কোনো কমতি রাখবেন না। অনেক বড় করে না হোক। অল্প আয়োজন করে হলেও সবকিছুই হবে।” হাসি বেগম বাধা দিতে গিয়েও, বড় ভাইয়ের মুখের ওপর বেশি কিছু বলতে পারেননি। খুশি বেগম আর মিনা বেগম এই বিষয়ে কিছু বলেননি। তারা শুধু চায় সুমুর বিয়েটা সুস্থ ভাবে হোক। কাল গায়ে হলুদের রিসেপশন বড় করে করা হবে।
ছাদে এখন সুমু সকলের মধ্যমণি হয়ে বসে আছে। মেহেদী পড়ানো হচ্ছে তাকে। পার্লারের মেয়েটা হঠাৎ সুমুকে বলল,
“সুমু! তোমার হবু বরের নাম কি?”
সুমু বলার আগেই ইফতিয়া বলল,
“রিফাত! আপু ওর দুইহাতে খুব সুন্দর করে বড় বড় করে “রিফাত” নামটা লিখে দিন।”
সুমুর বিগড়ানো মেজাজটা আরও বিগড়ে গেল। সে মনে মনে বলল,
“এই মেয়েটাকে যে কবে থেকে বিনা বেতনে নিজের দালাল হিসেবে রেখেছি, সেটা আমি নিজেও জানি না। মেহেদী পরানোর জন্য লোক আসবে এইটা আগে জানলে, নিজের হাতদুটোকে ব্লেড দিয়ে জায়গায় জায়গায় কেটে রেখে দিতাম। তবুও অন্যকারে নামে মেহেদী পরতাম না।
সুমু আলতো হেসে বলল,
“এইসব নাম লেখার কোনো প্রয়োজন নেই আপু।”
পাশ থেকে মাইশা বলল,
“কেনো? কেনো? কেনো প্রয়োজন নেই? আপনি লিখেন তো। খুব সুন্দর করে রিফাত নামটা লিখেন।”
সুমু কিছু বলতে যাবে তখনই চোখ পরল ছাদের দরজার দিকে। রাহিনরা সকলে আসছে। সুমু শেরাজকে দেখে একটু উচ্চস্বরে বলল,
“আপু একটা হার্ট আঁকুন সুন্দর করে। তার ভেতরে রিফাত নামটা লিখে দিন। আফটার অল, হি ইজ মাই অডবি হাজব্যান্ড।”
শেরাজের পা জোড়া থমকে গেল কিছুক্ষণের জন্য। তার শান্ত মস্তিষ্কে ধপ করে আগুন জ্বলে উঠল। নিজেকে কোনোমতে সামলে ছাদের অন্য সাইডে চলে গেল সে। পার্লারের মেয়েটি খুব যত্ন করে রিফাত নামটা লিখে দিল সুমুর হাতে। নামটা লেখার সময় সুমুর মনে হচ্ছিল, তার হাতে কেউ এসিড মেরেছে। নয়তো হাতটা জ্বলছে কেনো। কই এতোক্ষণ তো জ্বলেনি। নামটা লেখার সাথে সাথে জ্বলছে কেনো। সুমুর ইচ্ছা করল নাম লেখা অংশ দুটো কেটে হাত থেকে বাদ দিয়ে দিতে। কিন্তু এমন কিছুই করবে না সুমু। নিজের ইচ্ছাটাকে দমিয়ে রাখল, তার খান সাহেবকে তার খুশি দেখানোর জন্য। সুমু চায় তার খান সাহেব দেখুক, তাকে ছাড়া সুমু কতোটা ভালো আছে। হোক সেটা দেখানো অভিনয় করা ভালো, তবুও তো ভালো আছে সে। আর সারাজীবন এইভাবে অভিনয় করেই ভালো থাকবে সে। এখন সুমুর মনে হয়, সে ভালো অভিনেত্রী হতে পারতো। কতো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করে সে। কখনও সে ভাবেনি , বাস্তব জীবনেও কখনও তাকে এমন অভিনয় করতে হবে। আজ সত্যি তার মনে হয়, সে দারুন অভিনেত্রী।
দূর থেকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে শেরাজ। নিজের রাগকে কন্ট্রোল করার কোনো উপায় খুঁজে পেল না সে। তার ইচ্ছে করছে সুমুর হাতদুটো কেটে কুচিকুচি করে দিতে। হঠাৎ ঠোঁটে কোণে বাঁকা হাসি রেখে শেরাজ বিড়বিড়িয়ে বলল,
“আমার ধৈর্যের সীমা খুব কম, সুইটহার্ট। নিজেকে যতো কন্ট্রোল করে ধরে রেখেছি, তুমি ঠিক ততোবার আমার কন্ট্রোলে আঘাত করছো, সুইটহার্ট। এর পরিণাম কি ভালো হবে? উহুম! একটুও ভালো হবে না। তবে চিন্তা করো না তুমি। আমি তোমাকে কোনোদিনও আঘাত করব না। শুধু খুব যত্নসহকারে তোমার হাত থেকে অন্যের নামটা মুছে ফেলব।”
পার্লারের মেয়েটা মেহেদী পরিয়ে চলে গেছে। রাহিন ড্রাইভারকে বলে বাড়ির গাড়ি দিয়ে পাঠিয়েছে মেয়েটাকে বাসা পযর্ন্ত ছেড়ে দিয়ে আসতে। এখন আপাতত তারা গান-বাজনা করছে। শেরাজ খুব সুন্দর গান গায়, তবে কেউ আছ সাহস পেল না শেরাজকে গান গাইতে বলার জন্য। তাই মাইশারা সকলে মিলে সুমুকে জোর করছে একটা গান গাওয়ার জন্য। কিন্তু সুমু গাইতে চাইছে না। সকলে মিলে জোর করছে তাকে। সকলের জোড়াজুড়িতে শেষমেষ সে রাজি হলো গান গাইতে। মেহেদী পরা হাত নিয়েই উঠে দাঁড়াল সে। ধীরে পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল ছাদের একদম শেষ প্রান্তে। সুমুর পরনে নীল রঙের একটা সেলোয়াল-কামিজ। কামিজের ওপরে লেডিস হুডি পরা। ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকা। চুলগুলো খোপা করে রাখা। কপালের দুপাশ দিয়ে কিছুটা করে চুল বের করে রাখা। বিয়ে হয়নি এখনও সুমুর, তবুও তাকে বউ বউ লাগছে। অন্যরকম সুন্দর লাগছে আজ সুমুকে। শেরাজ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার প্রেয়সীর দিকে। হঠাৎ সুমু উদাস মন নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গান ধরল,
“মেরি তুমহারি, খাব ও ছারি!
দেখেথে জো সাচ, হোংগে নেহি!
হোংগে জুদা না, তুমনে কাহাথা!
আয়েগা পার ইয়ে, সোচা নেহি!
ইয়েভি কাহা থা তুমনে মুঝে, ম্যা দূর না যায়ুংগা!
দিলকো মেরি না সামাঝ আয়া, তেরা বিন বোলে চালে যানা!
কাভি তুমহে ইয়াদ মেরি আয়ে, রাহাছে মেরি গুজার জানা”
“তুম, আগার, মানাওগে, তো মান যায়ুংগী!
ম্যা তেরি বুলানেপে, লট আয়ুংগী!
হার সাফার মে সাথ তেরা, ম্যা ইউহি নিভায়ুংগী!
কাভি তুমহে ইয়াদ মেরি আয়ে, পালকো কো আপনী উঠালেনা!
সাফ দেখুংগী মে তুমকো ওহি, যোনা দেখুতো বাতা দেনা”
গান শেষ করে কেঁদে উঠল সুমু। সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আজকের দিনে এমন গান হয়তো কেউ আশা করেনি তার থেকে। কেউ কোনো কথা বলছে না। সুমু চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে চলে গেল ছাদ থেকে। মাইশা যেতে নিলে রাহিন আটকালো তাকে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সে বলল,
“ওর হয়তো আমাদের সবার জন্য কষ্ট হচ্ছে, তাই কাঁদছে। কাউকে যেতে হবে না। ও একটু কাঁদুক। কেঁদে চোখের পানি শেষ করুক। যাতে বিয়ের দিন কাঁদলেও, ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ে মেকআপ নষ্ট না হয়।”
মাইশা হেসে ফেলল রাহিনের কথায়। সে ভাবল, সেও তো এমন কাঁদতো সারাদিন। তবে সুমুর কান্নাটা একটু অস্বাভাবিক লাগল তার। আর গানটা? গানটাও অস্বাভাবিক। ভালোবাসার মানুষকে না পেলে একটা মানুষ এই ধরনের গান গেয়ে কাঁদতে পারে। মনের ভাবনাকে মনের ভিতর দমিয়ে রাখল মাইশা। সে সকলকে তাড়া দিল বাড়ির ভেতরে যেতে। রাত অনেক হয়েছে। ঠান্ডাও পড়েছে খুব। তাই সকলে ছাদ ত্যাগ করল। ইফতিয়া, লামিয়া, আর রাইশার মুখে তৃপ্তির হাসি, যেন সুমুর চোখের পানি দেখে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছে তারা তিনজন।
সিকদার বাড়ি আজ আবারও সেজে উঠেছে বিয়ের সাজে। আজ সুমুর গায়ে হলুদ। পার্লারের মেয়েরা সুমুকে সাজাচ্ছে। মেয়েরা সকলে ঠিক করেছে একরকমের শাড়ি পরবে, আর ছেলেরা সকলে একরকমের পাঞ্জাবী পরবে। সকলে রেডি হয়ে গেছে অলরেডি। শেরাজ আজ নিজের মর্জি মতো পাঞ্জাবী পরেছে। তার ইন্ডিয়ান ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবী। কালো পাঞ্জাবীতে মারাত্মক সুদর্শন লাগছে তাকে। তার ফর্সা শরীরের উজ্জ্বলতা আরও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করে নিল সে। আইয়ুবরা সকলে বসে বসে শেরাজকে দেখছে।
নিহাল নিরবতা ভেঙে বলল,
বাড়ির সব পুরুষ সেম পাঞ্জাবী, শুধু তুই ছাড়া। দেখে মনে হচ্ছে, আজ তোরও গায়ে হলুদ।
শেরাজ কোনো কথা বলল না। সকলে তাকিয়ে তার ভাবমূর্তি বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। শেরাজ ঠিক কি করতে চাইছে, স্যান্ডি ছাড়া কেউ জানে না। স্যান্ডিকে জিঙ্গাসা করলে, স্যান্ডিও শেরাজের ভয়ে কিছু বলে না। শেরাজ হঠাৎ ঘড়িটা পরতে পরতে রুম থেকে বের হলো। তার পিছু পিছু আইয়ুবরাও বেরিয়ে গেল।
সুমুকে নিয়ে আসা হয়েছে স্টেজে। আজ সুমুর দিক থেকে চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়েছে। কাঁচা হলুদ কালারের শাড়ির সাথে গাঁদা আর গোলাপ ফুলের কম্বিনেশনের সব অর্নামেন্টস। মুখে হালকা প্রসাধনীর ছোঁয়া।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে তার প্রেয়সীকে দেখছে শেহ
রাজ। সুমুকে একে একে সকলে হলুদ ছোঁয়াচ্ছে আর গিফট দিচ্ছে। আনোয়ার সাহেব বলেছেন, “গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান তাড়াতাড়ি শেষ করতে।”
লামিয়া গিয়ে বসল সুমুর পাশে। হলুদের বাটি থেকে হলুদ নিয়ে সুমুর গালে একটু চেপে ছোঁয়াল সে। সুমু হালকা ব্যথা পেল, তবে মুখে কিছুই বলল না। লামিয়া সুমুকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে বলল,
“আজ তোমার বড় বড় লেকচার কোথায় গেল, সুমু? তোমার খান সাহেব তো আর তোমার রইল না। কালতো তোমার বিয়ে হয়ে যাবে। তখন কি করবে তুমি?”
এই লামিয়া মেয়েটার সাথে তার একদম কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তবুও মুখে জোরপূর্বক হাসি রেখে বলল,
“শেরাজ খানের দিক দিয়ে লাগবে না। আমার দিক দিয়ে সে আমার খান সাহেব ছিল, আছে, আর সারাজীবন থাকবে। তুমি আমাকে নিয়ে একটু বেশি চিন্তা করছো লামিয়া। আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। তুমি তোমার নিজের চরকায় তেল দাও। আমাকে নিয়ে ভাবার জন্য আমি নিজেই যথেষ্ট।”
লামিয়া রাগে জ্বলে উঠল। সে হনহনিয়ে চলে গেল স্টেজ ছেড়ে। রাহিনরা উঠে আসল স্টেজে। শেরাজকেও টানতে টানতে নিয়ে এলো সে। একে একে রাহিনরা সকলে সুমুকে হলুদ ছোঁয়ালো। আইয়ুবরা সকলে মিলে একে অপরের গালে হলুদ ছোঁয়াল এবং শেরাজের গালেও ছোঁয়াল। শেরাজ একটু রাগি লুক নিয়ে ওদের দিকে তাকালেও, মুখে কিছুই বলল না।
রাহিন হঠাৎ শেরাজকে বলল,
“এস.কে! তুই তো সুমুকে হলুদ ছোঁয়ালি না। চল তুইও ছোঁয়াবি।”
কথাটা বলে শেরাজকে টেনে নিয়ে সুমুর পাশে বসাল সে। শেরাজ বাধা দিল না রাহিনকে। সারবাজ অলরেডি ক্যামেরা নিয়ে রেডি। সুমুর হার্টবিট বেড়ে গেল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সেই প্রথম দিনের মতোই অনুভূতি কাজ করছে সুমুর।
শেরাজ বাটি থেকে হলুদ তুলে নিল হাতে। সুমু ছলছল নয়নে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ আলতো হাতে ছুঁয়ে দিল সুমুর গাল। সারবাজ সাথে সাথে ক্যামেরা বন্দি করল ওদের দুজনকে। সুমু চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে লাগল তার খান সাহেবের ছোঁয়া। চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল তার। শেরাজ তাকিয়ে দেখছে তার প্রেয়সীকে। ক্যামেরার ক্লিকে হুঁশ ফিরল দুজনের। শেরাজ উঠে যেতে নিলে আইয়ুব শেরাজকে বাধা দিয়ে বলল,
“কোথায় যাচ্ছিস এস.কে? এখানেই বস। একটা গ্রুপ ফটো নিব।”
শেরাজ বসে রইল সুমুর পাশে। দুইগাল ভরা তার হলুদ। শেরাজ জানে, তার বাদর বন্ধুগুলো ইচ্ছে করে প্ল্যান করে এইসব করছে। সারবাজ ক্যামেরা অন করে উঠে এলো স্টেজের ওপর। সুমু আর শেরাজ স্টেজের সোফার ওপর বসা। রাহিনরা সকলে ওদের দুজনের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। সাথে সাথে সকলের একটা মিষ্টি যুগল বন্দি হলো ক্যামেরার ভেতরে।
হঠাৎ আইয়ুব নাজমিনকে ডেকে বলল,
“এই ছাম্মাকছাল্লো!”
নাজমিন তাকাল আইয়ুবের দিকে। আইয়ুব হেসে আবারও বলল,
“সামিয়াকে নিয়ে উঠে এসো। একটা পিক তুলি।”
নাজমিন যেতে চাইল না। কিন্তু সামিয়া টেনে নিয়ে গেল নাজমিনকে। সকলে মিলে আবারও ক্যামেরা বন্দি হলো। হঠাৎ শেরাজের চোখ গেল সুমুর হাতের দিকে। মুহুর্তে শেরাজ রেগে গিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে হনহনিয়ে হেঁটে চলে গেল বাড়ির ভেতরে। সুমু তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের যাওয়ার দিকে।
এদিকে, সুমু আর শেরাজের একসাথে বসে পিক তোলার ব্যাপারটা সকলে স্বাভাবিক ভাবে নিলেও কিছু মানুষ নিল অন্যভাবে। খুশি বেগম রাগে ফুসলেও, কাল সুমুর বিয়ে হয়ে যাবে ভেবে তেমন মাথা ঘামাল না ব্যাপারটা নিয়ে। তিনি ইফতিয়াকেও বুঝিয়ে বলে শান্ত করল।
রাত বারোটায় শেষ হলো হলুদের রিসেপশন। সকলে খেয়ে শুয়ে পড়েছে। সুমু একা ঘুমাতে চেয়েছিল, কিন্তু হাসি বেগম দেয়নি। সে বলেছে, “বিয়ের ছোঁয়া লাগলে একা থাকতে নেই।” তাই সুমু বাধ্য হয়ে নাজমিন আর সামিয়াকে সাথে নিল।
গায়ের হলুদ উঠছিল না বলে, সুমু শাওয়ার নিতে ঢুকেছে। এখনো বের হয়নি। হাসি বেগম বলেছেন, এতো রাতে শাওয়ার না নিতে। তখন সুমু বাধ্য মেয়ের মতো কথা শুনেছে। কিন্তু হাসি বেগম রুম ছেড়ে যেতেই সুমু শাওয়ার নিতে ঢুকেছে। নাজমিন আর সামিয়া চিন্তা করছে। অনেকবার ডেকেছে ওরা সুমুকে, তবুও সে বের হচ্ছেনা। প্রায় চল্লিশ মিনিট হয়ে গেছে সুমু ওয়াশরুমে ঢুকেছে, কিন্তু এখনো বের হয়নি। ভেতরে পানি পরার শব্দের সাথে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। সামিয়া আর সহ্য করতে পারল না বোনের কষ্ট। সে বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে ফোন করল শেরাজকে। শেরাজ কল রিসিভ করতেই, সামিয়া কাঁদতে কাঁদতে সবটা বলল তাকে। শেরাজের কোনো কথা শোনা গেল না। শুধু কল কাটার শব্দ ভেসে আসলো সামিয়ার কানে।
হঠাৎ দরজার কড়াঘাত পড়ল। নাজমিন হন্তদন্ত পায়ে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। শেরাজ ভেতরে ঢুকে নাজমিন আর সামিয়াকে কষে এক ধমক দিল, আর আগে খবরটা না জানানোর জন্য। সে ছুটে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজা ধাক্কা দিতে লাগল। শেরাজের কন্ঠ শুনে ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। কান্নার আওয়াজ বন্ধ হতেই শেরাজ চুপ করে ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মিনিট দশেকের মধ্যে দরজা খুলে দিল সুমু। শীতে শরীর কাঁপছে তার। বারবার চোখ বন্ধ করছে আর খুলছে। কান্নার ফলে চোখ লাল হয়ে গেছে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে। পরে যেতে নিলে শেরাজ নিজের বুকের মধ্যে আগলে নিল সুমুকে। পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে বেডে শুইয়ে দিল তাকে। শরীর অস্বাভাবিক মাত্রায় ঠান্ডা তার। শেরাজ ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে দিল সুমুর শরীরে। নাজমিন আর সামিয়া বেরিয়ে গেল ওদের প্রাইভেসি দিয়ে। শেরাজ সুমুর পাশে বসে তার ঠান্ডা হাতটা ধরল। ঠিক তখনই আবারও তার চোখে পড়ল সুমুর হাতে রিফাতের নামটা। মুহুর্তেই রাগ ভর করল শেরাজের শরীরে। সুমুকে রেখে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। বাহিরে গিয়ে সে নাজমিন আর সামিয়াকে বলল,
“ওর পাশে থাকো। আমি এক্ষুনি আসছি।”
কথাটা বলে শেরাজ চলে গেল নিজের রুমে। সামিয়া আর নাজমিন ভেতরে ঢুকল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আবারও ফিরে এলো শেরাজ। নাজমিন আর সামিয়া আবারও বেরিয়ে গেল। শেরাজ সুমুর পাশে গিয়ে বসল। সুমুর অচেতন শুকিয়ে যাওয়া মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সুমুর মেহেদী রাঙানো হাতদুটো বের করল সে। দুইহাতের তালুতে ধীরে ইনজেকশন পুষ করল সে। তারপর নতুন চকচকে ধারালো ব্লেড বের করল। আস্তে-আস্তে রিফাতের নাম লেখা জায়গাটায় ব্লেড দিয়ে কেটে দিল সে। চেতনা থাকলে, সুমু এখন একটুও ব্যথা অনুভব করতো না। কারণ শেরাজ ইনজেকশন দিয়ে দুইহাতের তালু অবশ করে নিয়েছে। দুইহাত থেকে নাম দুটো খুব যত্নসহকারে নষ্ট করল শেরাজ। তারপর ফাস্টএইডের বক্স এনে আলতো হাতে সুমুর হাত ব্যান্ডেজ করে দিল। চোখে পানির ছেঁটা দিয়ে সুমুর জ্ঞান ফেরাল সে। আধো আধো চোখে চোখ মেলে তাকাল সুমু। শেরাজ জ্বরের আর ব্যথায় ঔষধ খাইয়ে দিল সুমুকে। সুমু কিছু বলতে নিল, কিন্তু শেরাজ বাধা দিল তাকে। সুমু আর কিছু বলল না। শেরাজ তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। সুমু ঘুমিয়ে যেতেই, সে সুমুর কপালে আলতো করে চুমু খেলো। তারপর ব্যান্ডেজের ওপর দিয়ে দুই হাতের তালুতে চুমু খেলো। কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
খান সাহেব পর্ব ১৬
“সরি সুইটহার্ট!”
কথাটা বলে রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেল সে। আজ শেরাজের মন অশান্ত। রুমে এসে আর ঘুমাতে গেলনা শেরাজ। বেলকনিতে গিয়ে ফোন থেকে সুমুর ছবি বের করে তাকিয়ে রইল ছবিটার দিকে। এইভাবেই হয়তো আজ রাতটা পার করবে সে।
